মেঘের ওপারে পর্ব-০৭

0
357

#মেঘের_ওপারে
#পর্ব:৭
#অন্তরা_দেবযানী

সকাল সাতটা বাজছে।ঘুমে ঝিমুচ্ছে আর বইয়ে মুখ গুজে আছে অদ্রি। সামনে মোটা বেত নিয়ে বসে আছে আয়ান।হাতে ফোন।মাঝে মাঝে হাসছে।
অদ্রি আয়ানের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। অসুস্থ বলে আজ এক সপ্তাহ আয়ান ভার্সিটিতে যেতে দেয়নি। কিন্তু আবার পড়াশোনায় ছাড়ও দেয় নি। নিয়ম করে ভোরে ঘুম থেকে উঠায়। দুই ঘন্টা বসে পড়ায়।এরপর অফিসে যাওয়ার আগে অদ্রিকে ওষুধ খাইয়ে আরো পড়া দিয়ে যায়। অফিস থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে অদ্রির থেকে পড়াগুলো আদায় করে। এরপর অদ্রির ছুটি।
এই এক সপ্তাহ ধরে শ্রেয়াও আসে না। শ্রেয়া আসলে অদ্রি ঠিকই আয়ানের নামে বিচার দিত।এতো সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে কষ্ট হয় তার।আয়ান কি এসব বুঝে না?হয়ত বুঝে। সে জানে আয়ান এসব তার ভালোর জন্যই করছে। তবুও ভালো লাগে না তার। অনেক দিন ভার্সিটিতে যেতে পারে না তাই মনও খারাপ।

আয়ানের আজ অদ্রিকে পড়ানোর দিকে খেয়াল নেই।ফোনে শ্রেয়ার সাথে চ্যাটিং করছে।
হঠাৎ অদ্রির দিকে নজর যায়।ঘুমে ঝিমুচ্ছে।অদ্রিকে দেখিয়ে বেতটা তুলতেই অদ্রির ঘুম উধাও।পড়া শুরু করে দেয়।আয়ান মুচকি হাসে।

অদ্রি আয়ানকে আড় চোখে একবার দেখে নেয়।বলে, ভাইয়া!
আয়ান গম্ভীর গলায় বলে,বল।
— আজকে ভার্সিটিতে যাই।
— উহুম।
— যাই না প্লিজ। কতদিন যাই না।
— তুই অসুস্থ।এখন যেতে পারবি না।

অদ্রি ঠোঁট উল্টিয়ে বলে, কোথায় অসুস্থ?পা তো ঠিক আছে।আমি হাঁটতেও পারি ঠিকভাবে।যাই না?
— বললাম তো না।

অদ্রি চোখ পানিতে টলমল করছে।নাক টেনে বলে,যাই?
আয়ান অদ্রির দিকে তাকায়। সাথে সাথে চোখ ফিরিয়ে নেয়।ঐ চোখের দিকে তাকালে ঐ মায়াবী চোখ দুটো ঠিকই তাকে বশ করে ‘ঠিক আছে’ উত্তর বের করে নিবে। কিন্তু এই অবস্থায় অদ্রির বাইরে যাওয়া ঠিক হবে না। ডাক্তার বলেছে অদ্রির পায়ে কোনো প্রকার আঘাত লাগতে দেওয়া যাবে না। ইনফেকশন হলে এরপর হয়ত তার পা বাদ দিতে হতে পারে। আয়ানের নিজের কোনো বোন নেই।অদ্রিকে নিজের বোনের মতো ভালোবাসে।অদ্রিকে নিয়ে কোনো প্রকার ঝুঁকি নিতে চায় না সে।

অদ্রি আয়ানের হাত ধরে বলে,প্লিজ যাই?

আয়ান অদ্রিকে একবার দেখে নেয়। ছোট শ্বাস ছেড়ে বলে, আচ্ছা। কিন্তু আমি দিয়ে আসব।আমিই নিয়ে আসবো।
অদ্রি খুশি হয়ে যায়।বলে, আচ্ছা।

আয়ান রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
অদ্রি মনে মনে বেশ খুশি হয়। তাড়াতাড়ি চলে যায় তৈরি হতে।আজ অনেক দিন পর ভার্সিটিতে যাবে।এক সপ্তাহ তার কাছে যেন এক মাসের সমান।
অদ্রির ফোন বেজে উঠে। শ্রেয়া ফোন করেছে। অদ্রি সাথে সাথে রিসিভ করে।
— হ্যালো শ্রেয়া আপু সরি ভাবী,কেমন আছ?এখন আস না কেন?
— তোকে ভীষণ খুশি মনে হচ্ছে!
— হ্যাঁ।আজ ভার্সিটিতে নিয়ে যাবে বলেছে।
— আয়ান?
— হ্যাঁ।
শ্রেয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।আর অদ্রি শ্রেয়ার কথার আসার অপেক্ষায় থাকে। শ্রেয়া গম্ভীর হয়ে বলে, আয়ানের অফিস আছে।তোমার পিছনে এত সময় নষ্ট করছে কেন?

