#যেখানে_মন_ভেজে_চুপচাপ
#পর্ব_৪
#লেখনিতে_খুশবু_আকতার
দশ-পনেরো মিনিট হলো বাস ছেড়েছে। রাস্তায় যানজট নেই। বাসটাও বেশ ভালোই স্পিডে চলছে। অনেকটা পথ এসে গেছে। জানালার ধারে সিট পেয়েছে মৃত্তিকা। জানালার ধারে যেন সিট পায় সেটা বলেই সমীরণ টিকিট কেটেছিল। জানে নয়ত মৃত্তিকার সমস্যা হবে। তবে পাশের সিটে যে একটা ছেলে বসবে সেটা জানত না। জেনেছিল একেবারে শেষ মুহূর্তে বাস ছাড়ার আগে আগে। তখন আর সমীরণের কাছে করার মতন কিছুই ছিল না। শেষে শুধু বলে দিয়েছে যদি কোন সমস্যা হয় সঙ্গে সঙ্গে যেন কল করে।
গালে হাত ঠেকিয়ে জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য উপভোগ করছে মৃত্তিকা। এর মাঝে ওর ফোনটা শব্দ করে বেজে উঠল। ব্যাগ থেকে বের করতেই দেখল সমীরণ কল করেছে। মৃত্তিকা বিরক্ত হলো না। বরং খুশি হলো। মানুষটা খুব চিন্তা করে ওকে নিয়ে। সেজন্যই তো গাড়ি ছাড়তে না ছাড়তেই কল করেছে। মৃত্তিকা রিসিভ করে ফোনটা কানে ধরতেই অপর পাশ থেকে সমীরণ তাড়াহুড়ো গলায় বলে উঠল,
“মৃত্তিকা, বাস থেকে নাম।”
ভ্যাবাচ্যাকা খেল মৃত্তিকা। বুঝেও যেন বুঝল না। জিজ্ঞেস করল,
“কি করব?”
“বাস থেকে নাম। ড্রাইভার কে বল বাস থামাতে। আমি পিছনেই আছি।”
“কিন্তু কেন নামব? দেরি হয়ে যাবে তো। এর পরের বাস রাতে। আর রাতে তো আমি একা যেতে পারব না।”
“তোকে যা বলেছি চুপচাপ সেটা কর। বললাম না আমি পিছনে আছি। তোকে কি করে বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে সেই ব্যবস্থা আমি করব। তুই এক্ষুনি বাস থেকে নামবি।”
কথাটা বলে কলটা কেটে দিল সমীরণ। মৃত্তিকা আসলে বুঝতে পারছে না যে হঠাৎ করে ছেলেটার হলো কি। এভাবে নামতেই বা বলছে কেন। যদি নামানোরই ছিল তাহলে তুলে দিয়েছিল কেন বাসে।
তবে কোন উপায় নেই। যেহেতু নামতে বলেছে তাহলে নামতেই হবে। শেষে বাধ্য হয়ে বাস থেকে নামল। একেবারে রাস্তার মাঝ পথে নেমেছে। যা বুঝল কন্ডাকটার বোধ হয় বিড়বিড় করে গালিও দিল ওকে বিরক্ত করার জন্য। ভাগ্যিস সমীরণ এখনো আসেনি। বলা যায় না নয়ত মা রা মা রিও লেগে যেতে পারত।
মৃত্তিকা কে দু-তিন মিনিটের মতন অপেক্ষা করতে হলো। সমীরণ বাইক নিয়ে এসে দাঁড়াল সেখানে। ছেলেটা বাইক নিয়ে এসেছে তবুও মনে হচ্ছে হাঁপাচ্ছে। হেলমেটটা খুলে উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ঠিক আছিস তুই? বাস ছাড়ার পর আর কেউ উঠেছিল বাসে?”
“না। কেউ তো আর ওঠেনি। শুধু আমি নেমে এলাম। নামতে কেন বললে?”
একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সমীরণ। আশেপাশে একবার তাকাল। তবে কোথাও আর সেই কালো গাড়িটা দেখতে পেল না। কিন্তু গেল কোথায় গাড়িটা? বাসের পিছনেই তো ছিল। হঠাৎ করেই সমীরণের মাথায় একটা খেয়াল এলো। ও কি ভুল দেখেছিল, ভুল ভাবছিল এতক্ষন? কালো রঙের গাড়ি তো শাফায়াত ছাড়াও আরো অনেকেরই থাকতে পারে। গাড়ির নাম্বারটা তো খেয়াল করেনি।
এতক্ষণে সমীরণের থেকে কোন জবাব না পেয়ে মৃত্তিকা আবারো জিজ্ঞেস করল,
“কি হলো বল? যেতে কেন দিলে না আমায়?”
সমীরন তাকাল মৃত্তিকার দিকে। কিছুক্ষণ সেভাবে তাকিয়েই থাকল। বোধহয় মনে মনে অজুহাত খুঁজল। কি কারণ বলবে সেসব ভাবল। ভাবনা চিন্তা শেষে হাতের হেলমেটটা মৃত্তিকার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“পিছনে বস। রেখে আসছি তোকে।”
“কোথায়?”
“কোথায় আবার, যেখানে যাচ্ছিলি।”
“তুমি এতদূর বাইক নিয়ে যাবে! আর তুমি যাবেই বা কেন? যেতে তো তাও তিন ঘন্টার মতন লাগবে। এর থেকে ভালো আমি বাসে চলে যেতাম।”
সমীরণ বিরক্তিকর গলায় বলল,
“কানের কাছে বকবক করে আমার মাথা খাবি না। বসতে বলেছি আমি, চুপচাপ বস।”
আর কিছু বলার সাহস পেল না মৃত্তিকা। হেলমেট হাতে নিয়ে পরতে ধরেও আমার থেমে গেল। সেটা পুনরায় সমীরণের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“আমার লাগবে না। তুমি বাইক চালাবে, তুমি পরে নাও।”
“প্রয়োজন নেই। আমার থেকে এটা তোর বেশি প্রয়োজন। আমি ম র লে আমার জন্য শুধু কাঁদবে এক বাপ। তুই ম র লে তোর পুরো গুষ্টি কাঁদবে। যতই হোক তিন প্রজন্ম পর একমাত্র ভেড়ী হয়ে জন্মেছিস। কষ্ট হওয়াটাই স্বাভাবিক।”
“আমিও কাঁদব। সব থেকে বেশি আমি কাঁদবো। তোমার একবারও মনে হলো না যে তোমার কিছু হয়ে গেলে আঙ্কেল বাদেও আমি কাঁদতে পারি?”
“তাই নাকি! কেন কাঁদবি? আমি না থাকলে তোর কি? বরং চড় খাওয়ার হাত থেকে বেঁচে যাবি।”
“প্রয়োজন নেই। এর থেকে ভালো আমি চড়ই খেয়ে নেব। তবুও তোমার কিছু না হোক।”
সমীরণ সামান্য হেসে নিজের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। কি ভেবে যেন আবার মৃত্তিকার দিকে তাকিয়ে ওকে জিজ্ঞেস করল,
“আমি চ ড় মা র লে তোর খুব কষ্ট হয়, তাই না মৃত্তিকা?”
মৃত্তিকা কাঁচুমাঁচু করে বলল,
“কষ্ট হওয়া স্বাভাবিক।”
“আমারও কষ্ট হয়। তোর থেকেও বেশি কষ্ট হয়।”
“কেন?”
