মায়ার বাঁধন পর্ব-০১

0
570

মায়ার বাঁধন- ১ম পর্ব
©শাহরিয়ার

মানুষ বলে কালো মেয়েদের নাকি লাল শাড়িতে মানায় না। কিন্তু আমাকে আজ ভীষণ মানিয়েছে। আজ আমার বিয়ে, বিয়ের জন্য বাবা লাল টুকটুকে একটা বেনারশী শাড়ি কিনে নিয়ে এসেছে। একটু আগেই বড় আপু মেজ আপুরা এসে আমাকে সে শাড়ি পরিয়ে দিয়েছে। আমি এখন ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে রয়েছি। বার বার আয়নাতে নিজেকে দেখছি আর মুগ্ধ হচ্ছি। আজ খুব ইচ্ছে করছে আমার সেই সব বান্ধবীদের ডেকে বলতে তোরা না আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করতি আমার কখনো বিয়ে হবে না। কখনো লাল শাড়ি গায়ে জড়াতে পারবো না। তখন খুব কষ্ট লাগতো। দু’চোখের কোনে পানি চলে আসতো, খুব কষ্টে নিজেকে সামলে নিতাম। দু’চোখের পানি লুকিয়ে ওদের বলতাম। আল্লাহ নিশ্চই উত্তম পরিকল্পনাকারী। সে যদি আমার ভাগ্যে বিয়ে না লেখে রাখে তাহলে না হয় আমি চিরকুমারি থাকবো। পুরনো কথা গুলো ভাবতেই দু’চোখের কোনে আবারো পানি জমতে শুরু করেছে।

মা: উপমা দরজাটা খোল মা বর পক্ষ চলে এসেছে।

মায়ের কথায় দ্রুত ড্রেসিং টেবিলের সামনে থেকে উঠে যেয়ে দরজাটা খোলতেই মা তাড়াতাড়ি ঘরের ভিতর ঢুকে পরলো।

মা: আজ তোকে খুব সুন্দর লাগছে।

বেশ লজ্জা পেয়ে মায়ের কথায় মাথা নিচু করে নিলাম।

মা: সংসার জীবন বড়ই কঠিনরে মা। আমি জানি তুই মানিয়ে নিয়ে চলতে পারবি। জানিনা তারা কেমন মানুষ তবে যেমনই হোক না কেন তুই তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করবি। তাদের মন জুগিয়ে চলবি। কখনো স্বামীর মনে শ্বশুড় শাশুড়ির মনে কষ্ট দিবি না। হয়তো এরপর আর তোকে এসব কথা বলার সুযোগ পাবো না, তাই এখুনি বলে দিলাম। একটু পরেই হয়তো কাজী সাহেব চলে আসবে আমি এখন বের হচ্ছি।

কথাটা বলে মা বের হয়ে গেলে দরজাটা চাপিয়ে দিয়ে এসে খাটের এক কোনে বসে পরলাম। আমরা চার ভাই বোন, ভাইটা সবার ছোট, দেখতেও সবার চেয়ে সুন্দর হয়েছে। আমরা তিন বোন পেয়েছি মায়ের মত গায়ের রং, আর ভাইটা হয়েছে বাবার মত। উজ্জল ফর্সা, সবার আদরের ছোট ভাই। ভাইটার কথা ভাবতে ভাবতেই দরজার ওপাশ থেকে তার কণ্ঠ ভেসে আসলো।

দরজাটা খোলে দিতেই জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে দিলো। ওর সাথে সাথে আমিও কাঁদতে শুরু করে দিলাম। ওর মাথায় হাত দিয়ে কাঁদিস না ভাই আমার খুব কষ্ট লাগে তোর চোখে পানি দেখলে। শাকিল ভাই আমার এখন তোর উপর অনেক দ্বায়িত্ব। বাবা মাকে দেখে রাখবি, তুই ছাড়াতো আর কেউ থাকলো না এ বাড়িতে মা বাবাকে দেখে রাখার জন্য।

শাকিল: তুমি কেঁদো না আপু, আমি সব দেখে রাখবো। তুমিও ও বাড়িতে যেয়ে নিজের যত্ন নিবা।

দুই ভাই বোন কথা বলতে বলতেই বড় আপু চলে আসলো ঘরের ভিতর।

বড় আপু: কিরে তোরা কান্না করছিস কেন? বর পক্ষ চলে এসেছে শাকিল তুই নিচে যা। যেয়ে দেখ কিছু লাগবে কিনা ওদের। আমার কিছু কথা আছে উপমার সাথে।

শাকিল চলে যেতেই বড় আপু দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে এসে আমার হাত ধরে বিছানায় বসিয়ে।

