হতে পারি বৃষ্টি পর্ব-৩২+৩৩

0
673

#হতে_পারি_বৃষ্টি
#মোহনা_মিম
#পর্বঃ৩২

নাচ শুরু হয়েছে। উচ্চ শব্দে গান বাজছে। যে যার পার্টনারের সাথে নাচছে। স্পট লাইট তাক করে আছে তাদের দিকে। কাইফ নাচছে কি নাচছে না ঠিক নেই, শুধু তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আছে মিমির ওপর।

~তেরি মেরি গাল্লা হোগি মাশহুর~
~কার না কাভি তু মুঝে নাজরো সে দূর~
~কিত্থে চালিয়ে তু কিত্থে চালিয়ে তু~
~কিত্থে চালিয়ে..~

প্রথম স্টেপ শেষে পার্টনার চেঞ্জ হয়ে গেল। দুর্ভাগ্য বসত মিমি ঘুরে এসে কাইফের কাছে পড়ল। এক হাতে মিমির হাত আর এক হাতে মিমির কোমর চেপে ধরে কাইফ বাঁকা হাসে। মুহূর্তেই মিমির মুখ রক্তশূন্য হয়ে যায়। গলা শুকিয়ে আসে, যেমনটা বাঘের সামনে পড়লে হরিণের অবস্থা হয়। মিমি যে পালিয়ে যাবে তারও পথ নেই। কাইফ যে রেগে আছে তা সে খুব ভালো করেই মিমিকে বুঝিয়ে দিচ্ছে। তার নখ গেঁথে দিচ্ছে মিমির কোমরে। মিমি চোখ বন্ধ করে ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠে। দ্বিতীয় স্টেপ শেষ হতেই কাইফ ইচ্ছে করে মিমিকে নিয়ে লাইন ক্রস করল। সে চায় না মিমিকে আর কেউ স্পর্শ করুক। মিমিকে টেনে নিয়ে ফাঁকা জায়গায় চলে গেল। হাত ছেড়ে দিল। মিমি নিঃশ্বাস ফেলল কি ফেলল না, সাথে সাথে কাইফ তাকে দেওয়ালে চেপে ধরল। মিমির দম বন্ধ হয়ে এলো। কাইফের ক্রুদ্ধ শ্বাস তার মুখশ্রীতে আছড়ে পড়ছে। শক্ত করে চেপে ধরল তার বাহু। মিমির জোরে শ্বাস ফেলে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল–

— ক কি করছেন ম মিস্টার খান?

কাইফ রাগী কন্ঠে বলল–

— তোমাকে অনেক বার বলেছি না আদিলের থেকে দূরে থাকতে? তাও সেই আদিল? ওর সাথে কেন ডান্স করতে গিয়েছিলে?

মিমি যেন হুট করেই রেগে গেল। কাইফ যে অন্য একটা মেয়ের সাথে ডান্স করছিল এতে কিছু হয় না, আর সে করলেই দোষ? মিমি শক্ত কন্ঠে বলল–

— আমি যার সাথে খুশি নাচব। যা খুশি তাই করব। আপনার কি?

কাইফ চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস ফেলে। তবু তার রাগ কমে না। সে যথেষ্ট শান্ত স্বরে বলল–

— আমাকে রাগিও না মিমি। রাগানোর ফল কিন্তু মোটেও ভালো হবে না।

মিমি কাইফের বুকে হাত রেখে মৃদু ধাক্কা দিল। এতে কাইফকে নাড়াতে প্রর্যন্ত পারল না, সরানো তো দূরের কথা। সে মৃদু চেঁচিয়ে বলল–

— আমি একশো বার নাচব। ইচ্ছে হলে আদিল স্যারের সাথে লেপ্টে থাকব। আপনিও তো ওই জেসি ন্যাকার সাথে নাচছিলেন তাতে কিছু হচ্ছিল না? ছাড়ুন আমাকে আমি আদিল স্যারের সাথে নাচব।

