প্রেম এসেছিলো নীরবে পর্ব-০৪ + বোনাস পর্ব

0
1146

#প্রেম_এসেছিলো_নীরবে(৪)
#সাদিয়া_জাহান_উম্মি
ড্রয়িংরুমে বসে আড্ডা দিচ্ছে সবাই।হেমন্ত, হিয়া আর প্রাহি।তারা ওদের ছোটবেলার ছবি দেখবে।হিয়া এইবার ছবির এ্যালবামটা খুললো।সবার আগে আসলো অর্থ কারন সে হলো সবার বড়।ছবিটা দেখেই ওরা হেসে দিলো।অর্থ পুরো উদম হয়ে আছে আর ওর মুখে সুজি ভরা সে কান্না করছে। প্রাহি ছবিটার দিকে গভীর নয়নে তাকিয়ে রইলো।বাচ্চাটা কে সে জানে না।তবে তার খুব হাসি পেয়েছে।প্রাহি জিজ্ঞেস করলো,

-” এটা কে হিয়া আপু?”

হিয়া হাসতে হাসতেই বলে,

-” আরে এটা অর্থ ভাইয়া।তুই ভুলে গেছিস।ওহ সরি তুই তো আর অর্থ ভাইয়াকে তো তুই আর চিনিস না।”

হেমন্ত বললো,

-” এটা ভাইয়ার যখন দেড় বছর বয়স তখনকার ছবি।ভাইয়া খেতে খেতেই হিসু করে দিছিলো।আর বড়মা উনাকে ন্যাংটু করে দিয়ে আবারও খাওয়াতে চাইছিলো।কিন্তু ভাইয়া ন্যাংটু হয়ে কিছুতেই খাবে না।তাই তো সুজি দিয়ে একেবারে মুখ ভরিয়ে ফেলেছে।”

প্রাহি খিলখিল করে হেসে দিলো।হেমন্ত আর হিয়া প্রাহির হাসির দিকে তাকিয়ে রইলো।ইসস,মেয়েটা মনে হয় অনেক দিন পর এইভাবে হাসছে।প্রানটা জুড়িয়ে গেলো ওদের।প্রাহি হাসি থামিয়ে আবারও নানান ছবি দেখতে লাগলো।অর্থ’কে ও কখনোই দেখেনি।প্রাহি এইবার জিজ্ঞেস করেই ফেললো,

-” অর্থ ভাইয়াকে কি আমি কখনই ছোট বেলায় দেখিনি?”

হেমন্ত আস্তে করে বলে,

-” নাহ দেখিস নি।ভাইয়ার যখন জন্ম হওয়ার এক বছর আগেই বড়মা আর বড়বাবা ভাইয়াকে তার মামা, মামির কাছে লন্ডন পাঠিয়ে দেয়।ভাইয়ার মেধা অনেক ভালো ছিলো তাই। তোর জন্মের পর একবার এসেছিলো দুমাসের ছুটিতে। তখন তোর দু’বছর বয়স ছিলো।তাই তোর কিছুই মনে নেই।”

হিয়া বলে উঠে,

-” ভাইয়া ছোট থেকেই অনেক গম্ভীর একজন মানুষ।আর যেই পরিমান রাগ ভাইয়ার। যখন রাগ উঠে বাড়ির কারো সাধ্য নেই তার রাগ কমানোর।আমরা ভয়ে কেউ যাইনা তার কাছে তখন।এখনো ঠিক সেইরকমি আছে।একটুও বদলায়নি।তবে আমাদের সবাইকে অনেক ভালোওবাসে।”

প্রাহি ছোট্ট করে ঢোক গিললো লোকটার কথা শুনেই কেন যেন ওর হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে।না জানি লোকটাকে দেখে ও হার্ট এট্যাক না করে বসে।
….