“যখন মনে হয় এতগুলো বছর আগলে রাখার পরেও হয়ত স্বেচ্ছায় অন্যের হাতে তুলে দিতে হবে তখন কষ্ট হয়। যখন মনে হয় চেয়েও হয়ত আমি নিজেকে সংসারী কিংবা ঘরমুখো করতে পারব না তখন কষ্ট হয়। যখন বুঝতে পারি নিজের দোষেই হয়ত নিজের সুখ হারাব তখন কষ্ট হয়।”
বুঝল না মৃত্তিকা সমীরণের বলা কথাগুলো। কিসের কথা বলছে সমীরণ। প্রশ্নাত্মক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কিসের কথা বলছো? একটু বুঝিয়ে বলো না। বুঝলাম না তো।”
সমীরণ এবারে একটু শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“বাদ দে। শোন, আমি না থাকলে সব থেকে বেশি প্রভাব আমার বাবার উপরেই পড়বে। আমি ছাড়া আমার বাবার আর কেউ নেই। কারো জীবন যদি থমকায় সেটাও শুধুমাত্র আমার বাবার জীবনই থমকাবে। তুই হয়ত কাঁদবি। দুই দিন, দুই মাস কিংবা দুই বছর। তারপরে ভুলে যাবি। তোকে মনে রাখতে দেবে না কেউ আমায়। বুঝলি? এমনিতেও যারা চলে যায় তাদেরকে সারা জীবন মনে রাখতে নেই।”
মৃত্তিকার যেমন রাগ হলো ঠিক তেমনি অভিমান হলো। হাতে থাকে হেলমেটটা সমীরণের হাতে দিয়ে বলল,
“পরবো না আমি। দরকার নেই। একদম আমাকে জোর করতে আসবে না। জোর করলে তোমার সঙ্গে যাবই না।”
কথাটা বলে মৃত্তিকা বাইকের পিছনে গিয়ে উঠতে ধরলে সমীরণ ওর হাত টেনে ধরল। মেয়েটাকে আবারো নিজের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে হাতে থাকা হেলমেটটা নিজেই মৃত্তিকাকে পরিয়ে দিতে দিতে বলল,
“আমি যে সত্যি বলেছি সেটা তুই নিজেও জানিস। শুধু মানতে চাইছিস না। সে কারণেই রেগে গেলি। সে যাই হোক সত্য মিথ্যার বিচারে এখন আর না যাই। হেলমেটটা পরে নে। তোর কিছু হয়ে গেলে আমার কষ্ট হবে। যতই হোক তোর দায়িত্ব নিয়ে বেরিয়েছে। তোর কিছু হয়ে গেলে মৃদুল কে মুখ দেখাতে পারব না।”
কোন উত্তর দিলে না মৃত্তিকা। চুপচাপ হেলমেটটা পরা শেষে পিছনে বসে পড়ল। বাইকটা স্টার্ট দেওয়ার আগে সমীরণ আয়নাটা ঠিক করে নিল। যেন পিছনে বসা মৃত্তিকাকে দেখা যায়। এইতো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মৃত্তিকার মুখটা। হেলমেট মাথায় দিয়ে গাল ফুলিয়ে বসে আছে। বেশ ভালোই রাগ করেছে। সমীরণ কে ধরেও বসল না। সমীরণ হাসল। জানে এই অভিমান বেশিক্ষণ টিকবে না। দু মিনিট যেতে না যেতেই মৃত্তিকার হাত ঠিক সমীরণের কাঁধে চলে আসবে।
খানিকটা দূরে যেতেই সমীরণের চোখে আবার সেই কালো গাড়িটা পড়ল। স্পিডটা একটু কমিয়ে ভালো মতো দেখে নিল গাড়িটা। ভিতরে কে বসে আছে সেসব বোঝা যাচ্ছে না। তবে নাম্বার প্লেটটা খুব ভালোভাবে দেখে নিল। যেন পরেরবার শাফায়াতের গাড়ির নাম্বারের সাথে মিলিয়ে দেখতে পারে।
_________
এতটা পথ একটানা বাইক চালিয়ে এসে সমীরণের পিঠ ঘাড় সব ব্যথা ধরে গেল। মৃত্তিকা কত করে বলল যে কিছুক্ষণ কোথাও একটু দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নেওয়া যাক। হালকা কিছু খাওয়া যাক। তবে শোনেনি। রাত হয়ে গেলে সমস্যা হবে আবার। সমীরণের উদ্দেশ্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মৃত্তিকাকে পৌঁছে আবার নিজের বাড়ি ফিরে আসার। অনেকটা পথ যাতায়াত করতে হবে।