গান চলার কারনে তাদের কথা কেউ শুনছে না আর না তাদের দেখছে। মিমি রাগে দুঃখে কি বলছে তা হয়তো সে নিজেও জানে না। কিন্তু এর ফলে কাইফ ভয়ংকর ভাবে রেগে গেল। তার ফর্সা মুখ রক্তিম আভা ধারণ করল। সে হিসহিসিয়ে বলল–

— তোমাকে আগেই ওয়ার্ন করেছিলাম কিন্তু তুমি শুনলে না। এখন আমার সাথেই তোমাকে লেপ্টে থাকতে হবে।

বলে সে মিমিকে টেনে স্টেজে নিয়ে গেল। মিমি ছাড়াতে চেয়েও পারল না। ইতোমধ্যে যেখানে নাচের সমাপ্তি ঘটেছে। দুজনে স্টেজে দাঁড়াতেই সাউন্ড বক্সে গান চালু হলো। কাইফ হেঁচকা টানে মিমিকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে আসলো। তার এক হাত মিমির কোমরের উন্মুক্ত অংশ স্পর্শ করল। কাইফের বলিষ্ঠ হাতের শীতল স্পর্শে মিমি শিউরে উঠল। বুকের মধ্যে ধড়াস করে উঠল। সে কাইফের দিকে করুন দৃষ্টি নিক্ষেপ করল, যার অর্থ ‘ছেড়ে দিন আমায়, আপনার এমন স্পর্শ সহ্য করতে পারছি না আমি’। কাইফ তাকে ছাড়ে না। মিমি নাচছে না, এই প্রথম কাইফের বেপরোয়া স্পর্শ পেয়ে তার হাত পা অবশ হয়ে গিয়েছে। কাইফ তাকে নাচাচ্ছে, মিমি পুতুলের ন্যায় কাইফ যা করছে তা দেখে যাচ্ছে। কাইফ থেকে একটু সরে যাওয়া চেষ্টা করলেই, সে আরও নিজের কাছে টেনে নিচ্ছে।

~দেখা হাজারো দাফা আপকো
ফির বেকারারি ক্যাসি হে~
~সামহালে সামহালতা নেহি এ দিল
কুছ আপমে বাত অ্যাসি হে~

~লেকার ইজাজাত আব আপসে
সাসে এ আতি যাতি হে~
~ঢুনডে সে মিলতি নেহি হে হাম
বাস আপ হি আপ বাকি হে~

তাদের নাচ দেখে সকলে হাত তালি দিচ্ছে। তবে এক কোণে দাঁড়িয়ে রাগে ফুঁসছে জেসি। প্রথম দিন থেকেই মিমিকে তার পছন্দ নয়। কাইফ মিমির সাথে নাচছে এটা দেখে তার ইচ্ছে করছে মিমিকে কিছু একটা করে ফেলতে। সে মিমিকে ছাড়বে না। চরম অপমানিত করে তবেই ছাড়বে। কীভাবে কি করতে হবে তা নিজের মাথায় সাজিয়ে নিল সে। অতঃপর শয়তানি হাসি হাসল।

গান শেষ, নাচ শেষ। স্টেজে দাঁড়িয়ে দুজন দুজনের চোখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। যেন কোনো সম্মোহিত হয়েছে তারা। করতালির শব্দের হুশ ফিরল তাদের। মিমি ছিটকে দূরে সরে গেল। দৌড়ে স্টেজ থেকে নেমে এক কোণে গিয়ে দাঁড়াল। বুকের মধ্যে কম্পন হচ্ছে। কাইফের স্পর্শের কথা মনে পড়তেই তার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে। কেমন লজ্জা লাগছে! ইশ্ কোথায় মুখ লুকাবে সে? কাইফ মিমির দিকে এক পলক তাকিয়ে অন্যদের সাথে কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

— ম্যাম!

ওয়েটারের ডাকে মিমি তার দিকে তাকাল। প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল–

— জ্বি? আমাকে বলছেন?

