#প্রিয়া_তুমি
#পর্বঃ১
#লেখিকা_লক্ষী_দেব
“বিয়ের তিন বছরে কতদিন তোর স্বামীর সাথে কথা বলেছিস? ছেলেটা আজ বাদে কাল দেশে আসবে। কোথায় তুই ছেলেটার জন্য অপেক্ষা করবি, সাজবি তা না শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে বাপের বাড়িতে এসে হাজির হয়েছিস।
তানিয়া বড় আপুর কথায় তাচ্ছি’ল্যমাখা হাসি দিল। কোলে থাকা চার বছরের ফারিনকে কোল থেকে নামিয়ে বলল,
“স্বামী নামক মানুষটাকে আমি বিয়ে করতে চাইনি আপু। তোমরাই জোর করে আমায় বিয়ে দিয়েছ। এখন আমার থেকে এসব কি করে আশা করছো?
তামান্না তানিয়ার কথায় দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বোনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“জোর করে বিয়ে দিয়েছি বলে এমন করবি? জোর করে কোনো অস’ভ্য, অভ’দ্র ছেলের সাথে তো বিয়ে দেইনি। রাফসান যথেষ্ট ভদ্র, অমায়িক একজন মানুষ।
“তাতে কি? আমি তো বলেছিলাম আমি বিয়ে করতে চাই না। আমি তো পালিয়ে যেতাম না আপু। আমার কোনো প্রেমিকও ছিল না। আমি শুধু একটু সময় চেয়েছিলাম। তাহলে কেন সেদিন আমার কথা না শুনে বিয়ে করিয়ে দিলে?
“কারণ রাফসানের তোকে হারানোর ভয় ছিল। তুই জানিস তোদের বিয়ের পাঁচ দিনের দিন রাফসান বিদেশ চলে গেছে। আর ফিরছে তিন বছর পর। এই তিন বছরে যদি তোর অন্য কোথাও বিয়ে হয়ে যেত। সেই ভয়ে রাফসান এতো তাড়াহুড়ো করেছে। আর ভালো ছেলে, ভালো পরিবার দেখে আব্বু, আম্মু, আমি কেউই না করিনি।
তানিয়া মুখ ঘুরিয়ে নিল। মোবাইলের দিকে চোখ রেখে বলল,
“আমি আজকে ও বাড়িতে যাবো না আপু। আম্মুকে একটু বলে দিও, ও বাড়িতে ফোন দিয়ে যেন বলে দেয় আমি আজকে এখানে থাকবো।
“এখানে থাকবি মানে? তুমি জানিস না রাফসান কালকে দেশে আসবে। এসে যদি দেখে তুই এখানে তাহলে ব্যাপারটা কেমন হবে? তাছাড়া তোর শ্বশুর বাড়ির লোকজনই বা কি বলবে।
“আম্মু বলে দেবে আমার শরীর ভালো না। তাহলেই তো হয়।
তানিয়া কথায় তামান্না এবার রেগে গেল। গলার স্বর উঁচু করে ডেকে উঠল,
“আম্মু, আম্মু। দেখে যাও, তোমার মেয়ে কীসব বলছে।
তামান্নার ডাক শুনে নিলুফা বেগম ছুটে এলেন। তামান্না, তানিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“কি হয়েছে? কি বলছে তানিয়া?
তামান্না তানিয়ার দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল,
“তোমার মেয়ে নাকি ও বাড়িতে যাবে না। রাফসান দেশে আসছে দেখে ওর শরীর খারাপ করছে। তুমি ওর শাশুড়িকে ফোন দিয়ে বলে দাও, তানিয়া আজ এখানে থাকবে।
নিলুফা বেগম তানিয়ার মুখের দিকে তাকালেন। মেয়েকে শান্ত চিত্তে মোবাইল টিপতে দেখে রাগী গলায় বলল,
“তুই বলেছিস তুই ও বাড়িতে না গিয়ে আজকে এই বাড়িতে থাকবি?
