#সুঁই_সুতোর_আসক্তি
#পর্বঃ২৬
#লেখিকাঃঅনন্যা_অসমি
অনেক্ষণ ধরে অজোরে কান্না করে চলছে আরোহী।তার দুপাশেই বসে আছে কায়াসা আর ইতি।ইতি আরোহীর কান্না দেখে প্রচুর বিরক্ত আর কায়াসা চুপচাপ বসে আছে।
” যেভাবে কান্না করছে যেন মনে হচ্ছে ওর কাছের কেউ মারা গিয়েছে।” বিরবির করে বলে ইতি।তারা তিনজন এখন কলেজের ক্যান্টিনে বসে আছে।তারা ক্যান্টিনের এককোণে বসে থাকায় আর আরোহী উলটো মুখ করে বসার কারণে তার কান্না কেউ খেয়াল করছেনা।ইতির এখন প্রচুর বিরক্ত লাগছে।অবশেষে আর সহ্য করতে না পেরে ইতি আরোহীকে মুখের উপর বলে দেয়,
” আরোহী প্লিজ চুপ কর।আমার আর এসব ভালো লাগছেনা।এতো কান্নার কি হলো?সামান্য আঘাতই তো পেয়েছে এতে আরো কান্নার কি হলো?”
” তুই….এভা..বে…বল…ছিস কে..ন?তুই জানিস না ওর অবস্থা খুব খারাপ।ওকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে।” কান্না করতে করতে বলে আরোহী।
” তুই কি দেখেছিস নাকি যে ওকে লাইফ সাপোর্ট রাখা হয়েছে নাকি?”
” আমাকে ওর বন্ধু বলেছে।”
” হতেও তে পারে ওরা মিথ্যা কথা বলছে।” অন্যদিকে তাকিয়ে কথাটা বলে ইতি।
” না ওরা মিথ্যা কথা কেন বলবে?ওরা যখন বলেছে তখন সত্যিই ওর অবস্থা ভালো হবেনা।”
” লাইফ সাপোর্টে যদি থাকতো তাহলে সত্যিই আমি খুশি হতাম।” বিরবির করে বলে ইতি।
” না জানি কোন জানোয়ার আমার রাতুলের এই অবস্থা করেছে।কত ভালো একটা ছেলে,আমাকে কতটা ভালোবাসে।না জানি ওর কতটা কষ্ট হচ্ছে।” কথা শেষ হতেই আরোহী আবারো ভেঁ ভেঁ করে কান্না শুরু করে দেয়।
” যে ভালো ছেলে।আল্লাহ জানে কখন এই মেয়েটা সত্যিটা জানবে।” বিরবির করে বলে ইতি। ” হয়েছে এবার কান্না বন্ধ কর আর ক্লাসে চল।”
” আমি যাবোনা তোরা যা।”
” ঠিক আছে।কায়ু চল।” কায়াসা এতক্ষণ চুপচাপ বসেছিল।ইতি কায়াসার হাত ধরে তাকে টেনে ক্যান্টিন থেকে বের করে আনে।
” আরে ইতু কি করছিস?আরুর জন্য দাঁড়া।”
” ওর আসতে হলে ও নিজেই আসবে।ওর এসব নেকা কান্না আমার মোটেও আর সহ্য হচ্ছে না।একটু হয়তো কেউ মেরেছে তাই বলে এতো কান্না করার কি আছে?”
