বৃষ্টিবিলাস পর্ব-৩৫

0
639

#বৃষ্টিবিলাস
৩৫.
#writer_Mousumi_Akter

–রোজাদের বাড়ির ছোট্ট সাজানো ড্রয়িং রুমে বসে আছে শুভ।এদিক সেদিক বারবার তাকাচ্ছে রোজার মুখটা দেখার জন্য।শুভর চোখ একটুও স্হির নেই,মন ও স্হির নেই।রোজাকে দেখার তৃষ্ণায় ছটফট করছে।কোন ঘর টা রোজার হতে পারে শুভ আন্দাজ করতে পারলেও সিওর না।রাজ আর শুভর সাথে কথা বলে অহনার মা ভেতরে অহনাকে ডাকতে গিয়েছে।বাসার কাজের বুয়া ওয়েদার খারাপের জন্য আসেনি।এক সপ্তাহ নিম্নচাপ থাকবে। রাজ ও শুভর পাশেই বসে আছে।শুভ কে এদিক সেদিক কিছু খুজতে দেখে রাজ বুঝতে পারলো শুভ রোজাকেই খুজছে।রাজ আস্তে করে উঠে গেলো শুভর সাইড থেকে।রাজ আগে একবার এসেছে এ বাড়িতে তাই মোটামুটি চিনে গিয়েছে সব কিছু।ড্রয়িং এ রাখা টিভির উপর একটা ফ্রেমে রোজা আর অহনার ছবি।ছবিতে দুজনেই পাউচ হয়ে আছে।দুজনের গাল ভরা হাসি।কি মিষ্টি লাগছে রোজার হাসি মুখ।শুভ সব কিছু উপেক্ষা করে তাকিয়ে আছে রোজার মুখের দিকে।টিভির উপরে ওয়ালে নীল শাড়ি পরে, হাত ভর্তি নীল চুড়ি,কপালে নীল টিপ পরা একটা গাছের ডাল ধরে দাঁড়িয়ে হাসছে রোজা।ছবিটা যেনো ভীষণ জীবন্ত।ছবির পাশেই একটা গরু ঘাস খাচ্ছে।সম্পূর্ণ প্রকৃতির সাথে মিশে আছে রোজা।গেজ দাঁত এ রোজার হাসিটা আরো বেশী মিষ্টি লাগে।শুভ সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে চশমা টা ভালো ভাবে চোখে লাগিয়ে নিয়ে বুকে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে রোজার ছবি দেখছে।শুভর কাছে মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব মায়া, সব মিষ্টতা রোজার হাসিতে আছে।এই হাসিমুখ দেখতেই বোধহয় তার এতদূরে ছুটে আসা।এই হাসিমুখ দেখলে তার জীবনের সব কষ্ট বিলীন হয়ে যায়।মনের মাঝে ভীষন ভালো লাগার অনুভূতি হচ্ছে শুভর।প্রিয়তমার মুখের হাসিতে কি যাদু আছে কে জানে।বেশ অনেক্ষণ হয়েছে শুভ রোজার ছবির দিকে তাকিয়ে আছে।
হঠাত কারো পায়ের ধীর গতির শব্দে পেছনে তাকালো শুভ।সাদা কামিজের সাথে গোলাপি ওড়না আর প্লাজু পরে হাতে এক গ্লাস পানি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রোজা।চুল গুলো ফ্যানের বাতাসে উড়ছে।চোখ দুটো ফোলা।মেয়েটা যে কেঁদে কেঁদে নিজের এমন অবস্থা করেছে সেটা বুঝতে শুভর বাকি নেই।রোজার মুখে ভীষণ মলিনতা,শুভর গায়ে ভীষণ জ্বর আর ক্লান্তুি।প্রিয়তমার মুখ দেখে সব ক্লান্তি উড়ে গেলো শুভর।দুজন দুজন কে মন ভরে দেখছে যেনো চৈত্র মাসে ফেটে চৈচির হওয়া মাটিতে প্রথম বর্ষণ।এই তৃষ্ণা যেনো দীর্ঘকাল আর দীর্ঘক্ষণের।