তানিয়া বুঝতে পারল মা রেগে গেছেন। তবুও মায়ের রাগকে পাত্তা না দিয়ে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে বলল,
“হুম বলেছি।
নিলুফা বেগম তানিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ছোঁ মেরে তানিয়ার হাত থেকে মোবাইলটা কেড়ে নিয়ে বলল,
“কেন বলেছিস? তুই জানিস রাফসান আসছে। তারপরও বলছিস এখানে থাকবি। এখন তিনটা বাজে। সকালে যেরকম করে এসেছিস, এক্ষুনি সেরকম করে শ্বশুর বাড়িতে ফিরে যা।
তানিয়া টলমল দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি আমায় তাড়িয়ে দিচ্ছো আম্মু? বিয়ে দিয়ে আমাকে এভাবে পর করে দিলে? আমি তোমাদের এতোটাই বোঝা হয়ে গেলাম যে দুইটা দিন এখানে থাকতে ও পারবো না।
নিলুফা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মেয়েটা এতো অবুঝের মতো কথা বলছে কেন? তাকে তো তাড়িয়ে দিচ্ছে না। শুধু ও বাড়িতে ফিরে যেতে বলছে। নিলুফা বেগম নিজেকে শক্ত করলেন। মেয়েটাকে ও বাড়িতে পাঠাতে হবে। ওর কথায় গলে গেলে চলবে না। দৃঢ় গলায় বললেন,
“যদি ভাবিস তাড়িয়ে দিচ্ছি, তাহলে তাড়িয়েই দিচ্ছি। তুই এক্ষুনি ও বাড়িতে ফিরে যাবি।
তানিয়ার চোখ বেয়ে দু ফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়ল। বাম হাতের উল্টো পিঠে চোখের পানি গুলো মুছে ফেলে। বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আজ বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছো। একদিন দেখবে আমাকে একটু দেখার জন্য ছটফট করবে। কিন্তু দেখতে পাবে না।
তানিয়া আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। মায়ের প্রতি তীব্র অভিমান নিয়ে বেরিয়ে গেল। অথচ মা যে ভালোর জন্যই বলেছে সেটা বুঝল না। তানিয়া চলে যেতেই নিলুফা বেগম থপ করে বিছানায় বসে পড়লেন। বি’ষন্ন গলায় বলল,
“মেয়েটা কি বলে গেল দেখলি?
তামান্না মায়ের কাঁধে হাত রাখল। মুচকি হেসে মাকে ভরসা দিল,
“ওই কথাটা ভুলে যাও আম্মু। ছোট মানুষ বলে ফেলেছে। যখন বুঝতে পারবে তুমি ভালোর জন্য বলেছো তখন দেখবে সব রাগ, অভিমান চলে যাবে।
নিলুফা বেগমের মুখে হাসি ফুটল না। তিনি আগের মতোই চুপ করে রইলেন। কে জানে মেয়েটার রাগ ভাঙে কি-না। মেয়েটা যে বড্ড বেশি অভিমানী।
______________
কলিং বেলের শব্দ শুনে আমেনা বেগম রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দরজা খুলে দিলেন। দরজার ওপাশে ছেলের বউ তানিয়াকে দেখে এক গাল হেসে বললেন,
“তুমি এসেছো। তোমার আম্মার শরীর কেমন এখন? ভালো আছেন তো?
তানিয়া ভেতরে ঢুকলো। সকালে শাশুড়িকে মি’থ্যে কথা বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাপের বাড়ি গিয়েছিল। ইচ্ছে ছিল বাপের বাড়ি গেলে সহজে এখানে আসবে না। কিন্তু কে জানত মা, বোন তার সাথে এমন করবে। তানিয়া তার থমথমে মুখে হাসি ফুটিয়ে শাশুড়ির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আম্মু আগের থেকে এখন অনেকটা ভালো আছে।
“ভালো থাকলেই ভালো। এসো, এসো। দেখো তোমার মামি শাশুড়ি, রিমা, রিতা সকলে চলে এসেছে। বাড়িতে কাজের অন্ত নেই।
আমেনা বেগমের কথাটা শেষ হতেই তানিয়া পো’ড়া পো’ড়া একটা গ’ন্ধ পেল। রান্নাঘরের দিকে পা বাড়িয়ে শাশুড়ির উদ্দেশ্যে বলল,
“আম্মা আপনার রান্না পু’ড়ে যাচ্ছে।
আমেনা বেগমের এতক্ষণে রান্নার কথা মনে পড়ল। হায় হায় করে তানিয়ার পিছু পিছু রান্নাঘরে ছুটলেন। তানিয়া রান্নাঘরে গিয়ে তাড়াতাড়ি করে চুলা নিভিয়ে দিল। আমেনা বেগম কড়াইতে আলু ভাজি বসিয়ে দিয়ে গেছিলেন। এখন সব গুলো আলু পুড়ে গেছে। তানিয়া অসহায় মুখ করে শাশুড়ির দিকে তাকাল। আমেনা বেগম তানিয়ার ভাব ভ’ঙ্গি দেখে বললেন,
“কি আর করবে। এই ভাজি তো কেউই খেতে পারবে না ফেলে দাও।
তানিয়া শাশুড়ির কথা মতো তাই করল। শাড়ির আঁচলটা প্যা’চ দিয়ে কোমড়ে গুঁজে নিজে রান্না করার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে বলল,
“আপনাকে রান্না করতে হবে না আম্মা। আমি করছি।
আমেনা বেগম তানিয়ার কথা মানতে চাইলেন না। তবে তানিয়ার জোরাজুরিতে আর অমত করে পারলেন না। তানিয়া যখনই রান্নার কাজে মন দিল তখনই আমেনা বেগম বলে উঠলেন,
“রাফসানের সাথে তোমার কথা হয়েছে।
তানিয়া রান্না করতে করতেই উত্তর দিল,
“আমি কেন শুধু শুধু উনার সাথে কথা বলতে যাব।
তানিয়ার মুখে এমন অ’দ্ভুত কথা শুনে আমেনা বেগম অবাক হয়ে বললেন,
“মানে? তুমি রাফসানের সাথে কথা বলবে না তো কে বলবে?
