স্নিগ্ধ প্রেমের সম্মোহন পর্ব-৪২+৪৩

0
1790

#স্নিগ্ধ_প্রেমের_সম্মোহন
#সাদিয়া_মেহরুজ_দোলা
|পর্ব-৪২|

ছাদের পূর্ণস্থান মরিচবাতি এবং বিভিন্ন ধরনের লাইটিং এর কারণে ঝলমল করছে চারিপাশ। সময় সাপেক্ষে সঙ্গীত এবং মেহেদী ফাংশন একসাথেই করা হয়েছে। স্টেজে দুহাত ভর্তি মেহেদী নিয়ে গাল ফুলিয়ে বসে আছে দোলা! তার বিরক্ত লাগছে। যাকে বলে প্রচন্ড রকমের বিরক্ত। পূর্বের দিকে আঁড়চোখে তাকিয়ে সে গাল ফুলিয়ে রেখেছি। পূর্ব খেয়াল করেনি তা! সে ব্যাস্ত ফোন নিয়ে। আজকের ঘটনা নিয়ে খুব টেনশনে আছে সে!

দোলাকে হলুদ লাগিয়ে দিয়ে যাওয়ার পর পরই ম্যাসেজ আসে দোলার ফোনে। তা দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলো সে! ম্যাসেজে লিখা ছিলো,

-‘ তোমার দাদুর অবস্থা খারাপ করে দিয়েছে অদ্রিন। যদি তাকে বাঁচাতে চাও তাহলে যত দ্রুত সম্ভব টরেন্টো তে আসো! ‘

ব্যাস! এতটুকু লিখা পড়ে বুক কেঁপে উঠেছিলো দোলার। সুখের মূর্হতে এ কেমন বিপদ এলো? দোলা তৎক্ষনাৎ পূর্বকে ফোন করে সবকিছু খুলে বলে। পূর্ব ওর টিমকে তদন্ত করতে দিয়ে পরিশেষে রেজাল্ট পায় এটা অদ্রিনের কান্ড কারখানা! সেই অভিযানে বাকি জঙ্গিদের ধরতে পারলেও অদ্রিনকে ধরা যায়নি। পালিয়ে গিয়েছিলো সে। পূর্ব জায়িন আকবর কে ফোন করে সব বলার পর তিনি আশ্বস্ত করে বলেন শান্ত থাকতে! অদ্রিনকে সে দেখবে। অদ্রিন তেমন কিছুই করতে পারবেনা। অতঃপর পুরো ঘটনা পূর্ব দোলাকে জানানোর পর ক্ষ্যান্ত হয় সে!

ফোনে কাজ করা শেষ করে পূর্ব দোলার দিকে তাকাতেই দেখে সে মুখ ফুলিয়ে বসে আছে! চিন্তিত হলো পূর্ব। দ্রুত পায়ে দোলার পাশে বসে মিহি কন্ঠে বলল,

-‘ দোলপরী আর ইউ ওকে? এভাবে মুখ ফুলিয়ে বসে আছিস কেনো?’

দোলা বলল না কিছু। তা দেখে পূর্ব সামনে তাকায়। সবাই যে যারমতো ব্যাস্ত। পূর্ব দোলার গা ঘেঁষে বসে ওর কোমড় চেপে ধরে নিজের সন্নিকটে আনে! শিউরে ওঠে দোলা। ডান পাশে মাথা ঘুরিয়ে পূর্বের দিকে প্রশ্নসূচক চাহনি দিয়ে তাকায়। পূর্ব ভ্রু কুচকে বলল,

-‘ হোয়াট? এভাবে অন্য দিকে ঘুরে আছিস কেনো?’

দোলা তপ্তশ্বাস ছাড়ে। লোকটা ত্যাড়া! কই তাকে একটু সুন্দর করে ডেকে বলবে, তা না সে উল্টো পাল্টা কাজ করছে।
দোলা কাট কাট কন্ঠে বলল,

-‘ আপনি নিলজ্জ হতে পারেন পূর্ব বাট আমি নই! সরে বসুন। ‘

পূর্ব ভ্যাবাচেকা খায়! তবে তা বাহিরে প্রকাশ করলো না সে। বাহিরে একদম স্বাভাবিক চাহনি দিয়ে তাকিয়ে আছে সে দোলার দিকে। পূর্ব ভাবছে, মেয়েটার হলোটা কি? হটাৎ করে এতোটা কঠোর? এমন কাট কাট গলায় কথা বলছে। পূর্ব স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,

-‘ চুমু খাবো?’

হতভম্ব দোলা। চোখ দুটো ছোট ছোট করে চেয়ে আছে সে পূর্বের দিকে। পরিশেষে সে বলল,

-‘ মানে?’

-‘ মানে সিম্পল! চুমু খায়নি আজ তোকে, তাই এমন স্ট্রেন্জ বিভেব করছিস রাইট? ওকে দ্যান বল, কোথায় চুমু খাবো? গালে নাকি কপালে? ‘
এই বলে পূর্ব খানিকটা এগোয় দোলার দিকে।

দোলা তেতে গেলো। তিক্ত কন্ঠে সে বলল,

-‘ একদম দূরে সরুন! আমি এরজন্য রেগে নেই। রেগে যাওয়ার কারনটা হচ্ছে আপনাকে এই কালো রঙের পাঞ্জাবি কে পরতে বলেছে? এতোটা ফিটফাট হয়ে এসেছেন কেনো? আশপাশে যে মেয়েরা চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে তা কি চোখে পড়ছে না? ‘

দোলার কথায় বাঁকা হাসি দেয় পূর্ব। শীতল কন্ঠে সে বলল,

-‘ আর ইউ জেলাস বউ?’

