হতে পারি বৃষ্টি পর্ব-৩০+৩১

0
679

#হতে_পারি_বৃষ্টি
#মোহনা_মিম
#পর্বঃ৩০

~হতে পারি রোদ্দুর~
~হতে পারি বৃষ্টি~
~হতে পারি রাস্তা~
~তোমারই জন্যে..~

~হতে পারি বদনাম~
~হতে পারি ডাকনাম~
~হতে পারি সত্যি~
~তোমারই জন্যে..~

~হতে পারি গল্প~
~তুমি কাছে টানলে~
~হতে পারি জানলা~
~এ হাওয়া ও তোমার কারনে..~

~শুধু তুমি চাও যদি~
~সাজাবো আবার নদী~
~এসেছি হাজার বারনে~
~শুধু তোমারই জন্যে~
~শুধু তোমারই জন্যে~

বেলকনির রেলিং ধরে আনমনে গান গায়ছে মিমি। তার মন ভীষণ খারাপ। জেসি নামক সমস্যা তাদের জীবনে এসেছে তার এক সপ্তাহ হয়ে গিয়েছে। এই এক সপ্তাহ কাইফ জেসির সাথে ব্যস্ত ছিল। মিমিকে যেন সে দেখেও দেখত না। মিমিও চুপ আছে, কি করবে সে? যেখানে কাইফ এই বিয়েটাই মানে না সেখানে মিমির কিছু করা সাজে না। কাইফ নিজ মুখে না বললেও সে জানে যে কাইফ বিয়েটা মানে না। অজান্তেই মিমির চোখের কোণে পানি জমে। সে তো কাইফের প্রতি দুর্বল! প্রায় চার মাস একসাথে থাকছে। থাকতে থাকতেই মিমির মনে কাইফের জন্য কিছু একটা তৈরি হয়েছে, অদ্ভুত এক অনুভূতি, গা শিরশির করা অনুভূতি। তাহলে কি এই অনুভূতিকে ভালোবাসা বলা যায়? মিমি তা জানে না। মিমি এক দৃষ্টিতে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। সে জানেই না কাইফ তার পাশে দাঁড়িয়ে তাকেই গভীর দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছে। কাইফ হালকা কাশি দিয়ে মিমির দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করল এবং সে সফলও হলো। মিমি হকচকিয়ে দুহাতে চোখের কোণে আসা পানিটুকু মুছে নিল। কাইফ তার দিকে তাকিয়ে থেকেই বলল–

— তুমি কি কোনো ব্যাপারে আপসেট মিমি?

— না তো।

— সেই কখন থেকে আমি তোমার পাশে দাঁড়িয়ে আছি। তুমি টের পেলে না। কি ভাবছ এতো?

— কিছু না।

বলে সে রুমে চলে যেতে নিলে কাইফ তার হাত ধরে আটকে ফেলল। কাইফের ছোঁয়ায় মিমি চোখ বন্ধ হয়ে আসল। কাইফ বলল–

— তুমি আমাকে ইগনোর করছ কেন?

মিমি নিজের হাত থেকে কাইফের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল–

— আমি কে? যে আপনাকে ইগনোর করব? আর আমি ইগনোর করি বা না করি তাতে আপনার কোনো যায় আসে বলে মনে হয় না। আমি নিতান্তই একটা বাইরের লোক। শুধুমাত্র আপনার পিএ। এ ছাড়া কিছুই নয়।

কাইফ শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কথা বলতে গিয়ে মিমির গলা কাঁপছে, গলার স্বর আটকে আসছে। সে ঢোক গিলে বলল–

— এভাবে যখন তখন আমাকে ছোঁবেন না। আমি একটা বাইরের মেয়ে, এভাবে ছোঁয়া আপনার শোভা পায় না। আর রোজ রাতে যে আমাকে সোফা থেকে তুলে নিয়ে আসেন এটা দয়া করে আর করবেন না। সোফা থেকে বিছানায় নিয়ে এসে কি বোঝাতে চান আপনি? আমি সোফাতেই ঠিক আছি। আপনার কোনো জিনিসের ওপর অধিকার নেই আমার।

