#মন_কেমনের_মরশুম
পর্ব: ৯
বিশাল টানা বারান্দার এক কোণে একটা রকিং চেয়ার। চেয়ারে শরীর এলিয়ে দিয়ে বসে আছে নীলু। তার চুলগুলো খোলা, বাতাসে এলোমেলো। ডান হাতে একটা ডায়েরী। ডায়েরীর উপর লেখা ‘আমার প্রেম’। মূলত ডায়েরীটায় নীলু শুধুমাত্র আরশাদের কথা লিখতো। যেদিন থেকে নিজের ভিতর ভালোবাসার উষ্ণতা টের পেয়েছে, সেদিন থেকে এই ডায়েরী তার সঙ্গী। আরশাদ কবে কি রঙের জামা পরেছে, কবে তাকে কি উপহার দিয়েছে সবকিছু লেখা আছে এখানে। নীলু ঠিক করেছে এটা আজ সে পুড়িয়ে ফেলবে। সব স্মৃতি শেষ করে দিবে। মস্তিষ্ক শীতল করতে সময় নিচ্ছে এখানে বসে।
“নীলু মা।”
নীলুর ভাব উদ্রেক হয়না বাবার ডাকে। ওভাবেই বসে থাকে ঠাঁয়। বিশাল এই বাড়িটায় সে আর তার বাবা ছাড়া আর কেউ থাকেনা। বুয়া এসে সব কাজ করে চলে যায়। নীলুর বাবা নিজাম হোসেনের একমাত্র সম্বল, ভালোবাসা তার এই মেয়ে।
নীলুর মাথায় বাবাত হাত পড়তেই সে কিছুটা চমকে ওঠে। সজল চোখে বাবার দিকে তাকায়।
“এখানে বসে কি করছো মা?”
“কিছু করছি না বাবা।”
“তুমি কি আমার সাথে একটু আসবে?”
“কোথায়?”
“আমাদের কোণার ঘরটায়।”
“কেনো বাবা?’
“তোমার জন্য একটা চমক আছে। গেলেই দেখবে।”
ম্লান হাসে নীলু। বিষাদে মাখা সেই হাসি দেখে নিজাম হোসেনের বুক যেনো এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে যায়।
“আমার জীবন থেকে সব চমক হারিয়ে গেছে বাবা। আর কিছু দেখেই আমি চমকাবো না।”
“এভাবে বললে কীভাবে হবে মা? তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে আমি আমার জীবনটা উৎসর্গ করে দিলাম। তোমার অযত্ন হবে ভেবে দ্বিতীয় বিয়ের কথা ভাবিনি কখনো। তোমার মুখে সবসময় হাসি দেখতে চেয়েছি। সেই তুমি যদি আমার কথা চিন্তা না করো, এভাবে নাওয়াখাওয়া বাদ দিয়ে পড়ে থাকো আমি কোথায় যাই? আমার তো বয়স হয়েছে মা।”
নীলু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ায়। ডায়েরীটা আপাতত এখানেই রেখে যায়।
“চলো, দেখি কি চমক রেখেছো আমার জন্য।”
নিজাম হোসেনের মুখে চওড়া হাসি ফোটে। নিজের পকেট থেকে রুমাল বের করে মেয়ের চোখে বেঁধে দেয়।
“বাবা এসব কি ছেলেমানুষী?”
“মাঝে মাঝে একটু ছেলেমানুষী করা ভালো, এটা দোষের কিছু না। তুই আয় তো আমার সাথে।”
নীলু সেই ছোট্টবেলার মতো বাবার হাত আঁকড়ে ধরে। যেনো এক অজানা ভরসা পায়। শক্ত করে চেপে ধরে বাবার হাত।
আস্তে আস্তে মেয়েকে নিয়ে কোণার ঘরের সামনে এসে দাঁড়ায় নিজাম হোসেন। ঘরটা অতিরিক্ত পড়ে ছিলো এতোদিন। দুইজন মানুষের জন্য কতোই বা আর ঘর দরকার হয়? এটাও এতোদিন দরকার হয়নি।
মেয়ের চোখের বাঁধন খুলে দিয়ে নিজাম হোসেন বললো,”এবার দরজাটা খোল।”
নীলু অনিচ্ছাসত্ত্বেও শুধু বাবাকে খুশি করার জন্য ক্লান্ত হাতে দরজাটা খোলে।
আর সাথে সাথে দুই পা পিছিয়ে আসে। হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে সে সামনের দিকে। তার বাবা হাসছে তার দিকে তাকিয়ে।
“বাবা….”