— জ্বি ম্যাম। ডান্স করে নিশ্চয়ই আপনার কষ্ট হয়ে গিয়েছে? এই জুসটা আপনার জন্য।

সত্যিই মিমির গলা শুকিয়ে গিয়েছে। জুসটা নিয়ে নিলে মন্দ হয় না। সে কোনো কিছু না ভেবেই জুসের গ্লাস হাতে নিয়ে বলল–

— থ্যাঙ্ক ইউ। আমার এটার খুব প্রয়োজন ছিল।

ওয়েটার মুচকি হেসে চলে গেল। মিমি এক চুমুকে সবটা শেষ করল। তার যেন কেমন লাগল, কিন্তু জুসটা ভালো ছিল। মিমির মাথাটা কেমন ভারি হয়ে এলো। চোখে ঝাপসা দেখতে লাগল। আড়াল থেকে জেসি বাঁকা হাসল। সে জুসের মধ্যে এলকোহল মিশিয়ে দিয়েছে। যে ব্যক্তি প্রথম বার খাবে সে চরম লেভেলের মাতাল হয়ে যাবে। এবার নিশ্চয় মিমি অপমানিত হবে।

মিমি মনে হলো এই জায়গা তার ভালো লাগছে না। এতো লোক জন তার একদমই পছন্দ হচ্ছে না। সে হেলতে দুলতে লিফটের মধ্যে ঢুকে গেল। তা দেখে জেসি মেঝেতে পা দিয়ে আঘাত করে বলল–

— শিট! চলে যাচ্ছে কেন? এখন আমার প্লান সাকসেসফুল হবে না। শিট!
———

কাইফ এতক্ষণ ব্যস্ত থাকায় সে মিমির দিকে খেয়াল করতে পারেনি। হঠাৎ দেখল মিমি নেই, কোথাও নেই। কাইফ ভয় পেয়ে গেল, কোথায় গেল মিমি? সে তাদের থেকে বিদায় নিয়ে আশে পাশে ভালো করে দেখল। কিন্তু মিমি নেই।‌ কাইফ চিন্তায় পড়ে গেল। সে তাদের থেকে বিদায় নিয়ে মিমিকে খুঁজতে বের হলো।

মিমি হোটেলের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এখানে তেমন লোক জন নেই। মিমি যেন কেমন কেমন লাগছে। মনে হচ্ছে সে ছোট হয়ে গিয়েছে। মিমি হুট করেই খিলখিল করে হেসে উঠলো। আশ্চর্য জনক ভাবে তার অকারণে হাসতে খুব ভালো লাগছে। সে গোল গোল করে ঘোরা শুরু করল। তার খুব ভালো লাগছে। দুই এক জন মানুষ যাতায়াতের পথে তার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। আবার কেউ কেউ মুখ চেপে হাসছে মিমির পাগলামি দেখে। মিমির সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। সে মাতাল কন্ঠে গলা ছেড়ে গাওয়া শুরু করল–

~আজ ম্যা উপার~
~আসমা নিচে~
~আজ ম্যা আগে~
~জামানা হে পিছে~

নিচে এসে মিমিকে এমন করতে দেখে কাইফ হতবাক। মিমি এমন করছে কেন? সে এগিয়ে গিয়ে মিমির হাত চেপে ধরল। মিমি ভ্রু কুঁচকে কাইফের দিকে তাকাল। কাইফকে দেখতেই সে পুনরায় খিলখিল করে হেসে উঠলো। কাইফ ভ্রু কুঁচকে বলল–

— হাসছ কেন? এমন করছ কেন? লোকে পাগল বলবে তোমায়।

মিমি মাতাল কন্ঠে বাচ্চাদের মতো করে বলল–

— জানেন? আমার খুব ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে আমি উড়তে পারব। আর জানেন সব দুটো দুটো দেখছি। এই যে আপনি দুটো, এই একটা আর এই একটা।

মিমি আঙুল দিয়ে কাইফের দু পাশে দেখিয়ে দেয়। কাইফ চোখ কপালে তুলে বলল–

— মিমি! কি খেয়েছ তুমি? ড্রিঙ্ক করেছ?