কাইফ মিমির কথা শুনে মোটেও বিচলিত হলো না। কাইফ যে রোজ রাতে তাকে সোফা থেকে তুলে নিয়ে আসে মিমি কোনো একদিন টের পেয়ে গিয়েছে। মিমির চোখ ভেঙে কান্না আসছে। সে তৎক্ষণাৎ প্রস্থান করল। সোজা ছাদে চলে গেল। সে কাঁদবে খুব কাঁদবে। মিমি চলে গেলেও কাইফের কোনো হেলদোল হলো না। বরং সে ঠোঁট বাঁকিয়ে মুচকি হাসল। সে জানে মিমির মনে কি চলছে। সে তো পুড়ছে অনেক আগে থেকেই পুড়ছে। এখন মিমিও নাহয় একটু পুড়ুক, নিজের মনের কথা বোঝার চেষ্টা করুক। কাইফের মনে প্রশান্তির হাওয়া বয়ে যায়। সে খুব শীঘ্রই মিমির কষ্ট দূর করে দেবে, সেও যে কষ্টে আছে।
———–

এয়ারপোর্টে প্রচুর মানুষের আনাগোনা। কেউ কেউ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে, তাদের বিদায় দিতে এসেছে তাদের পরিবারের লোকজন। সিফাত আজ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। ব্যবসার কিছু কাজে সে তার বাবার পরিবর্তে সেখানে যাচ্ছে। যে ছেলে বাবার অফিসে পা রাখে কি রাখে না ঠিক নেই, সেই ছেলে দেশের বাইরে বাবার কাজে সাহায্য করার জন্য যাচ্ছে! এটা ভেবেই সিফাতের বাবা মা প্রথমে অবাক হয়েছিলেন। সিফাতের মা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন–

— কি হয়েছে বাবা? তুই হঠাৎ দেশের বাইরে যেতে চাচ্ছিস? বল আমাকে তোর কি হয়েছে?

— উফ্ মা! আমার কিছুই হয়নি। বাবা একা কতোদিক সামলাবে বলো তো? আমি এখন থেকে নাহয় একটু কাজে সাহায্য করি।

সিফাতের মা ছেলের কথা তেমন বিশ্বাস করলেন বলে মনে হলো না। তবুও তিনি কিছু বললেন না। ছেলে যখন যেতে চায়ছে, তখন যাক।

মাকে ভুলভাল বুঝিয়ে দিলেও সিফাত নিজে তো জানে যে সে কেন যাচ্ছে। সেদিন রিহা তাকে বলেছিল সে যেন তাকে তার মুখ আর না দেখায়। কিন্তু সিফাতের অবুঝ মন! দেশে থাকলেই শুধু রিহার কাছে যেতে চায়বে, তাকে এক পলক দেখার জন্য ছটফট করবে। এই অবুঝ মনকে সে বোঝাতেই পারে না। তাই তো দেশের বাইরে বাহানা দিয়ে চলে যাচ্ছে। সেখানে যেয়ে ইচ্ছে করলেই তো আর রিহার কাছে আসতে পারবে না। তখন বেশ হবে। রিহাও আর তার মুখ দেখে বিরক্ত হবে না। সিফাত মাঝে মাঝে বুঝতে পারে না এক পিচ্চি মেয়ে তার ওপর কি জাদু করেছে? যে সিফাত ভয়ংকর ভাবে তার মায়ায় জড়িয়ে পড়েছে। ভালোবেসে ফেলেছে পিচ্চি মেয়েটাকে। সে বসে বসে এসবই ভাবছিল। মেঘের কথায় তার ঘোর ভাঙল।

— না গেলে হতো না রে সিফাত?

মেঘ তাকে বিদায় জানাতে এসেছে। সিফাত মানা করেছিল কিন্তু মেঘ শোনেনি। সিফাত শুকনো হেসে বলল–

— না রে। বাবার কাজে একটু সাহায্য করতে হবে। তার তো বয়স হচ্ছে।

মেঘ মুখ গোমড়া করে বলল–

— বাবা হতে চলেছি। ভেবেছিলাম বড় সড় একটা খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করব। কিন্তু তুই তো চলে যাচ্ছিস। আর কিছুই করব না।

সিফাত মেঘকে আলিঙ্গন করে বলল–

— তোকে আবারও কংগ্রাচুলেশান! তুই বাবা হবি আর আমি হবো চাচ্চু। আমি খুব খুশি ইয়ার।

— এই যাচ্ছিস আর আসবি কবে?

