#ভালোবাসি_প্রিয়
(রিপোস্ট)
#পর্ব_৯
©জারিন তামান্না
পলক বাকরুদ্ধ।সারাঘরে পিনপতন নিরবতা বিরাজমান। পলকের নিশ্বাসের শব্দটাও বড্ড বেশি মনে হচ্ছে এখন তার নিজের কাছেই।মস্তিষ্কের শিরায় শিরায় দুটো কথাই দৌঁড়ে বেড়াচ্ছে তার।-“ইয়ানা আমার বড় সন্তান।আর ভবিষ্যতে আপনারও মেয়ে।”অতঃপর নিজের মনেই একটা অপ্রতিদ্বন্দ্বী যুদ্ধে জড়িয়ে গেল সে। একের পর এক প্রশ্ন এসে ভীড় করছে মন-মস্তিষ্কে। নিজের মনে নিজেই একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছে।কিন্তু আদতে সেই প্রশ্ন কার জন্য আর উত্তরই বা কে দিবে কোন কিছুই বোধ নেই এই মূহুর্তে পলকের। সে শুধু ভাবছে,
_তবে কি এই জন্যই এত কিছু? এই কারণেই তার মত মেয়েকে পছন্দ করেছে তারা? মানুষটা তাকে এভাবে ঠকালো? আর বাবা মা? নিশাত! তারা জানে? ও তো আমার আগে থেকেও জানে উনাকে। ওকে বলেছেন উনি?নাকি লুকিয়ে গেছেন! নাহ..আর যাই হোক নিশাত জেনে শুনে এটা করবে না। কিন্তু উনার আগে থেকেই একটা মেয়ে আছে এটা উনি এ বাড়ির কাউকে কেন বলেননি?কেন লুকিয়ে গেছেন!!
পলক আপন মনেই নিজের মত এতকিছু ভেবে চলেছে।আর ওদিকে সিফাত নিজের মত কথা বলেই যাচ্ছে।কিন্তু পলকের কোন সাড়া নেই।হঠাৎ সিফাতের খেয়াল হলো সে বলে যাচ্ছে অথচ পলক চুপ। ফোনটা চেক করলো আবারও,কল কানেক্টেড। কিন্তু পলকের সাড়া নেই। সিফাত দুবার” হ্যালো..হ্যালো ” বললো কিন্তু পলকের সে সবের ধ্যান নেই। সিফাত ফোনটা কেটে দিল।কিন্তু সাথে সাথেই আবার কল করলো। ফোনের রিংটোনে পলকের ঘোর কেটে গেল। দেখলো সিফাত কল করেছে। তখনই ওর খেয়াল হলো ও তো সিফাতের সাথেই কথা বলছিল।তাহলে কল কখন কেটে গেল?সিফাতের কথা মনে হতেই মনে পড়ে গেল ইয়ানার কথাটাও। মূহুর্তেই নিদারুণ এক কষ্ট এসে চেপে ধরলো পলককে। ভারী হয়ে এলো নিশ্বাসের চলন। কিছুক্ষণ ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে রইলো।রিং হচ্ছে। স্ক্রিনে দেখাচ্ছে “captain calling”. কিন্তু পলক কল রিসিভ করছে না।রিং হতে হতেই কলটা কেটে গেল এবার।
________________________
এদিকে,
সিফাতের টেনশন হচ্ছে এখন। হঠাৎ কি-ই বা হলো যে কথা বলতে বলতে পলক চুপ হয়ে গেল?এখন কল করছে সেটাও রিসিভ করছে না। ঠিক আছে তো সে?বাড়িতে কিছু হয়েছে কি? এসব ভাবতে ভাবতেই আবারও কল করলো পলকের নাম্বারে। আর এবার একবার রিং হতেই পলক কলটা রিসিভ করলো।কানের কাছে ফোন ঠেকাতেই সিফাতের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর শুনতে পেল।
_হ্যালো..মৃন্ময়ী! আপনি শুনতে পাচ্ছেন?
পলক চুপ।
_মৃন্ময়ী!! Are you ok..? hey?! speak out..plzz..
_করুণা করছেন আমাকে? নাকি আমার অতীতের সুযোগ নিতে চাইছেন আপনি?
সিফাতের উত্তেজিত,চিন্তিত কন্ঠস্বরের বিপরীতে পলকের অসম্ভব রকমের শান্ত গলায় করা প্রশ্নটা মূহুর্তের জন্য সিফাতকে থমকে দিল। পলকের প্রশ্নগুলোর অর্থ তো সে বুঝলই না বরং পলকের এমন শান্ত কণ্ঠস্বর তাকে আরও বেশি বিচলিত করে তুললো । তারপরেও নিজেকে ধাতস্ত করে প্রশ্ন করলো পলককে,
_মানে? কি বলছেন এটা আপনি?
_মানেটা তো খুবই সহজ। আপনার সন্তানের জন্যই তো বিয়ে করছেন আমাকে।তার মা চাই হয় তো। কিংবা দলিলকৃত কোন ন্যানি।ওই জন্যই তো বিয়েটা করছেন আমায় তাই না? আমার মত মেয়েকে তো এছাড়া বিয়ে করা কোন কারণ দেখছি না আর।আচ্ছা,আমার বাড়ির লোক জানে যে আপনি আপনার মেয়ের জন্য একজন মা চাই বলেই বিয়ে করছেন? আমার অতীতের কারণে কেউ আমায় বিয়ে করছে বলে এই বিয়েটা করে উদ্ধার করতে চাইছেন আমাকে, তাই না?আর বিনিময়ে আপনারও সার্থসিদ্ধি হয়ে যাবে।এটাই তো আপনার উদ্দেশ্য তাই না?? কি হলো বলুন!এটাই তো চান আপনি,তাই জন্যই বিয়ে করতে চাইছেন আমার মত একটা মেয়েকে!! ‘
কল রিসিভ করার পর ঠিক যতটা শান্ত গলায় প্রশ্ন করেছিল পলক তার চেয়েও বেশি গমগমে গলায় কথাগুলো বললো সে। আচমকা কোথায় থেকে কিসের এত রাগ কিসের এত ক্ষোভ এসে ভর করলো তাকে কে জানে! কিন্তু পলক যে অসম্ভব এক ঘোরের মাঝে আছে,কি ভেবে কি বলছে সে নিজেও জানে না হয় তো।
একদিকে সিফাত হতভম্ব! পুরো দমে হতভম্ব।আচমকা এমন অহেতুক ক্ষোভের মুখে পড়ার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না সে। তার মাথায় কিচ্ছু আসছে না। পলক কি বলছে এসব? কেনই বা বলছে।সত্যি না জেনে..কিছু না বুঝে এ কি ধারণা করে নিল সে?
_কি হলো বলছেন না কেন? এখন কেন চুপ করে আছেন আপনি? বলুন না…করুণা করছেন…সুযোগ নিচ্ছেন আমার, তাই না?
পলকের কথায় ঘোর কাটলো সিফাতের। পলকের কন্ঠটাও এবার কেমন ধরে ধরে আসছে।কাঁদছে কি মেয়েটা?এটা ভাবতেই ভেতর থেকে কি যেন খাঁমচে ধরো সিফাতকে। ভেতরে যন্ত্রণা মতন হচ্ছে কিছু একটায়। অস্থির গলায় পলকের উদ্দেশ্যে বললো সে,
_মৃন্ময়ী …শান্ত হোন প্লিজ। কি সব বলছেন আপনি? এমন কিছুই না। আমরা পরে কথা বলি বরং।এখন কিছু শোনার বা বোঝার মত অবস্থা নেই আপনার। I promise.. I will explain you everything. But now please, calm down.