” এভাবে বলছিস কেন?ও হয়তো রাতুলকে সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছে।তাই ওর জন্য কষ্ট পাচ্ছে।”
” শোন কায়ু এই ৩/৪ মাসে না কোন ভালোবাসা হয়না যা থাকে সব মায়া আর টাইম পাস।এখন আরোহী ওই রাস্কেল রাতুলটার জন্য যেভাবে চিন্তিত করছে,যেভাবে কান্না করছে দেখ গিয়েছে এরকম সে কোনদিন তার বাবা-মা অসুস্থ হলে এতোটা চিন্তিত ছিল কিনা।আসছে দুইদিনের বয়ফ্রেন্ডের জন্য কেঁদে ভাসিয়ে দিচ্ছে।আর এসব ভাবিস নাতো,ক্লাসে চল।এসব নিয়ে যত কথা বলবো ততই আমার মাথা গরম হয়ে যাবে।
কলেজ শেষ হওয়ার পর,
ট্যাক্সি এসে থাকে একটা হসপিটালের সামনে।ট্যাক্সি থেকে নামে আরোহী,ইতি আর কায়াসা।আরোহী তাড়াতাড়ি ভাড়াটা দিয়ে হসপিটালের ভিতরে ঢুকে পড়ে।ইতির মুখে স্পষ্ট বিরক্তর চাপ।সে বিরক্ত নিয়ে আরোহীর পেছন পেছন যেতে থাকে।কায়াসা এদিক-ওদিক দেখতে দেখতে ভিতরে ঢুকতে থাকে।হসপিটালটাকে চিনতে কায়াসার মোটেও সমস্যা হয়নি।এই হসপিটালে সে আগেও দু’বার এসেছে।কারণ এই হসপিটালেই ইতির ভাই ইভানের ট্রিটমেন্ট হয়েছিল আর এই হসপিটালেই আদ্রিক ডাক্তার হিসেবে কর্মরত।আরোহী রিসেপশে থেকে রাতুলের ব্যপারে জিজ্ঞেস করছে আর ইতি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মোবাইল টিপছে।কায়াসাও এসেছে তাদের পেছনে দাঁড়ায়।এদিক ওদিক দেখতে দেখতে হঠাৎ কায়াসা রিসেপশনিস্ট এর পেছনে থাকা দেওয়ালটাতে চোখ যায়।সেখানে এখানে কর্মরত ভিন্ন ডাক্তারদেন নাম দেওয়া আছে।নিজের মনে অজান্তেই কায়াসা আদ্রিকের নামটা খুঁজতে শুরু করে আর কিছু সময়ের মধ্যে সে পেয়েও যায়।সে পড়তে থাকে ওখানে কি কি লেখা আছে।এরমধ্যেই ইতি কায়াসার হাত ধরে লিফটের মধ্যে ঢুকে পড়ে।
” আমরা কোথায় যাচ্ছি?” বোকার মতো প্রশ্ন করে কায়াসা।
” তোর জামাইকে খুঁজতে যাচ্ছি,গাধি।”
ইতির কথায় কায়াসা বুঝতে পারে আসলে সে কি বোকার মতো প্রশ্নই না করেছে।কায়াসা বা ইতি কেউ হসপিটালে আসতে চাইনি।কিন্তু আরোহীে জোরাজুরিতে কায়াসা রাজি হয়ে যায়।ইতি আরোহীকে একা ছাড়তে রাজি নয় বিধায় সেও কায়াসার সাথে আসে।
লিফট এসে থামে ৪ তালায়।আরোহী তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে যায়।ইতি এখনো কায়াসার হাত ধরে আসে।৪২০ নম্বর রুমে ঢুকে আরোহী,তার কয়েক সেকেন্ড পর ঢুকে ইতি আর কায়াসা।আরোহীতো এসেই আবারো তার কান্না শুরু করে দিয়েছে।
” রাতুল এ কি হলো তোমার?কে করলো এরকম?প্লিজ চোখ খোল রাতুল,দেখো তোমার আরোহী এসেছে।প্লিজ তুমি একবার চোখ খোল,একবার আমার সাথে কথা বলো।এই প্লিজ আমি তোমাকে আগে থেকেও বেশি ভালোবাসবো।প্লিজ একবার কথা বলো আমার সাথে।”
” যতসব ঢং।” আস্তে করে বলে ইতি।তবে এটা আরোহী না শুনলেও পাশে থাকার কারণে কায়াসা ঠিকই শুনতে পাই।তবে সে এখন সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে রাতুলকে দেখছে।তার ব্যান্ডেজ করা পা দুটো উপরের দিকে ঝোলানো,হাত দুটোও দুই দিকে ঝোলানো।একটা চোখ পুরো ব্যান্ডেজ।তবে গায়ে জামা থাকার কারণে তারা কেউ রাতুলের গায়ের ক্ষতগুলো দেখতে পাইনি।কায়াসা ইতি থেকে হাত ছাড়িয়ে আরোহীর পাশে এসে দাঁড়ায়।
” আরোহী প্লিজ আর কান্না করিস না।তুই এরকম পাগলামি করলে তো তোরও শরীরও খারাপ হয়ে যাবে।তখন আঙ্কেল-আন্টির কি হবে তুই ভেবে দেখেছিস?প্লিজ কান্না বন্ধ কর।” কিন্তু কে শুনে কার কথা আরোহী আপন মনে কান্না করে চলছে।
” আপনারা কার পারমিশেন নিয়ে কেবিনে ঢুকেছেন?”