গাড়িতে বসে আছে অর্থ একটু আগেই সে বাংলাদেশে ল্যান্ড করেছে।হেমন্ত আসতে চেয়েছিলো ওকে পিক-আপ করতে কিন্তু অর্থ মানা করে দেয়।শুধু বলে গাড়ি পাঠিয়ে দিতে।আজকে অর্থের কাছে কেমন যেন লাগছে।হেমন্ত’র সাথে কথা খাওয়ার পর থেকেই ওর বুকের ভীতরটা অস্থিরতা ছেয়ে আছে।কেন এমন লাগছে কিছুই বুজতে পারছে না অর্থ।গাড়ির হর্ণে ধ্যান ভাঙে।বাড়ি এসে পড়েছে।বাড়ির গেট খোলা হচ্ছে।পার্কিং লটে গাড়ি থামতেই বের হয়ে আসে অর্থ।ড্রাইভারকে লাগেজ নিয়ে আসতে বলে ও এগিয়ে যায় সদর দরজার দিকে।ঘড়ির দিকে তাকায় অর্থ রাত এগারোটা বাজে।তার বাড়ির মানুষ আবার এতো তাড়াতাড়ি ঘুমোয় না।তাদের ঘুমোতে ঘুমোতে ১২ টা বাজে।তাই নির্দিধায় কলিংবেল বাজালো।

-” আমি আর অর্থ ভাইয়া দু বছরের ছোট বড়। হিয়া আমার থেকে আট বছরের ছোট আর অর্থ ভাইয়া থেকে দশ বছরের।”

হেমন্তের কথায় প্রাহি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।সবাই ওর থেকে কতো বড় আর ও কি না ১৬ বছরের একটা পুচকি মেয়ে।লোকে ওকে তাহলে ঠিকই করে বাচ্চা বলে।প্রাহি বললো,

-” তোমার বয়স কতো ভাইয়া?”

হেমন্ত হালকা হাসলো বললো,

-” আমার ২৬ বছর বয়স।অর্থ ভাইয়ার ২৮ আর হিয়ার ১৮।”

প্রাহি মুখ গুমড়া করে বলে,

-” আমি তোমাদের সবার থেকে কতো ছোট।”

হিয়া খিলখিল করে হেসে বললো,

-” তাই তো তোকে পিচ্চি ডাকি।”

হঠাৎ বাড়ির কলিংবেলের আওয়াজে সবাই থেমে যায়।হেমন্ত হিয়াকে বললো গিয়ে দরজা খুলে দিতে।হিয়া উঠে গেলো দরজা খুলতে।দরজা খুলেই ‘ ভাইয়া!’ বলে অর্থকে জড়িয়ে ধরে।অর্থও গম্ভীরভাবে বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।হিয়া অর্থকে ছেড়ে চিৎকার করে সবাইকে ডাকলো।এতে অর্থ ভ্রু-কুচকে রাগী কন্ঠে বললো,

-” এতো রাতে এইভাবে চিৎকার করছিস কেন? আমি কি নতুন এসেছি এই বাড়িতে।”

ভাইয়ের রাগি কন্ঠে হিয়া চুপ হয়ে গেলো।অর্থ বাড়িতে প্রবেশ করতেই রায়হানা বেগম ছুটে এসে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলো।কান্নারত গলায় বলে,

-” বাবা তুই এসেছিস।কতোদিন পর আমার ছেলেটাকে দেখলাম।আর তুই যে আসবি আমাকে বললি না কেন?”

অর্থ বিরক্তি নিয়ে বলে,

-” উফফ মা।আই ডোন্ট আন্ডার্স্ট্যান্ড হুয়াই ইউ ক্রায় সো মাচ ইন ওয়ার্ড্স। তুমি জানো না তোমার চোখে জল দেখতে ভালো লাগে না।আর রইলো আমি আসবো সেটা ইচ্ছে করেই জানাইনি।তবে হেমন্তকে বলে রেখেছিলাম।আমার মা’কে একটু সার্প্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম।”

