সুদর্শন শঙ্খচিল পর্ব-১২+১৩

0
243

‘সুদর্শন শঙ্খচিল’
[১২]
লেখনীতে:- নূরজাহান আক্তার (আলো)

তুয়া ওর পছন্দের ডায়েরিটা বের করেছে। নীল রংয়ের ডায়েরিটা দেখতে বেশ সুন্দর। এখানে তেমন কিছু লিখা নেই। এটা গত দুই সপ্তাহ আগে তুয়া ডায়েরিটা কিনেছিল। তবে তুয়া এই ডায়েরিটা সব সময় লুকিয়ে রাখে। কারন ডায়েরির কয়েকটা পৃষ্ঠায় বিশেষ কাউকে নিয়ে লিখা আছে।
তুয়া ডায়েরির প্রথম পৃষ্ঠায় হাত বুলালো, সেখানে যত্ন করে লিখা,

প্রথম পৃষ্ঠা,

-“তোমার হাসি দিয়ে আমাকে ঘায়েল করতেই হতো? না করলে বুঝি খুব মন্দ কিছু ঘটত। ”

দ্বিতীয় পৃষ্ঠা,

-” মুগ্ধতা থেকে কবে ঘটবে পূর্ণতা?”

তৃতীয় পৃষ্ঠা,

-” ইস! এভাবে তাকিও না। তোমার ঘায়েল করা
চাহনিতে লজ্জায় আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে।”

চতুর্থ পৃষ্ঠা,

-“এই দুষ্টু! আমাকে এতটা বেতাল করে তবেই বুঝি শান্তি পেলে, হুম?

পঞ্চম পৃষ্ঠা,

-“কবে তুমি নাম ধরে ডাকবে, কবে তুমি হাতে হাত রাখবে?”

ষষ্ঠ পৃষ্ঠা,

-“এত ভদ্র হওয়া মোটেও ভাল নয়, স্যার। একটু একটু অভদ্র হবেন, তবে শুধু আমার কাছে। কি মনে থাকবে তো?”

সপ্তম পৃষ্ঠা,

-“কবে শেষ হবে অপেক্ষার প্রহর? আসবে তুমি? বাসবে ভাল, বলবে ভালবাসি?”

নবম পৃষ্ঠা,

-“আমি এখন ধর্ষিতা কালিমায় অভিশপ্ত, ডক্টর সাহেব। তোমার আমার যাত্রাপথ এখানেই সমাপ্ত।”

পরের পৃষ্ঠা গুলোতে আর কিছু নেই। তুয়ার একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল নবম পৃষ্ঠার লিখাটার উপরে। তুয়া ভেবেছিল ওর ভালবাসার প্রকাশ আর ঘটবে না। ধর্ষিতাকে মানুষ বলেই তো গণ্য করা হয় না, তার ভালবাসার দাম আর কে দিবে? তুয়া ভেবেই নিয়েছিল সে প্রত্যয়কে হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু ভাগ্য প্রত্যয়কে তুয়ার কাছে এনে দিল। হয়ত এটাই তুয়ার মোনাজাতে প্রত্যয়কে শুদ্ধ মনে পবিত্র ভাবে চাওয়া ফল।

পরেরদিন ভোরে প্রত্যয় বাসায় ফিরল। একজন পেশেন্টের জন্য সারারাত জেগে ছিল। প্রত্যয়ের আম্মু নামাজ পড়ার জন্য উঠে প্রত্যয়কে দেখে বললেন, “আব্বু, আজকাল তোর খুব ধকল যাচ্ছে। এভাবে চললে তো তুই অসুস্থ হয়ে পড়বি।” প্রত্যয় মুচকি হেসে বলল, “আমি ঠিক আছি, আম্মু।”

প্রত্যয়ের আম্মু আর কথা বাড়ালেন না, উনি চলে গেলেন। প্রত্যয় ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পড়ল। ডাক্তারী পড়ার প্রথম ধাপ থেকেই রাত জাগাটা ওর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আর কথাতেই আছে মানুষ অভ্যাসের দাস। তাই এখন প্রত্যয়ের খুব একটা সমস্যা হয় না।

