সেদিন বৃষ্টি হবে পর্ব-০৮

0
560

#সেদিন বৃষ্টি হবে
#পর্ব_০৮
#সামিয়া_মেহেরিন

তূর্ণা বিস্মিত, হতভম্ব। গলা দিয়ে কোনো কথা বেরোয় না। বুকের বা পাশটায় বোধহয় কেউ হাঁতুড়ি পে’টা করছে। এটাই হয়তো স্বাভাবিক। ভালোবাসার মানুষটির মুখে এমন কথা কেই বা সহ্য করতে পারে!

অবাধ্য চোখের অশ্রু বেরিয়ে আসতে চায় দু চোখ বেয়ে। কোনো রকমে নিজেকে সামলে তূর্ণা আটকা আটকা গলায় বলে,
” কী বলছেন এসব?”

উদয় ভাবলেশহীন। যেন কিছুই বলে নি সে। অথচ সে যা বলেছে তাতে তূর্ণার হৃদয় ভেঙে খানখান হয়ে যাচ্ছে।

সহসা তৃতীয় ব্যক্তির গলার আওয়াজ কানে আসে।
“আরে তূর্ণা, তুমি এখানে?”

তূর্ণার চোখ যায় নওরিনের দিকে। ডানহাত দিয়ে নিজের ব্যান্ডেজ করা বামহাত ধরে তাদের দিকে এগিয়ে আসে নওরিন। তূর্ণা ভ্রু কুঁচকে তাকায় সেদিকে।

নওরিন তূর্ণার দৃষ্টি অনুসরণ করে নিজের হাতের দিকে তাকায়। তূর্ণার দৃষ্টি বুঝতে পেরে নিজেই বলে,

“দেখো না, ছুঁ’ড়ি দিয়ে আপেল কাটতে গিয়ে নিজের হাতই কেটে ফেলেছি।”

তূর্ণা হতভম্ব। নওরিন তার হাত কেটেছে বলে ডাক্তারের কাছে এসেছে। তাহলে উদয় কেন তাকে ওমন কথা বলল। ওই কথাটা বলতে কি তার বিবেকে কোথাও আটকালো না?

নওরিন উদয়ের উদ্দেশ্যে বলে,
“ভাইয়া, ধন্যবাদ তোমাকে সাহায্য করার জন্য। আর আমি এখন ফিরবো না। হাসপাতালে আরো কিছুক্ষণ তার সাথে থাকবো। তুমি বরং তূর্ণাকে নিয়ে চলে যাও।”

নওরিন কার সাথে থাকবে বলছে তা তূর্ণা বুঝতে পারে না। বোঝার চেষ্টাও করে না। তার মনে তীব্র অভিমান বাসা বেঁধেছে। সেখানে আর দাঁড়িয়ে না থেকে হাসপাতালের বাইরে বেরিয়ে আসে।

উদয় তূর্ণার পিছে যেতে গিয়েও থেমে যায়। নওরিনের উদ্দেশ্যে বলে,
“রোজ রোজ কেন এভাবে পড়ে থাকো বলোতো। তার তো কোনো হুশ ই নেই।”

নওরিন নিঃশব্দে হেসে বলে,
“তুমি এই কথা বলছো, ভাইয়া? আমার অনুভূতি তুমি ব্যতিত কে বুঝবে বলতো? ভালোবাসা মানুষকে কত কি না করতে বাধ্য করে!”
_____________

তূর্ণা একাই বাসায় ফিরে এসেছে। উদয়ের জন্য অপেক্ষা করেনি। আজকের দেওয়া আঘাতটা সে কোনোদিন ভুলবে না। কেন মানুষটা তাকে ওই রকম একটা কথা বলল? হোক না তা মিথ্যে!

