প্রেমপ্রদীপ পর্ব-০৫

0
5279

#প্রেমপ্রদীপ
part–5
Arishan_Nur (ছদ্মনাম)

সমুদ্রকে পরম আদরে আগলে নিল রোদেলা। কালকে থেকে বাবুকে না দেখে ছিল। কেবল সে ই জানে কিভাবে, কতো কষ্টে সে ছিল!

সমুদ্র মাকে পেয়ে স্বস্তি পেল৷ এতোক্ষণ ধরে সে ভেতরে ভেতরে ছটফট করছিল। মায়ের গন্ধ পেতেই বুকটা ঠান্ডা হয়ে গেল তার। এখন কান্নাও পাচ্ছে সমুদ্রের এটা ভেবে যে কিভাবে সে পুরা একটা রাত মাকে ছাড়া ছিল৷

রোদেলা সমুদ্রের দুই গালে চুমু খেয়ে বলে, বাবু দুপুরে খেয়েছো?

সমুদ্র মাথা ঝাকিয়ে বলে, না। মামী পোলাও রান্না করছে। রান্না হচ্ছে।

রোদেলা সময় দেখে নিল। দেড়টা বাজে। সে সমুদ্রকে নিয়েই রুমে আসল। তারপর ফ্রেস হতে গেল।

গোসল সেড়ে বের হতেই দেখল সমুদ্র বিছানার উপর পা তুলে বসে আছে। আর মেঝেতে আয়না একটা বিড়ালের বাচ্চা নিয়ে খেলা করছে। বিড়ালের বাচ্চাটা একটু নড়াচড়া করলে সমুদ্র দৌড়ে বিছানার শেষ কোণায় চলে যাচ্ছে আর জোড়ে জোড়ে ভীত গলায় বলছে, আয়ু প্লিজ ওকে ধরে রাখ। ছেড়ে দিচ্ছিস কেন?

আয়না আবারো খপ করে বিড়ালের বাচ্চাটা ধরে ফেলে এবং আদর করতে লাগলো। সমুদ্রের চোখে-মুখে ভয়। যদি বিড়ালটা তাকে খামচি মারে!

রোদেলাকে দেখে আয়না উত্তেজিত হয়ে বলে, জানো ফুপু সমুদ্র না বিড়াল ভয় পায়!

রোদেলা হাসল। তা দেখে সমুদ্র খানিকটা লজ্জা পেল। কি দরকার ছিল মাকে বলার যে সে বিড়ল ভয় পায়! আয়ুও না সবসময় বেশী বেশী করবে!

রোদেলা আয়নাকে প্রশ্ন করে, আম্মু কই?

–রান্নাঘরে৷

রোদেলা একথা শুনে উদগ্রীব হলো। অথৈয়ের এসময় রেস্টে থাকা জরুরি। তা না সে রান্না করছে। রোদেলা দুইজন কে উদ্দেশ্য করে বলে তোমরা খেল আমি আসছি৷

রোদেলা বের হয়ে রান্নাঘরের দিকে গেল। অথৈকে সাহায্য করতে।রান্নাঘরে গিয়ে দেখল ফাতেমা বেগম আর অথৈ দুজন মিলে রান্না করছে। অথৈয়ের জন্য ডাইনিং টেবিল থেকে একটা চেয়ার আনা হয়েছে৷ অথৈ চেয়ারে বসেই পোলাও রান্না করছে। অথৈয়ের পোলাও রান্না ভালো হয়। ঝরঝরা হয় যার জন্য খেতএ সুস্বাদু হয়। আরেক চুলায় ফাতেমা বেগম রোস্ট বানাচ্ছেন। পোলাও আর রোস্ট খেতে সমুদ্র পছন্দ করে৷ এজন্য রান্না করা হচ্ছে এসব। মা আর ভাবীকে দেখে রোদেলা খুশি হলো। যাক অন্তত পক্ষে তার শ্বাশুড়ির মতো না!