প্রত্যয় একটু পরে চোখ খুলে বুকের বা পাশটায় হাত রাখল। কালকে যেখানটাই তুয়া মুখ লুকিয়ে কেঁদেছিল। কালকের কথা ভেবে প্রত্যয় মুচকি হেসে আবার ওর চোখ দু’টো বন্ধ করে নিল।

**!!

“আমাকে ভালবাসলে কি তোর হৃদয়টা পঁচে যাবে?”

চাঁদ কথাটা বলে অঝরে কাঁদতে লাগল। কালকে রাতে চাঁদ জোর করে প্রিয়মকে জড়িয়ে ধরেছিল। কিন্তু ফলস্বরুপ প্রিয়ম ওকে চারটা থাপ্পড় মেরে রুম থেকে বের করে দিয়েছে। চাঁদ এত আঁকুতি করেও প্রিয়মের মন গলাতে সক্ষম হয়নি। শক্ত পুরুষালী হাতের থাপ্পড় খেয়ে চাঁদের জ্বর চলে এসেছে। সে যতই কষ্ট পাক তবুও থামবেনা। সে প্রিয়মের থেকে ভালবাসা আদায় করে তবেই ছাড়বে। চাঁদ তো প্রিয়মকে পাগলের মত ভালবাসে, তাহলে প্রিয়ম কেন ওকে ভালবাসবে না?

চাঁদ বালিশ আঁকড়ে ধরে কেঁদে কেঁদে বলল, “তোমার অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তোমাকে বিয়ে করে, আমার বিন্দুমাত্রও আফসোস নেই। আজ আমাকে কষ্ট দিচ্ছো দাও, কালকে নাহয় ভালবেসে পুষিয়ে দিও।”

চাঁদ এসব মনগড়া কথা বলে নিজেকে শান্তণা দিলে, ওর মনে ভয় এসে বাসা বেঁধেছে। আর ভয়টা হল প্রিয়মকে চিরতরে হারানোর ভয়। চাঁদও বুঝে গেছে প্রিয়ম মারাত্মক জেদি ছেলে। ওকে বশে আনা মোটেও সহজ হবেনা, কিন্তু সেও হাল ছাড়বেনা। প্রিয়মের ভালবাসা পেতে কষ্টকেই সঙ্গী করে সে লড়ে যাবে। তবুও এত সহজে সে প্রিয়মকে কিছুতেই
হারাতে দিবেনা।

প্রিয়মের প্রতি চাঁদের ভালবাসাটা হল কাটাযুক্ত গোলাপ মত। আর এখানে চাঁদও হাজার বার কাঁটার খোঁচায় রক্তাক্ত হতে প্রস্তুত। তবুও প্রিয়মকে এক চুল পরিমাণ ছাড়তেও, সে রাজি নয়।

**!!

আজকে শুক্রবার এজন্য রনিত এখনও ঘুম থেকে উঠেনি। পলক এই নিয়ে চার বার রনিতকে ডেকে গেল। কিন্তু রনিত, “হুম! হুম! উঠছি আর একটু!” এসব বলে আবার ঘুমিয়ে পড়ছে।

ওই দিকে রনিতের মা পলককে বলছেন, “পলক রনিতকে ডেকে বাজারে যেতে বল।” পলক আবার রুমে গিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “এই! এই লোক উঠছেন না কেন আপনি? মা আপনাকে বাজারে যেতে বলছেন। কি হলো উঠুন!”

রনিত পাশ বালিশটাকে বুকে জড়িয়ে বলল, “তুমি যাও, আমি আসছি।”

বেশ কিছুক্ষণ পর রনিতকে বাজারে যেতে না দেখে রনিতের মা পলককে বলল, “কেমন মেয়ে তুমি যে স্বামীকে ডেকে তুলতে পারছ না? এত গিলেও গলার জোর বাড়েনা?”

