Home "ধারাবাহিক গল্প "যেখানে মন ভেজে চুপচাপ যেখানে মন ভেজে চুপচাপ পর্ব-০২

যেখানে মন ভেজে চুপচাপ পর্ব-০২

0
1

#যেখানে_মন_ভেজে_চুপচাপ
#পর্ব_২
#লেখনিতে_খুশবু_আকতার

ঘড়িতে সময় তখন রাত আটটা। মৃত্তিকা পড়তে বসেছে। রাতের খাওয়া দাওয়া এখনো হয়নি। রান্না-বান্নাও হয়নি। আজ কেন যেন রান্না করতে ইচ্ছে করছে না। যে মেয়েটা বাড়িতে এক গ্লাস পানি অবধি ঢেলে খেত না তাকে এখন মেসে এসে তিনবেলা রান্না করে খেতে হয়। একি কম খাটুনির কথা!

পড়ার মাঝে মৃত্তিকার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে তাকাতেই দেখল মৃদুল এর নামটা ভেসে উঠেছে। রিসিভ করে কানে ধরতেই অপর পাশ থেকে মৃদুল তাড়া দিয়ে বলল,

“এক মিনিটের মধ্যে নিচে নাম। দাঁড়িয়ে আছি।”

কথাটা বলেই কলটা কেটে দিল। মৃত্তিকা কে কোন কিছু বলার সুযোগও দিল না। একটা বার জিজ্ঞেসও করতে পারল না যে কেন এই অসময়ে নিচে নামবে। মৃদুলই বা কেন এসেছে।

রাগে দুঃখে মৃত্তিকার শরীরটা জ্ব লে উঠলো। এই মৃদুলের স্বভাব একেবারে সমীরণের মতন হয়ে গেছে। কেমন যেন গা ছাড়া সব বিষয়ে। সব সময় শুধু হুকুম করা। আবার একটা কথা সম্পূর্ণ বলে না। না ঠিকঠাক ভাবে নিজে বোঝাবে, না অপর পাশের মানুষটাকে বোঝার সুযোগ দেবে। মানে নিজে বলতে পারলেই হলো। তার কথা কেউ বুঝুক বা না বুঝুক তাতে তাদের যায় আসেনা। দুটোই খচ্চর।

তবে নিচে না গিয়েও কোন উপায় নেই। বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ওড়নাটা মাথায় পেঁচিয়ে চুপচাপ নিচে নেমে গেল। নিচে নামতেই দেখল দুই খচ্চরই এসেছে। দুজনেই বাইকের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এতটাই অসভ্য যে মেয়েদের মেসের সামনে এসে দাঁড়িয়ে থেকে সিগারেট ফুঁকছে। দুটোকে যে এলাকায় আসতে দিয়েছে কে কে জানে!

“কি হয়েছে? যখন তখন এভাবে নিচে ডাকো কেন? চারতলা থেকে নিচে নামতে আমার কষ্ট হয়। পায়ে ব্যথা করে। আর একটা কথা ঠিক ভাবে না বুঝিয়ে ফোন কেটে দাও কেন? তুমি কি চাইছো আমি বড় আব্বুকে বলে দেই তুমি আমার সাথে কেমন আচরণ করো?”

বেশ রাগী গলায় মৃত্তিকা কথাগুলো বলল। এমন ভাবে বলল যেন মৃদুল ভয় পায়। মৃদুল আর সমীরণ দুজনে দুজনের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। মৃত্তিকা ভাবল কাজ বোধহয় হয়েছে। হয়ত ভয় পেয়েছে। এবার থেকে একটু মানুষের মতন ব্যবহার করবে।

তবে তেমন কিছুই হলো না। বরং দুজনে হঠাৎ করে শব্দ করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে একজন আরেকজনের গায়ের উপর ঢলে পড়ছে। এই দৃশ্যটা মোটেই সুবিধার লাগছে না মৃত্তিকার। কেন যেন মনে হচ্ছে ওর জন্য কোন বিপদ অপেক্ষা করছে।

মৃত্তিকার এসব ভাবনার মাঝে সমীরণ ওর মাথায় একটা গাট্টা মে রে বলল,

“তোর মতন পুঁচকের হুমকি শুনে কে ভয় পায়? তোর হুমকিতে কোন মেয়ে মানুষও ভয় পাবে মানে। সেখানে আমরা দুজন হলাম পুরুষ মানুষ।”

“পুরুষ মানুষ জন্য কি ভয় পাওয়া যাবে না নাকি। ছেলেরা কি ভয় পায় না?”