বড় আপু: শোন উপমা আমরা তিন বোন কালো, আর তাই শ্বশুড় বাড়িতে হয়তো অনেক কথা শুনতে হয়, হয়তো তোকেও শুনতে হতে পারে। তাই আগে থেকেই মন শক্ত করে নে। সবার মন রেখে চলার চেষ্টা করবি। এ জীবনে কালো বলে আমাকে তোর মেজ আপুকেও অনেক কথা শুনতে হয়েছে। তা তুই ভালো করেই জানিস। এখন আল্লাহর রহমতে আমি তোর মেজ আপু দুজনেই ভালো আছি। আর দোয়া করি বিয়ের পর আল্লাহর রহমতে তুই ও ভালো থাকতে পারিস এই দোয়াই করি।

উপমা: তুমি চিন্তা করো না আপু, ছোট বেলা থেকেই তো কত কথা শুনছি মানুষের। এসব শুনতে শুনতে এখন আর গায়ে লাগে না। আর “নিশ্চই আল্লাহ যা করবেন তার বান্দার ভালোর জন্যই করবেন।”

বড় আপু: হ্যাঁ দোয়া করি তাই যেন হয়। ও হ্যাঁ তোকে তো বলাই হয়নি তোর হবু বর একদম রাজ কুমারের মত দেখতে।

উপমা: কিছুটা লজ্জা পেয়ে ইস আপু কি যো বলো না তুমি।

বড় আপু: আহারে আমার বোনটা লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছে। আচ্ছা তুই রেস্ট কর আমি যাচ্ছি।

কথাটা বলে বড় আপু রুম থেকে বের হয়ে গেলো।

খাটের উপর বসে ভাবছি আচ্ছা আমার হবু বর যদি সত্যিই অনেক সুন্দর হয় তবে কেন আমাকে বিয়ে করতে রাজী হলো। আমাকে সে দেখতে আসেনি। বিয়ের আগে ও বাড়ি থেকে একবার শুধু আমার হবু শ্বশুড় শাশুড়ি এসেছিলো। পরে তারা বাড়িতে গিয়ে জানিয়েছিলো তাদের আমাকে পছন্দ হয়েছে। আর আজকের তারিখ ঠিক করেছে বিয়ের জন্য।

ছোট বেলা থেকেই শুনে এসেছি জন্ম মৃত্যু বিবাহ সব আল্লাহর হাতে। এবং এতো বছর তাই বিশ্বাস করে এসেছি। শুনেছি যে আল্লাহর উপর ভরসা করে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট্য আজ তার প্রমাণ পাচ্ছি। দুই বছর আগে মাস্টার্স শেষ করেছি। ভার্সিটি জীবনে তেমন নতুন করে কোন বন্ধু বান্ধবি হয়নি আমার। আসলে আমিই খুব ভয় পেতাম কাউকে বিশ্বাস করতে কেননা বরাবরই আমি কালো বলে সবাই আমার পেছনে আমাকে নিয়ে উপহাস করতো। কাউকে কখনো বুঝাতে পারতাম না আমার গায়ের রঙ কালো এটাতো আমার দোষ নয়। আল্লাহ আমাকে কালো বানিয়ে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। তিনিই তার সকল বান্দার শরীরের গঠন আগে থেকেই ঠিক করে পাঠিয়েছেন। তাহলে কেন এই সমাজের মানুষ গুলো শরীরের রঙ দেখে মানুষ বিবেচনা করেন? ভার্সিটি জীবনটা বলতে গেলে একাই কাটিয়েছি। দুই বছর আগে মাস্টার্স শেষ করি এই দুই বছরে অসংখ্য পাত্র পক্ষ আমাকে দেখতে এসেছে, কারোরই আমাকে পছন্দ হয়নি। যদিও দুই একজন আমাকে পছন্দ করেছে তারাও মোটা অংকের যৌতুক দাবী করেছে। আমার বাবা চাইলেই তাদের দিতে পারতেন যৌতুক কিন্তু আমি তাতে রাজী ছিলাম না। কেননা যে টাকা যৌতুক দিবো তা আমি আমার বাবার বাড়িতে সাড়া জীবন বসে খেলেও শেষ হবে না। তবে কেন তাদের এতো টাকা দিতে যাবো। আমি কখনোই হতাশ হইনি। বাবা মা আমার মাথায় আস্থার হাত রেখে বলতো “নিশ্চই আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী” সে অবশ্যই তোমার জন্য উত্তম কিছুই লেখে রেখেছেন। তোমাকে শুধু ধৈর্য ধরে থাকতে হবে সে দিনের জন্য। আমিও তাই বিশ্বাস করি কেননা ছোট বেলা থেকেই চেষ্টা করেছি পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়তে কুরআন পাঠ করতে। যখনি মন খারাপ হতো তখনি আমি কুরআন শরীফ খুলে পড়তে শুরু করে দিতাম। একটা সময় পরম শান্তিতে হৃদয় জুড়িয়ে আসতো।