পলক মাথা নিচু করে নিল। সে কারো মুখে মুখে তর্ক করতে পারেনা। রনিতের মা নিজের ছেলের দোষ দেখল না, পরের মেয়েকে ঝেড়ে চলে গেলেন।

পলক সয়া সসের বোতলটা নিয়ে রুমে ঢুকে রনিতের বুকের উপর বসল। রনিত এখনও বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। পলক শক্ত করে রনিতের নাক চেপে ধরল। নাক চেপে ধরায় রনিত হা করার সঙ্গে সঙ্গে পলক রনিতের মুখে সয়া সস ঢেলে দিল। এমন ঘটনায় রনিত মুখ ভর্তি সস দিয়ে হতভম্ব হয়ে চোখ খুলে তাকাল। পলক রাগে হনহন করতে করতে স্থান ত্যাগ করল।

রনিত দ্রুত উঠে ওয়াশরুমে গিয়ে বমি করতে লাগল। সকালবেলা সসের গন্ধে ওর বমিও হয়ে গেল। বেশ কিছুক্ষণ পর রনিত ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে বলল, “এই মেয়ে মানুষ যে কি দিয়ে তৈরী আল্লাহ মাবুদই জানে। আর আমার রেস্ট করার দিনই মেহমানদের আসতে হবে, উফ! অসহ্য লাগে। ”

**!!

ইচ্ছে তুয়াদের বাসায় সোফায় বসে চানাচুর খাচ্ছে। তুয়া ইচ্ছের পুতুলকে শাড়ি পড়িয়ে দিচ্ছে। তুরাগ এসে ইচ্ছের পাশে বসে বলল, “ইচ্ছেপাখি তুমি একটা কথা শুনেছ? ইচ্ছে মুখ ভর্তি চানাচুর নিয়ে বলল, ” তি কঠা?”

তুরাগ আড়চোখে তুয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, ” তুয়া কালকে সারারাত কেঁদেছে।” ইচ্ছে তুয়ার দিকে একবার তাকিয়ে তুরাগকে বলল, “কাঁদছিল ক্যানো?” তুরাগ দাঁত বের করে হেসে বলল, “প্রত্যয়কে বিয়ে করার জন্য।”

তুয়া হাতের পুতুলটা রেখে তুরাগকে দৌড়ানি দিল। তুরাগ দরজা খুলে সিঁড়ির কাছে গিয়ে বলল, “টুপা, আমাকে মারলে আমি সব কথা প্রত্যয়কে বলে দিব।” তুয়া রেগে তুরাগের দিকে তাকিয়ে আছে।

তখনই প্রিয়মকে বের হতে দেখে ইচ্ছে দৌড়ে গিয়ে বলল, “প্রিউুম! প্রিউুম! কালকে তুয়া আপু এত এত কেঁদেছিল।”

প্রিয়ম ইচ্ছের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বলল, “কেন?” ইচ্ছেও তুরাগের মত দাঁত বের করে হেসে বলল, “প্রত্তুয়কে বিয়ে কলাল জন্য।” তুয়া উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়ে আছে। তুরাগ পেটে হাত দিয়ে এখনও হো হো হাসছে। ইচ্ছেও খিলখিল করে হাসছে।

প্রিয়ম উচ্চশব্দে প্রত্যয়কে, “ভাইয়া! ভাইয়া! করে ডাকল। প্রত্যয় কেবল ঘুম উঠে ফ্রেশ হয়ে মুখ মুছছিল। প্রিয়মের ডাক শুনে প্রত্যয় টাওয়াল গলায় ঝুলিয়ে প্রিয়মের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, ” প্রিয়ম, কিছু বলবে?” প্রিয়ম বলল, “কালকে সারারাত তুয়া কেঁদেছিল।”