এতক্ষণ পলক ভেতর ভেতর ফুপাচ্ছিল।অতিরিক্ত উত্তেজিত হলে সে এমন করে। কিন্তু এখন সিফাতের কথা শুনে সেটা বাহ্যিক রূপে প্রকাশ পেয়ে গেল। কান্না উপচে পড়লো দু চোখ বেয়ে। সে কাঁদছে। নীরবে কাঁদলেও শ্বাস ঠিকই ঘন হয়ে আসছে তার। ফোনের ওপাশে সিফাত সেটা বেশ বুঝতে পারছে। অস্থির লাগছে তারও। আচমকা এমন কিছু ঘটবে তার ধারণার বাইরে ছিল সেটা। কিন্তু পলক যে থামছেই না। তার সহ্যও হচ্ছে না এমন।কি করবে মাথায় আসছে না তার। তাই না পারতে এবার ধমকে উঠলো সে,
_এই…চুপ করবা তুমি? কান্না করতে মানা করলাম না? কথা কানে যায় না…?চুপ করো। কাঁদবানা এভাবে। শান্ত হও আগে।
সিফাতের ধমকে কান্না আরও বেড়ে গেল পলকের। এবার কিছুটা জোরেই কেঁদে দিল সে। হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে কাঁদছে। যথা সম্ভব চেষ্টা করছে সে যেন আওয়াজ না হয় কান্নার। সিফাতের আর সহ্য হলো না সেটা। কি শুরু করেছে কি মেয়েটা? কি এমন বললাম আমি যে এভাবে কাঁদতে হবে?!ধ্যাততত…’মনে মনে বললো কথাগুলো।কিন্তু মুখে বললো,
_চুপ করবা না তো তুমি?আচ্ছা,ঠিক আছে। কাঁদো।যত ইচ্ছা কাঁদো।একবার শুধু কাছে পাই তোমায়।তখন বিচার করবো তোমার।পরে কথা বলবো।রাখছি। -বলেই কল কেটে দিল। ভাল্লাগছে না তার। সামান্য একটা কথায় কেউ কি করে এত কিছু ভেবে নিতে পারে? How?? একটাবার জিজ্ঞেস তো করতে পারতো..কিন্তু তা না করে…!আর কিছু ভাবতে ইচ্ছে করছে না তার। বেড সাইড টেবিল থেকে লাইটার আর সিগারেটটা নিয়ে ব্যালকোনিতে এসে দাঁড়ালো সে।আজ রাতটা তার নির্ঘুম কাটবে। তার মৃন্ময়ীর কেমন কাটবে কে জানে!
একটা বিষাদের দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে দিল সে। ক্ষণে ক্ষণে হাওয়ার ছড়াচ্ছে একটা গোমট যন্ত্রণার ধোঁয়াটে প্রলেপ।
_________________________________
এক সপ্তাহ পর…
পলকদের বাড়িতে আজ বেশ হৈ চৈ। সকাল থেকে বাড়িতে রান্নাবান্না চলছে। ছোট খাটো অনুষ্ঠান হোক তবুও তো অনুষ্ঠান বলে কথা। মেহমানরা আসবে। একটু ভালো মন্দ খাবারের আয়োজন না করলেই নয়। নিশাতও আজ কলেজ যায়নি। সকাল থেকে মায়ের সাথে হাতে হাত লাগিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। দুপুরের খাবারের নিমন্ত্রণ দেওয়া হয়েছে তাই দ্রুত কাজ শেষ করতে হবে।
বৃহস্পতিবার হওয়ায় বেলা ১২ টার দিকেই বাড়ি ফিরেছে পলক। বাড়িতে ঢুকেই এমন উৎসব উৎসব রব দেখে অবাক হলো সে। কি হচ্ছে, কেন হচ্ছে কিচ্ছু জানে না সে। নিশাতকে দেখলো ঘরদোর ঝেড়ে পরিষ্কার করছে। ড্রয়িংরুমে নতুন সোফার কভারগুলো লাগানো হয়েছে। এই কভারগুলো শুধুমাত্র ঈদের দিন কিংবা বাড়িতে কোন বিশেষ মেহমান এলে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু আজ তো ঈদ নয়। বাড়িতে কোন মেহমান আসবে এমন কোন কিছুও জানা নেই পলকের। এমন হলে মা অন্তত বলতো। হাফডে হওয়ায় দুপুর ৩ টায় কলেজ ছুটি হওয়ার কথা আজ নিশাতের। কিন্তু এই সময় সে বাড়িতে।তাও কাজ করছে এভাবে। ঘটনা কি সেটা উদ্ধার করতে এবার পলক সরাসরি নিশাত কে জিজ্ঞেস করলো।
_হ্যাঁ রে নিশু… বাড়িতে আজ এত আয়োজন কিসের রে?কোন মেহমান আসছে নাকি?
কর্নারসেটের শো-পিসগুলো পরিষ্কার করছিল নিশাত। বেশ ধুলো জমেছে। সেই ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তেই জবাব দিল নিশাত।
_হু।
_কিসের হু? পরিষ্কার করে বল।
_বিশেষ করে বলার মত কিছু নেই বুবু। মেহমান আসছে বাড়িতে। -কাঠকাঠ গলায় বললো নিশাত।
আজ বেশ ক’দিন ধরেই এমন আচরণ করছে নিশাত পলকের সাথে। প্রথম প্রথম খুব একটা আমলে না নিলেও আজকাল এসব একেবারেই ভালো লাগে না পলকের। আচমকা বোনের এমন পরিবর্তনের কোন কারণ সে খুঁজে পায় না। আর আজও সামান্য একটা কথা জানতে চাওয়ায় বোনের এমন আচরণে বেশ কষ্ট পেল সে। কিন্তু আর কত সহ্য করবে সে! নিশাত তার খুব আদরের বোন। প্রিয় মানুষ। তার থেকে এমন আচরণ সে নিতে পারছেনা আর। তাই আজ এর একটা বিহিত করবে বলে সিদ্ধান্ত নিল। কিছুটা তেঁতানো গলায় জিজ্ঞেস করলো,
_এই তোর সমস্যা কি বলতো?
পলকের এহেন কথায় যেন চরম পর্যায়ে অবাক হলো এমন ভাব করে নিশাতও পাল্টা প্রশ্ন করলো,
_কিসের সমস্যা?