কারো আওয়াজ শুনে তারা তিনজন পেছনে ফিরে তাকাই।
” আদ্রিক স্যার আপনি!” আরোহী জিজ্ঞেস করে।
” আমি এই হসপিটালেই ডাক্তার হিসেবে জব করি।”
” আদ্রিক স্যার আপনি প্লিজ একবার দেখুন না ও চোখ খুলছেনা কেন?প্লিজ ওকে ঠিক করে দিননা।”
” পেসেন্ট তোমাদের কে?”
” আসলে……” কায়াসা আমতো আমতো করে কিছু বলবে তাই আগেই ইতি বলে দেয়, ” আমার আর কায়াসার কেউ না তবে আরোহীর বয়ফ্রেন্ড।”
আদ্রিক ইতির কথা শুনে ভ্রু-কুচকে আরোহীর দিকে তাকাই।কায়াসা চোখের ইশারায় ইতিকে জিজ্ঞেস করে কেন সত্যি কথা বললো?ইতি তাকে চোখের ইশারায় চুপ থাকতে বলে।
” আরোহী এটা হসপিটাল,তাই এখানে এতো শোরগোল না করাই ভালো।তাই কান্না বন্ধ করো,না হলে পেসেন্টেরও সমস্যা হতে পারে।”
” আদ্রিক স্যার ওর কি হয়েছে?” ইতি উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করে।আসলে তার মনে এখনো সন্দেহ আছে।আসলেই কি রাতুলের কিছু হয়েছে নাকি ও নাটক করছে।
” ওর হাত আর পায়ের অনেকগুলো হাড় ভেঙে গিয়েছে।হাত পা সেড়ে উঠতে প্রায় কয়েকমাস মাস লাগবে বা বছরও লাগতে পারে।সেই সাথে বাম চোখটাতেও সমস্যা হয়েছে।এখন মূল সমস্যা কি সেটা আমি ঠিক এখন বলতে পারছিনা কারণ চোখের ব্যপারটা আই’স স্পেসালিস্টই ভালো বলতে পারবেন।তবে আমি যতটুকু জানিস ওর চোখটা আর ঠিক নাও হতে পারে।বিস্তারিত জানতে হলে তোমরা চক্ষু ডাক্তারের কাছে গিয়ে জানতে পারো।”
আদ্রিকের কথা শুনে আরোহী আবারো ফুফিয়ে ফুফিয়ে কান্না করতে শুরু করে।ইতি আবারো বিরক্ত নিয়ে আরোহীর দিকে তাকাই।
” আচ্ছা ওনার জ্ঞান ফিরতে কতটা সময় লাগবে?”