লাস্ট কথাটা বলে হালকা হেসে মাকে জড়িয়ে ধরলো।সবার সাথে কুশলাদি বিনময়ে যখন ব্যস্ত অর্থ হঠাৎ ওর নজর আটকে যায় একটা মেয়ের উপর।অর্থর ভ্রু-কুচকে দেখছে মেয়েটাকে।মেয়েটার গায়ে জড়ানো বেবি পিংক কালার স্কার্টের সাথে সাদা ফতুয়া আর বেবি পিংক কালারের স্কার্ফ গলায় পেচানো,চুলগুলো পনিটেইল করে রেখেছে।মুখশ্রীটা ভালোভাবে বুজা যাচ্ছে না মাথা নিচু করে আছে বিদায়।মেয়েটার চেহারাটা দেখার জন্যে অর্থের হৃদয়টা ছটফট শুরু করলো।তাই রায়হানা বেগমকে জিজ্ঞেস করলো,

-” মা হু ইজ সি?”

রায়হানা বেগম ছেলের প্রশ্নে একবার প্রাহির দিকে তাকালো।তারপর হালকা হেসে প্রাহির কাছে গিয়ে ওকে নিয়ে অর্থের সামনে এসে দাড়ালো।অর্থ কুচকানো ভ্রু-জোড়া আরো কুচকে এলো।রায়হানা বেগম বললেন,

-” এটা হলো প্রাহি।”

অর্থ জিজ্ঞাসুদৃষ্টিতে এখনো তাকিয়ে।রায়হানা বেগম আবারো বললেন,

-” ও তোমার ছোটমা’র বোনের মেয়ে প্রাহি।”

অর্থ এইবার বিষ্ময় নিয়ে তাকালো অবাক হয়ে বলে,

-” হুয়াট?ডিড ইউ জাস্ট সে দ্যাট সি ইজ প্রাহি?বাট হাউ ইজ দিছ পসিবল?”

হেমন্ত এইবার এগিয়ে এসে অর্থকে সবটা খুলে বললো।এইবার অর্থ বুজতে পারলো সবটা।হিয়া প্রাহিকে উদ্দেশ্য করে বললো,

-” প্রাহি মা ভাইয়াকে সালাম দেও।”

প্রাহি এইবার কাচুমাচু হয়ে আস্তে করে মুখটা উপরে তুললো।কাঁপা কন্ঠে বলে,

-” আস..আসসালামু আলাইকুম ভা..ভাইয়া।”

এদিকে অর্থ স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে।প্রাহি মুখটা তুলে ওর দিকে তাকাতেই মনে হলো অর্থের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসলো।এতোটা নিষ্পাপ মুখশ্রী বুজি কারো হয়?আর এতোটা মায়া জড়ানো মুখশ্রী।কাজলটানা চোখগুলোতে অর্থের মন গেঁথে গেলো,গোলাপি ঠোঁটজোড়া হালকা কাঁপছে।ফর্সা গোলগাল চেহারাটা দেখতেই অর্থের এতোক্ষন যে অস্থিরতা ছিলো তা যেন নিমিষেই বিলীন হয়ে গেলো।হিয়ার কথায় অর্থ তার সম্ভিত ফিরে পায়।হিয়া বলছে,

-” ভাইয়া প্রাহি সালাম দিয়েছিলো.! ”

-” হুম!ওহ হ্যা ওয়া আলাইকুমুস সালাম।”

প্রাহি কাঁপতে কাঁপতে আবার জিজ্ঞেস করে,

-” কেমন আ..আছেন ভা..ভাইয়া।”

-” আলহামদুলিল্লাহ! তুমি কেমন আছো।”

-” ভা..ভালো।”

