#ভালোবাসার_মৌসুম
#aroshi_jahan_isha
পর্ব ৯
দেখুন মিস্টার তন্ময়, পেসেন্টের অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে। আমরা আমাদের সাধ্য মতো ট্রিটমেন্ট দিচ্ছি। তারপরেও আপনাদের ওনাকে এমন ভাবে সবকিছু দেখাতে হবে যেনো ওনি মানষিক ভাবে আঘাত না পায়।সবসময় যেনো হাসিখুশি থাকে।
ডক্টর আহিম হাসান গম্ভীর কন্ঠে কথা গুলো বলেই চলে গেলো।তন্ময় চোখ বন্ধ করলো।একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে পারি জমালো অতীতের সেই কালো দিনে।
অতীত
________
সময়টা তখন শীতের মাঝামাঝি। প্রকৃতি জুড়ে কুয়াশা পাহাড়ি আঁকাবাকা রাস্তার ফাকে একখানা চার চাকার গাড়ি ছুটে চলছে তার আপন গতিতে । তারিখ টা তখন ৩ জানুয়ারি ২০১৮ গাড়িতে বসা চারজন মানব-মানবীর মুখে তখন আনন্দের ভারি রেশ।তবে তাদের এই হাসিখুশি মুখ বোধহয় প্রকৃতির পছন্দ হলো না।
সামনে থেকে আসা বিশাল মালবাহী একখানা ট্রাক এসে ঝলসে দিলো চারচাকার গাড়িখানা। ছোট্ট গাড়িখানা ঝলসে গেলো সঙ্গে সঙ্গে, ছিটকে পরলো পাহারের সমতলে।
সঙ্গে সঙ্গে প্রাণ হারালো নিশান্ত আর তার স্ত্রী দিয়া।
বেঁচে গেলো তন্ময় আর নাতাশা।নাতাশার বড় ভাই ছিলো নিশান্ত আর নিশান্তর বন্ধু ছিলো তন্ময় সেই সুভাতেই নাতাশার সাথে তার পরিচ। মেয়েটা বড্ড চঞ্চল ছিলো।তবে সেই দূর্ঘটনায় পাল্টে যায় তার চঞ্চলতা। মাথায় তিব্র আঘাতের ফলে বিরাট ক্ষতি হয়।
প্রায় ৭ মাস কুমায় ছিলো, লন্ডনের সনামধন্য একটা হাসপাতালে। সঙ্গে ছিলো তন্ময় আর নাতাশার বাবা।
অবশেষে পাক্কা দের বছর সময় নিয়ে ঠিক হয়।তবুও রয়ে যায় মস্তিষ্কের এক কোন দূর্বল হয়ে।যার ফলস্বরূপ অতিরিক্ত মানষিক চাপ,চিৎকারে ভয়।অপছন্দনিয় কিছু হলেই মস্তিষ্কে বিরাট আঘাত হানবে।যার ফলস্বরূপ মৃত্যু হতে পারে।
একসাথে থাকতে থাকতে নাতাশা হুট করে একদিন তন্ময় কে প্রপোজ করে বসে।নাতাশার মানষিক অবস্থা দেখে তন্ময় আর না করতে পারে নি।থেকে যায় তার পাশে।অতঃপর হুট করে একদিন তাহসিন চৌধুরী তন্ময়কে রেশবপুর গ্রামে নিয়ে আসে আর মাইরা কে বিয়ে করতে বলে।
তবে তন্ময় না করে।তাহসিন চৌধুরী বোধহয় সেদিন ওয়াদা করেছিলেন বিয়ে তিনি দিয়েই ছাড়বে।নিজের গলায় চাকু ধরে বাধ্য করে তন্ময় কে বিয়ে করতে।সেদিন তন্ময় বাধ্য হয়ে মাইরাকে বিয়ে করে।
যার ফলস্বরূপ নাতাশা আবারও ৩ মাস হাসপাতালের বেডে ছিলো।মাইরা তন্ময়ের বিয়ের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নাতাশা মানষিক ভাবে ভেঙে পড়ে।যার ফলে তার ইন্ট্রাক্রানিয়াল হঠাৎ বেড়ে যায়।পরে তাকে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয় সেখানে চিকিৎসা দেওয়া হয়।আস্তে আস্তে সুস্থ হয়।তন্ময় তাকে সান্তনা দিয়ে বলে সে ইচ্ছে করে বিয়ে করে নি পরিস্থিতির চাপে পড়ে এমনটা করেছে। নাতাশা মেনে নেয় সবকিছু।
তন্ময় হাসপাতালের করিডোরে বসে মাথা চেপে ধরে, কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে উঠলো,
নিশান্ত আমি খুব ক্লান্ত ভাই,সবকিছু এলোমেলো লাগছে। একদিকে আমার প্রিয় তোর বোন অন্যদিকে আমার……
না আর ভাবতে পারছে না,সবকিছু এলোমেলো লাগছে। তন্ময় ধীর পায়ে নাতাশার কেবিনের দিকে গেলো।
_____ঘড়ির কাটায় তখন দুপুর, তপ্ত রোদে ঘামে নেয়ে একাকার হয়ে গেছে রাস্তার মানুষজন।
কলেজের দক্ষিণ পাশে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে বসে আছে মাইরা আর নীলিমা।মাইরার হাতে আইসক্রিম। নীলিমা কোল্ড কফির গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে ফুসে ওঠছে।
জানিস মাইরা ওই অসভ্য লোকটা কথায় কথায় অপমান করে আমাকে।দেখেছিস ক্লাসে সবার সামনে আমাকে পাঁজি মেয়ে বললো।আর কি বললো আমি বেয়াদব ম্যানার্স জানি না।আমি নাকি অভদ্র”
মাইরা আইসক্রিম শেষ করে ট্যিসু তে হাত মুছতে মুছতে শুধালো,
তুই একটু খানি পাঁজি বটে।তবে একদম অভদ্র না।যদিও ম্যানার্স কম জানিস!
