ভালোবাসি প্রিয় পর্ব-৩৩+৩৪

0
570

#ভালোবাসি_প্রিয়
(রিপোস্ট)
পর্ব_৩৩
©জারিন তামান্না

বেলা ৩ টায় বিয়ে পড়ানোর কথা।এখন বাজে বেলা ৩:৪৭ মিনিট। অথচ বিয়ের বর, কনে দুজনেই গায়েব। বিয়ে বাড়িতে রীতিমত চাপা গুঞ্জন চলছে বর বউ দুজনেরই একসাথে গায়েব হওয়ায়। আমজাদ আলী, ইশতিয়াক আলম, রুকু,দিহান,নিশাত, নাজিয়া অনবরত কল করে যাচ্ছে তাদের নাম্বারে। সিফাতের ফোনে রিং হলেও তা রিসিভ হচ্ছে না আর পলকের ফোন সুইচড অফ বলছে। চিন্তায় সবাই অস্থির হয়ে উঠেছে। কিন্তু, কে কোথায় আছে সেটা জানার কোন উপায় নেই। বিথি তিয়ানকে খুঁজছে, কিন্তু তাকেও পাওয়া যাচ্ছে না। সে আবার কিছু ভুলভাল করলো কিনা সেটাও বুঝতে পারছে না সে। তারও মাথা গরম সব মিলিয়ে। নোরাকে কোলে নিয়ে সারা ঘরময় পায়চারী করছে সে।

বিকেল ৪:৩০ মিনিট।

বাড়ির সদর দরজায় এসে দাঁড়ালো চারজন মানুষ। সিফাত,পলক তিয়ান আর অন্তরা। বড্ড কাহিল লাগছে অন্তরাকে। সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা সে। পলক তাকে ধরে রেখেছে একপাশ থেকে। এত বছর পর অন্তরাকে দেখে পলকের পরিবার আত্মীয়স্বজন সবার অবস্থা বিস্ময়ে হতবিহ্বল। আমজাদ আলী ঠিক কি বলবেন জানা নেই তার। আজকের এমন একটা দিনে অন্তরা আবার এসে তার সামনে দাঁড়িয়েছে। সবথেকে বেশি অবাক হলেন পলক, সিফাত আর তিয়ানকে অন্তরার সাথে দেখে। ব্যাপারটা ঠিক কি সেটা বুঝে ওঠার আগেই সিফাত আমজাদ আলীকে উদ্দেশ্য করে বললো,
_বাবা, আগে ঘরে চলুন প্লিজ। পরে বলছি সব।
_মৃণ্ময়ী, আপুকে নিয়ে আসুন।
_জ্বী। বলেই অন্তরাকে নিয়ে গেল নীচের একটা গেস্টরুমে।
আর তাদের পিছু পিছু গেল পলকের পুরো পরিবার,চাচা চাচী আর মামা-মামী। সিফাত তার পরিবারের কাউকে ঘরে যেতে নিষেধ করায়,তারা সবাই বাইরেই অপেক্ষায় রইলো।

____________________________________

_তুমি এখানে কি করছো অন্তরা? গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলেন আমজাদ আলী।
_আপাকে আমি নিয়ে এসেছি বাবা। অন্তরার পাশে বসে পলক বললো।
_তুমি নিয়ে এসেছো সেটা তো সবাই দেখেছি আমরা, কিন্তু ও এখানে কেন? আর তুমিই বা কোথায় গিয়েছিলে? আজ তোমার বিয়ে ভুলে গেছো সেটা? শেষ কথাগুলো বেশ ধমকের স্বরে বললেন আমজাদ আলী।তার এহেন প্রতিক্রিয়ায় কেঁপে উঠলো পলক,অন্তরা আর শাহনাজ বানু।অন্তরা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে যাচ্ছে।
_বাবা,প্লিজ আপনি হাইপার হবেন না। ডক্টর আপনাকে স্ট্রেসড নিতে নিষেধ করেছে। -সিফাত বললো।
_তুমি বুঝতেছো না বাবা…এই মেয়েটা এখানে কেন এসেছে সেটা জানতে হবে আমাকে। ওর জন্য কম কিছু সহ্য করতে হয়নাই আমাদের। পলকের জীবনটাও শেষ করে দিতে গিয়েছিলাম আমি। আমার ছেলেটা আলাদা হয়ে গেল ওর জন্য। আজ পলকের বিয়ে ছিল আর সে বাড়ি থেকে উধাও। তাও এই মেয়েটার জন্য। তাও তুমি আমাকে শান্ত থাকতে বলতেছো? বেশ উত্তেজিত হয়ে বললেন আমজাদ আলী।
_বাড়িতে কিন্তু আমিও ছিলাম না বাবা! আপনি একা মৃন্ময়ীকে দোষারোপ করতে পারেন না। আপনি বসুন এখানে আমি আপনাকে বলছি সব। বসুন আপনি।-বলেই তাকে একটা চেয়ার এগিয়ে দিল সিফাত।