“কি কেমন চমক দিলাম? বলেছিলাম না তুই চমকে যাবি একদম?”
“এসব কি? কখন করেছো এসব?”
“এইতো তুই যখন ঘুমিয়ে ছিলি তখন। গতকাল সব ঠিকঠাক করে রেখেছিলাম। আজ মনের মতো সাজিয়ে নিলাম।”
নীলু বাবাকে একবার শক্ত করে জড়িয়ে ধরেই ঘরের মধ্যে ঢুকে যায়। দুইটা শেল্ফ ভর্তি গল্পের বই। সামনে একটা বেতের টেবিল, দু’টো চেয়ার, টেবিলের উপর নীলুর পছন্দের বেগুনী রঙা কেটলি আর চায়ের কাপ দু’টো।
নীলু যেনো সব ভুলে উচ্ছ্বসিত হয়ে যায়। নিজাম হোসেনের বুক চিড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
“বাবা এসব কি করেছো তুমি? কি সুন্দর….”
“ওপাশের দেওয়ালে আরো দুইটা শেল্ফ হবে। সেগুলোতেও বই ভর্তি থাকবে।”
“কিন্তু বাবা তুমি তো একদম গল্পের বই পড়া পছন্দ করতে না। তাই তো আমি আরশাদের ঘরে….”
নীলু থেমে যায়। এক পৃথিবী বিষাদ এসে ভর করে তাকে আবারও।
“পুরোনো কথা থাক। তোমার খুশির চেয়ে বেশি এই মুহুর্তে আমার কাছে আর কিছুই না। তুমি খুশি হয়েছো তো?”
“হয়েছি বাবা।”
নীলু বই গুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেয়। নতুন বইয়ের মাতাল করা ঘ্রাণ। কি যে ভালো লাগে তার।
“এসো এখানে বসি। চা বানিয়ে রেখেই তোমাকে ডাকতে গিয়েছি। চলো বাপ বেটিতে মিলে একটু চা বিলাশ করি।”
নীলু চেয়ার টেনে বসে। নিজেই কেটলি থেকে কাপে চা ঢালে। একটা বাবাকে দেয়, অন্যটা নিজে নেয়।
“চা কেমন হয়েছে বললি না?”
“তোমার মতোই অসাধারণ হয়েছে বাবা।”
নিজাম হোসেন হৃষ্টচিত্তে হাসে। মেয়েটাকে খুশি দেখার জন্য, আগের মতো প্রাণোচ্ছল দেখানোর জন্য এই মুহুর্তে পৃথিবীর সব সুখ তার পায়ের কাছে এনে দিতে ইচ্ছা করছে তার।
নীলু গাঢ় গলায় বললো,”ধন্যবাদ বাবা, অনেক অনেক ধন্যবাদ তোমাকে।”
“মা রে! বাজারে যদি মেয়েদের সুখ কিনতে পাওয়া যেতো, সবচেয়ে বেশি ক্রেতা হতো মেয়েদের বাবারা। আমরা নিজেদের সর্বস্ব বিক্রি করে হলেও তোদের মেয়েদের জন্য সুখ কিনে আনতাম। কিন্তু আফসোস তা পাওয়া যায়না।”
নীলু বাবার কাঁধে মাথা রাখে। কিছুক্ষণ পরই নিজাম হোসেন টের পায় তার পাঞ্জাবি ভিজে যাচ্ছে নীলুর চোখের পানিতে। বুকটা হু হু করে ওঠে তার। নিজের চোখের পানিটুকু সামলায় অনেক কষ্ট করে।
“বাবা আমার অসহ্য কষ্ট হচ্ছে বাবা। আমার ভিতরটা পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাচ্ছে। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। মনে হচ্ছে আমি আমার শ্বাসপ্রশ্বাস টুকু হারিয়ে ফেলছি প্রতিনিয়ত। আমি কি করবো বাবা? তুমি আমাকে বলে দাও আমি কি করবো? কি করলে এই যন্ত্রণা থেকে একটু মুক্তি মিলবে আমার?”
