#লাল_শাড়ি
#১০
#ফারহানা_ইসলাম
মধ্যরাত,,,
আমি আর ইভা আপু এখনও জেগে আছি। দুজনে মিলে স্কুলের কথা বলছি আর হাসছি।
আমি তখন কোনো কিছু না ভেবে ইভা আপুকে জিজ্ঞেস করলাম,,,
…. আচ্ছা আপু তোমার কী মনে হয় না অনিম ভাইয়া তোমাকে অন্য দৃষ্টিতে দেখে?
…. শোন ইরা অনিম ভাইয়া আমাকে যেই দৃষ্টিতে দেখুক না কেনো আমি কিন্তু উনাকে কখনও অন্য দৃষ্টিতে দেখি না।
…. আপু তুমি তখন অনিম ভাইয়াকে ওভাবে না বললেও পারতা!! দেখলেনা ভাইয়ার মুখটা কেমন জানি লাল হয়ে গেছে।
…. একদম ঠিক করেছি। উনি এসেছেন আলগা পিরিতি দেখাইতে। উনাকে কে বলছে আমাদের বাড়ি অবধি এগিয়ে দিতে?
…. সেই যাই হোক, অনিম ভাইয়া কিন্তু তোমার কাছ থেকে এমন জবাব আশা করেনি।
…. শোন ইরা তুই এখনও কিছু বুঝিস না। দেখ চারদিকের মানুষ আমাদের কেমন চোখে দেখছে!! এর মধ্যে যদি আমি অনিম ভাইয়াকে আশকারা দিই তাহলে সেটা ভালো হবে না। কেউ জানতে পারলে আবার তিলকে তাল করবে।
____ ইভা আপুর কথা শুনে আমি মনে মনে ভাবলাম, আপু তো ঠিক কথাই বলেছে। একে তো সবার কাছে আমরা এখন হাসির খোরাগ, এর মধ্যে যদি আবার অনিম ভাইয়ার ব্যাপারটা কেউ জানতে পারে তাহলে তো ভূমিকম্প হয়ে যাবে।
—
সকালবেলা,,,,
আমি আর ইভা আপু স্কুলের উদ্দেশে রওনা হইলাম।
___ রাতের বৃষ্টির পর চারপাশটা কেমন ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। গাছের পাতায় এখনও বৃষ্টির পানি ঝুলে আছে। কাঁচা রাস্তার অনেক জায়গায় কাদা জমে গেছে।
আমি আর ইভা আপু সাবধানে হাঁটছি।
হঠাৎ পেছন থেকে পরিচিত একটা কণ্ঠ ভেসে এলো—
___ ইরা! আপু!
আমি পেছনে তাকিয়ে দেখি মুন্নী দৌড়াতে দৌড়াতে আসছে।
___ এইভাবে হেঁটে দু’বোন আমাকে রেখে চলে যাইবা নাকি?
আমি হেসে বললাম,
___ তুইই তো দেরি করছিস।
মুন্নী হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
___ আম্মা মোড়ল বাড়ি কাজে যাওয়ার আগে অনেক কাজ করে দিছে। তাই দেরি হইছে।
আমরা তিনজন একসাথে স্কুলের দিকে হাঁটতে লাগলাম।
পথের মাঝে কয়েকজন গ্রামের মহিলা আমাদের দিকে তাকিয়ে নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কী যেন বলছিল।
