Home "ধারাবাহিক গল্প বকুলের মালা শুকাবে বকুলের মালা শুকাবে পর্ব-০৭

বকুলের মালা শুকাবে পর্ব-০৭

0
498

#বকুলের_মালা_শুকাবে—৭
#শার্লিন_হাসান

“আমি তো বয়স দেখে বিয়ে করিনি, অন্যকিছু দেখে বিয়ে করেছি।”

“অস ভ্য। আমার মুক্তি চাই এসব থেকে। এরকম অস ভ্যের সাথে থাকা যায়না।”

“বিয়ে কোন ছেলে খেলা না। তোমার মাথায় সুবুদ্ধি কবে হবে?”

“অ্যাম ইন লাভ উইদ সামওয়ান।”

রাগিনীর এরকম কথার শেষে অভিদের তরফ থেকে কিছু বলার মতো অবশিষ্ট ছিলোনা বোধহয়। ও শুধু নির্বিকার হয়ে তাকিয়ে রয় রাগিনীর দিকে। রাগিনীর কাছে সে তাকানো গা জ্বলে যাওয়ার মতো অনুভব হলো। একে তো বুড়ো লোক তারউপর প্রেমিক পুরুষ হওয়ার শখ জেগেছে বিধায় তার মতো ষোলো বছরের মেয়েকে বিয়ে করেছে। তারউপর মুখে নেই লাঘাম। প্রচুর অস ভ্য। এরকম লোকের সাথে থাকা যায় নাকি!

অভিদ সিদ্দিকী চুপ থেকে জবাব দেয়, “ও আচ্ছা, তাহলে সেই সামওয়ানের জন্যই বিয়ের দিন পালিয়ে গিয়েছ। তো তোমার সামওয়ান স্টেশনে এসে, কল ব্যাক করেছিল তো?”

গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার মতো খোঁচা মারল অভিদ সিদ্দিকী। রাগিনী রক্তচক্ষু করে বলে, “আমার ফোন আমার কাছে নেই। নাহলে দেখিয়ে দিতাম ওর কত হাজার মিসড কল এসেছে।”

“আচ্ছা, তাই নাকি!”

“হ্যাঁ, আমি বেশ পোড়া পোড়া গন্ধ পাচ্ছি।
আপনি পেয়েছেন?”

“না।”
গম্ভীর মুখে জবাব দেয় অভিদ সিদ্দিকী। রাগিনী বেশ মজা পায়। বিয়ের তিনদিনের মাথায়, নিজের বউয়ের মুখে তার প্রেমিকের প্রতি ভালোবাসার।কথা শুনলে, কার না খারাপ লাগবে। গায়ে আগুন ধরবে! অভিদ সিদ্দিকীর ক্ষেত্রেও একই। মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে সবটাই। সেজন্য রাগিনী আরেকটু খোঁচা মেরে বলে,

“বুঝিতো! শেষ বয়সে প্রেমিক পুরুষ হওয়ার শখ জেগেছে সেজন্য, অল্পবয়সী ছেলে-মেয়ের প্রেমের কথা শুনে ভেতরে জ্বলছে বেশ। গায়ে আগুন ধরে যাওয়ার মতো ব্যপার।”

মূহুর্তে ঝড়ের বেগে ছুটে এসে রাগিনীর গলা চেপে ধরে অভিদ। অনেকটা জোরেই চেপে ধরে। রাগিনীর চোখ বেয়ে টলটল করে পানি পড়ছে। বাক হারার মতো নির্বিকার দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয় পুরুষালি আঘাতে। গায়ের সাথে গা ঘেঁষে গলাটা চেপে ধরেছে অভিদ। দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “পছন্দ করে বিয়ে করেছি আমি, এতো সহজে ছেড়ে দেবো তোমায়?”

কথাটা বলে গলা ছেড়ে দেয় অভিদ।
রাগিনী কাশতে থাকে। মূহুর্তে অভিদের গলা চেপে ধরে তীব্র ঝাঁঝালো কন্ঠে বলে, “The only villain between us is you. I’ll kill you”

“Then know this too – villain characters are my favorite.”