আসলে মেয়েদের অল্প কিছুই চাওয়া থাকে। যেমন শ্বাশুড়ি সুন্দর করে বৌমা বলে ডাকবে। মা বলে ডাকুক তা আশা রাখেনা। ছেলের বউ মেয়ে হবে না কোন দিন। আর একজন মহিলা কোন দিন মেয়ের চেয়ে তার বৌমাকে ভালোবাসতে পারবে না। কিন্তু একটু তো স্নেহ দিতে পারে? মাঝে মাঝে তো এভাবে কাজে সাহায্য করতেই পারে? তরকারি তে লবন বেশি হলে খোটা না মেরে বলতে তো পারে, থাক আরেকটু পানি দিয়ে জাল দিয়ে লবন কমিও আনো!

রোদেলাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ফাতেমা বেগম বলে, কি রে? দাঁড়িয়ে আছিস কেন?

–এমনি তোমাদের কাছে আসলাম। হেল্প করতে।

অথৈ মুচকি হেসে বলে, আরে রান্না শেষ। তুমজ এক কাজ কর সমুদ্রের কাছে গিয়ে বস। ও নাকি কান্নাকাটি করছিল। এখানে এসে অবশ্য কাদেনি। আয়নার সাথে খেলায় ব্যস্ত ছিল। তবে আবেগ ভাইয়া বলছিল বাসায় নাকি কান্না করেছে।

রোদেলা রোবট গলায় বলে, ও কখন চলে গেছে?

ফাতেমা বেগম চিন্তিত গলায় বলে, তুই আসার আগেই গেল। আরেকটু আগে আসতে পারলি না তুই মা!

রোদেলা নরম গলায় বলে, তুমি ফোন দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রওনা দিয়েছি। মহাখালীর জ্যামে আটকা পড়েছিলাম। আমার এখানে কি করার আছে ? ও থাকতে পারল না কিছুক্ষন?

ফাতেমা বেগম চড়া গলায় বলল, ছেলেটা দেড়ঘন্টার মতো বসে ছিল। আর কতোক্ষন থাকবে বসে? ওর ও অফিস আছে৷

রোদেলা বলে, ওর সরকারি চাকরি।

— তাই বলে কি হাসপাতাল না গিয়ে বসে থাকবে?

রোদেলা মায়ের সাথে তর্কে না গিয়ে প্রসঙ্গ পালটে বলল, কালকে রাতে আমি যা সিদ্ধান্ত নিয়েছি সেটার কথা ওকে বলো নি?

–বলেছি৷

— কি বলে ও?

ফাতেমা বেগম বিরক্ত হয়ে গেল এবং রাগী গলায় বলে, তুই ওর সাথে কথা বলে নিজেরা নিজেরা সব ঝামেলা মেটা। এইসবের মধ্যে আমাকে টানছিস কেন?

রোদেলা আর কিছু না বলল না। তারপর আবারো প্রশ্ন করে, বাবা আর মেঘ কখন পৌছাবে?

–সন্ধ্যার পর পর।

তখনই অথৈ প্লেটে করে খাবার বেড়ে রোদেলাকে দিয়ে বলে, সমুদ্র কে খাইয়ে দাও।

রোদেলা প্লেট হাতে নিয়ে বলে, আয়নাও তো খায় নি। দুইজন কে একসাথে খাইয়ে দিচ্ছি৷

–আচ্ছা। ঠিক আছে৷

রোদেলা খাবার হাতে সমুদ্র আর আয়নার কাছে গেল।

আয়না বিড়াল ছানাটা খাজায় ঢুকিয়ে, সমুদ্রের পাশে গিয়ে বসতেই সমুদ্র মায়ের গায়ের সাথে মিশে গিয়ে বলে, আম্মু আয়ুর গা থেকে বিড়াল-বিড়াল গন্ধ আসছে৷

আয়না একথা শুনে গড়গড় করে বলে, তোর মুখ থেকেও গন্ধ আসছে,, ইয়াক,,,আজকে সমুদ্র ব্রাশ করেনি জানো ফুপু?

