#মেঘের_ওপারে
#পর্ব:৮
#Devja_Ni
রিহা রায়হান অদ্রির মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
— কিসের চিকিৎসা সেটা তুইও জানিস আমিও জানি।আয়ানকে বলে,,,,
— তুমি কিসব বলছ আমি বুঝতে পারছি না!
— মিথ্যে কথা বলাও শিখে গেলি?
অদ্রি মাথা নিচু করে বসে আছে।তার বড় আম্মু কি বিষয়ে বলছে তা বেশ বুঝতে পারছে।
রিহা রায়হান হাসে। বিছানার নিচ থেকে কিছু রিপোর্ট বের করেন। অদ্রির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,এটা কি?
অদ্রি দেখেই দ্রুত হাতে নিয়ে নেয়।
— এটা তোমার কাছে কি ভাবে?তার মানে সেদিন তুমি আমার আলমারি খুলেছিলে?
— না খুললে বোধ হয় জানতে পারতাম না,তুই আমাদের ছেড়ে চলে যেতে চাইছিস।
অদ্রি চুপ। মুখ থেকে কোনো কথা বের হচ্ছে না।
রিপোর্টার দিকে তাকায়। রিপোর্টে স্পষ্ট লেখা আছে সে ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত।
অদ্রির চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে।মনে পড়ে যায় ডাঃ রিয়াদের কথা। উনি বলেছিল তার কাছে বেশি সময় নেই। দ্রুত চিকিৎসা করলে হয়ত সে বাঁচতে পারে।নাহলে,,,,।তবে এর মধ্যেই অনেকগুলো দিন চলে গেছে।
রিহা রায়হান বলে,আমি একজন ভালো ডাক্তারের সাথে তোর ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলেছি।
— তাতে কোনো লাভ নেই বড় আম্মু।অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। তাছাড়া আমার জন্য তোমরা অনেক করেছ ।আর না,,,। কাঁদতে কাঁদতে বলে অদ্রি।
— তুই আমার মেয়ের মতো।তোর জন্য করব নাতো কার জন্য করব।আমি আয়ানকে বলে আজি তোর ব্যবস্থা করছি।বেশি বড় বড় কথা শিখে গেছিস তাই না!রিহা রায়হান ধমক দিয়ে বলে।
অদ্রি ঘাবড়ে যায়।রিহা রায়হানের হাত টেনে ধরে। নিজের শরীরের সঙ্গে ছুঁইয়ে বলে,কথা দাও তুমি এই কথা কাউকে বলবে না।
রিহা রায়হান এবার কেঁদে দেয়।
— কেন এমন করছিস?
অদ্রি তেজি গলায় বলে,কাউকে বলার হলে আমি বলব। তুমি নও।
— তুই সত্যিই বলবি?
— বলব। যদিও জানি বাঁচবো না। তবুও বলব।
— আমি ডাঃ আতিকের সাথে কথা বলেছি। উনি বলেছেন সময় আছে।আয়ানকে বলিস!
অদ্রি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে,,
— বলব।আমি এখন আসি। তুমি কেঁদো না।আমি চাই না আমার জন্য কেউ চোখের জল ফেলুক।
অদ্রি যত্ন সহকারে তার বড় আম্মুর চোখ মুছে দিল।
— এত যখন বুঝিস তাহলে এতদিন বললি না কেন?আমি যদি সেদিন তোর ঘরে গিয়ে আলমারি না খুলতাম,,,,,, তুই না থাকলে যে আমরা কাঁদবো তা বুঝিস না।বলে রিহা রায়হান আবার কেঁদে দেয়।
অদ্রিও কান্না করে দেয়। বলে,বুঝি।তবে সেটা সাময়িক। সময়ের সাথে সাথে তোমরা একদিন শোকটা কাটিয়ে উঠতে পারবে।
কান্না ভেজা কন্ঠে রিহা রায়হান আবার ধমক দেয়।
— আবার এসব উল্টাপাল্টা কথা বলছিস! তোকে,,,,
— আচ্ছা আর বলব না।আমি আসি। অনেকগুলো হোম টাস্ক বাকি আছে।
— আচ্ছা যা।আয়ানকে কিন্তু শীঘ্রই বলবি।
— সেটা পরে দেখে নিব।আমি আসি।
অদ্রি রিহা রায়হানের রুম থেকে বেরিয়ে যায়।ধীর পায়ে নিজ রুমের দিকে এগিয়ে যায়।চোখ থেকে এখনো পানি গড়িয়ে পড়ছে।
