শুধু তোমারই জন্য পর্ব-১০+১১

0
1070

#শুধু_তোমারই_জন্য
#পর্ব_১০
#Ornisha_Sathi

রাত এগারোটা বাজে আদৃত এখনো আনিতাকে আনব্লক করেনি। আর এফবি একাউন্টও নেই যে ম্যাসেজ করবে। এত রাগ দেখানোর কি আছে? রাগ তো আমার করা উচিত উলটো মহারাজ রাগ করে নাম্বার ব্লক করে বসে আছেন। মনে মনে এসবই ভাবছে আনিতা।

আনিতার ভাবনার ছেদ ঘটিয়ে মেসেঞ্জারে টুং করে শব্দ হলো। আনিতা ফোন হাতে নিয়ে দেখে রাতুল ম্যাসেজ করেছে। আনিতা রিপ্লাই করে,

–“হ্যাঁ বলো।”

–“সাইকোদের মতো কাজ কেন করেছো?”

–“বুঝলাম না।”

–“বুঝতে হবে না। কাটা হাতের পিক দাও।”

–“কেন? দিতে পারবো না আমি।”

–“আদৃত দেখতে চেয়েছে কিন্তু। পরে পিক দিবা না আরো রেগে যাবে। তারপর দেখবা আর আনব্লকই করবে না তোমার নাম্বার।”

–“আদৃত তোমার সাথে?”

–“হ্যাঁ এখানেই আছে।”

–“ফোন করি তাহলে?”

–“করো।”

ম্যাসেজটা দেখে সাথে সাথেই আনিতা মেসেঞ্জারে রাতুলকে ফোন করে। একবার রিং হওয়ার পরই রাতুল রিসিভ করে,

–“হ্যাঁ আনিতা বলো।”

–“আদৃত কোথায়? তোমার সাথেই তো আছে তাই না?”

–“হুম দিবো?”

–“হ্যাঁ প্লিজ দাও। ও রাগ করে কথা বলছে না আমার সাথে।”

আনিতার অস্থিরতা দেখে রাতুল মুচকি হাসলো। সাথে আদৃত ঠোঁট কামড়ে ধরে হেসে দিলো নিঃশব্দে। রাতুল লাউডে দিয়ে কথা বলছিলো তাই আনিতার কথা আদৃতও শুনতে পারছে। আদৃতই রাতুলকে বলেছে হাতের পিক চাইতে। আরোহীর কথা শুনে মনে হলো পাগলীটা অনেকটা কেটেছে নিজের হাত। আর ও তো আনিতার উপর রেগে আছে তাই নিজে চায়নি। রাতুলকে দিয়ে চাইয়েছে। কিন্তু লাভের লাভ কিছুই হলো না রাতুল সেই বলেই দিলো আদৃত চেয়েছে।

রাতুল ফোনটা আদৃতের দিকে এগিয়ে দিলো। আদৃত ফোন না নিয়ে বলে,

–“ওর সাথে আমার কোনো কথা নেই। আর ওর উপর আমি রেগেও নেই। কেন কথা বলবো ওর সাথে আমি? যেখানে ও আমাকে বিশ্বাসই করে না। অন্য একটা মেয়ের কথা বিশ্বাস করে নিজের এত ক্ষতি করে তার সাথে তো কথা বলার প্রশ্নই আসে না।”

আনিতা আদৃতের বলা সব কথাই শুনলো। বেশ খারাপ লাগছে ওর। সাথে আরোহীর উপর বেশ রাগও হচ্ছে। কেন বলতে গেলো ওকে কথাটা? রাতুল আনিতাকে বলে,

–“শুনলে তো? আদৃত কথা বলতে চাচ্ছে না তোমার সাথে।”

–“কথা বলতে চাচ্ছে না মানে কি হ্যাঁ? ওকে ফোন দাও বলছি। ও যদি আমার সাথে কথা না বলে তাহলে কিন্তু তোমার আর জেরিনের সম্পর্কটাও আমি কন্টিনিউ করতে দিবো না। প্যাচ লাগামু আমি কইয়া দিলাম।”

–“আরেহ যাহ বাবা! আমি কি করলাম? তোমাদের দুজনের মাঝে আমাকে টানছো কেন?”