কথাটা যেন অদ্রির বুকে তীরের মত আঘাত করে।চোখ টলমল করে উঠে।কি বলবে ভেবে পায় না।
শ্রেয়া আবারও বলে,আসলে অদ্রি আমি তোকে হার্ট করতে চাইনি। মানে বলছি,তোর পা তো মোটামুটি ঠিক আছে। আয়ানকে শুধু শুধু কষ্ট দিয়ে কি লাভ!তোর তো এখন একা যাওয়ার মতো কন্ডিশন আছে।আয়ান একা হাতে সবটা সামলাচ্ছে তো তাই,,,,,,,।ওর দিকটাও তো ভাবতে হবে।

অদ্রি কিছু বলে না।ফোন কেটে দেয়।মুখ চেপে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে দেয়। সত্যিই তো মানুষটা তার পিছনে অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট করছে।আয়ানের দিকটা তো ভাবতে হবে। কিন্তু এত কিছুর মধ্যেও শ্রেয়ার কথায় তার বেশ কষ্ট হচ্ছে।মাথাটাও ব্যথা করছে।

আয়ান আসে।অদ্রিকে বলে,এখনো আগের মতো দাঁড়িয়ে আছিস?তোকে দিয়ে তো অফিস যেতে হবে।
— তুমি গাড়িতে অপেক্ষা কর আমি আসছি।
আয়ান চলে যায়। অদ্রি উল্টো দিকে ঘুরে ছিল।তাই হয়ত তার চোখের পানি দেখতে পায় নি।

অদ্রি বিরবির করে বলে,আর একটু অপেক্ষা কর। বেশি দিন তো আর না! তারপরই তো চলে যাব সবকিছু ছেড়ে।
অদ্রি শক্ত হয়ে হাতের তালু দিয়ে চোখ মুছে নেয়।

☆☆☆

ক্যাম্পাসে গাছের নিচে বসে গল্প করছে শ্রেয়ানের ফ্রেন্ডরা।শ্রেয়ান নিরবে বসে শুনছে।এই সপ্তাহ ধরে অদ্রিকে একবারও দেখতে পায় নি।মনটা কেমন অশান্ত লাগছে।জানতে ইচ্ছে করছে কি হয়েছে অদ্রির? কেন আসছে না ভার্সিটিতে? সেদিন শ্রেয়াকে জিজ্ঞেস করলে হয়ত ভালো হতো।

শ্রেয়ানের ইচ্ছা করছে অদ্রিকে একবার ফোন করে জিজ্ঞেস করতে। কিন্তু পারছে না।কিসে যেন বাধছে।হয়ত ইগোতে চোট লাগতে পারে এই ভয়! শ্রেয়াকেও জিজ্ঞেস করতে পারছে না। ফোন করে জিজ্ঞেস করতেই পারে কিন্তু পারছে না।হয়ত শ্রেয়া কি ভাববে সেই ভয়!

রাজ ধাক্কা দেয়।বলে,কই আছিস?

শ্রেয়ান বেশ বিরক্ত হয়। রাগে কিড়মিড় করে বলে,তোর চোখের সামনে বসে আছি দেখতে পাচ্ছিস না?
— আরে আরে,আমি তো বলতে চেয়েছি তোর মন কই?

পাশ থেকে কায়েস বলে,আরে রাজ!ওর মন কোথায় পড়ে আছে সেটা তুইও জানিস আমিও জানি শুধু শুধু জ্বালাস না?

— ওই দেখ,অদ্রিজা আসছে?শ্রেয়ানের কাঁধে হাত রেখে বলে কায়েস।
শ্রেয়ান ওদিকে একবার তাকায়।তারপর কায়েসকে বলে,তো আমি কি করব?
— তুই কিছু করবি না?
রাজ বলে,ও কি করবে? ও তো অদ্রিকে সহ্য করতেই পারে না।
— সেটা কোনো ব্যাপার না।ও পারে না কি হয়েছে?আমি তো পারি!
শ্রেয়ান ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,মানে?
— তোকে কেন বলব?এই রাজ চল অদ্রির সাথে একটু কথা বলে আসি।

হঠাৎ রিদ্ধি এসে রাজকে উদ্দেশ্য করে বলে,এই রাজ!একটু এদিকে আয় তো?
— কেন?
রিদ্ধি চোখ রাঙায়।
— এত কথা বলিস কেন?চল।
রাজ আর কিছু বলে না। রিদ্ধির সাথে যায়।

কায়েস শ্রেয়ানকে একবার দেখে নেয়।বলে,
— এই শ্রেয়ান আমার সাথে চল তো।
— তোর কথা বলার ইচ্ছা তো তুই যা না।আমি কেন যাব?
কায়েস রাগ দেখিয়ে বলে,তুই আজকাল একটু বেশিই করিস।তুই কথা বলিস না আমি বলব।চল।
কায়েস শ্রেয়ানকে টেনে নিয়ে যায়।

