#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ১
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা
“ভালোবাসি তোমাকে ইশাত, ওরিয়েন্টেশনের দিন তোমায় প্রথম দেখেছিলাম। সেই প্রথম দেখা থেকেই ভালোবেসে ফেলেছি।”
ছেলেটার দেওয়া সফেদ রঙ্গা লাভ লেটারের সাথে এক গুচ্ছ লাল গোলাপের বুকে আর মুখে বক্র হাসি নিয়ে দাড়িয়ে আছে ইশাত। তার বিপরীতে রাকিব নামের ছেলেটা চোখ মুখ ভর্তি প্রত্যাশা নিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে। মূলত সেই তাকে এসব ধরিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে তার উত্তরের। ইশাত মনে মনে তাকে নিয়ে কিছুক্ষণ উপহাস করলো। তার পরিচয় জানলে হয়তো ছেলেটা এমনটা করার সাহস পর্যন্ত পেত না। তার বান্ধবী আদিবা ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তার পাশেই দাড়িয়ে। ঈশাতের স্বভাব সম্পর্কে বেশ ভালো ভাবে সে অবগত।
ইশাত ইংরেজি বিভাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স প্রথম বর্ষে এবার। স্বভাবগতভাবে মেয়েটার চলাফেরা সাধারণ মেয়েদের তুলনায় ভিন্ন। মা’রপিট আর গে’ঞ্জাম করা তার রন্ধে রন্ধে মিশে। এর জন্যই স্কুলে সে লেডি ডন নামের খেতাব পেয়েছিল। তার বড় ভাই ইমরান আইজিপি পদে রয়েছে। ছোট থেকেই মা আর ভাইয়ের আদরে আল্লাদে বড় হয়েছে ইশাত। ছোট বেলায় তার বাবা দেশের সেবায় শহীদ হন। তিনিও ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন বিশ্বস্ত এবং সৎ কর্মকর্তা।
ইশাত ছোট থেকেই নিজের দমে নিজের জেদে চলা একজন মেয়ে। একবার সে যেটা জেদ করে বসে সেটা হাসিল করেই তবে শান্ত হয়। চলাফেরায় তার আধুনিকতার ছাপ। সৌন্দর্যের বর্ণনা করতে গেলে হলুদ বরণ গায়ের রং তার। মাথার চুল ডার্ক ব্রাউন। চেহারার সাথে সামঞ্জস্য রেখে চুলে স্টেপ কাট দেওয়া। উচ্চতায় পাঁচ ফুট পাঁচ, পড়নে ব্ল্যাক টপ আর জিন্স। ইতিমধ্যে তাকে দেখে ভার্সিটির সব ছেলেরাই ক্রাশ খেয়ে কাত হয়ে বসে আছে। তবে সেটা খেয়াল করেও ইশাত অগ্রাহ্য করলো।
প্রেম ভালোবাসার প্রতি তার কখনও কোনো আগ্রহ ছিল না। পদে পদে এমন অজস্র প্রস্তাব সে প্রত্যাখ্যান করে এসেছে। কেউ কেউ বাড়াবাড়ি করে প্রতাব দেওয়ার দুঃসাহসের কারণে তার হাতে পিটুনিও খেয়েছে। এখন ভাবার বিষয় সে রাকিবের সাথে কি করবে। আদিবা পাশে দাঁড়িয়ে তাকে ইশারায় বুঝাচ্ছে এখানে কোনো ঝামেলা না করতে। আদিবা তার ছোটবেলার বান্ধবী। তারা ছোট থেকেই একই স্কুল – কলেজে পড়েছে। আর এখন একই ভার্সিটিতে পড়ছে।
