ভালোবাসি তারে পর্ব-০১

0
10070

ভালোবাসি তারে
ঈশানুর তাসমিয়া মীরা
সূচনা পর্ব

মোটামোটি গ্রাম এলাকা। জমিদার বাড়ির ছোট মেয়েকে টিউশন পড়ায় ঝুম। এখন সেখানেই যাচ্ছে সে। আধ-পাঁকা রাস্তার একপাশে হাঁটছিল তখনই একটা গাড়ি এসে থামে তার পাশে। জানালার কাঁচ গলিয়ে মিষ্টি স্বরে কেউ বলে,
— “উঠে পড়ুন ম্যাম। আমরা বাড়িতেই যাচ্ছি। এটা আমার ভাইয়ার গাড়ি।”

ঝুম পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখে নিধা। যাকে সে টিউশন পড়ায়। ঝুমের জবাব না পেয়ে নিধা আবারো বলে,
— “আসুন না ম্যাম। আমার আর ভাইয়ার ভালো লাগবে।”

ঝুম হকচকিয়ে গেল। নিধার ভাইয়ার ভালো লাগবে মানে? কিন্তু প্রশ্নটা দমিয়ে গেল ঝুম। হালকা হেসে বলল,
— “লাগবে না, নিধা। আর একটুই তো পথ। হেঁটে যেতে পারবো।”

নিধা জোড় গলায় বলল,
— “ম্যাম? একসাথে গেলে কি সমস্যা? চলুন না।”

এতবার অনুরোধ করায় আর ফেরাতে পারলো না ঝুম। পেছনের সীটে বসে পড়ল। ড্রাইভিং সীটে একজন যুবক বসে আছেন। সম্ভবত নিধার বড় ভাই। আর তার পাশে নিধা বসে। গাড়ি চলতে শুরু করল। নিধা একদম ঝুমের দিকে ঘুরে বসল এবার। নিজ থেকেই বলতে শুরু করল,
— “জানেন ম্যাম, আজকেই ভাইয়া এসেছে এখানে। এসেই আমাকে নিয়ে এদিকে-ওদিকে ঘুরলো। আপনি আমাকে পড়াতে আসবেন বলেই বাড়িতে তাড়াতাড়ি ফিরছিলাম। আর দেখুন, আপনার সাথেই দেখা হয়ে গেলো।”

বলে খিলখিল করে হেসে উঠল নিধা। মেয়েটা বড্ড চঞ্চল। ঝুমও হালকা হাসলো। আড়চোখে গাড়ির আয়নায় একবার তাকিয়ে নিধার ভাইকে দেখার চেষ্টা করল। ব্যর্থ হলো। ফর্সা গাল, চিবুক আর চুল ছাড়া কিছুই দেখতে পারছে না সে। নিধা কিছুক্ষণ চুপ থেকে তার ভাইকে বলল,
— “ভাইয়ু? ম্যামকে হ্যালো বলবে না?”

সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলো না নিধার ভাই। ধীরে সুস্থে ড্রাইভ করতে করতে বলল,
— “আসসালামু আলাইকুম।”
কেমন ভাড়ি শোনালো কণ্ঠটা। একবার পেছনে ফিরে তাকালোও না।

হঠাৎ কথায় ঝুম অপ্রস্তুত হয়ে পরল। পরপরই দ্রুত বলে উঠল,
— “ওয়ালাইকুম আসসালাম।”

শুনে নিধা খিলখিল করে আবারো হাসলো। বলল,
— “ভাইয়ু, ম্যাম তো তোমার নামই জানে না। তুমি তাকে বলবে না?”

এবার আর উত্তর দিলো না নিধার ভাই। ঝুম কান খাড়া করে রেখেছে তার নাম শোনার জন্য। উত্তর না পেয়ে আশাহত হলো সে। নিধা বলে উঠল এবার,
— “আচ্ছা থাক! বলতে হবে না। আমিই বলছি। আমার ভাইয়ের নাম নিঝুম শেখ। সুন্দর না? আপনার নামের সাথে কিন্তু বেশ মিলে ম্যাম। ঝুম-নিঝুম।”

ঝুম অবাক হয়। আসলেই তো। সম্পূর্ণ অচেনা মানুষের সাথে কি সুন্দর তার নাম মিলে গেল। ব্যাপারটা অদ্ভুদ হলেও সুন্দর মনে হলো ঝুমের। আবারো সামনের যুবকটির দিকে তাকানোর চেষ্টা করল সে। আধোভাবে দেখতেও পেলো মুখের কিছুটা অংশ। তবে অস্পষ্ট। মুখে কেমন গম্ভীর, শান্ত ভাব এঁটে রেখেছে। নাম মিলে যাওয়ায় এত উত্তেজিত হচ্ছে না ঝুমের মতো। হয়তো ঝুমই একটু বেশি বাড়াবাড়ি করছে। তার আছে সব আলতু-ফালতু ভাবনা!