মাইরার খোঁচা মারা কথা শুনে নীলিমা রেগে গেলো।বসা থেকে ওঠে পা বাড়ালো কলেজের মাঠের দিকে।
নীলিমা……….
মাইরার চিৎকারে ভরকে গেলো নীলিমা।তড়িৎ গতিতে পিছু ফিরে চাইলো। ওমনি চোখজোড়া রক্ত বর্ণ ধারন করলো।পাভেল কে দেখে মাথার রগ গুলো লাফাতে লাগলো।
ছাড়ুন আমার হাত, লাগছে আমার ছাড়ুন বলছি!
_না সোনা ছাড়বো না কি করবে?
মাইরা হাত টানতে টানতে আবারও বলে ওঠলো, ভালোয় ভালোয় ছাড়ুন নয়তো খুব খারাপ হবে।
পাভেল ছাড়লো না বরং নোংরা নজরে মাইরা কে পড়খ করলো।
নীলিমা বড় বড় পা ফেলে এসেই পাভেলের গালে সজোরে একখানা থাপ্পড় বসিয়ে দিলো।
পাভেল তেরে এসে নীলিমার গলা চেপে ধরলো, মাইরা ভরকে গেলো, পাভেল কে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো। তবে পুরুষালি শক্তির কাছে ঠুনকো কাচের নায় হেরে গেলো।কুল কিনারা না পেয়ে আশেপাশে তাকালো,না কেউ নেই।
দৌড়ে কিছুটা সামনে যেতেই আহির স্যার কে চোখে পড়লো।
স্যার নীলিমাকে,,,,ওই পাভেল,,,,,,,
আহির চিন্তিত হয়ে শুধালো,
কি হয়েছে নীলিমার?
মাইরা ফুপাতে ফুপাতে বললো, ওই আসলে, আপনি চলুন মেরে ফেলছে তো ওকে।
বলেই আবার দৌড়ে আসলো কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে।পাভেল নীলিমার গলা চেপে ধরে আছে।মেয়েটা নড়ম দূর্বা ঘাসে পড়ে ছটফট করছে।ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করছে অনবরত।
আহির দৌড়ে এসে পাভেল কে লাথি মেরে দূরে ফেলে দিলো।
মাইরা নীলিমা কে জড়িয়ে ধরলো।ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে খাওয়ালো মাথায় পানি দিলো।
নীলিমা কাশতে কাশতে জ্ঞান হারালো।মাইরা ঘাবড়ে গেলো। ভয়ে কেঁদে ওঠলো।
অন্য দিকে আহির পাভেল কে এলোপাতাড়ি কিল ঘুসি মারতে লাগলো।কিছু ছাএছাএী দৌড়ে এদিকে এলো।আহিরকে থামালো।
নীলিমার মাথায় পানি দেওয়া হলো এতেও জ্ঞান না আসায় আহির কোলে তুলে নিলো।
মাইরাও কাঁদতে কাঁদতে তার পিছু ছুটলো।
হাসপাতালের ইমারজেন্সিতে নিয়ে আসা হয়েছে নীলিমাকে।
ডাক্তার চেকআপ করে জানিয়েছে।ভয় পেয়ে জ্ঞান হারিয়েছে।কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান ফিরে আসবে।
মাইরা কিছুটা শান্ত হলো।আহির কে উদ্দেশ্য করে বললো।
ধন্যবাদ আপনাকে স্যার, আপনি যদি না থাকতেন জানি না কি হতো।
আহির মৃদু হেসে বললো, ধন্যবাদ দিতে হবে না।
আর পাভেলের একটা ব্যবস্থা করতে হবে।
মাইরা সায় জানালো।
____________
নীলিমার জ্ঞান ফিরেছে বেশ কিছুক্ষণ আগেই