–“তো টানবো না? তুমি ওর কেমন ফ্রেন্ড হ্যাঁ? যে ও তোমার কথা শুনছে না। আর এত তো আমাকে হাফ গার্লফ্রেন্ড দাবী করো। তাহলে হাফ গার্লফ্রেন্ড এর এই কথাটুকু রাখতে পারছো না? আদৃত ইচ্ছে করে কথা বলতে না চাইলে মেরে কথা বলাও আমার সাথে। মারো ওকে ইচ্ছেমতো মারো কেন কথা বলবে না ও আমার সাথে?”

–“সত্যি সত্যিই মারবো কিন্তু। পরে আবার কান্নাকাটি করতে পারবা না কিন্তু।”

–“আচ্ছা মারো তারপরও আমার সাথে ওর কথা বলতেই হবে। তবে__”

–“আবার তবে কি?”

–“একটু আস্তে মেরো? ব্যাথা যাতে না পায় ওকে?”

–মারতে বলছো মারবো। আদৃত ব্যাথা পেলে পাবে। তাতে তোমার কি? ও যে এখন তোমাকে কষ্ট দিচ্ছে এর বেলায়?”

–“আদৃত ব্যাথা পেলে তো সেই ঘুরেফিরে আমিই কষ্ট পাবো। ওর ব্যাথা আমার সহ্য হবে নাকি?”

–“তাহলে আবার মারতে বলছো কেন?”

–“বারে বলবো না? ও যে এখন আমাকে কষ্ট দিচ্ছে। আমার নাম্বার ব্লক করে রেখেছে। আমার সাথে কথা বলতে চাইছে না। তাই ওকে মারবা তুমি। তবে আস্তে বেশি ব্যথা যাতে না পায়।”

আনিতার এমন বাচ্চামো কথা শুনে রাতুল আর আদৃত দুজনেই শব্দ করে হেসে দিলো। হাসতে হাসতে ওদের দুজনের মাটিতে গড়াগড়ি খাওয়ার মতো অবস্থা। ওদের হাসির শব্দ শুনে আনিতা মুখ ভার করে বলে,

–“হাসছো কেন তোমরা?”

–“তোমার কথা শুনে। আচ্ছা নাও আদৃতের সাথে কথা বলো।”

এই বলে রাতুল ফোনের স্পিকার অফ করে আদৃতের দিকে এগিয়ে দেয়। আদৃতও হেসেই ফোনটা হাতে নেয়। আদৃতের কাছ থেকে সরে আরহান আর ওর বাকী বন্ধুদের ওখানে গিয়ে বসে রাতুল। আদৃত ফোন কানে নিয়ে হ্যালো বলতেই আনিতা বলে,

–“এখনো রাগ করে আছো আমার উপর?”

–“আমি কি আমার পিচ্চি পাখির উপর বেশিক্ষণ রাগ করে থাকতে পারি?”

–“হুম এজন্যই তো এখন অব্দি নাম্বার আনব্লক করলে না। তাই না?”

–“করেছি অনেক আগেই। লাস্ট এক ঘন্টা তো তুমি ফোন দাওনি তাই জানোনা।”

–“একবার ফোন দিলে কি হতো?”

–“ইচ্ছে হয়নি দেইনি। আর এমন করবা বলো? আরো হাত কাটবা?”

–“নাহ।”

–“সত্যি তো?”

আনিতা এবার আর কোনো কথা বলল না। চুপ করে আছে। তা দেখে আদৃত বলে,

–“কি হলো চুপ করে আছো কেন? তার মানে আবারো হাত কাটবা?”

–“না মানে আমি তো ইচ্ছে করে করবো না। কিন্তু আবারো যদি এবারের মতো অনেক রাগ হয়? প্রচন্ডরকম কষ্ট হয় তখন কি করবো?”

–“তখন আমাকে ফোন দিয়ে ইচ্ছে মতো গালি দিবা। ঝাড়ি মারবা আমাকে। মনে যা আসে তাই বলবা। মনের সব রাগ কষ্ট বের করে ফেলবা।তাহলে দেখবা রাগ আর কষ্ট দুটোই চলে গিয়েছে।”

–“পারমিশন পেলাম কিন্তু। পরে উল্টাপাল্টা কিছু বললে রাগ করতে পারবা না।”

–“আচ্ছা বাবা দিলাম পারমিশন। তাছাড়া আমার পিচ্চিটার রাগ কষ্ট কমানোর জন্য না হয় দুটো বারতি কথা শুনলাম। দুটো ঝাড়ি গালি শুনলাম তাতে কি? আমার পিচ্চিটার মন তো ঠিক হবে। রাগের বসে নিজের সাথে উল্টাপাল্টা কিছু তো আর করবে না। এখন হাতের পিক দাও তো। লাইনে আছি আমি।”