আমি শুনতে না চাইলেও কানে ভেসে এলো—
___ এই যে সোহেলের বড় মাইয়াডা!!!
___ ওদের বাড়িতে নাকি এখন দুই বউ একসাথে থাকে!
___ আহারে মাইয়াগো কপাল!
কথাগুলো শুনে আমার বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল।
আমি মাথা নিচু করে হাঁটতে লাগলাম।
ইভা আপু একবারও পেছনে তাকাল না।
শুধু আস্তে করে বলল,
___ মানুষের মুখ বন্ধ করা যায় না। নিজের কান বন্ধ করতে শিখ।
আমি কিছু বললাম না।
কিন্তু চোখের কোণে পানি এসে জমল।
—
স্কুলে পৌঁছানোর পরও মনটা ভালো ছিল না।
প্রথম দুইটা ক্লাস কোনো রকমে শেষ হলো।
টিফিনের ঘণ্টা বাজতেই সবাই মাঠে নেমে গেল।
আমি আর মুন্নী গাছের নিচে বসে টিফিন খাচ্ছিলাম।
ঠিক তখনই পাশের ক্লাসের দুইটা মেয়ে এসে দাঁড়াল।
একজন ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
___ এই ইরা, তোর কি দুইটা মা?
আরেকজন হেসে উঠল,
___ না রে, একটা আসল মা আর একটা নতুন মা!
চারপাশে কয়েকজন ছাত্রছাত্রী হেসে উঠল।
আমার হাত থেকে টিফিনের ডিব্বাটা মাটিতে পড়ে গেল।
কী বলব বুঝে উঠতে পারছিলাম না।
ঠিক সেই সময় আমার বান্ধবী পিহা কোথা থেকে যেন এসে আমাদের সামনে দাঁড়াল।
তার চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে গেছে।
সে মেয়েদুটোর দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বলল,
___ কারও পারিবারিক কষ্ট নিয়ে হাসাহাসি করতে লজ্জা করে না তোমাদের? আজ ওদের নিয়ে হাসতেছো, কাল হয়তো তোমাদের ঘরেও এমন পরীক্ষা আসতে পারে।
আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা দেন, অপমান করার অধিকার দেন না।
পিহার কথায় চারপাশ একেবারে চুপ হয়ে গেল।
মেয়েদুটো মাথা নিচু করে সেখান থেকে চলে গেল।
আমি চোখের পানি মুছে পিহার দিকে তাকালাম।
পীহা আমার মাথায় হাত রেখে শুধু বলল,,
___ কাঁদিস না।
এরমধ্যে ইভা আপু এসে আমার আর মুন্নীর হাতে দুটো সিঙ্গারা ধরিয়ে দিয়ে বললো খা। অনেক লোকে অনেক কিছু বলবে তুই তা কানেও নিবি না।
ঠিক তখনই স্কুলের দপ্তরি এসে তাড়াহুড়ো করে বললেন,,,,,
___ ইবনাত সুলতানা (ইভা) আর ইসরাত জাহান (ইরা), তোরা দু’জন তাড়াতাড়ি প্রধান শিক্ষকের রুমে যা। তোদের বাড়ি থেকে একজন লোক আসছে।
আমার বুকটা ধক করে উঠল।
বাড়িতে আবার কী হয়েছে?
___ আমার বুকটা ধক করে উঠল।
আমি আর ইভা আপু একে অপরের মুখের দিকে তাকালাম।
মনে হচ্ছিল, আবার না জানি কী বিপদ হলো!
আমরা দ্রুত প্রধান শিক্ষকের রুমের দিকে দৌড়ে গেলাম। আমাদের পেছন পেছন মুন্নীও গেল।
রুমে ঢুকতেই দেখি আমাদের মাজেদা খালা দাঁড়িয়ে আছেন। ভিজে কাপড়, এলোমেলো চুল আর মুখভর্তি আতঙ্ক।