বাসায় এসে দেখে তুষার ড্রয়িংরুমে ঊর্মিলা বেগমের সাথে বসে আছে। তূর্ণার কাছে তা অস্বাভাবিক লাগে নি। বাসা বেশি দূর না হওয়ায় প্রায়ই হুটহাট তুষার চলে আসে এই বাড়িতে। বোনকে একপলক না দেখলে নাকি তার ভালো লাগে না।

তূর্ণার চেহারার মনমরা ভাব চোখ এড়ায় না তুষার আর ঊর্মিলা বেগমের। তূর্ণা ফ্রেশ হয়ে আসছে বলে নিজের ঘরে চলে যায়।

ফ্রেশ হয়ে নিজের শাশুড়ি মায়ের কাছে চলে যায় অনুমতি নিতে। কয়েকদিন বাপের বাড়ি গিয়ে থাকবে সেই অনুমতি। ঊর্মিলা বেগম বুঝতে পারেন মেয়েটার মন খারাপ। তারওপর অনেকদিন হয়েছে সে বাপের বাড়ি যায় নি। তাই তিনি আর বারণ করলেন না। উদয়ের অনুপস্থিতিতেই তূর্ণা তুষারের সাথে বেরিয়ে আসে।
____________

তূর্ণা তার বাপের বাড়ি এসেছে ঘণ্টাখানেক আগে। মা-বাবার সাথে কিছুক্ষণ গল্প করে নিজের ঘরে এসে বসে। পুরো ঘরটা একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। আগের মতোই আছে সব। নিলাশা বেগম রোজ নিয়ম করে মেয়ের ঘর পরিষ্কার করেন।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে তূর্ণা। ভালো লাগছে না তার কিছুই। দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। গোসলটা সেরে ফেলা দরকার। তূর্ণা উঠে আলমারির কাছে যায়। জামাকাপড় বের করে। সহসা তার হাতে টান পড়ে।

পুরুষালি শক্ত হাতের বন্ধনে তার হাত আবদ্ধ। আবদ্ধ হাতটিতে টান খেয়ে তূর্ণা সামনে ফিরে তাকায়। তূর্ণা বিস্মিত। উদয় এই সময় এখানে। আকস্মিকভাবে উদয় তূর্ণাকে নিজের নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। তূর্ণার শ্বাস নিতে কষ্ট হয় এতটাই শক্ত করে ধরেছে তাকে।

কিছুক্ষণ এভাবেই অতিবাহিত হওয়ার পর উদয়ের কণ্ঠস্বর কানে আসে তূর্ণার।

“বিশ্বাস করো, আমি শুধু দেখতে চেয়েছিলাম তুমি কীভাবে রিয়েক্ট করো। তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি আমি।”

বারবার একই কথা বলতে থাকে সে কষ্ট দিতে চায়নি তূর্ণাকে। তূর্ণার ছটফটানি বেড়ে যায়। উদয় তাকে ছেড়ে দেয়। তূর্ণার দুই গাল নিজের দুই হাত রেখে কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে,
“কথা দাও আমাকে ছেড়ে কোনোদিন চলে যাবে না।”

তূর্ণা নিজের বিস্ময় কাটাতে পারে না। উদয়ের চোখে চোখ রাখে। সেই চোখে আকুতি। উদয়ের ছলছল ভীতু চোখের আকুতি ফেলতে পারে না তূর্ণা।
____________

সেদিন উদয় তূর্ণার কাছে ক্ষমা চেয়েছিল বারবার করে। তূর্ণাও ক্ষমা করে দিয়েছিল। ভালোবাসা কত কি না করায় মানুষকে দিয়ে! বড় বড় অপরাধও মানুষ ক্ষমা করে দেয় এই ভালোবাসার জন্য। আর সেখানে উদয়ের ভুল তো খুব বড় কিছু না।

রাতে খাওয়ার সময় উদয়ের বাবা জাহাঙ্গীর সাহেব উদয়ের উদ্দেশ্যে বলেন,
“উদয় কাল তোমার গ্রামে যাওয়ার কথা না?”