” সেটা এখন বলা যাচ্ছে না।সেটা যেকোন সময় ফিরতে পারে।তবে আমরা চেষ্টা করবো ২৪ ঘন্টার মধ্যে যাতে পেসেন্টর জ্ঞান ফিরে আসে।এবার তোমরা বাইরে যাও।পেসেন্টের কাছে বেশিক্ষণ থাকা ঠিকনা।এতে তোমাদের দু’পক্ষেরই সমস্যা হতে পারে।”
আরোহী আসতে চাইছিলো না তবে ইতি তাকে জোর করে বাইরে নিয়ে আসে।আদ্রিক রাতুলকে চেকাপ করে অন্য রোগী দেখতে চলে যায়।আরোহী একটা চেয়ারে বসে এখনো কান্না করে চলছে।কায়াসা আরোহীর পাশে বসতে নিলে ইতি তাকে এক সাইডে নিয়ে আসে।
” কায়ু আমার কি মনে হচ্ছে জানিস?”
” কি?”
” রাতুলের অবস্থা তোর ওই সুতোই করেছে।কারণ দেখ এর আগেও তোর সাথে যখন কেউ খারাপ কিছু করেছে বা কারার চেষ্টা করেছে এরপরই তাকে আর ভালোভাবে পাওয়া যায়নি।আর সুতো কিন্তু জানতো রাতুল তোর সাথে কি করতে চেয়েছে।তারউপর সেই পার্টির রাত থেকেই রাতুল লাপাত্তা ছিল।তার মানে সব মিলিয়ে এটাই দাঁড়ায় সুতোই রাতুলকে এভাবে বাজেভাবে মেরেছে।”
” আমারো তাই মনে হয়।”
” আচ্ছা তোর কাছে এবার কোন চিঠি এসেছে?”
” না এখনো পর্যন্ত তো আসেনি।”
” আচ্ছা ঠিক আছে তবে সাবধানে থাকিস।এবারে তো তুই সুতোর জন্য বেঁচে গিয়েছিস তবে সবসময় সে তোকে বাঁচাতে আসবেনা।”
” হুম।”
” তবে যাই বলিস না কেন রাতুলে সাথে সুতো যেটা করেছে এটাতে আমার মনে একটা শান্তি কাজ করছে।সুতো তো ওকে জানে ছেড়ে দিয়েছে আমি হলে তো মেরেই ফেলতাম।”
” কি বলছিস তুই এসব?উনি যা করেছেন এটা মোটেও ভালো কাজ নয়।এভাবে মানুষকে মারা পাপ।উনি তো ওনাদের আইনের হাতে তুলে দিতে পারতো।তারপর বাকিটা তারা দেখতো।”
” কি দেখতো হ্যাঁ?প্রমাণ আছে তোর কাছে কোন?নেই তো?আইনের হাতে দিলে প্রমাণের অভাবে ও ছাড়া পেয়ে যেতো আর বের হয়ে তোরই ক্ষতি করতো।তাই সুতো যা করেছে একদম ঠিক করেছে।”
ইতি যতই যুক্তি দিক না কেন কায়াসা সুতো মানে এশানের কাজটা মোটেও ভালো চোখে দেখছেনা।
চলবে…….
#সুঁই_সুতোর_আসক্তি
#পর্বঃ২৭
#লেখিকাঃঅনন্যা_অসমি
ট্যাক্সি ড্রাইভারকে ভাড়া দিয়ে তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমে পড়ে কায়াসা।সে এখন তার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে।এটা কায়াসার নিজের বাড়ি।চট্রগ্রামের উদ্দেশ্যে কাল মধ্যরাতের বাসেই উঠে পড়েছিল কায়াসা।বাসায় আসতে আসতে প্রায় দুপুর হয়ে যায়।এতক্ষণ চিন্তিত থাকলেও বাড়ির বাইরের পরিবেশ দেখে কায়াসার ভ্রু-কুচকে উঠে।কারণ বাড়ির বাইরে দেয়ালের এক অংশ ছোট ছোট লাইট দিয়ে সাজানো।তবে কায়াসা এতে এতো মনোভাব না দিয়ে তাড়াতাড়ি লাগেজ নিয়ে ভেতরে আসতে থাকে।আসলে কাল সন্ধ্যার দিকে তার ফুফু তাকে ফোন করে বলেছে তার বাবা নাকি খুব অসুস্থ, সে যেন তাড়াতাড়ি চট্টগ্রাম চলে আসে।এটা শুনে কায়াসা রাতেই বাসে উঠে পড়ে।
বেল দিলে একটা মেয়ে এসে দরজা খুলে দেয়।কায়াসা মেয়েটাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ে।
” আরে আরে কে কেডা?আর ভিতরে যাচ্ছেন কিল্লাই ?” কায়াসার পেছন পেছন আসতে আসতে মেয়েটা বলে।কিন্তু কায়াসা সেদিকে পাত্তা না দিয়ে তার ফুফু কে ডাকতে থাকে।
” ফুফুমণি…..ফুফুমণি…..”