_সেটাই তো আমিও জিজ্ঞেস করতেছি। কি সমস্যা তোর হ্যাঁ? ক’দিন ধরেই দেখতেছি তুই আমার সাথে ঠিকমতন কথা বলিস না। কি..হইছেটা কি তোর?-বেশ গমগমে গলায় বললো পলক।
নিশাতের শো-পিস পরিষ্কার করা শেষ।এতক্ষণ যাবৎ পলক ওর পিছনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল। তাই এবার সে পলকের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো।একটা চাপা শ্বাস ফেলে শান্ত স্বরে বললো,
_আমার কিছু হয় নাই। আর কোন সমস্যাও নাই। মা রান্নাঘরে আছে। যা জানার তাকে গিয়েই জিজ্ঞেস করে নিস।-বলেই হনহন করে পলককে পাশ কাটিয়ে অন্য ঘরে চলে গেল নিশাত। বোনের এমন আচরণে খুব কষ্ট পেল পলক। দুঃখভরাক্রান্ত চাপা শ্বাস ফেলে রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল সেও।
রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে দেখলো শাহনাজ বানু মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা রান্না করছেন। গন্ধে মনে হচ্ছে তিনি মুরগীর রোস্টের মশলা কষাচ্ছেন। এছাড়াও ডাইনিং এ সে কয়েক বক্স দই মিষ্টিও দেখে এসেছে। এখানেও পোলাও, কাবাব,বড় মাছের ভুনা,ডিমের কোরমা,দেশি মুরগীর ঝোল,খাসির রেজালা করা হয়েছে। এক এক করে সাজিয়ে রাখা আছে চুলার পাশের তাকে। মোটামুটি এলাহি কান্ড যাকে বলে। খাবারের পরিমাণ দেখেও মনে হচ্ছে মোটামুটি ২০/২৫ জনের মত মানুষের আয়োজন করা হয়েছে। হঠাৎ করে এত আয়োজন হলো কই কেউ তো কিছু বলেনি তাকে আগে থেকে।মা আর নিশাতের পক্ষেও একা একা এত সব আয়োজন, রান্নাবান্না করা সম্ভব না। তাছাড়া মাসের শেষে এত এত টাকা খরচ করে বাজার করলো কিভাবে বাবা? কিসের জন্যই বা এই আয়োজন পলক কিছুই বুঝতে পারছে না। পলক তার মা কে জিজ্ঞেস করতে যাবে তার আগেই পিছন থেকে মেয়েলী কন্ঠের কেউ একজন বললো,
_এই সাজি…কখন এলি তুই? আর এখানেই বা এভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যা যা ফট করে গোসল সেরে রেডি হয়ে নে।
পলক পেছনে ফিরে দেখলো একটা বড় ট্রে হাতে তার মামী দাঁড়িয়ে আছেন।হয় তো ভেতর ঘরেই ছিলেন এতক্ষণ। ট্রেটা আনতেই গেছিলেন। পলক আবারও বেশ অবাক হলো। পলকের এই অবাক হওয়ার পরিমাণ আরেকটু বাড়িয়ে দিয়ে ভিতরের ঘর থেকেই ভাবী ভাবী বলতে বলতে পলকের ফুপু আর সাথে বড় চাচীও বেড়িয়ে এলেন।এই মূহুর্তে পলক ব্যাপকভাবে বিস্মিত। একবার ভাবলো হয় তো এনারাই এসেছেন বলেই এত রান্নাবান্না। কিন্তু পরমূহুর্তেই খেয়াল হলো এদের জন্য আচমকা এত আয়োজন কেন?উপলক্ষই বা কি! কিছুই ভেবে পায় না সে। এরমাঝেই আবার তার ফুপু এসে তাকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেলেন। আদুরে গলায় বললেন,
_আলহামদুলিল্লাহ। আমরা সবাই অনেক খুশি হয়েছি রে সাজি। আল্লাহ শেষমেশ মুখ তুলে চেয়েছেন।খুব সুখী হ তুই। আল্লাহ তোকে ভালো রাখুক।
পাশ থেকে বড় কাকীও এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। মিষ্টি হেসে তিনিও দোয়া করে দিলেন তাকে।
আর পলক! সে তো ব্যাক্কলের মত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে তাকিয়ে সব দেখছে। কি হচ্ছে সব তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে সব। এরই মাঝে আবার রান্নাঘর থেকে শাহানাজ বানু তাড়া দিলেন।
_এই,তুই এখনো এখানে দাঁড়িয়ে আছিস! যা, জলদি গোসলে যা। ভালো করে সাবান শ্যাম্পু মেখে গোসল দিবি। বিছানায় শাড়ি রাখা আছে। তোর মামী দিয়েছে, ওটা পড়বি গোসল সেরে। এখন যা তাড়াতাড়ি।
শাহানাজ বানুর কথা শুনে বাকিরাও তাড়া দিল। বলতে গেলে রীতিমতো ঠেলেঠুলে তাকে গোসলের জন্য পাঠানো হলো সেখান থেকে।
________________________________
ঘরে পা দিতেই আরেক দফা ঝটকা খেলো পলক। তার চাচাতো, মামাতো, ফুপাতো বোনগুলো সব তার রুমে।চাচাতো বোন মিলি। বয়সে তার থেকে ২ বছরের ছোট।সে ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে বসে শাড়ির সাথে ম্যাচিং করে চুড়ি সেট করছে। মামাতো দুই বোন রিয়া আর দিয়া তার ড্রেসিং টেবিলে তল্লাশি চালাচ্ছে। এক এক করে গয়না, লিপস্টিক, সাজগোজের জিনিস বের করে ঘাটছে।এরা যমজ দুই বোন। বয়স ১৫ বছর।কিন্তু আচার ব্যবহারে মনে হবে এরা নিশাতের থেকেও বড়। লোকে বলে যমজ বাচ্চাদের মধ্যে কাজে কর্মে স্বভাবে খুব মিল থাকে। আর এদের দেখলে মনে হবে এরা একে অন্যের জাত শত্রু। কারো সাথে কারো মিলে না।শুধু চেহারা ছাড়া। আর তার ফুপাতো বোন নাজিয়া।তার থেকে ৩ বছরের বড়।সে খুব মনোযোগ দিয়ে বেলী ফুলের গাজরা বানাচ্ছে।তাদের বাসার ছাদে একটা বেলী ফুলের গাছ আছে। শাহনাজ বানুর খুব পছন্দ বেলী ফুল। ছোট চাকরী হলেও চাকরীর প্রথম বেতন পেয়ে মায়ের জন্য বেলীফুলের একটা চারা কিনে এনে দিয়েছিল পলক। গাছটা এখন বেশ বড় হয়েছে। বেশ বোঝা যাচ্ছে, তাজা ফুলগুলো ওখান থেকেই আনা। পলকের এখন রীতিমতো মাথা চক্কর দিচ্ছে। কিছুতেই কিছু বোধগম্য হচ্ছে না তার। তাই একপ্রকার চেঁচিয়েই জিজ্ঞেস করলো সে,
_এইসব কিইই?? কি চলতেছে এইখানে হ্যাঁ? তোরা সব একসাথে ক্যান?