☆☆☆
সামনে পড়ার বই আর খাতা নিয়ে বসে আছে শ্রেয়ান। হোম টাস্ক কম্পলিট করছে। যদিও পড়াশোনায় মনোযোগ নেই।বারবার সেদিনের শ্রেয়ার কথাগুলো আর আজ সকালে অদ্রির ব্যবহারগুলো মনে পড়ছে।
পাশের রুম থেকে শ্রেয়া আর তার বাবার কথা ভেসে আসছে।শ্রেয়ান শোনার চেষ্টা করে। অস্পষ্ট শুনতে পেলেও আলোচনার বিষয় যে সে আর অদ্রি সেটা বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছে।
শ্রেয়ান দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।আজকাল তার কি হয়েছে বুঝতে পারে না।নিজেকে বড্ড বেশি একা একা লাগে।শ্রেয়াও আগের মতো তার সাথে কথা বলে না। শুধুমাত্র প্রয়োজনেই কথা বলে।তার বাবাও সারা জীবন টাকার পিছনে ছুটেছে।আজো ছুটে।তাকে দেওয়ার মতো কোনো সময় তার কাছে নেই।মাঝে মাঝে যা সময় পায় তাও শ্রেয়াকে দেয়।তার সাথে অপ্রয়োজনে কথা বলে না।কারণ তিনি মনে করেন স্ত্রীর মৃত্যুর জন্য সে দায়ী।তার স্ত্রী অসুস্থ থাকাকালীন তিনি শ্রেয়াকে নিয়ে লন্ডনে ছিল।শ্রেয়ানই তো তার মায়ের সাথে ছিল।তার মানে শ্রেয়ানই দায়ী। যদিও তার যুক্তি সংগত কারণ নেই। তবুও তিনি শ্রেয়ানের সাথে কথা বলেন না।
হঠাৎ শ্রেয়ানের নজর তার খাতার উপর যায়। অদ্রি শ্রেয়া শ্রেয়ান কিসব উল্টাপাল্টা শব্দ লেখে খাতা ভরিয়ে রেখেছে।
শ্রেয়ান বিরক্ত হয়।এক টানে পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলে। দুই ভাগে ছিঁড়ে বাইরে ফেলে দেয়।
☆☆☆
বালিশে মুখ গুজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে অদ্রি। ভাবছে,তার বড় আম্মু কেন আসতে গেলো তার রুমে! আলমারি কেন খুললো! অজানা তথ্য গুলো তো তার মৃত্যুর পর সামনে আসতোই। তখনই নয় জানতো।এত তাড়াতাড়ি কেন জানল!
সে তো ভেবেছিল একদিন হুট করে পৃথিবী থেকে উধাও হয়ে যাবে। সেদিন সবাই তাকে খুঁজলেও পাবেনা।হয়ত পাবে কিন্তু কথা বলতে পারবে না।তাকে আর কষ্ট দিতে পারবে না।আর সেও কষ্ট থেকে মুক্তি পাবে।
আজ আয়ানও তার সাথে দেখা করতে আসে নি। ওষুধ খেয়েছে কিনা তাও জিজ্ঞেস করতে আসে নি।
হঠাৎ অদ্রির ফোনটা বেজে উঠে। অদ্রির চোখ মুছে নেয়।ফোন তুলে দেখে আননোন নাম্বার থেকে কল। অদ্রি কেটে দেয়। মাথায় ব্যাথা করছে।এটা অবশ্য স্বাভাবিক ব্যাপার।
অদ্রির ফোন আবারও বেজে উঠে। অদ্রি বিরক্ত হয়ে ফোন রিসিভ করে।
— হ্যা,,,,,লো হ্যালো কে?
— আমি।
— আমি মানে?
— আমার কন্ঠ চিনতে পারছ না!
— না।
— কায়েস। আচ্ছা তোমার গলাটা এমন শোনাচ্ছে কেন? তুমি কেঁদেছো?
— হ্যাঁ। আপনার সমস্যা?
— তুমি শ্রেয়ানের জন্য কেন কাঁদছো?
— আপনি বেশি কথা বলেন।আপনাকে কে বলল আমি শান ভাইয়ার জন্য কাঁদছি। বিরক্ত হয়ে বলে অদ্রি।
— এই আমরা না ফ্রেন্ড। আপনি করে কেন বলো?
অদ্রি কিছু বলতে যায়।তার আগেই আয়ান রুমে চলে আসে।অদ্রিকে কথা বলতে দেখে হাত ফোন কেড়ে নেয়।আছড়ে ফেলে দেয় মেঝেতে।
অদ্রি ভয়ে জড়সড় হয়ে বসে।আয়ানকে বেশ রাগান্বিত লাগছে এই মুহূর্তে।
আয়ান রেগে গিয়ে প্রশ্ন করে,কার সাথে কথা বলছিলি তুই এত রাতে?
— আমার একটা ফ্রেন্ডের সাথে।
— ছেলে না মেয়ে?
