মেঘের ওপারে পর্ব-০৫

0
361

#মেঘের_ওপারে
#পর্ব:৫
#অন্তরা_দেবযানী

নিজের রুমে সোফায় বসে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে আছে শ্রেয়ান।তার মাথায় অদ্রির সকালের বলা কথাগুলো ঘুরছে।এই প্রথম অদ্রি তার নাম ধরে স্পষ্টভাবে ডাকলো।তার কাছে মনে হচ্ছে সময়টা থমকে গেছে।নাহ! থমকে যায়নি। পিছিয়ে গেছে।পিছিয়ে গেছে প্রায় নয় দশ বছর আগে।
“শ্রেয়ান তখন খুব ছোট।কোনো বন্ধু ছিল না।কোনো খেলার সঙ্গী ছিল না।তাই মন খারাপ করে বসে ছিল। তখনই একটা বাচ্চা মেয়ে তার কাছে আসে।
— আমা সাথে খেলবে?
শ্রেয়ান ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ বাচ্চা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকে।
— আমি অপরিচিত কারো সাথে খেলি না।শ্রেয়ান মুখ ঘুরিয়ে বলে।
— তাহলে চলো পয়িচিত হয়ে নি।আমি অদ্দিজা।

শ্রেয়ান ভ্রু কুঁচকে বাচ্চাটার কথা কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করল। অস্পষ্ট কথা বলছে। বিশেষ করে ‘র’ উচ্চারণ করতে পারছে না।তবে কি বলছে তা ঠিকই বোঝা যাচ্ছে।বলে,
— ঠিক আছে।আমার নাম শ্রেয়ান রেজওয়ান।
— সেয়ান য়েজোয়ান?
— নাহ্!শ্রেয়ান।
— শেয়ান।

বাচ্চা মেয়েটার ঠিক মতো উচ্চারণ না করতে পারার ব্যাপারটা শ্রেয়ানের বেশ মজা লাগল।

— আরে শেয়ান না শ্রেয়ান।ঠিক করে বলতে পারিস না।শ্রেয়ান হাসতে হাসতে বলে।
— উফ! তোমা নামটা খুব কঠিন।আমাটা দেখ কত্তো ছোট অদ্দিজা। বাচ্চা মেয়েটা বিরক্ত হয়ে বলে।
শ্রেয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
— অদ্দিজা!এটা কোনো নাম হলো? অদ্দিজা,,,,,,,,অদ্দিজা নাকি অদ্রিজা।অদ্রিজাই হবে হয়ত।বিরবির করে বলল শ্রেয়ান।
বাচ্চা মেয়েটাকে বলে, বুঝেছি তোর দ্বারা ‘র’ উচ্চারণ হয় না। তুই আমাকে শান বলেই ডাকবি।
— আচ্ছা।চল,খেলবো।”

অস্বস্তিকর লাগছে শ্রেয়ানের। আজকাল অদ্রির কথা একটু বেশি বেশি মনে পরে। বিশেষ করে পুরোনো স্মৃতিগুলো। কিন্তু পুরোনো স্মৃতিগুলো মনে করতে চায়না সে।সেসব কথা মনে করলেই তার মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। খুব কষ্ট হয় তখন। নিজেকে কেমন একা একা লাগে।মাকে সুস্থ করার জন্য চিকিৎসার উদ্দেশ্যে লন্ডন নিয়ে গিয়েছিল ঠিকই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাঁচাতে পারে নি।

☆☆☆

অদ্রির মাথায় কিছু ঢুকছে না। একদিন সে কি করে ঘুমালো?আর এখানেই বা আসলো কি করে?
বিরক্ত লাগছে এবার এসব ভাবতে।মাথায় চিনচিন ব্যথাও করছে।
আয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলে, ভাইয়া আমি এখানে কিভাবে এলাম?

— সেসব কথা পরে হবে।আগে ডাক্তারের কাছে চল।
— না। আগে বল।
— বলেছি তো পড়ে বলব।এখন ডাক্তারের কাছে যাওয়াটা বেশি জরুরি।
— না, তুমি না বললে আমি যাব না। তাছাড়া ডাক্তারের কাছে যেতে ইচ্ছা করছে না।
— কিন্তু যেতে তো হবেই।আয়ান খানিকটা চড়া গলায় বলে।

অদ্রি তেজ দেখিয়ে বলে, উহুম একদম না।আগে বল আমি এখানে কিভাবে?আমার মাথায় তো কিছুই ঢুকছে না।

— উফ!কি জ্বালা।আয়ান বিরক্তি নিয়ে বলে।

অদ্রিকে উদ্দেশ্য করে বলে,আমি তোকে একটা ইম্পর্ট্যান্ট কথা বলার জন্য ফোন করেছিলাম। কিন্তু তুই তো ফোন ধরছিলি না।ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। বারবার ফোন করতে থাকি। তারপর তোর রুমমেট মহুয়া ফোন করে বলে তুই ঘুমাচ্ছিস।তোকে অনেকবার ডেকেও জাগাতে পারছে না। তখনই তাড়াতাড়ি গিয়ে তোকে নিয়ে এসেছি। হয়েছে!এবার চল।
— কোথায়?
— কোথায় আবার ডাক্তারের কাছে।
— কেন?
— তোর ঘুমের রহস্য জানব। আল্লাহ্!এত ঘুম কিভাবে ঘুমাস?আগে তো এতো ঘুমাতি না।

অদ্রি অবাক হয়। সত্যিই কি সে এতটা সময় ঘুমিয়েছে! বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।

অদ্রি চুপ করে কিছু একটা ভাবতে লাগল। হঠাৎ বলে উঠে, তুমি বলছিলে না কি একটা ইম্পর্ট্যান্ট কথা বলার জন্য ফোন করেছিলে!কথাটা কি?