মিমি হেসে দুপাশে মাথা নাড়িয়ে বলল–

— না তো। আমি জুস খেয়েছি। কত মজা ছিল জানেন? চলুন না? আমি আরও খাবো।

— নাহ! আর খেতে হবে না। চলো, বাড়িতে যাবে চলো।

মিমি মুখ কুঁচকে বলল–

— ছেড়ে দিন। যাবো না। আমি কিন্তু চেঁচাব। কিডন্যাপার! বাঁচাও বাঁচাও!

কাইফ মিমির মুখ চেপে ধরে বলল–

— আমি তোমাকে কিডন্যাপ করলাম কখন?

মিমি কাইফের বুকে মাথা ঠেকাল। কাইফ থমকে গেল। মিমি বলল–

— আপনি জানেন আপনি কত খারাপ! আমাকে কষ্ট দেন শুধু। ওই জেসিকে আপনার সাথে দেখলে রাগ হয় আমার। ইচ্ছে করে ওর চুল টেনে ছিঁড়ে দিই। আর কষ্টও লাগে, তাও আপনি ওর সাথে থাকেন। কিচ্ছু বোঝেন না আপনি। কিচ্ছু না। খুব পঁচা আপনি। বদ লোক আপনি!

কাইফ মিমিকে নিজের বুক থেকে উঠিয়ে দেখে সে ঠোঁট উল্টে তাকিয়ে আছে। কাইফ বলল–

— হ্যাঁ। আমি তো খারাপ। আর তোমার ওই আদিল স্যার খুব ভালো তাই না?

মিমি মোচড়াতে মোচড়াতে বলল–

— তাই তো। আদিল স্যার খুব ভালো। আমি আদিল স্যারের কাছে যাব। ছাড়ুন আমাকে।

কাইফের রাগ হলেও সে শান্ত থাকে। সে জানে মিমি এখন হুশে নেই। সে গম্ভীর কণ্ঠে বলল–

— মিমি! তুমি কি ভালোই ভালোই আমার সাথে যাবে নাকি আমাকে অন্য পদক্ষেপ নিতে হবে?

মিমি জেদ ধরে বলল–

— আমি যাবো না, যাবো না। মানে আমি কিছুতেই যাবো না। বুঝেছেন আপনি?

মিমির বলা শেষ আর কাইফের তাকে কোলে তোলাও শেষ। মিমি চেঁচিয়ে বলল–

— এই! আমাকে কোলে নিলেন কেন? নামান আমাকে। কেউ বাঁচাও আমাকে।

মিমির চেঁচানো শুনে কয়েকজন লোক এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল–

— এখানে কি হচ্ছে ভাই? আপনি কি জোর করে ওনাকে কোথাও নিয়ে যাচ্ছেন? এই পুলিশ ডাকো তোমরা।

কাইফ তাদের বুঝিয়ে বলল–

— আপনারা আমাকে ভুল ভাবছেন। এই মেয়েটি আমার স্ত্রী। ও ভুল করে ড্রিঙ্ক করে ফেলেছে। কোনো কথা শুনছে না, তাই বাধ্য হয়েই..

কাইফকে আর কিছু বলতে হলো না। তারা বুঝে নিল। লোকটা হেসে বলল–

— আচ্ছা নিয়ে যান। বউ কথা না শুনলে এমন পদ্ধতিই প্রয়োগ করা উচিত।

কাইফ ও বিনিময়ে হেসে তাদের ধন্যবাদ জানাল। তারা চলে গেল। মিমি চেঁচিয়ে বলল–

— আরে! কোথায় যাচ্ছেন? বাঁচান আমাকে।

কাইফ তাকে ধমকে উঠে বলল–

— মুখ দিয়ে যদি আর একটা কথা বলেছ, তাহলে ঠাস করে নিচে ফেলে দেব।

কথায় কাজ হলো। মিমি কাইফের গলা জড়িয়ে ধরে চুপ করে থাকল। কাইফ তাকে গাড়ির কাছে এসে নামিয়ে দিল। তার হাত ধরে জোর করে গাড়িতে বসিয়ে, নিজেও বসে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বাড়ির দিকে অগ্রসর হলো।

চলবে?