রায়হানা বেগম এইবার অর্থকে বললো গিয়ে ফ্রেস হয়ে আসতে।তিনি অর্থের খাবার তার রুমে পাঠিয়ে দিবেন।অর্থ একপলক আবার তাকালো প্রাহির দিকে।তারপর গটগট পা ফেলে চলে গেলো নিজের রুমে।আস্তে আস্তে বাকিরাও চলে গেলো ঘুমোতে কারন রাত হয়েছে।হেমন্ত প্রাহিকে নিয়ে প্রাহির ঘরে গিয়ে প্রাহিকে মেডিসিন খাইয়ে দিয়ে ও চলে গেলো নিজের রুমে।
প্রাহি সুয়ে সুয়ে বার বার এপাশ ওপাশ করছে।কিছুতেই ওর ঘুম আসছে না।আকস্মিক সুখের দেখা পেয়ে প্রাহি অনেকটা ভীতু হয়ে আছে।কারন ওর জীবনে সুখ বেশিদিন টিকে না।সেই ভয়ে ও চেয়েও মন থেকে হাসিখুশিভাবে থাকতে পারছে না।হারানোর ভয় ওকে সর্বদা আকড়ে ধরে রাখে।প্রাহি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানা থেকে নেমে ব্যালকনিতে গিয়ে দাড়ালো।নীকষ আঁধার কালো আকাশে এক থালা চাঁদের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারা মেলা খুব অল্প।তবে জ্যোৎস্নার আলোতে চারপাশ মুখরিত হয়ে আছে।প্রাহির চোখের কোনে জল ভরে উঠলো।প্রতিটা রাত মা,বাবা না থাকার কষ্টটা যেন ওর হৃদয়টা দুমড়ে মুচড়ে দেয়।বোজার বয়স হতে কখনো সে একবেলা ঠিকঠাকভাবে খেতে পারেনি।সবসময় মামা,মামি আর মামাতো বোনের অত্যাচারে জীবনটা বিষিয়ে উঠেছিলো ওর।বারবার মরে যেতে ইচ্ছে করতো ওর।কিন্তু চেয়েও পারতো না।কারন আত্মহত্যা মহাপাপ। ওর শরীরে যে কতোশতো আঘাতের চিহ্ন তা একজন সুস্থ্য স্বাভাবিক মানুষ দেখলেও ভয় পাবে।আর পারলো না প্রাহি বুকে জমে থাকা কষ্টগুলো জল আকারে গড়িয়ে পড়লো ওর মৃসন কোমল গাল বেয়ে।প্রাহি সাথে সাথে চোখের জলটুকু মুছে নিজের ঘরে চলে গেলো।এতোক্ষন সবটাই নিজের ব্যালকনি থেকে দেখছিলো অর্থ।গোসল সেরে সে ব্লাক কফি খাচ্ছিলো ব্যালকনিতে বসে।হঠাৎ প্রাহিকে পাশের ব্যালকনিতে দেখে ভ্রু-কুচকে তাকিয়ে ছিলো।মেয়েটার ফর্সা কোমল চেহারাটা দেখলেই অর্থের কেমন যেন একটা অনুভূতি হয়।শুধু সেই চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকতেই ইচ্ছে করে।প্রাহিকে যখন দেখছিলো অর্থ তখন হঠাৎ প্রাহির চোখে জল দেখে কেন যেন ওর বুকের ভীতরটাও মোচড় দিয়ে উঠেছিলো।কিন্তু কেন এমনটা হচ্ছে?এই মেয়েটাকে এই নিয়ে শুধু দুবার ভালোভাবে দেখলো।একবার যখন প্রাহি খুব ছোট ছিলো আর এখব আবার দেখলো।তাহলে এই মেয়ের জন্যে ওর হৃদয়ে এতো অস্থিরতা কিসের। অর্থ বিরক্ত হয়ে কফি মগটা ব্যালকনি থেকে নিচে সজোড়ে আছাড় মারলো।তারপর হনহন করে চলে গেলো নিজের ঘরে।এখন ঘুমই পারবে তাকে এই অস্থিরতা থেকে মুক্তি দিতে।

#চলবে,,,
কেমন হয়েছে জানাবেন প্লিজ।আর ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।