সিফাত মেঘকে ছেড়ে দিয়ে বলল–

— জানি না। দেখি কবে আসা যায়।

মেঘ পুনরায় বলল–

— না গেলে হয় না?

সিফাত শুকনো মুখে মাথা ডানে বায়ে নাড়াল। ল্যাগেজ হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল–

— সময় হয়ে গিয়েছে। আমি আসছি। তানিয়া ভাবির খেয়াল রাখিস আর নিজেরও। ভালো থাকিস।

বলে সে সামনের দিকে এগোয়। সিফাতের বুকটা কেমন ভারি হয়ে আসছে, চোখ জ্বলছে। মনে হচ্ছে ইশ্! যদি একটাবার রিহার দেখা পাওয়া যেত! কিন্তু তা হবার নয়। সিফাত চোখ বন্ধ করে লম্বা শ্বাস নেয়। হঠাৎ মনে হলো কেউ তাকে ডাকছে, কিন্তু এটা মেঘ নয়। সিফাতের বুকের মধ্যে ধক করে ওঠে। সে কি ঠিক শুনছে? নাকি ভুল? সে পুনরায় ডাক শুনতে পেল। পিছু ফিরে তাকাল। তৎক্ষণাৎ বুকের ওপর থেকে ভারী পাথর নেমে গেল। চোখ জুড়িয়ে গেল। সিফাতের মনে হচ্ছে সে ভুল দেখছে, চরম ভুল। সে যখন ঠিক ভুল বিবেচনা করতে ব্যস্ত তখন রিহা তার সামনে এসে দাঁড়াল। উন্মাদ লাগছে তাকে, চুল এলোমেলো হয়ে গেছে, চোখে নিচে কালি পড়ে গিয়েছে। সিফাত অবাক চোখে তাকে দেখছে। সিফাত কে আরেকদফা অবাক করে দিয়ে রিহা তার কলার চেপে ধরল। ফলে সিফাত ঈষৎ ঝুকে পড়ল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল–

— কোথায় যাচ্ছেন আপনি? আমাকে এখানে ফেলে রেখে আপনি কোথায় যাচ্ছেন?

বিস্ময়ে হতবাক হয়ে সিফাত কথা বলতে ভুলে গেল। রিহা তার কলার মুঠো করে ধরল। আক্রোশের সাথে ঝাঁকিয়ে বলল–

— কি হলো কথা বলছেন না কেন? কেন চলে যাচ্ছেন আপনি?

আশে পাশের লোক জন তাদের চোখে বড় বড় করে দেখছে। এতে রিহার কোনো যায় আসছে না। সে ঘন ঘন শ্বাস ফেলছে। পেছন থেকে মেঘ হা করে তাদের দেখছে। কি হচ্ছে সব তার মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। সিফাত কাচুমাচু ভঙ্গিতে বলল–

— আমার কলার ছাড়ো রিহা। সবাই দেখছে।

রিহা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বলল–

— না ছাড়ব না। আপনি আমার কথার জবাব দিন। কেন চলে যাচ্ছেন আপনি? বলুন?

পরক্ষনেই সে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। ধীরে ধীরে সিফাতের কলার থেকে হাত সরিয়ে নেয়। সে আজ তানিয়ার সাথে কথা বলার সময়, কথায় কথায় তানিয়া সিফাতের দেশের বাইরে যাবার কথাটা বলে। কথা টা শুনেই রিহার বুকের মধ্যে জ্বালাপোড়া শুরু হয়। সেদিন সে রাগের বশে সিফাতকে অনেক কথা বলেছিল। কিন্তু সে এখন বুঝতে পারে তার হৃদয়ের বিরাট অংশ জুড়ে সিফাতের বাস। সে তৎক্ষণাৎ যে অবস্থায় ছিল সে অবস্থায় এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্য রওনা দেয়। রিহা কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল–

— চলে যান আপনি। চলে যান। আপনি তো আমাকে একটুও ভালোবাসেন না। সেদিন রাগের বসে কি না কি বলেছি, তাই আপনি চলে যাচ্ছেন। আমি জানি। তো দাঁড়িয়ে আছেন কেন? চলে যান।

সিফাত হতভম্ব। কি বলছে রিহা? কেন বলছে? তবে কি তার মনেও কিছু আছে? রিহার চোখের পানি দেখে তার অদ্ভুত কষ্ট হচ্ছে। সে ঢোক গিলে বলল–

— রিহা আমার কথাটা শোনো। কেঁদো না।

— না! আমি আপনার কোনো কথা শুনব না। চলে যান। আমি কাঁদতে কাঁদতে মরে যাব। তাতে আপনার কি?

