#সৎ_মা
#পর্বঃ০১
#রূপন্তি_রাহমান (ছদ্মনাম)
বয়স বাড়ার সাথে সাথে যখন মানুষ চিনতে শুরু করলাম তখন থেকেই নিজে নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, যদি কখনো বিয়ে করি তো একজন মা হারা সন্তানের পিতা কে বিয়ে করবো। কারো স্ত্রী হওয়ার আগে কারো মা হবো। নিজ পেটে সন্তান ধারনের আগেই মাতৃত্বের স্বাদ নিবো। “মা হারা সন্তান” এটা শুনলে বুকের ভেতরটা ছেৎ করে উঠে। আমাকে বড্ড টানে।
যাদের কাছে আমি আমার ইচ্ছের কথা বলেছি, সবাই আমাকে কটাক্ষ করেছে, হেয় করেছে, মজা নিয়েছে। কিন্তু আমি কখনো নিজেকে দেওয়া প্রতিজ্ঞা থেকে পিছিয়ে যাইনি। একের পর এক পাত্রকে রিজেক্ট করার পর বাবা অনেকটা বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“তোমার কি কোনো পছন্দ আছে? থাকলে বলতে পারো। আমি না করবো না। বয়স তো আর কম হলো না তোমার। মাস্টার্স শেষ করে স্কুলে শিক্ষকতা করছো। নিজের ভালোমন্দ সম্পর্কে নিজে খুব ভালো করে বুঝো।”
বাবাকে কিছু বলার আগেই মা উত্তর দিয়েছিলো,
“সে রাজি হবে কেন? আমাকে জ্বালিয়ে শেষ না করা অব্দি ওর শান্তি আছে নাকি। যতদিন বেঁচে থাকবে আমার ঘাড়ের ওপর বসে খাবে। ছোট একটা বোন যে আছে সে খবর আছে নাকি।”
মায়ের কথায় পাত্তা না দিয়ে বাবা কে বললাম,
“আমি কারো দ্বিতীয় স্ত্রী হতে চাই বাবা”
আমার কথা সবাই চমকে উঠে। সবাই সমস্বরে বলে, মানে?
আবারও বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলাম,
“আমি কোনো অসহায় শিশুর মা হতে চাই। যাকে এতিম করে কোনো মা আল্লাহর কাছে চলে গেছে কিংবা ফেলে গেছে। একটা অসহায় শিশুর ঢাল হতে চাই। একটা ভাঙাচোরা সংসারকে জোরা দিতে চাই।”
বাবা চেঁচিয়ে বললেন, “ইনসিয়া তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে কিসব বলছো তুমি? এতো ভালো ভালো প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে এখন বলছো কোনো বিবাহিত পুরুষকে বিয়ে করবে।যার বাচ্চা আছে। পাগল হয়ে গেলে নাকি?”