অদ্রি চুপ করে আছে। কিছু বলছে না।
আয়ান হয়ত অদ্রির এই চুপ করে থাকায় উত্তর পেয়ে গেছে।আয়ান খানিকটা চিৎকার করে বলে, কেন আমার মানসম্মানের পিছনে পরে আছিস?তোকে বলেছি না এমন কোনো কাজ করবি না যাতে মানুষ আঙ্গুল তুলে আমার দিকে।
অদ্রি বোকার মতো চেয়ে আছে আয়ানের দিকে।বোঝার চেষ্টা করছে কথাগুলো।কি এমন করল সে যাতে আয়ানের মানসম্মান নষ্ট হয়। কায়েসের সাথে কথা বলায়! কিন্তু কারো সাথে কথা বললে কি মানসম্মান নষ্ট হয়!
আয়ান রেগে রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় অদ্রি পেছন থেকে ডাক দেয়।তার তো ওষুধ খাওয়া হয়নি। জানে না কি ওষুধ খেতে হবে! প্রতিদিন তো আয়ান খাইয়ে দেয়। কিন্তু আজ! অদ্রি কিছু বুঝতে পারছে না।আজ সবাই তার সাথে অদ্ভুত বিহেভ করছে। সকালে শ্রেয়া।এরপর শ্রেয়ান।এখন তার আয়ান ভাইয়াও।
— ভাইয়া!আমি ওষুধ খাব না?
— তোকে খেতে নিষেধ করেছে কে?রেগে গিয়ে বলে আয়ান।
— তুমি খাইয়ে দিবে না?
আয়ান আবারও একটু রেগে যায়।বলে,বড় হয়েছিস। নিজের কাজগুলো নিজে করতে শিখ।কতদিন ছুটবো তোর পিছনে।এবার থেকে নিজের কাজগুলো নিজে করা শিখ। বাচ্চাদের মতো ব্যবহার গুলো এবার ছাড়।
আয়ান কিছু ওষুধ দেয় অদ্রির হাতে।এরপর বেরিয়ে যায় রুম থেকে।
অদ্রি চুপ করে আছে।তবে চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে।কষ্ট হলেও কথাগুলো তো সত্যি! অদ্রি ওষুধগুলো জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দেয়।এই ওষুধগুলো তার গলা দিয়ে নামবে না।
অদ্রি মলিন হাসে।রাগের মাথায় আয়ান হয়ত ভুলে গিয়েছে ওষুধগুলোর নিয়ম ডিনারের পর খাওয়া।আর অদ্রি এখনো ডিনারই করে নি।সে তো শুধুমাত্র আয়ানের সাথে কথা বলার জন্য আয়ানকে আটকানোর জন্য বলেছে।তবে এতে অবশ্য খারাপ কিছু করেনি।তা ভালোই বুঝতে পারছে। যদি না বলত তাহলে হয়ত আয়ানের মনের কথাগুলো জানতে পারতোনা।
অদ্রি কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে যায়।
কারো নরম কন্ঠে অদ্রি ঘুমঘুম চোখে তাকায়।সামনে আয়ান বসে আছে। চোখে মুখে অনুশোচনা। মৃদু কন্ঠে বলে, অদ্রি তুই তো কিছু না খেয়েই শুয়ে পড়লি।ওঠ কিছু খাবি চল।
অদ্রি মুখ ঘুরিয়ে বলে,খাব না চলে যাও। প্রয়োজন হলে নিজে নিয়ে খাব।তোমার চিন্তা করার দরকার নেই।
— রাগ করেছিস?
— না। তুমি তো ঠিকই বলেছো।আমার জন্য তোমার অনেক কষ্ট হয়েছে।
— সরি রে!আয়ান অসহায় মুখ করে বলে।
অদ্রি চুপ করে আছে।
অদ্রির কোনো উত্তর না পেয়ে আয়ান আবারও বলে,রেগে গিয়েছিলাম।
অদ্রি এবার মুখ খুলে।বলে,
— জানি।আমার জন্য ঝগড়া হয়েছে তোমার আর শ্রেয়া ভাবির সাথে।তাই না?
— কিভাবে জানলি?
— তখন তোমার রুমের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় তোমার কথাগুলো শুনেছি।কি বিষয়ে কথা হয়েছে তা বুঝেছি।হয়ত শ্রেয়া ভাবির সাথে কথা হয়েছে।
— বাদ দে।খাবি চল।
— ভালো লাগছে না প্লিজ! তাছাড়া রাত একটা বাজে।এত রাতে খেতে পারবো না। তুমি চলে যাও।
আয়ান চুপ করে আছে।আজ শ্রেয়া অদ্রিকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করেছে।সে সহ্য করতে পারেনি।এক পর্যায়ে কথা কাটাকাটিও হয়।এর জন্য একপ্রকার রেগে ছিল সে।আর সব রাগ অদ্রির উপর প্রভাব পড়ে।
আয়ান নিঃশব্দে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
চলবে,