#ফিরেছি_তোর_আঙ্গিনায়
#মৌমো_তিতলী
পর্ব,,,,৭
এডভোকেট কামরুল আহসানের চেম্বার থেকে বের হয়ে মুখে মাস্ক পরে নিলো আয়াত। সে এসেছিলো আদিত্যর কথামত এডভোকেটের সাথে কথা বলতে। আদিত্যর বিষয়ে ব্যাসিক কিছু তথ্যর সাথে RK Industries এড্রেস দিয়ে আদিত্যর সাথে দেখা করতে বলে মাত্রই বের হলো সে।
এভাবে গার্ড ছাড়া পাবলিকলি খুব একটা বের হওয়া হয়না আয়াতের। তবে মাঝেমধ্যে সুযোগ বুঝে মুক্ত বাতাসে গা ভাসাতে বেশ লাগে।
এসেই যখন পড়েছে কিছু শপিং করার প্ল্যান করে আয়াত।
অল্প কিছু কেনাকাটা করে একটা বড় শো পিসের দোকানে ঢোকে। নিজের রুমের জন্য কিছু বিশেষ বিশেষ শো পিস কালেক্ট করা একরকম হবি আয়াতের।
শপের ভেতরে ঘুরে ঘুরে সবকিছু দেখতে দেখতে একটা ক্রিস্টালের কারুকার্য করা পাখির শো পিস পছন্দ হয় আয়াতের। শো পিস টা হাতে নিয়ে একজন ফিমেল স্টাফের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে,,,
–এক্সকিউজ মি!
নতুন আনপ্যাক্টড কিছু শো পিস কাটুন থেকে সাবধানে বের করছিলো নোরা। হঠাৎ পেছন থেকে কিছুটা চেনা চেনা গলায় ডাক শুনে চকিতে পেছনে ঘুরে তাকালো নোরা।
দেখতে পেলো একজন লম্বা, ফর্সা, মুখে মাস্ক পরিহিত যুবক দাঁড়িয়ে আছে। হাতে শো পিস দেখে বুঝলো হয়তো কিনতে চায়!
নোরা এই শপে পার্ট টাইম জব করে। সে হাতের কাজ সাইডে রেখে উঠে দাঁড়ালো। ঘুরে দাঁড়িয়ে কাস্টমারের সামনে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,,,
:-ইয়েস হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ?
আয়াত হাতের শো পিস টা নোরার সামনে রেখে বললো,,,
:-আমি এটা কিনতে চাই! প্রাইজ টা দয়া করে যদি বলতেন!
এদিকে নোরা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে আয়াতের দিকে। লোকটার মাথায় কালো ক্যাপ,মুখে মাস্ক থাকার কারনে চেহারা টা পুরো ঢেকে আছে। লম্বা চওড়া দেখতে যুবকটিকে কেনো যেনো ভীষণ চেনা চেনা লাগলো নোরার কাছে। তবে কিছু বললো না।
শুধু আয়াতের হাত থেকে শো পিস টা নিয়ে উল্টিয়ে লেবেল মার্ক দেখে বললো,,,
:–জ্বী এটা সাড়ে তিন হাজার টাকা।
“আচ্ছা” বলে প্যান্টের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করতে গিয়ে খেয়াল হলো পকেটে মানিব্যাগ উধাও!
ভালো ভাবে হাতড়েও মানিব্যাগের ম ও খুঁজে পেলো না আয়াত! হাইজ্যাক হয়েছে নিশ্চয়! এবার! মহা বিপদে পড়লো আয়াত। মানিব্যাগে তার প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট,আইডি কার্ড, ক্রেডিট কার্ড রয়েছে। আয়াতের মুখটা আমশি হয়ে গেলো মুহুর্তে।
বাংলাদেশের রাজধানীতে কোন কিছুর অভাব থাকুক আর না থাকুক,চোর বাটপারের কোন অভাব নেই!
বাইরে বের হওয়া মানেই ফোন, মানিব্যাগ সবকিছু অনিরাপদ।
আয়াতের থমকে যাওয়া দেখে ফের নোরার ভ্রু কুঞ্চিত হলো।
:-আর ইউ ওকে স্যার? এনিথিং রং?
ঢোক গিলে নিলো আয়াত! আমতা আমতা করে বললো,,,
:-আই থিঙ্ক! আই লস্ট মাই পার্স!
শপের আরেকজন মেইল স্টাফ সোহেল এতক্ষণ ধরে কালো পোষাকে আদ্যপান্ত ঢাকা এই ছেলেটাকে খেয়াল করছিলো! তারওপর নোরার সাথে কথা বলা দেখে কেমন বিরক্ত হচ্ছিলো! নোরা এই শপে জব নেয়ার পর থেকেই ছেলেটা নোরার পিছে আঠার মতো লেগে আছে! নোরা কে কয়েকবার প্রপোজও করেছে কিন্তু নোরা পাত্তা দেয়নি! মালিকের কাছে নালিশ করার ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রেখেছে সোহেল কে।
আজ অজ্ঞাত এই ছেলেটা নোরার সাথে এতক্ষণ কথা বলছে দেখে এমনিতেই ভেতরে ভেতরে জ্বলছিলো সোহেল! আরও আয়তের পার্স হারিয়ে যাওয়ার কথা শুনে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো নোরার পাশে। নাক সিঁটকে ভাব নিয়ে বললো,,
:-হোয়াট! কি বললেন আপনি? আপনার পার্স হারিয়ে গেছে নাকি মেয়েদের থেকে কিভাবে অ্যাটেনশন নিতে হয় সেটা দেখাচ্ছেন!