প্রত্যয় তুয়াকে উল্টো ঘুরে দাড়িয়ে থাকতে দেখল, ততক্ষণে দুই পরিবারের সবাই উপস্থিত হয়ে গেছে। প্রত্যয় প্রিয়মের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ” কাঁদছিল কেন?” প্রিয়ম তুরাগ আর ইচ্ছের মত দাঁত বের করে হেসে বলল, “তোমাকে বিয়ে করার জন্য।”

প্রিয়মের কথা শুনে প্রত্যয় বাদে সবাই শব্দ করে হেসে উঠল। প্রত্যয় শব্দ করে না হাসলেও ওর মুখে মুচকি হাসি। এদের কথা শুনে তুয়া যে দৌড়ে পালাবে সেই সুযোগটুকু ওর নেই। ওর আব্বু আম্মু ওদের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। প্রত্যয় মুচকি হেসে বলল, “এ তো আমার সৌভাগ্য।”

তুয়া আর দাঁড়াল না। মাথা নিচু করে ওর আব্বু আম্মুকে সরিয়ে দৌড়ে চলে গেল। প্রত্যয়ও হাসতে হাসতে রুমে ডুকে গেল।

প্রত্যয়ের আম্মু হাসতে হাসতে বলল, “প্রিয়ম এই খবর কে ভাইরাল করল?” প্রিয়ম আঙ্গুল দিয়ে ইচ্ছেকে দেখিয়ে দিল। ইচ্ছে তুরাগকে দেখাতে যাবে, তখন দেখে তুরাগ ওখানে নাই। ইচ্ছে বলল, “আমাকে তুলাগ জানপাখি বলেছে।” তুয়ার আব্বু হাসতে হাসতে বললেন, “আজকে তুরাগ আর ইচ্ছের খবর আছে।”

**!!

আজকে শুক্রবার তাই প্রত্যয় দুই ঘন্টার জন্য ওর সার্জারির পেশেন্টদের দেখতে গেল। প্রত্যয় হসপিটাল থেকে ফিরে শাওয়ার নিয়ে নামাজের জন্য রেডি হল। শুক্রবারের অন্যতম মুহূর্ত হল, যখন বাসার সব ছেলেরা একসঙ্গে নামাজের জন্য বের হয়। প্রত্যয়ের আব্বুসহ ওরা দুই ভাই বের হওয়ার সময় দেখল, তুয়ার আব্বু দাঁড়িয়ে আছেন।

প্রত্যয়ের আব্বু বললেন, “ভাই দাঁড়িয়ে আছেন যে?” তুয়ার আব্বু বললেন, “তুরাগের জন্য,ওই যে ভাই বোন মারামারির শুরু করেছে।”

তুরাগ তুয়ার পেছন পেছন ঘুরছে পান্জাবীর বোতাম লাগিয়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু তুয়া চুপ করে বসে নখ কাটছে। যেন সে কিছু শুনতেই পাচ্ছে না।

তুরাগ করুণ সুরে বলল,” মসজিদে জিলাপি দিলে এনে দিব, এবার তো দে বোন আমার।”

তুয়াদের দরজা খোলা থাকায় সবাই ওদের কাহিনী দেখছে। তুয়া নখ কেটে আঙ্গুলে ফু দিতে যাবে তখন দেখল প্রত্যয়রা ওর দিকে তাকিয়ে আছে। তুয়া ভদ্র ভাবে উঠে তুরাগের পান্জাবীর বোতাম লাগিয়ে দিল। তুরাগ তুয়ার গাল টেনে হেসে প্রত্যয়দের সঙ্গে চলে গেল।

তুয়া পর্দার আড়ালে থেকে নিচে তাকাল। পাঁচজন একসঙ্গে নামাজে যাচ্ছে। প্রত্যয় আর তুয়ার আব্বু সাদা, প্রিয়ম হালকা গোলাপি, তুরাগ মেরুন, আর প্রত্যয় আকাশি আর সাদার সংমিশ্রণের পান্জাবী পরিহিত।

