ভালোবাসা_তুই
#সুচনা_পর্ব
#লেখিকা_সাদিয়া_জান্নাত_সর্মি
টানা এক ঘন্টা কাজ করার পর ভাতের প্লেট নিয়ে খেতে বসেছিলাম কিন্তু খাওয়া আর হলো না। এক লোকমা মুখে দেওয়ার আগেই মা এসে প্লেট টা টান দিয়ে আমার সামনে থেকে নিয়ে নিলেন।রাগি গলায় বললেন,
খেতে যে বসেছিস, রান্না ঘরে যে কতগুলো পড়ে আছে সে কাজ গুলো কে করবে?যা গিয়ে আগে কাজ গুলো কর, নাহলে তোর এখনের খাবার তো বন্ধই সাথে রাতের খাবার ও বন্ধ।যা, বলে আমাকেকে একটা ধাক্কা দিলো মা। আমি নিজের চোখ মুছে চুপচাপ রান্না ঘরে চলে এলাম। রান্না ঘরে এসে কাঁদতে লাগলাম আমি। নিজের মা হয়ে কেন এত খারাপ ব্যবহার করে আমার সাথে। বাসায় তো আরো অনেকে আছে,কই তাদের সাথে তো মা এতো খারাপ ব্যবহার করে না।বড় চাচ্চুর মেয়ে আফিয়া কে মা কত আদর করে, তাহলে নিজের মেয়ের সাথে এমন কেন করে।ছেলে হয়ে না জন্মে মেয়ে হয়ে জন্মানো কি দোষ?আজ বাবা যদি থাকতো এখানে তাহলে হয়তো মা এমন করতে পারতো না। আমি কাঁদছি আর এসব ভাবছি, তখন মা রান্না ঘরে এলেন। এসে দেখেন আমি কোন কাজ না করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছি। উনি আমার কাছে এসে চুলের মুঠি ধরে বললেন,কাজ না করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নাটক করিস? চুপচাপ কাজে গুলো কর নাহলে আজকে তোর রেহাই নেই। আমি মায়ের হাত থেকে চুলগুলো ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বললাম,
করতেছি তো মা,চুল গুলো ছেড়ে দাওনা লাগছে খুব আমার।
লাগে লাগুক,কাজ না করে নাটক করিস কেন? তোকে কতবার বলেছি আমাকে তুই মা বলে ডাকবি না,তোর মুখ থেকে মা ডাক শুনতে আমার ঘৃণা করে।বল আর কখনো আমাকে মা বলে ডাকবি তুই?
তুমি আমার মা, তাহলে তোমাকে মা বলে ডাকবো না তো কাকে মা বলে ডাকবো আমি?
মা প্রায় চিৎকার করে বললেন, তুই মা বলে ডাকবি না আমাকে। তোকে জন্ম দিয়ে আমি পাপ করেছি সেই পাপের বোঝা আমি আর টানতে চাই না। তুই একটা কথা ভালো করে শুনে রাখ আমি তোর মা নই,বুঝেছিস?
বলে মা চুল গুলো ছেড়ে দিলেন। আমি চোখ মুছে আস্তে আস্তে বললাম,
হ্যা বুঝেছি, তোমাকে আর কখনো মা বলে ডাকবো না।
মা আমার কথা শুনে বললেন, এখন চুপচাপ কাজ কর নাহলে খাওয়া বন্ধ।আর আজ আমার বোনের বড় মেয়ে সোহানী আসবে,ওর জন্য ভালো কিছু রান্না কর তাড়াতাড়ি। নাহলে,,
বুঝে গেছি আমি,আর বলতে হবে না আমাকে।
মা একবার আমার দিকে তাকিয়ে চলে গেলেন। আমি চোখ মুছে কাজ করতে লাগলাম, সকাল থেকে কিছু না খাওয়ার জন্য খিদে পেয়েছে খুব কিন্তু কপাল গুনে খেতে পারলাম না আমি।থালা বাটি তাড়াতাড়ি করে ধুয়ে রান্না ঘরটা পরিষ্কার করলাম,তার পর রাইস কুকারে ভাত রান্না বসিয়ে দিলাম।ভাত প্রায় হয়ে এসেছে তখন আফিয়া রান্না ঘরে এলো। এসে দেখে আমি ভাত বসিয়ে তরকারি কাটছি, এটা দেখে আফিয়া রেগে গেল।
নুর, তুই তো খেতে বসেছিলি, তাহলে রান্না ঘরে কি করছিস?আন্টি কি আবার কিছু বলেছে তোকে?
নাহ, উনি আমাকে কি বলবেন আবার, রান্না ঘরে কত গুলো কাজ পড়ে ছিল তাই কাজ গুলো করে নিচ্ছি, পড়ে খাবো আমি।
নুর, তুই আর যার সাথে মিথ্যা কথা বলবি বল কিন্তু আমার সাথে অন্তত মিথ্যে বলিস না প্লিজ। আমি স্পষ্ট দেখেছি আন্টিকে একটু আগে এখান থেকে বেরিয়ে যেতে। উনি আবার তোকে মেরেছেন তাই না?