আবিদার ইশারাকে পাত্তা না দিয়েই ইশাত রাকিবকে কয়টা কড়া কথা শুনাতে যাবে তার আগেই কোথার থেকে যেন কিছু আপত্তিকর শব্দ তার কানে এসে লাগলো। দিক অনুসরণ করে সে এগিয়ে গিয়ে দেখলো কলেজের গেটের সামনেই কয়েকদল ব’খাটে ছেলে একটা মেয়েকে একা পেয়ে টিস করছে। মেয়েটা ভয়ার্ত কদমে জুবুথুবু হয়ে মাথা নিচু করে ভেতরে চলে আসছে। এমন দৃশ্য দেখা মাত্র তার মাথায় র’ক্ত চড়ে বসলো। সে হাতের ফ্লাওয়ার বুকে আর চিঠি রাকিবের ওপর ছুঁড়ে মেরে বড় বড় কদম ফেলে সেদিকে অগ্রসর হলো। না বুঝে রাকিবও তার পিছু ছুটলো।
অগত্যা ইশাত ব’খাটে ছেলেগুলোর সামনে গিয়ে দাড়াতেই তারা সেই মেয়েকে ছেড়ে ইশাতের দিকে নজর দিল। সেই সুযোগে মেয়েটা দ্রুত ভার্সিটির ভেতরে চলে গেল। ছেলেগুলোর লোভাতুর দৃষ্টিতে ইশাতকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত অবলোকন করে জোড়ে জোড়ে শিশ বাজালো। আদিবা এগিয়ে এসে ইশাতের হাত ধরে টান মেরে তাকে ভেতরে নিয়ে যেতে চাইলো। কিন্তু ইশাত এক ঝটকায় তার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললো।
“তুই যা ভেতরে আমি আসছি।”
আদিবা ফিসফিস করে বলল।
“এখানে কোনো গে’ঞ্জাম করিস না আমরা এই ভার্সিটিতে নতুন সবাই খারাপ ভাববে ভেতরে চল।”
ইশাত চোখমুখ শক্ত করে দাড়িয়ে। আদিবাও ঠেস দাড়িয়ে রইলো। তখন তিনজন ছেলের মধ্যে একজন উঠে এসে বলল।
“এই মেয়েটা তো দেখি আগুন। নিজে হেঁটেই আমাদের কাছে চলে এসেছে। সেই তো! মা’লটা কিন্তু আমার।
পরেরজন তাকে থামিয়ে বলল।
“কইলেই হইলো নাকি। আমার নজর আগে পরসে মানে আমার।”
এভাবে তিনজনের মধ্যে দরকষাকষির এক পর্যায়ে ইশাতের মুখের ভঙ্গি পরিবর্তন হলো। সে রহস্যময় হেসে বলল।
“তোরা কি প্রতিদিন এখানে দাড়িয়ে মেয়েদের টি’স করিস? মানে কেউ কিছু বলে না?”
ছেলেগুলো ইশাতের সাহস দেখে হতবাক হলো। একজন তো বলেই বসলো।
“ওই মাইয়া তোর সাহস কি করে হয় আমাদের তুই করে বলিস। আমরা এই এলাকার কি জানিস? এই এলাকায় কারো সাহস নেই আমাদের উপর কথা বলার।”
ইশাত তাচ্ছিল্য হেসে বলল।
“সোজা সুজি বল রাস্তায় ঘুড়ে বেড়ানো দু টাকার পাতি গু’ন্ডা মা’স্তান তোরা। আর আমি অন্যদের মত নই যে তোদের অন্যায় দেখে চুপ করে থাকবো।”
“মুখে দেখি অনেক বেশি জোড় তোর। মনে একদমই ভয় নেই দেখছি।”
“হাতে তার থেকেও বেশি জোড় পরখ করে দেখবি?”
