#মেঘের_ওপারে
#পর্ব:৯
#Devja_Ni
ভার্সিটির ক্যাম্পাসে বসে আছে শ্রেয়ান। অদ্রি এখনো আসেনি।আজ তার চোখদুটো যেন অবাধ্য হয়ে শুধু অদ্রিকে খুঁজছে।
শ্রেয়ানের বারবার মনে হচ্ছে অদ্রি ভালো নেই। অদ্রির সাথে এখন কথা না বললেও একসময় তো তারা বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল। অদ্রির চোখের ভাষা বুঝতে পারে সে। গতকাল সকালেই অদ্রির চোখমুখ দেখে বুঝেছে অদ্রির মন খারাপ। ইদানিং শ্রেয়াও অদ্রি সম্পর্কে কিছু বলে না তাকে।সেও অবশ্য ইচ্ছে দেখায় না। কিন্তু আগে শ্রেয়া জোর করে অদ্রির কথা বলত তাকে।শ্রেয়ার চোখে অদ্রির জন্য ভালোবাসাটা আজকাল তার চোখে পড়ে না।
ইচ্ছে করছে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করতে। কিন্তু পারছে না। সেই তো অদ্রির সাথে কোনো যোগাযোগ রাখতে চায় নি।এরপর অদ্রিও যোগাযোগ করে নি।এই মুহূর্তে যদি ফোন করে অদ্রি যদি তাকে কথা শোনায়! অবশ্য সে কথা শোনানোর মতোই যে কাজ করেছে তা সে অস্বীকার করবে না।ভীষণ অস্থির লাগছে তার।কি করবে বুঝতে পারছে না।
হঠাৎ দেখে অদ্রি গেট দিয়ে ঢুকছে।শ্রেয়ানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠে। দ্রুত সেদিকে পা বাড়ায়।কেন যাচ্ছে তার উত্তর নিজের কাছেও নেই। তবুও যাচ্ছে।
— অদ্রি!
অদ্রি শ্রেয়ানের ডাক শুনে চোখ তুলে তাকায়।
শ্রেয়ানের বুক ধক করে উঠে। অদ্রির চোখমুখ ফুলে লাল হয়ে আছে।
— অদ্রি তুই ঠিক আছিস?
অদ্রি চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। তেজি গলায় বলে, আমি চাই না আমার মতো মেডেল ক্লাস মেয়ের সাথে কথা বলে কারো সম্মান নষ্ট হোক।
— অদ্রি!
— আশা করি কি বলতে চেয়েছি বুঝতে পেরেছেন।আমি চাই না আমার জন্য আর কারো সম্পর্ক নষ্ট হোক।
শ্রেয়ান অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অদ্রির দিকে।
কায়েস আসে।কানে হাত দিয়ে বলে, অদ্রি,সরি!আমার জন্য হয়ত কাল তোমার প্রবলেম হয়েছে।
অদ্রি সেদিকে কান নেই। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে।মাথাটা ঘুরাচ্ছে তার।দুকদম পিছিয়ে শ্রেয়ানের সাথে ধাক্কা খায়।
শ্রেয়ান সাথে সাথে ধরে ফেলে।
অদ্রির গায়ে শক্তি পাচ্ছে না। তবুও হাত দিয়ে শ্রেয়ানকে ছেড়ে দিতে বলে। মৃদু কন্ঠে বলে, ধরবেন না,,,হাতে ময়লা লেগে যাবে।
শ্রেয়ান অদ্রিকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে ছেড়ে দেয়।
কায়েস অদ্রির কাছে এসে দৌড়ে এসে কাছে টেনে নেয়। কাঁধে হাত রেখে প্রশ্ন করে, অদ্রি তুমি ঠিকাছো।
অদ্রির কায়েসের স্পর্শে বিরক্ত হয়। রেগে গিয়ে বলে,আমাকে টাচ্ করবেন না।আমার পছন্দ না।
— ওকে ওকে।চল আমি তোমাকে ক্লাসে যেতে হেলপ করি।
— লাগবে না।আমি পারবো।
— তা বললে শুনবো না।
কায়েস অদ্রির হাত ধরে নিয়ে যেতে লাগে।
অদ্রির অস্বস্তি হচ্ছে কায়েস এভাবে ধরায়।সরাতেও পারছে না।আর না পারছে কিছু বলতে। অদ্রি শ্রেয়ানের দিকে তাকায়।শ্রেয়ান এখনো ওখানে দাঁড়িয়ে আছে।
অদ্রির চোখ ভিজে আসে। ছোটবেলায় অদ্রি কোনো ছেলের সাথে মিশলেই শ্রেয়ান তাকে বকত।কথা বলাও ছেড়ে দিত।এরপর অদ্রি গিয়ে অনেক কষ্টে তার রাগ ভাঙ্গাতো।আর আজ! কতটা বদলে গেছে সে!তার চোখের সামনে দিয়ে অদ্রিকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে একজন।আজ কি এটা তার চোখে পড়ছে না?এখনো ঠাই দাঁড়িয়ে আছে ওখানে!অদ্রির যে অস্বস্তি হচ্ছে তাও বুঝতে পারছে না!অথচ একদিন তার চোখের ভাষা অনায়াসে বুঝে ফেলতো।
অদ্রি ঘাড় ঘুরিয়ে সামনে থাকায়।
হঠাৎ শ্রেয়ান এসে বিদ্যুৎগতিতে অদ্রিকে কায়েসের থেকে ছাড়িয়ে নেয়।
অদ্রি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে শ্রেয়ানের দিকে।আর কায়েস রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে শ্রেয়ানের দিকে।শ্রেয়ানের কলার চেপে বলে, প্রবলেম কি তোর?কি পেয়েছিস কি নিজেকে?