সোহেলের কথায় স্তব্ধ হয়ে গেলো আয়াত। কপাল কুঁচকে বললো,,
:–এক্সকিউজ মি! হুয়াই ডু ইউ মিন বাই অ্যাটেনশন নিতে! লিসেন সত্যি আমার পার্স টা পকেটে নেই। সেখানে আমার ইমপর্টেন্ট ডকুমেন্ট রয়েছে। আই থিঙ্ক চুরি হয়ে গেছে।
:-আরে থামুন তো মশাই! আপনার মতো অনেক দেখেছি। ছাপরি পোলাপান যত্তসব! পকেটে এক পয়সা থাকে না,এটা ওটা কেনার নাম করে এসে সুন্দরী মেয়ে দেখে বেচারা সেজে সিমপ্যাথি আর অ্যাটেনশন সিক করার ধান্দা সব।
আশ্চর্য! দেশের এক নম্বর নামকরা সিঙ্গার দ্যা গ্রেট আয়াত মাহমুদ শেষে কিনা এক ছোকরার থেকে ছাপরি উপাধি পেলো!! ইয়া আল্লাহ! আয়াতের কপালের রগ ফুলে উঠলো রাগে।
এমনিতেই পাবলিক প্লেস! তারওপর কোথায় কে ভিডিও নিয়ে নেয় তার গ্যারান্টি নেই! এই কারনেই পারছে না ছেলেটাকে কষে একটা থাবড়া মারতে। নিজেকে কন্ট্রোল করে কিছু বলতেই নিবে তার আগেই নোরার গলা শুনতে পেলো,,
:-তোমার সমস্যা কি সোহেল? কাস্টমারের সাথে এমন মিসবিহেব করার মানে কি? মালিক জানতে পারলে তোমার চাকরি যেতে পারে সেটা খেয়াল আছে তোমার?
সোহেল নোরা কে বোঝানোর চেষ্টা করে বললো,,,
:-আরে নোরা তুমি জানো না এসব ফাউল ছেলেপেলেদের। আর এটাকে তো দেখেই চোর,লাফাঙ্গা মনে হয়। কেমন কালো কাপড়ে মুখ ঢেকে রেখেছে দেখছো না?
নোরা এবার মহা বিরক্ত হয়ে ফোঁস করে নিঃশ্বাস নিয়ে বললো,,,
:-সে তো চেহারা দেখে তোমাকেও লুইচ্চা মনে হয়! তাতে আমরা কি কিছু বলেছি? না তো? তাহলে তুমি তাকে না জেনে না চিনে জাজ করতে আসছো কেনো?
হতেই পারে উনি সত্যি বলছেন। তোমার কি সমস্যা তাতে আমি তো বুঝতে পারছি না।
নোরা আয়াতের দিকে তাকিয়ে বলল,,,
:-আই’ম সরি স্যার! মিস বিহেবের জন্য আমি আমাদের স্টাফের পক্ষ থেকে মাফ চাইছি! কিছু মনে করবেন না। আপনি চাইলে আপনার পছন্দ করা শো পিস টা আমি আলাদা করে রাখছি! আপনি পরে পে করে সেটা রিসিভ করতে পারেন।
অন্য একটা ছেলের সামনে অপমান করাতে রাগে গজগজ করছিলো সোহেল। তারওপর নোরার ছেলেটার প্রতি বিনয়ি ভাব দেখে আরও রাগে পিত্তি জ্বলে উঠলো তার। তবে আবার কিছু বলতে গেলে দেখা যাবে নোরা আবার যা তা বলে অপমান করে দিবে। তাই চুপচাপ সেখান থেকে সরে গেলো।
এদিকে নোরার ব্যাবহারে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আয়াত। মেয়েটা নিস্বন্দেহে সুন্দরী। একটু চাবি! কিন্তু তাতেই যেন আরও গুলুমুলু দেখতে মেয়েটা। হুট করেই আয়াতের মনে হলো মেয়েটার এই ফোলা ফোলা মুখটা আগেও কোথায় যেন দেখেছিলো। চোখ বন্ধ করে মনে করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো আয়াত। তবে নোরার শো পিসের ব্যপারটা মনে হতেই বিনয়ের সাথে বললো,,,
:- মিস যদি সম্ভব হয় তো কাল এসে শো পিস টা আমি নিয়ে যাবো। প্লিজ কাল আমি আসা পর্যন্ত শো পিস টা সেল করবেন না দয়া করে।
নোরা স্মিত হেসে বললো,,,
:-শিওর স্যার!
নোরা আরও কিছু বলতে যাবে তার আগেই তার ফোন বেজে ওঠে। রিংটোনে বাজছে আয়াতেরই একটা গান। নিজের গলায় গান মেয়েটার ফোনে বাজতে শুনে কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকালো আয়াত! সাহসা মনে পড়লো কিছুদিন আগেই বনানীতে এক কনসার্টে মেয়েটাকে দেখেছিলো সে। হাজারো শ্রোতাদের মাঝে তার চোখ পড়েছিলো এই মেয়েটার দিকে। সেদিন মেয়েটার চোখে নিজের প্রতি এক অদ্ভুত মুগ্ধতা দেখেছিলো সে। সেটা মনে পড়তেই মাস্কের আড়ালে বাঁকা হাসলো আয়াত।
নোরা ফোনকল শেষ করে তাকাতেই আয়াত বলে উঠলো,,,
:-আয়াত মাহমুদের ফ্যান নাকি!