এতক্ষনে ভর্সিটির সব ছাত্রছাত্রীরা এদিকটায় এসে জড়ো হয়েছে। ইশাতের কর্মকাণ্ডে তারাও হতভাগ। কেউ এগোচ্ছে না তাকে আটকাতে। অনেকে কানাখুসি করছে তাকে নিয়ে। অন্যদিকে ছেলেগুলো বুক কাঁপিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বলল।
“মেয়েমানুষ হয়ে ছেলেদের তাগত দেখাস? গায়ে জোড় বেশি নাকি? খুবই হাস্যকর। মেয়ে হয়ে এতো তেজ কিসের? নারী জাতি হয় দুর্বল আর নরম ছেলেদের শক্তির কাছে তোরা কিছুই না। তোদের একবার ছুলেই তো তোরা শেষ।”
কথাগুলো যেন ইশাতের শরীরে আ’গুন ধরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। ক্রোধে তার চোখে মুখে তেজস্বিনী রূপ ফুটে উঠলো। সে গর্জে উঠে হুংকার দিয়ে বলল।
“তাহলে দেখি তো একটু তোদের জোড়।”
সুযোগ পেয়ে পৈশাচিক হেসে একটা ছেলে এগিয়ে এসে তার হাত ধরতে যাবে তার আগেই ইশাত ছেলেটার হাত খপ করে ধরে মুচড়ে তার পিঠে ঘুরিয়ে ধরলো। ছেলেটা ব্যথায় গোঙানি দিয়ে উঠতেই অন্য আরেকজন এসে তাকে আটকাতে যাবে তাকেও ইশাত বুক বরাবর সজোড়ে লাথি বসালো। লাথি খেয়ে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। পরপর সাথের জনকে চোয়ালে শক্তপোক্ত ঘুষি বসিয়ে দিলো। এভাবে এক এক করে তিন জনের অবস্থা সে নাজেহাল করেই ক্ষান্ত হলো।
এমন সময় ভার্সিটির গেট দিয়ে ঢুকছিল আসিফ। ভেতরে ঘটে যাওয়া এই দৃশ্য তার নজরে আটকালো। ইশাত ইতিমধ্যে তার জামাকাপড়ের ধুলো ঝাড়ছে। তখন সুযোগ বুঝে পেছন থেকে উঠে এসে একজন তার ওপর গাছের ঢাল ভেঙে সেটা দিয়ে আঘাত করতে যাবে তার আগেই ইশাত সজাগ হয়ে পেছনে না ঘুরেই দুহাতে সেটা ধরে ফেললো। সবাই এটা দেখে আরো কয়েকদফা অবাক হয়ে গেলো। ঈশাতের প্রত্যেকটা নড়াচড়ার সাথে বাতাসে তার সিল্কি চুলগুলো দুলছিল। আসিফের নজর ইশাতের মধ্যেই থমকে গেলো। ছেলেগুলো আর না পেরে বলে উঠলো।
“এটা কি মেয়ে নাকি মেয়ের ভেতর কোনো জ্বীন ঢুকেছে। গভীর সন্দেহ হচ্ছে আমার।”
এমন কথা শুনে বিপরীতে ইশাত হেসে বলল।
“আমি তো শুধু আমার সামান্য কিছু ফাইটিং ট্রিকস তোদের উপড়ে এপ্লাই করলাম তাতেই তোদের এমন নাজেহাল অবস্থা? কই তোরা না বললি নারী জাতি হয় দুর্বল তাদের ধরলেই তারা শেষ?”
তারা আবারো কোকাতে কোকাতে প্রশ্ন করলো।
“এই মেয়ে তুমি কে? একটা সামান্য মেয়ের পক্ষে কখনোই তিনজন ছেলেকে এভাবে পি’টানো সম্ভব না। সত্যি করে বলো তুমি কে?”
ইশাত এবার তাদের শাসিয়ে শেষ কথাটুকু বলল।
“একটা কথা মনে রাখবি নারী জাতি দুর্বল নয় তাদের মনোবল এতটাই দৃঢ় যে তারা যা চায় তাই করে দেখাতে সক্ষম। আর আমি তেমন কেউ নই তবে কারাতে, তায়কোয়ান্দো, জুডো, কুংফু সহ কিছু মার্শাল আর্টের ফাইটিং স্কিল আমার মধ্যে রয়েছে। এবং ব্ল্যাক বেলডও জিতেছি। আজকে তোদের কপাল খারাপ ছিল তাই ভুল মানুষের সামনে এসে পড়েছিলি।
কথাটা শুনে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা রাকিবের নিজের প্রতি মায়া হতে লাগলো। সে কিনা না জেনেই এমন গু’ন্ডি টাইপের মেয়েকে একটু আগে প্রোপোজ করে বসেছে। এখন তার কি হবে ভেবেই তার রুহু শুকিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে আসিফ এগিয়ে এসে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে থাকা ছেলেদের কলার ধরে এক হাতে তুলে কড়া গলায় শাসিয়ে উঠে বলল।
“আর যেন এই ভার্সিটির ত্রিসীমানায় তোদের না দেখি।”
ইশাত একপলক আসিফের দিকে তাকিয়ে ঘুরে চলে যেতে নিলে আসিফ তাকে থামাতে ডেকে বলল।
“এক্সকিউজ মি!”