সিফাতের মাথায় ধপ করে আগুন জ্বলে উঠলো। সে ধমকে উঠল–

— রিহা!

রিহা কিঞ্চিত কেঁপে উঠল। তবুও কান্না থামায় না। সে পিছু ফিরে চলে যেতে নিলেই সিফাত তার হাত চেপে ধরে। রিহা হাত মুচড়িয়ে বলল–

— ছাড়ুন। ছাড়ুন বলছি।

সিফাত ছাড়ে না। হেঁচকা টান দিয়ে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে শক্ত করে। তার হৃদয় শীতল হয়। সকল কষ্ট নিমেষেই দূর হয়। সিফাতের উষ্ণতা পেয়ে রিহা শব্দ করে কাঁদে। সিফাতের চোখের কোণে জল জমে। বেশ কিছুক্ষণ পর রিহা শান্ত হয়ে আসে। সিফাত তাকে ছেড়ে দিয়ে চোখের জল মুছে দিয়ে বলল–

— পিচ্চি মানুষ এভাবে কান্না কাটি করলে কি আর যাওয়া যায় বলো? আমার তো ফ্লাইট মিস হয়ে গেল।

রিহা চোখ রাঙিয়ে তাকাল। সিফাত মৃদু হাসে। মেঘ এতক্ষণ দূরে দাঁড়িয়ে এসব দেখেছিল এখন সে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল–

— এখানে কি হচ্ছে? আমাকে কি কেউ বলবে?

সিফাত এক হাতে ল্যাগেজ আর এক হাতে রিহার হাত মুঠোয় নিয়ে বলল–

— চল তোকে যেতে যেতে সব বলছি।

বলে সে এগোয়। মেঘ ও তাদের পিছু পিছু যায়। সে বুঝতে পারছে না, রিহা এসে এমন আচরণ করল কেন? আর সিফাতই বা চলে যাওয়া ক্যানসেল করল কেন?

চলবে?
{ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন, ধন্যবাদ}

#হতে_পারি_বৃষ্টি
#মোহনা_মিম
#পর্বঃ৩১

আজ কাইফ সবাইকে ডেকেছে। কোনো জরুরি কথা বলবে নাকি। সকলে হল রুমে জড় হয়েছে। সবাই উৎসুক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মিমি এক কোনায় দাঁড়িয়ে আছে। তার মধ্যে কোনো উৎসাহ কাজ করছে না। শুধুমাত্র বুকের মধ্যে চিন চিন ব্যথা করছে। সঙ্গে প্রচুর রাগ হচ্ছে, কারন এজ ইউজুয়াল জেসি কাইফের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। জেসি সেই কবে যে টপকেছে এখনও তার যাবার নাম নেই। সারাজীবনের জন্য থেকে গেল নাকি? থেকে গেলেই বা তার কি? কদিন পর তো কাইফের সাথে তার বিচ্ছেদ হয়েই যাবে। মিমির বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। তার ভাবনার মাঝেই কাইফ বলতে শুরু করল–

— লেডিস এ্যান্ড জেন্টেলম্যান! আপনারা শুনে খুশি হবেন যে, বিরাট এমাউন্টের প্রোজেক্ট টা আমাদের সফল হয়েছে। ভালো ভাবেই তার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আপনাদের সাহায্য এবং পরিশ্রম ছাড়া এটা কখনও সম্ভব ছিল না। আমি মন থেকে আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

করতালিতে মুখরিত হয়ে উঠল হলরুম। সকলে বেশ আনন্দিত। তবে মিমি পূর্বের ন্যায় ভাবলেশহীন। কাইফ হাত উঁচিয়ে সবাইকে শান্ত হতে ইশারা করল। পুনরায় বলল–

— আমাদের এই সাকসেস উপলক্ষে একটা পার্টির আয়োজন করা হয়েছে। আগামীকাল *** হোটেলের রুফ টপে এই পার্টি অনুষ্ঠিত হবে। আশা করি আপনারা সবাই এনজয় করবেন। এ্যান্ড ড্রেস কোড ইজ ব্লাক। আমার কথা আমি এখানেই শেষ করছি। ধন্যবাদ সকলকে।

কাইফ চলে গেল। তার পিছু পিছু গেল জেসি। সকলে ধীরে ধীরে হলরুম ত্যাগ করল। মিমিও নিজের ডেস্কে গিয়ে বসল। বসতেই আদিল টপকে পড়ল।

— আরে মিমি! শুনেছ তো যে পার্টি হবে?