ছোটবোন ইকরা মুখ বাঁকিয়ে বলে, ” তোমার মতো মানুষের রুচি এমন হবে আগেই বোঝা উচিৎ ছিল। পুরাই ব্যাকডেটেড একটা”
মাও কিছু না বলে চলে গেলো। শুধু ছোট ভাইটা আমার হাত ধরে বলল, “আমি জানি আমার আপু কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিবে না। হয়তো এতে কারো খুব ভালো হবে। আমি সব সময় তোমার পাশে আছি।”
আমার সিদ্ধান্তে শুধু আমার ছোট ভাই ইরফানের সাপোর্ট পেয়েছিলাম।এর পরেও বাবা অনেক চেষ্টা করছে আমার এই সিদ্ধান্ত থেকে আমাকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য। কিন্তু আমি নাছোরবান্দাকে কেউ টলাতে পারেনি। শুধু এটুকু বলেছিলাম,
“তোমাদের ছোট মেয়ের বিয়ের এতো তাড়া থাকলে ওর বিয়ে দিয়ে দিতো পারো। আমি আমার ব্যবস্থা করে নিবো। আমার চিন্তা করতে হবে না।”
রোজ বিকেলে আমি বিশ টাকা রিক্সা ভাড়া শিশু পার্কে সময় কাটাই। এটা এক প্রকার অভ্যাসে পরিনত হয়েছে। একদিন না আসলে কেমন অশান্তি লাগে।ছটফট করতে থাকি। ছোট ছোট বাচ্চাদের নতুন হাঁটা শিখা, আদো আদো বুলিতে উল্টো পাল্টা কথা বলা, অবান্তর প্রশ্ন এগুলো আমার কাছে বেশ লাগে। পার্কের বেঞ্চিতে বসে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিলাম হঠাৎই নজর পড়লো একজন লোক একটা ছোট বাচ্চার কান্না থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। বয়স এক কি দেড় বছর হবে। কোনোভাবেই শান্ত করতে পারছে না। একটু এগিয়ে গেলাম সেখানে। হাত বাড়িয়ে দিলাম বাচ্চার পানে।আচমকা বাচ্চাটা কান্না থামিয়ে আমার দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে রইলো। পিছন ফিরে বাচ্চার আমাকে দেখে অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। তারপর ভ্রুকুটি করে অন্য দিকে চলে গেলেন। আমি শুধু ভ্যাবলাকান্তের মতো তাকিয়ে রইলাম। যদিও কোনো বাবা তার সন্তানকে অপরিচিত কারো কাছে দিবে না।
এরপর বেশ কয়েকদিন সেখানে তাদের দেখেছি। একদিন সাহস করে সেই লোকের সামনে গিয়ে বললাম, “বাবুটা কে একটু আমার কোলে দিবেন?”
লোকটা আমায় বলে, আপনার কোলে আমার বাচ্চাকে কেন দিবো? যদি ছেলেধরা হন তো?
আমি হাসতে হাসতে উত্তর দিয়েছিলাম, “আমি কোথাও যাবো না। আপনার সামনেই বসে থাকবো। আপনার মেয়েটা খুব কিউট।”
এরপর প্রতিদিন তাদের সাথে দেখা হতো।বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে আদর করতাম। লোকটার নাম “সোলাইমান” আর কিউট বাচ্চাটার নাম “আরজা”।
একদিন দুইদিন করতে করতে প্রায় ছয়মাস চলে গেলো। ওনাদের সাথেও আমার বেশ সখ্যতা তৈরী হয়ে গেছে। আগে বাচ্চাদের খেলাধুলা দেখার জন্য পার্কে যেতাম। আর এখন বিকেলে পার্কেই যাৎ ওনাদের সাথে সময় কাটানোর জন্য। একদিন আরজা কে কোলে নিয়ে সোলাইমান সাহেব কে প্রশ্ন করলাম, “রোজ আপনার মেয়ে কে নিয়ে পার্কে আপনি আসেন। আপনার ওয়াইফ মানে আরজার আম্মু কোথায়?”