“না। ছেলেরা কখনো ভয় পায় না। ভয় পায় হাফ লেডিসরা। তোর কি আমাদেরকে দেখে হাফ লেডিস মনে হয়?”

মৃত্তিকা তেঁতে উঠে বলল,

“না না। তোমরা কেন হাফ লেডিস হতে যাবে। তোমরা হলে আসল পুরুষ, বীরপুরুষ, সিংহ পুরুষ, মহা পুরুষ। তোমাদের শিরায় শিরায় শুধু পৌরুষত্বই। ধ্যাত! কি বলার জন্য ডেকেছো বলোত। আমার পড়া আছে।”

সমীরণ আর প্যাঁচালো না এই বিষয়ে। খাবারের প্যাকেটটা মৃত্তিকার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

“ধর। তোর পছন্দের মোরগ পোলাও আছে।”

না চাইতেও কেন যেন মৃত্তিকার চোখ দুটো খুশিতে চিকচিক করে উঠলো। রান্নার আলসিতে ভেবেছিল খাবে না ঠিকই। তবে পেটের ভেতর ইঁদুর দৌড়ানো শুরু করেছিল। আর আজকেই কিনা সমীরণ খাবার নিয়ে এলো। কিন্তু মানুষটা বুঝল কি করে আজকে মৃত্তিকার খাবার দরকার! বিস্মিত গলায় জিজ্ঞেস করল,

“তুমি কি করে বুঝলে যে আমার আজকে খাবার দরকার ছিল? জানো আমি রান্না করিনি। খুব ক্ষুধা লেগেছিল। তুমি কিভাবে বুঝলে আমার মনের কথা?”

মৃদুল ততক্ষণে ওদের থেকে কয়েক কদম দূরে দাঁড়িয়ে ফোন চালানো শুরু করেছে। সম্পূর্ণ মনোযোগ ফোনের ওপরে নিবদ্ধ। কারো সাথে মেসেজে কথা বলছে। এদিকে মৃত্তিকা আর সমীরণের মাঝে যে কি নিয়ে কথা হচ্ছে সেদিকে ওর কোন মনোযোগ নেই।

সমীরণ আড়চোখে একবার দেখে নিল মৃদুল কে। যেহেতু ওর এদিকে মনোযোগ নেই তাহলে মন মত দু একটা কথা বলাই যায়। দু কদম এগিয়ে গেল মৃত্তিকার দিকে। চোখে মুখে সেই ছেলের হঠাৎ করে এক অদ্ভুত মাদকতা ফুটে উঠল। ঠোঁটে লেপ্টে আছে এক অদ্ভুত রহস্যময় হাসি। মৃত্তিকা কে এতক্ষণ বেশ হাস্যজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। তবে যেই না সমীরণ দু কদম এগিয়ে এলো অমনি মুখটা চুপসে গেল। খানিকটা তুঁতলে বলল,

“কি হলো?”

“যার গোটা মনটাই আমার কাছে বন্দী হয়ে আছে, তার মনের কথা জানবো না! তোমার মনের সমস্ত খবর ঠিক কোন না কোন ভাবে আমি অব্দি পৌঁছে যায়। তোমাকে যে আমি সব থেকে বেশি বুঝি, সবথেকে বেশি চিনি। তোমার হৃদয়ের খোঁজ সব থেকে বেশি আমি রাখি। তুমি হলে আমার হৃদমাঝারে লুকিয়ে রাখা মনমোহিনী। তোমার প্রতিটা হৃদস্পন্দন যেখানে আমি অনুভব করতে পারি সেখানে সামান্য মনের কথা জানা কি এমন ব্যাপার!”

