#প্রণয়ের_অন্তরমহল
#তাহরিশমিতা_মুনতাহা
#পর্বঃ২৩
⚠️ অনুমতি ব্যতীত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫
বাইরে তখন খাঁ খাঁ করছে দুপুরের তপ্ত রোদ। আগুনের হলকায় আকাশটা যেন তামাটে বর্ণ ধারণ করেছে। সেই তপ্ত রোদ আর মনের ভেতর বয়ে চলা শোকের দাবদাহ সঙ্গী করে দিয়ার জানাজা শেষ করে বাড়ি ফিরল সকলে। বাড়ির ভেতরে পা রাখতেই এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা গ্রাস করল সবাইকে।
নির্ণয় এসে সোফাটায় ধপ করে বসে পড়ল। তার মুখে কোনো রা নেই, যেন পাথর হয়ে গেছে। এক জোড়া টকটকে লাল চোখ জানান দিচ্ছে গত কয়েক ঘণ্টার অবর্ণনীয় যন্ত্রণার কথা। কপালে ঘাম আর চোখের জলে ভেজা এলোমেলো চুলগুলো লেপ্টে আছে। চেনা নির্ণয়কে আজ বড্ড অচেনা আর অদ্ভুত লাগছে- বিপর্যস্ত, বিধ্বস্ত এক ছায়ার মতো।
আশরাফুল খাঁন জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। ছেলের এই অবস্থা দেখা তাঁর পক্ষে অসহ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সেই কষ্টের আড়ালে জমে আছে পাহাড়সম ক্ষোভ। অভিমানে বুকটা ভারী হয়ে থাকলেও তিনি আজ নির্বাক।
অন্যদিকে, সোফার এক কোণে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আশা বেগম। ছেলেটার এই হাল তিনি সইতে পারছেন না। বারবার মনে হচ্ছে, চোখের নিমেষে কী থেকে কী হয়ে গেল! বুকের ভেতর থেকে একরাশ হাহাকার বেরিয়ে আসতে চাইল। তিনি আর সামলাতে পারলেন না, শাড়ির আঁচলটা মুখে চেপে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। কান্নার সেই চাপা আওয়াজ যেন পুরো বাড়ির নিস্তব্ধতাকে আরও ভারী করে তুলল।
পুরো বাড়িতে আজ শোকের থমথমে ছায়া। কেউ নড়ছে না, কেউ কথা বলছে না। বাড়ির প্রতিটি মানুষ যেন একেকটি চলন্ত পাথরের মূর্তি, যাদের প্রাণ আছে কিন্তু ভাষা হারিয়ে গেছে।
_______________
হাসপাতালের সাদা দেয়ালগুলোর মাঝে এক বুক হাহাকার নিয়ে শুয়ে আছেন নেওয়াজ মোল্লা, শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে কিছুটা ভালো, কিন্তু মনের ক্ষতটা বোধহয় সারবার নয়। জ্ঞান ফেরার পর থেকে তাঁর দুচোখ বেয়ে কেবল নোনা পানি গড়িয়ে পড়ছে। যে মেয়েটা ছিল তাঁর কলিজার টুকরো, সেই দিয়াকে ছাড়া বাকি জীবনটা কীভাবে কাটবে, সেই চিন্তায় তিনি পাথর হয়ে গেছেন। রুহানি বেগম অনেক চেষ্টা করেছেন স্বামীকে সান্ত্বনা দিতে, কিন্তু ব্যর্থ হয়ে এখন কেবিনের এক কোণে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর নিজের বুকের ভেতরটাও যেন এক তপ্ত মরুভূমি।
অন্যদিকে, নদীর অবস্থা এখন বিপন্মুক্ত হলেও তাকে রাখা হয়েছে কড়া পর্যবেক্ষণে। কিন্তু তার মনের ভেতর যে ঝড় বইছে, তা থামানোর সাধ্য কোনো চিকিৎসকের নেই। নদী চেয়েছিল নির্ণয় আর দিয়াকে আলাদা করতে, কিন্তু সেই আলাদা হওয়াটা যে চিরস্থায়ী বিচ্ছেদ হয়ে দাঁড়াবে, এক মুহূর্তের ব্যবধানে দিয়া পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে, তা সে ঘুনাক্ষরেও ভাবেনি।
অন্ধকার কেবিনে শুয়ে নদীর বারবার মনে হচ্ছে- সে কী করে ফেলল! এই অপরাধবোধ বিষের মতো তার রক্তে মিশে যাচ্ছে। বাবা-মায়ের সামনে সে এই মুখ নিয়ে কীভাবে দাঁড়াবে? যে আদরের বোনটাকে সে নিজের হাতে যমরাজের মুখে ঠেলে দিয়েছে, তার সেই পাপের কি কোনো ক্ষমা আছে? বুক ফেটে আর্তনাদ আসছে তার, ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তেই গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়তে। বেঁচে থাকাটা তার কাছে এখন মৃত্যুর চেয়েও কঠিন মনে হচ্ছে।
