শ্রাবণের অশ্রুধারা পর্ব-১০

0
461

#শ্রাবণের_অশ্রুধারা
#পর্ব_১০
#কলমে_আসমা_মজুমদার_তিথি

তিনদিন যেনো খুব ভালোই কাটলো তরুর।তুষার তাকে এতো ভালোবাসা আর সম্মান দিয়েছে যে সে নিজেকে এ পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানবী মনে করছে।তার কপালে এতো সুখও লেখা ছিল তা যে তার কাছে পুরোই স্বপ্নের মতন।অবশেষে কেউ অন্তত এ পৃথিবীতে আছে যে শুধু তার জন্যই তাকে ভালোবাসে যাকে সে খুঁজে পেয়েছে। যে ভালোবাসায় কোন দায়বদ্ধতা বা দয়া নেই,আছে শুধুই ভালোবাসা নামক পবিত্র শব্দ। ছোটবেলায় বাবা-মার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার জীবনটা ছিলো একেবারে রাজকন্যার মতন।সে ছিলো তার বাবা-মায়ের একমাত্র চোখে মনি।কিন্তু তার সেই সুখময় দিনগুলো হঠাৎ এক এক্সিডেন্টে বদলে গেলো।মা-বাবাকে হারিয়ে এতিম হয়ে সে আশ্রয় পেলো জেঠা-জেঠির বাড়িতে।সেখানে হয়তো সব ছিলো, আছেও কিন্তু তার জন্য সত্যিকারের ভালোবাসা নেই।চারু যদিও তাকে ভালোবাসে কিন্তু তার জেঠা-জেঠির কাছে সে শুধুই দায়িত্ব ছিলো।যে দায়িত্বের বিনিময়ে তারা পেয়েছিলো তরুর বাবার রেখে যাওয়া বিশাল সম্পত্তি ভোগ করার সুযোগ।সেটা ছোট বেলায় না বুঝলেও যত বড় হয়েছে ততই তার কাছে সবটা পরিষ্কার হয়েছে।তবুও তার থাকতে হয়েছিলো ও বাড়ি কারণ একা অনাথ মেয়ে সে কোথায় যাবে।চারুর সকল জিনিসের ভাগ সে হয়তো পেয়েছে কিন্তু তা পুরোনো হওয়ার পরে।চারুর অগোরোই তার জেঠিমা এই কাজ গুলো করতেন।ও বাড়িতে তার যদি একটুও প্রশান্তির কিছু থাকে তা কেবল চারুলতা নামক মানুষটিই ছিলো।যার ভালোবাসার ছায়াতলে সে নিজের সমস্ত কষ্ট ভুলে যেতো।ভুলে যেতো জেঠার নিষ্ঠুরতম লোভ,ভুলে যেতো জেঠিমার দেয়া অবহেলা,অনাদর আর অযত্ন। চারু চলে যাওয়ার পরে তার দম বন্ধকর জীবনে সুখের হাওয়া নিয়ে এসেছে তুষার।তার সবচেয়ে খারাপ, একাকিত্বের দিনগুলোতে তাকে বন্ধুর মতন সামলেছিলো তুষার,সেই বন্ধুত্ব থেকে কখন যে তুষারের প্রতি দূর্বল হয়ে গেছে তরু তা সে নিজেও জানে না।শুধু হঠাৎ যখন তুষার তাকে ভালোবাসি বলেছিলো তখন সেও তাতে সায় দিয়েছিলো।অবশেষে দীর্ঘ ২ বছরের প্রনয়ের পূর্নতা পেয়েছে গত দুদিন আগে।তরু তুষারকে একটা সময় তার জেঠা-জেঠির স্বার্থপরতার কথা বলেছিলো,তুষারও তার দিকটা বুঝে তাকে বুঝিয়েছে তারা তার সাথে হয়ত তরুর কখনো বিয়ে দিবে না তাহলে তাদের স্বার্থে আঘাত লাগতে পারে।