পাঁচজনের মাথায় শুভ্র চওড়া টুপি। তুয়ার কাছে এই মুহূর্তটা দেখতে বেশ ভাল লাগছে। তুয়া ওর ডায়েরি বের করে লিখল, “এক টুকরো আকাশ সেজে তোমাকে দেখতে বেশ ভাল লাগছে। একদম আমার সুদর্শন শঙ্খচিলের মত ।”

‘সুদর্শন শঙ্খচিল’
[১৩]
লেখনীতে:- নূরজাহান আক্তার (আলো)

তুয়া ওর ডায়েরিতে লিখল, “এক টুকরো আকাশ সেজে তোমাকে দেখতে বেশ ভালো লাগছে। একদম আমার সুদর্শন শঙ্খচিলের মতো।”

কথাটা লিখে তুয়া লজ্জা পেয়ে দুই হাত দিয়ে মুখ ডেকে নিল। তুরাগরা ফিরলে দুপুরে একসঙ্গে খেয়ে ঘুমিয়ে গেল। তুয়ার আম্মু তুয়াকে একবার দেখে চলে গেলেন।

প্রত্যয়রা সবাই একসঙ্গে খেতে বসেছে। প্রিয়ম চাঁদের সঙ্গে খেতে বসে না। তাই চাঁদ খাবার নিয়ে ড্রয়িংরুমে চলে গেল। প্রিয়ম একটু পরে খেতে আসলো। সবাই খেতে খেতে কিছু নিয়ে আলোচনা করছিল, হঠাৎ চাঁদের অট্রহাসির হাসির শব্দে সবাই কথা থামিয়ে ওর দিকে তাকাল। চাঁদ মুভি দেখে হাসতে হাসতে মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।

প্রিয়ম রাগী চোখে চাঁদের দিকে তাকিয়ে বলল, “আর একটা টু শব্দ আমার কানে আসলে খবর আছে।”

প্রিয়মের কথা শুনে চাঁদের হাসিটা মলিন হয়ে গেল। প্রত্যয় মুচকি হেসে বলল, “চাঁদ, হাসি আটকাবে না। যারা বেশি হাসে তাদের মন ভাল থাকে।”

চাঁদ হেসে বলল, “সত্যি?”

প্রত্যয় মুচকি হেসে বলল, “একদম সত্যি।”

চাঁদ প্রত্যয়ের সাপোর্ট পেয়ে আগের ন্যায় মুভি দেখে হাসতে লাগল। ওর হাসি দেখে প্রিয়ম বাদে বাকিরাও মিটিমিটি হাসতে লাগল।

প্রিয়ম কোনো রকমে খেয়ে উঠে চলে গেল। প্রত্যয়ের আব্বু বললেন, “প্রত্যয়, প্রিয়মের সঙ্গে সরাসরি কথা বলো, প্রিয়ম নিশ্চয় তোমার কথা শুনবে।”

প্রত্যয় পানি খেয়ে গ্লাস রেখে মুচকি হেসে বলল, “আব্বু, ভাই পড়াশোনা না করলে বুঝিয়ে বলা যায়। সিগারেট খেলে বা অন্যায় কাজে লিপ্ত হলে দু’টো মেরে শাসন করা যায়। কিন্তু ভাইয়ের জীবনসঙ্গী বাছাইয়ের দায়িত্ব-সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। আর অধিকার আছে বলে তো অনধিকারচর্চা করতে পারি না।”

প্রত্যয়ের কথা শুনে কেউ আর কথা বাড়ালেন না। চাঁদও প্রত্যয়ের কথা গুলো শুনল। সবাই নিজের খাওয়া সমাপ্ত করে রুমে চলে গেল। প্রত্যয় রুমে গিয়ে শুয়ে একটা বই পড়তে লাগল। হঠাৎ দরজার কাছে ছোট ছোট দু’টো পা দেখে প্রত্যয় চোখ বন্ধ করে নিল। ইচ্ছে উঁকি মেরে দেখল প্রত্যয় ঘুমাচ্ছে। সে সর্তকতার সাথে রুমে প্রবেশ করে পরখ করল প্রত্যয় সত্যি ঘুমাচ্ছে।

ইচ্ছে দুষ্টু হেসে প্রত্যয়ের ঠোঁটে লিপস্টিক দেওয়ার আগেই, প্রত্যয় ওর হাত ধরে বলল, “এগুলো কি দিচ্ছ?”