মৃত্তিকাদের বাড়িতে পা রাখল সন্ধ্যা ছয়টায়। প্রায় দু মাস পর মৃত্তিকা আবার বাড়ি এলো। মাঝে পরীক্ষা থাকায় আসতে পারেনি। যদিও একটু ফাঁকফোকর বুঝে মৃত্তিকা আসতে চেয়েছিল। তবে মৃদুল আসতে দেয়নি। আগে পরীক্ষা তারপরে বাকি সবকিছু। ছেলেটার নিজের পড়াশোনার ঠিক নেই। অথচ মৃত্তিকার পড়াশোনা নিয়ে খুব চিন্তিত। রেজাল্ট খারাপ করলে সে কি বকাবকি।
বাড়িতে মৃত্তিকা সবারই ভীষণ আদরের। তিন প্রজন্ম পর বংশে মেয়ে সন্তান এসেছে। সেই জন্য এতটা আদরের। সবাই চোখে হারায় মেয়েটাকে। ঘরে পা রাখতে না রাখতেই শুরু হয়ে গেল মা চাচিদের হাহাকার। মেয়েটা শুকিয়ে গেছে, কালো হয়ে গেছে, খাওয়া-দাওয়া ঠিকঠাক করে করে না, চুলগুলো ঝরে গেছে। আহারে! পড়াশোনা করার জন্য রাত জাগতে জাগতে কি বেহাল দশা হয়ে গেছে। তারা এও সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল যে আর যেতে দেবে না মৃত্তিকা কে। তাদের মেয়েকে ঘরেই রাখবে। পড়াশোনার কি দরকার যদি মেয়ের জীবনই না বাঁচে। দুধের মতন ফকফকে সাদা গায়ের রং কালো হয়ে গেছে। রোদের তাপে পুড়ে গেছে বোধ হয়।
সমীরণ এক কোনায় দাঁড়িয়ে থেকে ওদের এসব কথাবার্তা শুনছে আরঠোঁট টিপে হাসছে।
এই বাড়িতে সমীরণেরকে বেশ ভালো আদর যত্ন করা হয়। সমীরণকেও সবাই ভীষণ ভালোবাসে। অনেক ছোটবেলা থেকে পরিচয়। সমীরণের বাবা পেশায় হাই স্কুলের শিক্ষক। বেশ ছোটবেলায় ওদের গ্রামের হাই স্কুলে বদলি হয়েছিল সাদ্দাম হোসেন। সমীরণ তখন তৃতীয় কিংবা চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। সেই থেকেই মৃদুল এর সাথে পরিচয়। তখন থেকে দুজনে হয়ে উঠল একেবারে বেস্ট ফ্রেন্ড। ধীরে ধীরে দুই পরিবারেরও যোগাযোগ শুরু হয়ে গেল। পরে যখন কলেজে উঠল তখন আবার সাদ্দাম হোসেনের বদলি হয়ে গেল। সমীরণকে চলে যেতে হলো বাবার সাথে। মৃদুল কে আর গ্রামে রাখা গেল না। সেও কলেজের সময় থেকেই শুরু করল বাইরে পড়াশোনা। সমীরণ যে কলেজে ভর্তি হয়েছিল সেও সেই কলেজে ভর্তি হলো। তার পরে একই ভার্সিটিতে পড়াশোনা করছে। বলা যায় অনেক বছরের সম্পর্ক।
সমীরণের উদ্দেশ্য ছিল মৃত্তিকা কে রেখে চলে যাওয়ায়। তবে কেন যেন এখন যেতে ইচ্ছে করছে না। এর দুটো কারণ। এক মৃত্তিকা। আর দ্বিতীয়ত এই পরিবারের মানুষগুলোর ভালোবাসা। সমীরণ সেজন্য আজকাল আর যাতায়াত করতে চায় না। এই বাড়ি আর বাড়ির মানুষগুলোর সাথে এক অদ্ভুত টান অনুভব করে। এমনভাবে আটকায় যে সমীরণ চেয়েও যেতে পারে না। ওদিকে বাড়িতে আবার সাদ্দাম হোসেন একা।
সমীরণ শেষে বাধ্য হয়ে নিজের বাবার নাম্বারে ফোন লাগাল। অপর কাছ থেকে সাদ্দাম হোসেন ফোনটা রিসিভ করেই চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“কিরে বাবা, কোথায় আছিস তুই?”