ছোট ভাইটা সব সময় আমার পাশে থেকেছে সাহস যুগিয়েছে। যখন আমার খুব মন খারাপ হতো তখন ও পাশে এসে বলতো আপু আমি না কখনো কোন সুন্দির মেয়েকে বিয়ে করবো না। যদি প্রশ্ন করতাম কেন সুন্দরি মেয়েকে বিয়ে করবি না? ও হাসতে হাসতে বলতো যাতে কেউ এসে না বলতে পারে তোমার বোনদের চেয়ে আমি বেশী সুন্দরি। কেননা আমার বোনরাই পৃথিবীর সব চেয়ে বেশী সুন্দর আমার চোখে। এই যে তুমি দেখো তুমি প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ো, ফজরের নামায শেষে কুরআন পাঠ করো, কয়টা ঘরে এমন হয়। তুমি যখন এতো মিষ্টি মধুর সুরে কুরআন পাঠ করো তখন কি পরিমাণ যে ভালো লাগে তা বলে বুঝাতে পারবো না। এখন তুমিই বলো আধুনিক এই যুগে কয়টা মেয়ে সকালে উঠে নামায পড়ে? এতো সুন্দর মধুর সুরে কুরআন তেলোয়াত করতে পারে? আসলে আল্লাহ আমার বোনদের বিশেষ গুন দিয়ে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। তিনি তার প্রিয় বান্দাদের বিশেষ গুন দিয়ে থাকেন। ছোট ভাইটার কথা শুনে না হেসে পারি না। মুহুর্তেই মন ভালো হয়ে যেতো। সত্যিই আমার ভাইয়ের মাঝে আল্লাহ বিশেষ গুন দিয়েছেন যা দিয়ে সে মুহুর্তে আমার মন ভালো করে দিতে পারে।

ভাবতে ভাবতে তন্দ্রাভাব চলে এনেছিলো। হুট করেই দরজায় টোকা পরতে চোখ মেলে তাকালাম।

মেজ আপু: ঘরে ঢুকতে ঢুকতে কিরে তুই কি ঘুমিয়ে পরছিলি নাকি?

উপমা: না আপু এইতো একটু তন্দ্রাভাব চলে এসেছিলো।

মেজ আপু: আচ্ছা মাথায় ঘোমটা দিয়ে ভালো ভাবে বস এখুনি কাজী চলে আসবে। আপু কথাটা বলে শেষ করতে না করতেই বড় আপু মা আর আমার কাজিনরা দৌঁড়ে ঘরে ঢুকে পরলো। আমি দ্রুত মাথায় ঘোমটা দিয়ে বসে পরলাম। এর কিছু সময় পর কাজী চলে আসলেন। রাত ঠিক এগাড়োটা ত্রিশ মিনিটে আমাদের বিয়ের কাজ সম্পন্ন হলো। খাওয়া দাওয়া শেষ হতে হতে রাত প্রায় একটা বেজে গেলো। বিদায় লগ্নে এসে বাবা মায়ের চোখে পানি দেখে হৃদয়টা ফেটে যাচ্ছিলো।ইচ্ছে করছিলো দৌড়ে বাড়ির ভিতর ঢুকে যাই। চিৎকার করে বলি মা বাবা শাকিল আমি তোমাদের রেখে কোথাও যাবো না। মা আমাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে ফিসফিস করে বললো মেয়েদের সবচেয়ে বড় গুন ধৈর্য ধরা। যে মেয়ে যত ধৈর্যশীল। তার সংসার জীবন ততই মধুময় হয়। আমি দোয়া করি তোর সংসার জীবন অনেক সুন্দর ও শান্তিময় হোক।

চারিদিকে তাকিয়ে কোথাও শাকিলকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। শেষ মুহুর্তে এসে ছোট ভাইটাকে দেখতে পাচ্ছি না। কি যে কষ্ট লাগছিলো অন্য দিকে মনকে বুঝাচ্ছিলাম শাকিল আমার চেয়ে বেশী কষ্ট পাচ্ছে আমার চলে যাওয়াতে। এতো কিছুর মাঝেও একবার ও আমার মনে হলো না যে মানুষটার সাথে সারা জীবন সংসার করবো তাকে এক নজর দেখার দরকার। এখনো যে আমি তাকে দেখলাম না, আচ্ছা সে কি আমাকে দেখেছে?

চলবে…