আনিতা হাতের একটা পিক তুলে সেটা রাতুলের আইডিতে সেন্ড করলো। আদৃত সাথে সাথেই সিন করলো সেটা। পিকটা দেখে আদৃত চোখ বন্ধ করে নিলো একবার। পরপর দুটো বড় শ্বাস নিয়ে চোখ খুলে ভালো করে দেখলো ছবিটা। কুনইয়ের নিচ থেকে হাতের শিড়া অব্দি পুরো হাতটাই কাটা। গভীর ক্ষত হয়ে আছে হাতটা। এমন কেউ করে? মেয়েটা সত্যিই পাগল। এসবই ভাবছে আদৃত। আদৃত আবার ফোন কানে নিয়ে বলে,

–“এসব কি করেছো আনি? এভাবে কেউ কাটে? কত গভীর হয়েছে ক্ষতগুলো। ব্যাথা করছে না হাত?”

–“নাহ তো।”

–“কেন মিথ্যে বলছো? বাসার কেউ তো জানে না এটা আমি নিশ্চিত। কাল কলেজে গিয়ে হাত ড্রেসিং করে ব্যান্ডেজ করে নিবে আবার।”

–“লাগবে না। এভাবেই ঠিক হয়ে যাবে।”

–“আবার কথা বলে। যা বলেছি চুপচাপ তাই করবে মনে থাকবে?”

–“হুম।”

–“এই তো গুড গার্ল।”

–“আদৃত অনেক ভালোবাসি তোমাকে বিশ্বাস করো।”

–“জানি। কিন্তু আমি ভালোবাসি না তোমাকে।”

–“কিহ? কি বললে?”

–“যা সত্যি তাই বলেছি। তুমি আমারই ফ্রেন্ডকে ফোন দিয়ে বলবে আমাকে মারতে। তাহলে তোমাকে কেন ভালোবাসবো আমি?”

–“ওটা তো এমনি___”

–“এমনি কি হ্যাঁ? যেভাবেই হোক বলেছো তো।”

–“সরি আর এমন হবে না।”

আনিতার কথা শুনে আদৃত শব্দ করেই হেসে দিলো। আনিতা চুপচাপ আদৃতের হাসির শব্দ শুনছে। কি সুন্দর করে হাসে ছেলেটা। আদৃতের হাসি শুনলেই আনিতা কেমন যেন একটা ঘোরের মাঝে চলে যায়। আদৃত হাসি থামিয়ে বলে,

–“মজা করছিলাম পাগলী।”

–“তুমি হাসলে না খুব ভালো লাগে আমার। সবসময় এমন হাসিখুশি থাকবা কেমন?”

–“আমার পিচ্চিটা যখন আমাকে হাসিখুশি থাকতে বলেছে তাহলে অবশ্যই হাসিখুশি থাকবো। মহারানীর কথা কি আর অমান্য করা যায়? অমান্য করলেই তো আবার মানুষ ঠিক করে আমাকে মার খাওয়াবে তাই না?”

–“উফস আদৃত___”

–“ওকে ওকে আর বলছি না।”

–“হুম মনে থাকে যেন।”

–“অবশ্যই। আনি____”

–“বলো।”

–“জানো আমি না পাগল হয়ে যাচ্ছি।”

–“কেন?”

–“তোমার ভালোবাসার জন্য #শুধু_তোমারই_জন্য।”

–“ধ্যাত।”

–“সত্যি বলছি।”

–“হুম বুঝলাম। এখন বলো বাসায় যাবা কখন?”

–“লেট হবে একটু।”

–“কেন?”

–“অনেকদিন পর সব ফ্রেন্ডরা একসাথে হয়েছি তাই।”

–“আচ্ছা তাহলে আড্ডা দাও। পরে কথা হবে।”

–“উঁহু পরে কথা হবে না।”

–“কেন?”

–“এখন চুপচাপ ঘুমাবে তুমি। কাল অনেক রাত করে ঘুমিয়েছো। তার উপর আবার এই অবস্থা। রক্ত গিয়েছে অনেক। শরীর অনেক দূর্বল। সো চুপচাপ ঘুমাবে তুমি।”

–“কে বলেছে আমার শরীর দূর্বল? একদম ফিট আছি আমি।”

–“হ্যাঁ সেটা তোমার কন্ঠ শুনেই বোঝা যাচ্ছে। আর একটা কথাও না। এখনই অফলাইন হবে৷ তারপর চুপচাপ ঘুমাবে।”

–“কিন্তু___”

–“কোনো কিন্তু না। কাল কথা বলে একেবারে পুষিয়ে দিবো প্রমিস।”

–“আচ্ছা।”

–“ভালোবাসি পিচ্ছি।”

–“আমিও ভালোবাসি তোমাকে।”

–“তো রাখি?”