আমাদের দেখেই তিনি এগিয়ে এলেন।
___ইভা মা, ইরা, তোরা তাড়াতাড়ি বাড়ি চল।
ইভা আপু উৎকণ্ঠিত গলায় জিজ্ঞেস করল,,,
___কী হইছে খালা?
মাজেদা খালা কাঁপা গলায় বললেন,,,
___তোদের আম্মা হঠাৎ অজ্ঞান হইয়া গেছে।
কথাটা শুনেই আমার মাথা ঝিমঝিম করে উঠল।
ইভা আপু আর এক মুহূর্তও দেরি করল না।
প্রধান শিক্ষক আমাদের ছুটি দিয়ে দিলেন। মাজেদা খালা হেড স্যারকে বললেন যেন মুন্নীকেও ছুটি দেওয়া হয়।
আমি, ইভা আপু, মাজেদা খালা আর মুন্নী তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে রওনা দিলাম।
সারাটা পথ আমার শুধু একটাই দোয়া___
…. হে আল্লাহ, আমার আম্মারে ভালো কইরা দাও।
বাড়ির সামনে পৌঁছাতেই দেখি অনেক মানুষের ভিড়।
পাশের বাড়ির চাচি, ফুফুরা, গ্রামের কয়েকজন মহিলা সবাই উঠানে দাঁড়িয়ে।
আমার বুকের ধুকধুকানি আরও বেড়ে গেল।
আমি দৌড়ে ঘরের ভেতরে ঢুকলাম।
আমি দৌড়ে ঘরের ভেতরে ঢুকলাম।
দেখি আম্মা খাটে শুয়ে আছেন।
গ্রামের ডাক্তার দেলোয়ার কাকা উনার প্রেসার মাপছেন।
নিশা আম্মার হাত ধরে কাঁদছে।
আমি ছুটে গিয়ে আম্মার পাশে বসে পড়লাম।
___ আম্মা। ও আম্মা। আপনার কী হইছে?
আমার ডাক শুনে আম্মা ধীরে ধীরে চোখ খুললেন।
উনার মুখটা খুব ফ্যাকাশে।
আমাকে দেখে দুর্বল একটা হাসি দিলেন।
___ কিছু হয় নাই রে মা, একটু মাথা ঘুরছিল।
ডাক্তার কাকা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,,,,
___অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ঠিকমত খাবার না খাওয়া আর ঘুম না হওয়ার জন্য এমন হয়েছে। কয়েকদিন সম্পূর্ণ বিশ্রাম লাগবে।
আমি অবাক হয়ে আম্মার দিকে তাকালাম।
তিনি কি তাহলে ঠিকমতো খাচ্ছিলেনই না?
ইভা আপুও নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
বিকেলের দিকে সবাই চলে যাওয়ার পর ঘরটা আবার নীরব হয়ে গেল।
আমি রান্নাঘরে মাজেদা খালার পাশে গিয়ে বসে রইলাম। উনি তরকারি গরম করছিলেন।
হঠাৎ বারান্দা থেকে হাজেরার মায়ের গলা ভেসে এলো।
___ এইসব নাটক কইরা কোনো লাভ নাই।
আমি রাগে কাঁপতে কাঁপতে বাইরে বের হলাম।
দেখি হাজেরার মা দাঁড়িয়ে আছেন।
হাজেরা তাঁর পাশে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে।
হাজেরার মা আবার বললেন,,,,
___একটু অজ্ঞান হইলেই এত মানুষ! যেন কী হইয়া গেছে! মানুষ মরলে ও তো এত মানুষ আসে না।
ঠিক তখনই ইভা আপু সামনে এসে দাঁড়াল।
___আপনি আর একটা কথাও বলবেন না।
___ ক্যান? সত্য কথা কইতেছি।
___ যে মানুষটা নিজের সংসার বাঁচাইতে গিয়া প্রতিদিন একটু একটু করে মরতেছে, তারে নিয়া আর একটা বাজে কথা বলবেন না। না হয় এর পরিণাম ভালো হবে না।
হাজেরার মা রেগে উঠলেন।
___আমারে ভয় দেখাস? আমারে!!
ইভা আপুও দৃঢ় গলায় বলল,,
___ ভয় না। সম্মান কইরা কথা কইতেছি। কিন্তু সেই সম্মানের একটা সীমা আছে।
ঠিক তখনই আব্বা বাইরে থেকে এসে সব কথা শুনে ফেললেন।
আমি ভেবেছিলাম, তিনি হয়তো আগের মতোই চুপ করে থাকবেন।
কিন্তু এবার তিনি ধীরে ধীরে হাজেরার মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,,,,