” আরে নিশু মা তুই এসে পড়েছিস।কত দিন পর তোকে দেখলাম।আসতে কোন অসুবিধা হয়নি তো?”
” এসব ছাড়ো ফুফু।আগে এটা বলো আব্বু কোথায়?কি হয়েছে আব্বুর?”
” আরে তুই শান্ত হ আগে।”
” তুমি আগে বলো আব্বু কোথায়?”
” ভাইজানতো ছাদে।”
কায়াসা আর কোন কথা না বলে লাগেজটা নিচে ফেলে দৌড়ে ছাদের দিকে চলে যায়।
” কিরে মিতা এভাবে কি দেখছিস?যা ব্যাগটা রেখে আয়।”
” কোথায় রাখমু ফুফু আম্মা?আর এই মাইয়াটাই বা কেডা?”
” আরে এটা নিশু।তোর সাহেবের মেয়ে।”
” ও আচ্ছা এটাই তাহলে আপা।আসলে কোনদিন দেখিনাইতো তাই চিনতে পারিনাই।”
” আচ্ছা এবার যা ব্যাগটা তুলে রেখে আয়।আর তাড়াতাড়ি আসবি,অনেক কাজ বাকি।”
কায়াসা ছাদে এসে দেখে কয়েকটা লোক দেয়ালে লাইট লাগাচ্ছে আর তার বাবা তাদের কাজের তদারকি করছে।
” আব্বু।” হাঁপাতে হাঁপাতে বলে কায়াসা।মেয়েকে দেখে আকাশ মির্জা খুবই খুশি হয়।
” মা তুই এসে পড়েছিস?”
কায়াসা দৌড়ে গিয়ে তার বাবাকে জরিয়ে ধরে।
” আব্বু তুমি ঠিক আছে?কি হয়েছে তোমার?কোথায় কষ্ট হচ্ছে তোমার?”
” আরে মা শান্ত হয় আমি ঠিক আছি।আমার তো কিছু হয়নি।”
” তাহলে ফুফুমণি যে বললো।”
” আগে তুই ফ্রেশ হয়ে নে,তারপর আমি তোকে সব বলছি।”
” কিন্তু…… ”
” কিন্তু পরে শুনবো,আগে যা ফ্রেশ হয়ে নে।”
কায়াসা নিজের রুমে এসে লাগেজ থেকে একটা জামা বের করে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে তার বাবার রুমে চলে আসে।
” আব্বু আসবো?”
” আরে এতো তাড়াতাড়ি এসেও পড়েছিস।আয় আয়।”
” আব্বু এসব কি?বাড়িতে লাইটিং করা হচ্ছে কেন?আর তোমার কিছু না হলে ফুফুমণি আমাকে আসতে বললো কেন?”
” এদিকে আয়,আমার পাশে বস।”
” বলো এবার।”
” আচ্ছা তোর কি কোন পছন্দ আছে?মানে বলতে চাইছি তোর কি কারো সাথে কোন সম্পর্ক আছে?”
