#যেখানে_মন_ভেজে_চুপচাপ
#পর্ব_৩
#লেখনিতে_খুশবু_আকতার
শশী আজ আর এলই না ভার্সিটিতে। একটা ক্লাস করার পর মৃত্তিকার মনও আর টিকল না ক্লাসে। ক্লাস থেকে বেরিয়ে সরাসরি এল লাইব্রেরীতে। বেশিরভাগ সময় সমীরণ কে লাইব্রেরীতে পাওয়া যায়। ছেলেটার অন্যান্য স্বভাব যতই খারাপ হোক না কেন পড়াশোনার ব্যাপারে মোটেও উদাসীন না। পড়াশোনা ঠিক রেখে তারপরে সব আলতু ফালতু কাজ করে।
তবে আজ সমীরণ কে লাইব্রেরীতেও পেল না মৃত্তিকা। ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত! কোথায় যেতে পারে এটা ভাবতে ভাবতে পুরো ভবনই ঘুরল মৃত্তিকা। তবে পেল না ছেলেটার দেখা। শেষে হাঁপিয়ে গিয়ে একটা জায়গায় থেমে গেল। ভাবল আগে একটু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নেবে।
ভবনের তিনতলায় দাঁড়িয়ে তখন মৃত্তিকা। হঠাৎ করে মাঠের দিকে চোখ যেতেই দেখল একটা জায়গায় বেশ ভালোই ভিড় লেগেছে। গোল করে সবাই দাঁড়িয়ে আছে। এত ভিড়ের কারণটা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না মৃত্তিকা। কৌতূহল জাগল জানার জন্য যে ওখানে হচ্ছেটা কি।
এক মুহূর্ত আর দেরি না করে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল সেদিকে। তিন তলা থেকে নামতেই অবস্থা খারাপ হয়ে গেল মৃত্তিকার। ভিড়ের একটু কাছাকাছি যেতেই ওর কানে পুরুষালী গানের গলার আওয়াজ ভেসে এল। মৃত্তিকার চিনতে এক মুহূর্তও দেরি হলো না যে কন্ঠটা সমীরণের। ভিড় ঠেলে উঁকি দিতেই নিশ্চিত হলো।
এদিকে মৃত্তিকা ছেলেটার খোঁজ করতে করতে পাগল হয়ে যাচ্ছে। আর সে কিনা এখানে বসে বসে সবাইকে গান শোনাচ্ছে। বাহ! খুব ভালো। চমৎকার।
মৃত্তিকার ধ্যান ভাঙল আশেপাশের সবার করতালির আওয়াজে। সমীরণ ততক্ষণে গিটারটা নামিয়ে রেখেছে। সবাই প্রশংসায় ভাসিয়ে দিচ্ছে একেবারে। এই কথাটা নিঃসন্দেহে সত্য যে সমীরণের গানের গলা ভীষণ সুন্দর। তবে মৃত্তিকার জন্য কষ্টের ব্যাপার হচ্ছে সমীরণের গান শোনার সৌভাগ্য তেমন একটা হয় না। কেন যেন প্রতিদিন গান শেষ হওয়ায় ঠিক আগ মুহূর্তে এসে সেখানে পৌঁছায় মৃত্তিকা। আজও তেমনই হলো।
সমীরণ যদিও তখনও মৃত্তিকাকে খেয়াল করেনি। তবে ওর পাশে বসা মৃদুল খেয়াল করল। গান গাওয়ার স্বভাব মৃদুলের নেই। কখনো এসবের ধারে কাছেও যায় না। তবে গান শুনতে ভালোই লাগে।
মৃদুল হাত ধরে টেনে মৃত্তিকাকে নিজের পাশে বসিয়ে বলল,
“থাকিস কোথায় তুই? আমি গিয়ে খুঁজে এলাম, একবার লোক পাঠালাম তাও তোকে খুঁজে পাওয়া যায় না।”
মৃত্তিকা কটমটে দৃষ্টিতে মৃদুলের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমরা থাকো কোথায়? তোমাদের তো আমি খুঁজে পাই না। একজনের খোঁজ করতে করতে তো পুরো ভার্সিটি আমার চক্কর কাটা শেষ। তাও তার খোঁজ পেলাম না। সে এখানে বসে সবাইকে গান শোনাচ্ছে। আবার আমার কপালটা এতই খারাপ যে আমি এলাম তার গানও শেষ। মানে সব দিক দিয়ে ফাটা কপাল শুধু মৃত্তিকারই।”
কথাটা বলে মৃত্তিকা তেজ দেখিয়ে উঠে যেতে নিলে ওর কানে ভেসে এলো সমীরণের গম্ভীর কণ্ঠস্বর,
“বসে যা। গান শেষ হয়নি।”