ইচ্ছে ভয়ে ঢোক গিলে বলল, “তোমাকে বউ সাজাব, তাই নিমিষ্টিক দিচ্চি।”

প্রত্যয় মুচকি হেসে বলল, “প্রিয়ম বউ সাজতে পছন্দ করে, ওকে গিয়ে সাজাও।”

ইচ্ছের চোখ দু’টো জ্বলজ্বল করে উঠে নিমিষেই মুখটা মলিন করে বলল, “যদি না দেয়?”

প্রত্যয় ইচ্ছের কানে কানে কিছু বলল। ইচ্ছে দাঁত বের করে হাসল। প্রত্যয় ইচ্ছেকে কোলে নিয়ে প্রিয়মের রুমে নক করল। প্রিয়ম দরজা খুলে প্রত্যয়কে দেখে বলল, “ভাইয়া, ভেতরে এসো।”

প্রত্যয় রুমে প্রবেশ করে বলল, “প্রিয়ম, শুয়ে পড়ো। ইচ্ছে তোমার হার্ট চেক করবে।”

প্রিয়ম ইচ্ছের দিকে তাকিয়ে হেসে শুয়ে পড়ল। ইচ্ছে প্রিয়মের বুকে হাত রেখে বলল, “রুগী মারা গেছে, রুগীকে সূচ দিতে হবে।”

প্রত্যয় হেসে বলল, “তাহলে পেশেন্টের হাত বাঁধতে হবে, যাতে নড়াচড়া করতে না পারে।”

প্রিয়ম শুয়ে শুয়ে দু’জনের কান্ড দেখছে। ইচ্ছে গিয়ে চাঁদের একটা ওড়না এনে বলল, “প্রত্তুয়, হাত বাঁদো।”

প্রত্যয় প্রিয়মের হাত বেঁধে ইচ্ছেকে প্রিয়মের বুকের উপর বসিয়ে দিল। প্রিয়ম ইচ্ছের হাতে লিপস্টিক দেখে বলল, “না! ভাইয়া এটা ঠিক না। আমার হাত খুলে দাও, ভাইয়া।”

প্রত্যয় হাসতে হাসতে বলল, “ট্রিটমেন্ট চলছে, কথা বলিও না।”

ইচ্ছে প্রিয়মের ঠোঁটে লিপস্টিক লাগাতে গেলে, প্রিয়ম মাথা নড়াচ্ছে দেখে ইচ্ছে প্রিয়মের গালে থাপ্পড় বসিয়ে বলল, “চুপ, একদম চুপ।”
প্রিয়ম করুণ চোখে ইচ্ছের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল, “আম্মু! আম্মু! আমাকে বাঁচাও।”
ইচ্ছে আরেকটা থাবড় দিয়ে বলল, “চুপ! চুপ বলছি!”

প্রত্যয় মিটিমিটি হেসে প্রিয়মকে ফাঁসিয়ে চলে গেল।‌ প্রিয়মের ডাক শুনে ওর আম্মু এসে এসব দেখে হাসতে হাসতে বললেন, “ইচ্ছে, আর সাজগোজের জিনিস লাগবে?”