সিফাতের কথায় চেয়ারে গিয়ে বসলেন তিনি।তারপর সিফাত বলতে শুরু করলো।
_আপু লাস্ট ১’৫ মাস ধরেই মৃন্ময়ীর কন্টাক্টে ছিলেন।আপনি যখন হাসপিটালে এডিমিট ছিলেন তখনই প্রথম মৃন্ময়ীর সাথে দেখা হয় উনার। চেকআপে গিয়েছিলেন উনি।তারপর যখন মৃন্ময়ী সবটা জানলো তারপর থেকেই তারা যোগাযোগে ছিল। আর আমি উনার ব্যাপারে জানতে পারি লাস্ট ১৭ দিন যাবৎ। তারপর থেকেই উনি আমার গুলশানের ফ্ল্যাটে ছিলেন। আজ উনার প্রচন্ডরকম পেইন হওয়ায় ইমার্জেন্সিতে উনাকে হসপিটালে এডিমিট করা হয়। সেখানেই গিয়েছিলেন মৃন্ময়ী। আর উনার সাথে গিয়েছিলাম আমি আর তিয়ানও।কারণ, উনার পেইন হওয়ার খবরটা আমরা দুজনেই পেয়েছিলাম নিজেদের ফোনকলে।ডক্টর বলেছেন উনার এখন পর্যাপ্ত যত্ন আর মেন্টাল সাপোর্ট প্রয়োজন। আর এসবের জন্য উনার নিজের পরিবারের চাইতে থেকে ভালো আর কি হতে পারে! এই জন্যই আজ উনাকে এখানে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেই আমরা।
_আমি ওকে আমার বাড়িতে জায়গা দিবো না সিফাত। আমার জন্য ও মৃত!
_ভুল তো সবাই করে বাবা! আর ভুল শোধরানোর একটু সুযোগ সবারই প্রাপ্য। -সিফাত বললো।
_ও যেটা করেছে সেটা কোন ভুল ছিল না সিফাত। বিশ্বাসঘাতকতা ছিল। কম হেনস্তা হতে হয়নি আমাদের ওর জন্য!
_কিন্তু,এর পেছনে কারণ তো তুমিই ছিলে, বাবা। তোমার জেদের কারণে আপা বাধ্য হয়েছিল বাড়ি ছেড়ে পালাতে।আপা যখন বলেছিল সে নিলয় ভাইকে ভালোবাসে তাহলে কেন মেনে নাওনি তুমি সেটা? কম তো আকুতি মিনতি করেনি সে তোমার কাছে। তোমার সবচেয়ে কাছের প্রিয় মেয়েও তো আপাই ছিল সবসময়। সব আবদার মেনেছো তার। তাহলে শুধুমাত্র নিলয় ভাইয়ার কোন পরিবার নেই বলে কেন মেনে নাওনি তাকে তুমি? এতক্ষণ চুপচাপ সিফাত আর আমজাদ আলীর কথোপকথন শুনছিল পলক সহ ঘরে উপস্থিত সকলেই। কিন্তু আমজাদ আলীর এহেন কথায় আর চুপ থাকতে পারেনি পলক। একপ্রকার চেঁচিয়েই বললো কথাগুলি।
_ তুমি যেটা জানো না সেটা নিয়ে কথা বলো না পলক! গম্ভীর গলায় বললেন আমজাদ আলী।
_আচ্ছা,,বেশ! নাই জানলাম আমি কিছু। ওটা নিয়েও কিছু নাই বললাম আমি। তুমি শুধু এটুকু বলো আপা যখন তোমার কাছে এসেছিল,,ক্ষমা চেয়েছিল কেন ফিরিয়ে দিয়েছিলে তুমি? এটা জেনেও কেন ফিরিয়ে দিয়েছিলে যে আপার গর্ভে নিলয় ভাইয়ার সন্তান আর ভাইয়া.. বেশ উত্তেজিত স্বরেকথা বলছিল আজ পলক। কিন্তু শেষের এটুকু বলতেই ঝরঝর করে কেঁদে দিল পলক।অন্তরাও এবার ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো। ঘরে উপস্থিত সবাই হতবাক। কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছে না তারা। তবুও কেবল আমজাদ আলী ঘরে উপস্থিত থাকায় চুপ করে আছে সবাই। কিন্তু শাহনাজ বানু এবার আর চুপ থাকতে পারলেন না। ভয়ার্তক কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,নিলয়.. কি সাজি??
পলক কাঁদছে। কান্নার দমকে কিছুই বলতে পারছে না। তাই সিফাতই বললো,
_৪ মাস আগে একটা রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছে নিলয় ভাইয়া। যেহেতু নিলয় ভাইয়ার কোন পরিবার ছিল না,,আপুকে নিয়ে তিনি আলাদা বাসা ভাড়া করে থাকতেন। তাই এত কিছু ঘটে যাওয়ার পরে ওখানে একা থাকাও বেশ কঠিন হয়ে উঠেছিল আপুর জন্য। বাধ্যহয়ে আপু বাবার সাথে যোগাযোগ করেছিলেন। বলেছিলেন তাকে সব কিন্তু বাবা তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। একটুকু বলা শেষ করেই ছোট একটা শ্বাস ফেললো সিফাত।এত সব শুনে সবাই বিস্ময়ে হতবিহ্বল। শাহনাজ বানু অন্তরার মাথাটা নিজের বুকে চেপে ধরে কেঁদে যাচ্ছেন। তার স্বামীর রাগ জেদ সম্পর্কে তিনি অবগত। ৩৩ বছরের সংসারে আজও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি তিনি নিজের স্বামীকে। কিন্তু,তাই বলে এতটা নিষ্ঠুর তিনি হবেন নিজের সন্তানের প্রতি এটা তিনিও মানতে পারছেন না।
_বাবা, তুমি সত্যিই করেছো এমন? হতবাক স্বরে জিজ্ঞেস করলো পলাশ।
_হ্যাঁ,,করেছি। যে মেয়ে আমার ২৪ বছরের আদর স্নেহ পায়ে ঠেলে এভাবে আমাকে সবার কাছে অপদস্থ করে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে পারে তার জন্য এটাই ঠিক আছে।
_এতটা নিষ্ঠুর কেউ ক্যাম্নে হইতে পারে আব্বা? গমগমে স্বরে বললো নিশাত।
_সেসবের কৈফিয়ত আমি তোমাদের দেবো না নিশাত। ছোট তুমি! ছোটর মতই থাকো।
_আমি ছোট…বাকিটুকু বলার আগেই ওর হাত চেপে ধরে থামিয়ে দিল তিয়ান। কথার মাঝে বাঁধা প্রাপ্ত হয়ে নিশাত ওর দিকে তাকাতেই চোখের ইশারায় তাকে চুপ থাকতে বললো সে। নিশাতও বাধ্য মেয়ের মত চুপ করে তার কথায়।
_বাবা,,মানুষ ভুল করে।কিন্তু ভুলের পরে একটা সুযোগ কিন্তু সবারই প্রাপ্য সেটা শোধরানোর জন্য। বড় আপু যে ভুল করেছিল সেটার কারণ কিন্তু একভাবে আপনিই ছিলেন। শান্তস্বরে বললো সিফাত।
_আমি ওকে আমার বাসায় জায়গা দিবো না সিফাত। তুমি দয়া করে এই নিয়ে আর কিছু বলতে এসো না।
_এটাই তোমার শেষ সিদ্ধান্ত বাবা?গম্ভীর স্বরে বললো পলক।
_হ্যাঁ। এখন যাও,,বিয়ের জন্য প্রস্তুত হও।সবাই অপেক্ষা করছে বাইরে।
_কাউকে অপেক্ষা করতে হবে না। চলে যেতে বলো তাদের।
_মানে?
_তুমি যদি আপাকে মেনে না নাও,তাহলে আমিও করবো না এই বিয়ে। আপাকে নিয়ে চলে যাবো তোমার বাড়ি ছেড়ে।
_এইই সাজি! না।কি.. কি..ইই বলতেছিস তুই এগুলা? এমনিতেই আমার কারণে বাবাকে একবার এতকিছু ফেইস করতে হইছে এখন আবার তোর জন্যও যদি.. আতঙ্কিত স্বরে বললো অন্তরা।
_তুই চুপ থাক আপা। মানুষের জেদ তাকে কতটা নিষ্ঠুর করে দিতে পারে আমিও দেখবো আজকে। পলকের কন্ঠে রাগ জেদ স্পষ্ট।
_পলক!! কি আজেবাজে কথা বলতেছো তুমি? বিয়ে কোন ছেলেখেলা নাকি ? যাও তৈরী হও।- ধমকে উঠলে আমজাদ আলী।
_ছেলেখেলা না হলে এত বছর পরেও কেন মেনে নিতে পারছো না তুমি আপাকে? নিলয় ভাইয়ার সাথেও তো বিয়ে হইছিল ওর। তার সন্তানের মা হবে ক’দিন পরে। তাহলে তুমি কেন মানোনি এই বিয়ে?
_ এমন অকৃতজ্ঞ মেয়েকে আমি কখনোই মানবো না।
_তাহলে আমিও করবো না এই বিয়ে।
_সিফাতের পুরো পরিবার বাইরে অপেক্ষা করছে পলক। তামাশা করবা না কোন তুমি আজকে। -কঠিন গলায় বললেন আমজাদ আলী।
_মৃন্ময়ী না চাইলে আমিও করবো না এই বিয়ে। বাকিটা আপনার উপর,বাবা। আপনি কি করবেন তার উপর নির্ভর করবে সবটা।
_সিফাত…দেখো বাবা! তুমি এর মাঝে এসো না। এটা আমাদের পারিবারিক ব্যাপার,তুমি..
_আমি কি তবে এই পরিবারের বাইরে বাবা? এতদিনে কি এই পরিবারের সাথে কোন সম্পর্ক তৈরী হয়নি আমার?

সিফাতের এহেন কথা শুনে চুপ হয়ে গেলেন আমাজাদ আলী। তাকে চুপ থাকতে দেখে সিফাত এগিয়ে এসে হাঁটু গেড়ে বসলো তার সামনে। সিফাতকে এভাবে দেখে চকালেন তিনি। সিফাতকে বাঁধা দেওয়ার আগেই বড্ড শান্ত সহজ স্বরে সিফাত বললো,
_মৃন্ময়ীর কাছে শুনেছি আপু আপনার খুব কাছের ছিল। তার সব আবদার আপনি অনায়াসে মেনেছেন, প্রশ্রয় দিয়েছেন সবসময়। অথচ, সেই মেয়েটাই যখন আপনাকে ভরসা করে নিজের মনের কথাটা বললো আপনি নিজের জেদের কারণে সেটা নাকোচ করলেন। তাই বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার কাজটা করতেও সে বাধ্য হয়েছিল।শুনেছি,বাবা মাকে কষ্ট দিয়ে কোন সন্তান সুখী হয় না কখনো। আপুও পারেনি পুরোপুরি সুখী হতে। নিলয় ভাইয়াকে সে হারিয়েছে।একলা হয়ে গেছে। কিন্তু, সেও তো মা হতে চলেছে। নিজের সন্তানের জন্য একটা পরিবারের আশ্রয় পেতেই সে বাধ্য হয়ে আপনার দোরগোড়ায় ফিরে গিয়েছিল। আর আপনি আপনার রাগ জেদের কারণে এই অবস্থাতেও ফিরিয়ে দিয়েছেন তাকে। বাবা মা কি এতটাও নিষ্ঠুর হয় কখনো, বাবা? আপনি প্লিজ আরেকটা সুযোগ দিন আপুকে। তার এই অনাগত সন্তানটাকে একটা নিরাপদ আশ্রয় দিন।একটা পরিবার দিন। এটা পাওয়াটাও বাচ্চাটার অধিকার,বাবা। এই অধিকার ক্ষুণ্ণ করবেন না প্লিজ।

আমজাদ আলীর চোখ টলমল করছে। হাজার হলেও তিনিও একজন বাবা। বাবা মা সন্তাকে তাদের সবটা উজার করে দিয়ে ভালোবাসেন। স্নেহ মমতা দিয়ে বড় করেন।তাই সন্তানের থেকে পাওয়া সামান্য আঘাতও তাদের প্রচুর কষ্ট দেয়। অন্তরা তার সবচেয়ে প্রিয় মেয়ে ছিল।আর সেই মেয়েটাকে নিষেধ করার পরেও তার অবাধ্য হয়ে তাকে কষ্ট দিয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। এই কষ্টটাই তিনি সহ্য করতে পারেননি।তার রাগে জেদে এমন একটা অবস্থাতেও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি অন্তরাকে। কিন্তু এখন সিফাতের কথায় তিনি নিজের রাগ জেদের কারণে ঘটা ঘটনাগুলোর জন্যই অনুতপ্ত। কষ্ট হচ্ছে তার। কিন্তু,,তিনি বাইরে সেসবের কিছুই প্রকাশ করলেন না। কঠিন গলায় বললেন,
_পলাশের মা! পলককে বিয়ের জন্য তৈরী হতে বলো। আর বাকিরাও যার যার কাজে যাও। বিয়ে বাড়িতে অনেক মেহমান।তাদের দেখো। তারপর সিফাতকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
_বাবা তুমিও যাও। তৈরী হয়ে নাও। দুপুরে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। এখন প্রায় বিকাল শেষ। আর দেরি করো না। বলেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন। তারপর, দরজা খুলে বেরিয়ে যাওয়ার আগে পলককে বললেন,
_এই ভাবে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার দরকার নেই পলক। বিয়ে হচ্ছে,,শশুড় বাড়ি যাও। তুমি গেলে বাড়তি একজনের জায়গা এমনিতেই হয়ে যাবে। -বলেই তিনি বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।