” নাতো।”
” আলহামদুলিল্লাহ,এটাতো খুবই ভালো কথা।আমি তোর কাছে এইটাই আশা করেছিলাম।”
” কিন্তু আব্বু কি হয়েছে তা তো বলবে?হঠাৎ এরকম প্রশ্ন?আর আমার সাথে কারো সম্পর্ক নেই এটা শুনে আলহামদুলিল্লাহ বলার কি আছে?”
” সেটা তুই বুঝবিনা।শোন মা তোকে এখানে আনানোর আসল কারণটা বলি।আজ তোর বিয়ে।আমি জানতাম তোকে এমনিতে বললে তুই কখনো আসতিনা,তাই তোকে মিথ্যা কথা বলে আনালাম।”
” আব্বু তুমি এসব কি বলছো?আমার পড়াশোনা এখনো বাকি।আমি মাত্রই মেডিকেলে পড়া শুরু করলাম।আমিই এখনই বিয়ে করতে চাইনা।তুমি তো জানো আমি এই পর্যন্ত পৌঁছাতে কত কষ্ট করেছি।”
” আমি জানি মা কিন্তু আমি যা করছি সব তোর ভালোর জন্যই করছি।আমি তোর আব্বু।আমি কি তোর খারাপ চাইবো বল?”
” আব্বু তুমি প্লিজ বোঝার চেষ্টা করো।”
” ভাইজান তুমি যাও আমি ওকে বোঝাচ্ছি।” কায়াসার ফুফু বলে।
” দেখ বোঝাতে পারিস কিনা।”
” ফুফুমণি এসব কি?তোমরা আমাকে এভাবে মিথ্যা কথা বলতে পারলে?”
” নিশু মা শান্ত হয়।আমরা কেউই তোকে মিথ্যা কথক বলতে চাইনি কিন্তু কি করবো বল মিথ্যা না বললে যে তুই আসতিনা।মা তুই রাজি হয়ে যায় বিয়েতে,এতেই সবার মঙ্গল।না হলে যে ভাইজানের অনেক সমস্যা হবে আর তোরও বাঁচা মুশকিল হয়ে যাবে।”
” মানে?”
” মানে যার সাথে তোর বিয়ে ঠিক হয়েছে তার আব্বুর কাছ থেকে ভাইজান ৫০ লক্ষ টাকা ধরার নিয়েছে কিন্তু এখনো তা ফেরত দেয়নি আর না দিতে পারবো।এটার জন্য ওরা ভাইজানকে অনেক দিন ধরে ব্ল্যাক মেইল করতেছিল।আর ওরা যখন জানতে পারে ভাইজানের একটা মেয়েও আছে তখন ওরা বলে যেন তোর সাথে ওদের ছেলের বিয়ে দেয়।নয়তো তোর সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলবে আর ভাইজানকেও শান্তিতে বাঁচতে দেবেনা।তুই চিন্তা করবি বলেই তোকে এসব আমরা জানাইনি।তাই বলছি বিয়েতে রাজি হয়ে যায় এতেই সবার মঙ্গল।”
কায়াসা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,” ঠিক আছে।”
রুমে এসে কায়াসা তাড়াতাড়ি ইতিকে ফোন করে।
” হ্যালো ইতু কোথায় তুই?”
” এইতো কলেজে থেকে বের হচ্ছি।কেন?আর তুই আজ এলিনা কেন?”
” শোন ইতু আমি খুব বড় একটা বিপদে পড়ে গিয়েছি।”
” কি হয়েছে?আর তুই এখন কোথায়?”
” আমি এখন চট্টগ্রামে আছি।আব্বু আর ফুফুমণি মিলে মিথ্যা কথা বলে আমাকে এখানে নিয়ে এসে।আর এখানে এসে জানতে পারি ওনারা আমার সাথে একজন অপরিচিত কারো বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে।আর সন্ধ্যাই নাকি বিয়ে।”
” কি বলছিস তুই এসব?আর আঙ্কেলই বা হঠাৎ এরকম কিছু করলো কেন?”