–“আচ্ছা।”

এই বলে আনিতা নিজেই ফোন রেখে দিলো। আর অনলাইনে থাকলো না আনিতা। ফোন কাটার সাথে সাথেই অফলাইন হয়ে গেলো।

টেবিলের দিকে চোখ যেতেই দেখে খাবার ঢেকে রাখা আছে। আনিতা রাতের খাবার খেতে যায়নি বলে অনিমা রুমে নিয়ে এসেছিলো। তখন খায়নি আনিতা মন খারাপ ছিলো বলে। এখন আদৃতের সাথে কথা হয়েছে মনটাও বেশ ফুরফুরে। তাই চেয়ার টেনে বসে খেয়ে নিলো। খাওয়া শেষে প্লেট কিচেনে রেখে রুমে চলে এলো।

ঘড়িতে তাকিয়ে দেখে বারোটা সতেরো বাজে। তাই লাইট অফ করে চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়লো আনিতা।



চলবে।

#শুধু_তোমারই_জন্য
#পর্ব_১১
#Ornisha_Sathi

এর মাঝে অনেকগুলো দিন কেটে গিয়েছে। আর মাত্র একটা দিন তারপরই আদৃত আর আনিতার রিলেশনের ১ বছর পূর্ণ হবে। সেটা নিয়ে বেশ এক্সাইটেড হয়ে আছে আনিতা। কেননা আদৃত বলেছিলো ওদের রিলেশনের যেদিন ঠিক এক বছর পূর্ণ হবে সেদিন ওরা দুজনে মিট করবে। এতদিনে আনিতার সেই অপেক্ষার অবসান ঘটতে চলেছে। আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে কালকের এই তারিখটাতে আদৃত এসেছিলো ওর লাইফে। আর কালকের এই তারিখটাতেই আনিতা আদৃতের দেখা পাবে। বহু অপেক্ষার অবসান ঘটতে চলছে কাল। সেইজন্য কালকের দিনটা আনিতার জন্য খুবই স্পেশাল।

সন্ধ্যায় আনিতা কলেজের পড়া কমপ্লিট করছিলো। পাশে অনিমাও পড়ছে। তখনই আনিতার আম্মু রুমে আসলো ফোন হাতে নিয়ে। আনিতার আম্মু ফোনটা অনিমার দিকে এগিয়ে দেয়। অনিমা ফোন হাতে নিয়ে দেখে আব্বুর ফোন। তাই কানে নিয়ে কথা বলতে থাকে। আনিতা তেমন একটা ফোনে কথা বলে না ওর আব্বুর সাথে। তবে ওর আব্বুকে ও সবচাইতে বেশি ভালোবাসে। ওর আব্বুও দুই মেয়েকে অনেক ভালোবাসেন। আনিতা তখন অনিমাকে বলে,

–“তোর কথা শেষ হলে আমাকে দিস তো।”

অনিমা ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতি জানায়। অনিমার কথা শেষ হলে ও আনিতার হাতে ফোন দেয়৷ আনিতা ফোন কানে নিয়ে বলে,

–“আসসালামু আলাইকুম আব্বু।”

–“ওয়ালাইকুম সালাম। কেমন আছো মা?”

–“ভালো তুমি কেমন আছো?”

–“ভালোই। পড়াশোনা কেমন চলছে? ঠিক মতো কলেজে যাচ্ছো তো?”

–“হ্যাঁ আব্বু।”

–“তো আর কি অবস্থা আম্মু? কিছু দিন পর তোমার ছোট চাচ্চু আসছে দেশে। তোমার কিছু লাগবে?”

–“কিছু লাগলে পরে জানাবো।”

–“আচ্ছা।”

–“ওই আব্বু।”

–“কি মা বলো?”

–“আমার কিছু টাকা লাগবে।”

–“কত টাকা লাগবে?”

–“দু/তিন হাজার হলেই হবে।”

–“কি করবা এত টাকা দিয়ে?”