“আব্বু, আমি আসলে মৃদুলের বাড়িতে এসেছি মৃত্তিকাকে রাখতে। আসার সময় বাইক নিয়ে এসেছি। আজ তো অনেক রাত হয়ে গিয়েছে, আবার চাচা চাচিরা যেতেও দিতে চাইছে না। আমি একটা দিন থাকি এখানে! তুমি একা থাকতে পারবে না কষ্ট করে একটা দিন?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ পারবো না কেন। নিশ্চয়ই পারব। এই রাতে আর তোর আসার কোন প্রয়োজন নেই। এমনিতেও তো তুই কোথাও যাস না। ওখানে বরং দুই তিনটে দিন থেকে আয়। ভালো লাগবে। মৃদুল যায়নি সাথে?”
সমীরণ কয়েক সেকেন্ড মতন ভেবে বলল,
“না। ও এখনো আসেনি। তবে আসবে।”
সাদ্দাম হোসেনের সাথে কথাবার্তা শেষে সমীরণ ফোনটা রেখে এবারে কল লাগাল মৃদুলের নাম্বারে। মৃদুল ফোনটা রিসিভ করেই খেঁকিয়ে উঠে বলল,
“দুপুর থেকে কবার কল করেছি দেখেছিস একবারও? আমি তো ভেবেছি কেউ কোথাও
মে রে টেরে রেখে দিয়েছে। কোথায় আছিস তুই?”
সমীরণ রেগে গেল না। বেশ শান্ত গলায় বলল,
“তোর বাড়িতে।”
“কার বাড়িতে?”
“তোর বাড়িতে।”
“কেন?”
“একটা সমস্যায় পড়েছিলাম। তাই এসেছি মৃত্তিকার সাথে। তুই একটু আসতে পারবি! এখনই রওনা দে। একটু সমস্যা হয়েছে আমার। কাউকে বলতেও পারছি না।”
অপর পাশ থেকে মৃদুল উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
“কি হয়েছে?”
“হয়েছে। খুব সমস্যা হয়েছে। তুই আয় না! খুব সমস্যায় পড়েছি রে ভাই। তোকে ছাড়া হবে না। তুই জানিস আমি আমার সমস্যার কথা তোকে ছাড়া কাউকে বলতেও পারিনা। প্লিজ এক্ষুনি রওনা দে। বাকি কথা এলে বলব। দেরি করিস না যেন।”
সমীরণ সচরাচর এভাবে সাহায্য চায় না মৃদুল এর থেকে। ছেলেটার কন্ঠই তো এত শান্ত শোনা যায় না। মৃদুল ব্যাপারটাকে ভীষণ গুরুতর ভাবল। আশ্বস্ত করে বলল এক্ষুনি রওনা হবে।
সমীরণ ফোনটা কেটে দিয়ে পিছন ঘুরে তাকাতেই দেখল মৃত্তিকা দাঁড়িয়ে আছে। কপাল কুঁচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কি সমস্যায় পড়েছো তুমি? মৃদুল ভাইয়াকে ডাকলে কেন এভাবে? কোন সমস্যা তা আমি দেখতে পাচ্ছি না।”
সমীরণ বুকের ওপর দুহাত বেঁধে দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“জটিল সমস্যায় পড়েছি। দেখ না ভেবেছিলাম চলে যাব কিন্তু যেতে পারলাম না।”
“কেন যেতে পারলে না?”
“কেউ আটকাল।”
“কে আটকাল?”
সমীরণ স্মিত হেসে বলল,
“তুমি।”
হালকা একটু কেঁপে উঠল মৃত্তিকা। সমীরণের মুখ থেকে হঠাৎ তুমি সম্মোধনটা শুনলে গা শিউরে ওঠে। লোকটা যে কেন এভাবে হঠাৎ করে তুমি বলে ডেকে ওঠে মৃত্তিকা বুঝে উঠতে পারে না। এই ডাকের মধ্যে কি এক অদ্ভুত জাদু কিংবা মায়া থাকে তাও মৃত্তিকা বোঝে না। ওকে ভীষণভাবে সম্মোহিত করে। অদ্ভুত ঘোরের মাঝে চলে যায় ডাকটা শুনে।
“সত্যি আমার জন্য থেকে গেলে? আমি আটকেছি তোমায়?”