নিজাম হোসেন মেয়ের মাথা তুলে তার চোখের পানি মুছে দেয় যত্ন করে। ঈষৎ লাল চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে তার। নিজাম হোসেনের বুক ছিঁড়ে যায় ব্যথায়।
“সব ঠিক হয়ে যাবে মা, সব ঠিক হয়ে যাবে। টাইম উইল হিল অল পেইন। ইয়েস মাই লিটল গার্ল, টাইম উইল হিল অল পেইন।”
নীলু বাবার দুই হাত জড়ো করে মুঠোবন্দি করে। মাথা ঠেকায় সেই মুঠোয়। কি ভীষণ কষ্ট আচ্ছন্ন করে ফেলে বাবা মেয়েকে।
“নীলু খুব ছোটবেলায় তোর মন খারাপ হলে তোকে কি করতে বলতাম, তোর মনে আছে?”
নীলু মাথা তোলে, ঘোলাটে চোখে তাকায় বাবার দিকে।
“নিজে নিজে একটা গান করতে বলতে।”
“হ্যা। আমি এখন এই ঘর ছেড়ে চলে যাবো। তুই নিজে নিজে ওই গানটা করবি। দেখবি মন ভালো হয়ে যাবে সাথে সাথেই।”
“যাবে না বাবা। সেই ছোটবেলার মন খারাপ আর এখনের মন খারাপের মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য। এই মন পুড়ে গেছে বাবা, পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। এই মন আর ভালো হবে না।”
“চেষ্টা করতে ক্ষতি কি? বাবার কথা একবার শুনেই দেখ।”
নীলু চুপ করে থাকে। নিজাম হোসেন উঠে দাঁড়ায়। মেয়েটা থাকুক কিছুক্ষণ একা। নিজেই নিজেকে সময় দিক, আরো আরো। পুড়তে পুড়তে নিজেই স্বর্ণ হয়ে যাবে।
বাবা চলে যাওয়ার পর বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে নীলু।
এরপর বিড়বিড় করে গাইতে থাকে,
“আমরা করবো জয়,
আমরা করবো জয়,
আমরা করবো জয় একদিন…..
আহা বুকের গভীরে, আছে প্রত্যয়।
আমরা করবো জয় একদিন….”
মাঝে মাঝে ফোঁপানোর শব্দের মাঝে তার মিষ্টি সুর ঘরে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে, একদম আস্তে আস্তে।
আরশাদের ঘরের পাশেই একটা ছোট্ট ঘর, স্টোর রুমের মতোই। ইরার খুব কৌতুহল কি আছে ওই ঘরে। এমনিতেও সারাদিন ঘরে বসেই সময় কাটে তার। কেমন হয় একটু ঢুঁ মেরে দেখলে?
ইরা কৌতুহল দমিয়ে রাখতে পারেনা। কোমরে ওড়না গুঁজে ঢুকে যায়।
ধুলাবালি আর ঝুলকালির স্তূপ হয়ে আছে ঘরটায়। ইরার কাশতে কাশতে দম আটকে আসে। কি অবস্থা! এভাবে কেউ রাখে? স্টোর রুম হলেও অন্তত গুছিয়ে তো রাখা যায়। এলোমেলো, নোংরা সে একদম সহ্য করতে পারেনা। ঘর থেকে ঝাড়ু, বালতি এসব নিয়ে এসেছে সে সাথে সাথেই। আজকেই সব পরিষ্কার করে দিবে।
এক কোণায় বিশাল এক স্তূপ জামাকাপড়ের। ইরা নেড়েচেড়ে দেখে। জার্সি, স্পোর্টস প্যান্ট, ক্রিকেট প্যাড, ক্যাপ এসব। জার্সির পিছনে আরশাদের নাম লেখা।
ইরা একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে বললো,”নিশ্চয়ই এক সময় খুব ক্রিকেট খেলা হতো। প্রিয় ছিলো এই জিনিসগুলো। সেই প্রিয় জিনিস গুলো এভাবে নোংরা অবস্থায় ঘরবন্দী করে রেখেছে। সেখানে আমি তো তার প্রিয়ই নই। তার মায়ের ভাষায় বিড়াল-কুকুরের অবস্থানে আছি। আমাকে বর্জন করতে আর কতোই বা সময় লাগবে?”