আয়াতের নাম শুনতেই ফট করে অজ্ঞাত যুবকটার মুখের দিকে তাকালো নোরা!
নোরা কে এভাবে তাকাতে দেখে মনে মনে প্রমাদ গুনলো আয়াত! নিজের বোকামিতে নিজের মাথায় বাড়ি দিতে ইচ্ছে হলো! কিন্তু নোরা তার সকল আশঙ্কা ফুউউ দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে বললো,,,
:-আরে এটা একটা প্রশ্ন করলেন আপনি? আয়াত মাহমুদের গান পছন্দ করে না এমন কেউ আছে নাকি বাংলাদেশে? আমি তো ব্যক্তিগত ভাবেও তাকে ভীষণ পছন্দ করি! আই লাভভ হিম!
নোরার মুখে এমন সরাসরি ভালোবাসার কথা শুনে খুকখুক করে কেশে উঠলো আয়াত!
নোরার দিকে তাকাতেই দেখতে পেলো সে কেমন সন্দেহের দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তা দেখেই আয়াত কাল আবার আসবে বলে সটকে পড়লো।
এই মেয়ের সামনে আর বেশিক্ষণ থাকলে তাকে ঠিক চিনে ফেলবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
শপের বাইরে এসে লম্বা লম্বা শ্বাস ফেললো আয়াত। নোরার তখনকার বলা “আই লাভ হিম” কথাটা মনে পড়তেই নিঃশব্দে হাসলো আয়াত!
আপাতত তাকে আগে থানায় যেতে হবে। জিডি করার প্রয়োজন। ডকুমেন্ট গুলো ইমপর্টেন্ট। তাড়াতাড়ি করে একটা উবার কল করে আয়াত। মিনিট পাঁচেক পর উবার আসতেই তাতে উঠে বসে।
____________
আদিত্যর কেবিনে মুখোমুখি বসে আছে আদিত্য আর এডভোকেট কামরুল আহসান।
রুমালে নিজের চশমাটার কাঁচ মুছে সেটা নাকের ওপরে ঠেলে দিতে দিতে কামরুল আহসান বললেন,,,
:-তাহলে আপনি আইনগত ভাবে আপনার স্ত্রী কে ডিভোর্স দিতে চান তাইতো?
আদিত্য গম্ভীর স্বরে বলল,,,
:–জ্বী। আপনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পেপার রেডি করুন। তিন থেকে চার দিনের মধ্যেই আমি সবটা শেষ করতে চাইছি! আই হোপ ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড!
:–জ্বী মিস্টার চৌধুরী! আমি বুঝতে পারছি! কিন্তু ডিভোর্সের তো একটা ফর্মালিটিজ আছে! এভাবে হুট করে এতো তাড়াতাড়ি কিভাবে সম্ভব! আগে কেইস ফাইল করতে হবে। সেটা কোর্টে সাবমিট করতে হবে। কেইসটা কোটে উঠবে। দু পক্ষের উপস্থিতিতে আদালত সবকিছু সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে সেটা গ্রান্টেড করবে।
ভারি বিরক্ত হলো আদিত্য! ধম করে ল্যাপটপের ঝাপটা বন্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,,,
:-লিসেন মিস্টার আহসান! এই বিয়েটা আমি জাস্ট কোনদিন মেনে নেইনি। আমার কার সাথে বিয়ে হয়েছিলো, সে দেখতে কেমন,তার নামটা টা পর্যন্ত জানি না আমি। বুঝতে পারছেন আপনি?
আমি চাই জাস্ট তাকে ডিভোর্স দিয়ে এই মিথ্যা সম্পর্ক থাকে বেরিয়ে আসতে।
এর জন্য এতো ফর্মালিটিজ আমার দেখার প্রয়োজন নেই। আপনি শুধু ডিভোর্স পেপার রেডি করুন। আমি সিগনেচার করে তার কাছে পাঠিয়ে দিবো। বাকি কি কি ফর্মালিটিজ আছে,কোথায় কার গ্রান্টেড সিগনেচার লাগবে এসব আপনি দেখে নিবেন। আই জাস্ট ওয়ান্ট ডিভোর্স পেপার ইন ফোর ডেইস! আন্ডারস্ট্যান্ড!
আদিত্যর ক্রোধ দেখে মনে মনে ঘাবড়ে গেলেন প্রবীণ আইনজীবী। চার দিনের মধ্যেই পেপার আদিত্যর হাতে পৌঁছে যাবে বলে কোনমতে কেটে পড়লেন তিনি।
এডভোকেট কামরুল আহসান কেবিন থেকে বেরিয়ে যেতেই মৌমিতাও তড়িঘড়ি দরজার পাশ থেকে সরে গেলো। দৌড়ে চলে এলো ওয়াশ রুমে। ওয়াশ রুমের দরজাটা লক করেই হুহু করে কেঁদে ফেললো মৌমিতা।
এতক্ষণ আদিত্যর কেবিনে হওয়া প্রত্যেকটা শব্দ সে শুনেছে। বুকের ভেতরটা অদ্ভুত কষ্টে জ্বালাপোড়া করে মৌমিতার।
এতো তাড়া আদিত্যর তার থেকে মুক্তি পেতে! এতোটাই অপছন্দ তাদের এই সম্পর্ক টা আদিত্যর কাছে। এতোটাই মূল্যহীন যে পাঁচটা বছর একটা মেয়ে তার স্ত্রীর অধিকারে থাকলো,একটা বার তার মুখোমুখি হতেও চাইলো না সে। একবারও জানার প্রয়োজন মনে করলো না অপর পাশের মেয়েটা কি চায়!