— জ্বি স্যার।

— আমি খুবই এক্সাইটেড! তোমার আনন্দ হচ্ছে না?

মিমি কি বলবে? তার একদমই কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। সে জোর পূর্বক হেসে বলল–

— জ্বি স্যার।

— কাল ঠিক সময়ে চলে আসবে কেমন? আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করব।

মিমি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিল। আদিল চলে গেল। মিমি হাফ ছেড়ে বাঁচল। মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলেও মিমি মনে মনে ঠিক করে নিল সে কিছুতেই পার্টিতে যাবে না। কাইফের সাথে জেসির ঘেঁষাঘেঁষি তার পছন্দ হয় না। হৃদয় পোড়ে।
———–

— আচ্ছা মিমু? তুই বাবুর খালামনি হবি নাকি চাচিমনি?

মিমি উদাস মনে বসে ছিল তানিয়ার কাছে। তানিয়া কনসিভ করার পর থেকে টক জাতীয় খাবার খুব খাচ্ছে। এখন সে বসে বসে জলপাইয়ের আচার খাচ্ছে। খেতে খেতে সে মিমিকে প্রশ্নটা করল। মিমি তানিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল–

— কেন? খালামনি হবো।

— তুই আমার বান্ধবী এই দিন থেকে ঠিক আছে। তবে আরেক দিক থেকে তুই আমার জা হোস, তাহলে তো চাচিমনিই হবি তাই না?

মিমি মনে মনে তাচ্ছিল্য হাসে। আর জা! আর কতদিন বা থাকবে এই সম্পর্ক? যে সম্পর্কের কোনো মজবুত ভিত-ই নেই, সে সম্পর্ক টিকবে কি করে? তানিয়া মিমিকে অন্যমনষ্ক হতে দেখে তার বাহুতে মৃদু থাপ্পড় দিয়ে বলল–

— কি রে? কোথায় হারিয়ে গেলি?

মিমি ভাবনার জগৎ থেকে বের হয়ে ঠোঁটে হাসির রেখা টেনে বলল–

— কোথাও না। আগে বাবু আসুক তারপর দেখা যাবে যে কাকে কি বলবে। তুই এখন থেকেই এসব চিন্তা করে মাথা খারাপ করিস না তো। তুই আচার খা।

তানিয়া আচার মুখে দিয়ে পুনরায় বলল–

— মিমু! শুনেছি আজ অফিসে পার্টি আছে। মেঘ বলল। আমি যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু মেঘ আমাকে কি বলল জানিস? বলল “তুমি এখন অসুস্থ। তোমার কোথাও যেতে হবে না। কিছু একটা হয়ে গেলে? তখন কি হবে? সো আমিও যাচ্ছি না আর তুমিও যাচ্ছ না। ফাইনাল।”

তানিয়া মেঘের মতো করে মেঘকে নকল করে কথা গুলো বলল। তানিয়ার বলার ধরন দেখে মিমি হেসে ফেলল। তানিয়া আবার বলল–

— এসব ভালো লাগে বল তো মিমু? এমনটা ভাব করছে যেন আমি আট ন মাসে পড়েছি।

মিমি শব্দ করে হাসে। হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে। তানিয়া মুখ গোমড়া করে থাকলেও মনে মনে মিমিকে হাসতে দেখে খুশি হয়। অনেক দিন মিমি এভাবে প্রাণখোলা হাসি হাসে না। মিমি এড়িয়ে গেলেও তানিয়া ঠিক বুঝেছে কাইফের সাথে মিমির সম্পর্কটা ঠিক যাচ্ছে না। মিমি হাসি থামিয়ে বলল–

— জিজু তোকে অনেক ভালোবাসে রে তানি। তাই তো তোকে নিয়ে এত্ত চিন্তা করে।

তানিয়া প্রসঙ্গ পাল্টে বলল–

— বাদ দে এসব কথা। তুই পার্টিতে যাচ্ছিস তো?