ঘরে উপস্থিত সকলের মনেই খুশির ঝলক। সরাসরি কিছু না বললেও যে তিনি অন্তরাকে থাকতে দিতে রাজি হয়েছেন সেটা সবাই বুঝে গেল। নিশাত পলাশ নারাজ পলকের উপর। সব জেনেও তাদের কিছু না জানানোর জন্য।।তারপর একটু আগে কেমন নিয়ে করবেনা বলে জেদ ধরেছিল? সিফাত না থাকলে বোধয় খারাপ কিছু একটা সত্যিই ঘটে যেত আজ।

পলক কাঁদছে। খুশিতে কাঁদছে সে। কাঁদতে কাঁদতেই সিফাতের দিকে চাইলো সে। মুচকি হেসে সব ঠিক আছে বলে চোখের ইশারায় আশ্বস্ত করলো সে পলককে। পলকও চোখে জল মুখে হাসি নিয়ে কৃতজ্ঞতা জানালো তাকে। এই মানুষটাকেই সে চায়। খুব করে চায়। বাকি সারাটা জীবনের জন্য…প্রতিটা মূহুর্তের জন্য চায়। এই মানুষটাকে কষ্ট দেওয়া বা ঠকানো অসম্ভব তার জন্য। তাই এতদিন সাহস করে না বলা কথাটাও বিয়ের আগেই সে বলে দিতে চায় সিফাতকে। নিজের অতীতের সবটা বলেই সিফাতের হাত ধরে নতুন জীবনে পা রাখতে চায় সে। এখন একটা সুযোগ চাই শুধু তাকে সবটা বলার।

____________________________________

বর্তমান,

আয়নায় মুখ দেখার পর মিষ্টিমুখ করানো হয়েছে নতুন বর বউকে। এবারেও একজনের খাওয়া মিষ্টিটা আর একই গ্লাসের পানি খাওয়ানো হয়েছে তাদের দুজনকে।এতে নাকি স্বামী স্ত্রীর ভালোবাসা বাড়ে।
সব আচার অনুষ্ঠান শেষে ফার্ম হাউজের গার্ডেনে আয়োজন করা পার্টিতেও সামিল হলো সবাই। সেখানে নতুন বর বউকে অভিনন্দন আর শুভেচ্ছা জানালো সবাই।বিথি তো মহাখুশি। তার মনের ভয়টাও কেটে গেছে।তিয়ান, পলক আর সিফাত প্রত্যেকেই তার নিজ নিজ জায়গাটা পেয়েছে।তিয়ান তাকে বলেছে সবটা।পলকের সাথে,সিফাতের সাথে এ কদিন যা যা কথা হয়েছে তার সবটাই খুলে বলেছে। প্রথমে তিয়ানের উপর ভীষণ রকম রাগ হয়েছিল বিথির। কিন্তু,,সেও তো জানে তিয়ান কেমন আর পলককে সে কতটা ভালোবেসেছিল।আর আজও ভালোবাসে। তাছাড়া,,পলকের বোঝানার পর সে খুশি মনে সবটা মেনে নিয়েছে।নিজের কাজের জন্যও অনুতপ্ত সে। সে নিজেই বলেছে সিফাতই বেস্ট পলকের জন্য। আর তিয়ানের এই উপলব্ধিটাই বিথির সব রাগ উড়িয়ে নিয়ে গেছে নিমিষেই। তার এখন স্বস্তি লাগছে খুব। সম্পর্কগুলোও ভালো আছে। বরং আগের থেকেও বেশি স্ট্রং হয়ে গেছে।

একে একে যখন সবাই নতুন বিবাহিত জুটিকে অভিনন্দন জানাতে ব্যস্ত তখন স্টেজে উঠে এলো তিয়ানও। পলক কিছুই বলতে পারেনি সিফাতকে। বলার সুযোগই পায়নি বলা চলে। তার মনে কিছুটা খচখচে ভাব থাকলেও এত কিছুর মাঝে সেটাকে আর পাত্তা দেয়নি সে।সিফাতকে সে কষ্ট দিতে চায় না।আর কিছু কথা অন্তরালে থাকাই ভালো। তাই সবটা এখন ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিয়েছে সে।

তিয়ানকে দেখেই আলতো হাসলো সিফাত। বললো,
_Hey, Tiyan. কি অবস্থা?

সিফাতের এহেন প্রশ্নে একবার পলকের দিকে চাইলো সে। তারপর সিফাতের দিকে তাকিয়ে আলতো হেসে বললো,
_ভালোবাসি তো! তাই পলক যেটাতে খুশি সেটায় আমিও । বলেই এগিয়ে গিয়ে হাগ করলো সিফাতকে। তিয়ানের এমন কথায় খুব স্বস্তি পেল সিফাত। সত্যিই সে পলককে ভালোবাসে খুব। আর ভালোবাসে বলেই পলকের চাওয়াটাকে মন থেকে সম্মান করতে পেরেছে। মেনে নিয়েছে বাস্তবতাটাকে। তার মৃন্ময়ী ভাগ্যবতী বটে! বিথি আর তিয়ানের মত বন্ধু আছে তার জীবনে।যারা সর্বাবস্থায় তার ভালো চায়। সন্তুষ্টচিত্তে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তাকেও হাগ করলো সিফাত। সিফাত কে ছেড়ে পলকের কাছে এগিয়ে গেল তিয়ান। আলতো হেসে বললো,
_Congratulations Shamkonna.
_Thanks Tiyan. মৃদু হেসে বললো পলক। তারপর,পলকে দেখিয়ে সিফাতকে ইশারায় জিজ্ঞেস করলো সে একবার পলককে হাগ করতে পারে কিনা! সিফাত খুশি মনে চোখের ইশারায় তাকে অনুমতি দিল। অনুমতি পেয়েই আলতো করে জড়িয়ে ধরলো সে পলককে। তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,
_তোমার জন্য সিফাত ভাইয়ার থেকে পার্ফেক্ট আর কেউ হতো না পলক। কখনো কষ্ট দিও না তাকে।তুমি খুব খুব খুব সুখী হবে ইন শাহ আল্লাহ। বলেই পলককে ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো সে। মৃদু হেসে স্টেজ থেকে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই তার হাত টেনে ধরলো পলক। তিয়ান তার দিকে ফিরে চাইতেই খুব আদুরে স্বরে বললো পলক,
_তুমিও থাকবে তো আমার পাশে,,সারাজীবন?
_Always dear. বলেই আলতো করে তার গাল ছুঁয়ে দিল তিয়ান। পাশে দাঁড়িয়ে এই সবটাই দেখলো সিফাত। মনে মনে বললো,আলহামদুলিল্লাহ!

____________________________________

রাত ৯:৪৪ মিনিট।

পলককে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সিফাতদের ঢাকার বাড়িটাতে। কেঁদেকেটে একাকার অবস্থা পলকের। বিদায়ের সময় খুব কেঁদেছে সে।সিফাত বুঝিয়েছিল তাকে। এত কান্না কাটির কিছু নেই।এই পরিবারটা আজীবন তারই থাকবে।শুধু ঘর বদল হচ্ছে।নতুন একটা পরিবার পাচ্ছে সে। কিন্তু,পলক মানেনি। রুকুও সিফাতকে ধমকে চুপ করিয়ে দিয়েছে। বলেছে,তুই বুঝবিনা এই কষ্টটা। তারপর থেকে সিফাত কিছুই বলেনি আর।