পাঁচটা বছরের অপেক্ষার এই মূল্য দিলো আদিত্য! সে তো ভালোবেসেছিলো মানুষ টা কে। তাকে নিয়ে হাজারো স্বপ্ন বুনেছিলো। হয়তো এই স্বপ্ন দেখার যোগ্যই নয় মৌমিতা। কেউ যে বাবা মা হারা এতিম মেয়েটার স্বপ্নের মূল্যায়ন করবে এমন ভাগ্য নিয়ে হয়তো জন্মায়নি মেয়েটা। নয়তো কি জন্মের পর বাবা মা তাকে ছেড়ে চলে যেতো! যার দুনিয়ায় বাবা মা কেউ নেই তার অন্যর থেকে কিছু পাওয়ার আশা করায় বোকামি!
হু হু করে বাড়ছে মৌমিতার কান্নার তোড়! নাকমুখ লাল হয়ে গেছে মেয়েটার। চোখদুটো রক্তিম হয়ে ফুলে উঠেছে। নাকের ডগা দেখে মনে হচ্ছে পাকা টমেটো বসিয়ে রেখেছে কেউ!
বেশ কিছুক্ষণ কান্না করার ফলে মাথা টাও ভার ভার লাগছে এখন। দু হাতে মুখে পানির ঝাপটা দিলো মৌমিতা।
ওড়নার কিনারায় মুখটা মুছে বেরিয়ে এলো ওয়াশ রুম থেকে।
ওয়ার্ক প্লেসে ঢোকার সময় মুখোমুখি হলো আবিরের সাথে। আবিরের দিকে চোখ পড়তেই সৌজন্য মুলক হাসলো মৌমিতা।
মৌমিতার চোখ দুটো লাল দেখে কপাল কুঁচকে তাকালো আবির। মৌমিতা পাশ কাটিয়ে যেতেই পেছন থেকে ডাকলো তাকে,,
:-আর ইউ ওকে মিস মিতা?
আবিরের মুখে “মিতা” ডাক শুনে ভ্রু কুঁচকে তাকালো মৌমিতা। তবে কিছু বললো না। শুধু “আই’ম ফাইন” বলে নিজের কাজে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো মৌমিতা।
সেদিকে তাকিয়ে আলতো হাসলো আবির। মেয়েটাকে তার বেশ লাগে! সেই ইন্টারভিউয়ের দিন থেকে তাকে দেখছে। প্রয়োজনের বাইরে একটা কথাও বলে না মেয়েটা। নরম, চুপচাপ স্বভাবের মেয়েটা সব কাজ মন দিয়ে করে। মেয়েটার হাসি,কথা বলার ভঙ্গি,পলক ফেলার ধরন, চেহারা সবটাই মাত্রাতিরিক্ত স্নিগ্ধ। প্রথম দেখাতেই মেয়েটাকে ভালো লেগেছে আবিরের। কিন্তু মৌমিতার কম কথা বলার স্বভাবের কারণে তার সাথে ঠিক ভাবে জমিয়ে উঠতে পারছে না আবির। তবে সুযোগে অপেক্ষায় আছে। সঠিক সময়ে ঠিক মেয়েটাকে জানিয়ে দিবে তার মনের কথা!
_____________
প্রায় বিশ মিনিট পর আদিত্যর কেবিনে ডাক পড়লো মৌমিতার। বুকের মাঝে ধকধক করছে মেয়েটার। কিভাবে ওই মানুষটার মুখোমুখি দাঁড়াবে সে। আদিত্য না জানুক,সে তো জানে মানুষ টা তার স্বামী। যে কিনা তাকে ডিভোর্স দিতে উঠেপড়ে লেগেছে। নিজের ভেতরে আত্মবিশ্বাসের অভাব টের পেলো মেয়েটা। পারছে না সে নিজেকে শক্ত রাখতে। আদিত্যর সামলে যাওয়ার
বিন্দুমাত্র ইচ্ছে করছে না তার। কিন্তু কি করবে! এখানে যে তার হাত পা বাঁধা।
লম্বা শ্বাস টেনে নিয়ে আদিত্যর কেবিনে প্রবেশ করলো মৌমিতা। ওড়নাটা একটু বড় করে টেনে দিলো মাথায়।
এদিকে মৌমিতার কপাল পর্যন্ত ঘোমটা টানা দেখে চোখমুখ কুঁচকে তাকালো আদিত্য।
মেয়েটাকে মন ভরে দেখার জন্য তাকে কেবিনে ডাকলো! আর এই মেয়েটা মুখের ওপর আধ হাত ঘোমটা টেনে রেখেছে। ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ছাড়লো আদিত্য।
:-আপনার কি বিয়ে হয়েছে মিস মৌমিতা?
আদিত্যর মুখে বিয়ের কথা শুনে চমকে উঠলো মৌমিতা। একথা কেনো জিজ্ঞেস করলো!
