#সৎ_মা (০৬)
#সামসুজ্জামান_সিফাত
ঘুম ভাঙল রাত প্রায় এগারোটার দিকে। প্রচুর ক্ষিদে পেয়েছে তাই আসার সময় নিয়ে আসা বিস্কুটের প্যাকেট টা ছিঁড়ে বিস্কুট খেয়ে পানি খেয়ে নিলাম। তারপর পড়তে বসলাম। কিছুক্ষণ পড়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। পরের দিন সকালে উঠে না খেয়ে ই ভার্সিটি চলে গেলাম। অতঃপর এক বন্ধুর কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে নাস্তা করে ক্লাসে চলে যাই।
ভার্সিটি শেষে দোকানে না গিয়ে সোজা বাড়ি চলে আসি। ঘরে ঢুকতেই মায়ের ঘর থেকে অদ্ভুত শব্দ শুনতে পেলাম। কিছু না ভেবে ই আমি মায়ের ঘরের দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিতেই একদম নির্বাক হয়ে যাই। কারণ, দেখি ঘরে মা আর একটা অপরিচিত লোক একদম নগ্ন অবস্থায় যৌন মিলন করছে। আমার মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। তাহলে ওনি এতদিন আমার বাবাকে ঠকিয়েছে। কিছু না বলে আমি মায়ের ঘর থেকে কিছু না বলে ই আমার ঘরে এসে পড়ি। ঘরে এসে কাপড় না পাল্টে ই ভাবতে লাগলাম কি করি এখন ? হঠাৎ মাথায় এলো বাবাকে জানাতে হবে। তারাতাড়ি বাড়ি থেকে বের হয়ে দোকানে চলে এলাম। বাবা আমাকে দেখে ই বলে উঠলেন,”কি রে সিফাত তোকে এমন দেখাচ্ছে কেন ? কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তায় আছিস নাকি ?”
আমি বললাম,”বাবা তোমার সাথে জরুরি কিছু কথা আছে।”
– বল তাহলে।
– এখানে না, দোকান বন্ধ করে আমার সাথে আসো।
– কোথায় ?
– তুমি আমার সাথে আসো।
– আচ্ছা।
বাবা দোকান বন্ধ করল। আমি বাবাকে নিয়ে নদীর পাড় চলে এলাম। নদীর পাড় সাধারণত মানুষ থাকে না তেমন। কারণ, সবাই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মর্ম বুঝে না আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যে কতটা অতুলনীয় তা সবাই বুঝে না। যাইহোক, বাবাকে নিয়ে একটা নীরব স্থানে বসলাম। বাবা আমায় জিজ্ঞেস করল,”কিরে এখানে নিয়ে এলি কেন ? আর তোর না কি বলার ছিল?”
আমি বললাম,”তাই তো এখানে নিয়ে এসেছি।”
– আচ্ছা ঠিক আছে বল।
– আমার কথা তোমার বিশ্বাস হবে ত ?
– তোকে কখনো অবিশ্বাস করেছি কি ?
– না।
– তাহলে এই প্রশ্ন করলি কেন ? আর কি এমন কথা যে আমি বিশ্বাস করতে পারবো না।
– কথা টা অনেক টা অবিশ্বাস্য ই তাই তো জিজ্ঞেস করলাম বিশ্বাস করবে কি না।
– আচ্ছা ঠিক আছে বল শুনি।
আমি কিছুক্ষণ বাবা চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললাম,”বাবা তুমি ঠকছো।”
বাবা আমার দিকে অদ্ভুত চাহনি দিয়ে জিজ্ঞেস করল,”আমি ঠকছি মানে কি বলছিস তুই ?”
– হ্যাঁ বাবা যা বলছি তাই।
– আরে এমন অর্ধেক কথা না বলে কাহিনী কি খুলে বল।
আমি গতকাল আর আজকের ঘটনা গুলো সব বাবাকে খুলে বললাম। বাবা আমার কথা শুনে ঠাস করে আমার গালে একটা থাপ্পড় দিয়ে বলতে লাগলো,”মাথা ঠিক আছে তোর ? কি যা তা বলছিস ? সে একসময় তোকে মার ধর করতো বলে আজকে তুই তার নামে এমন একটা কথা বলতে পারলি ?”