আজ সারাদিনও কম কাঁদেনি মেয়েটা। বিয়েতে মেক আপ করবে না করবে না বলেও হালকা পাতলা মেক আপ তাকে করতেই হয়েছে। কারণ কেঁদেকেটে চেহারার হাল বেহাল করে ফেলেছিল সে। সিফাত এতক্ষণ কিছু না বললেও এবারে একরকম ফুঁসে উঠলো সে। চাপা রাগের স্বরে বললো,
_তোমাকে তো আমি বিয়ে করে নিয়ে যাচ্ছি মৃন্ময়ী। কিডন্যাপ করে নয়। এভাবে কান্না করছো কেন? এত কষ্ট কেন দিচ্ছো আমাকে?
সিফাতের এহেন ধাঁচের কথা শুনে চকিতেই কান্না থেমে গেল পলকের। ফ্যালফ্যাল করে কতক্ষণ সিফাতের দিকে চেয়ে থেকে হতবাক স্বরে প্রশ্ন করলো তাকে।
_আমার বিয়ে হয়েছে,,পরিবার আমি ছেঁড়ে এসেছি, কষ্ট হচ্ছে আমার..তাই কান্নাও আমি করছি ; এতে আপনি কষ্ট পাচ্ছেন কেন?
_কষ্ট পাচ্ছি কারণ আপনি আর আমি তো আলাদা নই এখন থেকে ! আমার অর্ধেক অস্তিত্বই তো এখন আপনার হয়ে গেছে। কেবলই আপনার। সিফাতের কন্ঠে অদ্ভুত ঘোর।আর চোখ জোড়ায় অপ্রতুল ভালোবাসা স্পষ্ট।
ওই চোখ জোড়ার দিকে কিছুসময় চেয়ে রইলো পলক। কান্না থামার পর ফুপাচ্ছিল পলক। এখন সেটাও থেমে গেছে তার। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলো না সে ওই গভীর দৃষ্টি পানে। দৃষ্টি সরিয়ে নিল সে।বাইরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো কেবল আপনমনেই।

____________________________________

আলম ম্যানশনের সুবিশাল গেট পেরিয়ে ঢুকলো সিফাত আর পলকের বিয়ের গাড়িটা। রাত এখন ১১:২০মিনিট। বেশ রাত হয়ে গেছে আসতে আসতে। বিয়ে ঠিক হওয়ার পর কখনো আসা হয়নি পলকের এ বাড়িতে। বিয়ের কার্ড দিতে বরপক্ষকে দাওয়াত করার সময় আমজাদ আলী,পলাশ,নিশাত, পলকের চাচা এসেছিলেন এই।বাড়িতে। নিশাত তাকে বলেছিল সিফতদের বাড়িটা বিশাল। রাতের অন্ধকারে বাইরের লন খুব একটা দেখা না গেলেও ঝলমলে আলোক সজ্জায় সজ্জিত বাড়িটা দেখে এর আয়তন বেশ আন্দাজ করা যাচ্ছে। পলক খুব একটা না বুঝলেও দেখলো যতটা দেখে যায়।

বাসার সদর দরজায় এসে গাড়ি থামার পর সিফাত নিজে পলকের হাত ধরে নামিয়েছে গাড়ি থেকে। নামানোর সময় বলেছে, আপনার একান্ত আপন নীড়ে আপনাকে স্বাগতম, মৃন্ময়ী!

খুব ধুমধাম করে বরণ করা হয়েছে পলককে। মিসেস.রেহনুমা, রেহানা, রুকু,রিহান আবিদ, দিহান, ইয়ানা, আলম ম্যানশনের কয়েকজন সার্ভেন্ট সবাই ছিল পলককে বরণ করার জন্য। কেবল সারা ও ইশতিয়াক আলম বাদে। গাড়ি থেকে নেমেই তারা যার যার মতো নিজের ঘরে চলে গেছে। বেশ রাত হয়ে যাওয়ায় বরণ শেষে টুকটাক আচার অনুষ্ঠান পালন করতে করতেই রাত ১২:৩০ টা বেজে গেছে। তারপর পলককে সোজা পাঠানো হলো সিফাতের ঘরে। রুকু আর ইয়ানা মিলে তাকে নিয়ে রেখে এলো সিফাতের ঘরে।তাকে সব বুঝিয়ে দিয়ে বেরিয়ে এলো তারাও। একা ঘরে সিফাতের অপেক্ষায় রয়ে গেল পলক। আজ তার আর সিফাতের জীবনের সবচেয়ে গূরুত্বপূর্ণ রাত। আজ থেকে তাদের নতুন জীবনের সূচনা। তিন কবুল বলার সাথে সাথেই তো এক হয়ে গেছিল তারা।তবুও আজ থেকে সেই নতুন মানুষের সাথে নতুন এক পথ চলার যাত্রা শুরু হবে এই রাত থেকেই। একঘরে…এক ছাদের তলায় তৈরী হবে তাদের ছোট্ট এক সংসার।

চলবে…

#ভালোবাসি_প্রিয়
(রিপোস্ট)
পর্ব_৩৪
©জারিন তামান্না

পলককে বাসর ঘরে রেখে গেছে বেশ অনেকক্ষণ। কিন্তু সিফাত আসেনি এখনো। সারাদিনের ধকলে খুব ক্লান্ত লাগছে পলকের। কিন্তু, বাসর ঘরে বর আসার আগে তো বউ ঘুমিয়ে পড়লে চলে না। তাই পলককেও জেগে বসে থাকতে হচ্ছে। বসে বসে বোর হয়ে গেছে সে। তাই বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ালো এবারে।রুমটা খানিকটা পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে। সিফাতের ঘরটা বেশ বড় আর খোলা মেলা। প্রয়োজনীয় কয়েকটা ফার্নিচার আর কিছু সাজজ্জার জিনিস দিয়ে সাজানো ছিমছাম একটা ঘর। ঘরের মাঝ বরাবর একটা বড় খাট। খাটটা আজ বিভিন্ন ফুল দিয়ে হালকা কিন্তু খুব সুন্দর করে সাজানো।ফুলের গন্ধে সুবাসিত হয়ে আছে ঘরটা।খাটের দেয়াল বরাবর সিফাতের বিশাল সাইজের সাদাকালো একটা ছবি।প্রাণোচ্ছল হাসিতে ভরপুর একটা মানুষ সে ছবিটায়।

খাটের দুপাশে দুটো সাইড টেবিল,একটা ড্রেসিং টেবিল।বিছানার এক পাশ বরাবর কিছুটা দূরে সামনে তিন পাল্লার বিশাল একটা আলমারি রাখা।বিছানার দেয়ালের পেছনে একটা বেলকোনি। দক্ষিণ দিকে একটা খোলা জানালা। হুড়মুড়িয়ে বসন্তের বিভোরী বাতাস আসছে সেদিক দিয়ে। পলকের ক্লান্তি অনেকটাই উবে গেল এই ফুরফুরে বাতাসের ছোঁয়ায়। কোণার দিকটায় ওয়াশরুম। আলমারির থেকে কিছুটা দূরে একটা সেন্ট্রাল টেবিল আর দুটো সোফা। একটা বুক সেলফ আছে ঘরের এক কোণার দেয়াল জুড়ে। বেশ গোছানো একটা ঘর। পলকের খুব ভালো লাগলো ঘরটা।

ঘর পর্যবেক্ষণ শেষে আবার খাটের এক কোণায় গিয়ে বসলো পলক। সাইড টেবিলের উপর থেকে তুলে নিল সিফাতের ফ্রেম করা ছবিটা। এই ছবিটা সে আগেও দেখেছিল,যখন ট্রেনিং এ যাওয়ার আগের রাতে ভিডিও কল দিয়েছিল। সেদিন দূর থেকে খুব একটা স্পষ্টভাবে দেখা যায়নি।তাই আজ হাতে নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো পলক সেটা। ছবিটায় সিফাতকে আরও বেশি ইয়াং লাগছে।পাইলটের ইউনিফর্মে খুব বেশিই সুদর্শন লাগছে তাকে। মাথায় ক্যাপ,,চোখে সানগ্লাস। মুখে তার ভুবন ভুলানো হাসিখানা। একহাতে ক্যাপ্টেনের কোট ঝোলানো, আর অন্যহাতে ট্রাভেলব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্লেনের সামনে। ছবিটা হাত বুলিয়ে দিয়ে মৃদু হাসলো পলক।এই মানুষটাই আজ থেকে তার।একান্ত আপন একজন।তার অস্তিত্বের অংশীদার। তার নতুন পরিচয় এই মানুষটা। আচ্ছা,,আজ থেকে তার নাম কি হবে? মিসেস.সাজিয়া মেহরিন নাকি মিসেস. সাফওয়ান সিফাত?
মিসেস! আজ সে মিস. থেকে মিসেস. হয়ে গেছে। এটা ভাবতেই খানিক লাজুক হাসলো সে।ভীষণ রকম মিষ্টি দেখালো পলককে সেই মূহুর্তটাই। এটাই তো হয় আসলে। মনের আনন্দ মুখের হাসিতে ফুঁটে উঠলে এক অন্যরকম সৌন্দর্য এসে শোভা বাড়িয়ে দেয় মানুষের। পলকের বেলায়ও সেটার ব্যতিক্রম হলো না। নববধূ সাজে এই লাজুক হাসিটা তার শোভা বাড়িয়ে দিল বহুগুণে।