মৌমিতার চমকানো ভাব দেখে হাসলো আদিত্য!
বললো,,,
:-নাহ মানে শুনেছি মেয়েদের বিয়ে হলে নাকি তারা এভাবে ঘোমটা দেয়! আপনিও ঘোমটা দিয়ে এসেছেন তাই মনে হলো আপনি হয়তো নতুন বউ!
আদিত্যর অহেতুক কথায় বিরক্ত হলো মৌমিতা। মনে মনে একশ একটা গালি দিয়ে বললো,,,
:-আপনি সবসময় বাড়তি কথা বলেন কেনো? কি কাজে ডেকেছিলেন তাই বলেন!
:-বাবাহ! বসের মুখে মুখে কথা! আপনার তো দেখছি দিনে দিনে উন্নতি হচ্ছে মিস!
কিন্তু আপনার এই ঘোমটায় আমাকে ডিস্টার্ব করছে। কাইন্ডলি যদি ঘোমটা টা সরিয়ে নেন তাহলে আমি কৃতজ্ঞ হই!
আদিত্যর এমন আপনি বলে ব্যাঙ্গ করাতে হাল ছেড়ে দিলো মৌমিতা। তবে ঘোমটা না সরিয়ে বললো,,,
:-আমার কাজের সাথে ঘোমটার কি সম্পর্ক স্যার! আপনি বলুন আমাকে কি করতে হবে? আমি এক্ষুনি তা করে দিচ্ছি।
:-মিস মৌমিতা! আপনি আমার কে হন?
আদিত্যর মুখে এই প্রশ্ন টা শুনে বুকের মাঝে হু হু করে উঠলো মৌমিতার। হাহঃ সে লোকটার কে হয়! যদি সত্যিই বলতে পারতো! চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এলো মৌমিতার চোখদুটো বেয়ে। ঢোক গিলে নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,,,
:-আমি…আমি আপনার অ্যাসিস্ট্যান্ট!
:–রাইট! অ্যাসিস্ট্যান্ট! আর অ্যাসিস্ট্যান্টের কাজ কি? আমাকে কাজে অ্যাসিস্ট করা। যাতে আমি কাজটা আরও স্মুথলি করতে পারি। রাইট?
:–জ্বী!
:-ব্যাস তাহলে ঘোমটা সরান! বিকজ আমি কারো মুখ না দেখে কথা বলতে পারি না। ইরিটেট লাগে। তাই আমি আপনার মুখ দেখেই কাজের কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবো! সো ওপেন ইউর ফেইস!
আদিত্যর লজিক শুনে আর কিছু বলতে পারলো না মৌমিতা। আলতো করে নাক পর্যন্ত টানা ওড়না টা টেনে মাথায় দিলো। সরে গেলো ঘোমটা তার মুখ থেকে।
আদিত্য মৌমিতার চোখের দিকে তাকিয়েই চমকে উঠলো। মেয়েটার চোখদুটো এমন লাগছে কেনো! রক্তিম কৃষ্ণচূড়া হয়ে আছে মৌমিতার হরিণ টানা চোখজোড়া। যেনো এখনো পর্যন্ত পাপড়িগুলো ভেজা। নাক লাল হয়ে আছে।
আদিত্য বিচলিত হয়ে মৌমিতার দিকে এগিয়ে এলো। অনেকটা কাছে এসে দাড়িয়ে বললো,,,
:-হোয়াট হ্যাপেন মৌমিতা? কাঁদছো কেনো? কোন প্রব্লেম? হেই! টেল মি মৌমিতা! কেউ কিছু বলেছে তোমাকে?
আদিত্যর মুখে শুধু মৌমিতা আর তুমি সম্বোধন শুনে আরও হৃদয় ভেঙ্গে এলো মৌমিতার। নিজ স্ত্রী রুপি মৌমিতা কে ছুড়ে ফেলার প্ল্যান কনফরম করে,এদিকে অফিসের ফিমেল অ্যাসিস্ট্যান্ট মৌমিতার প্রতি দরদ উথলে উঠছে ওনার। নোরা ঠিকই বলেছিলো,এই ব্যাডার চরিত্রে সমস্যা আছে। ঘরে…ওহ সরি ঘরে না! হোস্টেলে বউ রেখে অফিসের অ্যাসিস্ট্যান্টের প্রতি কু নজর দিচ্ছে। শয়তান, লম্পট লোক একটা।
মৌমিতা কে এমন ছলছল চোখে তার দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো আদিত্য! সে আবার কি করলো! যে, মৌমিতা তার দিকে এভাবে রাগী চোখে তাকিয়ে আছে! সে তো শুধু সমস্যা কি সেটাই জানতে চেয়েছে।
আদিত্য আরও কিছু বলতে যাবে তার আগেই মৌমিতা কান্নাজড়িত কণ্ঠে কোনরকমে বললো,,,
:-সরি স্যার আজকের মতো আমার ছুটি প্রয়োজন। যা কাজ আছে আমি কাল এসে করে দিবো। প্লিজ স্যার আমি ওয়ান্ট টু লিভ নাও! বলেই তড়িঘড়ি আদিত্যর কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলো মৌমিতা।
পেছন থেকে কয়েকবার ডাকলেও দাঁড়ালো না মৌমিতা। সেদিকে তাকিয়ে দন্ত দ্বারা ঠোঁট চেপে ধরলো আদিত্য! কি হলো মেয়েটার হঠাৎ করে! কাঁদছিলো কেনো মৌমিতা? মেয়েটার অশ্রুসিক্ত মুখটা মনে পড়তেই অদ্ভুত ভাবে বুকের বাঁ পাশে চিনচিনে ব্যথা অনুভব করলো আদিত্য! থম মেরে বসে রইলো নিজের চেয়ারে!