পলকের এমন প্রতিক্রিয়ায় সবাই একসাথে তার মুখের দিকে তাকালো। মিলি তাকে দেখেই একগাল হেসে দিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলো। বললো,
_Congratulations api. খুব খুশি হইছি আমরা সবাই। পাশ থেকে রিয়া দিয়াও চঁচিয়ে উঠলো,
_হ্যাঁ,আমরা তো সবাই মুটামুটি প্ল্যানও করে ফেলেছি কি কি করবো না করবো। ইশশশ আমরা কত্ত মজা করবো তোমার বি..এটুকু বলতেই নাজিয়া খেঁকিয়ে উঠলো। চোখ গরম করে রিয়া দিয়ার দিকে তাকিয়ে পলকের উদ্দেশ্যে বললো,
_এইই,সাজি। এম্নে সং এর মত দাঁড়ায় আছিস ক্যান। যা..বাথরুমে ঢুক। ১০ মিনিটে গোসল দিয়ে বেরোবি।
আচমকা এমন ধমকে থতমত খেয়ে গেল পলক। বোনদের মধ্যে নাজিয়া একটু রাগী স্বভাবের। সব কাজিনরা নাজু আপা বলতেই ভয়ে রীতিমত কাঁপে ।জমের মত ভয় পায় বলতে গেলে। কিন্তু মনটা বড্ড ভালো তার। তাই দরকারে অদরকারে নাজু আপাকেই সবার আগে মনে পড়ে সবার।রাগী স্বভাবের হলেও সোগাহ আর শাসন তার থেকে বেশি আর কেউ বোধয় তাদের করেনা। বিয়ে হয়েছে বছরখানেক।স্বামী কানাডা থাকে।মাস ৪ পরে সেও পাড়ি জমাবে সেখানে। আপাদত বাপের বাড়ি আছে সে।
একের পর এক ঘটনায় পলকের মাথা হ্যাং হয়ে গেছে অলরেডি। কিন্তু এই মূহুর্তে এসব না ভেবে গোসলে যাওয়া উচিৎ বলে মনে হলো তার। মাথায় একগাদা পানি ঢালবে আজ সে। তাছাড়া এখন এখান থেকে না গেলে আরেকদফা নাজু আপার তোপের মুখে পড়া থেকে তার রক্ষে হবে না…For sure! মানে মানে কেটে পড়াই ভালো।
এসব ভাবতে ভাবতেই পলক ভ্যানিটিব্যাগটা ড্রেসিং টেবিলের উপর রেখে একপ্রকার ভৌ দৌঁড় দিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল।তার এমন কান্ড দেখে রিয়া, দিয়া,মিলি অট্টোহাসিতে ফেঁটে পড়লো।।আর নাজিয়া মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে গাজরা গাঁথায় মনোযোগ দিল।
________________________________
গোসল সেরে আসার পর নাজিয়া নিজ হাতে শাড়ি পড়িয়ে দিয়েছে পলককে।রিয়া দিয়া নিজেদের মধ্যে খুঁটাখুঁটি চালিয়ে যাচ্ছে। সাথে নাজু আপা থাকায় চুপিসারে চালিয়ে যেতে হচ্ছে এই চুলাচুলির কার্যক্রম। একজন একটা ঝুমকো দেখাচ্ছে তো অন্যজন আরেকটা। মিলি নিজ হাতে সাজাচ্ছে পলককে। বিছানায় বসে নাজু আপা টুকিটাকি ইন্সট্রাকশন দিয়ে যাচ্ছে।কিন্তু এত কিছুর মধ্যেও একবারের জন্যও নিশাত এ ঘরে আসেনি। পলকের মন খারাপ লাগছে। একে তো কেউ কিছু বলছে না। কি হচ্ছে জানে না সে। বাকিরাও সাজগোজ করেছে। তাকেও সাজানো হচ্ছে। কিন্তু,ব্যাপারটা কি?! মনে মনে ঘটনা কি জানার জন্য ব্যাকুল হলেও নাজু আপার উপস্থিতিতে মুখ ফুটে কিছু জিজ্ঞেসও করতে পারছে না। নয় তো মিলি, রিয়া দিয়া কারও কাছ থেকে ঠিক কথা বের করে নেওয়া যেত। কিন্তু,হায়…তিনটেকে একসাথে পেয়েও সেটা করার সুযোগ পাচ্ছে না পলক।
_কি রে তোদের হলো? ওরা এসে পড়েছে। নিয়ে আয় পলককে। বলতে বলতে পলকের মামী ঘরে ঢুকলেন। পলকের সাজ সজ্জা এতক্ষণে একেবারে কমপ্লিট। বেশ মিষ্টি লাগছে তাকে। মামী মুগ্ধ চোখে দেখলেন ওকে। গা’য়ের রঙটা একটু চাপা হলেও ভারী মিষ্টি মেয়েটা।গা’য়ের রঙের মতই একটা চাপা সৌন্দর্য আছে মেয়েটার মাঝে। সহজে চোখে না পড়লেও একেবারে উপেক্ষা করার মতও না। মিষ্টি হাসলেন উনি। তারপর, নাজুকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
_তোদের হলে নিয়ে চল ওকে। অনুষ্ঠান শুরু করতে হবে তো।
_হ্যাঁ,মামী হয়ে গেছে। তুমি যাও। আমরা আসছি।
_হু,তাড়াতাড়ি আয়। বলেই তিনি বেরিয়ে গেলেন রুম থেকে।
তিনি যেতেই নাজু আপা পলকের দিকে চাইলো। পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার দেখে নিল পলককে। সব ঠিকঠাক আছে। জীবনের নতুন অধ্যায়ে প্রথম পা ফেলবে আজ মেয়েটা। তাই জন্যই কি আজ এতটা সুন্দর লাগছে ওকে? একটা প্রশান্তির হাসি ফুঁটে উঠলো নাজিয়ার মুখে। তারপর, এগিয়ে এসে পলকের মাথায় আঁচল তুলে দিল। পলক অবাক চোখে তাকিয়ে দেখছে সব। কিন্তু প্রশ্ন করার সাহস নেই। একদমই নেই।
________________________________
ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই হতভম্ব হয়ে গেল পলক। সিফাতের পুরো পরিবার এসেছে।দরজায় দাঁড়িয়েই আড়চোখে পুরো ঘরে একবার চোখ বুলিয়ে নিল পলক। সাইডের বড় সোফায় সিফাতের বাবা মা,ছোট বোন সারা, সাথে একজন অপরিচিত ব্যক্তি। তার পাশের সিঙ্গেল সোফায় রিহান বসা।জানলার ধারের খাটটায় বসা চারজন অপরিচিত ব্যক্তি। এদের মধ্য দুজন মহিলা দুজন পুরুষ। মাঝের দুই সিটের সোফাটায় কেবল সিফাত একাই বসা। তবে সিফাতের কোলে একটা ছোট বাচ্চা মেয়ে।একদম পুতুলের মত দেখতে। ৫/৬ বছরের হবে হয় তো। এটাই বোধয় ইয়ানা। সিফাতের মেয়ে। কি সুন্দর শান্ত হয়ে বসে আছে তার বাবার কোলে। মনে মনে ভেবে নিল পলক।পলকের বাড়ির লোকজন সবাই তাদের মেহমানদারি করছে। শেষে নাজু আপাও তাতে যোগ দিল। নাজু আপা পাশ থেকে সরতেই পলকের বা’পাশে দাঁড়ানো মিলির কুনুই ধরে টান দিল পলক। টান খেয়ে পলকের দিকে চাইতেই সে খানিকটা ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘ঘটনা কি? এরা সব এখানে কেন?’
মিলি উৎফুল্ল স্বরে বললো,’আজ তো তোমার পানচিনির অনুষ্ঠান গো বুবু….বিয়ের ডেট ফিক্স করে আংটি পড়িয়ে যাবে ওরা তোমায়।’
মিলির কথা শুনে পলকের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার উপক্রম। সে তো ভুলেই গেছিল আট দিন আগের সেই রাতের কথা। সিফাত তো বলেছিল এই সপ্তাহে স্বপরিবারে আসবে। কিন্তু,এটা কি হলো? এত কিছু বলার পরেও লোকটা সত্যি সত্যি চলে এলো বিয়ের ডেট ফিক্স করতে?! এসব ভাবতে ভাবতেই ঘরের দরজায় দাঁড়িয়েই নিজের জন্য এক ভয়ানক সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো পলক।
চলবে…..
#ভালোবাসি_প্রিয়
(রিপোস্ট)
#পর্ব_১০
© জারিন তামান্না
‘তুই এতটা ছোট মনের কবে হইলি রে সাজি?একটা ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে…তারে নিয়ে তোর এত আপত্তি কিসের? তুই নিজেই তো বাচ্চা কত পছন্দ করিস। স্কুলে কত কত বাচ্চা সামলাস.. আর এখন একটা বাচ্চা মেয়ের জন্য এভাবে…ছিঃ ছিঃ ছিঃ..
_মা তুমি ভুল বুঝতেছো। আমার ইয়ানাকে নিয়ে কোন সমস্যা নাই।সমস্যা ওই মানুষটাকে নিয়ে। সে আমাদের এভাবে ঠকালো আর তোমরা তার সাথেই তোমাদের মেয়ের বিয়ে দিতে একেবারে উঠেপড়ে লাগছো?