#হতে_পারি_বৃষ্টি
#মোহনা_মিম
#পর্বঃ৩৩

শা শা করে গাড়ি এগিয়ে চলেছে। কাইফ কিছুতেই শান্ত ভাবে ড্রাইভ করতে পারছে না। মিমি চুপ করে বসে নেই। সে এক প্রকার লাফালাফি করছে গাড়ির মধ্যে। কাইফ মহা বিরক্ত। মিমি গাড়ির দরজা ধরে টানতে টানতে বলল —

— খুলে যা সিমসিম! খুলে যা না?

কিন্তু গাড়ির দরজা খুললো না। মিমি হতাশার শ্বাস ফেলে বলল–

— দরজাটা খুলছে না কেন? আমি বাইরে যাব। এই খান! মিস্টার খান! দরজা টা খুলে দিন না?

কাইফ কোনো কথা বলে না। মিমি কাইফের হাত ধরে টানাটানি শুরু করল।

— এই! আপনি শুনতে পাচ্ছেন না? দরজা টা খুলে দিতে বলছি তো।

কাইফ গাড়ির ব্রেক কষে। আর একটু হলে এক্সিডেন্ট হয়ে যেত। সে মিমির দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে বলল–

— কি হচ্ছে কি মিমি? গাড়ি চালানোর সময় কেউ এমন করে? এক্সিডেন্ট হয়ে গেলে তখন?

মিমি ঠোঁট উল্টে ছলছল দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায়। কাইফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মিমি তো হুশেই নেই, কাইফের কোনো কথা এখন সে বুঝবে না। কাইফ নিজের সিট বেল্ট খুলে তার হাত ধরে হেঁচকা টান দিয়ে নিজের কোলে বসায়। মিমি ড্যাব ড্যাব করে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। কাইফ সিট বেল্ট দিয়ে মিমিকে নিজের সাথে আটকে নিল। মিমি চেঁচিয়ে উঠল–

— এই! আপনি আমাকে বেঁধে রাখছেন কেন? ছাড়ুন আমাকে।

কাইফ তার ঠোঁটে আঙুল রেখে বলল–

— চুপ! কোনো কথা নয়। এখানে মাথা রাখো। একটা ম্যাজিক সাউন্ড শুনতে পাবে।

নিজের বুকের বা পাশ আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় তাকে। মিমি তার কথা মতো কাইফের বুকে মাথা রাখে। কাইফের কথা মতোই সে শুনতে পায় ধক ধক শব্দ। মিমি মন দিয়ে তা শুনে যাচ্ছে। সে লেপ্টে রয়েছে কাইফের সাথে। কাইফ মুচকি হেসে গাড়ি স্টার্ট দিল।

বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামালো কাইফ। মিমিকে কোলে নিয়েই বহু কষ্টে গাড়ি থেকে নামল। এগিয়ে গেল বাড়ির দিকে। দুহাত বন্ধ। কলিং বেল বাজাবে কি করে? সে মিমিকে বলল–

— মিমি! কলিং বেল বাজাও তো।

মিমি মুখ তুলে তাকিয়ে মাথা দু পাশে নাড়ায়। যার অর্থ সে কলিং বেল বাজাবে না। কাইফ ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে বলল–

— বাজাও। ভেতরে তোমার জন্য একটা জিনিস আছে।

মিমি হেসে বলল–

— সত্যি?