থমকে গেল মৃত্তিকা সমীরণের কথাগুলো শুনে। বিশ্বাস হতে চাইল না নিজের কানকে। বুঝতে পারছে না ওই ভুল শুনল নাকি সমীরণই ভুলভাল বলে ফেলল। ছেলেটার চোখ মুখের অবস্থাও বদলেছে। সর্বক্ষণ মৃত্তিকাকে দেখলেই যেমন কঠিন হওয়ার ভঙ্গিতে থাকে এখন তেমন নেই। দেখতে নিতান্ত একজন ভদ্র, সভ্য, সুশীল, সুদর্শন, শান্ত পুরুষ বলে মনে হচ্ছে। তবে মৃত্তিকার যে বিশ্বাস করতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে যে সমীরণ সত্যি এই কথাগুলো বলল। নিজের সন্দেহটা দূর করার জন্য জিজ্ঞেস করেই ফেলল,

“তুমি মন থেকে বললে এই কথাগুলো?”

সমীরণ মৃত্তিকার দিকে একটু ঝুঁকে গিয়ে ঠোঁটে আলতো হাসি ঝুলিয়ে বলল,

“কেন বিশ্বাস হয় না?”

“না, হচ্ছে না তো। মনে হলো কোন স্বপ্ন দেখলাম। এখন সেই স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার ভয় হচ্ছে।”

মৃত্তিকা কথাটা বলতেই সমীরণ হো হো করে হেসে উঠল। অমনি ভ্যাবাচ্যাকা খেল মৃত্তিকা। যে আশঙ্কাটা করছিল এবারে মনে হলো সেটাই সত্যি হবে। ভেঙ্গে যাবে মৃত্তিকার স্বপ্নটা। তবে না ভাঙলে কি হয় না!

মৃত্তিকার এসব ভাবনার মাঝেই সমীরণ অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বলল,

“তুই এত বোকা কেন মৃত্তিকা? আমি কি না কি বললাম অমনি সেটা সত্যি ভেবে নিলি। সকালে এতই জোরে
চ ড় মে রে ছিলাম নাকি যে তোর পুরো মাথা এলোমেলো হয়ে গেছে? ব্রেন কি হাঁটুতে চলে এলো?
ধর, খাবার নে।”

কথাটা বলে সমীরণ আরো কিছুটা সময় একা একাই হেসে গেল। অন্যদিকে মৃত্তিকার মুখটা চুপসে গেছে। কাঁদো কাঁদো হয়ে উঠলো মেয়েটার মুখটা। খুব কষ্ট পেল।

মৃত্তিকা নিল না খাবারের প্যাকেটটা। কারো সাথে আর কোন কথাও বলল না। চুপচাপ দৌঁড়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেল। ওকে চলে যেতে দেখে সমীরণ পিছন থেকে কয়েকবার ডাকল। কিন্তু মৃত্তিকা দাঁড়ালো না। একবার সাড়াও দিল না।

সমীরণ আবারও হাসল। এবারের হাসিটা তার বড্ড মলিন দেখাল। কে জানে কি বুঝল।

সে যাই হোক, খাবারটা মৃত্তিকা কে দিতে হবে। সমীরণ দৌঁড়ে ওর পিছনে যেতে চাইলে গেটের কাছে গিয়ে সিকিউরিটি গার্ড ওকে আটকালো।

“আরে দাঁড়ান। কোথায় যাচ্ছেন? এখানে মেয়েরা থাকে। এখানে ছেলেদের প্রবেশ নিষেধ জানেন না?”