–“আমার ফ্রেন্ডরা ট্রিট চেয়েছে আমার কাছে। তাই সবাইকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে যাবো।”

–“আচ্ছা যেদিন লাগবে তোমার আম্মুর থেকে নিয়ে নিও।”

–“তুমি আম্মুকে বলে দাও। আম্মু নয়তো এত টাকা দিবে না আমাকে।”

–“আচ্ছা বলে দিবো আমি।”

আনিতা আরো কিছুক্ষণ ওর আব্বুর সাথে কথা বলে ফোন অনিমাকে দিয়ে দেয়। অনিমাও ওর আব্বুকে বলে, “” আপুরে টাকা দিলে আমাকেও দিতে হবে।” অনিমার আব্বু তখন মুচকি হাসে। ওদের দু বোনের সাথে সবসময় ঝগড়া লেগেই থাকে। আবার দুজনের অনেক মিলও বটে। দুই বোনই দুজনের জান।

পরদিন আনিতা বোরখা পড়ে একেবারে রেডি হয়ে ওর আম্মুর কাছে যায়। ওর আম্মু তখন কিচেনে ছিলো। আনিতা ওর আম্মুকে ডেকে বলে,

–“টাকা দাও।”

–“কিসের টাকা?”

–“কেন আব্বু তোমাকে বলেনি?”

–“আজই লাগবে? দাড়া একটু দিচ্ছি।”

এই বলে আনিতার আম্মু তার হাতের কাজটা শেষ করে। তারপর আঁচল দিয়ে হাত মুছতে মুছতে নিজের রুমে চলে যায়। আনিতাও যায় পেছন পেছন। আনিতার আম্মু আলমারি থেকে এক হাজার টাকার দুটো নোট বের করে দেয় ওর হাতে। দু হাজার দেখে আনিতা বলে,

–“দু হাজার কেন? আরো এক হাজার দাও।”

–“তোর আব্বুর কাছে কত চাইছিস?”

–“দু/তিন হাজার।”

–“তাহলে ঠিকই তো আছে। দু হাজারই তো দিয়েছি।”

–“আম্মু দু আর তিনে কত হয়? পাঁচ হাজার। সেখানে আমি তিন হাজার চাইছি। দাও তো আর এক হাজার।”

–“একটা দিবো ফাজিল মেয়ে। বড্ড কথা শিখে গেছো।”

এই বলে আনিতার আম্মু এক হাজার টাকার আরো একটা নোট দেয়। আনিতা সেটা নিয়ে আবারো বলে,

–“এবার কলেজে যাওয়ার গাড়ি ভাড়া + আমার ক্ষুধা লাগলে আমি কিছু খাবো না? তার টাকা দাও।”

আনিতার কথা শুনে আনিতার আম্মু চোখ কটমট করে তাকায় ওর দিকে। আনিতার আম্মু কপাট রাগ দেখিয়ে বলে,

–“তিন হাজার দিলাম এখন আবার গাড়ি ভাড়া আবার নিজের খাওয়ার টাকাও এক্সট্রা লাগবে তাই না?”

–“গাড়ি ভাড়া শেষ তো। এখন দাও তো।”

আনিতার আম্মু আর একশ টাকার একটা নোট ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে চলে গেলো। আনিতা আর কিছু বলল না। আপাতত একশ টাকাতেই হবে। আনিতাদের বাসা থেকে কলেজের যেতে আসতে অটোতে টোটাল ভাড়া বিশ টাকা লাগে। আর যদি রিকশায় যায় তাহলে চল্লিশ টাকা।

আনিতা টাকাগুলো ব্যাগে ভরে বের হয়ে গেলো বাসা থেকে। আজকে একা যেতে হবে ওর। তাসকিয়া রোদেলা শুভ ওরা আজকে একটু আগেই চলে গিয়েছে। ওকে অবশ্য বলেছিলো কিন্তু আনিতার ঘুম থেকে উঠতে লেট হয়ে যায়। আনিতা বাসা থেকে বের হতেই দেখে ওর মেজো চাচ্চু কোথায় থেকে যেন আসলো। আনিতার ওর চাচ্চুকে বলে,

–“চাচ্চু একটু কলেজে দিয়ে আসবা? লেট হয়ে গিয়েছে আজকে।”

–“আচ্ছা উঠো”

আনিতা বাইকে উঠে বসে। আনিতার কলেজ পৌঁছাতে মিনিট সাতেক সময় লাগে। কলেজ গেটের সামনে এসে ওর চাচ্চু বাইক থামালে আনিতা নেমে যায়। ওর চাচ্চুকে বলে চলে যেতে নিলেই ওর চাচ্চু বলে,

–“টাকা আছে তোমার কাছে?”