#চলবে
#ফিরেছি_তোর_আঙ্গিনায়
#মৌমো_তিতলী
পর্ব,,,,৮
*আর কে বিউটি এন্ড ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি*
আদিত্যর অফিসের সামনে এসে গাড়ি থেকে নামলো আয়াত। পাঁচ বছর পর ভাই প্লাস বেস্ট ফ্রেন্ডের সাথে দেখা হবে ভেবে বেশ উৎফুল্ল হলো আয়াত। এই কয়দিন হাজারও ব্যস্ততায় দুজনের দেখা করা সম্ভব হয়নি।
গাড়ি থেকে নেমে অফিস এরিয়ায় ঢুকতেই আয়াতের চোখ পড়লো অশ্রুসিক্ত চোখ মুছতে মুছতে অফিস থেকে ছুটে বেরিয়ে আসা মৌমিতার দিকে।
মৌমিতা কে আদিত্যর অফিস থেকে বেরোতে দেখে কপাল কুঁচকে এলো আয়াতের।
কাল যে আদি বললো সে চায় না মেয়েটার সাথে দেখা করতে,কথা বলতে। তাহলে আজ অফিসে কেনো ডেকেছিলো মেয়েটাকে! নিশ্চয় ডিভোর্সের কথা জানাতে! এই জন্যই তো মৌমিতা কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গেলো।
ঘটনা জানতে আয়াতও মৌমিতার পিছু নিলো। কিন্তু দু একবার “ভাবি” বলে আওয়াজ দিলেও গাড়ির শব্দে সেটা শুনতে পেলো না মৌমিতা। আয়াত তার কাছাকাছি পৌঁছানোর আগেই একটা রিকশায় উঠে বসলো মৌমিতা।
আয়াত দাঁড়িয়ে গেলো সাথে সাথে। বিষয়টা আদিত্যর থেকেই জেনে নিবে। মৌমিতা চলে যেতেই সেখান থেকেই ফিরে এলো অফিসের দিকে।
পাঁচ মিনিট পর আদিত্যর কেবিনের দরজায় নক করলো আয়াত। ভেতর থেকে আওয়াজ পেতেই ভেতরে ঢুকলো সে।
আয়াত কে দেখে উচ্ছাসিত হয়ে এগিয়ে এলো আদিত্য। আয়াত কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো,,,
:-কেমন আছিস মেরে ভাইই!
:-হুম আই’ম ফাইন ব্রো!
:হোয়াট হ্যাপেন? মুখটা এমন লটকে রেখেছিস কেন?
ওহ বাই দা ওয়ে! থ্যাংকস টু কল এডভোকেট কামরুল আহসান। লোকটা কাজের মনে হলো! খুব শিঘ্রই আমার কাজটা হয়ে যাবে মনে হচ্ছে!
আয়াত অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আদিত্যের দিকে। যেন সে বিশ্বাস করতে পারছে না। এই কি তার ভাই? তার বন্ধু আদি? তার ভাই তো এমন ছিলো না। এতোটা নির্দয়, এতোটা কঠিন হৃদয় তো ছিলো না আদির! তাহলে ওই টুকু একটা মেয়ের প্রতিই কেনো এমন অবিচার করছে আদি! এতো কিছুর পর তাও আবার এতোটা হাসিখুশি আছে যেন কিছুই হয়নি! হাউ!
আয়াত কে থমথমে মুখে তাকিয়ে থাকতে দেখে অবাক হলো আদিত্য। হেসে এগিয়ে গিয়ে আয়াতের হাত ধরতে গেলে সরে দাঁড়ালো আয়াত!
আদিত্যর অবাক দৃষ্টি কে অগ্রাহ্য করে বললো,,
:-তার আগে তুই বল আদি! কাল বললি তুই নাকি ভাবির সাথে দেখা করতে ইচ্ছুক নস। তাহলে আজকে আবার ভাবিকে অফিসে কেনো ডেকেছিলি?
আয়াতের কথায় কিছু বুঝতে না পেরে আহাম্মকের মতো তাকিয়ে রইলো আদিত্য। মাথা ঝাঁকিয়ে বললো,,
:-হোয়াট! হোয়াট ডিড ইউ সে?আমি? আমি ডেকেছি ওই মেয়েটাকে? তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে আয়াত? কি বলছিস তুই!
:-একদম নাটক করবি না আদি। আমি ভাবতে পারছি না তুই! তুই এমন কিভাবে করতে পারিস? আচ্ছা মানলাম তুই ভাবিকে ডিভোর্স দিতে চাস! এটাই তোর শেষ সিদ্ধান্ত! ভাবি তো তোর শর্ত মেনে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে। তুই ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে দিতিস!
শুধু শুধু মেয়েটাকে ডেকে মুখের সামনে ডিভোর্সের কথা আয়োজন করে বলার কোন দরকার ছিলো তোর? মেয়েটাকে দেখেও তোর মায়া হলো না?