অভিদ সিদ্দিকীর গা জ্বালানো কথায় রাগিনীর চোখমুখ আঁধার নেমে আসে। ও রুম থেকে বেরিয়ে আসে। লিভিং রুমটায় আসতে ফুফি শাশুড়ী আফিয়া সিদ্দিকীর মুখোমুখি হয়। রাগিনীর হাতের ব্যান্ডেজে একনজর তাকিয়ে আফিয়া সিদ্দিকী বলেন, “রাতের খাবারে একটা আইটেম রান্না করিও। নতুন বউয়ের হাতের রান্না টেস্ট করব।”

“দুঃখিত, আমি জীবনে কোনদিন রান্না করিনি। এখনও করার প্রয়োজন মনে করছিনা।”

“মেয়ে তো দেখি, মুখ চলার আগেই শব্দ বেরিয়ে যায়। এতো মুখ পাতলা হলে, সংসার করে খাওয়া লাগবেনা।”

“সেটা সময় বলে দিবে।”

কথাটা বলে ও সোফায় বসে যায়। আফিয়া সিদ্দিকী মুখ বাকিয়ে ফেলেন। তার জীবনে এরকম বেয়াদব মুখে মুখে টক্কর দিয়ে উঠে মেয়েমানুষ দেখেনি সে। তার ভাইয়ের ছেলে এতো ভদ্র,শান্ত প্রকৃতির। লাখে একজন শেষমেশ কি-না তার ভাগ্যে এমন একটা বেয়াদব উশৃংখল মেয়ে জুটলো। ভাবতেই খারাপ লাগে আফিয়া সিদ্দিকীর। তার ভাইয়ের ছেলেকে বাকি জীবন শান্তি দিবে তো এই মেয়ে!

ফাহমিদা সিদ্দিকী রাতের খাবার গরম করছেন কিচেনে। রাগিনী টিভিতে কার্টুন দেখছে। আফিয়া সিদ্দিকী কিচেনে যেতে যেতে রাগিনীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “ভাবী যে বউমা এনেছো, শেষ বয়সে পাতে পানি ঢালবে কিনা সন্দেহ।”

রাগিনী জবাব দেয়, “শেষ বয়সটা তো ভবিষ্যতের হিসেবে পড়ে যায়, আমি একটু পরেই প্লেটে পানি ঢেলে হেল্প করব ফুপু শাশুড়ী আমম ম্মু। আপনি চাইলে আপনারটায় ও ঢেলে দিতে পারি। আইমিন, ভাতের প্লেট।”

শেষের কথাগুলোকে কেমন ইভটিজিং আখ্যা দেওয়া যায়। আফিয়া সিদ্দিকী রাগিনীর তাকানো আর কথাতো অস্বস্তিতে পড়ে যান। এই মেয়ে দেখি ব্যাটাছেলেদের থেকেও ভয়ংকর। অবশ্য বিয়ের আগে ছেলেদের মতোই উশৃংখল চলাফেরা ছিলো এখন আর কতটুকু শুধরেছে।

ওদিকে বউয়ের ব্যবহার ফাহমিদা সিদ্দিকী কেঁদে ফেলেন। বিশেষত ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে। নিজেরটা নিয়ে ভাবেন না। তার আরো এক ছেলে, দুই মেয়ে আছে। এসব বুড়ো বয়স নিয়ে তার চিন্তা নেই। একসন্তান না দেখলে আরেক সন্তান তাকে দেখবে। কিন্তু বউয়ের যে আচরণ, তার ছেলেকে সুখে দুমুঠো ভাত দিবে কি-না সন্দেহ। উল্টো ব্যবহারের যে ছিঁড়ি, কবে জানি কাকে বি ষ দিয়ে মে রে দেয়।

তিনি স্তিমিতনেত্রে খাবার বেড়ে টেবিলে হাজির করেন। একে একে খাবার খাওয়ার জন্য ডাক পড়ে সবার। আয়ান সিদ্দিকী এবং আদিবা সিদ্দিকী হাজির হয়ে। মায়ের চোখ মুখের অবস্থা দেখে আয়ান অনুমান করে, নিশ্চয়ই কিছু উলোটপালোট হয়েছে। সেজন্য সে মাকে জিজ্ঞেস করে, “আম্মা, কিছু হয়েছে? তোমার চোখমুখ এমন দেখাচ্ছে কেন?”