ওনার হাসি হাসি মুখটা কেমন চুপসে গেলো। একটানে আরজা কে আমার কোল থেকে নিয়ে সোজা সামনের দিকে হাঁটা ধরলেন। ওনার আকস্মিক এহেম কান্ডে আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলাম। ওনি প্রায় চলেই যাচ্ছিলো তাই অনেকটা চিল্লিয়ে বললাম,
” আমি না বোঝে প্রশ্নটা করে ফেলেছি।আপনি প্লিজ আরজাকে নিয়ে এখানে আসা বন্ধ করবেন না।ও আমার কলিজার একটা অংশ হয়ে গেছে।”
ওনি হাঁটা থামিয়ে ওখানেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষন। তারপর ফিরে এলেন আমার কাছে। আরজা কে দিলেন আমার কোলে। লম্বা একটা নিঃশ্বাস নিয়ে বলতে লাগলেন,
“আরজার মা রিংকির সাথে আমার বিয়েটা ছিলো পারিবারিক। কেউ কাউকে চিনতাম না। মানুষ তো বিয়ের ফোনালাপ করে আমরা সেটাও করি নাই। আমি কয়েকবার কল করেছিলাম। রিংকি কথা বলেনি।ভেবেছি সে হয়তো লজ্জা পায় তাই কথা বলেনি। বিয়ের পর সব ঠিকঠাক চলছিলো। রিংকি কে অল্প কয়দিনে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। আমার সবকিছুতেই রিংকির দরকার হতো। রিংকির কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করতাম। বিয়ের নয়মাস পর সবচেয়ে বড় খুশির খবর টা দিলো। শুধু খুশির খবরই না আমার জীবন টাও উলোটপালোট হয়ে গেলো। আমি বাবা হবো এর থেকে বড় খুশির খবর কি হতে পারে বলেন। আর আমার জীবন উলোটপালোট করা খবরটা হলো, রিংকির বিয়ের আগে কারো সাথে প্রণয় ছিলো। ছিলো না বিয়ের পরও চালিয়ে গেছে। আমি বোকা কিছুই বুঝতে পারিনি। বাবু দুনিয়ায় আসার সাথে সাথে তাকে মুক্তি দিতে হবে। নতুবা সে নতুন প্রানকে পৃথিবীর আলো দেখাবে না। আর ওদের বিয়ের সমস্ত খরচ আমাকে বহন করতে হবে। সমাজ যেন জানে আমিই ওকে ইচ্ছে করে ডিভোর্স দিচ্ছি। ও আমার সাথে সংসার করতে ইচ্ছুক। আমি তখন কি করবো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। এতটুকু বুঝেছিলাম ওরা এমন একটা সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলো। যেন আমাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে নিজেদের ফয়দা লুটে নিতে পারে। বিশ্বাস করেন ও যদি বিয়ের আগে একবার বলতো অন্য কাউকে ভালোবাসে তো আমি ওকে কখনো নিজের জীবনের সাথে জড়াতাম না। নিজের সর্বস্ব দিয়ে ভালোবাসতাম না। আমি ওর সকল শর্ত মেনেছিলাম। ওর ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দিয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম কোনো নারী নয়মাস পেটে ধারণ করে নিশ্চয়ই তার অংশ ফেলে চলে যাবে না। হাজার হউক মা তো। মা কি কখনো নিজের সন্তান কে ফেলে থাকতে পারবে নাকি। আমাদের বিছানা আলাদা হয়ে গেলো।আমার বড্ড কষ্ট হতো ওকে ছাড়া থাকতে। ও যে আমার অভ্যাস ছিলো। আর ও অযুহাত দিয়েছিলো প্রেগন্যান্সির সময়ের। কারো শরীরের সাথে শরীর লাগলে নাকি ওর ঘুম আসে না। আমি তো জানতাম আসল সত্যি টা। নয়মাস পর আরজা ভূমিষ্ট হওয়ার পর আমার সকল ধারনাকে ভুল প্রমাণ ডিভোর্স পিটিশনের কথা বলে। আরজাকে দেখিয়ে বলেছিলাম, একবার এই ছোট বাচ্চাটার কথা ভাবো।কিভাবে থাকবে ও তোমায় ছাড়া। ভুলে যাও ন আগের সব কথা। আমি ভুলে যাবো তুমি কি বলেছিলে। কিন্তু রিংকি উত্তর দিয়েছিলো এমন তো কথা ছিলো না। তুমি তোমার শর্ত ভঙ্গ করছো। বুকে পাথর চেপে ডিভোর্স ফাইল করলাম। প্রসেসিং এর ছয়টা মাস ও আমার বাড়িতেই ছিলো। কাউকে বুঝতেই দেইনি আমাদের মধ্যে কি হচ্ছে। যেদিন আমাদের অফিশিয়াল ডিভোর্স হলো দুই বাড়ির লোক স্তব্ধ হয়ে গেলো। সব দোষ নিজের ঘাড়ে নিয়েছিলাম। বলেছিলাম ওর সাথে আর সংসার করতে ইচ্ছুক না।সেদিন দোষ না থাকা সত্ত্বেও আমি দোষী ছিলাম। সবাই ছি ছি করেছে। আমি নাকি অমানবিক। ছোট বাচ্চাটার কথা ভাবিনি।আসলেই কি আমি অমানবিক?”