শুভ কিছুক্ষণ রোজার দিকে তাকিয়ে থেকে বললো,

“কি হয়েছে মিস প্রেমিকা কেঁদে কেঁদে চোখের বারোটা বাজিয়েছো কেনো?খেয়াল করেছো কাজল চেপটে চোখের কোয়া কালিতে ভরে গিয়েছে।তুমিতো এমন অগোছালো নও প্রেমিকা।নিশ্চয়ই আয়না দেখোনি অনেক ঘন্টা।আবার এক্ষুণি মনে হচ্ছে কেঁদে দিবে।আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি চোখের কোয়া পানিতে ভরে এসছে।খবর দার এক ফোঁটা পানিও যেনো নিচে না পড়ে।ওই চোখে শুধু কাজল মানায় মিস প্রেমিকা।”

রোজা চুপ করে দাঁড়িয়ে চোখের পানি ছেড়ে দিলো।রোজা বুঝতে পেরেছে শুভ তার মন ভালো করতে,তাকে একটু হাসানোর জন্য এমন ভাবে কথা বলছে যেনো কিছু হয় ই নি।কিন্তু চাইলেই কি আর হাসা যায় সব সময়।রোজার শুভর মুখে এমন ভালবাসাময় কথা শুনে আরো বেশী কাঁন্না পাচ্ছে।

শুভ দু’কদম এগিয়ে এসে বললো,

“পানিটা কি আমার জন্য মিস প্রেমিকা”

শুভর মুখ এই মিস প্রেমিকা ডাকটা ভীষণ স্পেশাল রোজার কাছে।এই ডাকটা যেনো রোজার জন্য তৈরি হয়েছে।এক অন্যরকম ভালোলাগার কাজ করে রোজার মাঝে।

রোজা পানির গ্লাস টা এগিয়ে দিলো শুভর দিকে।পানির গ্লাস দেওয়ার সময় রোজার হাত থর থর করে কাঁপছে।এক্ষুণি পড়ে যাবে এমন একটা অবস্থা। হাত সহ সমস্ত শরীর কাঁপছে রোজার।শুভ দ্রুত গ্লাসসহ রোজার হাত শক্ত ভাবে চেপে ধরে বললো,

“রোজা প্লিজ কুল আমি আছিনা।কিসের ভয় তোমার।যার সাথে শুভ আছে তার সাথে কি কখনো অশুভ কিছু হতে পারে।কেনো এতটা নারভাস তুমি রোজা।তোমাকে সাহস রাখতে হবে রোজা।কেনো এতটা ভেঙে পড়েছো বলো।আমি কি পালিয়ে গেছি বলো।আমি কি তোমার সেই প্রেমিক রোজা।যা কিছু হয়ে যাক ঝড় হোক,তুফান হোক আমি আছি তোমার সাথে।তোমাকে তো ভয় পেলে চলবেনা জানপাখিটা।আমাকে শুধু একটু পাশে থেকে সাহস দিও,তোমার এই প্রেমিক এমনিতেই অনেক সাহসী।সাহসী পুরুষ কখনো হারে না রোজা।সব কিছু আমি ম্যানেজ করবো।”

রোজা এবার কেঁদে দিয়ে বললো,

“আমার ভাগ্য বোধহয় তুমি নেই শুভ।আ-আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে শুভ।আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবোনা।আজ আমার ভুলে আমি তোমাকে পেয়েও হারিয়ে ফেললাম।”

শুভ রোজার চোখের পানি মুছে দিয়ে বললো,

“তোমার ভাগ্য আমি ঠিক ই আছি বুঝলে।যার ভাগ্য আমি আছি সেও আমার ভাগ্য আছে বুঝলে বালিকা।”

রোজা অহনার ঘরের দিকে তাকিয়ে বললো,

“কাকি চলে আসবে আমি যাচ্ছি শুভ।বাবাকে আর কেউ অপমান করুক আমি সেটা চাইছিনা শুভ।আমার বাবা আমার জন্য এমনিতে অনেক অপমানিত হয়েছেন।”

“পানি না খাইয়ে চলে যাবে।”

“পানি খেয়ে নাও তুমি।”

“তুমি খাইয়ে না দিলে খাবো না।”

রোজা শুভর দিকে তাকিয়ে আছে।শুভর মাথায় বৃষ্টির পানির ফোঁটা।রোজা নিজের ওড়না দিয়ে শুভর মাথার পানি মুছিয়ে দিলো এক হাত দিয়ে।আরেক হাতে পানির গ্লাস।শুভ রোজার হাত সহ পানিরগ্লাস দুই হাতে ধরে পানি খেয়েনিলো।

