প্রীতিলতা আসবে বলে পর্ব-০৩

0
1925

প্রীতিলতা আসবে বলে
লেখিকা :আফরিন ইসলাম
পার্ট :৩
কপি করা নিষেধ

সকালের সোনালী আলো চোখে পড়তেই প্রীতিলতার ঘুম ভেঙ্গে গেল ৷নিজেকে বারান্দার পাশেই আবিষ্কার করলো সে ৷কাল রাতে একা একা চিৎকার করতে করতেই হয়তো ঘুমিয়ে গেছে ৷

প্রীতি ফ্রেশ হয়ে অফিসে চলে গেল ৷অফিসের সবাই তাকে অনেক ভালোবাসে ৷সবার দুঃখে প্রীতি যেন ছায়ার মতো পাশে থাকে ৷কিন্তু কারো সাথে কখনো খুব একটা কথা বলে না ৷কেউ কখনো প্রীতিকে হাসতে দেখে নি ৷প্রীতির বাড়ীতেও কেউ যায় নি আজ অবধি ৷ বরাবরের মতোই বড্ড রহস্যময়ী সে ৷প্রীতি কিছু ফাইল দেখ ছিল হঠাৎ একজন অফিসার তার সামনে নতজানু হয়ে দাড়ালো৷তারপর বলল

ম্যাডাম আপনাকে এসিপি স্যার জরুরী ভাবে ডেকেছেন ৷

প্রীতি মুখে কিছু বলল না ৷এসিপির রুমের দিকে হাটা দিল ৷দরজার সামনে যেয়ে বেল বাজাতেই ওপর পাশ থেকে আওয়াজ এলো ৷

ভেতরে আসো ৷

প্রীতি ভেতরে ডুকতেই বৃদ্ধ এসিপি বলল

কেন তুমি ঢাকাতে যেতে চাইছো বলতো ৷আর তুমি যেই কেসটার জন্য যাচ্ছো ৷ওটা কোনো সাধারন কেস নয় ৷কেউ যদি ভুলেও ঐ কেসে হাত দিয়েছে ৷তাহলে আবার একদিনের মধ্যেই ছেড়ে দিয়েছে ৷

ঐ সব পুলিশদের পিছুটান আছে ৷কিন্তু আমার কোনো পিছুটান নেই ৷আর কিছু বলবেন আপনি স্যার ৷

আর কত দিন তোমাকে বলবো আমাকে স্যার ডাকবে না ৷আমাকে বাবা ডাকতে পারো না ৷তোমার ব্যাপারে কত বার জিঞ্জাসা করলাম ৷কিন্তু কিছুই বলো না ৷আমাদের বাড়ীতেও থাকো না ৷কি করো একা একা সারাদিন ৷এখন আবার সিলেট ছেড়েও চলে যেতে চাইছো ৷তোমাকে চারদিন পর প্লেনের টিকিট কেটে দিয়েছি ৷কিন্তু তুমি তো কালকের মধ্যেই চলে যাবে ৷আমার কোনো কথা তুমি শোনো না ৷

আপনার থেকে চলে যাচ্ছি ৷কারন আমি আপনাদের ভালোবাসি ৷আমার অন্ধকার রাজ্যের ছায়া আপনাদের ওপর ফেলতে চাই না ৷আর আমার সম্পর্কে সময় হলেই জানতে পারবেন ৷আর আমি সময় মতো যোগাযোগ করবো ৷

না গেলে হয় না ৷এখানের সবাই তোমাকে ভালোবাসে ৷

প্রীতি কিছু বলল না ৷এসিপি আবারো বলল একটা কথা বলবো রাখবে প্রীতি মা ৷

চেষ্টা করবো বলুন ৷

সিগারেট আর না খেলে হয় না ৷প্রতিদিন এত এত সিগারেট খাও কেন ৷তোমাকে অনুরোধ করছি ছেড়ে দাও ৷

এটা ছাড়া সম্ভব না ৷

কেন সম্ভব না ৷

প্রীতির চোখ লাল হয়ে উঠলো ৷ওর হাত পা কাপঁতে লাগলো ৷ভয়ংকর কিছু অতীত চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগলো ৷চোখে পানি এসে জমা হয়ে গেল ৷আহ কি কষ্ট ৷প্রীতি নিজের প্যান্টের ভেতর থেকে খুব দ্রুত একটা সিগারেট বের করে টানতে লাগলো ৷সে কাপঁছে খুব করে ৷

এসিপি প্রীতির কাছে এসে বলল আমাকে একটু খুলে বল না রে মা ৷কি হয়েছে তোর ৷

প্রীতি অস্বাভাবিক আচরন শুরু হয়ে গেল ৷ স্যার একটা ছয় মাসের বাচ্চাকে যদি এই সিগারেট দিয়ে পোড়া হয় ৷তাহলে তার কেমন লাগবে স্যার ৷খুব কষ্ট তাই না স্যার ৷একটা মেয়েকে সাত আট জন মিলে ধর্ষনের পর যদি এই সিগারেট দিয়ে তার দেহে ছেকা দেওয়া হয় তাহলে তার কেমন লাগবে স্যার ৷এমন দৃশ্য কখনো দেখেছেন ৷ আর তাও যদি আপনারই পরিবারের সাথে এমন হয় ৷তাহলে আপনার কেমন লাগবে স্যার ৷এটা সিগারেট নয় স্যার ৷এটা আমার প্রতিশোধের একটা মাধ্যম ৷যেটা আজ দশ বছর ধরে আমার সঙ্গী হয়ে আছে ৷