— হ্যাঁ।

মিমি কলিং বেল বাজালো। কাইফ সহ সকলের কানের বারোটা বাজিয়ে সে অনবরত বাজাতেই থাকলো। কাইফ অতিষ্ঠ হয়ে বলল–

— কি হচ্ছে? থামো।

মিমি থামে না। অনবরত কলিং বেল বাজানোর পেছনে অন্য রকম একটা মজা আছে। এক পর্যায়ে তানিয়া দরজা খুলে দিল। দরজা খুলেই তার চোখ কপালে। সে গোল গোল চোখে তাকিয়ে বলল–

— কি হয়েছে ভাইয়া? বার বার কলিং বেল বাজাচ্ছেন কেন? আর মিমুর কি হয়েছে?

কাইফ ভেতরে প্রবেশ করতে করতে বলল–

— কলিং বেল আমি না, তোমার প্রিয় বান্ধবী বাজিয়েছে। তার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। তানিয়া তুমি দয়া করে আমাদের ওর খাবার টা আর এক গ্লাস লেবুর শরবত রুমে পাঠিয়ে দিও।

তানিয়া কিছু জিজ্ঞেস করতে গেলেই সে বলল–

— এখন আর কিছু জিজ্ঞেস কোরো না। আমি পরে সবটা বলব। ছোট মাকে বলে দিও আমরা এসে গিয়েছি। তুমি দ্রুত খাবার পাঠিয়ে দাও।

তানিয়া কিছু না বলে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দেয়। কাইফ এগিয়ে যেতে নিলে মিমি বলে ওঠে–

— তানি রে! আমাকে এই বাজে লোকটার হাত থেকে তুই বাঁচা রে। তুই তো জানিস না এই লোকটা কত খারাপ। খুব পঁচা। বাঁচা না আমাকে?

তানিয়া হকচকিয়ে গেল। কাইফ মিমির দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে তাকে নিয়ে রুমের দিকে অগ্রসর হলো।

কাইফ রুমে গিয়ে মিমিকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে বলল–

— এখানে চুপ করে বসে থাকো। আমি আসছি।

কাইফ একটা টি শার্ট এবং ট্রাউজার নিয়ে ওয়াশ রুমে প্রবেশ করল। কাইফ ওয়াশ রুমে ঢুকতেই মিমি ফট করে দাঁড়িয়ে গেল। রুম ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল যেন সে আগে দেখেনি। কিছুক্ষণ পর রুমের দেওয়ালে থাকা কাইফের ছবির দিকে তাকিয়ে আঙুল নেড়ে বলল–

— এই যে গোমড়া মুখো। আপনি যে খুব পঁচা তা কি জানেন? সব মেয়েরা আপনার দিকে নজর দেয় কেন হ্যাঁ? রাগ হয়না বুঝি আমার? কার আর দোষ দেবো বলুন? আপনি এতো সুন্দর কেন? আপনাকে শুধু আমি দেখবো আর কেউ না। দরকার হলে আপনাকে আমার সামনে বেধে রেখে তারপর দেখবো। আপনি আমাকে একটুও ভালোবাসেন না। কিন্তু আমি কি আপনাকে ভালোবাসি? উহু! তা তো বলবো না। বলবোওও না।

কাইফ তার পেছনে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। ইতোমধ্যে তার ফ্রেশ হওয়া শেষ। তার খুব হাসি পাচ্ছে। সে বিছানায় বসে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল–

— আচ্ছা বেশ। তোমাকে কিছু বলতে হবে না। এদিকে এসো।

মিমি হেলতে দুলতে তার দিকে এগিয়ে গেল। কাইফ তাকে ধরে বলল–

— এভাবে দুলছ কেন? শান্ত হয়ে দাঁড়াও।

কাইফ কোমর থেকে তার শাড়ি সরিয়ে মলম লাগিয়ে দেয়। ঠান্ডা স্পর্শে মিমি চোখ বন্ধ করে নেয়। কাইফের নখ খুব ভালো ভাবেই গেঁথেছিল এখানে। দরজায় নক হলো। কাইফ দরজা খুলে দেখল তানিয়া খাবারের ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে আছে। কাইফ সেটা হাতে নিয়ে টি টেবিলের ওপর রেখে বলল–

— তানিয়া! আমার একটা উপকার করো প্লিজ!

তানিয়া বলল–

— এভাবে বলছেন কেন ভাইয়া? বলুন কি করতে হবে।

— তুমি একটু ওর শাড়িটা চেঞ্জ করিয়ে নরমাল ড্রেস পরিয়ে দাও। ও এভাবে ঘুমাতে পারবে না।

তানিয়া হেসে বলল–

— আচ্ছা ঠিক আছে। আপনি একটু বাইরে যান, আমি ওকে চেঞ্জ করিয়ে দিচ্ছি।

কাইফ বাইরে চলে গেল। তানিয়া মিমির শাড়ি পাল্টে দিল। তাকে বেগ পোহাতে হয়েছে। মিমি কিছুতেই শান্ত থাকছে না। তানিয়া বাইরে গিয়ে বলল–

— ভাইয়া! হয়ে গিয়েছে।

কাইফ কৃতজ্ঞতার সাথে বলল–

— তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ তানিয়া।

— আরে! কোনো ব্যাপার না ভাইয়া।

তানিয়া চলে গেল। কাইফ রুমে প্রবেশ করে দরজা লক করে দিল। সে দেখলো তানিয়া মিমিকে একটা থ্রি পিস পরিয়ে দিয়েছে। কাইফ খাবারের প্লেট হাতে নিয়ে বলল–

— মিমি! খেয়ে নাও।

মিমি বাচ্চাদের মতো করে বলল–

— খাবো না, খাবো না, খাবো না।

কাইফ তার হাত চেপে ধরে নিজের পাশে বসাল। খাবার মুখের সামনে তুলে ধরল। কিন্তু মিমি মুখে নিল না। কাইফ তার গাল চেপে ধরে মুখের মধ্যে খাবার পুরে দিল। মিমি মুখ কুঁচকে খেতে লাগল। এভাবেই কাইফ তাকে পুরোটা খাইয়ে দিল। অতঃপর নিজের হাত ধুয়ে তার মুখ মুছিয়ে দিল। শরবতের গ্লাস হাতে নিয়ে বলল–

— এটা ঢক ঢক করে খেয়ে নাও। কুইক!

মিমি মুখ বাঁকিয়ে বলল–

— কি এটা? পঁচা জিনিস। আমি খাবো না।

কাইফ ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলল–

— তুমি ভালো কথা শোনার মানুষ নও। জোর না করলে হবে না।

কাইফ পুনরায় তার গাল চেপে ধরে শরবতটা খাইয়ে দিল। খাওয়ানো শেষে মিমি বলল–

— ইশ্! কি বাজে খেতে এটা! আপনি এটা কেন খাওয়ালেন আমায়? আপনি একটা পঁচা লোক, বাজে লোক।

— অনেক হয়েছে! এবার ঘুমাবে চলো।

— না।

— মিমি! চলো বলছি।

মিমি মুখ ঘুরিয়ে বলল–

— না।

কাইফ তাকে কোলে তুলে বিছানায় ঠাস করে ফেলে দিল। বিছানা নরম হওয়ায় মিমি কোনো ব্যথা পায়নি। কিন্তু সে চেঁচিয়ে উঠল–

— মা গো! মরে গেলাম গো! আমাকে মেরে ফেলল গো! কেউ বাঁচাও গো!

কাইফ লাইট অফ করে তার পাশে শুয়ে তাকে ঝাপটে ধরে বলল–

— হয়েছে! এখন তোমাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। ঘুমাও চুপ চাপ, নাহয় তোমাকে মেরে গুম করে দেব।

মিমি মাথা কাইফের বুকে। সে আবারও ধক ধক শব্দ শুনতে পাচ্ছে। তার মনে হচ্ছে কোনো ছন্দের তালে শব্দটা হচ্ছে। মিমির কাছে এটা দারুণ লাগছে। সে এটা শুনতে শুনতেই এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল।
———