ইচ্ছে দাঁত বের করে হেসে বলল, “দাও।”

প্রিয়মের আম্মু ইচ্ছেকে উনার মেকাপ বক্স দিয়ে চলে গেলেন। ইচ্ছে ওর মনমতো প্রিয়মকে সাজাতে লাগল। প্রিয়ম করুণ চোখে ওর আম্মুর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকল। সে কিছু বলতেও পারছে না, কিছু বললেই ইচ্ছে ওকে মারছে।

প্রত্যয় রুমে এসে দেড় ঘন্টার মতো ঘুমাল। বিকেলে ঘুম থেকে উঠে কলিকে খেতে দিতে বেলকনিতে গেল। তুয়া তখন বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছিল। হঠাৎ কলির চেচাঁমেচি শুনে তুয়া ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। কলি অনবরত বলে যাচ্ছে, “তুয়া! বউ! তুয়া! বউ!” তুয়া চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। তুয়ার মুখভঙ্গি দেখে প্রত্যয় মিটিমিটি হাসতে হাসতে চলে গেল।

সন্ধ্যার পর ইচ্ছে দৌড়ে এসে তুয়াকে বলল, “আপু, প্রত্তুয়ের বুকে দুঃখু! চল! চল।”

তুরাগ এসে বলল, “তুয়া দ্রুত প্রত্যয়দের বাসায় চল।”

তুয়া কিছু বলতে পারছে না, অজানা ভয়ে ওর বুক কাঁপছে। ওর মাথায় একটাই চিন্তা ঘুরছে, প্রত্যয় ঠিক আছে তো?

ইচ্ছে তুয়ার হাত ধরে টানতে টানতে প্রত্যয়দের ড্রয়িংরুমে নিয়ে আসলো। সবাই গোল হয়ে বসে আছে কিন্তু প্রত্যয় নেই। তুয়া ঢোক গিলে তুরাগকে বলল, “প্র প্রত্যয় কই, ভাইয়া?”

প্রত্যয়ের আম্মু তুয়াকে নিয়ে পাশের রুমে চলে গেলেন। বিকেলে প্রত্যয় হসপিটালে গিয়েছিল। টানা দুই ঘন্টা পেশেন্ট দেখে উঠতে যাবে, তখন তুরাগের কল পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে বাসায় ছুটে আসল। ওদের ড্রয়িংরুমের সোফাতে লাল টুকটুকে শাড়ি পরিহিত তুয়াকে দেখে প্রত্যয় দাঁড়িয়ে গেল।

প্রত্যয় জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করল। সে যেন নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গিয়েছিল। তুরাগ ওকে বলেছে, তুয়া আবার সুইসাইড করার চেষ্টা করেছে। কিছুতেই ওর সেন্স ফিরছে না। ওর হৃৎস্পন্দনের গতি কমে যাচ্ছে। এসব শুনে প্রত্যয় হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছে। সাদা শার্টটা ঘামে ভিজে গেছে। পরিপাটি ছেলেটার এই অবস্থা দেখে সবাই হেসে উঠল।

প্রত্যয় নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল, “হৃৎস্পন্দনের সঙ্গে সম্পর্কিত ফান বুকে গিয়ে বিঁধে। দম আঁটকে আসে, মনে হয় এক্ষুণি মারা যাব।”

প্রত্যয়ের কথা শুনে সবাই চুপ হয়ে গেল। তুয়া প্রত্যয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। তুরাগ এসে প্রত্যয়কে জড়িয়ে ধরে বলল, “তোমাদের দু’জনের টান পরীক্ষা করছিলাম। এখন কেউ কারো থেকে অনুভূতি আড়াল করতে পারবে না।”

প্রত্যয়ের আব্বু এসে বলল, “যাও, রেডি হয়ে এসো।”
প্রিয়ম প্রত্যয়কে নিয়ে ওর রুমে গেল। প্রত্যয় সাদা পাজামা-পাঞ্জাবী পড়ে তুয়ার পাশে বসল। কাজী এসে বিয়ে পড়ানো শুরু করল।

তুয়া ভাবতেও পারেনি ওর জীবনে এমন সুখময় মূহুর্ত আসবে। তুয়ার চোখের পানি অঝরে ঝরে যাচ্ছে। প্রত্যয় সবার আড়ালে তুয়ার এক হাত শক্ত করে ধরল। তুয়াও প্রত্যয়ের হাতটা আঁকড়ে ধরল।
তুয়ার শাড়ির আঁচলে ওদের হাতের শক্ত বন্ধনটা ঢেকে আছে। যেটা গভীর ভাবে পরখ না করলে কেউ বুঝতেও পারবে না। তুয়া তিনবার কবুল বলে প্রত্যয়কে জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করল।