_ঠকাইছে মানে? কে কারে ঠকাইলো?মেয়ের দিকে বিষ্ফোরিত চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন শাহনাজ বানু।
_কেন, যার সাথে মেয়ে বিয়ে দিতে উঠেপড়ে লাগছো সে তো দিব্যি লুকায় গেছে বাচ্চাটার কথা!
_বাচ্চাটার কথা সে ক্যান লুকাবে!সেই প্রথম দিনই তারা বাচ্চাটার কথা আমাদের বলছে। বাচ্চাটা কত্ত আদরের তাদের। প্রথম নাতনি। আদরের তো হবেই। আমার তো থেকেও নেই। -পলাশের মেয়ের কথা মনে হতেই মনটা খারাপ হয়ে গেল শাহনাজ বানুর।
তারপরেই আবার বললো, ‘হ্যাঁ,বাচ্চাটা জামাই বাবাজীর একটু বেশিই ন্যাওটা,তাই বলে তুই এমন করবি? এইটা কি তোর মত মেয়ের করা সাজে??’
মায়ের কথা শুনে পলক এবার অবাক না হয়ে পারলো না। হতভম্ব গলায় প্রশ্ন করলো,
_তোমরা সব আগে থেকেই জানতা,তারপরেও তোমরা এমন একটা মানুষের সাথে বিয়ে দিতে চাইতেছো? এতই বোঝা হয়ে গেছি আমি তোমাদের জন্য?
_আরেএএএ…তোর সমস্যা কি হ্যাঁ? কি যা তা বলতেছিস? এমন ভালো একটা ছেলে যেচে তোরে বিয়ে করতে চাইছে,পরিবারের সবাই রাজি। তাহলে আমরা তোরে বিয়ে দিবই বা না ক্যান!
_অন্যের স্বামীকে আমি ক্যান বিয়ে করবো?
_অন্যের স্বামীকে বিয়ে করবি ক্যান..তার কি ঘরে আরেকটা বউ আছে নাকি!বিয়ের পর তো সে তোর স্বামীই হবে। আর স্বামীর সব কিছু তো তোরই হবে।সেসব আপন করে নেওয়াই তো তোর দায়িত্ব কর্তব্য।
মায়ের এমন নির্দয়তা দেখে পলক আর কিছু বলার মত ভাষা হারিয়ে ফেললো। চুপ করে রইলো।
এতক্ষণ মায়ের সাথে তর্ক চলছিল পলকের।তখন সে রুমে না ঢুকে দরজা থেকেই ফিরে এসেছে। আসার আগে মিলিকে বলে এসেছিল যেন শাহনাজ বানুকে তার ঘরে পাঠিয়ে দেয়। মিলি তাকে কিছু বলবে বা আটকাবে তার আগেই হনহনিয়ে চলে এসেছে নিজের ঘরে। শাহনাজ বানু ঘরে এসে কি হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই সে সটাং জানিয়ে দিল,এই বিয়ে সে করবে না। কারণ,সিফাতের কোলের বাচ্চাটা। ওই বাচ্চা সমেত সে এই সম্পর্কে জড়াবে না। ব্যাস…এই নিয়ে শুরু হয়ে গেল তর্কাতর্কি।
কিন্তু,পলকের এখন অসহ্য লাগছে সব। তারা জেনে বুঝে এক বাচ্চার বাবা হওয়া ছেলের সাথে তাকে বিয়ে দিতে চাচ্ছে। আর আজ এত সব আয়োজন করার আগে তাকে কেউ কিছু জানালোই না,তার মতামত জিজ্ঞেস করা তো অনেক দূরের কথা। তাই সে দরজায় দাঁড়িয়ে নেওয়া তার বিয়া না করার সিদ্ধান্তেই সে অটল থাকবে বলে মনস্থির করলো।
হঠাৎই তাদের এই রুদ্ধদ্বার কথোপকথনের মাঝেই দরজায় টোকা পড়লো কারও। কেউ একজন অনবরত কড়া নেড়ে যাচ্ছে।কথা থামিয়ে দিল তারা।ওপাশ থেকে নাজিয়ার গলা পাওয়া গেল।
_সাজি….এই সাজি।দরজা খোল। ভিতরে কি মামীমা আছে? এই সাজি…
নাজিয়ার গলা শুনেই তটস্থ হয়ে গেল পলক। তড়িৎ গতিতে উঠে দরজা খুলে দিল। দরজা খুলতেই নাজিয়া দেখে পলক যেন ভরসা পেল। নাজু আপাকে বললে নিশ্চয় সে কোন উপায় করে দেবে। বিয়েটা তাকে করতে হবে না। নাজিয়া পলকের এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা দেখে তাকে কিছু বলবে তার আগেই তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিল পলক। নাজিয়া হতভম্ব। আজকের দিনে এভাবে কাঁদছে কেন মেয়েটা? ঘরের ভিতরে চোখ পড়তেই দেখলো শাহনাজ বানু দাঁড়িয়ে আছেন। চোখ মুখে বিরক্তির ছাপ। আর এখানে পলক এভাবে কাঁদছে। প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে শাহনাজ বানুর দিকে তাকাতেই দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেল। নাজিয়াকে দেখে উনিও যেন এবার ভরসা পেলেন। রাগ বিরক্তি চিন্তা সব কিছু মিলিয়ে তেঁতানো গলায় নাজিয়ার উদ্দেশ্যে বললেন,
_দেখ না রে নাজু। কি শুরু করছে মেয়েটা। সে নাকি এই বিয়ে করবে না।বিয়ের দিন তারিখ সব ঠিক হয়ে যাইতেছে আর উনি বলতেছেন বিয়ে করবেন না। তুই একটু বুঝা তো ওরে। নিজ হাতে নিজের পা’য়ে কুড়াল মারার পায়তারা করতেছে এই হতচ্ছাড়ি।
মামীমার কথা শুনে নাজিয়া আরেকদফায় অবাক হলো। এই তো সব ভালো ছিল। এত ভালো সম্বন্ধ। কিছুদিন আগে নিশাত ফোনে বললো, পলক নাকি নিজেও দেখা করে আসছে ছেলের সাথে। তাহলে তখন তো কিছু বললো না যে বিয়ে করবে না।তাহলে হঠাৎ কি এমন হলো যে বিয়ের ডেট ফিক্স করতে আসার পর বিয়ে করবে না বলে মানা করতেছে সে।
এদিকে একনাগাড়ে কেঁদে যাচ্ছে পলক। নাজিয়ার কাঁধের অনেকটাই ভিজে গেছে। এটা বুঝতেই পলকে টেনে তুলে ছাঁড়িয়ে নিল সে। সোজা করে দাঁড় করিয়ে কঠিন গলায় জিজ্ঞেস করলো,
_সমস্যা কি? বিয়ে কেন করবি না তুই?