শ্রেয়ানের কোনো ভাবান্তর নেই। মুখে বাকা হাসি ঝুলছে। কায়েসের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়।বলে,কেন রে!কি করেছি আমি?
— কি করেছিস মানে!অদ্রিকে আমার থেকে ছাড়িয়ে নিলি কেন?
শ্রেয়ান ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলে, সেজন্য তুই আমার সাথে যুদ্ধ করবি?
মুখ টিপে হাসে শ্রেয়ান।
কায়েস রেগে যায়।
— অদ্রিকে নিয়ে এমন করতে পারিস না!
— কেন রে! অদ্রি কি তোর প্রপার্টি নাকি,যে ধরায় তোর ক্ষতি হয়েছে! মুচকি হেসে বলে শ্রেয়ান।
শ্রেয়ানের কথা বলার ধরন দেখে কায়েসের গা জ্বলে উঠে।
রেগে অদ্রির দিকে তাকায়।
— অদ্রি তুমি কিছু বলছ না কেন ওকে?
অদ্রি এতক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল শ্রেয়ানের দিকে।আজ কত বছর পর শ্রেয়ানকে আগের মতো দেখছে! স্বপ্ন নাতো! অদ্রি নিজের হাতে চিমটি কাটে।একি সে ব্যথা পাচ্ছে না!তার মানে স্বপ্ন! অদ্রি আবারও চিমটি দেয়। এবারও ব্যথা লাগছে না।তার মানে এটা স্বপ্ন। অদ্রি মন খারাপ হয়।
শ্রেয়ান এবার বিরক্তি ভরা দৃষ্টিতে অদ্রির দিকে তাকায়।
— কি হয়েছে? চিমটি কাটস কেন?
শ্রেয়ানের কথায় অদ্রির চোখ বড় বড় হয়ে গেল।শ্রেয়ানের দিক থেকে চোখ নামিয়ে হাতের দিকে নিক্ষেপ করতেই সে অবাক।তার মানে এতক্ষণ সে শ্রেয়ানকে চিমটি দিচ্ছিল!
অদ্রির গাল লাল হয়ে আসে।মাথা নিচু করে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে।
কায়েস আবার বলে, অদ্রি!
অদ্রি ইশারায় থামিয়ে দেয়।বলে, আমি যেতে পারব। তুমি চলে যাও।
কায়েস কিছুটা অপমানিত বোধ করে। রেগেমেগে চলে যায়।
কায়েস যেতেই অদ্রি শ্রেয়ানের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়।
— কি ভেবেছেন কি শ্রেয়ান রেজওয়ান! এতদিন আমাকে কষ্ট দিয়ে হঠাৎ এসে সরি বললে সব ঠিক হয়ে যাবে!
শ্রেয়ান আবারও হাসে।বলে, আমি তো তোকে সরি বলিনি অদ্রি!সরির কথা কেন হচ্ছে?
অদ্রি দমে যায়।কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। হঠাৎ রিদ্ধিকে তাদের দিকে আসতে দেখে অদ্রি উল্টো দিকে হাটা শুরু করে।শ্রেয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকায়। অদ্রির হাত টেনে নিজের সামনে নিয়ে আসে।
অদ্রি আবারও শ্রেয়ানের থেকে নিজেকে ছাড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। উপায় না পেয়ে বলে, ছাড়ুন আমাকে।রিদ্ধি আপু দেখলে শ্রেয়া ভাবির মতো আমাকে ভুল বুঝবে।
শ্রেয়ানের হাতের বাঁধন আলগা হয়ে আসে। কিন্তু ছাড়ে না অদ্রিকে। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,শ্রেয়া ! শ্রেয়া কি করেছে?
— শ্রেয়া ভাবি আর আ,,,,,,,
অদ্রি চুপ হয়ে যায়। মুখের কথা মুখেই থাকে।এটা কি করছিল সে!ভাইয়ের কাছে বোনের বিচার দিয়ে তো আরেকটা সম্পর্ক নষ্ট করে দিচ্ছিল!
— থেমে গেলি কেন?বল!
— কিছু না।
— কিছু তো বলছিলি,,,,
— আপনার কথার উত্তর দেওয়ার জন্য বাধ্য নই। আপনার গার্লফ্রেন্ড আসছে, মাইন্ড করবে।হাত ছাড়ুন।
— এক মিনিট এক মিনিট কে গার্লফ্রেন্ড?কার গার্লফ্রেন্ড? অবাক হয়ে প্রশ্ন করে শ্রেয়ান।
অদ্রি রেগে বলে,অভিনয় করবেন না। আমি জানি।রাজ ভাইয়া বলেছে।
— কি বলেছে?
— আপনারা ক্লোজ ফ্রেন্ড।একটু বেশিই।মুখ ঘুরিয়ে বলে অদ্রি।
অদ্রি কথা শুনে শ্রেয়ান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে।এরপর শব্দ করে হেসে উঠে।বলে,ওর সাথে ক্লোজ থাকবো না তো কার সাথে থাকবো।ও আমার কাজিন গাধী।
অদ্রি বাঁকা চোখে শ্রেয়ানের দিকে তাকায়।
শ্রেয়ান আবারও বলে, আচ্ছা তুই কি ওকে আমার গার্লফ্রেন্ড ভেবে জ্বলছিলি?
অদ্রি রাগি দৃষ্টিতে শ্রেয়ানের দিকে তাকায়। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,জ্বলছি তো!আর তোমাকেও পোড়ানোর চেষ্টা করছি।
অদ্রি শ্রেয়ানের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে চলে যায়।
শ্রেয়ান সেদিকে তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। বলে,তুই সত্যিই আমাকে পোড়াচ্ছিস, অদ্রি!
চলবে,