চলবে,,,,
বানান ভুল ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
#সৎ_মা
#পর্বঃ০২
#রূপন্তি_রাহমান (ছদ্মনাম)
এতটুকু বলেই তিনি থামলেন। নিষ্পলক তাকিয়ে রইলেন আকাশপানে। আমি আমতা আমতা করে বললাম, “তারপর কি হলো?”
আমার কোলে থাকা মেয়ের কপালে চুমু আঁকলেন ওনি।তারপর বলেন, ” অপরাধ না করেও দোষী সাবস্ত্য হয়েছি। আমাদের এই সমাজে শুধু মেয়েরাই মানুষের কথা শুনে না পুরুষরাও কথা শুনে। আমার চরিত্রের দিকে সবাই আঙুল তুলেছে। সবাই বলাবলি করতো আমার নাকি অন্য কোথাও সম্পর্ক আছে। তাই আমি রিংকি কে ডিভোর্স দিয়েছি। সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছিলাম যখন আমার মা আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিলো। আমার মা বললেন, ” তোমার মতো ছেলে আমি আমার পেটে ধরেছি ভাবতেই ঘৃণা লাগে। অন্তত মেয়েটার কথা চিন্তা করে সংসার টা টিকিয়ে রাখতে।” অথচ মা জানে না সংসার বাঁচাতে আমিও মেয়ের দোহাই দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম মেয়ের জন্য হলেও সে আমাকে ছেড়ে যাবে না।”
-তারপর? তারপর কি হলো? ওনার সাথে আপনার আর দেখা হয়নি?
-হয়েছিলো দেখা ডিভোর্সের প্রায় পনেরো কি ষোলো দিন পরে। সে তার সো কল্ড বয়ফ্রেন্ডের সাথে ঘুরতে বের হয়েছিল আমি মেয়ের অসুস্থতায় ডাক্তারের কাছে দৌড়াদৌড়ি করছিলাম।আজব ব্যপার কি জানেন? আমার মেয়েটা ওর মাকে দেখে কতবার হাত বাড়ালো। কিন্তু নিষ্ঠুর মা পাত্তা দিলো না। পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। আমার মেয়েটা সেদিন গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে কেঁদেছে। সেদিন থেকে রিংকি যতটুকু ভালোবাসতাম তার থেকেও বেশি ঘৃণা করি। একটা মা কিভাবে এমন আচরন করতে পারে? নিজের পেটের সন্তানের সাথে এমন আচরণ করা যায়? আমি তো জানতাম মা জাতি নরম ও কোমল মনের। সে তার সন্তানের জন্য সব করতে পারে। এ কেমন মা? কোন মোহের জন্য এমন করলো?
সব শুনে কেমন রিয়েক্ট করবো সেটাই ভুলে গেলা। মা হয়ে সন্তানের ডাকে সারা না দিয়ে থাকা যায়? এ কোন যুগে এসে ঠেকলাম? ওনাকে আবারও প্রশ্ন করলাম,
“আপনার মা কে পরে সব খুলে বলেন নাই?”
আমার কোল থেকে আরজাকে ওনার কোলে নিলেন। তারপর বললেন,
“মা কে নিজ থেকে কিছু বলতে হয়নি। সেদিন রিংকির পাশে অন্য ছেলে আর আরজা এরিয়ে যাওয়া সবকিছু মিলিয়ে হয়তো মায়ের খটকা লেগেছে। মায়ের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে যে যদি আমি রিংকি কে ছেড়ে দেই তো আরজাকে দেখে নিশ্চয়ই দৌড়ে আসার কথা। আদর করার কথা। তা না করে উল্টো না দেখার ভাব করে চলে গেলো। বাড়িতে গিয়ে আমায় চেপে ধরে আড়ালে থাকা সত্যি টা জানার জন্য। বলতে অস্বীকার করায় নিজের কসম দিয়ে সত্যিটা আমাকে দিয়ে বলায়।”
-আপনার শ্বশুর শ্বাশুড়ি সত্যিটা জেনেছিলো?