–“হ্যাঁ আছে।”

তারপরও ওর চাচ্চু ওয়ালেট বের করে একশ টাকার দুটো নোট বের করে ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,

–“রাখো এটা।”

–“লাগবে না চাচ্চু। আমার কাছে টাকা আছে। আর আম্মুও দিয়েছে আসার সময়।”

–“রাখো কিছু খেতে ইচ্ছে করলে খেও।”

এই বলে ওর চাচ্চু একপ্রকার জোর করেই আনিতার হাতে টাকা দেয়। আনিতা ওর চাচ্চুকে বাই বলে কলেজে চলে যায়। ওর চাচ্চু বাইক ঘুরায় বাসার দিকে।

আনিতা আরোহী শুভ তাসকিয়া রোদেলা পাঁচজন মিলে একটা শপিংমলে গিয়েছে আদৃতের জন্য গিফট কিনবে বলে। কয়েকটা দোকান ঘুরে আনিতা আদৃতের জন্য একটা ঘড়ি, একটা ওয়ালেট নিলো। আর আদৃতের পছন্দের একটা পারফিউমও নিলো সাথে। সব গুলো আলাদা আলাদা ভাবে র‍্যাপিং পেপারে মুড়ে একটা ছোট্ট শপিং ব্যাগে নিলো। তারপর ব্যাগটা ওর কলেজ ব্যাগে রেখে দিলো। গিফটগুলো সব আনিতা ওর নিজের জমানো টাকা দিয়েই কিনেছে।

শপিংমল থেকে বেরিয়ে ওরা সবাই মিলে পাশেরই একটা রেস্টুরেন্টে গেলো। বেশ ক্ষানিকটা সময় ওরা সবাই ওয়েট করলো আদৃতের জন্য কিন্তু আদৃত আসছে না। আদৃতের বলা টাইম অনেক আগেই শেষ হয়েছে। এতক্ষণে তো এসে পরার কথা। এসবই ভাবছে আনিতা।

আনিতা ফোন বের করে আদৃতকে ফোন দিলো। প্রথম বারে ধরলো না। দ্বিতীয় বারে দুবার রিং হবার পরই আদৃত ফোন রিসিভ করলো। আনিতা ফোন কানে নিয়ে বলে,

–“আদৃত কোথায় তুমি? এতক্ষণে তো তোমার এসে পরার কথা।”

–“আনিতা আসলে___”

–“আসলে কি?

–“সরি আনি আমি আজ আসতে পারছি না। জরুরী একটা কাজ পড়ে গিয়েছে।”

–“মানে কি বলছো? তুমি তো আমাকে কথা দিয়েছিলে আমাদের সম্পর্কের এক বছর হলে তুমি মিট করবে আমার সাথে। তাহলে আজকে যখন মিট করার কথা তখন এসব কিভাবে বলতে পারছো তুমি?”

–“হ্যাঁ বলেছিলাম। আমিও চেয়েছিলাম তোমার সাথে দেখা করবো আজ। কিন্তু এখন পসিবল হচ্ছে না আনি।”

আদৃতের কথায় আনিতার কষ্ট হলো ক্ষানিকটা। অনেক আশা নিয়ে এসেছিলো ও। আর আদৃত কি বললো? জরুরী কাজ পড়ে গিয়েছে আসতে পারবো না। বাহ ভালোই তো! মনে মনে এসব ভেবে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো আনিতা৷ ক্ষানিকটা হেসেই বলে,

–“হুম বুঝলাম।”

–“প্লিজ আনি রাগ করো না। খুব শীঘ্রই আমরা মিট করবো। প্রমিস।”

–“হুম, আচ্ছা রাখছি আমার ফ্রেন্ডরা ওয়েট করছে আমার জন্য।”

–“আচ্ছা তাহলে পরে কথা হবে।”

এই বলে আদৃত নিজেই লাইন কেটে দিলো। আবারো তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো আনিতা। এবারেও বোকার মতো ভেবেছিলো আদৃত হয়তোবা বুঝতে পারবে ওকে। আদৃত হয়তো বুঝবে ও অভিমান থেকেই ফোন রাখার কথা বলল। কিন্তু না আদৃত তো আদৃতই। বরাবর যেমন ছিলো। এখনই ঠিক তেমনই আছে।