দোলা ফের একবার হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। মুখচ্ছবিতে সেই ভাবটা কাটাতে সে এদিক ওদিক দৃষ্টি দেয়। দোলা হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলল,

-‘ যত্তসব উদ্ভট চিন্তা ভাবনা আপনার। আমি জেলাস ফিল করবো কেনো? হুহ্? ‘

-‘ তাহলে এভাবে রেগে আছিস কেনো? মেয়েগুলো আমাকে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে এতে তুই গাল ফুলিয়ে কেনো? ‘

-‘ এইযে মেয়েরা আপনার দিকে তাকিয়ে আছে, চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে। এতে কি হচ্ছে জানেন? আপনার ওপর কু- নজর পড়ছে! কু- নজর পড়লে আল্লাহ না করুক আপনার যদি কিছু হয়ে যায়? আমি এতো তাড়াতাড়ি বিধবা হতে চাই না। বুঝলেন? তাই বলেছি! ‘
গরগর করে কথাগুলো উগলে দিয়ে ক্ষ্যান্ত হলো দোলা। পূর্বের দৃষ্টিভঙ্গি জানার জন্য ওর দিকে তাকাতেই দোলা স্থির হয়ে যায়! পূর্বের দৃষ্টি তার বোধগম্য হচ্ছেনা। একটুও না!

দোলার যুক্তি শুনে কিছু সময় নীরবতা পালন করে পূর্ব টেডি স্মাইল দিয়ে বলল,

-‘ আচ্ছা? এই ব্যাপার? ওকে ফাইন! কু- নজর পড়ছেনা আমার মিস.মেহরুজ দোলা। বরং ভালো নজরই পড়ছে। এনিওয়ে ওদিক থেকে একটু ঘুরে আসি? অনেক সুন্দরী মেয়েদের দেখেছি। একেকটা যেনো রসগোল্লা আহা..! ‘

পূর্ব কথাটা বলে উঠতে নিবে তৎক্ষনাৎ তার পায়ে গুতো মেরে দেয় দোলা। যার ফলস্বরূপ সে পুনরায় সোফায় বসে পড়ে। ব্যাথাতুর ভাবটা মুখপান থেকে সরিয়ে সে ভ্রু কুঁচকে দোলার দিকে চেয়ে বলল,

-‘ প্রবলেম কি? গুতো দিলি কেনো?’

দোলা আমতা আমতা করতে থাকে। অতঃপর কিছু একটা ভেবে সে নরম কন্ঠ বলল,

-‘ আপনার জন্য সেই কখন থেকে মেহেদী লাগিয়ে বসে আছি। খুদা লেগেছে আমার! যেহেতু আপনার জন্য এতোটা কষ্ট করছি, তাই আমাকে খাওয়ানোর দায়িত্ব আপনার। খাবার এনে দিন! আর কাওকে ডেকে দিন, ‘

দোলার খুদা লেগেছে শুনে এক প্রকার উতলা হয়ে উঠলো পূর্ব। মনে মনে নিজেকে কয়েকটা কঠিন গালি দিলো সে! ইশ! মেয়েটা কতক্ষণ যাবৎ না খেয়ে আছে। ভাবতেই বুক দুরুদুরু করে কেঁপে উঠলো তার। পূর্ব উঠে দাড়িয়ে চটপট কন্ঠে বলল,

-‘ একটু ওয়েট কর। আমি খাবার আনছি ওকে?জাষ্ট যাবো আর আসবো! ‘

বলেই পূর্ব লম্বা লম্বা পা ফেলে এগোয় ফুড কর্ণারের দিকে। তা দেখে মুচকি হাসি দেয় দোলা! ওর কোনো খুদা লাগেনি। অযথা পূর্বকে ব্যাস্ত রাখার তাগিদে এই মিথ্যাটা বলা।দোলা তো সেই কখন খেয়েছে। মেহেদী লাগানোর আগে অরা আপু তাকে খাইয়ে দিয়েছে। পূর্ব যখন বলল সে অন্য মেয়ের সাথে কথা বলতে যাচ্ছে ঠিক সেই মূর্হতে তার বুক কেঁপে ওঠে। অস্থির অস্থির ভাবটা প্রগাঢ় হয়ে আসে। এমনটা কেনো হয় জানা নেই! তার সিক্স সেন্স বলে এগুলো সব ভালোবাসার লক্ষ্মণ! প্রেমে পড়েছে সে, ফায়াজ আবরার পূর্বের প্রেমে! কিন্তু ব্রেন মানতে নারাজ এবং দোলাও। তাদের দু’জনেরই মতামত এটা ভালোবাসা নয় ভালোলাগা! তবে মনটা যে মানে না, উশখুশ করে প্রতি মূর্হত!