সমীরণ সিকিউরিটি গার্ড কে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,

“দেখুন আমি খারাপ কিছু করতে যাচ্ছি না। দেখলেন তো চলে গেল মেয়েটা। খাবার না নিয়েই চলে গেল। খাবারটা তো দিতে হবে। আমি যাব আর চলে আসব। কোন মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকাবোও না প্রমিস করছি।”

“না না। এসব বললে তো হবে না। আপনি কে যে আমি আপনাকে বিশ্বাস করব। যান তো এখান থেকে। অযথা বিরক্ত করবেন না রাতবিরেতে এসে।”

সমীরণ এবারে খানিকটা গম্ভীর গলায় বলল,

“বললাম তো শুধু গিয়ে খাবারটা দিয়েই চলে আসব। আমার পরিচিত মেয়ে থাকে এখানে। মৃত্তিকাকে চেনেন না? ও আমার পরিচিত। ওর সাথে দেখা করতে যাচ্ছি।”

অনেক ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করল সমীরণ। তবে সিকিউরিটি গার্ড কোনমতেই মানল না। না মানাটাই স্বাভাবিক। বরং সমীরণের রাগারাগি করাটা অস্বাভাবিক। শেষে মৃদুল ওকে বুঝিয়ে নিয়ে এলো সেখান থেকে। মৃত্তিকার নাম্বারে কল করল কয়েকবার তবে মেয়েটা রিসিভ করল না।

“এভাবে মজা করা বোধহয় ঠিক হলো না, তাই না মৃদুল? পাগলিটা বোধহয় কষ্ট পেল।”

মৃদুল জানেই না কি হয়েছে ওদের দুজনের মাঝে। কেন যেন আর কিছু জিজ্ঞেসও করল না।

এদিকে তীব্র অনুশোচনা প্রকাশ পেল সমীরণের কন্ঠে। যদি অনুশোচনাটা মৃত্তিকা জানতে পারত কিংবা দেখতে পারত তবে হয়ত মুহূর্তের মাঝে অভিমান গলে জল হয়ে যেত। তবে তেমনটা তো হলো না। শেষে খাবারের প্যাকেটটা সিকিউরিটি গার্ডকে দিয়ে বলল যেন মৃত্তিকার কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। সেখানে দাঁড়ালো না আর ওরা। বাইকে বসল দুজনে।

বাইক স্টার্ট দেওয়ার আগে একবার চারতলা ভবনের মৃত্তিকার রুমের জানালার দিকে তাকাল সমীরণ। সঙ্গে সঙ্গে মৃত্তিকা জানালার সামনে থেকে সরে গেল। সমীরণ টের পেল না। মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে আওড়াল,

“পাগলিটা কিচ্ছু বোঝে না।”

__________

অযথাই কোনো কারণ ছাড়া মৃদুলের সাথে পুরো শহরটা ঘোরাঘুরি শেষে সমীরণের বাড়ি পৌঁছতে পৌঁছাতে রাত দশটা বাজল। কলিংবেল বাজাতেই ভিতর থেকে ওর বাবা সাদ্দাম হোসেন দরজাটা খুলে দিলেন। দুজনকে দেখে দুজনই আলতো হাসল। সমীরণ ভিতরে এসে পায়ের জুতোটা খুলতে খুলতে সাদ্দাম হোসেনকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“ওষুধ খেয়েছো, আব্বু?”

“হ্যাঁ খেয়েছি।”

“আচ্ছা ঠিক আছে যাও ঘুমিয়ে পড়ো। আমিও হাতমুখ ধুঁয়ে ঘুমোবো।”

“সে কি খাবি না কিছু?”