মাঝে মাঝে আনিতা ভেবে পায় না, আদৃত সত্যি ওকে ভালোবাসে তো? একেক সময় মনে হয় আদৃত সত্যি ওকে খুব ভালোবাসে। আবার একেক সময় মনে হয় আদৃত ভালোবাসে না আনিতাকে। শুধুমাত্র আনিতার পাগলামি ভালোবাসা বাচ্চামো এসবের কাছে বাধ্য হয়েই আদৃত ওর সাথে সম্পর্কটা টিকিয়ে রেখেছে। মনে হয় এতদিনেও আনিতা আদৃতের ভালোবাসা হয়ে উঠতে পারেনি। শুধুমাত্র অভ্যাসই রয়ে গেলো আদৃতের।

এই এক বছরে কম তো অবহেলা সহ্য করেনি আদৃতের। হুটহাট করেই আদৃত কেমন যেন বদলে যেতো। কথা বলতে চাইতো না এড়িয়ে চলতো। প্রায়সময় ছোট খাটো বিষয় নিয়ে সম্পর্ক শেষ করে দিতো। আনিতা খুব করে চেষ্টা করতো আদৃতকে ওর লাইফে ফিরিয়ে আনতে। কখনো আদৃত আনিতার কথায় ব্যাক করতো। আবার কখনো স্বেচ্ছায় নিজেই সবকিছু ঠিক করে নিতো।

অনেক মেয়ের সাথেই আদৃতের রিলেশন ছিলো এটাও একসময় আনিতা জানতে পারে। তবুও নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসে গিয়েছে ও আদৃতকে। আদৃতকে এই বিষয়ে জানালে তার উত্তর ছিলো,

“মিথ্যে বলবো না তোমাকে। আগে রিলেশন করেছিলাম। অনেকের সাথেই মজা করতাম। কিন্তু তোমার সাথে সম্পর্কে জড়ানোর পর আর এসব কিছুই করিনি আমি। সব মেয়েদের সাথে কথা বলা অফ করে দিয়েছি।”

তবুও সবটা মেনে নিতো আনিতা। ওই যে খুব বেশি ভালোবাসতো যে। পাগল ছিলো কিনা আদৃতের জন্য। আর আদৃতও বারবার সেটারই সুযোগ নিতো। বারবার অবহেলা ইগনোর এসব করেই যেত৷ তবুও ভালোবেসেছে।

কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ পেতেই আনিতার ভাবনার ছেদ ঘটে। চোখের কোনে জমে থাকা পানিটা মুছে নিলো ও। পিছু ঘুরতেই দেখে শুভ দাঁড়িয়ে আছে। শুভকে দেখে আনিতা মৃদু হাসে। তা দেখে শুভ বলে,

–“আর যাই হোক আমার সামনে অন্তত মিথ্যে হাসি হাসিস না।”

–“কি বলছিস মিথ্যে হাসবো কেন?”

–“আর কত কষ্ট পাবি ওকে ভালোবেসে? ওর আর কত অবহেলা সহ্য করবি বল? কেন এত কষ্ট পাচ্ছিস ওর জন্য? কেন এখনো ওর সাথে সম্পর্কে আছিস বল?”

–“ওই যে ভালোবাসি যে।”

–“দেখ আনিতা তুই ভালোবাসলেও আদৃত তোকে ভালোবাসে না।”

–“ওর মনের কথা আমিও জানি না আর তুইও জানিস না। ওই যে বললাম না, ভালোবাসি ওকে? তাই ওর সবটা হাসিমুখে মেনে নেই। ওর সব কথা বিশ্বাস করি। আর আদৃত যে আমাকে বলে “আনি তোকে ভালোবাসি আমি” এই কথাটাও বিশ্বাস করি।”

–“আদৃত একদিন নিশ্চয়ই বুঝবে তবে না জানি বড্ড দেরী করে ফেলে।”

–“যাই হোক বাদ দে এসব। ও আসবে না। তোরা কি খাবি অর্ডার দে।”

এই বলে আনিতা ওখান থেকে সরে বাকী সবার সাথে গিয়ে বসলো। আনিতার যাওয়ার পানে তাকিয়ে শুভ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,

–“আমি জানি তুই আদৃতকে কতটা ভালোবাসিস আনিতা। আদৃতের প্রতি তোর ভালোবাসার কোনো খামতি নেই। কিন্তু আদৃত তো বুঝে না তোকে। বুঝলে এভাবে অন্তত কষ্ট দিতে পারতো না।”