কিছু সময়ের ব্যাবধানে পূর্ব এক প্রকার ছুটে আসে স্টেজের দিকে। আশপাশের কয়েক জোড়া উৎসুক চোখ পূর্বের দিকে তাকিয়ে। তবে যখন দেখে পূর্ব দোলার কাছে খাবার নিয়ে গিয়েছে তখন তারা সেই দৃশ্য দেখে মুচকি হেসে নিজেদের কাজে মন দেয়!

পূর্ব খাবার এনে দোলার সামনে রাখে। খাবার দেখে চোখমুখ কুঁচকে নেয় দোলা! তা দেখে পূর্ব ভ্রু কুচকায়! তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে সে বলল,

-‘ কি হলো? এমন চোখ মুখ কুঁচকাচ্ছিস কেনো?’

দোলা মিনমিনিয়ে বলল,

-‘ ইয়ে মানে… খুদা চলে গিয়েছে। খাবোনা! খাবারটা রেখে আসুন প্লিজ?’

পূর্ব চোখমুখ শক্ত করে বলল,

-‘ ঠাটিয়ে দিবো এক থাপ্পড়! খাবার নিয়ে এমন বাহান আমার পছন্দ না দোল। তুই এখনি খাবি। ‘

-‘ কিভাবে খাবো? দেখুন.. (হাত দেখিয়ে) আমার দুহাতে মেহেদী দেয়া। ‘

পূর্ব কিঞ্চিৎ হেসে বলল,

-‘ সো হোয়াট? আমার হাত আছে না? ‘

দোলা চোখ গোল গোল করে বলল,

-‘ মানে কি? এত মানুষের মাঝে আপনি আমায় খাইয়ে দিবেন?’

পূর্ব ট্রে থেকে খাবার তুলে হাতে নিয়ে কোনো কথাই ছাড়া দোলার মুখে পুরে দেয়। দোলা আঁড়চোখে চেয়ে দেখে সবাই তাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিচ্ছে। ঝটপট মাথা নিচু করে নেয় দোলা! লজ্জায় তার গালদুটো হয়ে উঠেছে রক্তিম বর্নের। নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারলো সে। এ নিয়ে আফসোস এর কোনো সীমা নেই তার। আপাতত দোলার ইচ্ছে হচ্ছে এখান থেকে ছুটে পালাতে। কারণ পূর্বকে থামানো তার পক্ষে সম্ভব নয়! একেবারেই নয়!

খাওয়ার পর্ব শেষ করে পূর্ব ফিচেল কন্ঠে বলল,

-‘ তুই বস! আমি হাত ধুয়ে আসি?’

দোলা মাথা নাড়ে। তার দৃষ্টি নত। লজ্জার রেশ কাটছেই না। পূর্ব চলে যেতেই হাফ ছেড়ে বাঁচে সে!

-‘ বাহ, কি কেয়ারিং হ্যাজবেন্ড পাইছোস দোস্ত! ‘

কারো কন্ঠস্বর শুনে মাথা তুলে দোলা। অরিন দাঁড়িয়ে। চোখমুখে অদ্ভুত হাসি! সে যে তাকে আরো লজ্জায় ফেলতে এসেছে তা বুঝতে পারে দোলা! বোধগম্য হওয়াতে খানিক গলা ঝেড়ে সটান হয়ে বসে সে। থমথমে কন্ঠে বলল,

-‘ হু তো? অভ্র ভাইয়া বুঝি তোর কেয়ার করে না? সেদিনই তো দেখলাম তোকে শাড়ী পড়িয়ে দিচ্ছে। ‘

অরিন লজ্জায় কুঁকড়ে যায়! আমতা আমতা করে উল্টো পাল্টা কথা বলে কেটে পড়ে সে। দোলা হাসে! যদিও উচিত হয়নি এটা বলা। তবে, আপাতত অরিনকে চুপ করানোর এই একটাই উপায় ছিলো তার কাছে। যদিও সে আন্দাজে কথাটা বলেছিলো তবে এটা যে সত্যি হয়ে যাবে তা দোলার ভাবনায় আসেনি।

পূর্বের গিটারের সুর এবং তার মুগ্ধকর কন্ঠের গানের মাধ্যমে রাত তিনটার দিকে মেহেদী এবং সঙ্গীত অনুষ্ঠান সমাপ্ত হয়। সব গেষ্ট অলরেডি চলে গিয়েছে এবং কয়েকজন এখানেই আছে কাল বিয়ে উপলক্ষে!