_আসসালামু আলাইকু, মৃন্ময়ী!
নতুন জীবনের ভাবনায় বিভোর পলক খেয়াল করেনি কখন সিফাত ঘরে এসে দাড়িয়েছে। তার গলার স্বরে বিছানায় বসা থেকে ঝট করে উঠে দাঁড়ালো সে। ঘোমটাটা এতক্ষণ তোলা ছিল। সে উঠে দাঁড়াতেই সেটাও নেমে এসে ঢেকে দিল পলকের পদ্মপাতার জলের মত টলটলে মুখখানি। সোজা হয়ে দাঁড়াতেই শান্ত স্বরে সিফাতের সালামের জবাব দিল সে।
_ওয়ালাইকুম আসসালাম ।হাতে তার তখনও ওই ছবির ফ্রেমটা।ওটাকে সে সাইড টেবিলের উপর রাখতে রাখতেই সিফাত বললো,
_এটা আমার প্রথম ফ্লাইট সাকসেসফুললি ল্যান্ড করার পর মালোয়শিয়াতে তোলা।
_অহ,আচ্ছা।
_হ্যাঁ। বলেই সে এগিয়ে গেল পলকের দিকে। সাইড টেবিলের কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল পলক।সেখানে গিয়েই পলকের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ালো সে। ঘোমটার আঁড়ালে পলকের মুখটা অস্পষ্ট। কিন্তু,,সেই মুখটাও ভীষণ রকম সুন্দর লাগলো সিফাতের কাছে। আলতো হাসলো সে। ঘোমটার ভিতরেই পলক নজর ঝুঁকিয়ে ছিল। সেই অবস্থাতেই বিসমিল্লাহ বলে আলতো হাতে পলকের ঘোমটা তুলে দিল। নববধূ সাজে নজর ঝুঁকিয়ে রাখা পলকের লাজুক মুখখানি দেখেই মুগ্ধ হলো সে। বললো, মাশাল্লাহ। তা শুনে মুচকি হাসলো পলক। তারপর, পলকের কপালের মাঝ বরাবর হাত রেখে দোয়া পড়লো সিফাত।এগিয়ে গিয়ে প্রথমবারের মত তার দু হাতের আঁজলায় তুলে নিল তার মৃন্ময়ী মুখখানি। এমন আলতো স্পর্শে ঈষৎ কেঁপে উঠলো পলক।চট করে চোখ তুলে চাইলো সিফাতের দিকে। তার ওমন চাহনীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলো সিফাত।তারপর বেশ সময় নিয়ে তার পুরু ঠোঁটের স্পর্শে প্রগাঢ় এক চুম্বন এঁকে দিল তার মৃন্ময়ীর কপালে। সিফাতের এমন প্রেমময় স্পর্শে লজ্জায় আবেশে চোখ বন্ধ হয়ে এলো পলকের। মূহুর্তেই যেন এক হিম শীতল শিহরণ বয়ে গেল তার পুরো শরীর জুড়ে।এভাবে কোন পুরুষের থেকে পাওয়া প্রথম স্পর্শ তার। তার মনে হলো এই স্পর্শটা অন্যরকম। সব স্পর্শ থেকে আলাদা। তিয়ানের সাথে বন্ধুত্ব বা সম্পর্ক থাকা কালীন তিয়ান কখনোই তাকে এভাবে স্পর্শ করেনি,কিন্তু কখনো কখনো সে সামান্য কাছাকাছি এলেও একরকম অস্বস্তি এসে ঘিরে ধরতো তাকে। তবে,আজ বিন্দুমাত্র অস্বস্তি হচ্ছে না তার।বরং কেমন সুখ সুখ লাগছে। একটা হালাল স্পর্শ ঠিক কতটা তৃপ্তিদায়ক হতে পারে, আজ সেটা খুব ভালোভাবেই অনুভব করলো পলক। পলকের কপালে চুমু দিয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়েই সিফাত বললো, শুকুর আলহামদুলিল্লাহ!

লজ্জায় পলক কিছু বলতে পারলো না। কেবল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো ওখানেই। পলককে ছেড়ে সিফাত কিছুটা দূরে দাঁড়াতেই পলক এগিয়ে এলো তার দিকে। নীচের দিকে ঝুঁকে সিফাতকে সালাম করতে যেতেই চেঁচিয়ে উঠলো সিফাত।
_এইইইই…মৃন্ময়ী, কি করছেন কি এটা? সিফাতের চেঁচানোতে পলক প্রথমে চমকে উঠলেও পরে অবাক স্বরে বললো, সালাম করছিলাম!
_ইসলামে এক আল্লাহ ব্যাতিত অন্য কারো সিজদায় বা কারও সামনে এভাবে নত হতে নেই, জানেন না এটা আপনি?
_জানি।
_জানেন তারপরেও কেন সালাম করতে যাচ্ছিলেন?
_বাসর রাতে নাকি স্বামীর পায়ে হাত দিয়ে সামাল করতে হয়। নানী দাদী বলে দিয়েছে বারবার করে।
_উনারা বলে দিয়েছেন বলেই মানতে হবে আপনাকে? শিক্ষিত মানুষ আপনি। নিজ থেকে জানার, বুঝার ক্ষমতা আছে আপনার।সেই আপনাকেই যে যা বলবে মানবেন আপনি?
_মাথা ডা’য়ে বা’য়ে নাড়িয়ে’ না ‘ বললো পলক।
_সবার সব কথা সবসময় কানে তুলতে নেই মৃন্ময়ী। কেউ কিছু বললে সেটাকে ঠিক ভাবে বুঝুন। নিজ জ্ঞান দিয়ে বিচার করুন আগে।তারপর,সেটা আপনার নিজের কাছে এপ্রুভ হলে তখন সেটার প্রয়োগ করুন।
_আচ্ছা।
_এই তো গুডগার্ল। মুচকি হেসে বললো সিফাত। তারপর আবার বললো, তবে মৃন্ময়ী এর পরিবর্তে একটা কাজ কিন্তু করতেই পারেন আপনি!
_কি কাজ? -কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো পলক।
_সালাম করা তো নিষেধ আমাদের ধর্মে। কিন্তু,আপনি চাইলে আমাকে হাগ করতেই পারেন।এতে কোন নিষেধ নেই কিন্তু। বরং নেকি আছে অনেক। বলেই দুষ্টু হাসলো সিফাত।

পলক পুরো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে সিফাতের এহেন দুষ্টুমিতে। হাগ তো সে করলোই না বরং ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো সিফাতের ওই দুষ্টুমিতে ভরা হাসি হাসি মুখখানার দিকে। তাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে সজোরে হেসে দিল সিফাত। তারপর বললো,

_ Relax..I was kidding just Mrinmoyi!

সিফাতের কথায় নিজের স্টুপিডিটির ব্যাপারটা বুঝে আবারও লজ্জা পেয়ে গেল পলক। লাজুক হেসেই বললো, ধ্যাত!

পলকের লজ্জা পাওয়া দেখে আরও একচোট হাসলো সিফাত। তারপর হাসি থামিয়ে বললো,

_আচ্ছা,এক কাজ করুন তো এখন। ফটাফট খুলে ফেলুন এসব।
_কি খুলবো? অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো পলক।
_এই যে এসব গয়নাগাটি আর বিয়ের শাড়িটা। এসব খুলে..
_এএএএসব খু..খুলবো কেন? আতংকিত স্বরে জিজ্ঞেস করলো পলক। পলকের এহেন প্রতিক্রিয়া দেখে অবাক হলো সিফাত। হতাবাক সুরে বললো,
_আজ আমাদের বাসররাত মৃন্ময়ী! আর বাসর রাতের মেইন কাজটাই তো এখনো বাকি।

_মেইন কাজ?! ভয়ার্তক স্বরে প্রশ্ন করলো পলক।
_হ্যাঁ। কেন আপনি জানেন না? কেউ কিছু বলেনি আপনাকে?
_পলক ঠিক কি বলবে বুঝে উঠতে পারছেন না।তাকে তো বলা হয়েছে। কিন্তু সিফাতের সামনে কিভাবে কি বলবে সে। ভয়ে আতংকে গুলিয়ে যাচ্ছে সব তার। তাই একবার ডা’য়ে বা’য়ে মাথা নাড়িয়ে না বোঝালো আবার মাথা উপর নীচে ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ বুঝালো। কিন্তু,সে যে আসলে কি বুঝিয়েছে সেটা সিফাত বুঝলো না। কিঞ্চিৎ বিরক্ত হলো সে।

এমনিতেই অনেকটা রাত হয়ে গেছে।তারওপর পলককের কোন হেলদোল নেই। সারাদিন কম তো ধকল যায়নি তার উপর।তাই সিফাত চাইছে বাসররাতের কাজটা শেষ করে তাড়াতাড়ি তাকে ঘুমাতে দিতে। কিন্তু,পলক কিছুই করছে না।তাই বিরক্তির স্বরেই সে বললো,
_ওওওহো…মৃন্ময়ী! কি করছেন আপনি? আপনাকে তো আমি বলেই ছিলাম সব শিখে পড়েই বিয়ের জন্য প্রস্তুত হতে। পরে আর কোন সময় সুযোগ দিবো না আমি আপনাকে এডজাস্ট করার । তারজন্যই তো এতদিন সময় দিয়েছি আপনাকে। আর এখন আপনি বলছেন আপনি জানেন না কিছুই। আচ্ছা,সমস্যা নেই। আমি দেখিয়ে বুঝিয়ে দেবো সবটা। এখন তাড়াতাড়ি করুন প্লিজ।