আমেনা বেগমের কথা শুনে তানিয়ার হাত থেমে গেল। মুখ ফসকে সত্যি কথাটা বলে ফেলায় নিজে দুটো থা’প্পড় মারতে ইচ্ছে হলো। বিয়ের পাঁচ দিনের মাথায় রাফসান যখন বিদেশ গিয়েছে তারপর রাফসানের সাথে গুনে গুনে মাত্র দুবার কথা হয়েছে তানিয়ার। দ্বিতীয় বার যখন কথা হয় তারপরই রাফসানের নাম্বার ব্ল’ক লিস্টে ফেলে দেয় সে। রাফসান চেষ্টা করেও তানিয়ার সাথে যোগাযোগ করতে পারে না। তবে বাসার কেউই জানে না তানিয়া আর রাফসানের মধ্যে যে যোগাযোগ নেই। রাফসান কখনো কাউকে জানায়নি। তানিয়া তো আরো আগে জানাবে না।
কিন্তু আজকে হুট করে সত্যি কথাটা বলে ফেলায় তানিয়া বি’ব্রত অব’স্থায় পড়ল। কথা ঘুরানোর জন্য বলে উঠলো,
“আসলে আম্মা কথা হয়েছে। তবে আজকে হয়নি। সকালে আম্মুর অসুস্থ’তার কথা শুনে ওই বাড়িতে চলে গেলাম। আর এখন রান্নাঘরে। সারাদিন কথা হয়নি।
তানিয়ার কথায় আমেনা বেগম যেন স্ব’স্তি পেলেন। বিয়ের প্রথম প্রথম তানিয়া যা করেছিল, সেই কথা মনে করে তানিয়ার মুখে অমন কথা শুনে বুকটা ধ’ক করে উঠেছিল। স্ব’স্তির শ্বাস ফেলে বললেন,
“তাই বলো। আমি তো কি-না কি ভেবেছিলাম।
তানিয়া দুচোখ বন্ধ করে শ্বা’স ফেলল। যাক, শাশুড়ি তাহলে সন্দেহ করেনি।
___________
সকাল হতেই বাড়িতে হইচই পড়ে গেল। বাড়ির ছেলে আজকে তিন বছর পর বাড়িতে আসবে। বাড়িতে যেন খুশির জোয়ার বইছে। অথচ তানিয়ার মনে কোনো খুশি নেই। সে তার মতোই নির্বি’কার চিত্তে রয়েছে। সকালে যখন রান্নাঘরে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল তখনই রাফসানের মামাতো বোন রিতা তানিয়াকে দেখে বলে উঠল,
“কি গো ভাবি। ভাইয়া আসছে একটু সাজগোজ করবে না?
রিতার প্রশ্নের উত্তর দিতে তানিয়া মুখ খুলতে নিলেই রিতার বোন রিমা বলে উঠল,
“সাজগোজের কি আছে? ভাইয়া তো আর মেয়ে দেখতে আসছে না। ভাবিকে তো দেখেছেই।
রিমার কথায় রিতা ক্রু’দ্ধ দৃষ্টিতে তাকাল। তানিয়া জবাব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলো না। বিয়ের পর থেকেই খেয়াল করছে রিমা কোনো এক অজানা কারণে তাকে স’হ্য করতে পারে না। তানিয়া কিছুতেই রিমার এমন আচরণের কারণ ধরতে পারছে না।
সকাল দশটার দিকে রাফসান বাড়ি ফিরলো। সকলে যখন রাফসানকে নিয়ে ব্য’স্ত হয়ে পড়ল তানিয়া তখন রান্নার অজুহাতে রান্নাঘরে রইল। রাফসানের সামনে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা তার নেই।
এদিকে বাড়ির সকলকে থাকলেও রাফসানের চোখ জোড়া তানিয়াকে খুঁজছে। মেয়েটা কোথায়? ইচ্ছে করেই কি সামনে আসছে না? রাফসানের চোখ জোড়া তানিয়াকে দেখার জন্য ব্যা’কুল হয়ে উঠেছে। মেয়েটা আসছে না কেন?
#চলবে