এসিপির শরীর যেন কাটা দিয়ে উঠলো ৷কি সব পাগলের মতো বলছো ৷ কে কাকে সিগারেট দিয়ে পুড়েছে ৷আর কিসের প্রতিশোধ ৷

প্রীতি হঠাৎ স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলো ৷ না না কাউকে কিছু বুঝতে দেওয়া যাবে না ৷তাকে সবার সামনে স্বাভাবিক থাকতে হবে ৷

প্রীতি উঠে দাড়ালো ৷তারপর বলল আমাকে যেতে হবে স্যার ৷ভালো থাকবেন ৷আর চৌদ্দ বছর আমাকে মেয়ের মতো ভালোবেসেছেন ৷আপনার ঋন এই জীবনে শোধ করতে পারবো না ৷চলি আমি ৷

প্রীতিলতা বেড়িয়ে গেল নিজের গন্তব্যে ৷

পরের দিন প্রীতিলতা খুব ভোরে সিলেট থেকে ঢাকার জন্য বের হয়ে গেল ৷গাড়ী চলছে দ্রুত গতিতে ৷আর প্রীতিলতা তার মনে পৈশাচিক আনন্দ যেন বেড়েই চলেছে ৷

রাত হয়ে গেছে ৷ ছোট একটা বাসায় প্রীতি উঠেছে ৷তার একার বেশ চলে যাবে এখানে ৷ একদম নিরিবিলি ৷ কিন্তু তার বাসায় মন বসছে না ৷সে জানে কোথায় তার মন পরে আছে ৷না এখনই তাকে যেতে হবে ৷একটু আগের কেনা নতুন বাইকটা নিয়ে বেড়িয়ে গেল সে ৷

অপর দিকে আবেশ চৌধুরী নিজের হাতে একটা ফটো এলবাম নিয়ে বসে আছে ৷হাত দিয়ে চোখের পানি মুচছে উনি বারবার ৷ আবেশ চৌধুরী নিজের চার বছরের ছেলে আর তিন বছরের মেয়েকে বললেন

এটা তোমার দাদু বুঝলে ৷অনেক বড় ব্যবসায়ী ছিলেন ৷আর এটা তোমার দিদুন ৷অনেক বড় ডাক্তার ছিলেন ৷ছেলে মেয়ে দুটো একটা মেয়ের ছবির দিকে তাকিয়ে বলল

বাবাই আর এইটা কে ৷

আবেশ চৌধুরী চোখ মুছে বলল এটা তোমাদের ফুপি ৷খুব পাজি ছিল ৷আমার সব জিনিস কেড়ে খেয়ে নিত ৷সারা দিন দৌড় করাতো আমাকে ৷এত দুষ্টু ছিল যে সব সময় বকা দিতে হতো ৷কিন্তু দেখ এখন আর দুষ্টুমী করে না ৷ঐ সর্বনাশা আগুন সব শেষ করে দিল ৷

অন্যদিকে প্রীতি দাড়িয়ে আছে তার বাবার তৈরি বাড়ীর সামনে ৷চৌদ্দ বছর আগে চকচক করা বাড়ীর গেটটাতে মরিচা ধরে নষ্ট হয়ে গেছে ৷ভেঙ্গে পরে আছে নিচে ৷প্রীতি সামনে এগিয়ে গেল ৷বাগানের পাশেই বিরাচ একটা দোলনা বাবা বানিয়ে দিয়ে ছিল তাকে ৷ওটার ভাঙ্গা অংশ ছড়িয়ে আছে ৷চারিদিকে অন্ধকার ৷প্রীতি বাড়ীর সদর দরজার কাছে গেল ৷দরজাটা মাকড়সার জালে পেচিঁয়ে আছে ৷জাল গুলো সরিয়ে সে ভেতরে চলে গেল ৷পুরো বাড়ী অন্ধকার ৷কালো ধোয়া আর ময়লায় এটা ভুতুড়ে বাড়ীর মতো হয়ে গেছে ৷সিড়ি গুলো প্রায় ভেঙ্গে গেছে ৷প্রীতি সাবধানের সাথে উপরে উঠে গেল ৷একটা ঘরের সামনে এসে সে থেমে গেল ৷তাকিয়ে রইলো প্রীতি একদৃষ্টিতে ৷প্রীতি দৌড়ে ঘরটাতে ঢুকে গেল ৷একটা দেওয়ালের কাছে যেয়ে হাউমাউ করে কেদেঁ দিল ৷হ্যা এই জায়গাটাতেই তার ছোট ভাইটাকে সবাই মিলে আছড়ে মেরেছে ৷ফ্লোরের হাত দিয়ে কাদতেঁ লাগলো সে ৷হ্যা এখানেই তার ভাইয়ের মগজ গুলো ছিটকে পরে ছিল ৷আর একটু দুরে যেয়ে চিৎকার করে কাদঁতে লাগলো ৷এখাই তার বাবাকে ওরা নির্মম ভাবে মেরেছে ৷বাবার পায়ের কাছেই ছোট ভাইটার লাশ পরে ছিল ৷

প্রীতিলতা কাদঁতে লাগলো ৷তোমরা কেন এভাবে চলে গেলে ৷বাবা আমি ভালো নেই ৷আমি ভালো নেই ৷আমার জীবনে কোনো সুখ নেই বাবা ৷আমি ঘুমাতে পারি না ৷আমি ওদের ছাড়বো না ৷ছাড়বো না আমি ৷প্রীতিলতার চিৎকারে পুরো বাড়ীটা ধমকে গেল ৷

চলবে….