“আল্লাহ, পরিপূর্ণ ভাবে ওকে ভাল রাখার তৌফিক দান করো।” প্রত্যয় মনে মনে কথাটা বলে কবুল বলল।

তুয়া এখনও শক্ত করে প্রত্যয়ের হাত ধরে আছে। মোনাজাতের সময় ওরা হাত ছাড়ল। দু’জনেই সাইন করে বিয়ের বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হল। বাসার সবাই যে ওদের এভাবে সারপ্রাইজ দিবে, ওরা ভাবতেও পারে নি। মোনাজাত শেষে কাজী খাওয়া-দাওয়া করে চলে গেলেন। দুই পরিবার মিলে খাওয়ার পর্ব শেষ করলেন।

তুয়া প্রত্যয়ের পাশে চুপটি করে সোফাতে বসে আছে। তুরাগ এসে বলল, “তুলা, এবার বাসায় চল।”
তুয়া প্রত্যয়ের দিকে তাকাল। প্রত্যয় মুচকি হেসে বলল, “যাও।” তুয়া মাথা নিচু করে নিল। সবাই মিটিমিটি হাসছে। প্রত্যয়ের আম্মু বললেন, “এ তো বর পাগল মেয়ে।”

উনার কথা শুনে সবাই অট্রহাসিতে ফেটে পড়ল। ইচ্ছের আম্মু, চাঁদ আর প্রিয়ম প্রত্যয়ের রুম সাজিয়ে বের হলো। ইচ্ছের আম্মু বলল, “কি রে তুয়া, বাসায় যাবি না?”

তুয়া করুণ চোখে প্রত্যয়ের দিকে তাকাল। প্রত্যয় স্বাভাবিক ভাবে বসে আছে। কিন্তু পা দিয়ে তুয়াকে আঁটকে রেখেছে, এটা কেউ টেরও পাচ্ছে না। প্রত্যয়ের আব্বু হাসতে হাসতে বললেন, “আমার পুত্রবধূ যখন যাবে না, তখন কেউ জোর করবে না।”
-“তুলা, মান ইজ্জত শেষ করে দিলি।” (তুরাগ)

সবাই তুয়াকে নিয়ে অনেক মজা করলেন।
তুয়ার আব্বু এসে তুয়ার মাথায় হাত রেখে বললেন, “মন খারাপের কিছু নেই। পাশাপাশি আমাদের বাসা।”

তুয়ার ছলছল চোখে ওর আব্বু-আম্মুর দিকে তাকাল। প্রত্যয় তুয়ার পা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তুয়ার আম্মু বললেন, “এটাই তোমার আসল ঠিকানা। নিজে ভাল থেকো আর সবাইকে ভাল রেখো।”

তুয়ার আব্বু-আম্মু চলে গেলেন। তুরাগ ছলছল চোখে বলল, “ভাল থাক।” তুয়া তুরাগকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিল। তুরাগ তুয়ার চোখে পানি মুছে দিয়ে চলে গেল। ইচ্ছের আম্মু আর চাঁদ তুয়াকে প্রত্যয়ের রুমে রেখে স্থান ত্যাগ করল।

প্রত্যয় ড্রয়িংরুমে সোফাতে বসে ফোনে কথা বলছে। প্রিয়ম ওর রুমে চলে গেল। প্রিয়মের আম্মু প্রিয়মকে পানি দিতে গিয়ে বললেন, “প্রিয়ম, তোমার চোখ লাল হয়ে আছে কেন? কিছু হয়েছে, আব্বু?”

প্রিয়ম বুকের বা পাশে হাত বুলিয়ে বলল, “না আম্মু, বুকে জ্যাম বেঁধেছে তাই হয়তো চোখ লাল দেখাচ্ছে।”

To be continue….!!