উদয় মাথা দুলিয়ে বলে,
“হ্যাঁ, যাবো কাল।”

তূর্ণা অবাক হয়ে উদয়ের দিকে তাকায়। কই তাকে তো এই বিষয়ে একবারো বলল না।

জাহাঙ্গীর সাহেব পানির গ্লাসটা শেষ করে আবার উদয়ের উদ্দেশ্যে বলেন,
“তূর্ণাকেও সাথে নিয়ে যেও। তোমাদের ঘোরাফেরাও হয়ে যাবে সাথে বাড়ির কাজটাও হয়ে যাবে।”

উদয় মাথা দুলায়। জাহাঙ্গীর সাহেব আবারো বলেন,
“দূরের রাস্তা, বাইকে যেও না। গাড়ি নিয়ে যেও।”

খাওয়ার শেষে ঊর্মিলা বেগমের সাথে টেবিল পরিষ্কার করে একেবারে ঘরে আসে তূর্ণা। এসে দেখে উদয় মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। তূর্ণার উপস্থিতি টের পেয়ে উদয় তূর্ণার উদ্দেশ্যে বলে
” এদিকে এসো।”

তূর্ণাও বাধ্য মেয়ের মতো উদয়ের কাছে যায়। উদয় তূর্ণার হাত ধরে বিছানায় বসিয়ে দেয়। অতঃপর তূর্ণার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে। দুই হাত দিয়ে তূর্ণার কোমর জড়িয়ে ধরে তূর্ণার উদ্দেশ্যে বলে,
“মাথা ব্যথা করছে। টিপে দাও।”

তূর্ণা মুচকি হেসে উদয়ের ছোট ছোট চুলগুলোর মাঝে হাত ডুবিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ এভাবেই কেটে যায়। তারপর নিরবতা ভাঙে তূর্ণার কথায়।

“কাল যে আমরা গ্রামে যাবো, জামাকাপড় গোছাতে হবে না?”

উদয় নিচু গলায় জবাব দেয়।
“আমি গুছিয়ে রেখেছি দুজনেরটাই।”

ভোরবেলায় দুজন বেরিয়ে পড়ে উদয়দের গ্রামের উদ্দেশ্যে অর্থাৎ সিরাজগঞ্জের উদ্দেশ্যে। ভোরবেলা হওয়ায় যানজট নেই তেমন। গাড়ি নির্বিঘ্নে এগিয়ে যাচ্ছে। তূর্ণা গাড়িতে উঠেই ঘুম দিয়েছিল। সেই ঘুম আর ভাঙেনি। আর উদয়ের দৃঢ় মনোযোগ গাড়ি ড্রাইভিংয়ের দিকে।

ঘুমের মাঝে নড়েচড়ে ওঠে তূর্ণা। সহসা মনে হয় কেউ তার দিকে গভীর দৃষ্টিপাত করে রেখেছে। ঘুম ঘুম চোখে চোখ মেলে সে। চোখ যায় তার দিকে অনিমেষ তাকিয়ে থাকা উদয়ের মুখশ্রীতে। আশপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। নিভু নিভু গলায় বলে,
“আমরা চলে এসেছি?”

উদয়ের ধ্যান ভাঙে। ছোট করে জবাব দেয় “হুম”

তূর্ণা ঠোঁট উল্টে বলে,
“আমায় ডাকলেই তো পারতেন। কতক্ষণ হলো এভাবে বসে আছেন!”

উদয় নিঃশব্দে হেসে গাড়ি থেকে নামে। তূর্ণাও নেমে যায়। তারা নামতেই এক মধ্যবয়স্ক লোক এসে উদয়ের হাতে চাবি দিয়ে বলে,
“আপনারা আসবেন দেখে ঘর পরিষ্কার করে রেখেছি।”

উদয় লোকটাকে ধন্যবাদ জানিয়ে তূর্ণাকে সাথে নিয়ে ভেতরে ঢুকে। তূর্ণা আশপাশ বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখে নেয়। বাড়িটা অনেক পুরাতন। কয়েক জায়গায় দেয়ালের ইট ভাঙা। ফার্নিচার কোনোটাই একেবারে অক্ষত নেই। তবে তাদের যে ঘরটায় থাকতে দেয়া হয়েছে সেটা তেমন ভাঙাচোরা অবস্থা নেই। থাকার মতোই।