তাকাল মৃত্তিকা সমীরণের দিকে। মেয়েটা বোধহয় বুঝতে পারেনি সমীরণের বলা কথাটা। সেজন্যই তো কেমন হাঁ করে তাকিয়ে আছে। সেসব বুঝে সমীরণ আবারও বলে উঠল,
“বসে যেতে বললাম। গান শেষ হয়নি এখনো আমাদের।”
হাসি ফুটে উঠল মৃত্তিকার ঠোঁটে। বাড়তি আর কোন কথা না বলে অমনি বসে পড়ল মৃত্তিকা।
সমীরণ কয়েকবার গিটারে গানের সুরটা তোলার চেষ্টা করল। তবে কেন যেন সুরটা ঠিকভাবে তুলতে পারল না। বিরক্ত হলো সমীরণ খানিকটা। সামনে মৃত্তিকা বসে আছে। এখনই এসব হতে হলো! কখনো তো হয় না এমনটা। এদিকে ভীড়ও আগের থেকে তুলনামূলক বেড়েছে।
এমন সময় হঠাৎ করেই সমীরণের বিরক্তি মাখা চোখ মুখ গিয়ে পড়ল মৃত্তিকার উপরে। মৃত্তিকা তখন অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকেই। সমীরণ তাকাল তবুও মৃত্তিকা দৃষ্টি সরাল না। বরং অল্প একটু হাসল।
সমীরণ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তো তাকিয়েই রইল। ওর হাতটা তখনও গিটারে গানের সুর তোলার চেষ্টা করছে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো এবারে সুরটা তুলতেও পারল। তবে মৃত্তিকার উপর থেকে দৃষ্টি সরাল না। চোখে চোখে কোন গোপন কথা আদান-প্রদান হলো কিনা কে জানে। উপস্থিত মানুষজন খেয়াল করল সমীরণের দৃষ্টি। কেউ কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারল না, কেউ কেউ কিছু কিছু আন্দাজ করল। কারো আবার এসবে যায় আসে না। তাদের সম্পূর্ণ মনোযোগ সমীরণের গানে। এরই মাঝে সমীরণ গানও আরম্ভ করল।
❝তোমার চোখের আদিম নিলাম,
দিলাম তোমায় রাইকমল।
উড়াল সেতু ভুলিয়ে দিলো,
একলা থাকা রাতমহল।
একটা হাওয়ার সঙ্গ করে,
আরেক হাওয়ার অঙ্গরাগ,
ভ্রমর হাসে ফুলের আশে,
শিশির পেতে নীলপরাগ।❞
গান শেষ হলো তবুও সমীরণের দৃষ্টির সরলো না মৃত্তিকার উপর থেকে। মৃত্তিকা অনেকক্ষণ আগেই বিভ্রান্ত হয়ে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছে। এই চোখে তাকিয়ে থাকার সাধ্য খুব বেশিক্ষণ হয় না মৃত্তিকার। একটু তাকিয়ে থাকলে কেমন যেন হাঁসফাঁস করে ভেতরটা। মৃত্তিকা সমীরণের দৃষ্টির মানেও বুঝে উঠতে পারে না। চোখের ভাষাও পড়ার সাধ্য হয় না। শুধু বোঝে কিছু একটা লুকোনো আছে ওই চোখে। এমন কিছু যা বোঝার সাধ্য মৃত্তিকার নেই।
______________
মৃত্তিকাকে আগেই মেসে যেতে বারণ করেছিল সমীরণ। কড়া গলায় নির্দেশ দিয়েছিল যেন অপেক্ষা করে বাইরে দাঁড়িয়ে। মৃত্তিকা অবশ্য তাই করছে এখন। দশ মিনিট হলো দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ছেলেটার কোন পাত্তা নেই। মৃত্তিকা একবার কলও করেছিল। তবে রিসিভ করেনি। কেটে দিয়েছিল। কেন? একবার রিসিভ করে কি বলা যেত না মৃত্তিকাকে যে আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হবে কিংবা ওর আসতে কতক্ষণ সময় লাগবে। কিন্তু তা তো করবে না। মৃত্তিকাকে কষ্ট দিয়েই যেন শান্তি পায় ছেলেটা।
মৃত্তিকা দাঁড়িয়ে এসব ভাবছে আর মনে মনে গালি দিচ্ছে সমীরণকে। এর মাঝে ওর সামনে একটা কালো চার চাকার গাড়ি থামল। এক নজর তাকালো গাড়িটার দিকে মৃত্তিকা। পরক্ষণেই আবার নিজের দৃষ্টি নামিয়ে নিল। প্রয়োজন মনে করল না দেখার। গাড়ির পিছন দরজা খুলে নেমে এলো এক লম্বা চওড়া সুদর্শন পুরুষ। গাড়ি থেকে নেমে সে এগিয়ে এলো মৃত্তিকার দিকে। কেউ সামনে এসে দাঁড়ানোতে মৃত্তিকা চোখ তুলে একবার তাকাল।