ফাহমিদা সিদ্দিকী কিছু বলার আগে আফিয়া সিদ্দিকী বলেন,”কী আর হবে। অভিদ যে মেয়েকে বউ করেছে, মেয়ের কথার ধরণ দেখলে যে কেউই কান্না করবে।”

“আরেহ্ ফুপি ভাবীর ব্যপারটা ভাইয়া বুঝবে। আম্মা, আপনি চিন্তা করবেন না। সব ঠিক হয়ে যাবে।”

“কী আর ঠিক হবে বাবা। যে বেয়া দব ধরে এনেছে মুখে মুখ তর্ক করে। বড় ছোটো মানে না। এরকম বেয়া দব মেয়েই কী অভিদের ভাগ্যে ছিলো? আমার ছেলে এতো নম্র- ভদ্র। কেউ ওকে নিয়ে একটা খারাপ কথা বলতে পারবে?
কখনো কোন মেয়ের সাথে বাজে ব্যবহার করেছে না কোন ময়মুরুব্বির সাথে বাজে ব্যবহার করেছে।এই এলাকার সবাই জানে, আমার অভিদ হিরের টুকরো ছেলে আমার।
ছেলের বউয়ের ব্যবহার দেখলে মানুষ ছি: ছি: করবে আমায়। দুনিয়ায় কী মেয়ের অভাব পড়েছে যে বড়লোক ঘরের বেয়াদব মেয়েটাকেই বউ করতে হলো।”

লম্বা কথার শেষে ফাহমিদা সিদ্দিকী হাফিয়ে যান। আয়ান মায়ের দিকে পানির গ্লাস এগিয়ে দেয়। আদিবা মায়ের বেদন বুঝতে পেরে পাশে দাঁড়িয়ে বলে, “ভাইয়া পছন্দ করে বিয়ে করেছে আম্মু। এখন ভাবীকে নিয়ে কটুক্তি করাটা খুব বাজে দেখায়।”

“আদিবা ঠিক বলেছে আম্মা। ভাবী নতুন পরিবেশে এসেছে, এভাবে বলাটা ঠিক না। তারও তো মানসিক প্রস্তুতির একটা ব্যপার আছে। তারউপর বিয়েটা হয়েছে একদম হুটহাট।”

আয়ান আর আদিবার কথায় রাগিনীর রাগটা কমে গেছে। এতোক্ষণ ফাহমিদা সিদ্দিকী যে পরিমাণ গা জ্বালানো কথা শুনিয়েছে, এতে করে রাগিনীর রাগ সপ্তম আকাশে ছিলো।

তাদের ঝগড়াঝাঁটির মাঝে আগমন হয়ে অভিদের। কানে এয়ারবাড গোজা। তাকে দেখা মাত্রই রাগিনীর রাগটা আবারো তরতর করে বেড়ে যায়। অভিদকে দেখে ফাহিমিদা সিদ্দিকী বিলাপ জুড়ে দেন। আফিয়া সিদ্দিকী বিচার বসান। সবার বিচার শুনে অভিদের মাথা হ্যাং হওয়ার উপক্রম। ও কোনরকম কিছু না বলে, সবাইকে খাওয়ার জন্য বলে। আর কোন টুশব্দ হয়নি। সবাই খাওয়ায় মনোযোগ দেয়। রাগিনী এক কোণে বসে,ভাতে হাত ঘুরাচ্ছে। মুখে নিয়ে চিবোচ্ছে তো ঝিমোচ্ছে। খাবার খাওয়ার ইচ্ছে একদমই নেই। বিন্দুমাত্র নেই। ওর প্রয়োজন মুক্তি। এখান থেকে মুক্তি প্রয়োজন। দম বন্ধ হয়ে আসে এদের সাথে থাকলে। অভিদ সিদ্দিকীকে দেখলে রাগটা আপনাআপনি বেড়ে যায়। সবাই খাবার খেয়ে চলে যায় নিজেদের মতো। কিন্তু রাগিনীর সেসবে হুঁশ নেই। ভাতের প্লেটের ভাত আর পেটে যায়নি। ওগুলোই হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করে, এক ধ্যানে সামনে থাকা বাটির দিকে তাকিয়ে আছে। অভিদ অনেকক্ষণ ধরে রাগিনীর দিকে লক্ষ্য রেখেছে। ঘড়ির কাটায় সময়, সাড়ে এগারোটা। মেয়েটা খাবার দাবার একদমই খাচ্ছেনা। অভিদ সিদ্দিকী গলা খাঁকারি দিয়ে বলে, “খাবার শেষ করো। এই বাড়িতে কেউই খাবার নষ্ট করেনা।”

রাগিনী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, “খেতে ইচ্ছে করছেনা।”

“আমি খাইয়ে দিব?”

রাগিনী অভিদের দিকে তাকায়। এতো কিছুর পরেও এই লোক এতো কুল হয়ে আছে কীভাবে? আবার খাইয়ে দেওয়ার আবদার পোষণ করে কীভাবে? সে হলে, লা থি মে রে চলে যেত। ইগো কী সস্তা জিনিস নাকি!

#চলবে