পলক তখনো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। কান্নারত অবস্থাতেই জবাব দিল,
_ওই বাচ্চাটা…কান্নার দমকে কথা আটকে আসছে তার।
_কোন বাচ্চাটা? ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো নাজিয়া।
_উনার কোলে..মেয়েটা! ওই জন্যই তো বিয়ে করতে চাইছে। নয় তো আমার মত মেয়েকে কেন জেনে শুনে উনার মত একজন যেচে বিয়ে করতে আসবে? আর এরাও দেখো…জেনে..জেনেবুঝে আমাকে উনার সাথে বিয়ে দিতে চাচ্ছে।
নাজিয়া ঘটনার কিছুই বুঝলো না। ওদিকে ছেলে পক্ষ তাড়া দিচ্ছে। ছেলের বড় বোন,মামা মেয়েকে দেখবে বলে অপেক্ষা করছে।আগেরবার তারা আসতে পারেননি। অপেক্ষা করছে ওই ছোট্ট বাচ্চাটাও। আর এদিকে এসব…। আর কিছু ভাবতে পারলো না সে। কারণ তাদের কাউকে ও ঘরে না যেতে দেখে রিয়া দিয়া এসেছে খুঁজতে। মিলি, নিশাত আর বাকিরা মেহমানদারি করছে। হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকলো দু বোন। এখানেও কে আগে আসবে সেই নিয়েও প্রতিযোগিতা তাদের। তাই দিয়া ঘরে ঢুকতেই তার পেছনে হুড়মুড়িয়ে দিয়ার গায়ে এসে পড়লো রিয়া। দিয়া গিয়ে ধাক্কা খেলো দরজার কাছে দাঁড়ানো নাজিয়ার সাথে। ধাক্কা খেয়ে নাজিয়া পেছনে তাকাতেই দেখলো বিচ্ছু দুটো এসেছে। চোখ গরম করে তাকাতেই বিচ্ছু দুটো ভয়ে তটস্থ হয়ে গেল। বকা শোনা থেকে বাঁচতে দুজনেই একে অন্যের উপর দোষ চাপিয়ে দিল।প্রথমেই দিয়া বললো,
_নাজু আপা,,আমার কোন দোষ নাই।রিয়া ফাজিলটা ধাক্কা দিছে আমাকে আর আমি এসে তোমার সাথে ধাক্কা খাইছি। মানে একবার পেছন থেকে ধাক্কা খেয়ে আবার সামনে গিয়ে ধাক্কা খাইছি। আ..
_না, আপা। দোষ তো ওই শাঁকচুন্নিটারই। দেখো না কেমন দরজার মুখে দাঁড়ায় ছিল।আমি ঢুকতে গিয়ে ধাক্কা লেগে গেছে।
_এই তুই মিথ্যা বলিশ ক্যান…এমনে হুড়মুড়াইয়া কে ঢুকতে বলছিল তোরে?
_এইই…আমি কই..-ব্যাস রিয়া আর কিছু বলতে পারলো না। তার আগেই নাজিয়া ধমকে উঠলো ওদের।
_এই, চুপ করবি তোরা? যখন দেখো দুইটাতে চুলাচুলি লাইগাই থাকে। আর ওইখানে মেহমান সব ছাইড়া এইখানে কি করতে আসছিস তোরা?
_আমরা তো তোমাদের খুঁজতে আসছিলাম। নিশু’বু পাঠায়ছে ডাকতে। তারা ওয়েট করতেছে। সাজি’বু কে নিয়ে যাইতে বলছে। দুজনেই একসাথে বললো।
_আচ্ছা,তোরা যা আমরা আসতেছি। নাজিয়া বললো।
_আচ্ছা। বলেই যেমন হুড়মুড়িয়ে এসেছিল ঠিক তেমনই হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে গেল দু বোন।
ওরা বেড়িয়ে যেতেই নাজিয়া পলকের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। বললো,
_তোর যা কাহিনী সব পরে শুনবো। এখন যা,মুখ চোখে পানি দিয়ে আয়। কেঁদে কেটে তো সাজগোজ সব ঘেঁটে দিছিস এক্কেবারে।
_নাজু আপা,আমি এই বিয়ে করবো না। তুমি গিয়ে মানা করে দাও ওদের।
_এই চুপ। যা জলদি, যেটা বললাম কর। বাকি কি করা লাগবে না লাগবে আমরা দেখবো।
নাজিয়ার এমন ধমকে কেঁপে উঠলো পলক। কান্না এতক্ষণ থেমে গেছে তার। নাজিয়ার রাগ সম্পর্কে বেশ ভালো ধারণা আছে তার। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বে সে ফ্রেশ হতে চলে গেল।
_________________________________
ওয়াসরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে পলক বেশ ভালো রকমে ঝটকা খেলো। তার ঘরের বিছানায় সিফাত বসে আছে। ঘরের দরজাটাও বন্ধ।
আসলে নাজিয়া গিয়ে যখন বললো যে পলকের স্কুল থেকে ফিরতে দেরি হয়েছিল।তাই রেডি হতেও সময় লাগছে। সিফাত ঠিকই বুঝেছিল পলক এখনো ভুলভাল ভেবেই বসে আছে। তাই এখানে আসতে চাইছে না হয় তো। তারপর নাজিয়াকে ডেকে জিজ্ঞেস করতেই নাজিয়া প্রথমে বলতে ইতস্তত করছিল। পরে যখন সিফাত ভরসা দিল,যে তাকে বলা যায়..নাজিয়াও বলে দিল পলকের বিয়ে করতে না চাওয়ার কথা।তারপর নিশাতের সাহায্য নিয়ে সে পলকের ঘর পর্যন্ত এসেছে।তার সাথে কথা বলবে বলে। নিশাতকে বলেছিল ঘরে আসতে কিন্তু সে বলেছে যে ঘরে যাবে না। দরজার বাইরেই থাকবে। দরজাটাও চাপানো ছিল। কিন্তু খুব বেশি খেয়াল না করায় পলক ভেবেছে যে সিফাত দরজা লাগিয়ে বসে আছে।
বিছানায় বসে ফোনে চোখ রেখে কি যেন ঘাঁটাঘাঁটি করছে সিফাত। বেশ দ্রুত গতিতে তার আঙুল চলছে ফোনের স্ক্রিনে। বিস্মিত পলক অপলক নয়নে দেখছে তাকে। একদম ফর্মাল ড্রেসআপে একজন সুদর্শন ব্যক্তি বসে আছে তার সামনে। আপন মনে কিছু একটা করছে। ক্ষণেক্ষণে তার মুখের ভাব বদলাচ্ছে। বেশ লাগছে.. তাকে দেখতে। এভাবে সিফাতকে দেখতে দেখতেই আপনমনেই মৃদু হাসলো পলক।
এদিকে ঘরে আরও একজনের উপস্থিতি বুঝতে পেরে পলকের উদ্দেশ্যে বললো,
_তুমি নাকি বলছো বিয়ে করবানা আমাকে? ভীষণ রকম শান্ত গলায় কথাটা বলেই পলকের দিকে তাকালো সে। তার দৃষ্টিও ভীষণ শান্ত। কিন্তু সেই শান্ত দৃষ্টির আড়ালে ছিল এক চাপা রাগ। যেটা খুব সুনিপুণভাবে সে আড়াল করে রেখেছে।
সিফাতের কথায় ঘোর কাটলো পলকের। ধাতস্থ হতেই ফিরে গেল আগের ফর্মে। সিফাতের প্রতি হওয়া রাগ ক্ষোভ এসে আবার ভর করলো তাকে। সিফাতের প্রশ্নের উত্তর তো সে দিলোই না বরং উল্টা তাকেই প্রশ্ন করলো।
_আপনি এখানে কি করতেছেন? তাও ঘরের দরজা লাগিয়ে বসে আছেন।মানুষজন কি ভাব্বে?
_মানুষজনের ভাবনার কথা তোমাকে ভাবতে হবে না। তুমি আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। বিয়ে করবানা বলছো তুমি?
_হ্যাঁ। ঝাঁঝালো গলায় জবাব দিবে ভেবেও শান্ত গলায় উত্তর দিল পলক। এই মানুষটার সাথে কেন যেন সে জোর আওয়াজে কথা বলতে পারে না। আজব! নিজের মনে নিজেই ভাবলো পলক।
_কেন?
_কারণ, আপনি আমার সাথে প্রতারণা করেছেন। আপনার একটা বাচ্চা আছে। আর বিয়েটাও তার জন্যই করতেছেন। এ কথা আমাকে আগে জানাননি। আর আমি কোন প্রতারককে বিয়ে করবো না।
_এটাই তোমার ফাইনাল ডিসিশন?