মুহূর্তের মাঝে মৃত্তিকা কেঁপে উঠল। ওর সামনে শাফায়াত কিবরিয়া দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু কেন এসেছেন উনি আবার? একেই তো ওনাকে দেখে অস্বস্তি হচ্ছে। তার উপরে আবার সমীরণের ভয়। যখন তখন সমীরণ চলে আসতে পারে। যদি এসে দেখে যে মৃত্তিকা শাফায়াতের সাথে কথা বলছে তাহলে হয়েই গেল। আজ আরেকটা চ ড় খাওয়ার হাত থেকে মৃত্তিকা কে কেউ বাঁচাতে পারবে না।
মৃত্তিকা শাফায়েত কে সালাম দিয়ে কম্পিত গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কিছু বলবেন, স্যার?”
শাফায়াত চোখ থেকে রোদ চশমাটা খুলে শার্টের সাথে ঝুলিয়ে রাখল। বেশ ভালোই গরম পড়েছে আজ। বিরক্তি মাখা চোখে তিনি একবার সূর্যের দিকে তাকালেন। অতঃপর কপালে জমা ঘাম বৃদ্ধাঙ্গুলির সাহায্যে মুছে নিয়ে তাকালেন মৃত্তিকার দিকে। মৃত্তিকা যে ভীষণ ভয় পাচ্ছে সেটা উনি মৃত্তিকার চুপসে যাওয়া মুখটা দেখেই বুঝতে পারলেন। কেন ভয় পাচ্ছে সেই কারণটাও হয়ত তার একটু আধটু জানা। তবুও মৃত্তিকার মুখ থেকে জানার ইচ্ছে হলো।
“ভয় পাচ্ছো কেন, মৃত্তিকা?”
মৃত্তিকা নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল,
“ভয় পাচ্ছি না তো।”
“ভয় পাচ্ছো তুমি। তোমাকে দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।”
মৃত্তিকা এবারে কোন উত্তর দেওয়ার আগেই ওর কানে ভেসে এলো সমীরণের রাশভারি কণ্ঠস্বর। অমনি মৃত্তিকার চোখ দুটো মার্বেলের আকার ধারণ করল। কি প্রয়োজন ছিল সমীরণের এত তাড়াতাড়ি আসার। না হয় আরেকটু দেরি করে আসত। আবার শাফায়াতেরই বা এখন আসার কি প্রয়োজন ছিল। মানে এরা হয় নিজেরা ম র বে, নয়ত মৃত্তিকাকে মা র বে।
“মৃদুল ডাকছে তোকে মৃত্তিকা।”
মৃত্তিকা ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকাল সমীরণের দিকে। মানুষটার কন্ঠ যতটা গম্ভীর শোনাল দেখে তো মনে হচ্ছে না ততটা রেগে আছে। স্বাভাবিক লাগছে দেখতে। মৃত্তিকার তাকিয়ে থাকার মাঝেই সমীরণ আবারও বলে উঠল,
“কি হলো, যা। অডিটোরিয়ামের সামনে আছে মৃদুল। তোর বাড়ি থেকে কল করছে তুই নাকি রিসিভ করছিস না। তাই চিন্তা করছে। তাড়াতাড়ি যেতে বলেছে তোকে।”
বেশ শান্ত আর ঠান্ডা কণ্ঠস্বর সমীরণের। তবে মৃত্তিকা জানে যদি এই কথার অমান্য করে তবে একটা অঘটন ঘটে যেতে পারে। শাফায়াতের থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল।
সমীরণ এতক্ষণে তাকাল শাফায়াত কিবরিয়ার দিকে। এমন একটা ভাব করল যেন এর আগে দেখেনি। ঠোঁটে স্মিত হাসি ফুটিয়ে তুলে সালাম দিল,
“আসসালামু আলাইকুম স্যার। আপনি এখানে খেয়ালই করা হয়নি।”
কেমন যেন তাচ্ছিল্য ভাবে হাসল শাফায়াত। হাসির কারণ কি সেটা সমীরণের মতন বিচক্ষণ মানুষও ঠিক ধরতে পারলে না। শাফায়াত এগিয়ে এলো সমীরণের দিকে। একবার আপাদমস্তক খুব ভালোভাবে ওকে দেখে নিল।
“মৃত্তিকা কে হয় তোমার?”