– চারপাশের পরিস্থিতি আমার বিপরীতে চলে গেলো। সেই এলাকায় টিকাই আমার জন্য কঠিন হয়ে গেলো। রাস্তায় দেখলে সবাই বলতো, আমার চরিত্র খারাপ। বাচ্চাটার জন্যও সংসারটা টিকাইতে পারলাম না। আরো অনেক ভাবে খুঁচা দিয়ে কথা বলতো। সেজন্য ওইখানের অফিস থেকে ট্রান্সফার হয়ে এখানের ব্রাঞ্চে চলে আসি। তবে পরে নাকি ওনারা আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলো। তবে ওনাদের সাথে আমার আর কখনো দেখা বা সম্পর্ক রাখার কোনো ইচ্ছে নেই। আমি চাইনা আমার মেয়ে কখনো জানুক তার এমন একটা মা আছে। আরজার মা ও আমি বাবাও আমি।
– বিয়ে করে নিজের স্ত্রী আর আরজার মা আনতে ইচ্ছে হয় না? ভাঙাচোরা জীবনের দায়িত্ব আরেকজনের হাতে সঁপে দিতে ইচ্ছে করে না?
– আবার যে ঠকে যাওয়ার ভয় হয়। রিংকির মতো সে ও যদি আমায় ঠকায়? একবার নিজেকে সামলেছি। আবার ঠকলে যে আমি শেষ হয়ে যাবো।
পশ্চিমাকাশে লাল সূর্য হেলে পড়েছে। লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে পুরো আকাশ জুড়ে। এই বুঝি সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। ছোট ছোট বাচ্চাদের তাদের নিয়ে ফিরে যাচ্ছে গন্তব্যে। মাঝ বয়সী অনেকে হাঁটতে এসেছে। হয়তো ডায়াবেটিসে ভুগছে। বেঞ্চের এপাশে আমি আর অপর পাশে সোলাইমান সাহেব। দুজনের মাঝেই নিরবতা বিরাজমান করছে। আরজা ঘুমিয়ে গেছে অনেক আগেই। সে তার বাবার বুকের সাথে একেবারে লেপ্টে আছে। কিছু কথা বলবো বলবো করে কেন জানি আর সাহস পাচ্ছি না। কথা গুলো গলা অব্দি এসেই আঁটকে যাচ্ছে। গলাও শুকিয়ে গেছে। সাহসই পাচ্ছি না বলার। ভয় কে জয় করে কিছুটা সাহস সঞ্চার করে সোলাইমান সাহেব কে বললাম,
“বিয়ে করবেন আমায়?” এই নিষ্পাপ বাচ্চাটার মা হওয়ার সুযোগ দিবেন? আপনার ভাঙাচোরা জীবন আর সংসারের দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ দিবেন? আপনার ছোট্ট মিষ্টি মেয়েটার মায়ায় পড়ে গেছি আমি। কথা দিচ্ছি ঠকাবো না। আপনার মেয়ের মা হয়ে আপনার জীবনে পদার্পণ করবো। তার না হয় আপনার স্ত্রী হওয়ার চেষ্টা করবো। আগে লড়াই করবো নিজের সাথে নিজে। আরজার মা হওয়ার লড়াই। একজন মা হওয়া চাট্টিখানি কথা না। তার লড়াই হবে আপনার সাথে। আপনার স্ত্রী হওয়ার লড়াই। দিবেন সেই সুযোগ?”