__________________
আশরাফুল খাঁন কথা বলেছেন ইন্সপেক্টর রথীন দে এর সাথে। তিনি সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন এটা দুর্ঘটনা। যেন এই বিষয়টা আর না ঘাটে। কেস যেন এখানেই বন্ধ করে দেওয়া হয়।
তিনি চান না এই শোকের আবহে পুলিশি ঝামেলা আর এক চুলও বাড়ুক। তার স্পষ্ট নির্দেশ- পুরো বিষয়টির এখানেই ইতি টানতে হবে। কোনো রকম তদন্ত বা জিজ্ঞাসাবাদ যেন বাড়ির চৌকাঠ না পেরোয়।
আশরাফুল খাঁন খুব ভালো করেই জানেন, পানি ঘোলা করলে কাদা ছিটবে নিজের দিকেই। তাই রথীন দে-কে আড়ালে ডেকে নিয়ে অত্যন্ত কঠোর এবং প্রভাবশালী গলায় নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন। তার স্পষ্ট কথা হলো, যা হবার তা হয়ে গেছে, এখন নতুন করে তদন্তের নামে পরিবারের মানুষকে আর হয়রানি করা যাবে না। তার এই শক্ত অবস্থানের সামনে ইন্সপেক্টরও অনেকটা নিরুপায়। তিনি চান দিয়ার এই মৃত্যু যেন স্রেফ একটা সাধারণ দুর্ঘটনা হিসেবেই নথিবদ্ধ হয়ে ইতিহাসের পাতায় ধামাচাপা পড়ে থাকে।
রথীন বাবু আড় চোখে তাকালেন আশরাফুল খাঁনের দিকে- আশরাফুল খাঁনের মতো প্রভাবশালী মানুষের মুখের ওপর কথা বলার সাহস এই তল্লাটে কারোর নেই। তাই ইন্সপেক্টর রথীন দে-ও আর কথা বাড়াননি। পরিস্থিতির গুরুত্ব এবং আশরাফুল খাঁনের গলার স্বর শুনে তিনি চুপচাপ সায় জানিয়েছেন তার সাথে। দীর্ঘদিনের চেনা সমীকরণে রথীন বাবু জানেন, এই লোক যখন একবার না বলে দিয়েছেন, তখন সেখানে তার আর কিছুই করার নেই, তাই তিনি মাথা নেড়ে নিঃশব্দে সম্মতি দিয়েছেন।
___________________
ওয়াহিদকে আজ একটু বেশিই চিন্তিত দেখাচ্ছে। ছেলেটা কিছু একটা নিয়ে বোধহয় খুব ডিস্টার্ব। সে অস্থির ভাবে নিজের হাতে ফোনটি নিয়ে কারো অপেক্ষায় বসে আছে। বারবার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাচ্ছে, যেন প্রতিটি সেকেন্ড তার কাছে কয়েক ঘণ্টার মতো মনে হচ্ছে।
ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল। কল আসতেই ওয়াহিদ আর দেরি করল না, চটজলদি রিসিভ করে কথা বলতে শুরু করল। তার গলার স্বরে এক ধরণের তাড়া আর চাপা উত্তেজনা। তবে ওপাশের ব্যক্তিটি ঠিক কী বলছে, তা শোনা গেল না। ওয়াহিদ খুব নিচু স্বরে কথা বলছে আর মাঝে মাঝে মাথা নাড়ছে, যেন খুব গোপন কোনো আলোচনা চলছে যা এই মুহূর্তে কাউকে জানতে দেওয়া যাবে না।
বেশ কয়েক মিনিট কথা চলল দুজনের। কথা বলার সময় ওয়াহিদের চেহারায় ভয়ের চেয়েও বেশি ছিল চাপা উত্তেজনা আর দ্বিধা। ওপাশ থেকে আসা প্রতিটি কথা সে যেন খুব সাবধানে গিলে নিচ্ছিল। এরপর কলটা কেটে যেতেই ফোনের স্ক্রিনটা নিভে গেল। ওয়াহিদ এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর যেন বুকের ভেতর জমে থাকা একটা পাহাড় সমান ভার নামিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় বড় করে একটা নিঃশ্বাস ছাড়ল।
বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে কিছু একটা ভাবলো, অতঃপর বিড়বিড় করে বললো-
