হিয়ার টানে পর্ব-১০

0
449

#হিয়ার_টানে
#১০ম_পর্ব
#স্নিগ্ধতা_প্রিয়তা

আমি আর আবির ভাইয়া বাসে উঠলাম। বাসে উঠেই আবির ভাইয়া বাড়িতে কল করে জানিয়ে দিলো যে, আমরা রওয়ানা দিয়েছি। হালকা শীত পড়তে শুরু করেছে৷ আর এমনিতেও আমার শরীরটা অনেক খারাপ। বাসে উঠেই আমি সিটের সাথে হেলান দিয়ে বসলাম। আবির ভাইয়া আমার মাথাটা নিজের কাঁধের উপর নিয়ে বলল,

–“বেশি খারাপ লাগলে চোখ বন্ধ করে রাখ। ভালো লাগবে। ”

আমি চোখ-দুটো বন্ধ করার সাথে-সাথেই ঘুম-ঘুম পেতে লাগলো ।

কতক্ষণ কেটে গেছে জানিনা। চোখ খুলে দেখি আবির ভাইয়া আমাকে জাগানোর জন্য ডাকছেন। আমি সিট থেকে উঠে ভাইয়ার সাথে বাস থেকে নেমে পড়লাম। তারপর ভাইয়া একটা রিকশা ডাকলো৷ অনেকটা রাত হয়ে গেছে৷ রিকশাও তেমন নেই! আমি আর আবির ভাইয়া রিকশায় উঠে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম।

ভয়ে আমার আত্মা শুকিয়ে যাচ্ছে। সকালে কাউকে না জানিয়ে চলে গিয়েছিলাম! এখন না জানি সবাই কি বলবে! সবাই নাকি আমার উপরে ভীষণ রেগে আছে৷ আমি ভয়ে-ভয়ে আবির ভাইয়াকে বললাম,

–“সবাইতো এমনিতেই আমার উপরে রেগে আছে! যদি শোনে যে আমরা বিয়ে করে নিয়েছি তাহলেতো আরো রাগারাগি করবে! আপনাকেও অনেক বকাবকি করবে!”

–“আরে পাগল আমরা কি গিয়েই বলব নাকি যে, আমরা বিয়ে করে নিয়েছি! পরিস্থিতি বুঝে কথা বলতে হবে। আমাদের বিয়ের কথা ভুলেও মুখে আনবি না! আগে দেখ কি হয়! তারপর। ”

–“যদি শাহিল ভাইয়ার কথাই ঠিক হয়? ওই ছেলেটা যদি এখনো আমাদের বাড়িতেই থাকে? আর আমি যাওয়ার সাথে-সাথে আমাকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেয়?”

আমার এই কথাটা শুনে আবির ভাইয়া একটু চুপ হয়ে গেলো৷ তারপর বলল,

–“তুই এখন অনেক অসুস্থ! আর আমার মনে হয়না যে, এই অবস্থায় বাড়ির সবাই তোর বিয়ে নিয়ে কথা বলবে!”

–“যদি বলে?”

আবির ভাইয়া আমাকে একটা ধমক দিয়ে বললেন,

–“তুইও ওই শাহিল ভাইয়ার মতো নেগেটিভ ভাবতে শুরু করেছিস! চুপচাপ চল৷ বেশি কথা বলতে হবে না। সে যা হয় দেখা যাবে! ”

রিকশা থেকে নামতেই দেখতে পেলাম যে, হিমা আর আমার মা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখেই হিমা দৌড়ে আসলো। তারপর কান্না করতে-করতে বলল,

–“তুই কাউকে কিছু না বলে কোথায় চলে গিয়েছিলি? আমরা তোকে কত খুঁজেছি জানিস! সবাই কত চিন্তা করছিলো! যদি তোর কিছু হয়ে যেতো! ভাগ্যিস শাহিল ভাইয়া ফোন করেছিলো। আরেকটু দেরি হলেইতো বড় কাকা পুলিশের কাছে যেতে চেয়েছিলো! যদিও…”

এটুকু বলতেই মা হিমাকে থামিয়ে দিয়ে আমাকে বাড়ির মধ্যে টেনে নিয়ে গেলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলো,

–“তুই ঠিক আছিসতো? তোর বাবা আর কাকারা কিন্তু ভীষণ রেগে আছে। একটা কথাও বলবি না! গিয়ে কি লাভ হলো? দেখলিতো মা-বাবা ছাড়া কেউ আপন হয়না! এইবার লক্ষী মেয়ের মতো আমাদের পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করে নিবি।”