ইরা ম্লান হেসে গুছিয়ে রাখে ওগুলো সুন্দর করে। পাশেই ব্যাট-বল৷ ওগুলোও ঠিক জায়গায় রেখে দেয়।
আরেকপাশে ডায়েরী, ছবির অ্যালবাম, কাগজপত্র। সেগুলো গুছাতে যেয়ে অনেকগুলো ফটো ঝপঝপ করে মাটিতে পড়ে। ইরা হাতে তুলতেই হেসে দেয়। আরশাদের শৈশব আর কৈশোরের ছবি। একদম মিল নেই আগের সাথে। আগে কেমন তালপাতার সেপাহি ছিলো, পাটকাঠির মতো। আর এখন? চওড়া আর বলিষ্ঠ শরীরের সামনে ইরার নিজেকে পিঁপড়াসম মনে হয়।
এরমধ্যে একটা ছবির দিকে চোখ আটকে যায় ইরার। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে। বিশাল একটা পাথরের উপর পা ছড়িয়ে বসে আছে আরশাদ। কৈশোরের সময়েরই হবে ছবিটা। তার পাশের আরেকটা পাথরে বসা নীলু। তার চেহারায় একদম ভিন্নতা আসেনি, একদমই একই আছে বলে চিনতে পারছে ইরা। নীলু হাসিমুখে তাকিয়ে আছে আরশাদের দিকে। বুকের নিচটায় কেমন চিলিক দিয়ে ব্যথা করে ওঠে ইরার। কি সুন্দর মানিয়েছে দুইজনকে, সেই আগে থেকেই। তার সৎমা ঠিকই বলতো, সে আসলেই অপয়া। এমন একটা সুন্দর সম্পর্ক ভেঙে গেলো শুধু তার জন্য।
ইরা ছবিগুলো রেখে দেয় অ্যালবামের ভিতর। ডায়েরীটা খুলতে যেয়েও খোলেনা। হতে পারে ব্যক্তিগত কিছু লেখা। অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে নাক গলানো তার অপছন্দ।
সবকিছু গোছাতে গোছাতে প্রায় ঘন্টা দুই লেগে যায় ইরার। সবকিছু ঝকঝকে তকতকে এখন। দেখেই শান্তি লাগছে। কি অবস্থাই না হয়ে ছিলো এতোদিন।
এসব ভাবতে ভাবতে বের হয়ে আসছিলো ইরা। হঠাৎ একটা পুরোনো আলমারির পিছনের দিকে নজর যায় তার। কিছু একটা আছে ওখানে। এসেছে যখন দেখে গেলে ক্ষতি কি?
জিনিসটা হাতে নিয়েই অবাক হয়ে যায় ইরা। এতো সুন্দর একটা গীটার, একদম নতুন অবস্থায় রয়েছে। আর এটা কিনা এভাবে ফেলে রেখেছে? লোকটার মাথায় সমস্যা আছে সে আগেই বুঝতে পেরেছিলো। তাই বলে এতোটা? শখের জিনিস এভাবে কেউ ফেলে রাখে?
ইরা তাড়াতাড়ি ঝুল ঝাড়ে গীটারের উপর থেকে। গীটারের তারে হাত লেগে টুংটাং আওয়াজ হয়। কি যে ভালো লাগে ইরার। অনেক ছোট থেকে ইরার শখ ছিলো একটা গীটারের। মা কে বললে বলতো মাধ্যমিকের পর কিনে দিবে। কিন্তু কপালে ছিলো না। সে নবম শ্রেণিতে ওঠার সাথে সাথে মা চলে গেলো। সৎমায়ের সংসারে দু’মুঠো ভাত পাওয়াই যেখানে কষ্টসাধ্য ছিলো সেখানে গীটার তো বিলাসিতা। নিজের হাজারও শখ সে মাটিচাপা দিয়েছে অনেক আগেই।
কিন্তু আজ এতো বছর পর নিজের শখের একটা জিনিস পেয়ে নিজেকে ধরে রাখতে পারেনা সে। এমনিতেই পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলো। সে নিলে কি খুব রাগ করবে উনি? সে তো আর নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে না। এ বাড়িতেই থাকবে।
কিছুটা ইতস্তত করলেও মনের বিরুদ্ধে যেতে পারে না ইরা। ওটাকে নিয়েই ঘরে চলে আসে সে।
দরজা আটকে টুংটাং বাজাতে থাকে। কোনোদিন শেখেনি সে, ফলে সুরটাও ওঠে না ঠিকমতো। তবুও বাজাতে ভালোই লাগছে তার।
হঠাৎ দরজায় করাঘাত পড়তেই উঠে দাঁড়ায় সে। গীটারটা ঘরের আলমারির পিছনে লুকিয়ে ফেলে। ভদ্রমহিলা দেখলে না জানি কি বলে।
কিন্তু ইরা দরজা খুলতেই দেখে আশা দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা কাচুমাচু। মনে হচ্ছে যেনো কেঁদেছে একটু আগেই। ফর্সা মুখে লাল আভা।
“আশা তুমি?”