তারা কখনোই নিশ্চয়ই চাইবে না তরু এমন কাওকে বিয়ে করুক যাতে করে সে কোন না কোনদিন তার ভাগের সম্পত্তির দাবি করে।তাইতো তরুকে লুকিয়ে বিয়ের কথা বলে তুষার।তরু প্রথমে রাজি নাহলেও তুষারের দেয়া ভরসায় সে লুকিয়ে বিয়েতে রাজি হয়।কিন্তু সে তুষারকে বলেছিলো অন্তত সে তার আপুমনিকে জানাতে চায় বিষয়টা।কিন্তু তুষারের কড়া নিষেধ থাকায় তরু তার বোনকে আর কিছুই জানাতে পারেনি।
তরু মনে মনে ভাবে আপুমনি যদি জানতে পারে হয়ত কষ্ট পাবে কিন্তু তার সুখ দেখে সেও নিশ্চয়ই খুশি হবে,তখন নিশ্চয়ই তার উপর আর রেগে থাকবে না তার আপুমনি!
বারান্দায় দাঁড়িয়ে এসব আনমনে ভেবে যাচ্ছিলো তরু, তখনই বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ঘরে আসে তুষার।তুষারের অস্তিত্ব বুঝতে পেরে বারান্দা থেকে বেরিয়ে আসে তরু,এসেই তুষারের ভেজা শরীর দেখে একটা তোয়ালে নিয়ে তার মাথা মুছতে এগিয়ে যায়।তুষারের কাছে ঘেঁষতেই সে এক ঝটকায় তরুর হাত থেকে তোয়ালেটা ছোঁ মেরে নিয়ে নিজেই নিজের মাথার পানি মুছতে মুছতে ওয়াশরুমে চলে যায়।
এদিকে তুষারের হঠাৎ এমন ব্যবহারে অবাক না হয়ে পারে না তরু,এতোগুলো বছরে সে তুষারের তার উপর কখনো এমন ব্যবহার দেখেনি।উল্টো সে যদি কখনো কোন কারণে রেগে যেতো তবে তুষারই তাকে ভালোবেসে তার রাগ নিবারন করত।সেখানে বিনা কারনে তুষারের এমন ব্যবহারের কোন মানেই খুঁজে পেলো না তরু।
অনেকটা সময় পর তুষার বেরিয়ে এসেও তরুকে আগের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বিরক্তবোধ করে।সে তরুর পাশ কাটিয়ে বিছানায় গিয়ে বসে পরে।কিছুসময় পর নিজের ঘোর কাটিয়ে তরুও গিয়ে তুষারের পাশে বসে তাকে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলো,
=আপনার কি হয়েছে তুষার? আপনি কী কোন কারনে ডিস্টার্বড আছেন। আমাকে সবটা বলুন প্লিজ!
তুষার চুপ করে বসে আছে। তার নিরবতা দেখে তরু আবারোও তাকে জিজ্ঞেস করে,
=কারো কোন বিপদ হয়েছে তুষার।বাসার সবাই ভালো আছে তো।কি হলো আপনি কথা বলছেন না কেনো।
তরুর একের পর এক প্রশ্নের যেনো আগুনে ঘি ঢালার মতন মনে হলো তুষারের।তবুও নিজেকে যথাসম্ভব স্থির রেখে সে শক্ত গলায় তরুকে বলল,
=কাল সকালের পর যেনো আমি আর তোমার মুখ কখনো না দেখি তরু।সকাল হলেই তুমি এ বাসা ছেড়ে চলে যাবে।
তুষারের হঠাৎ এমন একটা কথার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলো না তরু।তার কানে এ কথা পৌঁছাতেই যেনো তার পায়ের তলার মাটি মুহূর্তেই সরে গেলো।তবুও নিজেকে ধাতস্থ করে ভেজা গলায় বলল,
=আপনি এসব কী বলছেন তুষার!.

