#মনের_আড়ালে
Part_ 7
লেখনীতে -#Nusrat_Hossain
অভিক চোখ বোজা অবস্তাতেই মিটমিট করে হাঁসছিল তার আর ইশমির প্রথম দিনের কথাগুলো ভেবে ।
অনেক দিন পর আমি তোমার মুখে প্রানখোলা হাঁসি দেখতে পেলাম বাবা ।
অভিক চোখ মেলে দেখল মিসেস রাফিয়া রহমান তার মা হাস্যজ্জল মুখে দাঁড়িয়ে আছে ।সে বিছানা থেকে উঠে বসল আর বলল তেমন কিছু না একটা ফানি কথা মনে পরে গিয়েছিল তাই হাঁসছিলাম ।মিসেস রাফিয়া রহমান ছেলের পাশে বসলেন আর ঠোটে হাঁসি রেখেই বললেন যেকারনেই হোক আমার ছেলেকে কতদিন পর হাঁসতে দেখলাম এতেই আমি অনেক খুশি ।রাফিয়া রহমান ইতস্ততবোধ করছেন তিনি ছেলেকে কিছু বলতে এসেছেন কিন্তু তার সাহস হচ্ছে না ছেলেটা যদি রেগে যায় ?ঐ ঘটনার পর থেকে ছেলেটা তার কথায় কথায় রেগে যায় ।বাড়ির প্রত্যেকে এখন ভয় পায় অভিক কে ।তারা তার সাথে কথা বলতেও দশবার ভাবে ।এই তো সেদিনও একটা কাজের মেয়েকে রুম পরিষ্কার করে না রাখায় খুব জোড়ে ধমকিয়েছে ।বেচারি কাজের মেয়ে ভয় পেয়ে আর এই বাড়ি মুখো হয়নি ।অথচ তার ছেলেটা আগে এমন ছিল না সবার সাথে হাঁসিমুখে কথা বলত ।একটা পিঁপড়াকেও কোনোদিন ব্যাথা দেয়নি পর্যন্ত ।আর এখন ছেলের এমন আচরন দেখলেই তিনি ব্যথিত হন খুব ।ছেলের এই পরিবর্তন তিনিসহ বাড়ির কেউ-ই মানতে পারছেনা ।তাই তো তারা সবাই সিদ্বান্ত নিয়েছেন যেভাবেই হোক ছেলেকে সুন্দরী মেয়ে দেখে বিয়ে করাবে ।আর মাথা থেকে ঐ ইশমি মেয়েটার ভূত ছাড়াতে হবে ।বিয়ে হলে সংসার হলে এমনিতে ভুলে যাবে ঐ মেয়ের কথা ।
অভিক মুচকি হেঁসে বলল আম্মু তুমি কি কিছু বলবে আমায় ?
ছেলের কথায় রাফিয়া রহমান ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলেন ।তিনি মনে মনে কথাগুলো গুছিয়ে নিয়ে বলতে শুরু করলেন বাবা এভাবে আর কতদিন ? তিনি আরো কিছু বলতে নিলেই অভিক ভ্রু কুঁচকে বলে উঠল আমি বুঝতে পারলাম না তুমি কি বলতে চাইছ ?
রাফিয়া রহমান আবারো শান্তগলায় বলতে লাগলেন এভাবে আর কতদিন তুমি ইশমি মেয়েটার পেছনে পরে থাকবে ?