সমীরণ নিজের ঘরের দিকে যেতে নিয়েও আবার থেমে গিয়ে বলল,

“না। তোমায় তো বলেছিলাম কল করে যে আজ একটু বাইরে খাব। মৃদুল জোড়াজুড়ি করছিল তাই বাইরে খেয়ে এলাম।”

“বাইরে খেয়েছিস ভালো কথা। সেজন্য বাড়িতে এসে খাওয়া যাবেনা নাকি? চিংড়ি মাছ ভুনা করেছি। তুই তো পছন্দ করিস। এক প্লেট খেয়ে যা।”

সমীরণ সাদ্দাম হোসেনের কথায় তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলল,

“না না আব্বু। এত খেলে ভুঁড়ি বেড়ে যাবে।”

“সে ভুঁড়ি বাড়লে বাড়ুক। মেয়ে পাবি কি পাবি না সেই নিয়ে তো আর তোর চিন্তা নেই। তুই তো বিয়েই করবি না। তাহলে খেতে কি অসুবিধা। আমিও খাইনি এখনো। তোর জন্য অপেক্ষা করেছিলাম।”

সাদ্দাম হোসেন কথাটা বলতেই সমীরণ কপাল কুঁচকে বলল,

“খাওনি মানে? তুমি না বললে ওষুধ খেয়েছো?”

“সে তো খাওয়ার আগের ওষুধ খেয়েছি। চল খেয়ে নেই দুজনে। একা খেতে মন চায় না।”

একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সমীরণ। আর কিছু বলল না। অগত্যা সাদ্দাম হোসেনের সাথে গিয়ে চেয়ারে বসল।

রান্নাবান্না সব তিনি নিজেই করেন। অনেকগুলো বছর ধরে রান্নাবান্না করতে করতে তার রান্নার হাত এখন বেশ পটু হয়ে উঠেছে। যে কোন মেয়েকেও তিনি রান্নাবান্নায় হারিয়ে দিতে পারেন।

সমীরণের পেটটা যথেষ্ট ভরা। তাই অল্প একটু ভাত তুলে নিল। চিংড়ি মাছ ভুনা আসলেও সমীরণের ভীষণ প্রিয়। তবে পেট ভরা থাকায় তেমন একটা স্বাদ অনুভব করতে পারছে না। আবার না খেলেও হবে না। প্লেটের ভাতটুকু শেষ হতে না হতেই সাদ্দাম হোসেন আবারো ভাত তুলে দিলেন।

“আরে আব্বু কি করছো! আমি এত খেতে পারব না।”

সাদ্দাম হোসেন ধমকের সুরে বললেন,

“খেতে পারবি না কেন? জোয়ান ছেলে এইটুকি খাবার খেলে চলে নাকি। চুপচাপ খা।”

সমীরণ শুধু অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ওনার দিকে। তবে কিছু করার নেই। এখন যদি খাবারটুকু শেষ না করে সাদ্দাম হোসেন কষ্ট পাবে। সে জন্য জোর করে ঠুসে ঠুসে মুখে ঢোকালো খাবার গুলো।

খাওয়া-দাওয়া শেষ করে দুজনে মিলে সবকিছু গোছগাছ করে রাখল। নিজের ঘরের দিকে যাওয়ার পথে খবরের কাগজে চোখে পড়ল সমীরণের। অনিচ্ছা সত্ত্বেও থামল। খবরের কাগজটা হাতে তুলে নিল। বিনোদনের পাতায় একজনের ছবি ছাপা হয়েছে। জনপ্রিয় গায়িকা। শিরোনাম আর পড়ার ইচ্ছে হলো না সমীরণের। কি নিয়ে খবর লেখা হয়েছে সেসব কোন কিছুই জানার প্রয়োজন মনে করল না সে। বরং এক টানে পেপারটা ছিঁড়ে ফেলল। ছেঁড়া পেপারের টুকরোগুলো মেঝের ওপরে ছুঁড়ে ফেলে রাগান্বিত গলায় আব্বু বলে ডাকল।

তড়িঘড়ি করে সাদ্দাম হোসেন সেখানে এসে মেঝের ওপরে পড়ে থাকা পেপারের টুকরো গুলো দেখেই যেন বুঝতে পারলেন ব্যাপারটা। এর মাঝেই আবার ভেসে এলো সমীরণের রাগান্বিত গলার স্বর,

“এই মহিলার ছবি যে খবরের কাগজে ছাপা হয়েছে সেই খবরের কাগজ আমাদের বাড়িতে কি করছে? তুমি পড়ছিলে, তাই না?”