:-আয়াত! আয়াত রিল্যাক্স! কি বলছিস তুই আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না বিশ্বাস কর! আমি..আমি ডাকিনি মেয়েটাকে! আরে আমি তো তার সাথে কোনরকম যোগাযোগই করিনি। এতো দিন যখন করিনি তখন এই শেষ মুহূর্তে এসে আমি কেনো ওই মেয়েকে আমার অফিসে ডেকে পাঠাবো তুই বল?
আদিত্যর কথায় মাথা তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে আয়াতের। সে তো স্পষ্টই দেখলো মৌমিতা কে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে যেতে। নাকি এটা তার মনের ভুল!
কিন্তু এতোটা ভুল তো সে দেখবে না। নাহ! আয়াতের দৃঢ় বিশ্বাস মেয়েটা মৌমিতাই ছিলো!
আদিত্য আয়াতের চিন্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,,
:-আবার কি ভাবছিস! তোর বিশ্বাস হচ্ছে না আমি ডাকিনি মেয়েটাকে!
আয়াত আদিত্যর কথায় আনমনে বললো,,,
:-কিন্তু আমি যে দেখলাম ভাবিকে কাঁদতে কাঁদতে অফিস থেকে দৌড়ে বেরিয়ে যেতে!
আয়াতের কথায় ভ্রু কুঁচকে তাকালো আদিত্য। কি বললো আয়াত!
:- ওয়াট ডু ইউ মিন বাই ভাবি কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গেলো! কার কথা বলছিস তুই? কাকে দেখেছিস?
:-আরে আমি অফিসের সামনে এসে নামতেই তো দেখলাম মৌমিতা ভাবি কে তোর অফিস থেকেই কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে যেতে। পেছন থেকে কয়েকবার ডাকলাম কিন্তু ভাবি মনে হয় খেয়াল করেনি।
আয়াতের কথায় বড়সড় একটা বজ্রপাত ঘটে গেলো যেন আদিত্যর কেবিনে। মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো তার। পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেলো আদিত্যর!
কি বললো আয়াত? কি বললো!
:-তুই কি বললি? কি নাম বললি আয়াত? আবার বল?
:-মৌমিতা.. মৌমিতা ভাবি! তোর পাঁচ বছর আগে বিয়ে করা বউ! আমার বোনের মতো ভাবি!
ঢোক গিলতে লাগলো আদিত্য। মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে তার। হাত-পা অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপতে লাগলো! এটা কি করে সম্ভব! মৌমিতা! মৌমিতা তার ওয়াইফ! মৌমিতাই সেই মেয়ে? না না এটা কিভাবে সম্ভব! এটা হতে পারে না! কিছুতেই না।
শরীরের সমস্ত শক্তি যেন ফুরিয়ে এলো আদিত্যর। পা ভেঙ্গে পড়ে যেতে নিলে আয়াত জাপটে ধরলো আদিত্য কে।
:-আদি! এই আদি তোর আবার কি হলো! এমন করছিস কেন?
আদিত্য ঘোরের মধ্যে চলে গেলো যেন। আয়াতের মুখটা দু হাতে চেপে ধরে বললো,,,
:- আয়াত! এই, এই তুই সত্যিই বলছিস! তোর কোথাও ভুল হচ্ছে না তো? মৌমিতা কে তুই চিনিস?
আদিত্যর অবান্তর প্রশ্নে রাগ হলো আয়াতের। তবুও ঝামটা মেরে বললো,,
:-আজব কথা বলিস না তো আদি! আমি মৌমিতা কে চিনবো না কেন? তুই তো বিয়ে করে ধাঁঃ হয়ে গেলি। এই পাঁচ বছরে কতবার আমি তোদের বাড়িতে গেছি। ভাবির সাথে কথা হয়েছে। তাকে আমি চিনবো না?
আয়াতের কথায় এবার টনক নড়লো আদিত্যর। প্রথম দিন মৌমিতার সাথে প্রথম সাক্ষাতের সময় মৌমিতার সেই অবাক করা স্তব্ধ চাহনি! আদিত্যর সব আদেশ যত্নের সাথে পালন করা, আর আজকে! মৌমিতা নিশ্চয় এডভোকেটের সাথে তার ডিভোর্স সম্পর্কে বলা সব কথা শুনেছে! সেই কারনেই মৌমিতা কাঁদছিলো। মৌমিতা শুরু থেকেই জানতো আদিত্য তার স্বামী।
তাহলে কেনো মৌমিতা বললো না কিছু! কেনো সামনে এসে বললো না আমি আপনার বিয়ে করা বউ!
হাহঃ সেও বা কি ভাবছে। মৌমিতা কেনো বলবে! সে যে আঘাত তাকে দিয়েছে, মৌমিতা তো তার মুখটাও দেখার কথা না। এটা কি করে ফেললো আদিত্য! নিজেই নিজের এতো বড় ক্ষতি কি করে করে ফেললো!
এবার কিভাবে ফেরাবে সে মৌমিতা কে!
নিজেকে পাগল পাগল লাগছে আদিত্যর। গলা শুকিয়ে চৌচির হয়ে গেছে। বুকটা অস্বাভাবিক ভাবে ধকধক করছে। ইচ্ছে করছে এক্ষুনি ছুটে গিয়ে মৌমিতা কে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে বলতে,,,
“আমি ডিভোর্স চাই না! আমি তোমাকে হারাতে চাই না মৌমিতা” আমি আমার জীবনে তোমাকে আমার পাশে চাই! মৃত্যুর আগে পর্যন্ত আমি তোমাকে চাই মৌমিতা!