“আমি একটু ভিতরে আসি?”
ইরা কিছু না বলে দরজা থেকে সরে দাঁড়ায়। আশা ঘরে ঢুকেই নিজেই দরজা আটকে দেয় ভিতর থেকে।
“কি ব্যাপার আশা? সব ঠিক আছে তো?”
আশা ঢোক চেপে বললো,”উনি আবার আসছে।”
“কে আবার আসছে?”
“স্যার….”
“আসলে পড়বে, অসুবিধা কি?”
“আমি উনার কাছে পড়তে চাইনা, একদিনের জন্যেও না।”
“পড়তে না চাইলে তোমার বাবা মা’কে বলো, তারা অন্য শিক্ষক দিবেন তোমাকে। আমাকে বলছো কেনো?”
আচমকা আশা ঝরঝর করে কেঁদে দেয়। ইরা অপ্রস্তুত হয়ে যায়। কি করবে বা কি বলবে ভেবে পায়না।
“আশা….”
“আমি জানি তুমি অনেক কিছু জানো, অনেক কিছু পারো। তুমি কিছু একটা করো। নাহলে আমি বাঁচবো না। আমি মারা যাবো।”
ইরার মনটা দ্রবীভূত হয়। সে আশার দুই কাঁধে হাত রাখে। আশা ঠোঁট কামড়ে আরো বেশি কাঁদতে থাকে।
“দেখো আশা আমি সাধারণ মানুষ, কোনো পীর বা দরবেশ নই যে সব জানবো। আমি যেটা করেছি আমার সন্দেহ থেকে। কিন্তু আসলে কি হয়েছে আমি জানিনা। তুমি যদি সত্যিই চাও আমি তোমাকে সাহায্য করি তাহলে আমাকে বলতে হবে সবটা। কি করেছে আসলে ওই বদমাশটা তোমার সাথে? তুমি কেনোই বা তোমার বাবা মা বা ভাইয়াকে জানাতে ভয় পাও? এগুলো না বললে আমি কিছুই করতে পারবো না তোমার জন্য, বুঝতে পেরেছো?”
আশা ফোঁপাতে ফোপাঁতে মাথা নাড়ে।
“তাহলে বলো, আমি শুনছি।”
“এখন না। আগামীকাল মা নীলু আপাকে দেখতে ওদের বাড়িতে যাবে। তখন আমি তোমাকে সব বলবো। এখন মা দেখে ফেলবে।”
ইরা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,”বেশ, তোমার যা ইচ্ছা।”
“কিন্তু তোমাকে কথা দিতে হবে তুমি এ কথা কাউকে বলতে পারবে না।”
“বেশ, তা-ও মানলাম।”
আশা ভালো করে চোখ মুছে ফেলে নিজের ওড়না দিয়ে। মা যেনো কিচ্ছু বুঝতে না পারে।
দরজা খুলে একবার ইতিউতি তাকায় আশা। এরপর ছুটে একরকম পালিয়ে যায় সেখান থেকে। মূর্তির মতো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে তার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ইরা। কি হয়েছে আসলে এই একরত্তি মেয়েটার? সে কেনো এতো অসহায়? ইরাকেই বা সে সবটা বলতে চায় কেনো বিশ্বাস করে? ইরা কিছু সন্দেহ করেছে তাই? মা হয়ে এতোদিনেও কিছু বুঝতে পারেনি রাবেয়া বেগম?
সন্ধ্যার কিছু সময় পর ইরা আবারও গীটার নিয়ে বসেছে। দরজার বিপরীতে মুখ দিয়ে আনমনে গীটারে ভুলভাল সুর তুলছে তার নিজেও গুণগুণ করে গান করছে। সুরের এমন বেহাল দশায় নিজেই বিরক্ত আর হতাশ। অবশ্য না শিখলে তো পারার কথাও না। কে শেখাবে? কার কাছ থেকে শিখবে সে? তার যে এই জিনিস হাতে দিয়ে পুরোনো শখ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
গীটারের খুশিতে ভুলেই গিয়েছিলো ঘরের দরজা খোলা। লম্বা চুল খোলা রেখেছে সে। জামাকাপড় বৃষ্টিতে না শোকানোয় মায়ের সেই গোলাপি শাড়িটাই পরেছে। এমন কোনো সাজপোশাক না, তবুও তাকে মোহনীয় লাগছে। নিজের কাছেই লাগছে। নিজেকে আয়নায় দেখে বেশ মুগ্ধ হয়েছে সে। হঠাৎ আবার কি হলো তার? এতো সৌন্দর্যের উৎস কি?