আমি বললাম,”বাবা তুমি বিশ্বাস করো আমি যা সত্যি তা ই বলছি।”
– এটা ই ত আমার সবচেয়ে বড় ভুল। তোকে এতটা বিশ্বাস করতাম আমি আর আজকে আমার সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে কি থেকে কি বলে ফেললি ? সে তোর মা না হলে ও তোর বাবার অর্ধাঙ্গিনী ছিল আর তুই তার নামে তার ই স্বামীর কাছে এমন কথা বলতে পারলি ? আচ্ছা তুই কি সত্যি ই আমার সন্তান নাকি অন্য কারো পাপের ফল ? আমার তো মনে হচ্ছে তুই আমার সন্তান না। কারণ, তুই যদি আমার সন্তান হতি তাহলে এমন একটা কথা বলতে পারতি না। দেখ সিফাত, সে তোর সাথে যা করেছিল তা ভুলে যা আর তার নামে এসব মিথ্যা অপবাদ দিস না।
বাবা এক নাগাড়ে কথা গুলো শেষ করে চলে গেল। আমি একদম হতভম্ব হয়ে গেলাম। যে বাবা আমাকে ছোট থেকে এতটা বিশ্বাস করে আসছে, সে বাবা আজকে আমার কিছু কথা বিশ্বাস করতে পারলো না। যে বাবা আমায় একটা ফুলের টোকা ও দেয়নি, সে বাবা আজকে আমায় থাপ্পড় মারলো। কীভাবে বলতে পারলো, আমি বাবার সন্তান না অন্য কারো পাপের ফল বাবার সন্তান হলে বাবাকে এ কথা বলতাম না ? ভাবতেই চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা পানি বের হয়ে গেল। কিছুক্ষণ বসে থেকে মায়ের প্রতি একরাশ অভিমান নিয়ে মায়ের কবরের পাশে চলে এলাম। অভিমানের কারণে কিছু না বলে মায়ের মাথার পাশে বসে কিছুক্ষণ চোখের পানি ফেলে মায়ের জন্য দোয়া করে বাড়ি চলে এলাম। দেখি বাবা ও বাড়িতে ই আছে। কাউকে কিছু না বলে আমার ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে শুয়ে রইলাম।
বাবার কথার যন্ত্রনায় ছটফট করে করে সারা টা রাত পার করে দিলাম। বাবার কাছ থেকে আমি কখনো ই এমন কিছু আশা করিনি। ফজরের আজান দিলে উঠে হাত মুখ ধুয়ে অযু করে এসে নামাজ পড়ে মোনাজাতে বসে চোখের পানি ফেলতে লাগলাম। মোনাজাত শেষ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম।
সারাদিন বাহিরে ই কাটিয়ে দিলাম। সন্ধ্যার দিকে বাড়ি ফিরেছি। বাবা বাড়ি ছিল না। ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে শুয়ে রইলাম। আনুমানিক রাত প্রায় এগারোটার মত হবে। হঠাৎ মায়ের ঘর থেকে চিল্লাচিল্লির আওয়াজ শুনতে পেলাম। মনে হচ্ছে বাবা এসেছে আর কোনো কারণে মায়ের সাথে ঝগড়া লেগেছে। প্রায় সাড়ে ছয় বছর পর আবার বাবা মায়ের ঝগড়া হলো। আমি ওসবে কান না দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। আগের রাতে ঘুম হয়নি তাই ঘুম লেগে গেল।
পরের দিন ফজরের আজানের কিছুক্ষণ আগে ঘুম ভেঙ্গে গেল। আজান দেবার পর হাত মুখ ধুয়ে অযু করে এসে নামাজ পড়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলাম। আজকে আর হাঁটার শক্তি পাচ্ছি না ভালো করে। কিছু অন্তত না খেলে মনে হয় আর বাড়ি ইং আসতে পারবো না। তাই আবার বাড়ি চলে এলাম। বাড়ি এসে দরজা লাগিয়ে শুয়ে রইলাম।
দুপুর প্রায় তিনটার মত কে যেন এসে দরজা ধাক্কাচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম,”কে ?”