_জ্বী।
_বেশ। এখন যাও, সাজগোজ ঠিক করো। বাইরে অপেক্ষা করছে সবাই। বলেই, উঠে দাঁড়ালো সে। প্যান্টের পকেটে ফোন ঢুকিয়ে একনজর দেখলো পলককে। তার মৃন্ময়ী আজ সাদা গোল্ডেন মিশেল জামদানী শাড়ি পড়েছে। হাত ভর্তি গোল্ডেন চুরি। টুকটাক গয়নাগাটি আছে গায়ে। আর মাথায় বেণী করে বেলি ফুলের গাজরাও লাগানো হয়েছে। কিন্তু কান্নার কারণে চোখমুখ কেমন এলোমেলো হয়ে আছে। চাপা সৌন্দর্যের অধিকারিণী কিন্তু কিছুটা পাগলী টাইপ এই নারীটা তার হবে। ভাবতেই একটা প্রশান্তি ছুঁয়ে গেল তাকে। মৃদু হাসলো। কিন্তু সেটা পলকের নজরে পড়লো না। তারপর, ওকে পাশ কাটিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। পলক ওভাবেই থ’ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। মুখ দিয়ে আপনা আপনি বেরিয়ে এলো, কি হইলো এটা??!
সিফাত বেরিয়ে যাওয়ার একটু পরেই নিশাত ঘরে এলো। পলককে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কাঠকাঠ গলায় বললো,
_ওভাবে দাঁড়ায় আছিস ক্যান! এদিকে আয়। সাজ ঠিক করে দেই। আর কতক্ষণ অহেতুক বসায় রাখবি সবগুলারে!
নিশাতের কথা শুনে পলকের মন খারাপটা আরও বেড়ে গেল। সবাই একপ্রকার মানসিক অত্যাচার করছে তাকে। সবার কথা বাদ দিলেও নিশাতের এমন আচরণ সে কিছুতেই নিতে পারছেনা। কান্না পাচ্ছে তার আবারও। পলকের কোন হেলদোল না দেখে এবার প্রচন্ড বিরক্ত হলো নিশাত। চেঁচিয়ে বললো,
_তুই কি আসবি নাকি আমি গিয়ে নাজু আপারে পাঠাবো?
নাজিয়া কথা শুনে একটা চাপা শ্বাস ফেললো পলক। কারণ, সে আসা মানেই আরেক চোট বকার মুখের পড়া।যেটার লোড নেওয়ার মত মানসিক শক্তি এখন তার নেই।তাই নিশুর কথা মেনে নেওয়াই ভালো এখন। নিশাতকে একনজর দেখলো পলক।মুখটা কেমন ভার ভার হয়ে আছে।কিন্তু কি কারণে,সেটা জানে না সে। আপাদত বাইরে যাওয়া দরকার। তাই সে নিশাতের কথা মত সাজ ঠিক করতে বসে গেল।
_________________________________
পলক ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই আড়চোখে একবার সিফাতকে দেখলো।সেও পলকের দিকেই তাকিয়ে ছিল। ইশারায় পলককে দেখিয়ে ইয়ানাকে কিছু বলছিল। আর ওমনি সিফাতের কোল থেকে নেমে দৌঁড়ে এসে পলকের কোমড় জাপটে ধরলো। আচমকা ঘটা এ ঘটনায় পলক অবাক হলেও ঘরে উপস্থিত বাকি সবাই মুচকি মুচকি হাসছে। যেন বেশ আনন্দঘন মূহুর্ত চলছে কোন। কিন্তু ঘরে উপস্থিত একজন কিছুতেই এই মূহুর্তটায় আনন্দিত হতে পারলো না।
পলককে জাপটে ধরেই ওর মুখের দিকে তাকিয়ে তার উচ্ছ্বসিত কন্ঠে ইয়ানা বললো,
_তুমিই তাহলে আমার মামণি। খুউউউব মিষ্টি দেখতে। আমার খুব পছন্দ হয়েছে তোমাকে। -বলেই শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো ওকে।
পলকের নিজেরও খুব ভালো লেগেছে বাচ্চাটাকে। কিন্তু সিফাতের ওপর রাগও আছে। কিন্তু একজনের রাগ অন্যজনের উপর দেখানোর মেয়ে পলক নয়। তাই সে মিষ্টি হেসে কোলে তুলে নিল ইয়ানাকে। তার গালে চুমু দিয়ে বললো,
_মাশাল্লাহ, আমারও এই মিষ্টি পুতুলটাকে খুব পছন্দ হয়েছে।
ইয়ানা ভীষণ খুশি।তার মামণি তাকে আদর করছে এভাবে। এটা দেখে ঘরে উপস্থিত সবাইও বেশ খুশি। সেই মূহুর্তে সিফাতের মা মিসেস. রেহনুমা আলম উঠে এসে পলকে জড়িয়ে ধরে কপালে আলতো করে চুমু দিলেন। বললেন,
_মাশাল্লাহ। খুব মিষ্টি লাগছে আমার বৌমাকে। তারপর বিছানায় বসা মানুষগুলোকে উদ্দেশ্যে করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি গো পছন্দ হলো তোমাদের আমার বৌমাকে?’ ওখানে বসা ভদ্র মহিলা উঠে এসে পলকের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
_হ্যাঁ, আপা। পছন্দ হওয়ার মতই মেয়ে। সিফাতের সাথে মানাবে বেশ। ভদ্রমহিলার সাথে বসা মেয়েটিও উঠে এলো। পলককে দেখে খুব মিষ্টি করে হাসলো। রেহনুমা এক এক করে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন পলককে।
প্রথমেই ভদ্রমহিলাটিকে দেখিয়ে বললেন,এই যে এটা তোমার খালা শাশুড়ি,রেহানা। রিহানের মা। বিছানায় বসা ভদ্রলোকদের একজনকে দেখিয়ে বললেন এটা রিহানের বাবা। তোমার খালুশশুড়। আর এটা তোমার মামা শশুড়। আমাদের একমাত্র ভাই। আমাদের দুজনেরই বড় উনি। আর এটা (মেয়েটিকে দেখিয়ে) রুকাইয়া। আমার বড় মেয়ে। পেশায় গাইনোলজিস্ট। ওর বর মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। দেশে নাই এখন। তাই আসতে পারেনি আজ।আর তোমার শশুড়ও গতকাল সিলেট গেছে বিজনেসের একটা কাজে। তাই আজ সেও আসতে পারলো না।
সিফাত আর সারা ওকে রুকু আপা বলেই ডাকে। আর তুমিও তাই বলবা।পাশ থেকে বলে উঠলো রুকাইয়া। পলক মৃদু হেসে সায় জানালো। আর সবশেষে সোফায় বসা সারার পাশের ভদ্রলোকটিকে দেখিয়ে বললেন,এই হলো আমাদের ছোট জামাই। সারার বর আবিদ। এরপর আবার পলক সবাইকে সালাম জানালো।
তারপর মিসেস. রেহনুমা একটা বক্স থেকে একজোড়া বালার একটা বালা তুলে পলকের হাতে পড়িয়ে দিয়ে অন্যটা ইয়ানাকে দিয়ে বললেন,
_নানুসোনা,এইটা তুমি তোমার মামণিকে পড়িয়ে দাও।
নানুর কথা মত স্বাচ্ছন্দ্যে বালাটা হাতে নিল। তারপর কোল থেকে নেমে পলকের হাত ধরে টেনে সিফাতের সাথে সোফায় বসিয়ে দিল। ছোট ছোট হাতে পড়িয়ে দিল বালাটাও। বালা পড়িয়ে দিয়েই হাতে একটা চুমু দিল সে। ইয়ানার নিষ্পাপ মুখ,আদর দেখে মন নরম হয়ে গেল পলকের। কিন্তু সত্যিই বিয়েটা করবে কি করবে না এই নিয়েও তার দ্বিধা গেল না।