অভিক থমথমে গলায় বলল আমি ওর পেছনে পরে নেই আম্মু ।তুমি ভুল বুজছ আমায় ।
তাহলে কেন তুমি এখনো ভার্সিটতে চাকরি করছো ? তোমার বাবার এতবড় অফিস থাকতে তুমি ঐ মেয়েটার জন্য এখোনো ভার্সিটিতে পরে আছ ।অভিক তুমি অফিসের দায়িত্ব নাও এভাবে আর কতদিন ? তোমার বাবা একা আর কত পরিশ্রম করবে আমাদের তো আর কোনো ছেলে নেই যে তোমার বাবার পরে অফিসের দায়িত্ব নিবে ।তোমাকেই তো সব দায়িত্ব নিতে হবে ।
অভিক মায়ের কথায় মুচকি হেঁসে বলল সময় হোক নিব আমি সব দায়িত্ব ।তোমরা এই বিষয় নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারো আমার উপর ভরসা রাখতে পারো ।
রাফিয়া রহমান ছেলেকে আসল কথাটা বলতেই সাহস পাচ্ছেন না ।তিনি জানেন না এ কথা শুনলে অভিক ঠিক কি রিয়েক্ট করবে ? অন্তত যত যাই হোক তার উপর তার ছেলে কখনো রাগ দেখাবে না এটা তার বিশ্বাস ।সেই বিশ্বাস নিয়েই তিনি বলতে শুরু করলেন
অভিক বাবা আমরা তোমার বিয়ের জন্য মেয়ে দেখেছি ।তোমার বাবার বন্ধুর্… তিনি আরো কিছু বলতে নিলেই অভিক থামিয়ে দিয়ে নিচে চোখ স্থির রেখে বলল আম্মু আমার খুব ঘুমের প্রয়োজন ।তুমি এখন যাও পরে কথা হবে ।
ছেলের কথায় রাফিয়া বেগম কিঞ্চিত রেগে গেলেন ।রাগত স্বরেই তিনি বললেন আমাদের কথার কোনো দাম নেই তোমার কাছে ? ঐ মেয়েই এখন তোমার সব ।এমন তো না যে আমরা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাইনি । তোমার কথা ভেবেই আমরা ইশমি মেয়েটার বাড়ি পর্যন্ত বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলাম ।কিন্তু কি হল !তারা আমাদের মুখের উপর সরাসরি না করে দিল ।তুমি কি জানো আমরা কতটা অপমানিত হয়েছি এর জন্য ? তুমিও তো কত কষ্ট পেয়েছ তারপরো ঐ মেয়েটার পেছনেই পরে আছো ।ওদের কি আছে ?মধ্যবিত্ত ফ্যামিলি ওরা আর আমরা উচ্চবিত্ত আর আমাদেরকেই দাম দেখিয়ে না করে দিল ? আমাদেরও তো নিজের একমাত্র ছেলেকে নিয়ে শখ আহ্লাদ থাকতে পারে ,নাকি পারে না ? আমরা তোমায় এত কষ্ট করে যত্ন করে ভালোবাসা দিয়ে বড় করেছি এই বয়সে মুখের উপর তোমার না শোনার জন্য ? যা ইচ্ছে হয় করো তোমার ।আমি ঘরে দুয়ার দিয়ে থাকব ।না খাবার খাবো ,না তোমায় আর জীবনে আমার মুখ দেখাবো ।রাফিয়া বেগম একদমে কথাগুলো বলে বসা থেকে উঠে চলে যেতে নিলেই অভিক থমথমে মুখ নিয়ে বলল তোমরা যা বলবে তাই হবে আম্মু ।
রাফিয়া রহমান ছেলের কথাটা শুনতে পেয়েই মুখে হাঁসি ফুঁটে উঠল তিনি আবার ছেলের পাশে বসে ছেলের হাত ধরে বললেন ধন্যবাদ বাবা তোমায় ।আমাদের কথাটা রাখার জন্য ।ও তোমার বাবার বন্ধুর মেয়ে ।মেয়েটা খুব ভালো আর অমায়িক সুন্দরী ।আর আমাদের মত উচ্চ ঘরের মেয়েও ।আমার বিশ্বাস তোমার পছন্দ হবে রিশাকে ।
অভিক মায়ের কথা অগ্রাহ করে বলে উঠে , বিয়ে করবো যে এই কথা আমি তোমাদেরকে দিতে পারছি না ।