মা বলতো মেয়েরা প্রথম প্রেমে পড়লে নাকি তাদের রূপ-যৌবন ঢলে ঢলে পড়ে। এর আগে কখনো এমন হয়নি। প্রেমে পড়া দূর, কাউকে নিয়ে সেভাবে ভাবাই হয়নি। কিন্তু এখন তাহলে কি হচ্ছে? সে কি তবে চোরাবালিতে ডুবতে বসেছে? সর্বনাশ যা হওয়ার হয়েই যাচ্ছে? কি মুশকিল!
অফিস থেকে আজ একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরেছে আরশাদ। ক্লান্ত শরীর নিয়ে দরজা খুলে ঘরে ঢুকতেই থমকে যায়। ইরা গীটারে এতো মগ্ন যে খেয়ালই করেনি কেউ এসেছে।
ইরার হাতে নিজের গীটার দেখে স্তম্ভিত আরশাদ। এটা ইরা কোথায় পেলো? ওর কি গীটার খুব পছন্দ?
আরশাদ ব্যাগটা আস্তে করে টেবিলে রেখে পা টিপে টিপে ঘরে ঢোকে, ইরার পিছনে যেয়ে দাঁড়ায় বুকে দুই হাত গুঁজে। নিজের উপস্থিতি না জানিয়েই দেখতে চায় মেয়েটা কি করে।
উল্টাপাল্টা সুরের সাথে মিষ্টি গলার গানটা ঠিক যাচ্ছে না। আরশাদ আরো একবার অবাক হয় ইরার কণ্ঠ শুনে। কণ্ঠে এমন সুর খুব কমই শোনা যায়। ও এতো সুন্দর গান করে? মেয়েটার বেশ অদ্ভুত প্রতিভা আছে তো।
‘ভ্রমর কইও গিয়া
শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনলে..
অঙ্গ যায় জলিয়ারে ভ্রমর কইও গিয়া
ভ্রমর কইও গিয়া..
শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনলে…
অঙ্গ যায় জলিয়ারে ভ্রমর কইও গিয়া
ভ্রমর রে…
কইও কইও কইওরে ভ্রমর কৃষ্ণ রে বুঝাইয়া
কইও কইও কইওরে ভ্রমর কৃষ্ণ রে বুঝাইয়া
মুই রাধা মইরা যাইমু .কৃষ্ণ হারা হইয়া রে.
ভ্রমর কইও গিয়া…
ভ্রমর কইও গিয়া..
শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনলে…
অঙ্গ যায় জলিয়ারে ভ্রমর কইও গিয়া।’
হঠাৎ ইরা থেমে যায়। কারো গাঢ় তপ্ত শ্বাস পড়ছে যেনো তার পিছে। ভয়াবহ ভাবে চমকে উঠে ইরা পিছনে তাকায়। সাথে সাথে বুকটা ধক করে ওঠে তার। গীটারটা ফেলে উঠে দাঁড়ায়।
“মানে আসলে….”
“আসলে?”
“আসলে আপনার ঘরের পাশের ঘরটা খুব নোংরা হয়ে ছিলো। আমি ভাবলাম পরিষ্কার করে দিই। হঠাৎ এটা চোখে পড়ে। তাই…”
“তাই?”
“আপনি যদি রাগ করেন আমি আবার রেখে আসছি এক্ষুনি। পড়েই তো ছিলো, তাই নিয়ে এসেছি সাথে। আপনি বললে আর ধরবো না।”
আরশাদ ভ্রু নাচিয়ে বললো,”আচ্ছা তাই?”
ইরার মনে হলো আরশাদ বোধহয় মজা করছে তার সাথে। ইরা দমে যায় সহসাই। এখানে তাকে নিয়ে মজা করার কি হলো? সে তো আর চুরি করেনি, নিয়ে পালিয়েও যায়নি।
“কিন্তু গীটার বাজালেই তো শুধু হয়না, সুর ঠিক রাখার প্রয়োজন হয়। এমন সুরে গীটার বাজালে নিজের নয়, গীটারের অপমান হয়।”
ইরা অন্য দিকে ফিরে তাকায়। আশ্চর্য! সবাইকে সবটা পারতে হবে এমন কথা আছে? নিজে যে রান্নার বিন্দুবিসর্গ পারেনা, সেদিকে চিন্তা আছে?