নিজে নিজেই এসব বলে শুভও আনিতার ওখানে গিয়ে বসে। তারপর খাবার অর্ডার করে। কিছুক্ষণ বাদে ওয়েটার খাবার দিয়ে গেলে ওরা খেতে শুরু করে। খাওয়া-দাওয়ার পার্ট শেষ হলেই ওয়েটার এসে একটা লাভ শেইপ দুই পাউন্ডের চকলেট কেক দিয়ে যায় ওদের টেবিলে।

কেক এর উপর লেখা আছে “Happy 1st Relationship Anniversary” আর এই লেখাটার নিচে ছোট্ট করে ইংলিশে লেখা “আনিতা লাভ আদৃত।” কেকটা তো আজ দুজনে মিলে কাটার কথা ছিলো। কিন্তু ওকে এখন একাই কাটতে হবে। এসব ভেবে আনিতার চোখ পানিতে টলমল করে উঠলো। সাথে সাথেই আনিতা নিজেকে সামলে নিলো। আর কাঁদবে না ওর জন্য। আদৃতের যা ইচ্ছে করুক।

আনিতা কেক কাটার পর সবাই ওকে খাইয়ে দেয়। আনিতাও খাইয়ে দেয়। ওখানে থাকার সারাটা সময় আনিতা মুখে প্লাস্টিকের হাসি ঝুলিয়ে রেখেছিলো ঠোঁটের কোনে। ওরা সবাই সেটা বুঝতে পেরেছে। বেস্ট ফ্রেন্ড তো। আজকের দিনটা নিয়ে অনেক এক্সাইটেড ছিলো আনিতা সেটা ওরা সবাই জানে। কিন্তু এই দিনটাকেও আদৃত মূহুর্তেই মাটি করে দিলো।

রেস্টুরেন্টের সব বিল পে করে দিলো আনিতা। তারপর সবাই মিলে একসাথেই বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলো।

বিকেলে ছাদে দাঁড়িয়ে আছে আনিতা। একটু আগে আদৃতকে ফোন করেছিলো কিন্তু ওর দুটো নাম্বারই বন্ধ বলছে। বেশ মন খারাপ ওর। কিন্তু আনিতা ওর মন খারাপ ভাবটা বাহিরে প্রকাশ করতে চাচ্ছে না। এবার আর রাতুল আরহান কাউকেই ফোন দিয়ে আদৃতের কথা জিজ্ঞেস করবে না মনে মনে এটা ভেবে নিয়েছে আনিতা। আদৃত না চাইলে এবারে আর ওর সাথে সম্পর্ক রাখবে না আনিতা। যত কষ্টই হোক শেষ করে দিবে সবকিছু। এভাবে তো আর চলতে পারে না। অনেক তো হলো আর কত? আর কত নিজে নিজে বেহাইয়া হবে? এর থেকে ভালো না দূরে সরে আসা? আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে এসবই ভাবছে আনিতা।

আনিতার পাশে তখনই কেউ একজন এসে দাঁড়ালো। গভীর ভাবনায় থাকার ফলে সেটা টের পেলো না আনিতা। একমনে আকাশের দিকে মুখ করে চোখ বন্ধ করে আছে আনিতা। হুট করেই আনিতার কানের কাছে সে মানুষটা কিছুটা ঝুকে ফিসফিস করে বলে,

–“পিচ্ছি পাখিটার কি মন খারাপ?”

চোখ বন্ধ থাকা অবস্থাতেই চমকে উঠলো আনিতা। কি বলল? পিচ্চি পাখি? এই নামে তো ওকে একমাত্র আদৃতই ডাকে। আর কে ডাকতে পারে আনিতাকে এ নামে? এই ভেবে একবার আনিতা চোখ খুলতে চাইলো। কিন্তু পরক্ষণেই মনের ভুল ভেবে আর চোখ খুলল না আনিতা। কিন্তু আনিতার স্পষ্ট মনে হচ্ছে এটা মনের ভুল না ও ঠিকই শুনেছে। মস্তিষ্ক বলছে মনের ভুল আর মন বলছে না ও যা শুনেছে একদম ঠিকই শুনেছে। অতঃপর মন আর মস্তিষ্কের যুদ্ধে মনেরই জয় হলো। মনের কথাকে সায় দিয়ে চোখ খুলে পাশে তাকালো আনিতা।



চলবে।