অদ্রির পায়ের ব্যথা এখনো যায়নি। দ্রুত হাঁটতে পারে না। তবুও আজ দ্রুত হাঁটার চেষ্টা করছে। আয়ানের কড়া নির্দেশ শ্রেয়ানের সাথে কথা বলা যাবে না। আয়ানের এমন অদ্ভুত নির্দেশে অবাক হলেও কিছু বলে নি সে।আয়ান সবসময় তার ভালোই চায়।আড় চোখে শ্রেয়ানকে দেখে তাড়াতাড়ি হাঁটছে।

হঠাৎ তার সামনে তাদের এসে দাঁড়াতে দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। কায়েস বলে,হাই অদ্রিজা!কেমন আছ?
— তোমাকে কেন বলব?আমি তো তোমাকে চিনি না।মুখ বাঁকিয়ে বলে অদ্রি।
— তাহলে চল পরিচিত হয়ে নেই।আমি কায়েস মেহতাব।
অদ্রির ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায়।শ্রেয়ানের দিকে তাকায়।শ্রেয়ানকে দেখে অদ্রি অবাক হয়।শ্রেয়ানও আড় চোখে তাকিয়ে আছে। অদ্রির চোখে চোখ পড়তেই চোখ সরিয়ে নেয়।

কায়েস আবার বলে,কিছু বললে না অদ্রিজা, তোমার নাম কি?
অদ্রি হেসে দেয়।বলে,আমার নাম ধরে ডেকে আবার নাম জিজ্ঞেস করছো?
— ওহ্,সরি! কায়েস লজ্জা পাওয়ার ভাব এনে মাথা চুলকায়।
অদ্রি হাঁটা শুরু করে। কায়েস আবার ডাক দেয়।
— আরে আরে,কথাই তো বললাম না আর তুমি চলে যাচ্ছ?এটা ঠিক না। আচ্ছা তুমি এতদিন আসলে না কেন।
— তাতে কার কি যায় আসে।আমি বাঁচলেও বা কি মরলেও বা কি!
— যাক বাবাহ!কি জিজ্ঞেস করলাম আর কি উত্তর দিল!বিরবির করে বলে কায়েস।

শ্রেয়ান এতক্ষণ চুপ করে থাকলেও অদ্রির শেষ কথা শুনে চুপ করে থাকতে পারলো না।বলে, অদ্রিজা!তোর কি হয়েছিল?
অদ্রি প্রথম প্রথম খুশি হলেও অদ্রিজা ডাক শুনে খুশি হল না।তার উপর আয়ানের নির্দেশনার কথা মনে পড়ে যায়।কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চুপ করে থাকাও তার স্বভাব বিরুদ্ধ।

অনেকক্ষন চিন্তা করে কড়া করে বলে,আপনাকে বলার প্রয়োজন মনে করি না।
কায়েস বলে, শ্রেয়ান তুই তো ওকে পছন্দ করিস না।তুই বরং চুপ থাক।

শ্রেয়ান দমে যায়।ইগোতে চোট লাগে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।
কায়েস অদ্রির কাছে গিয়ে বলে, আমরা কি ফ্রেন্ড হতে পারি!
— উহুম,,,না। তুমি আমার থেকে বড়।
— তাতে কি?শ্রেয়ানো তো তোমার থেকে বড়।ওর সাথে তো তোমার ভালো ফ্রেন্ডশিপ ছিল।

অদ্রি জিভ কাটে।বলে,ঠিক তো। আচ্ছা তুমি আর আমি এবার থেকে ফ্রেন্ড।

অদ্রি আড় চোখে শ্রেয়ানের দিকে তাকায়।শ্রেয়ান তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
— আচ্ছা এখন আমি আসি।বলে অদ্রি হাঁটা শুরু করে।
— আরে চলো আমিও তোমার সাথে যাই।আমরা তো ফ্রেন্ড তাই না!এই শ্রেয়ান তুই যাবি?

শ্রেয়ান উল্টোদিকে ঘুরে হাঁটা শুরু করে। কায়েস বলে, আচ্ছা অদ্রিজা চল আমরা যাই।
— তাই চলো!

☆☆☆

রিহা রায়হানের রুমে চিন্তিত হয়ে বসে আছে অদ্রি। তাকে জরুরি কথা বলার জন্য ডেকেছেন তিনি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কিছু বলছে না। অদ্রি তাড়া দেয়।বলে,কি জন্য ডেকেছো তাড়াতাড়ি বল না!
রিহা রায়হান দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মৃদু কন্ঠে বলে,তুই অনেক বড় হয়ে গেছিস।আর কথা লুকানোও শিখেছিস।
— মানে? অদ্রি অবাক হয়ে প্রশ্ন করে।
— কিছু না।শোন,,,,,চিকিৎসাটা করিয়ে নে,মা।

অদ্রি ঘাবড়ে যায়।তোতলাতে তোতলাতে প্রশ্ন করে, কি,,,,কিসের চিকিৎ,,,,,,সা?

চলবে,