“আমার কথাটা শোন…..”

“আমি কোন কথা শুনতে চাই না, আব্বু। তোমাকে কত বার করে বলেছি ওনাকে ভুলে যেতে। কত বার করে বলেছি একটা বিয়ে করে নাও। নিজের জীবনে এগোও না কেন? পিছুটান ধরে বসে থাকো কেন? কেন আমার একটা কথাও শোনো না তুমি? ওনাকে নিয়ে খবরের কাগজে যা ইচ্ছে লেখা হোক না কেন তুমি কেন পড়েছো সেসব? তুমি কেন এখনো ওনাকে ভুলতে পারো না?”

এক নাগারে কথাগুলো বলে থামল সমীরণ। জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলছে। রাগে চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে। সাদ্দাম হোসেন জানেন ছেলে ওনাকে ভালোবাসেন বলেই কথাগুলো এভাবে রেগে বলছে। এই সবই ছেলের ভালোবাসা। একটুও কষ্ট পেলেন না তিনি। এগিয়ে এসে আলতো করে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। সমীরণ আবারও রাগী গলায় বলল,

“আমাকে আদর করলেই আমি এসব ভুলব না, আব্বু। আমাকে আদর করলে আমার রাগও কমবে না। শোন, আমি বিয়ে দেবো তোমার। তোমার থেকে অনেক বেশি বয়সে মানুষ বিয়ে করে। আমি তোমার আবার বিয়ে দেবো, বুঝতে পেরেছ? একজন ভালো বন্ধু পাবে তুমি। একজন জীবন সঙ্গী পাবে।”

“কিন্তু আমার ছেলে তো তার মা পাবে না।”

“প্রয়োজন নেই আমার মায়ের। আমার জন্য তুমিই যথেষ্ট। আমার আর কাউকে প্রয়োজন নেই।”

সাদ্দাম হোসেন আলতো হেসে বললেন,

“ঠিক তেমনি আমার জন্য তুই যথেষ্ট। যে কারণে আমি যৌবন কালেই বিয়ে করতে পারিনি। আর আজ শেষ বয়সে এসে বিয়ে করবো! আমি নাহয় জীবনসঙ্গী পেলাম কিন্তু আমার ছেলেটা তো মা পাবেনা। পাগলামি করিস না। যথেষ্ট বড় হয়েছিস তুই। ঘরে যা।”

রাগে সমীরণের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। সাদ্দাম হোসেনের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বলল,

“তোমার বিয়ে আমি দেবোই। সেই মহিলার জন্য তোমাকে আমি আর কষ্ট পেতে দেব না যার কাছে তোমার কোন মূল্য নেই। আমি ছেলে হয়ে আমার বাপের বিয়ে দিয়েই ছাড়ব।”

কথাটা বলে সমীরণ চলে গেল সেখান থেকে। সাদ্দাম হোসেনের কানে ঠাস করে দরজা বন্ধের আওয়াজ এলো। তিনি শুধু হাসলেন ছেলের এমন আচরণে। একটা সময় তিনিও এমন বদমেজাজি ছিলেন। হয়ত সমীরণের থেকেও বেশি মেজাজি ছিলেন। ছেলেটা একেবারে তার স্বভাব পেয়েছে। তবে ধীরে ধীরে তিনি শান্ত হয়ে গিয়েছিলেন কারো ভালোবাসার স্পর্শে। হয়ত ওনার ছেলেরও শান্ত হওয়ার জন্য কারো ভালোবাসা দরকার। একটু আদর দরকার।

__________

সকাল সকাল ভার্সিটিতে এসে মাঠে হাঁটাহাঁটি করছে মৃত্তিকা। শশী এখনো আসেনি। শশী ছাড়া তেমন কোন বন্ধুও নেই। তাই ওর আসার অপেক্ষা করছে। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ করে একদল মেয়ে মৃত্তিকার সামনে এসে দাঁড়ালো। চেনে মৃত্তিকা এদের সবাইকে। ওদের একেবারে সামনে যে মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে সে রাজনৈতিক নেত্রী জাবিন। আর তার পিছে তার সাঙ্গ-পাঙ্গ।