বিকেল বেলায় তূর্ণা পুরো বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখে। এখন ভাঙাচোরা হলেও একসময় যে এই বাড়িতে জাঁকজমক ছিল দেখেই বোঝা যায়। একা কিছুক্ষণ ঘুরে বিরক্ত হয়ে যায় তূর্ণা। উদয় সে তো সেই কখন গ্রামের কিছু লোককে নিয়ে এই বাড়িটা যে জমির উপর সেই জমি মাপযোগ করতে বেরিয়েছে।

কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে ঘরে চলে আসে তূর্ণা। মিনিট দুয়েকের মধ্যে উদয়ও ফিরে আসে। তূর্ণার উদ্দেশ্যে বলে চলো গ্রামটা ঘুরিয়ে দেখাই তোমাকে।

সন্ধ্যা নামার আগ দিয়ে বাড়ি ফিরে তারা। ফিরেই তূর্ণা বলে ওঠে,
“কি সুন্দর আপনাদের গ্রামটা!”

উদয় কিছু বলে না। তূর্ণা অভিমানী গলায় বলে,
“বাবা না বললে আমাকে তো নিয়েই আসতেন না তাই না? নিজেই একা একা আসতেন।”

উদয় নিঃশব্দে হেসে তারপর জবাব দেয়।
“এত বড় অপবাদ দিকে তোমার বুক কাঁপলো না, বউ? আমিতো বাবার বলার আগেই তোমার আর আমার জামাকাপড় সব গুছিয়ে রেখেছিলাম।”

উদয়ের মুখে বউ সম্বোধনটায় কেমন কেঁপে ওঠে তূর্ণা। এই ডাকটায় কি যেন একটা ছিল।

নিজেকে সামলে নিয়ে তূর্ণা আবার প্রশ্ন করে,
“আচ্ছা আমরা এখানে কেন এসেছি?”

উদয় স্বাভাবিক গলায় জবাব দেয়।
“এই বাড়িটা ভেঙে এখানে নতুন করে বাড়ি বানানো হবে। বাবার ইচ্ছা এটা। কিন্তু জমি নিয়ে স্থানীয় লোকেরা একটু ঝামেলা করছিল। তাই তাদের সাথে কথা বলে সবটা মিটিয়ে নিতে বাবা আমাকে পাঠিয়েছে। আর কন্সট্রাকশনের কাজটা আমার কম্পানিকে দিয়েছে।”
_____________

ভোরবেলায় উদয় বাড়ির পাশে পুকুরপাড়ে হাঁটতে চলে আসে। ছোটবেলার কত স্মৃতি জড়িয়ে এই নদীটার সাথে। তূর্ণা এখনো ঘুমে। নয়তো তাকে নিয়েই আসতো। ছোটবেলার কিছু হাসি-কান্নার গল্প শোনাতো।

সহসা কোনো মেয়েলি হাতের শক্ত বন্ধনে আবদ্ধ হয় উদয়। উদয় বুকে মাথা রেখে হাত দুটো উদয়ের পিঠে রাখে। নখ গেঁথে যায় উদয়ের সুঠাম পিঠে। তবু মেয়েটির কোনো হুশ নেই। অচেনা কোনো মেয়ের সাথে আলিঙ্গনে লিপ্ত হয়ে অস্বস্তি লাগে উদয়ের। কান্নাভেজা গলা কানে আসে।

“আপনি আমায় ছেড়ে কোথায় চলে গিয়েছিলেন শহুরে বাবু। আপনার পথ চেয়ে এতগুলো দিন পাড় করে দিয়েছি। অবশেষে আপনার দেখা মিললো। আমার অপেক্ষা শেষ হলো।”

চলবে!