পলক ভয় পাচ্ছে। যদিও সে জানে এসব স্বাভাবিক বিষয় স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কে কিন্তু তবুও সে ভয় পাচ্ছে।আর সিফাতও যে আজই এসবের কথা বলবে পলক ভাবেনি সেটা। সিফাতকে তার ওমন মানসিকতার মনে হয়নি কখনো। কিন্তু,সেও তো বলছে এসবের জন্য। যদিও বিন্তি দাদী বলেছিল তাকে এসবের কথা,কিন্তু সে ভেবেছিল সিফাত অন্যরকম।তাই তখন পাত্তা দেয়নি সেসব কথায়। কিন্তু এখন তার বারবার শুধু মনে হচ্ছে বিন্তি দাদীর বলা কথাগুলোই।
______________________________

সকালে যখন একের পর এক মানুষ এসে এটা ওটা বলেছিল ওকে,,বিয়ে নিয়ে দিয়েছিল নানান পরামর্শ তাদের মধ্যে একজন ছিল বিন্তি দাদীও। পলকের চাচাতো দাদী হন তিনি। যৌবনকালে যেমন রূপবতী ছিলেন তেমনি ছিলেন চটপটে। বয়স ৭০ এর কাছাকাছি এসে তার রূপে কিছুটা ভাটা পড়লেও তেজ কমেনি এক চুলও। স্বামী গত হয়েছেন বছর ১০ আগেই। কিন্তু তিনি এখনো টিকে আছেন নিজের তেজে।চঞ্চল স্বভাবের এই মহিলার কথার তোপে পড়ে সবারই প্রায় নাজেহাল অবস্থা হয় সবসময়।আজ সকালে ফার্ম হাউজ এসেই পলকের ঘরে গিয়েছিলেন তিনি। তাকে ঘরে ঢুকতে দেখে এমনিতেই বেরিয়ে গেছিল সব মানুষ। তার খপ্পড়ে পড়ার ইচ্ছে নেই কারও। নাজিয়া কেবল উষ্কখুষ্ক করছিল তিনি যতক্ষণ ঘরে ছিলেন।কারণ সে ভালো করেই জানে এই মহিলার কথার কোন ছিড়ি নেই। পলককে উনি ঠিক কি বলতে এসেছিল সেটাও নাজিয়া ভালো করেই জানতো। নিজের বিয়ের সময়ই এই অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে তার। কিন্তু,পলক এসব শুনলে লজ্জা পাবে ভীষণ। আর উনি যে স্বভাবের মানুষ পলককে লজ্জায় ফেলার কোন সুযোগ তিনি ছাড়বে না। অনেকবার এটা ওটা বলে তাকে ঘর থেকে বের করার চেষ্টা করেছে নাজিয়া। কিন্তু উনি বকে ধমকে চুপ করিয়ে দিয়েছে নাজিয়াকে। তাই শেষ রক্ষাও হয়নি! নিজের কাজ তিনি করেই ছেড়েছেন।

পলককে নিজের কাছে বসিয়ে এটা ওটা জ্ঞান দেওয়ার একপর্যায়ে তিনি বললেন,
_শোনো বুজি, একখান কথা কই তোমারে।
_জ্বী দাদী বলুন।-পলক বলল।
_আইজ থেইক্কা তোমার নয়া জীবন শুরু হইবো। সোয়ামি সংসার হইবো। খুব মন দিয়া সংসার করবা। সোয়ামির সব আদেশ নিষেধ মাইন্না চলবা। সোয়ামিরে নারাজ করবা না কখনো। যত কষ্টই হইক তারে খুশি রাখবা সব সময়। মনে রাখবা,,সোয়ামিরে খুশি রাখতে পারলেই তুমিও সুখী হইবা। সুখে সংসার করবা। আর আইজ তো একখান খাস রাইত। পত্থম পত্থম (প্রথম প্রথম) এট্টু আট্টু কষ্ট হইবো,তয় সযয্য (সহ্য)কইরা লইয়ো। মনে রাখবা আইজ যদি সোয়ামিরে খুশি করবার পারো তাইলে সারাজীবনের নামে তারে নিজের আঁচলের লগে বাইন্ধা রাখবার পাইবা। আমিও তো তোমার দাদাজান রে ওই কইরাই বশ করছিলাম। আমার রুপের পাগল আছিন মানুষটা। বলেই কিটকিটে হেসে উঠলেন তিনি। তারপর কিছুটা চতুরতার স্বরে বললেন,
পুরুষ মানুষের ওই একখান কমজুরি। আর তোমারও তো সব হের লাইগ্গাই বরাদ্দ করছে আল্লায়(আল্লাহ)।আর আইজ পত্থমবার একটু কষ্ট হইবো তয় সইয়া লইয়ো। পরে আর কষ্ট লাগবো না।কিন্তু,সোয়ামি জ্যান নারাজ না হয়।

তিনি কথাগুলো বলছেন আর পলকের মাথায় শরীরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। নাজিয়া উষ্কখুষ্ক করছে কোন মতে দাদীকে ঘর থেকে বের করে নেওয়ার জন্য। সে বেশ বুঝতে পারছে পলক দাদীর কথার অর্থ কিছুই ধরতে পারেনি। কিন্তু,একবার যদি দাদী খুলে বলা শুরু করে তাহলে খুব লজ্জা পাবে পলক। তাই শেষ চেষ্টা হিসেবে দাদীকে নিয়ে চলে যাওয়ার কথা বলতেই যাচ্ছিল কিন্তু তার আশংকাকে সত্যি করে দিয়ে অবাক স্বরে প্রশ্ন করলো পলক,
_কি সহ্য করবো?
পলকের এহেন প্রশ্নে বিন্তি দাদীও বেশ অবাক হলেন।হতবাক স্বরে প্রশ্ন করলেন,বুজনাই তুমি?
পলক সুন্দর ডা’য়ে বা’য়ে মাথা নাড়িয়ে ‘না ‘বললো। পলকের এহেন সরলতা দেখে যেন বেশ মজা পেলেন বিন্তি দাদী।তার চোখে মুখে ফুঁটে উঠলো দুষ্টু হাসি। সেই হাসি হাসি মুখে পলকের বাহুতে চাপড় দিয়ে বললেন,
_কি কয় ছেরি! সোমত্তা মাইয়া মানুষ হইছো, বিয়া আইজ তোমার.. তাও বুঝোনা কিছু? পলক আবারও না করলো মাথা নাড়িয়ে। তা দেখে দাদী পলককে কানেকানে কিছু বলার ইশার করতেই এগিয়ে এলো পলক। তারপর বিন্তি দাদী পলকের কানে কানে কিছু বললেন যা শুনে মূহুর্তেই পলকের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। লজ্জায় লাল হয়ে গেল তার কানগুলোও। নাজিয়া খিঁচে চোখ বন্ধ করে ফেললো।বিন্তি দাদীর হাত থেকে শেষ রক্ষা হলো না পলকের। এই মহিলাকে নাজিয়ার মোটেও পছন্দ হয় না। আঁড়ালে সবাই তাকে কটকটি বুড়ি বলে ডাকে। নাজিয়াও আজ মনে মনে তার চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করে ছাড়লো।
আর বিন্তি দাদী তার পান খাওয়া লাল লাল দাঁত ক্যালিয়ে হাসলেন। সেই মূহুর্তে তাকে বাংলা মুভির হাঁড়ে বজ্জাত কোন ভিলেনের থেকে কম মনে হলো না নাজিয়ার কাছে।
_______________________________

এবারেও পলকের হেলদোল না দেখে বেশ বিরক্ত হলো সিফাত। তাই তাকে তাড়া দিয়ে বললো,

_এমন স্ট্যাচু হয়ে কেন দাঁড়িয়ে আছেন মৃন্ময়ী? যেটা বললাম করুন। ওসব শেষ করে তারপর আবার ঘুমাতেও তো হবে। সারাদিন বড্ড ধকল গেছে আজ।আপনাকে দেখেও তো ক্লান্ত লাগছে বেশ। রাতও শেষ হয়ে আসছে প্রায়। পরে কখন কি করবো বললু তো! কাল আবার ভোর বেলায় উঠতে হবে। কত কাজ কাল দিনভর!

সিফাতের কথায় ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এলো পলক। মনে মনে ভাবলো একটাবার বলে দেখবে সে সিফাতকে, আজকে এসব না করার জন্য। বড্ড ক্লান্ত লাগছে তার। কিঞ্চিৎ ভয়ও লাগছে কেন জানি । যা করার কাল করবে না হয়। আজকের রাতটা সময় চাইলে নিশ্চয় না করবে না সিফাত তাকে।
যেমনি ভাবা তেমনি কাজ করলো পলক। মিনুতির স্বরে সিফাতকে বললো, একটা কথা বলবো আপনাকে?
_জ্বী বলুন।
একটা ফাঁকা ঢোক গিললো পলক। তারপর বললো, _আ..আজ না আমি প্রস্তুত নই। প্লিজ যা করার কাল করবেন। আমি তো আর চলে যাচ্ছি না!