___ আপনি আজকে বাসায় যান।
হাজেরার মা অবাক হয়ে বললেন,,,,
___ ক্যান?
___ কারণ এই বাড়িতে অসুস্থ মানুষ আছে। আর আমি আর কোনো ঝগড়া চাই না।
হাজেরার মা কিছুক্ষণ আব্বার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে হাজেরাকে নিয়ে ভেতরে চলে গেলেন।
পরেরদিন সকালবেলা
….. পরেরদিন আমি আর ইভা আপু স্কুলে যাই নি। আজকে মুন্নী একাই স্কুলে গেছে। মায়ের জন্য খুব চিন্তা হচ্ছে।
আমি আর নিশা বসে বসে টিভি দেখছি। টিভিতে সিসিমপুর শো দিতেছে। নিশা সিসিমপুর দেখছে আর হাত তালি দিচ্ছে।
ইভা আপু বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। আম্মা মাজেদা খালার পাশে বসে আছে। মাজেদা খালা মাছ কাটছে।
….. হঠাৎ দেখি মোড়ল জেঠা আর জেঠি আমাদের বাড়িতে এসেছেন। মোড়ল জেঠা জেঠিকে দেখে আম্মা সালাম দিয়ে বসতে বললেন।
মোড়ল জেঠি বললেন,,,
…. নাজিয়া, আমরা বসতে আসিনি। তোর সাথে একটু দরকারি কথা ছিল।
আম্মা বললেন,,,
…. জ্বী ভাবী বলেন?
তখনই মোড়ল জেঠা বললেন,,,
…. নাজিয়া, তুই তো শুনেছিস! কিছুদিন আগে আমার মেজো শালার বউ গত হয়েছে। সেতেরো মাসের একটা বাচ্চা ছেলে আছে।
…. হ্যাঁ ভাইজান আমি শুনেছি। ভাবী আমাকে সব বলেছেন।
…. নাজিয়া আমি বলতেছিলাম, আমার শালার সাথে তোর বড় মেয়েটার বিয়ে দিতে। দেখবি তোর মাইয়া অনেক সুখে থাকব।
…. ভাইজান আপনার মাথা খারাপ হইছে নাকি?
…. আমার মেয়ের বয়স মাত্র ষোল বছর। আমি এখন ওরে বিয়ে দিব না। আমি ওরে আরও পড়াব।
…. নাজিয়া, আমরা কিন্তু তোর ভালোর জন্যেই বলছি।
…. নাহ ভাইজান, আমার মেয়ের বিয়ের কথা এখন আমি চিন্তাও করতে পারি না।
মোড়ল জেঠা একটু গম্ভীর গলায় বললেন,
___ নাজিয়া, সময় থাকতেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। মেয়েমানুষ বড় হইলে অনেক রকম কথা ওঠে। তার উপর তোদের সংসারের যা অবস্থা!!
আম্মা এবার তাঁর কথা শেষ করতে দিলেন না।
___ আমার সংসারের অবস্থা খারাপ বলেই তো আমি চাই আমার মেয়েরা নিজের পায়ে দাঁড়াক। বিয়ে দিয়ে কারও ঘাড়ে বোঝা করে দিতে চাই না।
মোড়ল জেঠি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,,,
___ আমরা তো খারাপ কিছু ভাবি নাই রে নাজিয়া।
___ আমি জানি ভাবী। কিন্তু ইভার বিয়ের বয়স এখনও হয়নি। ও আগে পড়াশোনা করবে। তারপর আল্লাহ যেদিন ভালো লিখে রাখবেন, সেদিন বিয়ে হবে।
ঠিক তখনই বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা ইভা আপুর চোখ ভিজে উঠল। আমি বুঝতে পারলাম, আম্মার কথাগুলো ওর বুকেও সাহস হয়ে গেঁথে যাচ্ছে।
চলবে