এই মেয়েটাকে মৃত্তিকার একদম সহ্য হয় না। তার অন্যতম কারণ হলো সমীরণের সাথে চিপকে থাকতে চাওয়ার ইচ্ছে। মেয়েটা ভীষণ অসভ্য। সমীরণ ওর প্রতি বিরক্ত তা বোঝার পরেও পিছু ছাড়েনা।

জাবিনেরও যে মৃত্তিকাকে খুব একটা পছন্দ তেমন না। বরং ভীষণই অপছন্দ। এই অপছন্দেরও একি কারণ। মৃত্তিকার সাথে সমীরণের অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা। এই কারণেই মূলত জাবিন সহ্য করতে পারে না মৃত্তিকা কে। অনেকবার অনেকভাবে বিরক্ত করার চেষ্টা করেছে। তবে সম্ভব হয়নি দুটো কারণে।

এক মৃত্তিকার ভাই ছাত্রনেতা। আর জাবিনের থেকে মৃদুলের অবস্থানটা অনেকটাই উপরে। সে হিসেবে ছাত্রনেতার বোনকে বিরক্ত করলে ফলাফল ভালো হবে না এই ভেবে চুপ থাকে। এছাড়াও যে কারণটা রয়েছে তা হচ্ছে সমীরণ। ভার্সিটিতে নতুন আসার পর মৃত্তিকার আসল পরিচয় জানার আগে ওকে একবার র‍্যাগ দিয়েছিল। বেশ ভালোমতো ঝাড়িও খেতে হয়েছিল এজন্য সমীরণের কাছে।

মূলত এইসব কিছু মিলিয়ে মৃত্তিকা ভীষণ অপছন্দের। তবে আজকে এসেছে মৃত্তিকা কে একটু জ্বালাতে। ওর দিকে এগিয়ে এসে ব্যাঙ্গাত্মক গলায় বলল,

“সমীরণের হাতে চ ড় খেয়ে কেমন লাগল তোমার, মৃত্তিকা বেবি?”

বিরক্তিতে মৃত্তিকার সর্বাঙ্গ জ্ব লে উঠল। চ ড় খাওয়ার কথাটা এই বজ্জাত মেয়েটাও জেনে গেছে। এখন কি আর মৃত্তিকাকে অপমান করতে ছাড়বে? ছাড়বে না। বরং ভার্সিটির সবাইকে বলবে এই কথাটা। ইশ! কতটা লজ্জাজনক ব্যাপার।

মৃত্তিকা কে এভাবে চুপ করে থাকতে দেখে জাবিন ফের বলে উঠল,

“কি হলো কথা বলছো না যে। তুমি নাকি সমীরণের কাছে খুবই স্পেশাল। সেজন্যই বুঝি উঠতে বসতে চ ড় মা রে।”

“ঠিক বলেছো। মৃত্তিকা আমার জন্য স্পেশাল। সেজন্যই ওর কোনো ভুল দেখলে ওকে শাসন করার অধিকারও আমি রাখি।”

সমীরণের রাশভারি কন্ঠটা কানে আসতেই খানিকটা কেঁপে উঠল জাবিন। এদিক ওদিক তাকাতেই দেখল পাশেই সমীরণ দাঁড়িয়ে আছে। সমীরণ কে খুব একটা হাসতে দেখা যায় না। সব সময় তার চোখমুখে গাম্ভীর্যতা বিরাজ করে। কোন পরিস্থিতিতেই যেন সে হাসতে পছন্দ করেনা। তবে না হাসলেও ছেলেটাকে মারাত্মক লাগে দেখতে। একবার ওর দিকে তাকালেই যেন জাবিন দিন দুনিয়া ভুলে বসে। এখনো ঠিক তাই হলো। ওর ধ্যান ভাঙল সমীরণের গম্ভীর কন্ঠে।

