#বাতাসে_বহিছে_প্রেম
#আয়রা_তাবাস্সুম
পর্ব ০৪ [ শেষ পর্ব ]
আমি নিজেকে খুব সুচতুর মেয়েমানুষ মনে করি। পুরুষমানুষের কলাকৌশল সহজে কাজ করে না আমার উপর এমন চাপা অহংবোধ আমার বহুদিনের। কার দৃষ্টিতে কতটা কপটতা আর কতটা সচ্ছতা সেটা অনায়াসে ধরতে পারি দেখে একটা প্রেম অব্দি আমার কখনো হয়নি৷ কৈশোর পার করে আসার পরেও। অথচ হাঁদারামের গলার কাতরতা আমার এতদিনের জানা হিসেবনিকেশ যেন গড়মিল করে দিচ্ছিল। আমাকে ব্যাখ্যা দেয়ার কিংবা আমার কাছে নিজেকে সুপুরুষ প্রমাণের একেবারেই কোনো দায় ছিল না তার। তবু সে সেটা করছিল৷ এবং কেন করছিল সেটা বুঝে ফেলার বয়স আমি বহু আগে পার করে এসেছি।
মনের তীব্র দোলাচল থেকেই আমি এবার নজর মেলালাম তার দৃষ্টির সাথে৷ নিজের শেষ সংশয়টুকু মেটাতে। আর যা অঘটন ঘটার ঘটল৷ তার দৃষ্টিতে নিজের জন্য নিখাঁদ ভালবাসা বাদে আর কিচ্ছু চোখে পড়ল না আমার। এমন দৃষ্টিতে মিইয়ে গিয়ে পুনর্বার চোখ নামিয়ে নিবো তখনই তীক্ষ্ণ মাথাব্যথার মতন মাথাচাড়া দিয়ে উঠল সপ্তাহখানেক আগে আন্টির কাছ থেকে শোনা কথাটা। আমার আবেগী নারীমন বিবেকের তীক্ষ দংশনে ঘাপটি মেরে রইল। মাথায় বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল তার নন মেডিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ডের মেয়ে পছন্দ না করার বিষয়টা। তার আত্মগরিমার দাপট বিষফোঁড়া হয়ে বিঁধছিল তার প্রতি আমার সদ্য জন্ম নেয়া অনুভূতি তে।
আবেগে উদ্বেলিত মনকে হারিয়ে দিয়ে জিতে গেল আমার সুতীব্র আত্মসম্মানবোধ। এতক্ষণ নিশ্চুপ আমি এবারে কাট কাট গলায় বললাম কঠিন কিছু কথা, ‘আমার ভাবনা নিয়ে আপনার মাথাব্যথা হবার কথা ই না৷ তাই আমি কি ভাবি না ভাবি সেটা জানতে চাওয়া একেবারেই অপ্রয়োজনীয়।’
তার প্রতি আমার চেপে রাখা ক্ষোভ ঠিকই উগড়ে বেরিয়ে এলো এক ছুতোঁয়। তাই মুখ ফসকে বলে ফেললাম, ‘তাছাড়া নন মেডিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ডের একজনের অপিনিয়ন আপনার মাথায় নেয়ার দরকারও নেই।’
এতক্ষণ কাতর গলায় কথা বলা লোকটার মুখে এবারে খই ফুটল যেন৷ কোত্থেকে যেন ফিরে এলো তার আগের রাগ। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল একেকটা শব্দ, ‘হোয়াট ডু ইয়্যু মিন বাই দ্যাট? আচমকা এখানে মেডিকেল নন মেডিক্যাল কোত্থেকে আসল? মানে কি এসবের?’