ইশাত ঘুরলো না তবে পা জোড়া তার থমকালো। আসিফ তাকে স্থির হয়ে দাঁড়াতে দেখে প্রশ্ন করলো।
“আপনি কি ফার্স্ট ইয়ারে? না মানে আমি সেকেন্ড ইয়ারে আপনাকে এই প্রথম দেখলাম।”
ইশাত ছোট্ট করে উত্তর দিলো।
“হুম, ফার্স্ট ইয়ার।”
“আপনার নাম?”
ইশাত কিছুটা সময় নিয়ে প্রত্যুত্তর করলো।
“সামায়রা মেহেজাবিন ঈশাত।”
আসিফ বুদ্ধিমান ছেলে তাই সে বুদ্ধি খাটিয়ে আগেই বেশিদূর না গিয়ে আন্তরিকতা দেখিয়ে বলল।
“আমরা কি বন্ধু হতে পারি? না মানে আমার মনে হলো আপনার সাথে আমার যায় আমাদের বন্ধুত্ব বেশ জমবে।”
ইশাতের পক্ষ থেকে সোজাসাপ্টা উত্তর এলো।
“প্রথমবার দেখে কিভাবে বুঝলেন আমার সাথে আপনার বন্ধুত্ব জমবে?”
“যেভাবে পে’টালেন ছেলেগুলোকে দেখেই বুঝেছি আপনি অনেক সাহসী একটা মেয়ে তাই আপনার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাই।”
“তার আগে বলুন এর আগে কি কখনো প্রতিবাদ করেছিলেন এই বখাটে ছেলেদের অপ’কর্মের বিরুদ্ধে? এরা যে আপনাদের ভার্সিটির মেয়েদেরকে উত্তক্ত করে বেড়ায় সে বিষয়ে আওয়াজ তুলেছিলেন কখনো? তুললে হয়তো এতদিনে তারা এতটা সাহস করে উঠতে পারত না।”
আসিফ আর কোনো উত্তর দিতে পারল না। তবে মেয়েটাকে আসিফের বেশ ইন্টারেস্টিং মনে হলো। ইশাত জোর কদম ফেলে ক্যাম্পাসের ভেতরে চলে গেলো। আদিবাও তার পিছু পিছু গেলো। ভিড় আস্তে আস্তে কমতে শুরু করলো। পুরো ক্যাম্পাসে ইশাতের বাহাদুরির কথা ছড়িয়ে পড়লো। সবাই ইশাতের সাথে পরিচিত হতে এগিয়ে এলো।
চলবে ( ইনশাআল্লাহ )~~~~~~~~~~~~~~~~
#ক্লান্তিহীন_তুই_আমার_ফরিয়াদ
#পর্বঃ২
#সুমাইয়া_জান্নাত_ইলমা
ভার্সিটি থেকে বাসায় ফিরেই লিভিংরুমে ঢুকে ডিভানে গা এলিয়ে বসেছে ইশাত। সে আর তার মা ভাড়াবাড়িতে ৩টা বেডরুমের সাধারণ একটি ফ্ল্যাটে থাকে। তার বড় ভাই ইমরান কর্মসূত্রে অন্য ডিস্ট্রিকে ট্রান্সফার হওয়ার কারণে মাঝে মাঝে ছুটি পেলে বাসায় ফিরে। ধরতে গেলে এখানে তাদের মা মেয়ের একাই থাকা হয়। ইশাতের মা আসিয়া বেগম মাত্র যুহরের নামাজ আদায় করে তাজবীহ পড়তে পড়তে রুম থেকে বেরিয়ে এসেই মেয়ের জামাকাপড়ের বেহাল দশা দেখে কপালে হাত দিয়ে দাঁড়ালেন। রাগে তেড়েমেড়ে গিয়ে মেয়ের পিঠে একটা চাপড় বসিয়ে বললেন।
— এই মেয়ে আজ আবার কি ঘটিয়েছিস? ভার্সিটির প্রথম দিনেই জামাকাপড়ের এমন বেহাল দশা কেন? কতবার বলেছি মেয়ে হয়ে ছেলেদের মত আচরণ না করতে।
মায়ের কথায় ইশাত একবার নিজের পোশাকের দিকে নজর বুলালো। পড়নে ব্ল্যাক টপটা ধূলোয় সাদাটে হয়ে আছে। পেন্টের একপাশ এঁচড়ে গেছে। সেটা লক্ষ্য করে আনমনে জিব্বায় কামড় বসিয়ে সে মায়ের দিকে তাকালো। আসিয়া বেগম রাগী রাগী কন্ঠে মেয়েকে আবারো শাসন করে বললেন।
— তুই এমন কেন? মেয়েদের মত নূন্যতম কোনো নম্রতা ভদ্রতা নেই তোর মাঝে। আমরা তোকে আদর করি বলে এই না যে অন্যায় কাজে প্রশ্রয় দেব। এমন করলে হবে?