ইরার রাগ হয় নিজের উপরই। কেনো যে আনতে গেলো। এখন অপমানিত হতে হচ্ছে।
আরশাদ নেশাক্ত চোখে ইরাকে দেখে। মেয়েটা রাগ করেছে বোঝাই যাচ্ছে। তার রাগের ধরণ অন্যরকম। রাগ করলেও বুঝতে দেয়না। এখন যদি আরশাদ বলে কফি বানিয়ে এনে দাও, তাও দিবে। রাগ দেখিয়ে বসে থাকবে না।
“আপনি একটু অপেক্ষা করুন। আমি শরবত এনে দিচ্ছি। আজ তাড়াতাড়ি আসবেন আমি জানতাম না।”
ইরা দ্রুতবেগে চলে যেতে গেলেই হঠাৎ আঁচলে টান পড়ে পেছন থেকে।
হতবাক হয়ে ঘুরে তাকাতেই দেখে আরশাদ আঁচলে টেনে রেখেছে। চোখমুখ শান্ত কিন্তু ঠোঁটে কেমন একটা হাসি। ইরা জিজ্ঞাসু চোখে তাকায়।
“তুমি এতো সুন্দর গান করো, আগে কেনো বলোনি?”
“প্রয়োজন মনে করিনি।”
“এখন যদি আমি একটা গান শুনতে চাই? শোনানোর প্রয়োজন মনে করবে?”
“জানিনা।”
ইরা নিজের আঁচল ছাড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু আরশাদ বেশ শক্ত করেই চেপে ধরে আছে।
“ছাড়ুন, শরবত এনে দিই।”
“দরকার নেই। তুমি অনুমতি দিলে আমি তোমাকে গীটার বাজানো শেখাতে চাই। শিখবে?”
ইরা অবাক হয়ে তাকায় আরশাদের দিকে। কি বলবে ভেবে পায়না সে।
“কি হলো? বলো? শিখবে?”
“আপনি আমাকে শিখাবেন?”
“হ্যা শেখাতেই পারি। নেহাৎ খারাপ পারিনা আমি। এককালে বেশ গানবাজনা করতাম বন্ধুদের সাথে। পরে বাদ দিয়ে দিয়েছি। কিছু কিছু ভুলে গেলেও অধিকাংশই এখনো নখদর্পনে আছে। তুমি বললে শেখাতেই পারি। এতে গীটারেরও অপমান হলো না, গীটারের মালিকেরও না।”
“আপনার অপমান হবে কেনো?”
“উহু, গীটারটা তুমি হাতে নিয়েছো মানে এটার মালিক এখন থেকে তুমি। এবার বলো শিখবে?”
ইরা কি বলবে বুঝতে না পেরে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।
আরশাদ কিছুটা এগিয়ে আসে তার কাছে। ইরা পিছিয়ে যায় সাথে সাথেই।
“বিনামূল্যে শিখতে চাচ্ছো না বোধহয়। বিনিময়ে কিছু দিতে চাও?”
“আমি? আমার কি সামর্থ্য আছে আপনাকে দেওয়ার?”
“আছে, সময় হলে চেয়ে নিবো। এখন নিশ্চয়ই আপত্তি নেই আমার কাছে শিখতে?”
ইরা আঙ্গুলে শাড়ির আঁচল পেঁচাতে থাকে। শিখতে পারলে তো ভালোই, অসুবিধা কি?
বারান্দায় পা ছড়িয়ে বসেছে আরশাদ। ইরা জড়োসড়ো হয়ে তার দুই পায়ের মাঝে। কেমন যেনো অস্বস্তি হচ্ছে তার। এক বিছানায় পাশাপাশি শুয়েও এতোটা কাছে কখনো আসা হয়নি আরশাদের। আরশাদের বুকে দুইবার স্পর্শ লাগতেই ইরা আরো গুটিয়ে যায় নিজের মধ্যে। তার অবস্থা দেখে মুচকি হাসে আরশাদ।
আরশাদের নাকে ইরার চুল উড়ে আসছে। বেশ মিষ্টি একটা সুবাস আসছে। নিজের হাতেই ইরার চুল সরিয়ে দেয় সামনের দিকে।
ইরার কোলের উপর গীটার। গীটারের তারের উপর ইরা হাত রাখতেই আরশাদ ইরার হাতের উপর হাত রাখে। ইরা তড়িৎ বেগে নিজের হাত সরিয়ে নেয়।
“কি অদ্ভূত, হাত সরিয়ে নিলে কীভাবে শেখাবো?”