আয়ান বিরক্তি নিয়ে বলে,পরে বলব। আগে চল। এমনেই অনেক টেনশনে ফেলে দিয়েছিস।

অদ্রি আবারও তেজ দেখায়।বলে, উহুম!আগে বল,,,,তারপর যাব।
আয়ানের এবার বেশ রাগ হয়।রাগ দেখিয়ে কিছু বলতে যাবে।তখন শ্রেয়া চলে আসে।বলে, অদ্রি তোকে যেতেই হবে।

অদ্রি তেজ দেখিয়ে বলে,যাব না।আমার ভালো লাগে না ডাক্তারের কাছে যেতে।
— কিন্তু সুস্থ হতে হলে তো যেতেই হবে।
— কি হয়েছে আমার?আমি তো সুস্থই।
— হুম সুস্থ তুই। খুব সুস্থ।তাই তো পায়ের এই অবস্থা।

অদ্রি অবাক হয়।তার পায়ের আবার কি হলো? কোথায় এখন তো কোনো ব্যথা পাচ্ছে না। পায়ের দিকে তাকিয়ে হালকা নাড়তেই পায়ে ভয়ঙ্কর ব্যথা অনুভব করল। অদ্রির মুখটা কালো হয়ে যায়।
তবুও এক প্রকার জেদ দেখিয়ে বলে,ছেড়ে দাও না। ইচ্ছে করছে না যেতে।
— উহুম!কোনো ছাড় নেই।
— না ছাড়ার মালিক কি তুমি?

পাশ থেকে আয়ান বলে উঠে, এখানে ছাড়ার কথা উঠছে কোথা থেকে।সেলফ রিয়েলাইজেশন হচ্ছে,আমরা নিজেরাই নিজের মালিক।যে যার অবস্থানে থেকে অ্যাক্টিভ থাকতে হয়। তোকে সাবধানে থাকতে বলেছিলাম। কিন্তু তুই কি করলি?এখন যদি ইনফেকশন হয় তোর ধারণা আছে কি হতে পারে? নিজের ভালোটা নিজেই তো বুঝিস না।

শ্রেয়া রাগ দেখিয়ে বলে,তুই এখন আমাকে একদম ভালোবাসিস না অদ্রি! যদি ভালোবাসতি তো আমার কথায় রাজি হয়ে যেতিস।

অদ্রি এবার মুখে কিছু বলল না। কিন্তু মনে মনে একটু বিরক্ত হল। এবার কি তাকে ভালোবাসা প্রকাশ করার জন্য নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সব কাজ করতে হবে!
শ্রেয়া অদ্রির হাত টেনে ধরল।বলে,ওঠো অদ্রিজা মনি! ডাক্তারের কাছে যাব।

অদ্রি এবার শ্রেয়ার আদুরে অবদার ফেলতে পারল না।হয়ত এবারও জেদ করতে পারতো। কিন্তু ইচ্ছে হয়নি।

শ্রেয়া অদ্রিকে ধরে গাড়িতে বসিয়ে দিল।

☆☆☆

অদ্রি তার বড় আম্মু রিহা রায়হানের রুমে বসে আছে।রিহা রায়হান নিজের হাতে অদ্রিকে খাইয়ে দিচ্ছে। অদ্রি বেশ অবাক হচ্ছে। হঠাৎ করে মানুষটার এই ভাবে বদলে যাওয়ার কারণ বুঝতে পারছে না সে।তবে এসব যে তিনি মন থেকেই করছে তা বেশ বোঝা যাচ্ছে।
যে মানুষটা তাকে আগে সহ্যই করতে পারত না,সে মানুষটা হঠাৎ এতোটা বদলে গেল!

হঠাৎ অদ্রির আয়ানের কথা মনে পড়ে।
ধীর পায়ে অদ্রি তাড়াতাড়ি রিহা রায়হানের রুম থেকে বের হয়ে যায়। আয়ানের কাছে যাবে।কি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার জন্য ফোন করেছিল তা জানার জন্য মনটা খচখচ করছে।
অদ্রি আয়ানের রুমে যায়।আয়ান গভীর মনোযোগ দিয়ে ল্যাপটপে কাজ করছে।

কারো উপস্থিতি টের পেয়ে চোখ তুলে তাকায়। তাড়াতাড়ি গিয়ে অদ্রিকে টেনে সোফায় বসিয়ে দিল।
— কিছু বলবি?
— ওই সময় কি কথা বলার জন্য ফোন করেছিলে?
আয়ান বিরক্ত হয়।ঐ ব্যাপারটা এখনো মাথা থেকে যায়নি!
ছোট একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে আয়ান উঠে আলমারির কাছে যায়।খুলে কিছু পেপার্স হাতে নেয়।
আয়ান পেপার্সগুলো অদ্রির দিকে এগিয়ে দিল।

অদ্রি অবাক হয়। পেপার্সগুলো হাতে নেয়। উল্টেপাল্টে দেখতে থাকে।জিজ্ঞেস করে, এগুলো কিসের পেপার্স, ভাইয়া?

চলবে,