আফিয়ার কথা শুনে আমি চুপ করে রইলাম। আমার চুপ থাকা দেখে আফিয়া আমার হাত ধরে টানতে টানতে রান্না ঘর থেকে বাইরে নিয়ে এলো। আমি হাজার চেষ্টা করেও হাত ছাড়াতে পারলাম না।
আফিয়া কি করছিস তুই?দেখ অনেক কাজ পড়ে আছে সেগুলো করতে হবে নাহলে আমার কপালে খাওয়া জুটবে না আজ। তার উপর সোহানী আসবে আজ, তার জন্য রান্না করতে হবে আমাকে।
কেন রে? তুই কি ওই সোহানীর চাকর নাকি যে সে আসবে বলে তোকেই রান্না করতে হবে। বাসায় আরো অনেক কাজের লোক আছে তারা রান্না করতে পারবে আন্টির বোনের মেয়ের জন্য।আর আফিয়া থাকতে তুই খাওয়ার কথা চিন্তা করছিস কেন?তুই এখন আমার সাথে চল।
কোথায় নিয়ে যাবি আমাকে?
রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাবো। আমি জানি আন্টি প্রতিদিনের মত আজও তোকে খেতে দেয়নি,কাজ করতে লাগিয়ে দিয়েছে।তাই তুই এখন আমার সাথে যাবি, একটা কথাও বলবি না আর।
আমি আফিয়া কে আর কিছু বললাম না। খিদে পেয়েছে আমাকে খেতে হবে। বাসায় আজ খাবার পাবো না আমি, মা নামধারী মহিলা টি আমাকে খেতে দেবেন না উল্টে মারবেন। তার চেয়ে ভালো আফিয়ার সাথেই যাই।ও বাসায় সবাই আমাকে আদর করে এক মাত্র মা মানে সাথি আহমেদ ছাড়া। বাসার আর সবার জন্যই মনে হয় আমি এখনো বেচে আছি না হলে ওনার অত্যাচারে কবেই মরে যেতাম। ঠিক মতো পড়াশোনা টাও করতে দেয়না আমাকে। লোকাল কলেজে পড়ি আমি।মাসে চার থেকে পাঁচ দিন কলেজে যেতে পারি তার পরেও মা’র খেতে হয়।কবে যে মা আমাকে একটু ভালো বাসবে,, মা শুধু আমাকেই সহ্য করতে পারে না বাকি সবার সাথে তিনি কতো ভালো। চাচির কাছে শুনেছি আমার জন্মের দুই মাস পর বাবা-মায়ের ঝগড়া হয় আর বাবা রাগ করে বাসা থেকে চলে যান।যদি আজ বাবা থাকতো মা এরকম আমার সাথে কখনো করতে পারতো না। আমি এসব ভাবছি তখন আফিয়া আমাকে হালকা ধাক্কা দিলো,,
কি ব্যাপার কোথায় হারিয়ে গেলি? গাড়ি থেকে নাম চলে এসেছি আমরা।
ওহ্ হ্যা আমরা চলে এসেছি।
আমি গাড়ি থেকে নামলাম,আফিয়াও নেমেছে। সামনে তাকিয়ে দেখি অনেক বড় একটা রেস্টুরেন্টের সামনে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। অবাক হয়ে গেলাম আমি, আফিয়া কে জিজ্ঞেস করলাম,
আমরা এটা কোথায় এসেছি আফি?
কেন রেস্টুরেন্টে।
সেটা তো জানি আমি কিন্তু এতো বড় রেস্টুরেন্টে কেন? এখানে খেতে তো অনেক টাকা লাগবে। আমার কাছে তো কোন টাকা নেই।
চুপ কর তুই। তোকে টাকার কথা কে চিন্তা করতে বলেছে? টাকা যা লাগবে আমি দেবো, ভেতরে চল।
আফি আর আমি ভিতরে ঢুকলাম,কি সুন্দর ভিতর টা। একটা টেবিলে বসলাম আমরা। বসার পরপরই আফি বললো তুই একটু বস আমি গাড়ি লক করতে ভুলে গেছি,লক করে আসছি।আফি যাওয়ার পর আমি চারপাশ থেকে হাসাহাসির শব্দ শুনতে পেলাম। তাকিয়ে দেখি সবাই আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। আমাদের পাশের টেবিলের একটা মেয়ে বললো,
আজকাল তো কাজের লোকেরাও ফাইভ স্টার রেস্টুরেন্টে খেতে চলে আসে। কিন্তু এখানে খাওয়ার জন্য এতো টাকা পেল কোথায়?
ওর কথা শুনে পাশের মেয়েটা বললো,
বুঝিস না কোথা থেকে হয়তো টাকা চুরি করে নিয়ে চলে এসেছে তাই ফাইভ স্টার রেস্টুরেন্টে খেতে চলে এসেছে। না হলে টাকা পাবে কোথায় আর।
ওদের কথা গুলো শুনে চোখ থেকে আপনা আপনি পানি গড়িয়ে পড়লো।
(চলবে…….. কি)
(আসসালামুয়ালাইকুম। ভুল ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন)