স্নিগ্ধ প্রেমের সম্মোহন পর্ব-২৩+২৪

0
1952

#স্নিগ্ধ_প্রেমের_সম্মোহন
–[পর্ব-২৩]
লেখিকা: #সাদিয়া_মেহরুজ_দোলা

গোধূলি বেলা! পশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলে পড়েছে প্রায়। যেকোনো সময় সে পৃথিবীর আঙ্গিকে থেকে বিদায় নেবে! শ্যাওলা পানির ধারায় সূর্যের কমলা হলুদের আভা ছড়িয়ে আছে।

আমি সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আলতো করে পানিগুলো এলোমেলো করে দেই। শা শা বাতাস এসে চুলগুলোকে উড়িয়ে নিয়ে এলোমেলো করে দেয়! খিলখিল করে হেসে দেই অজান্তেই! কতোদিন পর, ঠিক কতদিন পর এভাবে হেসেছি ঠিক নেই। আজ পূর্ব ভাইয়ার কারণে ফের আমার পছন্দের জায়গাটা দর্শন করা হলো!

পূর্ব ভাইয় বাইকে উঠে পথিমধ্যে বাসায় যাওয়ার পথ পেরিয়ে এখানে নিয়ে আসেন!
কারণটা জানতে চাইনি আমি।

সিঁড়িতে বসে পানির দিকে তাকিয়ে থাকার সময় পূর্ব ভাইয়ার চেহারা পানিতে প্রতিফলিত হয়! ঠোঁটের কোনায় মৃদু হাসি নিয়ে তিনি আমার পানে চেয়ে। ভ্রম ভেবে চোখ কচলিয়ে ফের দেখতেই পূর্ব ভাইয়ার চেহারাটাই নজরে পড়ে! তার মানে এটা ভ্রম না! সত্যি তিনি আমার পিছে দাড়িয়ে।

মাথা ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাতেই হাতে কারো স্পর্শ টের পাই! ঘার ঘুরিয়ে সেদিকে তাকাতে দেখি পূর্ব ভাইয়া আমার হাত ধরে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন। আমি আমতা আমতা করে বলি,,,

‘ কিছু ব..বলবেন ভাই..য়া? ‘

পূর্ব ভাইয়া আমার কাছে এসে। তার একহাত আমার গালে স্পর্শ করে স্বগতোক্তি গলায় বলল,,,

‘ ঠিক কতদিন পর আমি তোর হাসি দেখলাম জানিস? পুরো ২ মাস ১২ দিন ৬ ঘন্টা ১৯ সেকেন্ড পর! এতদিন এই এক টুকরো হাসির জন্য ছটফট করে মরেছি তবুও দেখা পাইনি। এভাবে আমার প্রাণভোমরা আমার থেকে দূরে সরিয়ে রাখিস কেনো তুই? খুব ভালোলাগে এমন করতে?’

আমি ভ্যাবাচেকা খেয়ে তাকিয়ে আছি পূর্ব ভাইয়ার দিকে! তার কথাটার মানে বুঝতেই মাথা চক্কর দেয়। বেশ লং টাইম পর হেসেছি বুঝলাম তবে এতোটা দেরী? তার আবার কড়ায় গন্ডায় তিনি হিসেবও রেখেছেন? মাই গড! কি সাংঘাতিক লোক!
আমি চমকিত কন্ঠে বলি,,,

‘ আপনি এতোটা পাক্কা হিসেব কি করে রাখলেন? ‘

পূর্ব ভাই আলতো হাসলেন!
ধুপ করে সিঁড়িতে আধো শুয়েই আমার কোলে মাথা রাখেন। আমার একহাত তার বুক মাঝারে রেখে ধীর কন্ঠে বললেন,,,

‘ তোর বেলায় আমি সবকিছুর হিসেব বেশ দক্ষ ভাবে রাখি! মিনিট, সেকেন্ড, ক্ষন, ঘন্টা, মাস এভ্রিথিং! তোর সাথে কাটানো প্রহরের প্রতেকটা মূর্হত ব্রেনে এটার্চ করে রাখি যাতে যখন তুই পাশে না থাকিস তখন সেই মূর্হতগুলো মনে করে নিজেকে শান্ত রাখতে পারি। ইউ নো হোয়াট? তুই পাশে না থাকলে আমার শ্বাসক্রিয়া বন্ধ হয়ে আসতে চায়, থেমে যেতে চায় হৃদস্পন্দন! চোখদুটো শুধু ব্যাকুল হয়ে তোকেই খুজে বেড়ায় চারপাশে! এতোটা আসক্ত কেনো আমি তোর প্রতি?এভাবে নিজের স্নিগ্ধ প্রেমের সম্মোহনে সম্মোহীত না করলে হতো না? ‘

থমকানো চাহনিতে তাকিয়ে আছি তার দিকে!
তার নীল মনিযুক্ত চোখদুটো এঁটে সেঁটে আছে একরাশ মায়া, ভালোবাসা! সেই ভালোবাসাটা হয়তোবা আমারই জন্য! কাঁপা কাঁপা একহাত তার মাথায় রাখি। পূর্ব ভাই তার চোখ বন্ধ করে নেন! হয়তোবা তার রক্তিম পানিতে টলমলে চোখদুটো দেখাতে চাননা।

পরক্ষণেই মনে পড়ে আমার নিজ অবস্থান!
ব্যাকুল হয়ে পড়ি। উত্তেজিত হয়ে বলি,,,

‘ পূর্ব ভাই সরুন! বাসায় চলুন। সবাই ওয়েট করছে’

পূর্ব ভাইয়া চোখ খুলে আমার দিকে তাকায়। ধীরে বলল,,,

‘ আর কতদিন? ঠিক আর কতদিন তুই আমায় এভাবে ইগ্নোর করবি? আমার প্রশ্নের উত্তরগুলো এড়িয়ে যাবি? আমার থেকে দূরে দূরে ছুটে পালাবি? আর কতদিন? এবার তো ক্ষ্যান্ত হ! আমি ক্লান্ত দোলপরী। প্রচুর ক্লান্ত! তোর ভালোবাসা মাখা হাতটা মাথায় পাওয়ার জন্য ছটফট করে মারা যাচ্ছি আমি। দেখতে পাচ্ছিস না?’

চোখের পানিগুলো আটকে রেখে নিজেকে সামলে নেই। ধরা কন্ঠে তাকে বললাম,,,

‘ আমরা দুজন আলাদা পথের মানুষ! আমাদের এক রাস্তায় একসাথে হাতে হাত রেখে হাঁটা মানায় না পূর্ব ভাই! ‘

পূর্ব ভাইয়া উঠে বসলেন। চোখমুখে তার ফালি ফালি রাগের আভাস! আমার দু বাহু ধরে ঝাকিয়ে বললেন,,,,

‘ হোয়াট ডু ইউ মিন বাই দ্যাট? কি বলছিস এসব? ‘

‘যা সত্যি তাই! স্টে এওয়ে ফ্রম মি পূর্ব ভাই! ‘

পূর্ব ভাইয়া তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললেন,,,,

‘ তোর থেকে দূরে থাকবো?হাহ্! দোলপরী তুই ভালো ভাবেই জানিস এটা পসিবল না! ইম্পসিবল! অযথা ফালতু কথা বলবিনা। তুই না চাইলেও তোকে আমারই সাথে থাকতে হবে বিকজ ইউ আর মাই প্রোপ্রার্টি! মাই পারসোনাল প্রোপার্টি! তোর ওপর শুধু আমার অধিকার।’

পূর্ব ভাইয়ার চোখমুখ লালচে আকার ধারণ করেছে। চোখদুটোতে রক্তিম আভা চারিদিকে ছড়িয়ে আছে। রাগে ফোসফোস শব্দ করছে এক প্রকার!
উঠে দাঁড়ালেন তিনি! সাথে আমার হাত টেনে ধরে বাইকের কাছে নিয়ে যেতে থাকেন।
বাইকে বসে ধমকের সুরে আমায় বসতে বলতেই ভীতিগ্রস্ত হয়ে তার পেছনে বসে পড়ি! এতোটা রেগে যাবেন তা কল্পনা করিনি। পূর্ব ভাইয়ার স্বভাব এই একটা। ছোট খাটো বিষয়ে মাঝেমধ্যেই হুটহাট বেশ রেগে যান!

বাইক স্টার্ট দেয়ার পর তিনি ঝাঁঝালো কন্ঠে বললেন,,,

‘ পরে যাওয়ার শখ জেগেছে? পেছন থেকে জরীয়ে ধর! ‘

আমি নিম্নকন্ঠে বলি,,,

‘ পড়বোনা! আপনি বাইক চালান পূর্ব ভাই। ‘

কথাটা বলার পর তিনি বাইক চালানো অবস্থাতেই আমার একহাত টেনে তার বুকে নিবদ্ধ করে ফেলেন। সরাতে নিলেই বেশ শক্ত করে চেপে ধরেন যার ফলে হাতটা তার বুকের মাঝেই আবদ্ধ হয়ে রইল!

বাড়িতে প্রবেশ করতেই সবার হাস্যজ্বল মুখশ্রী দেখে মনটা তড়িৎ বেগে দ্বিগুণ পরিমানে ভালো হয়ে যায়।
সবাইকে দেখলাম অরা আপুর সাথে কথা বলায় ব্যাস্ত! আপু সোফায় বসে মিষ্টি হাসির রেখা ঠোঁটের কোনায় টেনে সবাইকে উত্তর দিচ্ছেন। মাঝেমধ্যে হেসে লুটিয়ে পড়ছেন পাশে বসে থাকা অরণ্য ভাইয়ার ওপর। এতে অরন্য ভাইয়া অনেকটা অস্বস্তি বোধ করছে মনে হলো! তবে পরিস্থিতির কারণে কিছু বলতেও পারছে না বেচারা!

আমি মনে মনে প্রশ্ন আঁটতে ব্যাস্ত, অরা আপু বিদেশ গিয়ে এতোটা চেঞ্জ? জিন্স প্যান্ট, শার্ট, কালার করা চুল, হাই হিলের জুতো, আর গায়ে পড়া স্বভাব?

ভাবনার মাঝেই পূর্ব ভাইয়া আমার পাশে এসে দাঁড়ান! একবার সামনে তাকিয়ে বিরক্ত দৃষ্টি মিলে ওপরে চলে যান সিঁড়ি বেয়ে।

যাওয়ার আগে কড়া কন্ঠে আমার কানে ফিসফিসিয়ে বলেন,,,

‘ দোলপরী, সন্ধ্যা হওয়ার সাথে সাথেই আমার রুমে আসবি! এক মিনিট লেট হলে বাড়িসুদ্ধ লোকের সামনে আমি তোকে কোলে তুলে আনবো। মাইন্ড ইট!’

আমি কিছু বলতে নেবো তার আগেই তিনি ধুপধাপ পা ফেলে সিঁড়ি ডিঙিয়ে ওপরে চলে যান!
সেদিকে তাকিয়ে আমি কিছুটা রেগে যাই। এই ছেলে এমন কেনো?এতো জেদী?
দেখা যেতে পারে, তাকে যদি আমি খুন করি তখন সেই মূর্হতে তিনি বলবেন, ‘ দোলপরী আই লাভ ইউ! আই জাষ্ট ওয়ান্ট ইউ! ‘
এটাই বলবে?বলতেও পারে!

হটাৎ বড় চাচুর কন্ঠস্বর শোনা গেলো বেশ জোরে। তিনি আমায় ডেকে বললেন,,,

‘ প্রিন্সেস ওখানে দাঁড়িয়ে কেনো?এদিকে এসো! ‘

আমি হেটে ড্রইংরুমে প্রবেশ করতেই অরা আপু গদগদ হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,,,

‘ দোলপাখি, পূর্ব কই?ও না তোর সাথে আসছিলো?’

‘আপু পূর্ব ভাইয়া তার রুমে চলে গিয়েছেন। ‘

আমার উত্তরে আপু বোধহয় খানিকটা মন খারাপ করলেন। আমি সেদিকে তাকিয়ে ফের বললাম,,,

‘ আপু ভাইয়া টায়ার্ড ছিলো তাই হয়তো চলে গেছে। একটু পরই এসে পড়বো বললো, তোমার সাথে আড্ডা দেবে?’

আপু গমগম সুরে বলল,,,

‘ তাই?পূর্ব এটা বলেছে?’

‘ হ্যা! ‘

আপুর এক টুকরো হাসির জন্য আজ বেহুদা মিথ্যা বলতে হলো। কি একটা অবস্থা! পূর্ব ভাইয়া কি আপুর মনের অনুভূতি বুঝবেন না?তাকে মেনে নিতে পারবেন না?

আব্বু আমায় উদ্দেশ্য করে বলল,,,

‘ আম্মু, দুপুরে খেয়েছো কিছু? মুখ এমন শুকনো কেনো?’

‘ খেয়েছি আব্বু! এমনিতেই বাহির থেকে আসাতে। তুমি খেয়েছো?’

‘ হ্যা! তুমি রুমে গিয়ে রেষ্ট নাও তাহলে। ‘

বড় চাচু বাবার সাথে তাল মিলিয়ে বললেন,,,

‘ হ্যা প্রিন্সেস তুমি রুমে গিয়ে রেষ্ট করো। ভালো লাগবে! ‘

আমি মুচকি হেসে চলে যাই। যাওয়ার আগে পথিমধ্যে দেখা হয় আয়াফ ভাইয়ার সাথে। তার স্তব্ধ দৃষ্টি! তা দেখে ভড়কে যাই কিছুটা। আয়াফ ভাইয়াকে কেমন উচ্ছৃঙ্খল দেখাচ্ছে।
আমি বলি,,,

‘ ভাইয়া কিছু বলবেন?কিছু হয়েছে? আপনাকে এমন দেখাচ্ছে যে?’

আয়াফ ভাইয়া শুকনো হেসে বলল,,,

‘ তেমন কিছুনা। ভালো আছো?’

‘ এইতো আলহামদুলিল্লাহ! আপনি? ‘

‘ আছি কোনোরকম। ‘

‘ কোনোরকম কেনো?ভালো নেই আপনি?’

আয়াফ ভাইয়া এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন আমার পানে। অতঃপর বললেন,,,

‘ প্রথম প্রেমে পড়েছি তো, প্রথম প্রেমের জ্বালা অনেক।ভোলা যায়না! ‘

আমি ধীর কন্ঠে বলি,,,

‘ ভোলার কি দরকার ভাইয়া?যার প্রেমে পড়েছেন তাকে বলে দিলেই তো হয়! তারপর বিয়ে করে নেবেন।’

‘ যাকে ভালোবাসি সে আমার নয় অন্যকারো। তবে তুমি যেহেতু বলেছো একবার ট্রাই করে দেখবো।’

আমি জোরপূর্বক হাসি দিয়ে সেখান থেকে চলে যাই। আজ আয়াফ ভাইয়ার ব্যাবহার,কথাবার্তার ধরন, চাহনি সবকিছু অন্যরকম! অন্যকিছু প্রকাশ করছে। তবে ধরতে পারছি না সে কি বলতে চাইছে!

মাগরিবের আজান দেয়ার পর ওযু করে নামাজ পড়ে নেই! কাঁধে ওড়না ফেলে পূর্ব ভাইয়ার রুমের উদ্দেশ্য স্টোর রুম পেড়িয়ে অতঃপর তিন তলার সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয়! তার রুমে তিন তলার একদম কর্নারে!

স্টোর রুমের সামনে আসতেই কেও হাত ধরে হেঁচকা টান মেরে আমায় ভিতরে ঢুকিয়ে নেয়! চিৎকার করতে নিলেই শক্ত করে মুখ চেপে ধরে। হাতদুটো পেচিয়ে পিঠের কাছে শক্ত করে চেপে ধরে।
হাতে অনেকটা শক্ত করে চেপে ধরাতে ব্যাথায় কুকিয়ে উঠি! ব্যাথায় চোখে পানি এসে গিয়েছে। কিছু বলার আশায় ছটফট করাতে ব্যার্থ হই!

অচেনা যে এমন ব্যাথাতুর ভাবে চেপে ধরেছে সে কানের কাছে মুখ নিয়ে রাগান্বিত কন্ঠে বলল,,,

‘ তোকে ভালোবাসি আমি! তোর ওপরই কেনো পূর্বের নজর পড়তে হলো?যখন ও তোর আশেপাশে থাকে, তোকে স্পর্শ করে তখন ইচ্ছা করে ঐ কু** কে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলি। কিন্তু আফসোস সম্ভব না সেটা। তুই ওর থেকে দশহাত দূরে থাকবি নয়তো ওকে এবার সত্যিই মেরে ফেলবো! ‘

কথাগুলো বলে হাতদুটো আরো জোরে চেপে ধরে। এক পর্যায়ে ধাক্কা দিয়ে ফেলে খুব দ্রুত চলে যায় সেখান থেকে। আবছা অন্ধকারে শুধুমাত্র চলে যাওয়াটাই দেখতে পেরেছি। চেহারা দেখা যায়নি। কন্ঠস্বরটা বেশ ভারী থাকায় বোঝা যায়নি কে ছিলো?

ধাক্কা দেয়াতে মাথা পরিত্যাক্ত কাঁচের টেবিলে লেগে বেশ খানিকটা কেটে যায়। হাতের ব্যাথায় ফুপিয়ে কান্না করে দেই! লোকটার বলা কথাগুলো এখনো মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। পূর্ব ভাইয়াকে মেরে ফেলবে, কথাটা মনে করতেই শ্বাস আটকে আসে! এই লোক আবার কে?

কান্নার মাঝেই স্টোররুমের দরজা খোলার কর্কশ শব্দ কানে ভেসে এসে। লাইট অন হতেই ভেসে উঠে পূর্ব ভাইয়ার চেহারা! তিনি বিচলিত হয়ে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে।
দৌড়ে এসে আমার পাশে বসে উত্তেজিত কন্ঠে বললেন,,,

‘ দোলপরি কি হয়েছে? কাঁদছিস কেনো?কপাল থেকে তো রক্ত পড়ছে। কি হয়েছে? ‘

পূর্ব ভাইয়া বলতে বলতেই আমায় নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নেন। আমি তার কালো টিশার্ট খামচে ধরে শব্দ করে কেঁদে দেই। তিনি পকেট থেকে তার রুমাল বের করে মাথায় আঘাতপ্রাপ্ত জায়গায় চেপে ধরলেন! অস্থির হয়ে বললেন,,,

‘ কাঁদছিস কেনো? কি হয়েছে? তুই স্টোররুমে কেনো এসেছিস?’

আমি চুপটি করে গুটিসুটি মেরে তার বুকে মুখ গুজে দেই। কিছু বলতে ইচ্ছে করছে না। পূর্ব ভাইয়া আমায় জরীয়ে ধরে কোলে তুলে নেন! স্টোররুম থেকে বেড়িয়ে নিজের রুমের দিকে নিয়ে যান।

চলবে?

#স্নিগ্ধ_প্রেমের_সম্মোহন
–[পর্ব-২৪]
লেখিকা: #সাদিয়া_মেহরুজ_দোলা

আজ অভ্র ভাইয়া এবং অরিনের এংগেইজমেন্ট! মাত্র কয়েকদিনেই অভ্র ভাইয়া বড় চাচুকে মানিয়ে ফেলেছেন। বড় চাচু প্রথমে রাজি না হলেও পরবর্তীতে তিনি ছেলের কথা ভেবে রাজি হয়ে যান! অরিন প্রথমে রাজি না হলেও অভ্র ভাইয়া তাকে হুমকি দিয়ে বিয়েতে রাজি করান!

আজ সন্ধ্যায় আবরার ম্যানশনেই হবে অভ্র ভাই আর অরিনের এংগেইজমেন্ট!
তাই আজ বেশ কয়েক বছর পর খুশির পরশ লেগেছে ম্যানশনে। সবার ঠোঁটের কোনায় মিষ্টি হাসির রেখা।
বাবাকে আমি সেদিন বেশ সাহস করে বলে দিয়েছিলাম আমি অভ্র ভাইয়াকে বিয়ে করবোনা। তার পরই মূলত বড় চাচু বলেন অভ্র ভাইয়াও বিয়েতে রাজি নন!
দুজনের মতামতের ভিত্তিতেই আজ অভ্র ভাই আর অরিনের এংগেইজমেন্ট!

রুমের দরজা লক করে বিষন্ন মনে বইয়ের মাঝে মুখ ডুবিয়ে রেখেছি। পড়ায় আপাতত মন নেই! আমার মন ব্যাস্ত এখন সেই রাতের লোকটি কে হতে পারে? তা জানতে!

আবরার ম্যানশনে সেদিন বাহিরের কোনো ছেলে প্রবেশ করেনি। অরণ্য, শুভ্র, আর আয়াফ ভাইয়াই ছিলো বাহির থেকে এসেছেন! তাদের সন্দেহ করা মুশকিল। ছোটকাল থেকে তাদের সাথে পরিচয়। বড় ভাই মনে করে নিজের।

বাসার বয় স্টাফরা এমন সাহস কোনোদিনও করবে না। তাছাড়া বাসার ছেলে সার্ভেন্টরা এখানে আট নয় বছর ধরে কাজ করে আসছে। সবারই বয়স হয়েছে এখন! বার্ধক্যের ছাপ বিরাজমান! কিন্তু সেই লোকের ভারী গম্ভীর কন্ঠের আড়ালে ছিলো যুবক কন্ঠের আভাস! তার মানে ছেলেটি যুবক! বয়স ২৮ কি ২৯ হবে হয়তো।

সিসিটিভি ফুটেজ দেখে কোনো ক্লু পাইনি! কারণ সেই মূর্হতটায় সিসি ক্যামের অফ ছিলো। ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত! লোডশেডিং ছাড়া কখনোই বাসায় সিসি ক্যামেরা অফ থাকেনা। তাহলে সেদিন?
এতটুকু আমি নিশ্চিত সেই লোকটা বাসার কেওই ছিলো। আবরার ম্যানশনের সন্নিকটের আত্নীয়! তবে কে?
আজ দুদিন পেড়িয়ে গিয়েছি সেই ঘটনার।
সেদিন পূর্ব ভাইয়াকে মিথ্যা বলে কাটিয়ে নিয়েছি কোনো রকম! যদিও তিনি আমার কথা বিশ্বাস করেননি। তবুও সেই ক্ষনটায় চুপ ছিলেন!
এই দুদিনে তার সাথে আমার দেখা হয়নি। কাজের চাপ সামলাতে কক্সবাজার চলে গিয়েছিলেন। সেখানে তার কোম্পানির একটা শাখা রয়েছে!

স্টোররুমে পুরান আমলের দাদাজানদের ব্যাবহার্য জিনিসপত্র থাকায় সেখানে একটা সিক্রেট ক্যামেরা ছিলো। ক্যামেরটা বেশ ছোট আকৃতির! বোতাম আকারের! সেটা আমি নীরবের কাছে দিয়েছি। ফুটেজ ডাউনলোড করার জন্য। সেখান থেকে নিশ্চিত দেখা যাবে লোকটা কে ছিলো?

ভাবনার গহীনে থাকাকালীন পায়ের শব্দ শুনি!বই থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সামনে তাকাতেই দেখি পূর্ব ভাই আসছেন! তাকে দেখতেই চোখদুটো চকচক করে উঠলো! ঘর্মাক্ত ব্রাউন কালার শার্টটা তার শরীরের সাথে চিপকে আছে।

আমি হটাৎ হিতাহিত জ্ঞান ফেলে দৌড়ে গিয়ে তাকে জরীয়ে ধরে। পূর্ব ভাইয়া আমার রুমে ততক্ষণে ঢুকে পড়েছিলেন!
আমি জরীয়ে ধরাতে তিনি হয়তো কিছুটা ভড়কে গেলেন! দু কদম পিছিয়ে গিয়ে একহাত আমার পিঠে রেখে দেন। আরেকহাত স্থাপন করেন মাথায়!

পূর্ব ভাইয়া শান্ত কন্ঠে বললেন,,,

‘ মিস মি?’

হুশ ফেরায় ছিটকে দূরে সরে যাই!
আমতা আমতা করে বলি,,,

‘ আপনাকে মিস করতে যাবো কোন দুঃখে?’

তিনি হাসলেন! মুচকি হাসি। মাথার চুলগুলো এলোমেলো করতে করতে বললেন,,,

‘ মিস না করলে এভাবে করে জরীয়ে ধরলি কেনো? আমি ব্যালেন্স ধরে রাখতে না পারলে এতক্ষণে তো ফ্লোরে পড়ে যেতাম! ‘

‘ জরীয়ে ধরেছি ইচ্ছে! আপনি আমায় জরীয়ে ধরেন না? আপনি তো আরো কতকিছু করেন! অসভ্য লোক একটা। ‘

‘ আমি যা করি ভালোবেসে করি। কিন্তু তুই কি কারণে আমায় এভাবে জরীয়ে ধরলি? হু?’

দ্বিধায় পড়ে গেলাম! মনে মনে প্রশ্নরা প্রায় আমার ঝেকে ধরেছে। তবে উত্তরের হদিশ কোথাও নেই। কি উত্তর দেই এখন তাকে?
উওর খুজতে যখন আমার মন ব্যাস্ত তখন ফের পূর্ব ভাইয়া বললেন,,,

‘ কি হলো বল? ‘

‘ বলবোনা! ইচ্ছে হয়েছে জরীয়ে ধরেছি। কারণ থাকলেও আপনাকে বলবোনা। আপনি আমার রুম থেকে এখন যান! ‘

পূর্ব ভাইয়া জানেন আমি একবার যাতে ‘ না ‘ বলে সেটায় শত চেষ্টা করেও আমায় কেও ‘ হ্যা ‘ বলাতে পারবে না!
এইযে আমি পণ ধরেছি তাকে দেবোনা উত্তর সেটা সে নিশ্চিত জানে।

পূর্ব ভাইয়া হামি দিয়ে আমার বেডে ধপ করে শুয়ে পড়লো! সেদিক পানে আমি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছি। তিনি তার শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খুলে নিয়ে আমার দিকে চেয়ে বলল,,,

‘ তোর রুমের এসি কি নষ্ট? এতো স্লো চলছে কেনো?’

আমি ঠোঁট বাকিয়ে বলি,,,

‘ নষ্ট না। এসি অফ করে রেখেছি। ‘

‘ কিহ্? এতো গরমে এসি অফ করেছিস কেনো?এখনি অন কর! গরমে সিদ্ধ হয়ে যাচ্ছি। ‘

‘ করবো না। আপনার যদি গরম লাগে তাহলে আপনি নিজের রুমে গিয়ে এসি ১° ডিগ্রি তে ছাড়ুন! কিন্তু আপাদত আমার রুম থেকে যান।’

পূর্ব ভাইয়ার আমার কথায় ভাবান্তর দেখা গেলোনা তার মাঝারে! তিনি তার দুহাত মাথার নিচে রেখে আয়েশ করে বললেন,,,

‘ যাবোনা! তুই এসি অন কর জলদি নাহলে একবার যদি আমি উঠি না দোলপরী তাহলে কিন্তু তোকে চুমু খাবো, তাও ঠোঁটে! এটা চাস তুই?’

আমি কোনো কথা ছাড়াই এসির রিমোট নিয়ে এসি অন করি। রাগে রিমোট এক প্রকার ছুড়ে মারি ফ্লোরে।
পূর্ব ভাই তৎক্ষনাৎ হেসে বললেন,,,

‘ আমার রাগ বেচারা রিমোটের ওপর ঝাড়ছিস কেনো?’

‘ আপনি এই রুমে কেনো এসেছেন?’

পূর্ব ভাইয়া উঠে বসলেন! শার্টের কলার ঝাড়া দিয়ে বললেন,,,

‘ টায়ার্ড আমি! বাসায় আসার পর থেকে কাজ করতে হচ্ছে বাড়িতে এতো সার্ভেন্ট থাকা সত্বেও। স্টেজ থেকে শুরু করে কে কি ড্রেস পড়বে তাও আমাকেই ডিসাইড করে অর্ডার দিতে হয়েছে ডিজগাস্টিং! ‘

আমি খিলখিল করে হেসে দেই পূর্ব ভাইয়ার চেহারা দেখে। চোখ মুখ কুঁচকে তিনি তার বিরক্তির রেশ পুরো চেহারায় এঁটে সেঁটে দিয়েছেন!

আমায় হাসতে দেখে তিনি বললেন,,,

‘ দেখ দোলপরী! রিকুয়েষ্ট করছি তোর কাছে। বিয়ের আগ পর্যন্ত এভাবে আমার সামনে হাসিস না। আমি কন্ট্রোললেস হয়ে পড়ি! তোর সাথে দেখে ঘোরের মাঝে চলে যাই। দেখা যাবে ঘোরের মধ্যে থেকেই তোর ঠোঁটদুটো টুপ করে কামড় দিয়ে ফেলেছি। বাট তোকে আমি হালাল ভাবে স্পর্শ করতে চাই! ‘

প্রথম কথা গুলোতে লজ্জায় আর রাগে চুপসে গেলেও শেষের কথাটা শুনে আমার ভ্রু যুগল কুঁচকে যায়! ঝাঁঝালো কন্ঠে বলি,,,

‘ এমন ভাবে বলছেন যেনো আপনি আগে আমায় স্পর্শ করেননি? হুহ্! বদ লোক! আগে কি করেছেন তা কি ব্রেন থেকে আউট হয়ে গিয়েছে?’

পূর্ব ভাইয়া দুষ্ট হাসলেন। স্বগতোক্তি কন্ঠে বললেন,,,

‘ আগে যা করেছি তা আমার অবস্থান বোঝানোর জন্য করেছি, নয়তোবা রেগে! তুই আমাকে হুটহাট রাগিয়ে দিস কেনো? রাগলে আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিনা জানিস না?’

‘ আপনি বের হোন! এখনি বের হোন রুম থেকে। নয়তো আমি বড় চাচুকে ডাকবো! ‘

‘ তো ডাক! সমস্যা কি? বরং আমারই ভালো। ‘
ডোন্ট কেয়ার ভাবে বলল পূর্ব ভাই!

আমি চোখ গরম করে রুম থেকে বেড় হতে নিবো তখনি সে দৌড়ে এসে আমার সামনে দাঁড়ায়। আমার কাছে হাঁটুভেঙ্গে বসে আমার পা স্পর্শ করতেই আমি অস্বস্তি নিয়ে বলি,,,

‘ আরেহ্ কি করছেন? পা ধরছেন কেনো? সরুন! উঠে দাঁড়ান প্লিজ! ‘

পূর্ব ভাইয়া মাথা তুলে চোখ পাকিয়ে বলল,,,

‘ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাক! একদম নড়বিনা। ‘

বলেই তিনি আমার পা তার পায়ের ওপর রাখে! পকেট থেকে চকচকে দুটো পায়েল বের করে আমার পায়ে ধীরে সুস্থে পড়িয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ান! আমার দৃষ্টি এখনো পায়েল দুটোতে নিবদ্ধ। দূর থেকেও বোঝা যাচ্ছে পায়েল দুটো হিরের। বেশ ইউনিক কাজ করা পায়েলে! একবার দেখতেই যে কারো দৃষ্টি আঁটকে পড়ে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইবে।