মা’রামারির কথা এড়িয়ে গিয়ে মায়ের কথায় ফোড়ন কেটে ইশাত মায়ের হাত টেনে পাশে বসিয়ে বলল।
— দেখো আম্মু এই যুগে এতো নম্র ভদ্র হলে চলে না। তোমার মেয়ে একটু অন্য রকম। মেনে নিতে শিখো।
আসিয়া বেগম মেয়ের কথায় অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন।
— না এসব আমি মানবো না। তোমার চলা ফেরায় পরিবর্তন আনতে হবে পোশাকে পরিবর্তন আনতে হবে। তুমি একজন মুসলিম মেয়ে হয়ে এভাবে চলাফেরা করবে সেটা আমি মানতে পারবো না। কাল থেকে মেয়েদের মত শালীন পোশাক পরবে কামিজের সাথে হিজাব পড়বে তুমি। আর নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বে।
— উফ মা, এসব আমাকে দিয়ে হবে না। আমি যা পড়ি তাতেই কমফোর্টেবল। নামাজ নাহয় পড়ে নিলাম।
— মায়ের কথার গুরুত্ব তোমার কাছে থাকলে তুমি নিশ্চয়ই সেটাই করবে যেটা আমি বলেছি।
মায়ের কথা এড়িয়ে ইশাত বলল।
— আপাতত আমি অনেক টায়ার্ড। শাওয়ারের জন্য যাচ্ছি তুমি খাবার গরম দাও।
কিছুক্ষণ পর ইশাত ফ্রেশ হয়ে এসে তড়িঘড়ি করে খাবার টেবিলের চেয়ার টেনে বসতে গেলেই তার মা তাকে বাধা দিয়ে বললেন।
— যুহরের নামাজ পড়েছ?
ইশাত অসহায় মুখ করে পেটে হাত রেখে বলল।
— আগে খেয়ে নিই খিদে পেয়েছে খাওয়ার পর নাহয় পড়ে নিব নি।
ঈশাতের অভিনয়ে যেন আসিয়া বেগমের মন গললো না। সে শক্তপোক্ত গলায় বললেন।
— ইশাত আমি খেয়াল করছি তুমি নামাজ আর পর্দার দিক দিয়ে অনেক উদাসীন। আমাদের ইসলামে মেয়েদের ১২ বছর বয়স থেকে নামাজের হুকুম রয়েছে। তুমি যে পড়ছো না তোমার গুনাহ তো হচ্ছেই সাথে তোমার বাবা মায়েরও। আমি তোমাকে এত করে বুঝাই তাও আমার কথা কানে নাও না।
— আচ্ছা যাচ্ছি আগে নামাজ পড়ে তারপরই খেতে বসবো। খুশি?
— হুম, যাও।
ইশাত উঠে যাওয়ার পর আসিয়া বেগম বিড়বিড় করে আনমনে বলে উঠলেন।
“দোয়া করি আল্লাহ তোমাকে কোনো এক উসিলায় হলেও হেদায়েত দান করুক।”
______________________________________________
বেলা গড়িয়ে আধার নেমে এলো। তবে আজ রাতের আকাশটা বেশ উজ্জ্বল। আকাশে অর্ধখণ্ডিত চাঁদটা জানালা দিয়ে স্পষ্ট দৃশ্যমান। পরিষ্কার আকাশে চিকিমিকি তারারা উকি দিয়ে আছে। কল্পনায় তারাগুলো একে অপরের সাথে সংযুক্ত করলেই যেন আবিষ্কার করা যাবে কাল্পনিক কিছু বস্তু। আকাশের দিকে তাকালেই মনে হচ্ছে যেন চাঁদ আর তারারা অদৃশ্য এক খেলায় মেতেছে। জানালার সাথে সংযুক্ত উইন্ডো সিটে বসে আকাশের দিকে এক ধেয়ানে তাকিয়ে সেইসব উপভোগ করছে ইশাত। হঠাৎ সেইমুহুর্তে তার ফোন বেজে উঠল। ফোনের স্ক্রিনে তাকাতেই তার ঠোটে হাসিরেখা ফুটে উঠলো। আদিবা কল করেছে। কল তুলে ফোন কানে ধরতেই অপরপাশ থেকে আদিবা সালাম জানিয়ে বলল।
— কিরে কি করছিস?