=তুমি যেটা শুনেছ আমি সেটাই বলেছি।আমার এক কথা বারবার বলা একদম পছন্দ নয় সেটা তুমি জানো।

=কিন্তু আপনি তো আমাকে বিয়ে করেছেন তুষার। বিয়ের পর থেকে আমার সব দাঁয়িত্ব তো আপনার তুষার।তাহলে হঠাৎ কেনো আপনি এমন কথা বলছেন।আমার কী কোন অন্যায় হয়েছে,বা আমার কোন কাজে কী আপনি রেগে আছেন তাই এমন কথা বলছেন। প্লিজ তুষার আমাকে সবটা বলুন।এভাবে আমাকে ধোঁয়াশার মাঝে রাখবেন না প্লিজ।
কান্না করতে করতে কথা গুলো বলল তরু।কিন্তু তার উল্টোদিকের মানুষের তার এই কান্নার ব্যকুলতা যেনো কানেই পৌঁছালো না।সে শুধু বারংবার বিরক্তি সূচক অভিব্যক্তি করে গেলো পুরোটা সময়। এদিকে পাগলের মতন প্রলাপ বকে যাচ্ছে তরু।তার বিশ্বাসই হচ্ছে না তার তুষার তার সাথে এমনটা করছে।তার মনে হচ্ছে তুষার হয়ত তার উপর কোন কারণে এখ৷ রেগে আছে তাই এমনটা করছে রাগ ভাঙলেই সবটা ঠিক হয়ে যাবে।সারারাত নিজেকে এই সান্ত্বনাই সে দিয়েছে।কিন্তু ভোর হতেই যখন সে দেখলো তুষার নেই,পুরো বাসাতেও খুঁজে যখন তুষারকে পেলো না তখন তার ধারনা যেনো একটু একটু করে ভুল প্রমানিত হতে লাগলো।নিজের জীবনে সে অনেক কিছু হারিয়েছে।সবচেয়ে আপনজনদের হারিয়েছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের ভালোবাসাকেও যে হারাতে হবে তা সে কখনো ভাবেইনি।কিন্তু বাস্তবে এমনটাই হলো তরুর সাথে।নিজেকে আজ সত্যি সত্যিই অপয়া মনে হচ্ছে তরুর।তার ভাগ্যেই এমনটা হয় বারবার। নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছে হচ্ছে তার।সেই যদি বেঁচে না থাকে তাহলে দুঃখ আর তাকে পাবে কোথায়।দ্রুত তুষারের বাসা থেকে বেরিয়ে গেলো সে।এলোমেলো পায়ে রাস্তায় হাঁটছে তরু।কোথায় যাচ্ছে তার কোনো হুশ নেই,তার কেবল বারবার এটাই মনে হচ্ছে তার জীবনটাই একটা অভিশাপ, এ জীবনটা না থাকলেই ভালো হবে সবার।কিন্তু তুষার এসব কেনো করলো শুধু সেটাই বুঝতে পারছে না তরু।যে লোক তাকে এতো ভালোবাসত তার হঠাৎ কী হলো যে সে রাতারাতি এতোটা বদলে গেলো শুধু সেইটাই বুঝতে পারছে না তরু।
সবটা শুনার পর অনুজ তরুকে আশ্বাস দিলো সে সবটা ঠিক করে দিবে।তাই তাকে বাসায় দিয়ে আসতে চাইলো অনুজ। কিন্তু তরু যেতে নারাজ।সে চায় না আর ওবাড়ি ফিরে যেতে তাও এমন কিছু ঘটে যাওয়ার পরে।অনুজ অনেক বুঝিয়েও পারলোনা তাকে বুঝাতে শেষে বাধ্য হলো তাকে নিজের সাথে বাসায় নিয়ে যেতে।কিন্তু তরু তখনও বেঁকে বসল, তার ভাষ্যমতে,

=ভাইয়া আমি এ মুখ নিয়ে আপুর সামনে কী করে দাঁড়াবো।আপু তে আমার জন্য অনেক ছোট হয়ে যাবে ও বাড়িতে।আমি আপুর উঁচু মাথা নত করতে পারবো না ভাইয়া।তারচেয়ে বরং আপনি আমাকে কোন হোমে রেখে আসুন।সবটা ঠিক হলে নাহয় আপুকে সবটা জানাবেন।
তরুর কথা শুনে অনুজের গত রাতের কথাগুলো মনে পড়লো।তাই ততক্ষনাত সে তরুকে সবটা বলল,আর বলে,
=পিচ্চি প্লিজ তুই আমাকে হেল্প কর।আমি তোর বোনের কাছে না জেনেই ওয়াদা করে ফেলেছি এখন এই ওয়াদা না পালন করলে যদি ওর কোন ক্ষতি হয় তাহলে সেটা আমি মেনে নিতে পারবো না।আমি চাই ও নিজেই নিজের দেয়া এমন একটা ওয়াদা ফিরিয়ে নিক।তার জন্য আমার তোর সাহায্য লাগবে।
অনুজের কথা শুনে তরু বলল,
=কী সাহায্য লাগবে ভাইয়া বলুন শুধু একবার। আমি আমার আপুমনির জন্য সবকিছু করতে পারি।