দোলা রুমে এসে হাত ধুয়ে পিলে চমকে উঠে! এক চিলতে হাসি ফুটে উঠে তার মুখে। মেহেদীর রঙ বেশ গাঢ় হয়েছে। সবাই বলে থাকে কনের মেহেদীর রঙ যার যত গাঢ় হয় তার স্বামী তাকে ততোটা গভীর ভাবে ভালোবাসে। ব্যাপারটা প্রথমে দোলার কাছে ফালতু হলেও পরবর্তীতে কেনো যেনো বিশ্বাস করে নেয়! পূর্ব তাকে কতোটা ভালোবাসে তার সম্পর্কে ধারণা হয়তো নেই দোলার আবার আছে।

হাতের দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থায় অরিন আসে রুমে! দোলার হাত দেখে সে লাফিয়ে উঠে বলল,

-‘ বাব্বাহ! কত গাঢ় হয়েছে রঙ, পূর্ব ভাইয়া তোকে কতোটা ভালোবাসে এটা তার বড় একটা প্রমান’

দোলা লাজুক হাসে। অরিন পুনরায় বলল,

-‘ এই শোন! চুপিচুপি ছাঁদে যা তো। পূর্ব ভাইয়া ওয়েট করছে তোর জন্য। ‘

দোলা বিষ্ফোরিত চাহনি দিয়ে তাকায় অরিনের দিকে। অতঃপর অধীর হয়ে বলল,

-‘ পূর্ব আবরার মঞ্জিলে যায়নি?’

-‘ না। তোর হাতে মেহেদীর রঙ দেখবে বলে বেচারা উতলা হয়ে উঠেছে। জলদি যা। ‘

দোলা এক নজর অরিনের দিকে তাকিয়ে ছাঁদের দিকে পা বাড়ায়! হৃদস্পন্দন এই মূর্হতে জোরে জোরে স্পন্দিত হচ্ছে। যদিও এটা সব সময়ই হয়! যখন পূর্ব কাছে থাকে তার!

ছাঁদে গিয়ে চারপাশে দৃষ্টি দেয় দোলা। উদ্দেশ্য পূর্বকে খোঁজা! তবে দেখা পেলোনা তার। আচানক পিছন থেকে কেও জরীয়ে ধরতেই ধরফর করে দু কদম সামনে এগিয়ে যায় সে! পূর্ব দোলার ঘাড়ে থুতনি রেখে বলল,

-‘ ভয় পেয়েছিস?’

-‘ তো? এভাবে কেও ধরে? সরুন! ‘
কড়া কন্ঠে বলল দোলা।

পূর্ব মিহি হেসে ছেড়ে দেয় দোলাকে। সামনে দাড়িয়ে দোলার হাতদুটো তার হাতের মুঠোয় নিতেই ঠোঁটের কোনায় হাসি প্রসারিত হয়। পুলকিত সে! উচ্ছাসিত কন্ঠে পূর্ব বলল,

-‘ মেহেদীর রঙ অনেক গাঢ় হয়েছে। ‘

বলেই তিন চারটা চুমু খায় পূর্ব দোলার হাতে। দোলা কেপে উঠে চট জলদি হাত ছাড়িয়ে নেয়। অতঃপর এক দৌড়ে সে নিচে নিজের রুমে চলে আসে। পূর্বকে দ্বিতীয়বার কোনো কথা বলার সুযোগ দেয় না! আচানক পূর্বকে দেখলে তার বেশি লজ্জা লজ্জা পায়। মনে হয় দূরে থাকলে বাঁচি! পূর্বের সেই ঘায়েল করা দৃষ্টি যে তার শিরদাঁড়া কাপিয়ে দেয় তুমুল ভাবে!

তিন কবুল বলে বিয়ে নামক পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হয় পূর্ব – দোলা! কবুল বলার আগ মূর্হতে দোলার কন্ঠনালী কাঁপছিলো যেনো। বারংবার বাবা মায়ের দিকে তাকিয়েছিলো অশ্রুসিক্ত নয়নে!
তবে পূর্বের ক্ষেত্রে নিয়মটা ব্যাতিক্রম। কাজি কবুল বলতে বলার পর এক সেকেন্ড ওয়েট না করে চটপট তিন কবুল বলে দেয় সে!

স্টেজে দোলাকে বসানোর পরই চারিদিকে সবাই চিৎকার করে বলল, ‘ বর এসেছে, বর এসেছে ‘
ধুক ধুক আওয়াজ তুমুলহারে বর্ধিত হয় দোলার হৃদ গহীনে! চোখ তুলে সে পাতলা ওরনার আড়ালে পূর্বের মুখশ্রীর দিকে তাকায় সে। পূর্ব হা করে তাকিয়ে আছে। অভ্র ভাই তাকে ধাক্কা দিতে হুশে আসে! পূর্ব দোলার পাশে বসে বলল,

-‘ পাগল করে দিলি স্নিগ্ধপরী! এখন এতোটা সময় নিজেকে কন্ট্রোল করি কি করে বলতো? ‘

দোলা ইতস্তত বোধ করে অন্যদিকে তাকায়। পূর্বের এই লাগামহীন কথায় সে লজ্জায় চুপসে গেছে। লোকটা বিয়ের পর থেকে ঠোঁটকাটা স্বভাবের হয়ে গেছে।

সকল ধরনের রীতি, অনুষ্ঠান, ফটোশুট শেষ করে ঘনিয়ে আসে দোলার বিদায়ের ক্ষন! কাঁদতে কাঁদতে ফর্সা মুখ লাল হয়ে গিয়েছে তার। গাড়িতে বসা মাত্রই পূর্ব চোখ গরম করে বলল,

-‘ নিজের রাজ্যের রানী করে নিয়ে যাচ্ছি তোকে। দাসি করে নয়! কাঁদা বন্ধ কর।

বলেই পূর্ব দুহাত দিয়ে দোলার চোখের পানি মুছে দেয় যত্ন সহকারে।

চলবে….

#স্নিগ্ধ_প্রেমের_সম্মোহন
#সাদিয়া_মেহরুজ_দোলা
|পর্ব-৪৩|

কাউচে গুটিশুটি মেরে পূর্ব ঘুমিয়ে আছে। তার লম্বা শরীরটার জায়গা ছোট্ট কাউচটায় হয়নি। তবুও কোনো রকম ঘাপটি মেরে শুয়ে পড়েছে সে। আমি সেদিকে তাকিয়ে আঁচলে মুখ গুঁজে কেঁদে দেই! কান্নার আওয়াজটা খুবই সীমিত। যার কারণে তা হয়তো পূর্বের কানে যায়নি। আমার কান্নার আওয়াজ তার কানে গিলে নিশ্চিত এতক্ষণে তিনি হুড়মুড়িয়ে উঠে পড়তেন! কিছুক্ষন আগের ঘটনা তিক্তভাবে মনে গেঁথে গেছে আমার। চাইলেও ভুলতে পারছি না। অনুশোচনায় দহনে পুড়ছি যেনো ক্ষনে ক্ষনে!

কিছু সময় আগে..,
________________________

আবরার মঞ্জিল বধু বেশে পা দেয়ার পর মনে অদ্ভুত শিহরণ বয়ে যায়। পাশে দাড়িয়ে পূর্ব আমার হাত শক্ত করে চেপে ধরে। কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন,

-‘ আমার রাজ্যে স্বাগতম স্নিগ্ধপরী! ‘

কথাটা বলে সবার অগোচরে কানের পিনায় আলত রূপে চুমু খান। আমি ইতস্তত বোধ করে তারদিকে কড়া দৃষ্টিতে তাকাতেই তিনি মৃদু হাসেন। অতঃপর শুরু হয় সকল ধরনের রীতি – নীতি! রাত একটার দিকে আমায় বড় চাচি পূর্বের রুমে পাঠিয়ে দেন। তিনি রুমে বসে আমায় খাইয়ে দিয়ে আদুরে কন্ঠে বললেন,

-‘ কষ্ট হচ্ছে তোর মা?’

আমি নরম কন্ঠে বলি,

-‘ না চাচি, আমি ঠিক আছি!’

-‘ চাচি কি হ্যা? আমি এখন তোর শ্বাশুড়ি। মা বল। ‘
বড় চাচির কন্ঠে কিছুটা তেজ ভাব ছিলো। আমি মুচকি হেঁসে বলি,

-‘ আমার কষ্ট হচ্ছেনা মা। ‘

বড় চাচি একগাল হাসলেন। তৃপ্তিময় কন্ঠে বললেন,

-‘ আচ্ছা। তাহলে তুই বস! পার্লারের দুজন মেয়ে এসে আরেকবার বাসর ঘরের জন্য সাজিয়ে দিবে। তারপর তুই ফ্রী!’

চাচির মুখে ‘ বাসর ঘর’ শব্দটা শুনে লজ্জায় ইচ্ছে হলো মাটি ফুড়ে তার ভেতর ঢুকে যাই। চাচি মাথায় হাত বুলিয়ে কপালের কার্ণিশে একটা চুমু দিয়ে বেড়িয়ে যান। তারপর আসে দুজন মেয়ে। সম্ভবত এরাই পার্লার থেকে আসা। মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে যায় মূর্হতে! এখন আমার একটা ঘুম প্রয়োজন ছিলো। সারাদিন এর ধকলে যাচ্ছেতাই অবস্থা। মেয়ে দুটো প্রবেশ করার পর তার পিছু আসে অরা আপু। আপু বলল,

-‘ এইযে দোলপাখি, আরেকটু কষ্ট কর? যা বেনারসিটা চেঞ্জ করে এই কালো রঙের শাড়ীটা পড়ে আয়। ‘

অরা আপু কথাটা বলে একটা কালো রঙের শাড়ী এগিয়ে দেন। কুচকুচে কালো রঙের শাড়ীটা দেখতে চোখ ধাঁধানোকর। কালো স্টোন বসানো শাড়ীর আঁচল সহ পুরো অংশে। শাড়ী দেখা সম্পূর্ণ হলে আমি অসহায় কন্ঠে বলি,

-‘ আবার শাড়ী কেনো আপু? আমি আর চেঞ্জ করতে পারবোনা। ‘

-‘ আরেহ্, এটা কি রীতি ফিতীর মধ্যে ছিলো নাকি? তোর জামাই আমায় আড়ালে ডেকে এই শাড়ীটা দিয়ে বলল যাতে তুই পড়িস! তো আমি কি করবো?’

পূর্বের কথা আসতেই বুক ধ্বক করে উঠলো। সেটা ভয়ে! আমি যে এখনো তাকে মন থেকে স্বামীর অধিকার টা দিতে পারবো না। সময় প্রয়োজন মানিয়ে নিতে। কিন্তু পূর্ব মানবেন তো?

রোবটের মতো সোফা থেকে উঠে এসে অরা আপুর হাত থেকে শাড়ীটা নিয়ে নেই। পূর্বের পুরো রুমটায় সাদা, কালো, লাল রঙের ফুল দিয়ে সাজানো! দেখলেই মন জুরিয়ে যায়। তবে আপাদত আমার আশপাশে যা আছে সব বিষাক্তময় লাগছে! ওয়াশরুমে এসে চক্ষু চড়কগাছে। ব্লাউজের হাতা স্লিভলেস? আমি কখনো স্লিভলেস ড্রেস পড়িনা। অস্বস্তির কারণে! আর আজ কিনা তিন তিনটা মানুষের সামনে স্লিভলেস ব্লাউজ পড়ে যেতে হবে? শুকনো ঢক গিলে জিহবা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নেই। কিছু একটা ভেবে চটপট শাড়ী পড়ে আচল দিয়ে কাঁধসহ ঢেকে নেই।

বাহিরে বেরোতেই অরা আপু সহ বাকি তিনজন মেয়ে বেশ প্রশংসায় মেতে উঠলো! সুন্দর লাগছে, হ্যানত্যান! তবে এসব কিছুই আমার মাথায় ঢুকছে না। চিন্তায় চিন্তায় মাথা ব্যাথা হয়ে গেছে। পার্লারের মেয়ে দুটো নিজেদের মতো করে সাজিয়ে দিয়ে চলে যায়। তবে এবার বেশ হালকা সাজ দেয়া হয়েছে। অরা আপু আমায় বেডে বসিয়ে দিয়ে কপালের কাছে আসা চুলগুলো পিছে সরিয়ে দিয়ে বলল,

-‘ বেষ্ট অফ লাক বোনু। ‘

আপুর কথায় আমি অস্ফুটস্বরে বলি,

-‘আ..পু? ‘

আপু হেঁসে চলে যায়। পেড়িয়ে যায় আধাঘন্টা! হৃদপিণ্ড তুমুল ভাবে লাফাচ্ছে। ইচ্ছে করছে এই সবকিছু ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যাই। বুঝলাম না, হটাৎ এতো লজ্জা, ভয়- ভীতি! কোথা থেকে এসে জরো হলো?

দরজা খোলার আওয়াজে চট জলদি মাথা তুলে সেদিকে তাকাই। পূর্ব এসেছে। মাথার পাগড়িটা খুলে নিয়ে দরজা সজোরে লাগিয়ে দেন। পাগড়ি সোফায় ছুড়ে মেরে বিরক্তি কন্ঠে তিনি বললেন,

-‘ ডিজগাস্টিং! এরা জাষ্ট পঞ্চাশ হাজার টাকার জন্য এতো চিল্লাচিল্লি করতে পারে? গড! মাথা ধরে গিয়েছে। দোল তোর ফ্রেন্ডরা…’

এতটুকু বলে মাথা তুলে তিনি এবার আমাতে দৃষ্টি দেন। গভীর দৃষ্টি! অদ্ভুত ভাব প্রকাশ পাচ্ছে তাতে। ভীতি নিয়ে চট জলদি নেমে পড়ি বেড থেকে। হটাৎ কান্না পাচ্ছে আমার। ইশ..! এই লজ্জাজনক পরিস্থিতি থেকে যদি একটু খানি মুক্তি পেতাম। আঁচল দিয়ে ফের উন্মুক্ত কাঁধ ঢেকে নেই। চোরাচোখে পূর্বের দিকে তাকাতেই দেখি সে এখনো আমার দিকে একই দৃষ্টি দিয়ে একভাবে তাকিয়ে আছেন রক্তিম ঠোঁটজোরা গোল হয়ে আছে, হয়তো তিনি পরের শব্দটা বলতে চাচ্ছিলেন কিন্তু থমকে গিয়েছেন!

জরোতা নিয়ে পূর্বের কার্বাডের সাথে মিশে দাঁড়াই। পূর্ব এগিয়ে আসছেন। তা দেখে কাঁপাটে চোখের পাতা বন্ধ করে নেই। ঠোঁট, হাত, পা সবই তুমুল রূপে কাঁপা কাপিঁ করছে। কিছু সময় বাদে অনুভূত হলো আমার হাত কেও স্পর্শ করছে। ধীরে চোখ খুলে দেখি পূর্ব অতি সন্নিকটে দাঁড়িয়ে আমার। ঠোঁটজোরা কাঁপছে তার আমার মতো! কাঁপা কন্ঠে তিনি বললেন,

-‘স..স্লিভলেস ড..ড্রেস কেনো পড়েছিস?’

তার প্রশ্নে সবকিছু ফেলে স্ব- চকিত চাহনিতে তার দিকে তাকাই! তবে পূর্ব একাধারে আমায় দেখছেন। আমি চমকিত কন্ঠে বলি,

-‘ হোয়াট? ড্রেস আপনি দিয়েছেন, আবার জিজ্ঞেস করছেন স্লিভলেস ড্রেস কেনো পড়েছি?আজব! ‘

পূর্বের গভীর দৃষ্টি পরিবর্তন হয় আমার কথ্যে। তিনি বললেন,

-‘ আমি জাষ্ট শাড়ীটা পছন্দ করেছিলাম। আদার’স সবকিছু সম্পর্কে আইডিয়া না থাকায় অরিনকে বলেছি কিনে দিতে! ইট’স মিন..অরিন, উফ শিট! ‘

অরিন! এসবের জন্য দায়ী অরিন? মাথায় ধপ করে আগুন জ্বলে উঠলো যেনো। তিক্ত কন্ঠে চিবিয়ে চিবিয়ে বলি,

-‘ অরিন, বেয়াদব! ঐটা নিশ্চিত ইচ্ছে করে দিয়েছি ফাজিল। ‘

রাগে ফুঁসে পূর্বের দিকে তাকাই। তার চাহনি নেশাক্ত ময়! ধীর তিনি তার মাথা আমার মুখপানের দিকে এগোতেই আমি কিছু বলতে নিবো পূর্ব তার একহাত আমার ঠোঁটে রেখে ঘাড়ে মুখে গুজে দেন! আলত করে একটা চুমু খান কাঁধে। কাঁধ থেকে শাড়ীর আঁচল ফেলে দিতে নিবে তৎক্ষনাৎ তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ঠাস করে থাপ্পড় মেরে দেই তার গালে। ফুঁপিয়ে কেঁদে দিই তার এরূপ আচরণে। খেয়াল করে দেখি পূর্বের মুখশ্রীতে অপরাধী ছাপ ফুটে উঠেছে। তিনি করুন কন্ঠে বললেন,

-‘ দোল আ’ম সরি! আসলে… ‘

হাত উঁচু করে তাকে থামিয়ে দিয়ে কড়া কন্ঠে বলি,

-‘ চলে যান এখান থেকে। ‘

পূর্ব কিছু সময় চেয়ে থাকে আমার দিকে। অতঃপর কাউচে গিয়ে বসে পড়ে। কাউচ রুমের কর্নারে, বেলকনির দিকে! তিনি যেতেই আমি কাঁদতে কাঁদতে বেডে বসে পড়ি। মন কেনো জানি শান্ত হতে পারছেনা। পারছেনা তার স্বামীস্বরূপ স্পর্শ মেনে নিতে। তবে তাকে থাপ্পড় দিয়েছি আজ প্রথম। সে কারণে মন থেকে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছে। ইচ্ছে করছে হাতদুটো কেটে ফেলি। একটা থাপ্পড়ই তো! এতো কষ্ট লাগছে কেনো? জীবনে তো কম থাপ্পড় মারিনি ছেলেদের। আজ হটাৎ পূর্বকে থাপ্পড় মারতে এতো কষ্ট, এতো অনুশোচনা কেনো অনুভব হচ্ছে? কেনো খারাপ লাগছে তার সাথে উঁচু গলায় কথা বলায়?

কথাগুলো মনে পড়তে স্ব – শব্দে কেঁদে দেই। আমার কান্নার শব্দে হুড়মুড়িয়ে উঠে বসেন সদ্য ঘুমিয়ে পড়া পূর্ব! মাত্রই তিনি ঘুমিয়েছিলেন। একরাশ অপরাধীত্ব নিয়ে!

শাড়ীর আঁচলে মুখ গুঁজে কাঁদছি। পূর্ব দৌড়ে এসে বসে পড়েন পাশে ডিসটেন্স বজায় রেখে! তিনি অস্থির হয়ে বললেন,

-‘ দোল? আর ইউ ওকে? কি হয়েছে? কাঁদছিস কেনো? তখনকার বিভেবের জন্য? আ’ম সরি! তখন কি হয়েছিলো আমার জানিনা… আমার তোকে আরো সময় দেয়া উচিত ছিলো। হুটহাট এভাবে.., ‘

পূর্ব থেমে গেলেন। কন্ঠ ধরে এসেছে তার। আমি হাঁটু থেকে মুখ তুলে কান্নারত কন্ঠে বলি,

-‘ তখনকার জন্য কাঁদছি না। ‘

-‘ তাহলে? ‘

-‘ আপনাকে থাপ্পড় মারার জন্য সরি, আমি আপনাকে মারতে চাইনি। হটাৎ কি থেকে, ‘

পূর্ব স্বস্তির শ্বাস ছাড়লেন। আমার একহাত শক্ত করে চেপে ধরে বললেন,

-‘ সরি বললে তোকে এই মাঝরাতে কানে ধরে উঠ বস করাবো। তখনকার পরিস্থিতি অনুযায়ী ওভাবে রিয়েক্ট করা নরমাল ব্যাপার। শান্ত হ! আরেকবার যদি চোখ থেকে পানি পড়ে তাহলে অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করবো। ‘
বলেই চোখ টিপ দেন পূর্ব!

আমি ইতস্তত করে মাথা নিচু করে নেই। তিনি ফের বললেন,

-‘ শুয়ে পড়! রাত হয়েছে অনেক। ‘

বেডে শুয়ে পড়তেই তিনি উঠে চলে যেতে নিলে আমি চটপট বলি,

-‘ কই যাচ্ছেন?’

-‘ কেনো?ঘুমাতে! ‘

-‘ কোথায় ঘুমুতে যাচ্ছেন?’

-‘ কাউচে। তাছাড়া আর কোথায় ঘুমাবো? ‘

-‘ ওখানে ঘুমালে আপনার মতো লম্বা মানুষের জায়গা হবে?’