এখন বাড়ি যেতে পারবে।আহির আর নীলিমা হসপিটালের বাইরে চলে গেছে যদিও মাইরাও গেছিলো তাদের সাথে তবে ব্যাগ ফেলে যাওয়ায় আবারও আসতে হলো ।
ব্যাগ নিয়ে যেই না যেতে যাবে ওমনি চোখ গেলো,হাসপাতালের বেঞ্চে বসে থাকা তন্ময় আর নাতাশার পানে।মেয়েটা কতো অধিকার খাটিয়ে তন্ময়ের কাঁধে মাথা রেখে বসে আছে।
অথচ মাইরা স্ত্রী হয়েও এই অধিকার পেলো না।ছলছল করে ওঠলো, অষ্টাদশীর নয়ন জোড়া।ফ্যালফ্যাল কর চেয়ে রইলো।নিজ মানুষকে অন্য না’রীর পাশে দেখে বক্ষ মাঝে ব্যথা অনুভব করলো।
অথচ তার সামনে বসে আছে তার স্বামী নামক মানুষটা অন্য নারীর পাশে। কি করে যাবে মাইরা তার সামনে দিয়ে। সে কি আদোও যেতে পারবে।না গেলে যে নীলিমা অপেক্ষা করবে।মাইরা চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাটা ধরলো।এক পা দু পা করে তন্ময়ের সামনে এলো।তন্ময় বোধহয় আশা করে নি মাইরা কে এখনে।তাইতো আশ্চর্য হয়ে, নাতাশা কে ভুলে উঠে মাইরার সামনে এসে দাড়ালো।
নাতাশা হকচকিয়ে গেলো, পড়ে যেতে নিয়েও নিজেকে সামলে নিলো।অপলকভাবে চেয়ে রইলো তন্ময় আর মাইরার পানে।
তুমি ঠিক আছো? আর হসপিটালে কি করছো?
তোমার কি হয়েছে?চুপ করে আছো কেনো?
মাইরা ফ্যাল ফ্যাল করে কেবল তাকিয়ে রইলো মাইরার পানে।মানুষটা চিন্তিত হয়ে কেমন করে চেয়ে আছে।
কথা বলছো না কেনো?মাইরার বাহু চেপে ধরেলো তন্ময়।
মাইরা শান্ত কন্ঠে বললো, কিচ্ছু হয় নি আমার!
_তাহলে এখানে কেনো?
মাইরা শান্ত শীতল কন্ঠে বললো, নীলিমাকে নিয়ে এসেছি ও একটু অসুস্থ ছিলো।
তন্ময় ভ্রু কুঁচকে বললো, তুমি একা এসেছো?
_না আহির স্যার আছে,আমার জন্য অপেক্ষা করছে আমাকে যেতে হবে পথ ছাড়ুন।
ওদের বলে দেও তুমি আমার সাথে যাবে।
_আপনার সাথে যাবো?
হু,
মাইরা নাতাশার পানে চাইলো।মেয়েটা কেবল তাকিয়ে আছে তার পানে।
*******
রাতের শহর বোধহয় একটু বেশিই সুন্দর। চারিদিকে ক্রিতিম আলোয় ঝলমল করছে। গাড়ির পেছনের সিটে বসে আছে মা’ইরা।
তন্ময় গাড়ি ড্রাইভ করছে, তার পাসেই বসে আছে নাতাশা।গম্ভীর মুখে।
মাইরা বিষন্নমাখা মুখে কেবল চেয়ে দেখছে তাদের।
নাতাশা হুট করে বলে উঠলো। ভালোবসি তন্ময়!
তন্ময় মৃদু হাসলো।
মাইরা অশ্রু ভেজা নয়নে কেবল চেয়ে রইলো।
তন্ময় ফ্রন্ট মিররে দেখলো অষ্টাদশীর বিষন্ন মুখ।
নাতাশা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো তন্ময়ের পানে।
তন্ময় শান্ত কন্ঠে বললো, ভালোবাসো?
নাতাশা হাসলো, কি চমৎকার সেই হাসি!প্রমাণ লাগবে তন্ময়!
তন্ময় কিছু বললো না।
চলবে……