শাফায়াত প্রশ্নটা করল। সমীরণ কয়েক সেকেন্ডের মতন ভাবল। ভাবল কি পরিচয় দেওয়া যায়। কি পরিচয় দিলে মৃত্তিকার থেকে দূরে রাখতে পারবে এই লোকটাকে। খানিকটা ভাবনা চিন্তা করে উত্তরে বলল,
“অনেক কিছু।”
“মৃত্তিকার পরিবারের সাথে তোমার বোধহয় জানাশোনা আছে, তাই না? আমি ভুল না হয়ে থাকলে ওনারা খুব মানেন তোমাকে?”
সমীরণ আলতো হেসে বলল,
“জ্বী স্যার। অনেক ছোট থেকে পরিচিত। খুব ভালো সম্পর্ক মৃত্তিকার সাথেও, ওর পরিবারের সাথেও।”
“ওহ্। এখন বুঝলাম কেন ওনারা শাফায়াত কিবরিয়ার পাঠানো প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন।”
“কিসের প্রস্তাব, স্যার?”
সমীরণ এমন একটা ভাব দেখাল যেন কিছু জানেই না। শাফায়াত কিসের কথা বলছে এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। অথচ শাফায়েত এ ব্যাপারে নিশ্চিত যে সমীরণ সবটাই জানে। সেই জন্যই তো ঠোঁটে তাচ্ছিল্য হাসি ফুটে উঠলো।
“আই নো, মৃত্তিকা জানিয়েছে তোমায়। বিয়ের প্রস্তাব।”
সমীরণ মনে পড়ার ভঙ্গিতে বলল,
“ও আচ্ছা। আপনি যে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন ফিরিয়ে দিয়েছে? আমি তো জানতাম না এটা। ফিরিয়ে কেন দিল বলুন তো? আপনার মতন একজন এডুকেটেড, হ্যান্ডসাম, স্টাবলিশ ছেলের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয় কেউ!”
“এক্স্যাক্টলি। আমার কোশ্চেন এটাই। ইউ নো হোয়াট সমীরণ, আমার সামনে তুমি কিচ্ছু না। সব দিক দিয়ে তুমি পিছিয়ে। আমাদের দুজনের সম্পর্কটাও অদ্ভুত। তুমি আমার স্টুডেন্ট। আমাদের মাঝে যা ঘটছে এই ব্যাপারটা আমার কাছে খুবই চিপ লাগছে।”
সমীরণ না বোঝার ভঙ্গিতে বলল
“কোন ব্যাপার স্যার?”