#প্রেম_এসেছিলো_নীরবে (বোনাস পর্ব)
#সাদিয়া_জাহান_উম্মি
আঁধার কালো রাত পেরিয়ে সূর্য মামা জেগে উঠেছে তার দীপ্তমান আলো দ্বারা আলোকিত করেছে এই ধরনী।প্রাহি ফজরের নামাজ পরে তার মিষ্টি সুরে কোরআন শরিফ তিলাওয়াত করছে।এটা তার নিত্যদিনের অভ্যাস।আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিনের দরবারে সে সবার ভালোর জন্যে দো-আ করে।কেন যেন ওর ভালো লাগে।নিজের জন্যে দো-আ না চেয়ে অন্যের জন্যে প্রানভরে দো- আ চাইতে।প্রাহি ভাবে ও যেভাবে অন্যের জন্যে আল্লাহ্’র দরবারে দো-আ চাইছে।ঠিক তার মতোই অন্য কেউ হয়তো ওর জন্যেও দো-আ চাইছে আল্লাহ্’র কাছে।কোরঅান তিলাওয়াত শেষ হতেই প্রাহি নিজের বিছানা গুছিয়ে নিলো। তারপর নিজের চুলগুলো ভালোভাবে আঁচড়ে নিজে যাওয়ার জন্যে উদ্যত হলো।আজ প্রাহি সবার জন্যে সকালের জন্যে নাস্তা বানাবে এটা পন করেছে।রান্নাঘরে গিয়ে দেখে সেলিমা খালা মাত্র উঠেই রান্না ঘর ঝাড়ু দিচ্ছেন।প্রাহিকে দেখেই তিনি হাসলেন।সেলিমা খালা এই বাড়িতে কাজ করেন অনেক বছর হলো।প্রাহি তিনি ছোট থেকেই খুব স্নেহ করেন।আর প্রাহিও তাকে খুব ভালোবাসে।প্রাহিকে উদ্দেশ্য করে সেলিমা বললেন,

-” কিগো ছোট বুড়ি।তুই এতো সকালে এইহানে কি করোছ?”

প্রাহি মুচকি হেসে বললো,

-” আজ আমি সবার জন্যে নাস্তা বানাবো খালা।”

খালা অবাক হলেন প্রাহির কথা শুনে।তাই বললেন,

-” ধুর হো হতচ্ছারি।তোর শইল ভালা না আমারে বড় আফা আর ছোট আফায় কইছে।তুই এতো সকালে উঠছোস হেইয়ার লাইজ্ঞাই তোরে মারতে মন চাইতাছে।আবার তুই এহন আইছোস রান্দোন চড়াইতে।যা গিয়া বিশ্রাম নে গা।”

প্রাহি মুখ কালো করে বলে,

-” এমন করছো কেন খালা?আমি ঠিক আছি।মেডিসিন খেয়ে আমার শরীরটা অনেকটাই ভালো।আমার কিছু হবে না।তুমি শুধু বলো কে কি পছন্দ করে সকালে খেতে আমি তাই বানাবো।”

সেলিমা খালা তাও রাজি হলেন না।প্রাহি অনেক জোড়াজুড়ি করায় অবশেষে তিনি হার মানলেন।কারন মেয়েটা আর একটু হলে কেঁদে দিতো।
প্রাহি খুশি মনে একে একে সবার জন্যে নাস্তা বানাতে লাগলো।প্রথমে রুটি আর পরোটা বানালো।তারপর আলু,গাজর,পেপে,বাধা কপি,ফুলকপি,সিম দিয়ে ভাজি বানালো। তারপর খিচুরি চুলোয় বসিয়ে আরেক চুলায় নানা পদের ভর্তা করার সব কিছু তৈরি করে নিলো।ভর্তার জন্যে সব কিছু রেডি হতেই।শীলনোড়ায় একে একে সব ভর্তা করে নিলো।সব শেষে ডিম ভেজে।চুলোয় চায়ের পানি বসিয়ে রাখলো যাতে সবাই আসতেই দ্রুত সবাইকে চা দিতে পারে।এরপর একে একে সব রকম খাবার টেবিলে পরিবেশন করতে লাগলো।সেলিমা খালা কিছুই করেননি।কারন প্রাহি কিছু করতেই দেননি তাকে। প্রাহি যখন ডায়নিং টেবিল সাজাচ্ছে তখন নেমে আসলেন হেনা আর রায়হানা বেগম।তারা এসেই প্রাহিকে বললো,

-” কিরে মা তুই এতো সকালে?”