রোদেলা সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বলে, কেন ব্রাশ করোনি বাবু?

সমুদ্র আল্লাদী গলায় বলে, আমি ব্রাশ করতে পারিনা তো!

আয়না আবার হাসা শুরু করে দিল। সমুদ্র মন খারাপ করে আবারো মায়ের গা ঘেষে বসে পড়ে। রোদেলা দুজনকে খাইয়ে দিল।

★★★

আবেগ রোদেলার বাসা থেকে বের হয়ে নিজের বাসায় যায় নি। বরং রাস্তায় রাস্তায় কিছুক্ষন ঘুরে বেরিয়েছে। আবেগের যখন মন খুব খারাপ থাকে তখন রাস্তায় দাড়িয়ে থাকে। আজকেও ব্যতিক্রম হলোনা। আজকেও তার মন খারাপ। প্রচুন্ড মন খারাপ। বুকে এক ঝাক কষ্ট নিয়ে ঘুরছে সে। আবেগ চায় রোদেলা যেন তার কাছে ক্ষমা চায়! এবং চাকরি ছেড়ে দিয়ে তার সাথে সংসার করে। চাওয়াটা খুবই স্বল্প। তারপর ও রোদেলা তার কথা মানছে না।

আবেগ যথেষ্ট ভালো ইনকাম করে। পেশায় ডাক্তার। কি দরকার রোদেলার কাজ করার? তাও দেশের বাইরে গিয়ে? রোদেলা বাসার আশেপাশে কোথাও জব করুক এতে বিন্দুমাত্র বাধা দিবে না আবেগ কিন্তু থাইল্যান্ড যাওয়ার কি খুব প্রয়োজন? এটা বাড়াবাড়ি করছে না রোদেলা?

আবেগ হাটা ধরল।যে করেই হোক সে সমুদ্র কে নিজের কাছে রাখবে। রোদেলার সাথে থাইল্যান্ড যেতে দিবে না। এতে রোদেলার ও শিক্ষা হবে যে– ক্যারিয়ার এর জন্য সংসার ছাড়া কতোটা ভুল সিদ্ধান্ত!

হুট করে ফোন বেজে উঠল। সে পকেট থেকে ফোন বের করে দেখে রিশাদ কল দিয়েছে। বিরক্ত হলো আবেগ। ইদানিং এই রিশাদ তার পিছু ধরেছে। রিশাদের মায়ের কিডনি তে সমস্যা। তাদের হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে৷ এজন্য মাঝে মাঝেই কল দেয় রিশাদ। কল দিয়ে চিকিৎসা সংক্রান্ত কথা পর্যন্ত ব্যাপার টা থাকলেও আবেগ বিরক্ত হতোনা কিন্তু রিশাদ বিভিন্ন ধরনের গল্প শুরু করে দেয়। সবই রোদেলা আর রিশাদের একসাথে মিটিংয়ে পর ঘুরতে যাওয়ার গল্প। এসব শুনলেই মেজাজ খারাপ হয় আবেগের।

আবেগ না চাইতেও ফোন ধরল। রিশাদ ওপাশ থেকে বলে উঠে, কেমন আছেন ডাক্তার সাহেব?

আবেগ বলল, ভালো।

–আম্মাকে তো কালকে আবার টেস্ট করাতে নিয়ে যাব।

–ওহ।

–রোদেলাও তো অসুস্থ। এখন কেমন আছে ও?

আবেগ জানতই না রোদেলা অসুস্থ। রোদেলা যে অসুস্থ এটা এখন তাকে বাইরের মানুষের কাছে শুনতে হচ্ছে!

আবেগ প্রতিউত্তরে কিছু বললোনা।

রিশাদ নিজ থেকেই বলে উঠে, কালকে অনেকক্ষণ কথা হলো রোদেলার সাথে। ও অনেক এক্সাইটেড। থাইল্যান্ড যাওয়া নিয়ে।

আবেগ হুট করে বলে, আপনি কি আমার সাথে দেখা করতে পারবেন?