“নির্ণয়ের সাথে একটু দেখা করা উচিত’
এরপর আর এক মূহুর্ত দাঁড়ালো না। বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়ল খাঁন বাড়ির উদ্দেশ্যে। তবে মন চাচ্ছে নেওয়াজ মোল্লা কে এক নজর দেখতে কিন্তু তা কখনোই হবার নয়। ভাবতেই বুকটা ভার হয়ে এল ওয়াহিদের। আজ কতবছর মামার আদর স্নেহ পায়না। লোকটা বড়ই স্বার্থপর হৃদয়হীনা।
ছিঃ তুই এসব কী ভাবছিস? ওয়াহিদ নিজের এমন ভাবনাকে নিজেই কয়েক দফা গালি দিল। নিজের মাথায় নিজেই একটা গাট্টা মেরে বললো-
“মামার তো এতে কোনো দোষ নেই। মামার দোষ দেওয়াটা বোকামি যা হয়েছে তা কেবলই ভাগ্যের লিখন”
হাঁসল ওয়াহিদ। এরপর বাইকের স্পিড বাড়িয়ে ছুটে চলল খাঁন বাড়িতে।
___________________
নির্ণয় অন্ধকার ঘরের এক কোণে গুটিশুটি মেরে বসে আছে। হাত দুটো থেকে রক্ত চুয়ে চুয়ে পড়ছে মেঝেতে। চামড়া ছিঁড়ে গেছে হাড় ও মনেহয় ভেঙ্গেছে, হাতের অবস্থা বেহাল দশা, বোধহয় দেয়ালে ঘুষি দিয়েছে শরীরের সব শক্তি দিয়ে।
কেমন নেশাগ্রস্ত মনে হচ্ছে নির্ণয় কে। চোখ থেকে অঝোরে পানি ঝড়ছে। নিজের ভূমিষ্ঠ না হওয়া সন্তান আর প্রিয়জনকে হারিয়ে আজ সে শান্ত নদী হয়ে গেছে।
বারবার মনে হচ্ছে সে নিজের হাতে শেষ করে দিয়েছে নিজের সব কিছু। নিজেই কেড়ে নিয়েছে নিজের সব সুখ শান্তি। নির্ণয় প্রচন্ড ক্ষোভে খামচে ধরলো নিজের এলোমেলো চুল গুলো, টানতে টানতে শব্দ করে কেঁদে উঠলো। বিড়বিড় করে বলতে লাগল-
“এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না! না এমনটা হওয়ার কথা ছিল না! কথা ছিল না এমনটা হওয়ার!
পাগলের মত বিলাপ করতে শুরু করেছে ছেলেটা। নিজেই নিজেকে আঘাত করে চলেছে অনবরত। আজ দিয়া যদি দেখত নির্ণয়ের এই পাগলামী বোধহয় সব অভিমান অভিযোগ ভুলে লুটিয়ে পড়ত অসভ্য লোকটার বাহুতে। কিন্তু হায় বড্ড বেশি দেরি হয়ে গেছে।
****
তখন প্রায় সন্ধ্যা ওয়াহিদ এসে পৌঁছেছে খাঁন বাড়িতে। বাইক এক সাইড করে বাড়ির যেন ফটকের সামনে আসতেই অবাক হলো ওয়াহিদ। গেটটা খোলা বাড়ির ভেতরের সবকিছু দেখা যাচ্ছে অনায়াসে। ওয়াহিদ এক কদম দুই কদমে এগিয়ে গেল বাড়ির ভেতরে। একি পুরো বাড়ি ফাঁকা কেমন কবরস্থানের মত শুনশান নীরব।
ওয়াহিদ সিঁড়ির কাছে যেতেই থমকে দাঁড়াল। বাড়ির সকলে নির্ণয়ের ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চুপচাপ। আর ভেতর থেকে কেমন গুড়ুম গুড়ুম আওয়াজ আসছে।
তাড়াহুড়ো করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠল ওয়াহিদ। ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল-
“কী হয়েছে? আপনারা সবাই এখানে এমন চোরের মত উঁকি ঝুঁকি মারছেন কেনো? আর ভেতর থেকে ওটা কিসের শব্দ আসছে?
এক সাথে এতগুলো প্রশ্ন করে থামল ওয়াহিদ। বড় করে শ্বাস নিয়ে ঘাড় তুলতেই দেখল সকলে ওর দিকেই তাকিয়ে। একটু অপ্রস্তুত হলো ওয়াহিদ। শুকনো ঢোঁক গিলে কাঁশি দিয়ে বলল-
“ক……কি হয়েছে? এমন করে তাকিয়ে আছেন কেনো?
সকালে দৃষ্টি এবার নরম হল। আশা বেগম আচমকা ওয়াহিদের হাত দুটো আঁকড়ে ধরে আকুতি করে বলল-
“আমার পোলাডারে যেমনেই হোক ঘর থেইকা বাইর কর বাপ, আমার পোলাডা যে নিজেরে শেষ কইরা দিব।
ওয়াহিদ বুঝলো না আশা বেগমের কথার মানে। কপাল কুঁচকে একবার তাকালো বন্ধ দরজার দিকে এরপর আশা বেগমের দিকে, বলল-
#চলবে