-‘ হু! তাছাড়া আর কই ঘুমাবো?’
বলেই ভ্রু কুচকে নেন তিনি। আমি বেডের মাঝখান থেকে সরে গিয়ে বামপাশে শুয়ে পড়ি। ইশারা করি ডানপাশে ঘুমোতে। তিনি বিনা শব্দে শুয়ে পড়েন। এক চিলতে হাসি তার ঠোঁটের কোনায় বিদ্যমান! বেড বড় হওয়াতে আমাদের দু’জনের মাঝে ডিস্টেন্স অনেক। স্বস্তির শ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করি। সব কিছুরই একটা নির্দিষ্ট সময় লাগে। সময়ের আগে কেও সবকিছু মেনে নিতে পারে আবার কেও না। সেই ‘ কেও না’ এর দলেই বোধহয় আমার নাম খোদাই করা রয়েছে।

রাত সাড়ে তিনটা! অভ্রের পাশে চুপচাপ বসে আছে অরিন। তার আমলকি খেতে ইচ্ছে করছে। শুধু আমলকি নয়, দুনিয়ার যতো ধরনের টক খাদ্য রয়েছে তা খেতে ইচ্ছে করছে! হটাৎ এমন উদ্ভট ইচ্ছেতে হতভম্ব অরিন। কেনো এসব অখাদ্য খাওয়ার ইচ্ছে জাগলো তার? সে তো টক কিছু দেখতেই পারেনা। বমি করে ভাসিয়ে দেয় সে। কিন্তু আজ হটাৎ মধ্যরাতে এই খাবার খাওয়ার ইচ্ছে কেনো জাগলো তার?

ঘুমন্ত অভ্রের পেট বরাবর গুতো দেয় অরিন। বিষম খেয়ে শোয়া থেকে বসে অভ্র। মাত্রই ঘুমিয়েছিলো বেচারা! ছোট ভাইয়ের বিয়ের চাপ সব তার ওপর পড়েছে। অভ্র কাশি থামিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে অরিনের দিকে তাকিয়ে বলল,

-‘ কি হয়েছে? ঘুমাচ্ছো না কেনো? এভাবে বসে আছো যে?’

অরিন ঠোঁট উল্টে বলল,

-‘ আমার না আমলকি খেতে ইচ্ছে করছে। শুধু আমলকি না, সব ধরনের টক স্বাদের খাদ্য খেতে ইচ্ছে করছে। প্লিজ এনে দাও অভ্র! ‘

অভ্র থতমত খায়। এই মাঝরাতে হটাৎ অরিনের টক খাওয়ার ইচ্ছা কেনো জাগলো তা তার মাথায় ঢুকছে না। অভ্র সন্দিহান কন্ঠে বলল,

-‘ হটাৎ এমন ইচ্ছে জাগলো কেনো?তুমি তো টক কিছু দেখলেই বমি করে দাও। ‘

-‘ জানিনা তো! বাট আমার খেতে ইচ্ছে হচ্ছে যান এনে দিন। ‘

অভ্র মাথা চুলকায়। অতঃপর কিছু মনে করে সে বলল,

-‘ তোমার পিরিয়ড লাষ্ট কবে হয়েছে? ‘

-‘ গত দুমাস আগে!স্ট্রেন্জ না? ডাক্তার দেখাবো দেখাবো করে দেখানো হয়না। ‘

হুট করে অভ্র চেঁচিয়ে বলল,

-‘ অরিন আমরা বাবা মা হচ্ছি। আমাদেরও একটা ছোট্ট বাবু হবে। থ্যাংক’স ফর ইট জান! ‘

দরজার কড়াঘাতে ঘুম ভেঙ্গে যায় তৎক্ষনাৎ। চোখ খুলতেই দৃশ্যমান হয় পূর্বের রক্তিম চোখজোরা। এক দৃষ্টিতে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। হতভম্ব হয়ে উঠে পড়ি! কাল রাতে যেভাবে ব্যাবধান রেখে ঘুমিয়ে ছিলাম তেমনটাই আছে। আমি আমতা আমতা করে বলি,

-‘ আপনার চোখ লাল হয়ে আছে কেনো?

পূর্ব উঠে বসে বললেন,

-‘ সারারাত ঘুম হয়নি। ঘুমোতে দেয়নি তোর এই স্নিগমাখা চেহারা। যার ফলস্বরূপ চোখ লাল হয়ে আছে। ‘

থতমত খেয়ে যাই তার উত্তরে। পূর্ব হটাৎ বাহু ধরে টান মেরে ফটাফট ঠোঁটের ওপর তিন চারটে চুমু খান একসঙ্গে। পরিশেষে বেড থেকে নেমে গিয়ে ঠোঁটের কোনায় হাসি ফুটিয়ে বললেন,

-‘ চুমু দিতে নিষেধ করা যাবেনা। আমি মানবোনা! তোর ঠোঁটদুটোর প্রতি অন্যায় হবে আমি চুমু না দিলে। তার কত সুন্দর করে আমায় ডেকে বলে চুমু দিতে, ইউ নো?তোর ঠোঁট দেখলে নিজেকে কন্ট্রোল করা মুশকিল হয়ে পড়ে। এনিওয়ে ফ্রেশ হ! আম্মু ডেকেছিলো তোকে। ‘

চলবে…