দরজার ওপাশ থেকে উত্তর আসলো,”আমি তোর বাবা।”
– কোনো প্রয়োজন নাকি ?
– দরজা খোল আগে পরে বলছি।
– দরজা খুলতে পারবো না কিছু বলার থাকলে ওখানে থেকে ই বলো।
– দেখ বাবা রাগ করিস না, ওইদিন আমি রাগের মাথায় থাপ্পড় দিয়ে ফেলেছি তারপর যা তা বলেছি। আমি সত্যি ই দুঃখিত বাবা তুই দরজা খোল।
কিছু না বলে কোনোরকমে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলাম। বাবা হাতে খাবারের বাসন নিয়ে ঘরে ঢুকলো। আমি কিছু না বলে খাটে এসে বসে পড়লাম। বাবা ও আমার পাশে বসে বলল,”এই নে বাবা খেয়ে নে।”
আমি বললাম,”ক্ষিদে নেই আমার।”
– আমি জানি খুব ক্ষিদে পেয়েছে তোর খেয়ে নে।
– আরে বললাম তো ক্ষিদে নেই।
– দুই দিন না খেয়ে থাকলে যে ক্ষিদে কেমন থাকে তা আমার জানা আছে তাই বলছি খেয়ে নে।
– বললাম ত ক্ষিদে নেই।
– আমি সত্যি ই দুঃখিত ওইদিন ওই কথা গুলোর জন্য।
– ওসব কোনো ব্যাপার না।
– তাহলে খেয়ে নে বাবা।
– ক্ষিদে নেই।
বাবা ঠাস করে একটা থাপ্পড় দিয়ে বলল,”কিসের ক্ষিদে নেই ক্ষিদে নেই করছিস ? বাবা ছেলের কাছে নত হয়েছে, বাবা ছেলের কাছে ক্ষমা চেয়েছে একটা বাবার কাছে এর চেয়ে বেশি কি বাবার বলা কিছু কথার কষ্ট ? হ্যাঁ কষ্ট বড় তাই বলে কি নিজ থেকে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাইলে ক্ষমা করা যায় না ? বল তুই ই বল ক্ষমা কি করা যায় না ?”
আমি কিছু বললাম না। বাবা আবারো বলল,”দেখ বাবা তোকে ওইদিন থাপ্পড় দিয়ে আর ওসব বলে আমি নিজেই শান্তিতে থাকতে পারিনি। তুই খাস নি বলে আমি ও খাইনি। বাবা আবার ও তোর কাছে আমি নত হয়ে বলছি, খেয়ে নে।
যখন শুনলাম বাবা ও খায়নি তখন আর রাগ ধরে রাখতে পারলাম না। সব রাগ অভিমান ভেঙে বললাম,”ঠিক আছে আমার সাথে তোমাকে ও খেতে হবে।”
বাবা বলল,”না তুই খা আমি পরে খাবো।”
– তুমি খেলে খাবো নয়তো খাবো না।
– ঠিক আছে।
বাবা আমায় খাইয়ে দিল আমি ও বাবাকে খাইয়ে দিলাম। তারপর দুজনে কিছুক্ষণ কথা বলে দোকানে চলে এলাম।
[কেউ কোনো অপরাধ করে নিজ থেকে ক্ষমা চাইতে আসলে বুঝবেন সে সত্যি ই অনুতপ্ত। এমতাবস্থায় তাকে সাথে সাথে ক্ষমা করে তার ভুল শুধরে দিন। কারণ, একটা মানুষ মূলত তার ভুলের কারণেই অপরাধ করে থাকে]