প্রাহি হালকা হেসে বলে,

-” ও কিছু বা বড় মামুনি আর খালামুনি। আমার সকালে উঠার অভ্যাস।তাই ভাবলাম সেলিমা খালা একটু সাহায্য করি।”

হেনা তাও হালকা শাষনের সুরে বললেন,

-” তোর না শরীর ভালো না?তাহলে তুই এতো সকালে কেন উঠেছিস?”

প্রাহি মুখশ্রীটা ইনোসেন্ট বানিয়ে এককানে হাত দিয়ে মাথাটা হালকা কাত করে বাচ্চাদের মতো করে বললো,

-” সরি খালামুনি!”

হেনা আর রায়হানা বেগম একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে দিলেন।প্রাহিও হেসে দিলো।হাসতেই হাসতেই ওর নজর যায় সিড়ির দিকে। হেমন্ত,হিয়া,হিয়ান্ত সিকদার,হিয়াজ সিকদার আর অর্থ আসছে সিড়ি বেয়ে।অর্থকে দেখেই শুকনো ঢোক গিললো প্রাহি।কারন অর্থ প্রাহির দিকেই তাকিয়ে আছে তাও অদ্ভুত দৃষ্টিতে।অর্থ তাও প্রাহির দিকে তাকিয়ে আছে।নিচে নেমে আসতেই অর্থ গম্ভীর কন্ঠে বললো,

-” হিয়া যা দাদুকে নিয়ে আয়।”

হিয়া মাথা দুলিয়ে চলে গেলো নুরুল আমিন সিকদারকে আনতে।কিছুক্ষন পর ওরাও এসে পড়লো।তারপর সবাই একসাথে খাবার টেবিলে বসে পড়লো।যখন খাবারের ঢাকনাগুলো সরানো হলো সবাই খুশিতে গদগদ হয়ে গেলো। বিশেষ করে ভুনা খিচুরি এতো এতো পদের ভর্তা দেখে।হেমন্ত প্রায় চেচিয়েই বললো,

-” ওয়াও! ওয়াও! হুয়াট অা প্লেজেন্ট সার্প্রাইজ।এতো এতো ভর্তা তাও সাথে ভুনা খিচুরি।ইয়াম ইয়াম।আজ তো পেট পুরে খাবো আমি। সেলিমা খালা তোমাকে এত্তো এত্তোগুলো থ্যাংক ইউ।”

প্রাহি অনেক খুশি হলো হেমন্তকে এতোটা খুশি হতে দেখে।এদিকে সেলিমা খালা মুখটা কাচুমাচু করে বললো,

-” কিন্তু আইজকা তো আমি কিছুই রান্দি নাই।”

হিয়া ডিম ভাজি মুখে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

-” কে করেছে খালা?আম্মু নাকি ছোট মা।”

সেলিমা খালা প্রাহির দিকে তাকিয়ে বললেন,

-” প্রাহি রানছে আইজকা সব কিছু।”

সবাই খাওয়া থামিয়ে এইবার হা করে তাকালো প্রাহির দিকে।সবার এইভাবে তাকানো দেখে প্রাহির গলায় খাবার আটকে গেলো।বেচারির নাক মুখ লাল হয়ে গিয়েছে।আকস্মিক অর্থ দাঁড়িয়ে পড়লো তারপর একগ্লাস পানি নিয়ে প্রাহির অপারপাশ হতেই প্রাহির দিকে বাড়িয়ে দিলো। প্রাহি প্রথমে ভড়কে গিয়ে চোখ নামিয়ে কাশতে কাশতেই পানির গ্লাসটা একটানে শেষ করে ফেললো।

নুরুল আমিন জিজ্ঞেস করলেন,

-” দাদু তুই ঠিক আছিস?”