_এসব কি কথা মৃন্ময়ী? এরজন্য প্রস্তুতির কি আছে! আর বাসররাতের কাজটা বাসর রাতে না করে অন্যদিন করবো কি জন্য! যা করার আজকেই করবো। আর এত ভারী ভারী শাড়ি গয়না নিয়ে আপনিই বা কিভাবে কি করবেন!সে জন্যই বলছি, আপনি খুলুন এসব। তাকে তাড়া দিয়ে বললো সিফাত।
পলকের মন খারাপ হয়ে গেল সিফাতের এহেন ব্যবহারে। এমন কিছু মোটেও আশা করেনি সে।হুট করেই কান্না পেয়ে গেল তার। কিন্তু,সে কান্না চেপে রাখার চেষ্টা করছে। সিফাতের সামনে কিছুতেই কাঁদবে না আজ সে। তাছাড়া সিফাতের অধিকার এটা। একদিন না একদিন এটা তাকে দিতেই হবে।তাহলে আজ কেন নয়! এসব ভাবতে ভাবতেই হাতের চুড়ি খুলার জন্য হাত লাগালো তাতে। সেই মূহুর্তেই সিফাত তাকে জিজ্ঞেস করলো,
_আচ্ছা,এশার নামাযটা কি পড়া হয়েছিল আপনার?
_হ্য…এএএ…হ্যাঁ? চমকে প্রশ্ন করলো পলক।
_বলছি যে..এশার নামাযটা পড়তে পেরেছিলেন আপনি?
_না।
_অহ! আমারও পড়া হয়নি। বলেই ঘড়ি দেখলো সিফাত। রাত ১:৪৯ বাজে। তারপর বললো, তাহলে এক কাজ করি চলুন। এশার নামযটা আগে পড়ে নেই দুজনেই।তারপর না হয় বাসররাতের নফল নামাযটাও পড়ে ফেলবো। একটু সময় লাগবে কিন্তু নামাযটা মিস দিতে চাইছি না। বাসর রাত বলে কথা! এই রাতটা তো আর বারেবার আসবে না। আর আপনাকে পাওয়ার পর আল্লাহর শুকরিয়া না করলে কিছুটা বেঈমানিই হয়ে যাবে এটা,তাই না বলুন? মিষ্টি হেসে বললো সিফাত। তারপর আবার বললো,
_যান, এসব খুলে অন্য ড্রেস পড়ে নিন।আলমারিতে বা’পাশের কাবার্ডে আপনার জন্য সালোয়ার কামিজ রাখা আছে কিছু। ওখান থেকেই পড়ে নিন একটা।
_আমার সালোয়ার কামিজ আপনি কোথায় পেলেন? অবাক কন্ঠে প্রশ্ন করলো পলক।
_আমিই কিনেছিলাম বিয়ের শপিং করার সময়। বিয়েতে সব শাড়ি কেনা হয়েছিল আপনার জন্য। কিন্তু,আমার মনে হলো সারাক্ষণ শাড়ি পড়ার থেকে সালোয়ারকামিজ পড়াটা বেশি ভালো। আর আপনিও তো তাই পড়তেন বিয়ের আগে। তাই নিশাতকে সাথে নিয়ে আপনার মাপমতোই কিছু ড্রেস কিনে রেখেছিলাম আমি।আপাকে বলেছিলাম বিয়ের তত্ত্বে এগুলো দিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু,আপা দিলো না। বললো, এগুলো এ ঘরেই রাখতে। আপনি এলেই দিয়ে দেওয়া যাবে।তাই, আলমারিতে আপনার জন্য রাখা অংশটায় গুছিয়ে রেখেছি ওগুলো।

পলক কি বলবে বুঝতে পারলো না। কেবল এই ভেবেই অবাক হলো যে এই মানুষটা তাকে নিয়ে ঠিক কতটা ভাবে। কতটা কেয়ার করে তার।খুব একটা শাড়ি পড়ার অভ্যাস পলকের নেই। শাড়ি নিয়ে ঘুমাতেও পারে না সে। বিয়ের পর কিভাবে সেটা ম্যানেজ করবে ভেবেই বেশ চিন্তায় ছিল সে। কিন্তু, এখন বেশ স্বস্তি লাগছে। এই মানুষটা সত্যিই অন্য রকম।
_যাই হোক, আপনি এগুলো খুলতে থাকুন, আমি ততোক্ষণে ওযুটা করে আসি, কেমন?
_জ্বী।

পলকের সম্মতি পেয়ে আলমারি থেকে জামা কাপড় নিয়ে ওয়াসরুম চলে গেল সিফাত।

সিফাত যেতেই ধপ করে বিছানায় গিয়ে বসে পড়লো পলক। নিজের চুল নিজেরই ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে এখন তার। কিন্তু,,এই পিন করা খোপায় সেটা সম্ভব হচ্ছে না এই মূহুর্তে। তাই নিজ হাতে নিজের কপাল চাপড়ে বললো,
_এই জন্যই…এইইই জন্যই তোর কোনদিন কিছু হবে না রে সাজি!! প্রতিবার একই ভুল করিস তুই। একটু আগেই মানুষটা বললো,সবার সব কথা কানে তুলতে নাই। না বুঝে কিছু ভেবেও নিতে নাই।নিশাত তো বলেই, ভাবনার চাকা তোর এক সুতা বেশিই টানে। যার জন্য সব ভুলভাল ভেবে প্যাঁচ লাগাই ফেলিস তুই। মানুষটা মেইন কাজ দিয়া কাজ বলতে কি বুঝাইছিল আর তুই কি বুঝলি! তুই তো জানতি যে বাসর রাতে নফল নামায পড়তে হয়…তারপরেও বিন্তি দাদীর কথাই তোর আগে মনে হইলো???!!! যাচ্ছেতাই তুই একটা!!- বলেই নিজের উপর নিজেই রাগ ঝাড়লো সে। আর এসব বলতে বলতেই জোরে জোরে টেনে হাতের চুড়ি খুলছিল সে।ফলে একটা চুড়ি টান দিতে গিয়ে বেশ জোরেই ব্যাথা লাগলো তার হাতে। আহ! বলে আর্তনাদ করে উঠলো সে।
_মৃন্ময়ী! বলেই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো সিফাত।হাতের তোয়ালেটা সেন্টার টেবিলের উপর রেখে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল পলকের দিকে। নীচে হাঁটু গেড়ে বসে পলকের হাতটা তুলে নিল নিজের হাতে। আলতো হাতে চুড়ি খুলতে খুলতে বললো,
_তাড়াতাড়ি করতে বলেছিলাম জাস্ট,তাড়াহুড়ো করতে তো বলিনি। এভাবে জোর করে কিছু করতে গেলে কখনোই ভালোভাবে হয় না সেটা। তাই, সজ্ঞানে বুঝে শুনে সময় নিয়েই করতে হয় যা করার। বলতে বলতেই দু হাতের চুড়িগুলো খুলে দিলো সিফাত। পলক মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনলো সিফাতের কথাগুলো। চুড়ি খোলা শেষে তার হাতের পিঠে আলতো করে চুমু দিতেই হাত মুঠো করে ফেললো পলক। সিফাতকে ভালোভাবে খেয়াল করতেই দেখলো যে তার চুলগুলো ভিজা। ফোঁটা ফোঁটা জলে মুখটাও ভিজে আছে কিছুটা। বোঝাই যাচ্ছে গোসল করেছে সে। সাদা পাঞ্জাবী পায়জামা পড়েছে সে।বড্ড নিষ্পাপ লাগছে তাকে দেখতে। সিফাতকে এভাবে দেখে আবারও মন খারাপ হয়ে গেল পলকের।আজ সে আবারও ভুল বুঝেছিল সিফাতকে। তাই নিজের কাজে খুব লজ্জিত সে। তারবিপরীতে, সিফাতের এমন আদর যত্ন আরও লজ্জিত করে তুলছে তাকে। পলককে লজ্জা পেতে দেখে আলতো হাসলো সিফাত। উঠে দাঁড়িয়ে নিজেই এক এক করে সব গয়না খুলতে সাহায্য করলো পলককে। এমন কি খুব যত্ন করে খুলে দিল ওড়না আর আঁচলের পিনগুলোও। গয়না গুলো সব খোলা শেষ হলে পলককে বললো,
_আপনি যান,,ফ্রেশ হয়ে আসুন।আমি এগুলো গুছিয়ে রাখছি। আপনি এলে একসাথে নামায পড়বো।
পলকও আর কথা বাড়ালো না। আলমারি থেকে কাপড় নিয়ে ওয়াসরুমে গেল ফ্রেস হতে।

____________________________________

বড্ড ক্লান্ত লাগছিল পলকের। তাই সেও হট শাওয়ার নিয়ে নিল।তারপর ওযু করে বেরিয়ে এলো ওয়াশরুম থেকে। পলক আসতেই দেখলো সিফাত তার ছড়ানো ছিটানো গয়নাগাটিগুলো সুন্দর করে গুছিয়ে রেখেছে। মেঝেতে জায়নামাজও বিছিয়ে রেখেছে সে। সিফাত বোধয় একটু বেশিই গোছালো। তাই তার কথা কাজ সব কিছুই এত সুন্দর। সিফাতের প্রতি আরও একবার মুগ্ধ হলো পলক।