____________________________________________
ইনসিয়ার বাবা ইকবাল সাহেব সোফায় বসে পেপার পড়ছেন। আর কিছুক্ষন পরপর চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন। সকালে অফিসে তাড়াতাড়ি যাওয়া লাগে বিধায় পেপার পড়ার সুযোগ হয়না। ওনার সামনে এসে দাঁড়ালেন ওনার স্ত্রী রাবেয়া বেগম। রাগে ফুস ফুস করতে করতে বললেন,
” তোমার গুনধর বড় মেয়ে কে ফোন লাগাও। সেই কখন বাসা থেকে বেরিয়েছে এখনো আসার নামগন্ধ নেই। এতো বড় ধিঙ্গী মেয়ে হয়েছে কিন্তু আক্কেল জ্ঞান কিছুই হয়নি। আমাকে কাল কাল কটে জ্বালিয়ে গেলো। তোমার বড় মেয়ের জন্য আমি শান্তি পেলাম না। নিজে যা ভালো মনে করে তাই করে। তুমি বলো কোনো ভদ্র ঘরের মেয়ে এতোক্ষণ বাইরে থাকে? লোকে কি বলবে? এমনিতেই লোকে নানান কথা বলে বিয়ে হচ্ছে না বলে। তোমার বড় মেয়ের জন্য আমার ছোট মেয়েটার কপাল পুড়বে।”
নিজের স্ত্রীর দিকে তাকালেন ইকবাল সাহেব। স্ত্রীর গতিবিধি লক্ষ্য করছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
পেপারটা ভাজ করে টি টেবিলের উপর। খালি কাপটা ওনার হাতে দিয়ে বললেন,
“তুমি যাও আমি ফোন লাগাচ্ছি। ইকরা আর ইরফান কি করছে? ইকরার টেস্ট পরীক্ষার রেজাল্ট কবে দিবে বলেছে কিছু?”
” খবর নিতে বললাম বড় মেয়ের। কোন রাজ্য উদ্ধার করতে গেছে সে। ওনি করছে কি। তোমার বড় মেয়ের মতো আমার ছেলে মেয়েরা এতো ধিঙ্গী না।”
ইকবাল সাহেব স্ত্রীর যাওয়ার পানে তাকিয়ে আবারও দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো লাগে ওনার কাছে। হুট করে ওনার মেয়েটা এতো পরিবর্তন কেন হয়েছন সেটাই বুঝতে পারছেন না।
____________________________________________
রুম জুড়ে পায়চারী করছে সেলিনা খাতুন। ছেলে তার সেই কখন নাতনিকে নিয়ে বাইরে হাঁটতে গিয়েছেন। সন্ধ্যা হয়ে এলো এখনো আসছে না দেখে তার হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। কোনো বিপদ হলো না তো।উপরন্তু এখানের কিছুই চিনে না। তিনবার কল করেছে একবারও ফোন রিসিভ হয়নি।এইদিকে এই সময় তিনি তার নাতনিকে খাওয়ায়। মেয়েটা নিশ্চয়ই খিদের চোটে কান্না করছে। চতুর্থবারের মতো ফোন লাগালেন তিনি। এইবার রিসিভ হলো।
____________________________________________
কথা গুলো বলে উত্তর আসায় বসে আছি। কি বলে সোলাইমান সাহেব। আমার প্রস্তাবে কি রাজি হবেন নাকি ফিরিয়ে দিবে। বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করছে। এই প্রথম আমি নিজ থেকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিলাম। এমন একটা মেয়ের মা ই তো হতে চেয়েছে সে।
চুপচাপ বসে আছে সোলাইমান আচমকা মোবাইলের শব্দে ঘোর কাটে ওনার। রিসিভ করার আগেই মোবাইলের রিংটোন বন্ধ হয়ে গেল।মায়ের নাম্বার থেকে চারটি মিসডকল এসেছে । কথায় বলায় এতো বলা শোনায় এতটাই মগ্ন ছিলো যে খেয়ালই করেনি। সময় দেখে মাথায় হাত। ইনসিয়ার কথার উত্তর না দিয়ে দৌড়ে লাগালেন তিনি।
চলবে,,,
বানান ভুল ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।