_________________________________
সিফাতের কথা অনুসারে ঠিক ১ মাস পরে অর্থ্যাৎ পরের মাসের ২১ তারিখ বিয়ের দিন ঠিক হলো। সিফাতের বড় বোন রুকাইয়া এসে একটা আংটি সিফাতের হাতে দিয়ে বললো পড়িয়ে দিতে।কিন্তু সিফাত এতে আপত্তি জানালো। পলকের দিকে একবার দেখলো,পলক চোখ নামিয়ে নিয়েছে। তাকাচ্ছেনা সিফাতের দিকে। একটা চাপা শ্বাস ফেলে সে রুকাইয়াকে বললো,
_রুকু আপা,আজ তুই পড়িয়ে দে। তোরও তো হবু ভাই বউ।’ বলেই ম্লান হেসে ব্যাপারটা এড়িয়ে যেতে চাইলো।
রুকু একবার ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে কি যেন খুঁজলো। হয় তো ভাইকে বোঝার চেষ্টা।তারপর, ভাইয়ের কথামত পলকে আংটি পড়িয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের কথা পাকা করলো । পলকের মাও একটা সোনার চেইন এনে সিফাতকে পড়িয়ে দিল। বর কনে কে মিষ্টিমুখ করিয়ে পানচিনির অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হলো।
________________________________
দুপুরের খাওয়ার পরে সবাই একসাথে বসে বিয়ের আয়োজন নিয়ে টুকটাক কথাবার্তা বলছিল। পলক নিজের ঘরে ছিল। ঘরে পলকের সাথে মিলি,নাজিয়া আর নিশাতও ছিল। সে সময় রুকু এলো ঘরে। বললো,পলকের সাথে কথা ছিল কিছু। একটু একা ছাড়া যাবে কিনা তাদের। নাজিয়া কিছু একটা আন্দাজ করে মিলি আর নিশাতকে ইশারা করলো। তারাও বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। তারপর, রুকু গিয়ে দরজাটা চাপিয়ে দিল। এটা দেখে পলকের মনে নানা রকম চিন্তা এসে উঁকি দিতে শুরু করলো। কি বলবেন উনি?
রুকু মিষ্টি হেসে পলকের পাশে এসে বসলো। প্রথমেই জিজ্ঞেস করলো,
_কেমন আছো পলক?
_জ্বী, আলহামদুলিল্লাহ। আপনি কেমন আছেন আপু?
_আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি।
পলক খেয়াল করলো মানুষটার মুখে সবসময় একটা মিষ্টি হাসি লেগেই থাকে। খুব নরম সুরে কথা বলেন উনি।বিষয়টা পলকের ভালো লাগলো খুব।
_পলক…-নরম সুরে ডাকলো রুকু।
_জ্বী?
_ভাইয়ের সাথে কি কোন সমস্যা চলছে তোমার?
পলক কি বলবে এবার! সত্যি বলে দেবে?নাকি কিছু একটা বলে কাটিয়ে দিবে ব্যাপারটা? কিন্তু মিথ্যা বলতেও বাঁধছে পলকের। তাই চুপ করে রইলো। পলকের চুপ করে থাকা দেখে রুকু বুঝে নিল যে তার ধারণাই ঠিক। কোন একটা সমস্যা হয়েছে দুজনের মাঝে। তাই, পলকে বুঝিয়ে বলার কথা ভাবলো
_পলক শোনো…-রুকু আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই ইয়ানা ছুটে এলো ঘরের দরজা খুলে। ঘরে এসেই পলককে বললো,
_মামণি,তুমি এখানে? জানো আমি তোমাকে সারা বাসায় খুঁজছি! তুমি এখানে কেন লুকিয়ে আছো?
_পলক আর রুকু দুজনেই হেসে দিল ইয়ানার কথায়।পলক ইয়ানাকে কাছে টেনে নিয়ে কোলে বসিয়ে বললো,
_আমি তো লুকিয়ে নেই সোনা। এটা আমার ঘর। তাই এখানেই ছিলাম আমি। বলেই টুক করে একটা চুমু খেয়ে নিল ইয়ানার নরম তুলতুলে গালে। পলকের কথা শুনে ইয়ানা পুরো ঘরে একবার চোখ বুলালো। তারপর, রুকুকে উদ্দেশ্য করে বললো,
_আম্মু, দেখো মামণির ঘরটা কি সুন্দর না? পাপার ঘরের মতন বড় না কিন্তু সুন্দর। তাই না?
_হ্যাঁ,আম্মা। তোমার মামণির ঘরটাও খুব সুন্দর। আর তোমার মামণিটাও খুব মিষ্টি।
_আচ্ছা,আম্মু বাবাই কবে আসবে? কত্তদিন বাবাইকে দেখি না। পাপার বিয়েতেও কি আসবে না? মন খারাপ করে বললো ইয়ানা।
_আসবে আম্মা। পাপার বিয়ের আগেই চলে আসবে। এ কথা শুনে ইয়ানার চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।
_আচ্ছা, আম্মা শোন..এখন তুমি যাও এখান থেকে। আমি তোমার মামণির সাথে একটু কথা বললো।
ইয়ানা তার দুই ঝুটি করা মাথাটা দুলিয়ে হ্যাঁ বললো।তারপর, পলকের গালে একটা ছোট্ট চুমু খেয়ে বললো, আমি যাই মামণি। কিন্তু কথা শেষ করে তুমি আসবে তো আমার কাছে?
_হ্যাঁ,সোনা। আমি আসবো। বলেই ইয়ানার গাল ছুঁয়ে আদর করে দিল । তারপর, ইয়ানা আগের মতোই দরজাটা চাপিয়ে দিয়ে চলে গেল ঘর থেকে।
ইয়ানার মুখে রুকুর জন্য আম্মু ডাক শুনেই পলক শকড হয়েছিল। আর তারপর কাউকে বাবাই বলায় নতুন কিছু প্রশ্ন এসে কড়া নাড়লো পলকের মাথায়।সিফাত বললো ইয়ানা তার বড় সন্তান। সেই হিসেবে তাকে সে পাপা বলে ডাকে। কিন্তু রুকুকে সে আম্মু বলছে।আবার কাউকে বাবাই বলছে। তাহলে বাবাইটা কে?এতসব কিছুর চাপ পলক নিতে না পেরে সরাসরি জিজ্ঞেস করলো।
_আপু ওর বাবাই…?
_হ্যাঁ,,আসলে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হলে যা হয় আর কি! মাসের পর মাস সমুদ্রে ভেসে বেড়ায়। ছুটিতে আসে। মেয়েটা খুব কম সময় পেয়েছে তার বাবাকে। কিন্তু ভাই খুব করে চেষ্টা করে সেই কমতিটা পূরণ করার। ইয়ানা তো পাপা বলতে পাগল। সে বলে তার বাবাই আর পাপা নাকি ওর বিশাল বিশাল দুইটা সম্পদ। তুমিই বলো,কি বুঝে এই পিচ্চি সম্পদের! বলেই হাসতে লাগলো রুকু।তার কথা শুনে পলকও হেসে দিল।
আর ভাই সবাইকে ইয়ানার পরিচয় কি বলে জানো?
পলক জানে না,তবে আন্দাজ করে নিল। তবুও জিজ্ঞেস করলো।
_কি বলে?
রুকু প্রশান্তির এক হাসি হেসে বললো,’তার বড় সন্তান!’
চলবে…