তার উত্তেজিত গলার একেকটা প্রশ্নের উত্তর আমি দিলাম একেবারে ঠান্ডা গলায়। একবাক্যে জানালাম, ‘আপনি নিয়ে এসেছেন। কেন আপনি তো বলেছেন মেডিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ডের মেয়ে বাদে অন্য মেয়ে বিয়ে করার ইচ্ছে নেই আপনার।’
আমি ভেবেছিলাম আমার এমন প্রশ্নবাণে লোকটা ভ্যাবাছ্যাকা খাবে ভীষণ৷ অস্বস্তিতে গাঁট হয়ে শব্দ খুঁজবে বাহানা দিতে। অথচ আমাকে ভীষণ অবাক করে একেবারে নির্লিপ্ত গলায় সে বলতে শুরু করল নিজের কথা। একনাগাড়ে বলে গেল,
‘দিয়া! তুমি বিশ্বাস না ই করতে পারো৷ তবু বলি। এভাবে বলার সুযোগ যদি আর না পাই।
মানুষ কাউকে না দেখেই তার প্রেমে পড়তে পারে কিনা আমার জানা নেই। তবে আমি পড়েছিলাম। আম্মুর কাছ থেকে স্রেফ একজনের গল্প শুনতে শুনতে তাকে না দেখেই একেবারে ধপ করে তার প্রেমে পড়েছিলাম৷ জেনে গেছিলাম সে ছটফটে মিশুক স্বভাবের একটা মেয়ে। খুব ভালো পাস্তা বানায়। তার পছন্দের সব জামার রং নীল৷ সে ঘুমোতে খুব ভালবাসে। মায়ের জন্য রাতদিন টেনশন হয় তার। সে ভীষণ মিষ্টি করে হাসে।’
আমি এতদিন জানতাম এসব শুধু টিভি সিরিয়ালে হয়। নায়ক না দেখেই নায়িকার প্রেমে পড়ে। এসব বোগাস অবাস্তব মনে হতো আমার। অথচ আমার সাথে বাস্তবে হচ্ছিল। বিশ্বাস অবিশ্বাসের তীব্র দোলাচলে বিভ্রান্ত হচ্ছিল আমার সুচতুর সব বুঝে ফেলা মস্তিষ্কও। আশ্চর্য হবার প্রথম ধাক্কাটা কোনোমতে সামলে আমি তাকে ফিরতি কোনো প্রশ্ন করতে যাবো সেই অবসরও পেলাম না। কারণ সে তখনও বলে যাচ্ছিল নিজের কথা। আর আমার সব বুঝে ফেলা উর্বর মস্তিষ্ক বহু প্রচেষ্টার পরও কোনো কপটতা খুজেঁ পাচ্ছিল না তার চোখেমুখে, তার বলা একেকটা কথায়।
‘দিয়া! আমি ছোটবেলা থেকেই খুব সেন্সিবল টাইপের ছেলে। আম্মুর আপুকে নিয়ে যতটা দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে তার একভাগও আমাকে নিয়ে করতে হয়নি কখনো। আমি সবসময় জীবনটা খুব হিসেব করে চালিয়েছি। অ্যাডমিশনের পরে কোন লাইনে যাব, সেটাও এসএসসির পরেই ঠিক করে রেখেছিলাম। বলতে গেলে নিজের পুরো জীবনের ছক বহু আগেই কষে ফেলেছিলাম। অথচ সেই ছকে একদম অপ্রত্যাশিতভাবেই তুমি এলে।
প্রেম ভালোবাসার মতো অনুভূতিগুলো নিয়ে আমি কখনো তেমন ভাবিনি। ক্যারিয়ার গড়তে এতটা ডিটারমাইন্ড ছিলাম লাভ লাইফ নিয়ে ভাবার অবসরও পাইনি। কখনো বিয়ের কথা মাথায় এলেও ঠিক করেছিলাম সেটায় ভালোবাসা থাকুক আর না ই থাকুক আন্ডারস্ট্যান্ডিং অবশ্যই থাকবে। দাম্পত্যের কলহ অশান্তি ঝামেলা এসব আমার খুব অপছন্দের। তাই ভেবেছিলাম যদি কখনো বিয়ে করি, নিজের প্রফেশনের কাউকেই করব। এতে দুজন দুজনের পেশাগত জীবনের ব্যস্ততা, দায়িত্ব আর সীমাবদ্ধতাগুলো বুঝতে পারব। দাম্পত্য জীবনে এসব নিয়ে মনোমালিন্য তৈরি হবার স্কোপ থাকবে না৷ শুধু এই একটা কারণেই মেডিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ডের মেয়েকে বিয়ে করার পরিকল্পনা ছিল আমার। নাথিং এলস!
কুচুটে ব্যাডা মায়ের স্বভাব পেয়েছে পুরো৷ আমি কিছু বলতে যাবো তার আগে সে আবারও রেলগাড়ির গতিতে শুরু করল নিজের কথা৷
‘সব শুনে হয়তো বুঝতে পেরেছ আমি খুব প্র্যাকটিক্যাল একজন মানুষ। এতটাই প্র্যাকটিক্যাল যে আবেগ অনুভূতি বরাবরই খুব কম গুরুত্ব পেয়েছে আমার জীবনে। অথচ জানি না কীভাবে আমি জীবনের সবচেয়ে ইমপ্র্যাকটিক্যাল কাজটাই করে ফেললাম। একটা মেয়েকে না দেখেই, শুধু তার গল্প শুনতে শুনতে তার প্রেমে পড়ে গেলাম। অথচ এটুকুও জানি না, সেই মেয়েটা আদৌ কোনোদিন আমাকে পছন্দ করবে কি না।
দিয়া! আমি আমার পুরো জীবনে প্রতিটা ইনভেস্টমেন্ট খুব হিসেব করে করেছি। সময়, পরিশ্রম, আবেগ যেটাই হোক আগে সম্ভাব্য লাভ-ক্ষতির হিসেব কষেছি। যেখান থেকে রিটার্ন পাওয়ার সম্ভাবনা কম, সেখানে কখনো এক কদমও বাড়াইনি।
অথচ প্রথমবার আমি আমার সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটাই একেবারে বেহিসেবিভাবে দিয়ে বসলাম। আমার পুরো মনটা এমন একজনের হাতে তুলে দিলাম যে চাইলে আমাকে ভালোবাসতেই পারে, আবার নাও পারে। এমন একজনের ওপর নিজের সব ভালো মন্দ অনুভূতি ইনভেস্ট করলাম, যার কাছ থেকে কোনো রিটার্ন পাওয়ার নিশ্চয়তা তো দূরের কথা, সামান্য আশ্বাসটুকুও ছিল না।
তুমি সেদিন ইচ্ছে করেই চায়ের পানি ফেলেছিলে সেটা আমি বুঝতে পেরেছিলাম। তারপর যেভাবে প্রতিদিন আমাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করলে, তখনই বুঝে গেলাম তোমার মনে আমার জন্য কিছুই নেই। কোনো কারণে তুমি বাড়াবাড়ি ধরণের অপছন্দ করো আমাকে। এরকম সিচুয়েশনে একজন আগাগোড়া প্র্যাকটিক্যাল মানুষ হিসেবে আমার উচিত ছিল মুভ অন করা, আবেগের বশে অনিশ্চিত একটা সম্ভাবনা কে আকড়েঁ না ধরা।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারলাম কই? তোমার মুখে নিজের চরিত্রদোষের অভিযোগ শুনে ঠিকই সবকিছু ভুলে ছুটে এলাম নিজের আত্মসমর্থনে।
দিয়া… কাউকে ভালোবাসলে সবাই কি এতটা অসহায় হয়ে পড়ে ? নাকি শুধু আমি ই হলাম বলো তো!’
ছোটবেলায় আম্মু আমাকে টিভিতে ঠাকুরমার ঝুলি চালিয়ে দিয়ে রান্নাঘরে নিজের কাজ সারতেন৷ ফলশ্রুতিতে নামতা মুখস্থ করার মতো আমার মনে আছে একেকটা পর্ব৷ এরকমই একটা পর্বে দেখেছিলাম রুপকথার গল্পে অচেতন রাজকন্যার শিয়রে সোনার কাঠি আর রুপোর কাঠি রাখা থাকত। রাজপুত্তুর এসে সোনার কাঠি ছোঁয়ালেই জেগে উঠত দৈত্যের ছলাকলায় ঘুমন্ত রাজকন্যা। টের পেলাম সোনার কাঠির সন্ধান আমি পেয়েছি। সুযোগসন্ধানী পুরুষমানুষ দের ছলাকলায় আমার বিতৃষ্ণ পাথুরে মন নির্দিষ্ট একজনের সত্যিকারের ভালবাসায় গলে জল হয়েছে। এমন নিখাঁদ ভালবাসা আমি অগ্রাহ্য করি কি করে!
এরপর গল্পটা আর আমার একার না৷ আমার আর হাদাঁরামের। আমাদের দুজনের। মাস দুয়েক পর সেপ্টেম্বরের ঝিরিঝিরি বৃষ্টির এক সন্ধ্যাবেলায় ঘরোয়া ভাবে আমাদের আকদ হলো। পুরো ঘটনাটা নিয়ে আন্টির বিস্ময়ের রেশ তখনো কাটে নি৷ সম্ভবত তিনি বুঝে উঠতে পারছিলেন না বিদ্যার চাপে তার হাগামুতা করারও সময় না পাওয়া বিদ্বান পুত্র প্রেম করার সময় কোত্থেকে পেলো! আমি ভেবেছিলাম বিষয়টা তিনি অতি আগ্রহসকারে জানতে চাইবেন আমার কাছ থেকে৷ তবে এবার আমাকে অবাক করে দিয়ে তিনি একদম ভিন্ন একটা প্রশ্ন করে বসলেন আমায়।
‘দিতি! তুমি বেছে বেছে এই নিরামিষের পাল্লায় কিভাবে পড়লে? পাগলাটা তে পড়াশোনা বাদে আর কিচ্ছু বুঝে না৷ ছোটবেলা থেকে স্রেফ পড়াশোনা ই করে এসেছে৷ তুমি এই পাগলের জন্য পাগল হলে কি করে মা?’
আমি উত্তর দেয়ার আগে রাদিয়া আপু আন্টিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘দিতি কি পাগল আম্মু! তোমার ছেলে তারচে বেশি পাগল দিতির জন্য।’
আমি চেষ্টা করলাম নিজের দু গালের লালিমা লুকোতে। হাঁদারাম আসলেই হাঁদারাম। নিশ্চয় বোনকেও বলে বেড়িয়েছে সব কথা। রাদিয়া আপু আমাদের বিয়ে উপলক্ষে বাংলাদেশে এসেছিলেন সপ্তাহ খানিকের জন্য। এরকমই একদিন কথায় কথায় জানতে চাইলেন আমাদের প্রেমের গল্প৷ আমি এবার বড় দ্বিধায় পড়লাম। আমাদের তো কোনো প্রেমের গল্প নেই৷ আমাদের তো পুরোটাই অভিমান অভিযোগের গল্প। ঝগড়াঝাটি মারকাটারির গল্প। প্রেমের গল্পে প্রেম ই তো নেই!
আমি বলার আগে উত্তর টা দিলো হাঁদারাম। পুরো আন্টির স্বভাব পেয়েছে আন্টির গুণধর সুপুত্র। নিজের কথা শেষ না করে কাউকে কথা বলতে দেয় না সে। কথার মাঝখানে ফোঁড়ন কেটে বলে উঠল,’আর প্রেম! ওর মাথায় তো খালি আমাকে উপযুক্ত শিক্ষা দেয়ার পাঁয়তারা ঘুরতো৷ অনর্থক ক্ষোভ পুষে রাখত আমার জন্য, ঝগড়া করত বারবার!’
কুচুটে ব্যাডা আসলেই কুচুটে! অকারণে তাকে উপযুক্ত শিক্ষা আমি কোনোবারই দিই নি৷ যথোপযুক্ত কারণ ছিল আমার প্রতিটা কাজের। তাই তৎক্ষনাৎ বলে উঠলাম, ‘আচ্ছা? অনর্থক? তা আমার সাবজেক্ট কে অগামগা বলেছিল কে শুনি? কে বলেছিল কোনোমতে একটা গতি হবে আমার?’
আমার চোখ পাকিয়ে বলা একেকটা অভিযোগের সে উত্তর দিল ভীষণ রেগে। আপুকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘দেখলে আপা! অভিযোগের শেষ হয় না ওর। তারপর আবার তুমি জানতে চাও প্রেমের গল্প! আমি মোটেও ওর সাবজেক্ট কে অগামগা বলি নি। আল্লাহ মালুম আম্মু আমার কোন কথা কোন এঙ্গেলে প্রেজেন্ট করেছে!’
তারপরের কথাটা একেবারে তরল গলায় বলল সে, ‘তাছাড়া একটা গোটা অগামগা মেয়ে কে ভালবাসতে পারলে তার অগামগা সাবজেক্ট নিয়ে আমার কিসের আপত্তি!’
‘আমি অগামগা মেয়ে?’
‘তা নও তো কি৷ হাতে বাতের ব্যথা উঠে, সরীরে চা র পানি ঢালো, বিরোধী দলের নেত্রী র মতো মিথ্যে প্রপাগান্ডা ছড়াও। এগুলো সুস্থ স্বাভাবিক মেয়েদের কাজ?’