এটা কি পানি খাওয়া ছিলো নাকি রোজার হাত ধরার বাহানা ছিলো মাত্র।

পানি খাওয়া শেষে রোজা বললো,

“তুমি বসো বসুন অহনা আসছে এখন।”

রোজা চলে যাওয়ার সময় শুভ রোজার হাত টেনে এক ঝটকায় নিচের কাছে নিয়ে এলো।রোজা একদম শুভর কাছাকাছি চলে এলো।

“শুভ রোজার হাত ধরে নিজের কপাল ছুইয়ে বললো দেখো না কত জ্বর।তুমি না দেখলে কে দেখবে রোজা।”

রোজার হাত যেনো ছ্যাত করে উঠলো গরমে।রোজা বেশ মন খারাপ করে বললো,

“এই অসুস্থতায় কেনো ছুটে এসেছো শুভ।জানো সারারাত আমি ঘুমোতে পারিনি তোমার চিন্তায়।তুমি ভালো আছো কিনা ভেবে অস্হিরতায় ছটফট করেছি আমি।ওষুধ খেয়েছো তো।”

শুভ এবার হেসে দিয়ে বললো,

“এই পাগলামি টুকুর জন্যই আমার তোমাকে চাই রোজা।”

রোজা মায়াবী চোখে তাকিয়ে আছে শুভর দিকে।

“শুভ বললো,আমি তো পানি চাইনি তুমি পানি নিয়ে এলে যে।”

“রাজ ভাইয়া বললো তুমি পানি খাবে।বাইরে কেউ নেই।তুমি কষ্ট পাচ্ছো বলে আমি নিয়ে এলাম।”

“আমি এবার যায় কেউ এসে যাবে।”

“এভাবে যাওয়ার জন্য বাহানা করছো কেনো মিস প্রেমিকা?আর তোমার কি হয়েছে আমাকে আগে বলো।আমার জন্য মন খারাপ সেটা আমি জানি এ বাদেও কিছু হয়েছে আমি জানি।”

“না কি হবে কিছুই না।”

“আমার প্রিয়তমার মুখ দেখে কি আমি বুঝি না কি হয়েছে।কে কি বলেছে বলো আমাকে।”

“বললাম তো কিছুই হয়নি। ”

“না বললে কিন্তু এক্ষুনি লিপ কিস করবো এখানে দাঁড়িয়ে।কেউ আসলেও ছাড়বো না।কোনটা বেটার হবে সত্যিটা বলা নাকি মানুষ এর মাঝে কিস করবো প্রেমিকা।”

রোজা আবার কাঁদছে।

“একদম কাঁদবে না।আগে বলো কি হয়েছে।”

“বাবা আমাকে তোমার সাথে কথা বলতে নিষেধ করেছে।বাবা আজ আমাকে মেরেছে।”

“মেরেছে ভীষণ অবাক হয়ে বললো শুভ।কিন্তু কেনো?”

রাজ ওদের মাঝে এসে বললো,

“শুভ আন্টির কাছে শুনলাম আঙ্কেল নাকি রোজাকে আজ বকেছেন।রোজার ফোন নেই অহনার ফোন দিয়ে তোকে ফোন দিয়েছিলো।রোজার ফোন করাতে আঙ্কেল রোজার বাবাকে ফোন দিয়ে অপমান করেছে।হয়তো এসব নিয়েই রোজাকে মেরেছে আঙ্কেল।”

শুভ চোয়াল শক্ত করে বললো,এসব আর নেওয়া যাচ্ছেনা।এবার বাবা একটু বেশী বাড়াবাড়ি করেছে।বাবার সাথে আজ আমি লাস্টবার কথা বলবো রোজাকে নিয়ে।তারপর রোজাকে নিয়ে আমি এখান থেকে চলে যাবো।অনেক হয়েছে এসব কাহিনী।এসব পারিবারিক ড্রামা বিরক্ত লাগছে আমার।আমার নিঁখুত লাভ স্টোরিকে এরা বাংলা সিনেমার সব থেকে জটিল পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে।রোজা আমি তোমার বাবার কাছে ক্ষমা চেয়ে তোমাকে নিয়ে যাবো।তুমি তৈরি থেকো।

চলবে?…..