গাড়ি জমিদার বাড়ির সামনে এসে থামলো। দারোয়ান বিরাট বড় গেট খুলতেই ভেতরে প্রবেশ করলো গাড়িটি। একসাইডে গাড়ি থামানোর সাথে সাথে নিধা দৌঁড়ে চলে গেল বাড়ির ভেতরে। রয়ে গেল শুধু ঝুম এবং নিঝুম। পরপরই সীট বেল্ট খুলে নিঝুমও বেরিয়ে পরল। ঝুম কিছু একটার ঘোরের মাঝে ছিল। গাড়ি থেকে নামার বিষয়টা খেয়াল ছিল না। হঠাৎ ভাড়ি কণ্ঠে চমকে উঠল ঝুম,
— “নামুন।”

সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি থেকে নেমে পরল ঝুম। নিঝুমের সামনে দাঁড়িয়ে অপ্রস্তুত হাসলো। এতে অবশ্যক নিঝুমের ভাবগতি পাল্টালো না। সে তার মতোই গম্ভীর, শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে। ঝুমের এবার নিজেকে কেমন বোকা মনে হলো। সে দ্রুত পায়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেল।

_______________________

আট বছরের বাচ্চা হলেও নিধা একটু বেশিই মেধাবী। একটা কিছু বুঝিয়ে দিলে চট করে বুঝে নেয় সে। স্পষ্ট ভাবে কথা বলতে পারে। অংকের প্রতি বেশ জোঁক তার। পড়তে বসলে প্রথমে অংক করবেই করবে নিধা। সে অনুযায়ী ঝুমও অংকই করাচ্ছে নিধাকে। হঠাৎ কি মনে করে ঝুম বলল,
— “আচ্ছা নিধা? তোমার ভাই কি এখন থেকে এখানেই থাকবেন?”

অংক করতে করতে নিধার জবাব,
— “হ্যাঁ! ভাইয়ু তো বলেছে থাকবে।”
— “ওহ্।”

ঝুম আর প্রশ্ন করলো। প্রশ্ন করাটা কেমন বেহায়াপনা মনে হলো ঝুমের কাছে। কিছুক্ষণ পর নিধা নিজ থেকেই বলা শুরু করল,
— “ভাইয়ু এতদিন শহরে ছিল। সেখান থেকে ডাক্তারি পাস করে বেরুলো… আমার ভাইয়ু অনেক হ্যান্ডসাম, তাই না ম্যাম?”

এ প্রশ্নের কি জবাব দেবে ঝুম? মুখ থেকে ‘রা’ চলে গেল যেন। শুধু চোখ বড় বড় করে নিধার দিকে তাকিয়ে রইলো ঝুম। এতেই নিধার অবস্থা শেষ। এমনি দুষ্টুমি করলেও ঝুমকে সে প্রচন্ড ভয় পায়। এবং ভালোওবাসে। গুরুজনদের সম্মান করার শিক্ষাটাও নিধার মাঝে আছে। তাই আর কথা বাড়ালো না নিধা। চুপচাপ অংক করতে লাগলো।

নিধাকে পড়াতে পড়াতে বিকেল শেষ হয়ে এলো প্রায়। গ্রাম এলাকা হলেও শহরের কিছু প্রভাব আছে এ গ্রামে। সেই জন্যই তো ঝুম এমন ভাবে টিউশন পড়াতে পারছে। তবে বেশি রাত করে ফেরাও কেউ ভালো চোখে দেখে না। তাই ব্যাগ গোঁছাতে গোঁছাতে দ্রুত জমিদার বাড়ি থেকে বের হচ্ছিল সে। পথিমধ্যে হঠাৎ পেছন থেকে সেই ভাড়ি কণ্ঠ শোনা গেল,
— “মিস! আপনি আপনার কলম ফেলে যাচ্ছেন।”

ঝুমের পা থেমে যায়। পেছনে ফিরে তাকায় সে। তার ঠিক দু’হাত দূরত্বে নিঝুম কলম হাতে দাঁড়িয়ে আছে। ধীর পায়ে নিঝুমের দিকে এগিয়ে গেল ঝুম। নিঝুম কলম এগিয়ে দিতেই সেটা নিয়ে নিলো। মুচকি হেসে বলল,
— “ধন্যবাদ।”

নিঝুম ভ্রু কুঁচকায়। শক্ত গলায় বলে,
— “ধন্যবাদ বলার কিছু হয় নি। নিজের জিনিস সামলে রাখতে শিখুন।”

ওমনি ঝুমের মেজাজ বিগড়ে গেল। রাগ হতে লাগলো। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
— “আপনার কি মনে হয়, আমি জিনিস সামলাতে পারি না?”
— “জ্বী। ঠিক শুনেছেন।”

রাগ আরো বেড়ে গেল ঝুমের। কাঠকাঠ কণ্ঠে বলল,
— “আপনি আমাকে অপমান করছেন কেন? জমিদারের ছেলে বলে যা ইচ্ছে বলবেন?”

নিঝুম ভ্রু উঁচিয়ে তাকালো এবার। সে কখন অপমান করল? করেছে কি? উহু! মনে পড়ছে না নিঝুমের। তাছাড়া অযথা কথা বলতেও ভালো লাগছে না তার। সুতরাং, কিছু না বলেই পেছন ফিরে চলে গেল নিঝুম। ঝুম হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে নিঝুম চলে গেল? এতটা অসম্মান? কত না ভদ্র ভেবেছিল ঝুম নিঝুমকে। কিন্তু হলো কি? আস্ত অভদ্র বের হলো নিঝুম। নূন্যতম মেনার্স নেই। ঝুমের ইচ্ছে করলো চেঁচিয়ে কিছু কথা শুনিয়ে দিতে নিঝুমকে। তবে পারলো না। জমিদারের ছেলেকে কিছু বললে তো পুরো গ্রামের মানুষ ধোলাই দেবে তাকে। অতএব, কথা না বাড়িয়ে রাগে কটমট করতে করতে জমিদার বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এলো ঝুম।

________________

চলবে…