রাদিয়া আপু এতক্ষণ নিরব দর্শকের মতন দেখে যাচ্ছিলেন আমাদের ঝগড়াঝাঁটি। এবার বড় বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘ভুল হয়েছে আমার তোদের প্রেমের গল্প জানতে চাওয়া। এরকম তু তু ম্যায় ম্যায় করে তোদের প্রেম হলো কিভাবে সেটাই তো বুঝে উঠতে পারছি না আমি৷ আর এরকম অভিযোগ অনুযোগ নিয়ে তোরা বাকি জীবন একসাথে কাটাবি কি করে সে চিন্তাও তো হচ্ছে আমার!’
এমন প্রশ্নের কি উত্তর দিবো আমি ভেবে কূল পাচ্ছিলাম না। সত্যি বলতে আপুর সামনে নিজের এমন ছেলেমানুষী আচরণে আমি খানিকটা লজ্জিতও ছিলাম। জবাব টা এলো হাঁদারামের কাছ থেকে। শুনলাম সে বিমর্ষ গলায় আপুকে বলছে, ‘বাকি জীবন কাটানোর গরজ তো একমাত্র আমার৷ তাই আমি ই নাহয় অভিযোগ অনুযোগ সব মাথা পেতে নেবো৷ সে তো ভালবাসে না৷ আমিই ভালবাসি তাকে। শুরু থেকে আমিই ভালবেসে মরেছি। তার কি! সে কখনো সমান হতে পারবে আমার ভালবাসায়?’
আমার খুব রাগ হলো। এটা তার ভালবাসার নমুনা? ভালবাসলে তো সামনের মানুষটার মুখ দেখে মনের খবর পড়ে ফেলা যায়৷ যেমনটা আমি তার মুখ দেখে জেনে গেছিলাম তার মনের খবর৷ জেনে গেছিলাম আমার প্রতি তার ভালবাসা একেবারে নিখাঁদ। ফাঁকফোকর নেই তাতে। তাহলে মানুষ টা কেন পড়তে পারে না আমার মনের খবর। এই যে রাতের বেলা সে ঘুমিয়ে পড়লে আমি অপলক তাকে দেখি৷ দেখতেই থাকি৷ ঘুমোতে ইচ্ছে হয় না আমার। সেটা তাহলে কি? সেটা ভালবাসা না? প্রকাশ না করলে ভালবাসার গভীরতা বুঝি আন্দাজ করা যায় না?
পরিশিষ্ট :
আমার মেয়ের তখন ছয় বছর বয়স। এই অল্প বয়সেই একেবারে বাপের মতন কুচুটে স্বভাব পেয়েছে মেয়েটা। এই যেমন সেই কখন দুপুরে একটা কিল বসিয়েছি পিঠে সেটা মনে রেখে ঠিকই রাত দশটা হলো অমনি গুনগুন করে কাঁদতে বসেছে। একদম বাপ হসপিটাল থেকে ফেরার আগে। মাঝখানে বিকেল সন্ধ্যে পুরোটা সময় সে স্বাভাবিক ই ছিল। হেসেছে খেলেছে যেই মনে পড়ল বাপ আসবে তক্ষুনি কুচুটে বাপের কুচুটে কন্যা কাঁদতে বসেছে বাপকে বিচার দেবার পাঁয়তারায়।
কুচুটে কন্যা তার কূটবুদ্ধিতে সফলও হলো। বাপ চেম্বার করে এসে মেয়ের অভিযোগ শুনে তাকে আদরে আহলাদে ঘুম পাড়িয়ে আমার কাছে এসে অভিযোগ করল।
‘দিয়া! এতটুকু একটা বাচ্চা! মারতে হাত কাঁপল না তোমার? মেয়েকে এভাবে মারলে কেন?’
‘আপনার মেয়ে স্কুলে মারামারি করে এসেছে। এখন শাসন না করলে আদরে আদরে বাঁদর হবে’
অমনি সে বলে উঠল,
‘সেটা আর কি করার! তোমার ডিএনএ পেয়েছে আফটারঅল৷ তুমিও তো কম হেনস্তা করো নি আমাকে!’
সব কথার শেষে বহু বছর আগের কথা তুলে আমাকে নাজেহাল করা হাঁদারামের বহুদিনের অভ্যেস। আমি তাই গা করি না তেমন। বরং আশ্চর্য হই এই ভাবনায় যে পৃথিবীতে ভালবাসার মতন ম্যাজিকাল আর কিছুই নেই। তা নাহলে প্রথম দেখায় বাড়াবাড়ি রকমের অপছন্দের একটা মানুষ এতটা পছন্দের হয়ে উঠে কিভাবে!
( সমাপ্ত)