ইশাত সালামের উত্তর নিয়ে বলল।
— এইতো বসে ছিলাম, তুই?
— বসে ছিলিস মানে? অ্যাসাইনমেন্ট করিস নি কাল তো জমা দেওয়ার কথা?..
— শিট!! মাথা থেকে বেড়িয়েই গিয়েছিল অ্যাসাইনমেন্টের কথা।
— আমি জানতাম তুই কেয়ারলেস তাইতো কল করে খোঁজ নিলাম। এখন কি করবি?
ইশাত মুখ লটকিয়ে বলল।
— কি আর করার পেঁচার মতো রাত জেগে অ্যাসাইনমেন্ট করব।
— সেটাই কর। আমি রাখছি তাহলে।
ফোন কেটে অনিচ্ছাকৃত স্টাডি টেবিলের পাশে চেয়ার টেনে ধপ করে বসে পড়লো মেয়েটা। ল্যাম্প লাইটটা জ্বালিয়ে তাক হাতড়ে অ্যাসাইনমেন্টের পেপার বের করে নিজেকে নিজে বলল।
“চল ইশাত কাজে লেগে যা।”
সারারাত অ্যাসাইনমেন্ট করতে করতে ইশাত স্টাডি টেবিলেই ঘুমিয়ে পড়লো। সকালে মায়ের ডাকে ধড়ফড়িয়ে টেবিল থেকে মাথা তুলে দেখলো সেই কখন থেকে ফোনের এলার্ম বেজে চলেছে। ভার্সিটিতে যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। অথচ অ্যাসাইনমেন্টের কাজ এখনো একটু বাকি।
তখন আসিয়া বেগম চিন্তিত হয়ে মেয়েকে বললেন।
— ছোটবেলার মতো এখনো তোমার ঘুম ভারী। ফজরেও একবার ডেকে গিয়েছি উঠো নি।
আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে ইশাত মাকে উত্তরে বলল।
— সারা রাত জেগে অ্যাসাইনমেন্ট লিখছিলাম আম্মু তাই ঘুমোতে দেরি হয়ে গেছে।
— তাই বলে টেবিলেই ঘুমিয়ে পরেছ। ঘাড় ব্যাথা করবে তো।
মায়ের কথায় খেয়াল হতেই ঘাড়ে হাত দিয়ে সে বলল।
— হ্যা আম্মু অলরেডি করছে।
— উঠে ফ্রেশ হয়ে নাও চা করে দিচ্ছি।
আসিয়া বেগম কক্ষ ত্যাগ করার আগে তাকে জলদি ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করার জন্য আসতে বলে গেলেন। কিন্তু ইশাত আগে তার অবশিষ্ট কাজ শেষ করে নিলো। অবশেষে কাজ শেষ করতে করতে তার বেশ দেরিই হয়ে গেল। সব কমপ্লিট করে ব্যাগ গুছিয়ে ফ্রেশ হয়ে বেড়িয়ে দেখলো আসিয়া বেগম নাস্তা তৈরি করে টেবিলে এনে রেখেছেন।
ইশাত নাস্তা না করে চায়ের কাপে দুই তিনটা চুমুক দিয়ে মাকে বুঝিয়ে তাড়াহুড়োর মধ্যেই বেরিয়ে গেলো। বাসা থেকে বেড়িয়ে রোডে এসে অটো নিয়ে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে রওনা হল সে। পথে অনেকবার আদিবা কল করেছে কিন্তু ফোন সাইলেন্ট হওয়ার কারণে সে তুলতে পারে নি। কিছুক্ষণের মাঝে অটো এসে ভার্সিটি গেটের সামনে থামতেই ইশাত টাকা পরিশোধ করে দ্রুত পায়ে ভেতরে প্রবেশ করতে গিয়ে ঘটলো এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। সে তাড়াহুড়োতে কারো সাথে জোরে এক ধাক্কা খেল। ধাক্কায় তাল সামলাতে না পেরে পড়ে যেতে নিলেও অপরপাশে ব্যাক্তিটি তাকে ধরার আগেই সে কোনো ভাবে নিজেকে সামলে ফেলল। তখন তার কানে একটা ফিসফিসানি শব্দ এলো।
“সো আনরোমান্টিক। আমি সামলে নিলে কি যেত।”
ইশাত মাথা তুলে তাকিয়ে দেখলো কালকের সেই ছেলেটি তার বরাবর দাড়িয়ে। তার মানে সেই ছেলের সাথেই সে ধাক্কা খেয়েছে। সে মৃদু হেসে সেই ছেলেটির উদ্দেশ্যে বলল।