” ফুফুমণি বলেছে যে আব্বু নাকি ওনাদের থেকে অনেকে গুলো টাকা ধার নিয়ে।এখন সেটা ফেরত দিতে পারছে আর তার বদলে ওনারা আমাকে চাইছে।না হলে আমাদের মেরে ফেলবে বলছে।আমার সাথে খারাপ কিছু হবে এই ভয়ে তারা বিয়েতে রাজি হয়ে গিয়েছে।”
” হুম সমস্যা তো খুবই জটিল।এখন তো তোর বিয়ে করা ছাড়া কোন পথই খোলা নেই।আর ওয়েট তোর সুতো কি জানে যে তোর আজ বিয়ে?”
” জানিনা।তবে সেটা এখন ভাবার বিষয় নয়।ভাবার বিষয় এটা আমি কি করে আবার ঢাকায় ফিরতে পারবো।”
” তোর তো কোন পছন্দ নেই তাহলে বিয়েতে অমত কিসের?”
” কারণ আমি ওদের কাউকে চিনিনা,আমার কাছে পরিবেশটা পুরোই অজানা।যদি ওনারা খারাপ কেউ হয় তখন।জানাশোনা থাকলে তাও ভেবে দেখতাম কিন্তু অপরিচিত কারো সাথে হুট করে বিয়ে করা মোটেও যুক্তিযুক্ত নয়।দেখা যাবে বিয়ের পর আবার অন্যকোন নাটক করছে।”
” আচ্ছা তুই একটু শান্ত হয় আর ভাব কি করা যায়।আমি এখন থেকে কিছু করার চেষ্টা করছি।”
সন্ধ্যা হয়ে যায়।কায়াসা ভেবেছিল হয়তো ঘরোয়া ভাব ছোট খাটো করে বিয়েটা হবে কিন্তু না সন্ধ্যা হতেই অনেক মানুষ চলে এসেছে।কায়াসা এখন ভাবছে এতো মানুষের মাঝে সে পালাবে কি করে।আর এখন পালিয়ে গেলে তার বাবার মান সম্মান তো যাবেই সাথে তাদের জীবন হুমকির মুখে পড়বে।
কায়াসার ফুফুমণি আর কয়েকটা পার্লারের মেয়ে এসে কায়াসা তৈরি করিয়ে দিয়ে যায়।
” ফুফুমণি এতো মানুষ কেন?তোমরা কি সব আগে থেকেই প্ল্যান করে রেখেছিলে নাকি?”
” আরে না না ২/৩ দিন আগেই তো সব হলো।আর এতো মানুষ কারণ তারা চাই বড় করে বিয়ের অনুষ্ঠান হোক।এসব আয়োজন,মানুষ সব তারাই করেছে।তোর আব্বু তো চেয়েছিল ছোট আয়োজনে সব শেষ করতে কিন্তু ওনারাই দমক দিয়ে বলে ভাইজানকে চুপ করিয়ে দিয়েছে।”
এরই মধ্যে নিচে থেকে শোরগোল শোনা গেলো।
” মনে হয় ওনারা চলে এসেছেন।তুই থাক,আমি কিছুক্ষণ পর এসে তোকে নিয়ে যাবো।”
ফুফুমণি বেরিয়ে গেলেই কায়াসা ফোনটা নিয়ে ইতিকে ফোন দেয়।
” ইতু,ওরা তো চলে এসেছে এবার কি হবে?”
” কায়ু তুই চিন্তা করিস না।আমি কয়েকঘন্টার মধ্যেই তোদের বাসায় পৌঁছে যাবো।এরমধ্যে তুই কিছু একটা করে বিয়েটা আটকা।”
কায়াসা ফোন কেটে দিয়ে চিন্তা করতে থাকে যে কি করা হয়।বিছানায় বসে চিন্তা করছিল কায়াসা হঠাৎ করেই সে মাথা ঘুরে বিছানায় পড়ে যায়।
চলবে………