মিমির মুখের হাসি চলে গেল। সে শুকনো গলায় বলল–

— না তানি। আমি যাচ্ছি না।

— ওমা! কেন?

— এমনি।

— এমন কোনো কথা হলো? তুই যাবি মিমু।

— ইচ্ছে করছে না তানি।

— তুই যাবি মানে যাবিই ব্যস। আমি অসুস্থ মানুষ তোর কাছে এই একটাই তো জিনিস চাইছি। তুই আমার কথা শুনবি না? তুই আমাকে ভালোবাসিস না রে মিমু। তুই অনেক চেঞ্জ হয়ে গিয়েছিস।

বলে তানিয়া কাঁদার একটা ভান করল। তার এই অভিনয় খুব ভালো করে কাজে লাগল। মিমি হার মেনে বলল–

— তোর ইমোশনাল ড্রামা কখনও বন্ধ হবে না রে তানি? এসব ভাজুং ভুজুং শুনিয়ে আমাকে রাজি করাতে এক্সপার্ট তুই। আচ্ছা আমি তোর কথা মেনে নিলাম, যাব আমি।

তানিয়া এক মুহুর্তের জন্য আনন্দে লাফিয়ে উঠল। মিমি আঁতকে উঠে বলল–

— কি করছিস? বুদ্ধি শুদ্ধি সব গিয়েছে নাকি? এই অবস্থায় এসব লাফালাফি ঝাঁপাঝাঁপি একদম করবি না।

— ওকে মেরি জান। দাঁড়া, আমার কাছে তোর জন্য একটা জিনিস আছে।

তানিয়া ওয়াড্রব থেকে একটা কালো রঙের শাড়ি বের করে মিমির হাতে দিল। প্রফুল্ল কন্ঠে বলল–

— এই দেখ শাড়িটা! কি সুন্দর বল? আর কত্ত সফট্। তুই এটা পরে পার্টিতে যাস। তোকে দারুন লাগবে।

মিমি চোখ কপালে তুলে বলল–

— শাড়ি! আমি পার্টিতে শাড়ি পরে যাব? তাছাড়া এটা তো তোর শাড়ি।

— আরে তাতে কি? কেউ পার্টিতে শাড়ি পরে যায় না নাকি তুই শাড়ি পরে যাবি এবং আমি তোকে সাজিয়ে দেব।

— কিন্তু তানি!

— কোনো কিন্তু নয়। আমি যা বলেছি তাই-ই ফাইনাল।

বরাবরের মতো আবারও মিমিকে হার মানতে হলো।
———

রিকশা এসে থামলো *** হোটেলের সামনে। এই হোটেলটির উচ্চতা দশ তলা। এরই ছাদে পার্টির আয়োজন করা হয়েছে। মিমি রিকশার ভাড়া মিটিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। দশতলা বিল্ডিং এর ছাদে সিড়ি বেয়ে উঠতে গেলে মিমি নির্ঘাত পটল তুলবে। তাকে লিফট দিয়েই যেতে হবে। মিমি লিফটে প্রবেশ করে প্রয়োজনীয় বাটন প্রেস করল। তানিয়া তাকে শাড়ি পরানো থেকে শুরু করে সব করেছে। তাকে আবার হালকা মেকআপও করিয়ে দিয়েছে। চোখে দিয়েছে কাজল আর ঠোঁটে দিয়েছে লাল লিপস্টিক। মিমি চুলটা খোঁপা করতে চেয়েছিল কিন্তু তানিয়া শোনেনি, সে সুন্দর করে চুল আচড়িয়ে ছেড়ে দিয়ে রেখেছে। মিমি কিছু বলতে নিলেই শুরু হয়ে যাবে তার ইমোশনাল ড্রামা। তানিয়ার কথা ভেবে মিমি মুচকি হাসে। লিফট এসে থামলে মিমি নেমে পড়ে।