“আপনিই তো বলেছেন ভালোবাসা ব্যতীত স্পর্শ করা যায়না।”
“সব স্পর্শে কি কামনা থাকা জরুরি ইরা? বেশ, তুমি না চাইলে থাক।”
ইরা ইতস্তত করে বললো,”আচ্ছা ঠিক আছে। শুরু করুন।”
ইরার বরফ শীতল হাতের উপর উষ্ণ একটি হাত। আরশাদ এক মনে বলে যাচ্ছে,”প্রথমে এই তার, এখান থেকে সোজাসুজি এটায় উঠবে। ভুলেও পাশেটায় না, বুঝতে পারছো? এভাবে করো….”
ইরার পুরো শরীরটাই বরফের মতো জমে যাচ্ছে। আরশাদের কোনো কথা কানে যাচ্ছে না।
ঘাম, সিগারেটের গন্ধ আর আরেকটা অদ্ভুত গন্ধের মিশেলে একটা ঘ্রাণ ইরার নাক স্পর্শ করছে। ঘন শ্বাস পড়ে তার। কেমন যেনো নিয়ন্ত্রণহীন লাগে।
নিজেই নিজেকে মনে মনে বলে,’ছি ইরা, এ কি অধঃপতন তোর? যে তোকে ভালোইবাসে না, তার এতোটা কাছাকাছি তুই? তার এটুকু স্পর্শে মাতাল হয়ে যাচ্ছিস। লজ্জাশরম কি বিসর্জন দিয়েছিস পুরোপুরি?”
কিন্তু চাইলেও উঠে যেতে পারেনা ইরা। কি এক অদৃশ্য বাঁধনে আটকা পড়েছে। আরশাদের প্রশস্ত বুকের মাঝে অসহায় বোধ করে সে। আরশাদ তাকে অকারণে স্পর্শ করছে না, শুধু আঙ্গুলে আঙ্গুল ছুঁয়ে যাচ্ছে বারবার….
ইরা আচমকা সরে যায়। ছিটকে দূরে যেয়ে বসে। আরশাদ ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিয়ে যায়।
“কি হলো ইরা? কোনো সমস্যা?”
“আজ আর শিখবো না, অনেক হয়েছে।”
“অনেক কোথায় হলো? মাত্রই শুরু করলে।”
“আজ আর প্রয়োজন নেই। অন্য কোনোদিন।”
আরশাদ কিছুক্ষণ গীটারটা জড়িয়ে বসে হঠাৎ ওটা পাশে রেখে উঠে দাঁড়ায়। তার ঠোঁটের কোণে সেই চিরাচরিত দুষ্টু হাসি।
ইরাও উঠে দাঁড়ায়।
“আমি আপনার জন্য কফি আনছি।”
“ইরা, তুমি আসলে ভয় পাচ্ছো।”
“কিসের ভয় পাবো আমি? কেনোই বা ভয় পাবো?”
আরশাদ ইরার অনেকটা কাছে এসে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো,”প্রেমে পড়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছো, নিজেকে হারিয়ে ফেলার ভয় পাচ্ছো।”
আরশাদ দাঁড়ায় না। ইরাকে ওভাবে রেখে ঘরে চলে যায়।
ইরা দাঁতে দাঁত ঘষতে থাকে।
“খেয়েদেয় কাজ নেই উনার প্রেমে পড়বো। নিজেকে কোন সুদর্শন নায়ক ভাবে উনি? নিজেই অকারণ ছুঁয়ে দেওয়ার বাহানা খুঁজছে আবার আমার উপর সব দায় চাপাচ্ছে। আর কোনোদিন উনার কোনো ফাঁদে পা দেওয়া যাবেনা। ভালোবাসা মানে আত্মসমর্পণ। নিজেকে পুরোপুরি ভেঙেচুরে দিয়ে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ। উনি কয়েক কদম আগে এগিয়ে আসুক, করুক আত্মসমর্পণ। এর আগে আর কোনোভাবেই উনার সংস্পর্শে যাওয়া যাবে না। দুষ্টু লোকের মিষ্টি কথার অভাব হয়না। কিন্তু আর না, আর কোনোভাবেই না……”
(চলবে……)