শাফায়াত এবারে খানিকটা শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“নাথিং। যাই হোক, রিজেকশন ব্যাপারটা আমার খুবই অপছন্দ। তাও যেখানে আমি সবদিক দিয়ে এগিয়ে তারপরেও বারবার আমায় রিজেক্ট করার ব্যাপারটা সরাসরি আমার সেল্ফরেসপেক্টে আঘাত করেছে।”
“এমনিতেও স্টুডেন্টের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানোতে আপনার সেলফ রেসপেক্ট কতটুকু আছে সেটা আগেই প্রমাণ হয়েছে। তার উপরে আবার রিজেক্ট করে দিয়েছে। বুঝতে পারছি আপনার কষ্টটা। বাট নেভার মাইন্ড। মৃত্তিকার থেকেও ভালো কাউকে পেয়ে যাবেন।”
“বাট আই ওয়ান্ট মৃত্তিকা।”
কন্ঠে কেমন যেন একটা অদ্ভুত দৃঢ়তা খুঁজে পেল সমীরণ। সেই সাথে এও বুঝতে পারল এটা মৃত্তিকাকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা না। বরং না পাওয়ার জেদ। একটা তীব্র জেদ চেপে গেছে হয়ত শাফায়াতের মনে। ওই যে বলল রিজেকশন পছন্দ নয়। সেখানে মৃত্তিকা রিজেক্ট করেছে, পরিবার থেকেও রিজেক্ট করে দিল।
তবে এ ব্যাপারে আর কিছু জিজ্ঞেস করতে পারল না সমীরণ। শাফায়াত রোদ চশমাটা আবার চোখে পড়ে নিজের গাড়িতে উঠে চলে গেল।
সমীরণকে চিন্তিত হতে দেখা গেল। কেন যেন ভালো লাগছে না ব্যাপারটা। মৃত্তিকা বোকা। যদি মেয়েটা একটু চালাক হত তবে সমীরণের এত চিন্তা হত না। তবে সেই মেয়ে তো কোন জটিলতা বোঝে না। কি যে করবে সমীরণ এই মেয়েটাকে নিয়ে!
___________
মৃত্তিকা কে নিয়ে বাসস্ট্যান্ডে এসে বসে আছে সমীরণ। মৃদুলও এসেছিল ওদের সাথে। তবে সে আবার ভীষণ ব্যস্ত মানুষ। হুটহাট জরুরী কল চলে আসে। সেজন্য মিনিট দশেক আগে চলে গেছে। মৃত্তিকার দাদু ভীষণ অসুস্থ। ওকে দেখার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। মৃদুলকেও তিনি আসতে বলেছিলেন। তবে সে তো ব্যস্ত মানুষ। তার পক্ষে নাকি এখন যাওয়া সম্ভব হবে না। তাই মৃত্তিকাকে পাঠিয়ে দিচ্ছে।
মৃত্তিকা কোন ধরনের কোন গোছগাছ করার সময় পায়নি। ভার্সিটিতে যেভাবে এসেছিল সেভাবেই ওখান থেকেই ওকে বাস স্ট্যান্ড আনা হয়েছে। আপাতত বসে আছে চেয়ারে। সমীরণ গেছে টিকিট কাটতে। একটু পর সমীরণ টিকিট নিয়ে এল। সঙ্গে করে কিছু চিপস, চকলেট, পানির বোতলও এনেছে। সেই সাথে একটা কোল্ড ড্রিংকস আছে। সেগুলো সব মৃত্তিকার হাতে দিয়ে নিজে ধপ করে পাশের চেয়ারে বসে পড়ল।
“আরো আধা ঘন্টা পর বাস ছাড়বে।”
“তাহলে তুমি চলে যাও। তোমার তো অনেক কাজ থাকে। অযথা এখানে গরমের মাঝে বসে থেকে কি করবে। আমি ঠিক চলে যাব।”
মৃত্তিকা কথাটা বলতেই সমীরণ ওর দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে বলল,
“তোকে বলেছি আমার অনেক কাজ আছে? একবারও তোকে বলেছি এখানে বসে থাকতে অসুবিধা হচ্ছে আমার?”
মৃত্তিকা মিনমিনে গলায় বলল,
“না মানে এত গরমে অসুবিধা হওয়াটাই তো স্বাভাবিক।”
“আমার জন্য স্বাভাবিক। আমার অসুবিধা হচ্ছে না। বরং সুবিধাই হচ্ছে।”
মৃত্তিকা কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“কি সুবিধা হচ্ছে?”