লোক জনের সংখ্যা দেখে মনে হলো সেই একমাত্র বাকি ছিল। বাদ বাকি সবাই এসে পড়েছে। ছাদ খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে, বিশাল বড় ছাদ পুরোটা লাইটিং করা। আবার বড় সড় একটা স্টেজও করা হয়েছে। মিমির নিজেকে কেমন যেন বেমানান লাগল। সবাই আধুনিক সব জামা কাপড় পড়ে এসেছে, যেমন গাউন, টপস্, ইত্যাদি। মিমিই একমাত্র শাড়ি পরে এসেছে। সে এক কোণে গিয়ে দাঁড়াল। কাইফ তার থেকে দূরে কিছু লোকের সাথে কথা বলছে এবং তার গায়ের সাথে লেপ্টে আছে জেসি। জেসি স্লিভ লেস একটা গাউন পরেছে। যার পিঠের দিক থেকে একদম খোলা। মিমির কাছে বরাবরের মতই তাকে অশ্লীল লাগল। কাইফ সম্পূর্ণ ব্লাক পরেছে, মিমির কাছে তাকে বড় আকর্ষণীয় লাগছে। কাইফের বলিষ্ঠ দেহে কালো রংটা যেন একটু বেশিই মানায়। মিমি যখন এক দৃষ্টিতে কাইফকে দেখে যাচ্ছিল তখন আকস্মিক কাইফও তার দিকে তাকাল। দুজনের চোখাচোখি হলো। মিমি তৎক্ষণাৎ তার দৃষ্টি সরিয়ে নিল। তবে কাইফ সরাল না। সে এক ঘোরের মধ্যে পড়ে গেল, তার দৃষ্টি সরানো দায় হয়ে পড়ল। মিমি এই প্রথম কালো শাড়ি পরেছে। কাইফ ভাবতেও পারেনি কালো শাড়িতে তাকে এতোটা সুন্দর লাগবে। তার চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। জেসির ডাকে সে ঘোর থেকে বেরিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিল।

— হেই মিমি!

মিমি আদিলের ডাকে তার দিকে তাকায়। জোর পূর্বক হেসে বলল–

— জ্বি স্যার?

— তুমি এতো দেরি করলে কেন? জানো? আমি তোমার অপেক্ষা করছিলাম।

মিমি কি বলবে? সে কিছুই বলল না। শুধু হাসল। আদিল আবারও বলল–

— আজ তোমাকে সুন্দর লাগছে। সবার থেকে আলাদা।

— আপনাকেও হ্যান্ডসাম লাগছে স্যার। কিন্তু আমাকে বড্ড বেমানান লাগছে। আমিই একমাত্র শাড়ি পরে এসেছি।

— আরে কি যে বলো না! এর জন্যই তোমাকে সবার থেকে আলাদা লাগছে। স্পেশাল! এখানে একা একা দাঁড়িয়ে আছ কেন?

— এমনিই স্যার।

আদিল আরও কিছু বলতে যাবে তার আগেই একটা ডান্সের ঘোষণা হলো। পার্টনার চেঞ্জ ডান্স। কয়েক স্টেপ পর পর পার্টনার চেঞ্জ করতে হবে। আদিল সেটা শুনে মিমির সামনে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল–

— উইল ইউ ডান্স উইথ মি?

মিমির নাচের একদমই ইচ্ছে নেই। সে বারন করতে যাবে তার আগেই দেখল জেসি কাইফকে ঠেলে স্টেজে নিয়ে গেল। মিমির জেদ হলো। সে মুখে হাসি ফুটিয়ে আদিলের হাত হাত রেখে বলল–

— অফ কোর্স।

তারা স্টেজে উঠল। ভুলবশত কাইফের পাশেই মিমি দাঁড়িয়েছে। সকলে গোল হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিমি কাইফের দিকে তাকিয়ে দেখল, কাইফ তার দিকে চোয়াল শক্ত করে তীক্ষ্ণ কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মিমির কেমন যেন ভালো লাগল। সে কাইফের কঠিন দৃষ্টিকে পাত্তা না দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল। এতে কাইফের রাগ সপ্তম আসমানে উঠল। কাইফ পারে না আদিলকে মেরে গুম করে দিতে। সে ছাড়া অন্য কেউ মিমিকে স্পর্শ করছে ভাবতেই কাইফের মাথায় রাগ টগবগিয়ে ফুটছে। মিমি কেন অন্য কারো সাথে নাচবে? সে নিজেও যে অন্য কারো হাত ধরে আছে সেটা কাইফের চোখে পড়ছে না, শুধু চোখে কাঁটার মতো ফুটছে আদিলের ধরে রাখা মিমির হাত।

চলবে?
{ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন, ধন্যবাদ। }