–অবশ্যই। এখন নাকি পরে?

–এখন করলে ভালো হয়।

–ঠিক আছে।

কিছুক্ষন পর একটা রেস্টুরেন্টে আবেগ পৌছে গেল। রিশাদ ও চলে আসল।

রিশাদ চেয়ারে বসতে বসতে বলল, আজকে আমি আপনাকে খাওয়াব।

আবেগ ভ্রু কুচকে বলে, কেন? কোন ভালো খবর আছে?

–জি। আমার ও থাইল্যান্ড পোস্টিং হয়েছে। রোদেলা জানায় নি আপনাকে? আমি তো মিস্টি পাঠিয়েছিলাম।

আবেগের চোয়াল শক্ত হয়ে আসল। রোদেলা তাকে বলেই নি রিশাদ ও যাচ্ছে থাইল্যান্ড। এবার আসল ব্যাপার খোলাসা হলো আবেগের কাছে। রিশাদ যাচ্ছে জন্য রোদেলা ও বিদেশে যাওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে।

–ডাক্তার সাহেব?

আবেগ রিশাদের ডাকে ভাবনা থেকে বের হয়ে এলো।

রিশাদ বলল, আজকে তো রোদেলা হাফ ডে কাজ করেছে। বিকেলে একটা নিউস পেয়েছি৷

–কি নিউস?

–নিউসটা হলো থাইল্যান্ডে তিন মাস আগে ট্রেনিং দেওয়া হবে। এই সময় ট্রেনিং সেন্টারে থাকতে হবে। ফ্যামিলি এলাউ না। তিন মাস পর কোয়াটার দেওয়া হবে। তখন ফ্যামিলি নিয়ে থাকতে পারবে। সামনের সোম বার আমরা বাংলাদেশ থেকে থাইল্যান্ডে রওনা দিব।

রিশাদের কথা শুনে আবেগ বাকা হাসল আর মনে মনে বলে,মানে আর মাত্র তিন দিন! রোদেলা যদি যেতে চায় তাহলে আগে একা যেতে হবে, তিন মাস পর সমুদ্র কে নিয়ে যেতে পারবে। এই তিন মাসে ই সব পালটে যাবে। নয় ছয় থেকে ছয় নয় করে দিব।

আবেগ রিশাদকে প্রশ্ন করে, রোদেলা অফিসে সবাইকে কেন বলত সে ডিভোর্সি?

— জানি না।

— আপনাকে কে তাহলে সত্য বললো?

— এটাও জানি না। তবে ডিভোর্সি দের জন্য অফিসে কোটা জাতীয় কিছু আছে মেবি,,,,,,

★★★

–আম্মু জানো আয়ুর নাকি একটা ছোট্ট বোন হবে।

–হুম। জানি।

— আয়ুর একটা বোন হবে। আমার স্কুল ফ্রেন্ড আরিফের একটা ভাই আছে। আমার কোন ভাই-বোন হবে না?

রোদেলা বলল, সমুদ্র এতোবেশী কথা বলবেনা। সবসময় চুপচাপ থাকবে। বেশি কথা বলা আমার পছন্দ না।

সমুদ্র চুপসে গিয়ে বলে, আমি তো কমই কথা বলি আম্মু। আয়ু এর চেয়ে বেশি কথা বলে। স্কুলে সারাক্ষণ এর-ওর সাথে কথা বলতেই থাকে।

— সমুদ্র তুমি কি আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে?

সমুদ্র তার মাকে আকড়ে ধরে বলে, নাহ। কালকে রাতে আমার অনেক কষ্ট হচ্ছিল।

রোদেলার চোখে পানি চলে আসল। তবুও সে কঠিন গলায় বলে, কিন্তু আমাকে ছাড়া থাকতে হবে।

সমুদ্র কাদো কাদো গলায় বলে, পারব না আম্মু তোমাকে ছাড়া থাকতে।

কালকে দাদি বলছিল মা নাকি তাকে রেখে অনেক দূর চলে যাবে। কথাটা কি তবে সত্যি? সমুদ্রের ভয় হতে লাগলো!