সকালের মৃদু আলো চোখে পড়ায় মিমির ঘুম হালকা হয়ে গেল। সে নড়তে গিয়ে বুঝতে পারল যে সে নড়তে পারছে না। সে পিটপিট করে চোখ মেলে তাকাল। ভালো করে চোখ মেলে আশে পাশে তাকাল। নিজেকে কাইফের বুকের মধ্যে দেখতেই সে হতভম্ব। চোখে রসগোল্লার মতো বড় করে সে কাইফের দিকে তাকাল। সে তো পার্টিতে ছিল, এখানে কীভাবে আসলো? একটা জুস খেয়েছিল, তারপর থেকে আর কিছু মনে নেই।‌‌ কি হয়েছিল তারপর? সে সরে যেতে চেয়েও পারল না। সে কাইফের শক্ত বন্ধনে আবদ্ধ। মিমির এখন দম বন্ধ লাগছে। সে মৃদু কন্ঠে ডাকল–

— মিস্টার খান!

কাইফ শোনে না, গভীর ঘুমে মগ্ন। মিমি কাইফের দিকে ভালো করে তাকাল। এতো কাছ থেকে আগে কখনও দেখা হয়নি এই সুদর্শন পুরুষটিকে। দেখো কেমন বাচ্চাদের মতো ঘুমিয়ে আছে! কে বলবে এই লোকটা নাকের ডগায় রাগ নিয়ে ঘোরে? মিমি পুনরায় ডাকল–

— মিস্টার খান!

কাইফ তবুও শোনে না। মিমি এবার চেঁচিয়ে উঠল–

— মিস্টার খান!!

কাইফ মিমিকে ছেড়ে লাফ দিয়ে উঠে বসল। মিমি যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। কাইফ ঘুম ঘুম কন্ঠে ভ্রু কুঁচকে বলল–

— কি হয়েছে? এভাবে চেঁচাচ্ছ কেন? বাড়িতে চোর পড়েছে নাকি ডাকাত?

মিমি নাকের পাটা ফুলিয়ে বলল–

— চেঁচাব না তো কি করব? এমন ভাবে চেপে ধরেছিলেন, আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল।

কাইফ কিছু না বলে ছোট শ্বাস ফেলে। মিমি আবারও বলল–

— আমি বাড়িতে কখন এসেছি? আর আপনি আমাকে ওভাবে জড়িয়ে ধরে ছিলেন কেন? নাচানাচি করবেন এক মেয়ের সাথে আর জড়িয়ে ধরবেন আরেক মেয়েকে? ভারি লু..

মিমি কথা শেষ করতে পারল না, কেননা কাইফ শক্ত চোখে তাকিয়েছে। মিমি ঢোক গিলে কেটে পড়তে চায়লেই কাইফ তাকে দু বাহুর মাঝে আবদ্ধ করে নিল। গম্ভীর কণ্ঠে বলল–

— বাইরে যা খুশি করি না কেন, তুমি আমার বউ। আমি যা খুশি তাই করতে পারি। তুমি কি দেখতে চাও আমি আর কি কি করতে পারি?

কাইফের মতলব মিমির কাছে ভালো ঠেকলো না। তার গাল জ্বলে উঠল লজ্জায়। সে তুতলিয়ে বলল–

— ন না দেখতে চ চাই না।

— ঠিক আছে। তাহলে নিজের মুখ বন্ধ রাখো। আবার কোনো আজে বাজে কথা বললে..

— না না আমি কিচ্ছু বলব না।

কাইফ তাকে ছেড়ে দিয়ে বলল–

— গুড! যাও এখন। সারা রাত জ্বালিয়ে এখন আমার ঘুমের বারোটা বাজালে। ঘুমাব আমি, একদম ডিস্টার্ব করবে না।

মিমি সুর সুর করে চলে গেল। কাইফকে বিরক্ত করার কোনো মানেই হয় না। যা খুশি করুক, ঘুমিয়ে থাকুক। মিমি ঠিক করল সারাদিনে কাইফের আশে পাশে আসবে না। সত্যি বলতে চরম লজ্জা পেয়েছে সে।

চলবে?
{ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন, ধন্যবাদ}