আদিত্যর দুচোখ বেয়ে অবাধে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়তে লাগলো। আদিত্যর হঠাত পরিবর্তনে হাঁ করে তাকিয়ে আছে আয়াত! হঠাত কি হলো বুঝতে পারছে না।
আয়াত আদিত্যর পায়ের কাছে হাঁটু মুড়ে বসে বললো,,,
:- হুয়াট হ্যাপেন ব্রো?
আজ শক্ত সামর্থ্য পুরুষ মানুষ হয়েও আদিত্য নিজেকে সামলাতে পারছে না। যাকে প্রথম দেখেই ভালোবেসে ফেললো,যার জন্য মনের মাঝে অফুরন্ত অনুভূতি তৈরি হলো, যাকে নিজের করে পাওয়ার লোভে নিষ্ঠুর, নির্দয় হতেও পিছু পা হলো না! সেই মেয়েটাই কিনা শুরু থেকেই তার ছিলো,তার বিয়ে করা বৈধ সহধর্মিণী ছিলো।
আর আদিত্য কিনা দিনের পর দিন তাকে ইগনোর করে গেছে। বছরের পর বছর তাকে ত্যাগ করে থেকেছে। পরিবার ছেড়ে বিদেশে গিয়ে পড়ে থেকেছে। কতটা কষ্ট পেয়েছিলো তার বাবা-মা! কতটা কষ্ট পেয়েছিলো মৌমিতা!
আয়াত কে উত্তর দেয়ার মতো শব্দ খুঁজে পেলো না আদিত্য।
কোনমতে চোখ মুছে বললো,,,
:-আয়াত! মৌমিতা আমার পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট। বিশ্বাস কর আমি জানতাম না যে মৌমিতাই আমার ওয়াইফ। মৌমিতা কখনো বলেনি। আর আমি তো তাকে কখনো দেখিনি যে চিনবো। আমি অফিসে জয়েন করার পর প্রথমবার যখন আমি মৌমিতা কে দেখি! প্রথম দেখায় ওকে আমার ভীষণ ভালো লাগে। তারপর
মৌমিতা অফিসে জয়েন করার পর আমার সাথেই থেকেছে সব সময়। আমার ভালো লাগার মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। আর আমি এখন কনফরম যে আমি মৌমিতা কে ভালোবাসি। মৌমিতা কে নিজের করে পাওয়ার জন্যই আমি ডিভোর্সের ব্যপারটা জলদি শেষ করতে চেয়েছি। বিশ্বাস কর আমার মাথা কাজ করছে না। কি করবো আমি! এটা আমি কি করলাম আয়াত! আমি কেনো আগেই মায়ের কথা মেনে নিলাম না! তাহলে মৌমিতার থেকে এতো বছর আমার দুরে থাকতে হতো না।
:-আয়াত! আয়াত ইউ টোল্ড মি না! কি করবো এখন আমি? আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু ডিভোর্স হার! আই কান্ট লিভ উইদাউট মৌমিতা! আই ওয়ান্ট হার! প্লিজ!
আয়াতের এবার মাথা টা পন টন করে ঘুরছে আদিত্যর কথ শুনে! এতো বেপার টা মোয়ে মোয়ে হয়ে গেলো!
তবে এটা শুনে শান্তি পেলো শেষ পর্যন্ত তার ভাইয়ের ডিভোর্স টা হচ্ছে না। খালামণি জানতে পারলে কি ভীষণ খুশি হবে! ভাবতেই খুশিতে দু লাইন গান ধরতে ইচ্ছে করছে আয়াতের!
আয়াত বাঁকা হেসে আদিত্যর দিকে তাকিয়ে বললো,,,
:-ফিকার নট মেরে ভাই! আমি আছি না! তোর কোন চিন্তা নেই!
এক কাজ কর! প্রথমে তুই এডভোকেট কে একটা ফোন কর! ডিভোর্স পেপার রেডি করতে না করে দে। আর ভাবি কে যেহেতু ডিভোর্স পেপার পাঠানো হবে না। তো তুই সেভাবে ভাবির মন জয় করার চেষ্টা কর! বাকিটা এমনি এমনি হয়ে যাবে!
আদিত্যও ভাবলো আয়াতের কথা ঠিক! মৌমিতা যদি এডভোকেটের কথা শুনেও থাকে! তবুও ডিভোর্স তো আর হয়ে যায়নি। মানে এখনো সবটা হাতের বাইরে চলে যায়নি। কাল মৌমিতা আসুক একবার অফিসে।
কাল থেকেই শুরু করবে মৌমিতার মন কিভাবে ভোলাতে হয়!
এতো দিন মৌমিতা তার জন্য অপেক্ষা করেছে, কয়েকদিন না হয় সেই অপেক্ষা করে নিবে। তবুও তার জীবনে ফিরে আসতেই হবে বিবিজান! এতোক্ষণে মনটা হালকা হলো আদিত্যর।
খুশি মনে দু ভাই বের হলো অফিস থেকে। আয়াত কে সাথে নিয়েই আশাকুঞ্জের উদ্দেশ্য রওনা দিলো আদিত্য!
#চলবে