— ঠিকই ধরেছেন, বলতে গেলে আমি এক প্রকারের অ্যান্টি-রোমান্টিক। আমার ধারা কারো কোনো প্রত্যাশা রাখাটাই ভুল হবে।
বিপরীতে আসিফ দাত দিয়ে জিব কেটে বলল।
— ইশ! কথাটা আস্তে করেই তো বলেছিলাম, শুনে ফেললে? কান তো ভালোই সরস। উপস! মাইন্ড করবেন না আমি ভুলে আপনাকে তুমি করে বলে ফেলেছি।
— সমস্যা নেই আপনি আমার এক ইয়ারের সিনিয়র হন। আপনি করে বললে ভালো শোনায় না। তাই তুমি করে বলতে পারেন।
আস্কারা পেয়ে আসিফ আরো কয়েক ধাপে এগিয়ে গিয়ে বলল।
— তুমিও আমাকে তুমি করে বললে খুশি হোতাম।
— সেটার কোনো প্রয়োজন নেই। অলরেডি আমার অনেক আমার দেরি হয়ে গিয়েছি যদি পথ ছেড়ে দাঁড়াতেন তাহলে উপকৃত হোতাম।
আসিফ আনমনে হেসে সরে দাড়ালো। ইশাতও আর কথা না বাড়িয়ে হলের দিকে এগিয়ে যেতে নিয়ে দেখলো হলের বাহিরে আদিবা কোমড়ে হাত দিয়ে রাগী রাগী চোখে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। ইশাত বুঝলো না তার রাগের কারণ তবে কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরে জানতে চাইলো।
— ক্লাসে যাস নি কেন?
— তোর জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। কতবার কল করেছি খেয়াল আছে?
— ওহ সরি দেখি নি। ফোন সাইলেন্ট ছিল।
— তুই এতক্ষন ওখানে দাঁড়িয়ে আসিফ ভাইয়ের সাথে কি কথা বলছিলি?
ইশাত আদিবার হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলল।
— ও কিছু না, চল ক্লাসে।
_______________________________________________
একাডেমিক ভবন, আবাসিক হল এবং লাইব্রেরির সাথে সংলগ্ন ক্যাম্পাসের মাঠে বসে আদিবার সাথে আড্ডা দিচ্ছে ইশাত। এখানকার পরিবেশটা বেশ স্বচ্ছ আর প্রাণবন্ত। আশেপাশে আরো অনেক ছাত্র ছাত্রীরা বসে আড্ডা দিচ্ছে। কিছুক্ষণ আগেই ঈশাত আর আদিবার একটা ক্লাস শেষ হয়েছে এখন অফ টাইম চলছে। আর কিছুদিনের মধ্যে আদিবার বিয়ে সেই নিয়ে ইশাতের সাথে সে তার কৌতুহল প্রকাশ করছে। বাবা মায়ের পছন্দের ছেলের সাথেই পারিবারিক ভাবে বিয়েটা হবে। ইশাতও ভীষণ খুশি তার বেস্ট ফ্রেন্ডের জন্য। বেশ মন দিয়ে শুনে যাচ্ছে বান্ধবীর প্রত্যেকটা আবেগিক অভিব্যক্তি। কথার মাঝেই আদিবা হঠাৎ বলে উঠলো।
— আচ্ছা ইশাত তোর মনে কি কখনো কারো জন্যে ভালোবাসার অনুভূতি জাগে নি? আমি তো তোর বেস্ট ফ্রেন্ড আমি চাই তুইও এমন কাউকে খুঁজে পাস যে তোর ভালো থাকার কারণ হোক।
ইশাত হাত নাড়িয়ে বলল।
— আরে, এসব ভালোবাসা টালোবাসা আমাকে দিয়ে কখনো হবে না।
— এখন এমন বলছিস তবে যখন সত্যিকার অর্থে এমন কাউকে খুঁজে পাবি যাকে দেখার পর থেকে প্রথম ভালোবাসার উষ্ণতা তোকে ছুয়ে যাবে তখন আর এই কথা বলতে পারবি না।
ইশাত তাচ্ছিল্য করে বলল।
— আমি আর কাউকে ভালোবাসবো? আদেও সম্ভব? আজ পর্যন্ত কোনো ছেলেকে দেখে ভিন্ন কিছু অনুভব করি নি। সবাইকে একই লেগেছে। সবাই বলে আমার মন নাকি অনেক শক্ত। আমি কি করবো এতে?