রাফিয়া রহমান মুখে হাঁসি ফুটিয়ে-ই বললেন বিয়ের কথা পরে হবে তুমি নাহয় আগে মেয়েটার সাথে মিট করে এসো কালকে ।
অভিক নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে মাথা ঝুলিয়ে মাকে হ্যাঁ বোঝাল ।রাফিয়া রহমান ছেলের উত্তর পেয়ে খুশিমনে অভিকের রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন ।
মা যাওয়ার পর অভিক বিছানায় গাঁ এলিয়ে দিল ।তার কিছু ভালো লাগছে না ।এই মুহূর্তে তার ঘুমের প্রয়োজন ।অনেকক্ষণ ঘুমানোর চেষ্টা করেও ঘুম আসছে না ।তাই একটা ঘুমের টেবলেট খেয়ে বিছানায় আবার ঘা এলিয়ে দিল ।এবার তার চোখে ধীরে ধীরে ঘুম নেমে এল ।
___________________
ইশমি আমার ফোন দে বলছি ।তোর সাহস কিভাবে হয় আমার হাত থেকে ফোন কেড়ে নেয়ার ? দে বলছি আমার ফোন আহিবা ইশমির হাত থেকে ফোন নেয়ার চেষ্টা করতে করতে বলল ।
ইশমি আহিবার ন্যুড পিকগুলো আহিবার বয়ফ্রেন্ডের চ্যাটলিস্ট থেকে ডিলেট করার চেষ্টা করছে কিন্তু আহিবার জন্য পারছে না ।একপ্রকার ওদের মধ্যে ফোন নিয়ে হাতাহাতি হচ্ছে ।আহিবা চেষ্টা করছে ইশমির হাত থেকে ফোন নিতে আর ইশমি চেষ্টা করছে ন্যুড পিকগুলো ডিলেট করতে ।
একটু আগে ইশমি আহিবার জন্য খাবার নিয়ে আসে আহিবার রুমে আর রুমে এসেই দেখতে পায় আহিবা একটা ছেলেকে মেসেঞ্জারে নিজের ন্যুড পিক সেন্ড করছে চেহারা দৃশ্যমান ।আহিবা চেয়ারে সামনের দিকে মুখ করে বসে ছিল বিধায় ইশমিকে দেখতে পায়নি ।বোনের এই অবনতি দেখে ইশমির মাথা ঝিমঝিম ধরে গেছে ।সে পেছন থেকে আরো ভালোভাবে খেয়াল করে দেখতে পায় নিকনেম জান দিয়ে সেভ করা ।ছেলেটা এখন লাইনে নেই তারমানে এখনো পিকগুলো ছেলেটার কাছে পৌঁছায়নি ।সে আর কিছু না ভেবে খাবার টা রেখেই খুব দ্রুত পেছন থেকে আহিবার হাত থেকে খপ করে ফোনটা হাতে নিয়ে নেয় ।আর তারপর-ই তাদের মধ্য ফোন নিয়ে হাতাহাতি শুরু হয় ।
ইশমি পিকগুলো ডিলেট করার চেষ্টা করতে করতে বলে উঠল বোন প্লিজ আমায় এই পিকগুলো ডিলেট করতে দে ।বোঝার চেষ্টা কর যে তোকে মনপ্রান দিয়ে ভালোবাসবে সে কখনো তোর কাছে ন্যুড পিক চাইবে না ।এই ছেলেটা খারাপ এই ছেলে তোকে ভালো-ই বাসে না ।তোকে নিয়ে খেলছে এই ছেলে বোন ।পরে তোকে এর জন্য খুব পস্তাতে হবে ।তাই ছেলেটা লাইনে আসার আগেই পিকগুলো ডিলেট করতে হবে ।এবার আহিবা রাগে ক্ষোভে ইশমিকে জোড়ে ধাক্কা মেরে বসল ।যার ফলে ইশমি নিচে পরে গিয়ে ব্যাথা পেল ।এই ফাঁকে আহিবা ইশমির হাত থেকে ফোনটা নিয়ে নিল আর চোখ গরম করে বলল আমি তোর লাইফে কোনোদিন নাক গলিয়েছি
যে তুই আমার লাইফে নাক গলাস ।আমি শুধু সাহিরকে আজকেই ন্যুড পিক সেন্ড করিনি ! এর আগেও অনেক ন্যুড পিক সেন্ড করেছি আর তুই ভালোভাবে কান খুলে শুনে রাখ আমি আমার ফেইস সহ-ই ন্যুড পিক সেন্ড করেছি এখন তুই কি করবি কর গিয়ে ।আসছে আমার সতী সাবিত্রী ।নিজে যে বড়লোক ছেলেদের পটিয়ে পাটিয়ে দিনভর ফূর্তি করে কোলে চড়ে বাসায় ফিরে আসিস আবার তাকে দিয়ে বিয়ের প্রস্তাবও পাঠাস এটা কোনো দোষ না ।আর আমি প্রেম করলেই তোর ঘা জ্বলে যায় ।কি ভাবছিস আমি কিছু বুঝি না তোর হিংসে হয় আমার উপর তাই এমন করছিস ।