রোদেলা সমুদ্রের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে, পৃথিবীতে সম্ভব না এমন কোন কাজ নেই বাবু। মানুষ এভারেস্ট জয় করছে, চাঁদে গিয়েছে, ডাইনামাইট তৈরি করেছে, সেখানে তুমি তোমার মাকে ছাড়া থাকতে পারবে না? এটা তো বোকাদের মতো কথা। বল যে তুমি তোমার মা ছাড়া থাকতে পারবে। যে-সব কাজ নিজে নিজে করতে পারোনা সেসব কাজ পরিস্থিতি সাপেক্ষে শিখে যাবে।

সমুদ্র মায়ের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছে। মা কি বলছে কিছুই তার মাথায় ঢুকছেনা। এর আগে মা কোন দিন এমন সব কথা বলেনি।সবসময় তাকে জুজুবুড়ি, পান্তাবুড়ি, টোনাটুনির গল্প শুনায়। আর এতো রাগী গলায়ও কথা বলেনা কোনদিন।আজ কি হয়েছে আম্মুর?

সমুদ্রের একটু ভয় ও লাগছে। মা কি কোন কারনে তার উপর রেগে আছে? ম্যাথ স্যার কি মাকে ফোন দিয়ে বলে দিয়েছেন যে সে পড়া পারেনি?

রোদেলা সমুদ্রের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল। সমুদ্রের ঘুম ঘুম ভাব চলে এলো। রোদেলা সমুদ্রের কাছে এসে বলতে লাগলো, তুমি যদি ভদ্র ভাবে থাকো, ঠিকভাবে পড়াশোনা করো তাহলে আম্মু তোমার কাছে আসবে!

সমুদ্র গভীর ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছে তারপর ও মায়ের কথার পিঠে উত্তর দিল, আমি প্রতিদিন পড়া করে যাব স্কুলে মা! তারপর ও তুমি কোথাও যেও না প্লিজ।

সমুদ্র ঘুমিয়ে যাওয়ার পর পর রোদেলার ফোন বেজে উঠল। আবেগের কল।

রোদেলা ফোন দ্রুত রিসিভ করল। আবেগ ওপাশ থেকে কর্কষ গলায় বলে, বিজি আছেন নাকি ম্যাডাম?

রোদেলা ঝাঝালো কন্ঠে বলে, এভাবে কথা বলার তো কোন মানে দেখছি না আমি আবেগ।

— অবশ্যই কারন আছে। তুমি এতো বড় অফিসে চাকরি করবে তাও আবার থাইল্যান্ডে কোয়ার্টার পাবে।গাড়ি পাবে। আমি রিটায়ার্ড করেও গাড়ি কিনতে পারি কিনা সন্দেহ আছে। ওখানে তুমি থাই বাত কামাবে আর এখানে আমি বাংলাদেশী টাকা কামাবো। এতো বড় অফিসার সাহেবা কে কিভাবে তুমি বলে ডাকি বল? সম্মান দেওয়া উচিত।

আবেগের কথায় রোদেলার বিরক্ত লাগতে শুরু করল। একটা সময় ছিল আবেগের প্রতিটা কথায় সে মুগ্ধ হতো! এখন মুগ্ধ তো অনেক দূরের কথা বরং বিরক্ত হয়!

রোদেলা বলে, তুমি আমাকে অপমান করার জন্য কল করেছো?

–না। আগামী সোম বার তো তুমি চলে যাচ্ছো। একয়েকদিন সমুদ্র তোমার সাথে থাক। তুমি যাওয়ার সময় ওকে নিতে আসব।

–আচ্ছা৷

— আরো একটা কথা।

— কি?

— আমি আমার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছি। তোমাকে তালাক দিব না। তুমি বিদেশ যাও যা ইচ্ছা করো কিন্তু তালাক দিচ্ছিনা আমি।

–এটা কেমন কথা? দুই দিন আগে তুমি তালাক দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলে, আজ হঠাৎ কি হলো?