মৃত্তিকাকে চোখের ইশারায় একবার আশপাশটা দেখিয়ে বলল,
“দেখছিস না আশেপাশে কত সুন্দর সুন্দর মেয়ে। দেখি কাউকে পছন্দ হয় কিনা। তোর ভাবি বানানো যায় কিনা। আর কত কালই বা এমন একা থাকব বল! আমার বউ না হোক, তোর ভাবি বানানোর জন্যও তো কাউকে প্রয়োজন।”
মুহূর্তের মাঝে মৃত্তিকার মেজাজটা গরম হয়ে গেল। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে খানিকটা রাগি গলায় বলল,
“আমার ভাবি আছে। আর ভাবি আমার প্রয়োজন নেই, বুঝতে পেরেছো? আর তুমি নাকি বিয়েই করবে না। তাহলে মেয়ে খোঁজো কেন?”
“মানুষের মন। কখন যে কি প্রয়োজন হয় সে নিজেও জানে না। তার উপরে পুরুষ মানুষ। কাউকে মা রা র জন্য সব সময় শুধু হাত নিসপিস করে। বউ থাকলে সুবিধা। যখন তখন চ ড় মা র তে পারবো।”
মৃত্তিকা তাড়াহুড়ো গলায় বলল,
“তো চ ড় মা রা র জন্য বিয়ে করতে হবে নাকি। আমি তো আছি। আমাকেই তো চ ড় মা র তে থাকো সারাদিন। আরো লাগবে!”
সমীরণ খানিকটা ঝুঁকে এলো মৃত্তিকার দিকে। মৃত্তিকা একটু সরে গেল। সমীরণ চোখ গরম করে তাকাতেই আবার সে নিজের জায়গায় স্থির হয়ে বসল। সমীরণ ক্লান্ত মাথাটা এলিয়ে দিল মৃত্তিকার কাঁধে। চোখ দুটো বন্ধ করে কয়েকটা শ্বাস ছেড়ে বলল,
“বউকে যেভাবে ভালোবাসবো তোকে সেই ভাবে ভালোবাসলে তো বদনাম হয়ে যাবি রে। কলঙ্ক লেগে যাবে তোর চরিত্রে। নষ্ট হয়ে যাবি তুই।”
“ও মা। তুমি না বললে চ ড় মা রা র কথা। এখানে আবার আদর ভালোবাসা এল কোত্থেকে?”
সমীরণ শব্দ করে হেসে উঠে মাথাটা তুলে সোজা হয়ে বসে বলল,
“ভালোবাসা আর মা র দুটো হলো সমার্থক শব্দ, বুঝলি?”
“না, বুঝলাম না। এই দুটো কখনো সমার্থক শব্দ হতে পারে না, বুঝেছো?”
“কিন্তু আমার কাছে দুটো সমার্থক শব্দ। সেজন্যই তো তোকে সব সময় চ ড় মা র তে থাকি। আমি একটু আলাদা মৃত্তিকা। আমার সবকিছুই আলাদা, অন্যরকম। আমার ঘৃণাও ব্যথা দেয়, আমার ভালোবাসাও ব্যথা দেয়। বুঝলি কিছু?”
মৃত্তিকা যে আসলে কত বড় বোকা সেটা ও নিজেও বুঝতে পারছে। তেমন কঠিন কিছু হয়ত বলেনি সমীরণ। কিন্তু তারপরও সমীরণের বলা কথা গুলো মেলাতে গিয়ে অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। এবং সবশেষে কোনোমতেই কিছু মেলাতে পারল না। শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে বলল,
“না, বুঝলাম না।”
সমীরণ আস্তে করে মৃত্তিকার মাথায় একটা টোকা মে রে বলল,
“তা কি করে বুঝবি! মাথার মধ্যে তো একজনকে গেড়ে বসিয়ে রেখেছিস। আর কিছু ঢুকবে নাকি তোর মাথায়। কারো সাথে এমন ভাবে জড়িয়ে পড়তে নেই, মৃত্তিকা। কখনো যদি সে হারিয়ে যায় তবে কিন্তু নরকের স্বাদ ইহকালেই টের পেয়ে যাবি।”
মৃত্তিকা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। কিছু জিজ্ঞেস করতে চাইল। তবে সমীরণ ওকে সেই সুযোগ দিল না। তার আগে বাস এসে গেছে বলে তাড়াহুড়ো করে উঠে চলে গেল। কিছু বলতেও পারল না মৃত্তিকা। কখনো যেমন কিছু বলতে পারেনি, আজও পারল না।
চলমান।