আমি পূর্ব ভাইয়ার দিকে তাকাতেই তিনি পকেটে হাত গুজে বললেন,,,

‘ পছন্দ হয়েছে? ‘

আমি মাথা নাড়িয়ে ‘ হ্যা ‘ বলি!
অতঃপর মুখে বললাম,,,,

‘ খুব সুন্দর হয়েছে! কবে কিনলেন? ‘

‘ আজই! অরিনের জন্য এংগেইজমেন্ট রিং আনতে গিয়ে এটা নজরে পড়ে। তাই নিয়ে এসেছি। ‘

তৃপ্তি চোখে তার দিকে তাকাই!
পূর্ব ভাইয়ার ফোনে ম্যাসেজ টিউন হতেই তিনি চলে যান দ্রুত!
আমি সেদিকে একবার চেয়ে পায়েল দুটোট দিকে তাকাই। মন বলছে অন্যায় করছি অরা আপুর প্রতি। অতঃপর মস্তিষ্ক জানান দিচ্ছে, দুটো ভালোবাসার মানুষ একমাত্র দোল আর পূর্ব! তাদের আলাদা করলে প্রকৃতি মানবেনা।

হটাৎ করে স্বার্থপর হতে ইচ্ছে করলো। পূর্ব ভাই তো আমায় ভালোবাসে! তাহলে তাকে কেনো কষ্ট দিবে আমি? অরা আপু কি আদও পূর্ব ভাইয়াকে ভালোবাসে?তার আচরণে তো সেটা প্রকাশ পাচ্ছেনা।
নাহ! পূর্ব ভাইয়া আমার! তার ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার হয়তো আমারই। আর যাই হোক আমি তাকে কষ্ট দিতে পারবো না।

অন্ধকার রুমটায় হাটুগেড়ে ফ্লোরে বসে আছে অরা। হাসফাস করছে তার মন! কিছু প্রশ্ন, কিছু অন্যায় তাকে সর্বদা তাড়া করে বেড়ায়!
প্রকৃতি থেকে ভেসে আসে কিছু সাবধনতা মূলক বাণি, সে যা করছে তা ঠিক করছে না! অন্যায় করছে। ‘

অরার ফোন বেজে উঠতেই অন্ধকার ঘরটা আলোয় পরিপূর্ণ হয়। অরা ফোন রিসিভ করতেই কর্কশ কন্ঠে বলল,,,

‘ দোলাকে ইনজেকশন দিয়েছো?’

‘ নাহ স্যার। সুযোগ হচ্ছেনা। ‘

বাজখাঁই গলায় অপাশ থেকে বলল,,,

‘ হোয়াট দ্যা…! জলদি ইনজেকশন দেয়ার চেষ্টা করো অরা। এমনিতেই ইনজেকশন দেয়ার একমাস পর ক্যান্সারের আভাস পাওয়া যাবে শরীরে। তোমার বাংলাদেশে বেশিদিন থাকার পারমিশন বস দেননি ইউ নো না?’

অরা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। পরিশেষে বলল,,,

‘ জ্বী তা আমি জানি। আমি জলদিই ইনজেকশন দেয়ার চেষ্টা করবো। ‘

‘গুড! আর শুনো ইনজেকশন কিন্তু তিনটা দিবে! ‘

অরা কথাটা শুনে আতকে উঠলো! তিনটা? আল্লাহ!
অরা বলল,,,

‘ স্যার তিনটা দিলে তো ক্যান্সার হওয়ার সাথে সাথে মাংশ পঁচে গলে যাবে। ‘

‘ যাক! বসের ওর্ডার এটা। মানতেই হবে। ‘

ফোন কেটে যায়!
অরা কাঁপছে! একটা নিষ্পাপ মেয়েকে এতোটা কঠিন মৃত্যু দিবে এরা? তিনটা ইনজেকশন দিলে যে হাড্ডি পর্যন্ত বজায় থাকবেনা দোলার। গলে পঁচে নষ্ট হয়ে যাবে।

অরার কান্না পায়। কেনো এই লোকগুলো দোলার পিছনে লেগেছে?কি দোষ এই মিষ্টি মেয়েটার? ভেবে পায়না অরা!

চলবে,