–কিছু না। ভাবলাম তোমাকে মুক্তি দিলে তুমি আবারো নিজের জীবন নতুন করে শুরু করবে। সমুদ্রের ঝামেলা তো আর থাকছে না তোমার।

রোদেলা রেগে গিয়ে বলে, সমুদ্র তোমার জন্য ঝামেলা?

–আমার জন্য না। আমার জন্য আমার ছেলেই সব। তোমার জন্য ঝামেলা সমুদ্র। তাই তো রেখে যাচ্ছো।

রোদেলা কাপা গলায় বলে, জাস্ট তিন মাস ও তোমার সাথে থাকবে এতেই তুমি আমাকে খোটা মারছো? আমার জন্য ও ঝামেলা হলে নয় মাস পেটে রাখতাম না? আর একটা সন্তানের দায়িত্ব কেবল তার মায়ের না? বাবার ও আছে দায়িত্ব। সমান দায়িত্ব আছে ওর উপর তোমার।

— আমি কখনোই দায়িত্ব থেকে পিছপা হইনা। তোমার সাথে তর্কে জড়ানোর ইচ্ছা নেই।

— তালাক যে দিচ্ছো না দুই দিন পর ই তোমার মা তোমাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য পাগল হয়ে যাবে।

— সব কিছু এতো সহজ না। রোদেলা? (করুণ গলায়)

আবেগের মুখে এভাবে নিজেকে ডাকতে দেখে অবাক হয়ে গেল রোদেলা।

আবেগ বিনীত গলায় বলে, যাওয়ার দরকার নেই থাইল্যান্ড। তুমি চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে আসো। আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিব৷

— সম্ভব না। আর কিসের জন্য ক্ষমা করবে তুমি?

— অফিসে সবাইকে নিজের পরিচয় ডিভোর্সি দেওয়ার জন্য।

রোদেলা চমকে উঠে। কিন্তু কিছু বললোনা। চুপ থেকে কিছুক্ষন পর খট করে ফোন কেটে দিল।

★★★
আগামী সোমবার রোদেলা সত্যি সত্যি থাইল্যান্ড চলে গেল। আবেগ ভেবেছিল শেষ মুহূর্তে রোদেলা সব ছেড়ে তার কাছে ফিরে আসবে আর বলবে, আমার ক্যারিয়ার দরকার নাই। তুমি হলেই চলবে।

কিন্তু এমন কিছু ঘটেনি। এয়ারপোর্ট এ রাত বারোটায় পৌছে যায় তারা। আবেগ ও যায় সমুদ্র কে নিয়ে রোদেলাকে বিদায় জানাতে। তাদের মধ্যে কোন রকম কথা হয় নি।

অনেক রাত হওয়ায় রোদেলা এয়ারপোর্টের ভেতরে ঢুকার সময় সমুদ্র বাবার কোলে ঘুমিয়ে পড়ে ছিল। শেষ বার আর মায়ের দেখা পেল না ছোট্ট সমুদ্র।

কোন পুরুষের জীবনে যদি এমন কোন নারী থাকে যার কাছে আপনার চেয়ে তার ক্যারিয়ার বেশি জরুরী ও প্রিয়, বুঝে নিবেন পৃথিবীর সবচেয়ে অভাগা হলো সেই পুরুষ টা!

রোদেলার যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল আবেগ। কোলে তার পাচ বছরের ছেলে। ছেলের গায়ে জ্বর। সমুদ্রের জ্বর এসেছে। আবেগ তাকে শক্ত করে চেপে ধরে। এদিকে আবেগের চোখে বেদনা তো ওদিকে সদ্য শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পা রাখা রোদেলার চোখে-মুখে উপছে পড়া স্বপ্ন! স্বাধীনচেতা হওয়ার শান্তি মুখে বিরাজ করছে।

চলবে৷