প্রাহি মাথা নাড়িয়ে বললো,

-” হ্যা দাদু।”

রায়হানা বেগম প্রাহির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন,

-” আমার ছেলেটার না ভুনা খিচুরি নানান পদের ভর্তা দিয়ে খেতে অনেক ভালোবাসে।কিন্তু কি করবো বল বয়স হয়েছে এখন আর এইসব বাটাবাটি করতে পারিনা।তাই এগুলা রান্না করেও আর খাওয়ানো হয় না।আর মেয়েটা তো একেবারে অলসের উপর ডিগ্রি নিয়ে বসেছে।সে একটা ডিমই ভাজতে পারেনা।”

হিয়া ঠোঁট উলটে বললো,

-“মা।”

রায়হানা বেগম হালকা ধমকে বললেন,

-” কি মা হ্যা?শিখ কিছু হিয়ার থেকে।তোর থেকে কতো ছোট হয়েও সব পারে।”

প্রাহি এইবার তাচ্ছিল্য হেসে বলে,

-” আমিও এসব পারতাম না বড় মামুনি।তোমার মতো যদি আমার মাও বেচে থাকতেন তাহলে আমারও কোনদিন রান্না শিখা হতো না।কিন্তু মামির অত্যাচারে সেই আট বছর বয়স হতেই আস্তে আস্তে সব রান্না শিখে নিয়েছি আমি।তবে এটার জন্যে মামিকে ধন্যবাদ জানাবো আমি।আজ তিনি আমাকে রান্না শিখিয়েছেন বলেই আমি তোমাদের সবাইকে রান্না করে খাওয়াতে পারছি।”

সবার মনটা খারাপ হয়ে গেলো।কারো সারাশব্দ না পেয়ে প্রাহি চোখ তুলে তাকিয়ে দেখলো সবার মন খারাপ হয়ে গেছে।তাই প্রাহি নিজেকে ঠিক করে নিয়ে বললো,

-” আরে আমি কষ্ট করে রান্না করেছি সবাই তাড়াতাড়ি খেয়ে বলো কেমন হয়েছে।”

প্রাহিকে হাসিখুশি দেখে সবার মুখেও হাসি ফুটে উঠলো তারপর সবাই নাস্তা করতে লাগলো।সবার মুখে হাসি লেগে থাকলেও।একজন পুরোটা সময় গম্ভীর হয়ে বসেছিলো।প্রাহির কষ্টে জড়ানো প্রতিটা কথাই যেন তীরের মতো আঘাত করেছে অর্থের বুকে।প্রাহির প্রতিটা কষ্টে কেন তার হৃদয় ব্যাথিত হয় এটাই বুজতে পারছে না অর্থ।কাল সারাটা রাত ছটফট করেছে সে।নিজেকে পাগল পাগল লাগছে অর্থের।

প্রাহির রান্না খেয়ে সবাই প্রসংশায় পঞ্চমুখ।কিন্তু যার জন্যে এই স্পেশাল খাবারটা তৈরি করলো প্রাহি।তার থেকেই কিছু শুনলো না ও।সেলিমা খালা থেকে শুনেছিলো অর্থের পছন্দের খাবারের কথা তারপরেই তো তার জন্যে এসব রান্না করলো।মুহূর্তেই মনটা খারাপ হয়ে গেলো প্রাহির।কিন্তু তাও সবার সামনে হাসি মুখে থাকলো।এইদিকে অর্থ প্রাহির দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষন তারপর সবাইকে বিদায় জানিয়ে সে অফিসের উদ্দেশ্যে চলে গেলো।একে একে হিয়ান্ত আর হিয়াজ ও চলে গেলেন।হিয়া চলে গেলো কলেজে।হেমন্ত যাবে পুলিশ স্টেশনে।বাকিরাও যার যার কাজে চলে গেলো।এদিকে প্রাহি অর্থের মুখ থেকে নিজের বানানো খাবারের প্রসংশা না শুনে মুখ কালো করে রাখলো। লোকটা তো একেবারে চেটেপুটে খেয়ে নিয়েছে সব।কিন্তু তাও কেন একটু সুনাম করলো না প্রাহি।ছোট্ট প্রাহি আর ছোট্ট মনে বিশাল আকারের একটা অভিমান জমালো অর্থকে নিয়ে।কিন্তু আদৌ তার অভিমান কি কখনো অর্থ বুজবে?কি জানি।

#চলবে,,,

ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।ভুল হলে ধরিয়ে দিবেন।