সমীরণ কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে। হঠাৎ করে আবার চোখ মেলে মৃত্তিকার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমাকে তো তুমিই আটকাও সব সময়। তুমি ছাড়া কারো সাধ্য আছে নাকি আমাকে আটকানোর! তোমার মায়া ভরা চোখ দুটোর দিকে তাকালেই আমি আটকে যাই। তোমার গলার স্বর যেন কোন গানের সুর হয়ে বাজে আমার কানে। সেই সুর পিছনে ফেলে রেখে তো আমি সামনে এগোতে পারিনি কখনো। আজও পারলাম না।”
মৃত্তিকা অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সমীরণের দিকে। মৃত্তিকা নিশ্চিত সমীরণ এই কথাগুলো একদম মন থেকে বলেছে। তাহলে মৃত্তিকার এত বছরের ভালোবাসা ব্যর্থ হয়নি। এত বছরের অপেক্ষা, ত্যাগ, এত কান্না সবকিছু তবে আজ হাসি ফোটালো মৃত্তিকার ঠোঁটে।
মৃত্তিকা যেই না কিছু বলতে যাবে অমনি সমীরণ হো হো করে হেসে উঠে বলল,
“এগুলোই শুনতে চেয়েছিলিস তাই তো? নে তোর মন রক্ষার্থে বলে দিলাম। তাই বলে আবার ভাবিস না এগুলো আমার মনের কথা। আমার কানে কোন সুর টুর বাজে না, বুঝেছিস? এত মায়া টায়া আমি বুঝিনা।”
সমীরণ কে হঠাৎ করে আবার কেমন যেন গা ছাড়া দেখাল। মৃত্তিকা কে কথাগুলো বলে চুপচাপ পাশ কাটিয়ে চলে যেতে ধরলে মৃত্তিকা ওর বাহু টেনে ধরল। আজ প্রথম বোধহয় মৃত্তিকা সমীরণ কে এভাবে টেনে ধরল। নয়ত বরাবর সমীরণেই সব সময় হাত ধরে থামিয়ে দেয়। সমীরণ থামল। আলগোছে নিজের বাহু থেকে মৃত্তিকার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,
“এটা তোর বাড়ি। তোর আমায় এভাবে টেনে ধরা আমার উপরে কোন প্রভাব না ফেললেও তোর বাড়ির লোকজনের উপর ফেলতে পারে। বোঝার চেষ্টা কর। যথেষ্ট বড় হয়েছিস তুই।”
মৃত্তিকা সমীরণের একটা কথারও কোন উত্তর দিল না। কেমন ছলছল দৃষ্টিতে সমীরণের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমার কেন যেন মনে হয়েছিল তুমি মন থেকে ঐ কথাগুলো বলেছিলে। আমি ভুল ছিলাম না, তাই না?”
“উঁহু। তুই ভুল ছিলি। যে কথাগুলো আমার মনে নেই সেই কথাগুলো মন থেকে বলব কি করে বল।”
“আমিও নেই তোমার মনে?”
সমীরণ কে এই প্রশ্নের উত্তরটা দেওয়ার জন্য একটুও ভাবতে হলো না। একটুও থমকাল না। নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
“না।”
কথাটা বলে সমীরণ চলে যেতে ধরলে মৃত্তিকা আবারো পিছন থেকে বলে উঠল,
“তোমায় আমি বুঝতে কেন পারি না? তোমায় আমি চিনতে কেন পারি না? এত চেষ্টা করি তোমাকে বোঝার তবু আমি সফল হতে পারি না কেন বলতে পারো?”
“তুই আমাকে সেদিনই বুঝতে পারবি যেদিন আমি চাইব। আর তার থেকেও বড় কথা আজ অব্দি আমি নিজেই নিজেকে বুঝতে পারলাম না। তুই কি করে বুঝবি!”
চলমান।