রাত ৩:২৭ মিনিট।
এশার নামায শেষ করে দু রাকাত নফল নামায পড়লো তারা। নিজেদের সুখী বিবাহিত জীবনের জন্য প্রার্থনা করলো মনভরে। নামায শেষ করে জায়নামাজগুলো তুলে রাখছিল পলক।তখনই সিফাত বললো, মৃন্ময়ী এদিকে আসুন তো একটু..
সিফাতের ডাক শুনে পেছন ফিরতেই দেখলো সিফাত দাঁড়িয়ে আছে ড্রেসিং টেবিলের সামনে। সামনের আয়নায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তাকে। আয়নার আদলে অদ্ভুত রকম সুন্দর লাগছে তাকে দেখতে।পলক মুগ্ধ নয়নে দেখলো তাকে। মনে মনে বললো, মাশাল্লাহ! হাতের জায়নামাজগুলো টেবিলের উপর রেখে এগিয়ে গেল সে সিফাতের কাছে। তার পাশাপাশি দাঁড়াতেই আয়নার আদলে একত্রে ভেসে উঠলো দুজনের প্রতিচ্ছবি। সেদিকে তাকিয়েই পলকের কাঁধে হাত রেখে তাকে নিজের সামনে এনে দাঁড় করালো সিফাত।আয়নায় এভাবে দেখলো সে দুজনকে। পলকের শরীরে এই মূহুর্তে কোন গয়না নেই কেবল নাকের হীরে আর সোনায় জড়ানো ছোট নাকফুলটা ছাড়া । কোমড় পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে তার ভিজা চুল কিন্তু মাথায় ওড়না দেওয়া। ভীষণ রকম স্নিগ্ধ পবিত্র লাগছে তাকে।সিফাত এক ধ্যানে চেয়ে রইলো আয়নার আদলে ভেসে ওঠা তার মৃন্ময়ীর দিকে। তাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে লজ্জা পেল পলক।দৃষ্টি চঞ্চল হয়ে ছুটোছুটি করতে লাগলো সামনের ফ্লোরে! তা দেখে আলতো হাসলো সিফাত। আলতো হাতে পলকের ওড়না নামিয়ে চুলগুলোকে মুঠো করে নিয়ে পলককে ইশারায় ধরতে বললো ওগুলো। পলক বাধ্য মেয়ের মত তাই করলো।তারপর, ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখা গয়নার বাক্সটা হাতে নিয়ে একটা চেইন আর লকেট বের করে তাকে পড়িয়ে দিল সিফাত। এরপর, পলকের সামনে হাঁটু ভেঙে বসলো সে। বক্স থেকে হালকা ডিজাইনের কিন্তু খুব সুন্দর একটা কোমড়ের বিছা বের করে পড়িয়ে দিল পলককে। পড়ানোর সময় পলককে বললো, দেখি জামাটা একটু উঁচু করুন তো মৃন্ময়ী। প্রথমে তার কথায় হকচকিয়ে গেলেও সিফাতের শান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে আপত্তি করলো না আর। একপাশ থেকে কামিজ ধরে খানিকটা উঁচু করতেই ওই সামান্য ফাঁক গেলিয়েই বিছাটা জড়িয়ে দিল পলকের কোমড়ে।ওটা পড়িয়ে দিতে দিতে বললো, এটা আপনার বাসর রাতের উপরহার মৃন্ময়ী। এটা সব সময় পড়ে থাকবেন আপনি। আমি ব্যাতিত অন্যকেউ যেন এটা খোলার চেষ্টাও না করে। এমনকি স্বয়ং আপনিও না।
পলক কিছু বললো না সিফাতের এহেন কথার বিপরীতে। ওটা পড়ানো শেষ হতেই উঠে দাঁড়ালো সিফাত। তারপর,আরেকটা বক্স দেখিয়ে বললো, এতে হালকা কিছু গয়না আছে। সব সময় পড়ে থাকার জন্য। এখন থাক এগুলো।সকালে ঘর থেকে বেরোনা আগে পড়ে নিবেন।
_আচ্ছা। তারপর, খানিকটা মন খারাপের স্বরেই বললো,
_কিন্তু, আমি যে আপনার জন্য কোন উপহার আনিনি..
_আমার উপহার পাওয়ার সময় এখনো হয়নি মৃন্ময়ী। যেদিন সময় হবে আমি নিজেই নিয়ে নেবো আপনার থেকে। বলেই বাঁকা হাসলো সে।পলক কিছুই বুঝলো না সিফাতের এহেন কথার অর্থ। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু জিজ্ঞেসও করলো না তাকে। পলককে এভাবে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঘুমানোর জন্য তাড়া দিলো সিফাত।
_মৃন্ময়ী অনেক রাত হয়ে গেছে। আসুন এবার শুয়ে পড়ুন। ঘুমিয়ে নিন কিছুক্ষণ। বলতে বলতেই বিছানায় গিয়ে শোয়ার প্রস্তুতি নিল সিফাত। কিন্তু,পলক ঠাই দাঁড়িয়ে রইলো। এর
আগে কোন ছেলের সাথে এক বিছানায় শোয়া তো দূর,,এক ঘরে থাকাও হয়নি তার। সিফাত তার স্বামী এটা জানে সে। কিন্তু তবুও বেশ ইতস্তত করছে সে। তাকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সিফাত বললো,
_ঘুমাতে আসুন মৃন্ময়ী। আজ সারাটা দিনও বেশ ধকল যাবে আপনার। এখন না ঘুমালে পরে সুযোগ পাবেন না আর। আর ঘুম না হলে শরীর খারাপ লাগবে। উঠে আসুন বিছানায়।
সিফাতের কথায় এবার সে বিছানায় না গিয়ে পারলো না। বিছানায় উঠে বালিশ ঠিক করে শোয়ার প্রস্তুতি নিতেই বাঁধ সাধলো সিফাত। তারপর পলকের বালিশটা নিয়ে কিছুটা নামিয়ে তার পাশেই নিজের কিছুটা কাছাকাছি সেট করে বললো,
_এদিকে আসুন। এখানে ঘুমাবেন আপনি।
সিফাতের উচ্চতা ৫’১১ ইঞ্চি। আর পলকের ৫’৪ ইঞ্চি। বালিশের সেট করা পজিশন অনুযায়ী তাতে পলকের মাথাটা সিফাতের বুকের কাছাকাছি পড়ে।

পলক বেশ অবাক হলো সিফাতের এমন কাজে। কিন্তু, মুখে কিছুই না বলে বাধ্য মেয়ের মত গিয়ে শুয়ে পড়লো সিফাতের পাশে।কিন্তু, শুলো সিফাতের উল্টো পাশে কাত হয়ে। কিছুটা দূরে বালিশের এক কোণায় মাথা রেখে জড়সড় হয়েই শুয়ে রইলো সে। ঘুমানোর জন্য চোখ বন্ধ করতেই পেটের উপর সিফাতের বলিষ্ঠ হাতের স্পর্শ অনুভব করলো পলক। সারা শরীরে অদ্ভুত এক শিহরণ বয়ে গেল তার। কিন্তু,ঠিকভাবে কিছু বুঝে উঠার আগেই একটানে তাকে নিজের বুকের কাছটায় এনে ঠেকালো সিফাত। পলক কিছু বললো না সিফাতের এহেন কাজে। চুপচাপ শুয়ে রইলো ওভাবেই। ভেতর ভেতর শরীর কাঁপছে তার।সিফাতও তাকে ধরে রেখেছে ওভাবেই। হঠাৎ তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ঘোর লাগানো কন্ঠে সিফাত বললো,
_ভালোবাসি মৃন্ময়ী! বলেই পলকের মাথায় ভিজা চুলের উপরেই চুমু দিলো সে। তারপর, পলকের মাথায় বিলি কেটে দিতে দিতে বললো,
_ঘুমিয়ে যান এবার।শুভরাত্রি। বলেই ওই অবস্থাতেই চোখ বন্ধ করে ফেললো সে ঘুমানোর জন্য।

মাথায় বিলি কাটার স্পর্শ অনুভব করছে পলক। কানে বাজছে সিফাতের বলা,”ভালোবাসি মৃন্ময়ী” কথাটা।মস্তিকে চলছে আজ রাতের প্রতিটি মূহুর্তের কথা।সিফাতের প্রেমময় স্পর্শের অনুভূতিগুলো এখনো যেন খুব আবেশে জড়িয়ে আছে তাকে। এত কিছু ভাবতে ভাবতেই তার বন্ধ চোখ বেয়েই গড়িয়ে পড়লো দু’ফোঁটা সুখজল। মনে মনে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলো সে, আগলে রাখতে পারবি তো সাজি,এই সুখপাখিটাকে?!

চলবে..