“তোমাকে বলেছিলাম মৃত্তিকার থেকে দূরে থাকতে। আজ শেষবার সাবধান করছি। স্টে এ্যাওয়ে ফ্রম হার। ওকে বিরক্ত করা মানে কিন্তু আমাকেও বিরক্ত করা। আর এর পরিণতি কি হতে পারে তুমি জানো। বি কেয়ারফুল। এখন যেতে পারো।”

জাবিন আর সত্যি সেখানে দাঁড়াল না। নিজের দলবল নিয়ে চলে গেল। মৃত্তিকা এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। খুব ভালো লাগছিল ব্যাপারটা। সমীরণ কি সুন্দর ওকে সব সময় সব কিছুর থেকে আড়াল করে রাখে, আগলে রাখে। কাউকে বিরক্ত করতে দেয় না। এই ব্যাপারটা কি সুন্দর না!

“আমি আসার আগে আর কিছু বলেছে? বেশি বিরক্ত করেছে?”

বেশ শান্ত ধীর শোনালো সমীরণের কন্ঠটা। সমীরণের গলা দিয়ে এমন নরম কন্ঠ বের হওয়া বেশ দুর্লভ ব্যাপার। অন্তত মৃত্তিকার ব্যাপারে তো খুবই দুর্লভ। আজ আবার হঠাৎ করে কি হলো কে জানে! মৃত্তিকা নিজেও পাল্টা নরম গলাতেই বলল,

“আর কিছু বলেনি। ওরা আসার পরপরই তুমি এসেছো।”

“ওহ্ তাহলে ঠিক আছে। সকালে খেয়েছিস কিছু?”

“হ্যাঁ খেয়েছি।”

“ভালো করেছিস। ধর এটা নে।”

একটা চকলেট এগিয়ে দিল সমীরণ মৃত্তিকার দিকে। শুরুতেই মৃত্তিকা অনেকটা ভুলে গিয়েছিল রাতের অভিমানের কথা। এখন তো তা একেবারেই ভুলে গেল। চোখ দুটো চিকচিক করে উঠল। উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,

“আমার জন্য! অভিমান ভাঙানোর চেষ্টা করছো নাকি?”

সমীরণ কথাটা সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলল,

“আমার কি আর খেয়ে দেয়ে কোন কাজ নেই যে তোর অভিমান ভাঙাতে যাব? নিজে অভিমান করেছিস, নিজের অভিমান নিজেই ভাঙা। আমার এত ঠ্যাকা পড়েনি। মৃদুলের দলের একটা ছেলে আমাকে দেখতে পেয়ে এটা দিল। আমি তো পছন্দ করি না। তোর তো আবার এখনও বাচ্চামো যায়নি। তাই দিলাম। এটা নিয়ে এখন চুপচাপ ক্লাসে যা। ক্লাস শেষে আমার জন্য অপেক্ষা করবি বাইরে। একটা দরকার আছে।”

কথাটা বলে সমীরণ হাতে থাকা চকলেটটা মৃত্তিকার হাতে দিয়ে চলে গেল সেখান থেকে। মৃত্তিকা একবার সমীরণের যাওয়ার দিকে তাকাল তো একবার নিজের হাতে থাকা চকলেটটার দিকে তাকাল।

মৃত্তিকা জানে এই চকলেটটা সমীরণই কিনেছে ওর জন্য। মৃত্তিকার পছন্দ অপছন্দ সমীরণ খুব ভালো করেই জানে। যেই চকলেটটা দিয়ে গেল সেটা মৃত্তিকার ভীষণ পছন্দ। সেটাও সমীরণ খুব ভালো করেই জানে। সেজন্যই এনেছে। তবে স্বীকার করতে চায় না। বেশ ঠিক আছে স্বীকার না করুক। তবুও নাহয় গোপনেই নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করুক। মৃত্তিকা এতেই সন্তুষ্ট।

চলমান।