=আমার বউ হতে হবে তোকে।

=মানেহ্
চিৎকার করে বলল তরু।
=আরেহ তুই এমন চিল্লাচিল্লি করছিস কেনো,আমি তোকে সত্যি সত্যি বউ হতে বলছি না,শুধু বউয়ের অভিনয় করতে বলছি।

=এসব কি বলছেন ভাইয়া।আপুমনি এতে খুব কষ্ট পাবেন।আমি এসব করতে পারবো না।

=আমি তো চাই ও কষ্ট পাক,ও বুঝুক আমি যদি বিয়ে করি তাহলে ওর কী হবে,ও আদৌও সেসব মানতে পারবে কিনা।আর তাছাড়া আমি আমার মাকেও একটা শিক্ষা দিতে চাই।প্লিজ লক্ষী বোন আমার আমাকে ফিরিয়ে দিস না।যাস্ট কয়েকদিনেরই ব্যপার।এরপর আমরা ওকে সবটা বলে দিবো।আর বুঝাবো ওর একটা অক্ষমতার কারণেই যে আমাকে দ্বিতীয় বিয়ে করে নিতে হবে এর কোন মানে নেই।সমাজে তে কত বাচ্চার মা-বাবা নেই আমরা নাহয় তাদের মধ্যে কারোও বাবা-মা হবো।অক্ষমতার এরমাত্র সমাধান কেবল দ্বিতীয় বিয়েই নয় বরং যদি সম্পর্কটাতে ভালোবাসা থাকে তবে সেই ভালোবাসা দিয়ে এই ক্ষুদ্র অক্ষমতাও ঢেকে ফেলা যায়।

অনুজের বলা প্রতিটি কথা খুবই মনোযোগ সহকারে শুনে অবশেষে রাজি হয় তরু।
=আচ্ছা ঠিক আছে এতে যদি আপুমনির ভালো হয় তবে আমি রাজি ভাইয়া।

=তবে কথা দাও এ প্ল্যানের বিষয়ে তুমি কাওকে কিছু বলবেনা,আমি যতক্ষণ না কাওকে কিছু বলছি তুমি চুপ থাকবে ততোক্ষণ।

=হুম ভাইয়া কথা দিলাম এ বিষয়ে আমি কাওকে কিছু বলবো না।
তবে সে বা অনুজ যদি জানত এই ছোট্ট একটা মিথ্যার দাম তাদেরকে চারুকে হারিয়ে দিতে হবে তবে হয়ত দুজনের কেউই এমন একটা কাজ করতো না।
কিন্তু ওই যে কথায় আছে, ‘ভাগ্যের লিখন যায়না খন্ডন ‘
তেমনটাই হয়েছে তাদের তিনজনের সাথে।
_______________________________________
হাসনাত বাড়ির ড্রয়িং রুমে চলছে পিনপতন নীরবতা । একটু আগেও বংশধর আসবে বলে যে খুশির বন্যা বয়ে গিয়েছিল এ পরিবারে সেখানে হঠাৎ একটা কথায় মুহূর্তেই সমস্ত আনন্দ মাটি করে দিল।
রহিমা বেগমের সাথে কথা বলার পরেই অনু তাদের বাড়িতে চলে আসে।ততক্ষণে তরুকে নিয়ে রহিমা বেগমও বাসায় চলে আসে।অনু এসেই তরুকে একের পর এক প্রশ্নের বাণ ছুঁড়ে মারে।কিন্তু নিরুপায় তরু নিশ্চুপ ভাবে শুধু সবটা শুনেই যাচ্ছিলো।এছাড়া তার যে এখন কিছুই করার নেই।সে যে তার ভাইয়ের কাছে প্রতিশ্রুতু বদ্ধ।চুপ থাকা ছাড়া সে আর কিছুই করতে পারবে না এখন।তখন পিছন থেকে অনুজ বলে উঠে আমি তোমাদের সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি।তরুকে কিছু জিজ্ঞেস করে লাভ নেই।

চলবে,,,।