ইশমি স্তব্ধ হয়ে আহিবার দিকে তাকিয়ে রইল ।সে আর কিছু না বলে আহিবার রুম থেকে বেরিয়ে পরল ।কারন সে জানে আহিবাকে এখন কোনো কিছু বললেও শুনবে না ।সে ভাবতে লাগল কিভাবে সে আহিবাকে ঐ ছেলেটার হাত থেকে বাঁচাবে ।শতহোক আহিবা তো তার বোন ।ঐ ছেলেটা যদি পিকগুলো ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয় তখন কি হবে ? বাবার সম্মান নষ্ট হয়ে যাবে ভাবতেই ইশমির কলিজা ধক করে উঠল ।সে বিড়বিড় করে বলল একটা উপায় তো বের করতেই হবে আমায় ।
রাতে ইশমি বিছানায় চোখবুজে শুয়ে ভাবছিল সে কিভাবে আহিবাকে বাঁচাবে ছেলেটার হাত থেকে ? এর সাথে বাবার সম্মান জড়িত , পরিবারের সম্মান জড়িত।সে ভাবছিল আর তখনি তিথি তাকে আলতো ধাক্কা দিয়ে বলল ইশমি ঘুমিয়ে পড়েছিস ।
ইশমি চোখ মেলে তিথির দিকে মুখ করে বলল না আপু এখনো ঘুমাইনি বলো কি বলবে ?
ইশমি খেয়াল করল তার তিথি আপুকে খুব খুশি খুশি দেখাচ্ছে ।
তিথি ঠোটে হাঁসি রেখেই বলল কালকে আমার সাথে একজায়গায় যাবি ?
ইশমি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল কোন জায়গায় ?
তিথির হাঁসি আরো প্রশস্ত হল আর বলল ফেইসবুকে একজনের সাথে আমার কিছুদিনের আলাপ বুঝেছিস ।প্রতিদিন কথা বলতে বলতে কখন যে আমাদের মধ্যে… তিথি আর বলতে পারলো না তার খুব লজ্জা লাগছে ।কিন্তু ইশমি কিছুই বুজতে পারল না ।সে জিজ্ঞেস করে বসল কি হয়েছে তোমাদের মধ্যে ?
তিথি ইশমির বোকা কথায় কপট রাগ দেখিয়ে বলে উঠল গাধী কোথাকার ।প্রেম হয়ে গেছে আমাদের মধ্যে ।ইশমি চমকে শোয়া থেকে উঠে বসল ।
ইশমি চমকে উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল তুমি দেখেছ ছেলেটাকে ?
তিথি লজ্জা চেহারা নিয়ে বলল , না দেখিনি ফেইসবুকে আমাদের পরিচয় হয়েছে ।এতদিন লন্ডনে ছিল সে পাঁচদিন হলো দেশে ফিরেছে ।তাই কালকে মিট করতে চাইছে আমার সাথে ।আমি চাই তুইও আমার সাথে যাবি কালকে বিকেলে ।
ইশমি বসা থেকে আবার শুয়ে পরল আর বলল বাসায় কি বলে জানিয়ে যাবে ?
তিথি কিছু একটা ভেবে বলল , বলব যে আমার পুরোনো বান্ধবীর সাথে দেখা করতে যাচ্ছি ।
ইশমি চোখ বুঝে বলল ঠিক আছে ।ইশমি ঘুমিয়ে-ই পরেছিল তখনি তার ফোনে টোন করে শব্দ হল ।সে হুড়মুড়িয়ে জেগে উঠল ।ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল একটা মেসেজ এসেছে ।ইশমি মেসেজটায় চোখ বুলাল ।মেসেজটা ছিল
ইশু আমার না তোমায় খুব চুমু দিতে ইচ্ছে করছে ।তোমার গালে , ঠোটে , তোমার গলার অনেকখানি নিচের ঐ তিলটাতেও আর …. ইশমি আর পড়তে পারলো না সে অস্ফুটসুরে বলল ছিহ !তারপর ফোন টা অফ করে আবার শুয়ে পরল ।কিন্তু মেসেজটা পড়ার পর থেকে তার ঘুম উড়ে গেছে ।
চলবে,
@Nusrat Hossain