— দেখিস তোর জীবনে যখন দমকা হাওয়ায়র মত সেই মানুষটার আগমন ঘটবে যাকে দেখে তোর হৃদয়ে ব্যাকুলতার সৃষ্টি হবে তখন আর চাইলেও নিজের মনের অনুভূতি দমিয়ে রাখতে পারবি না। মানুষ ভেতর থেকে যতই শক্ত হোক না কেন কাউকে একবার ভালোবেসে ফেললে মনটা বেশ অবাধ্য হয়ে যায়। ভালোবেসে মানুষ সকল সীমা অতিক্রম করতে সক্ষম।
আদিবার কথা ইশাতের মাথায় কিছুই ঢুকলো না তবে সে আদিবাকে দুষ্টুমি করে খোচা মে’রে বলল।
— কিরে তোকে দেখে তো মনে হচ্ছে ভালোবাসার ওপর পি এইচ ডি করে বসে আছিস। হবু দুলাভাইকে তো বিষয়টা জানাতেই হয়।
আদিবা ইশাতের পিঠে চাপড় মে’রে বলল।
— এই একদম এসব করবি না তুই। যাহ আর কিছুই বলবো না তোকে।
— আরে আরে রাগছিস কেন একটু দুষ্টামিইতো করছিলাম। চল কেন্টিন থেকে কিছু খেয়ে আসি। আজ তাড়াহুড়োতে নাস্তা করতে পারি নি।
— ঠিকাছে তুই এখানে বস আমি নিয়ে আসছি এখানে বসেই খাবো। তুই কি খাবি বলে দে।
— আমার জন্য ড্রায় কেক আর জুস নিয়ে আসিস।
— ঠিকাছে।
আদিবা যেতেই কোথার থেকে যেন অফিস এসে ইশাতের পাশে বসে পড়লো। ইশাত ঘাড় ঘুরিয়ে নিজের পাশে আসিফকে দেখতে পেয়ে বিরক্তিতে চোখ উল্টে বলল।
— আপনি এখানে কেন? কিছু বলবেন?
— হ্যা, একটু গল্প করতে এলাম।
— কেন গল্প করার মত কি কোন বন্ধু নেই আপনার?
আসিফ হতাশ মুখ করে বলল।
— নেই বলেই তো তোমাকে বন্ধু বানাতে চাইলাম।
আসিফের কথা শেষ না হতেই অদূর থেকে তার বন্ধুরা তাকে ডাকতে ডাকতে বলল।
— ওই ব্যাটা কখন থেকে খুজছি তোকে আর তুই এখানে।
সেটা দেখে ইশাত সন্দেহসূচক চাহনি নিক্ষেপ করলো আসিফের ওপর। হাতেনাতে ইশাতের কাছে ধরা খাওয়ার পর আসিফ অসহায় হেসে কেটে পড়তে বলল।
— এরা তেমন কোনো কাছের বন্ধু না। হয়তো কোনো দরকারে ডাকছে। দেখি তাহলে গিয়ে কেন ডাকছে।
ইশাত তার কথায় তোয়াক্কা না করে ব্যাগ থেকে ফোন বের করে নিউজ ফিড স্ক্রল করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
চলবে ( ইনশাআল্লাহ )…………………………