আমার প্রচন্ড রাগ হচ্ছে মায়ের কথা শুনে৷ আমি বাইরে থেকে আসলাম৷ এতবড় একটা ঘটনা ঘটে গেলো তারপরেও মা সেই বিয়ে দেওয়া নিয়েই পড়ে আছে! আমি কিছুটা রেগে গিয়ে বললাম,

–“মা তুমি আমার চিন্তা করা বাদ দিয়ে এখনো বিয়ের চিন্তা করছো? আমি বলেছিতো আমি অন্যকাউকে বিয়ে করতে পারবো না! ”

মা আমাকে আবির ভাইয়াদের বসার ঘরে নিয়ে গেলো আর ওখানে বাবা, কাকারা, চাচিরা সবাই ছিলো৷ আমার শেষের কথাটা এতজোরে বলেছি যে, সবাই সেটা শুনতে পেয়েছে৷ আমার কথাটা শুনেই বাবা বলে উঠলেন,

–“ছিঃ হিয়া! তুই আমার মেয়ে হয়ে আমার মান-মর্যাদা সব মাটির সাথে মিশিয়ে দিলি? তোর একবারও আমাদের কথা মনে হলো না? এখনো তুই ওই ছেলেটার কথাই বলছিস? তোর লজ্জা করছে না! প্রথমে অভীক আর তারপর… ”

এটুকু বলতেই বড় কাকা বাবাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,

–“তুই চুপ করবি একটু। মেয়েটাকে আগে আসতে দে। তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। বাড়ি যখন ফিরে এসেছে তখন আর চিন্তা কি! এইসব কথা যেন বাড়ির বাইরে না যায়! ”

বড় কাকা কথাগুলো সবাইকে উদ্দেশ্য করেই বলল। আবির ভাইয়াও এখানে চলে এসেছে৷ কিন্তু অভীক ভাইয়ার কথা এখানে কোথা থেকে আসলো আমি তাই বুঝতে পারছিলাম না৷ আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

–“অভীক ভাইয়ার কি হয়েছে? ঠিক আছেতো?”

আমাকে এত বিচলিত হওয়া দেখে বড় চাচি বললেন,

–“আমার ছেলেকে নিয়ে তোর চিন্তা না করলেও চলবে! আমার ছেলের আবার কি হবে! ও ভালই আছে! ”

মা আমাকে চুপ করিয়ে দিয়ে আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন,

–“তুই অভীককে যে চিঠি দিয়েছিলি সেটা সবাই দেখে নিয়েছে! এইজন্যই সবাই এত রেগে গেছে তোর উপরে আর বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে! তুই এমন কাজ কেন করলি মা?”

বলেই কান্না শুরু করে দিলো মা। কিন্তু আমি যেন নড়াচড়া করতে ভুলে গেছি। অভীক ভাইয়াকে দেওয়া চিঠির জন্যই সবাই আমার সাথে এত খারাপ ব্যবহার করছে! কিন্তু অভীক ভাইয়ার চিঠিটা এদের হাতে কি করে পৌঁছালো! অভীক ভাইয়া কি দিয়েছিলো? নাকি বাড়িতে রেখে গিয়েছিলো সেটা দেখেই! কিন্তু এরা জানবে কি করে যে, চিঠিটা আমি লিখেছি? তাহলে কি হিমা নিজে বাঁচার জন্য! এটুকু ভাবতেই আমার পুরো পৃথিবী শুন্য হয়ে গেলো। আমি কি করবো আর কি বলব বুঝে উঠতে না পেরে সোফার উপরে বসে পড়লাম।

আবির ভাইয়া আমার পাশ থেকে মায়ের কথাগুলো শুনে ফেলে চেঁচিয়ে উঠে,

–“তোমরা যে চিঠির জন্য হিয়াকে ভুল বুঝছো ওই চিঠিটা হিয়া দেয়নি! তোমরা ভুল বুঝছো!”

আবির ভাইয়ার কথা শুনে মেজো চাচি আবির ভাইয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,

–“তুই যা জানিস না তা নিয়ে কেন কথা বলছিস! আর ওই মেয়ের হয়ে তুই কেন কথা বলছিস! হিয়া এমন একটা কাজ করবে আমিওতো কখনো ভাবতে পারিন! কিন্তু আমরা সবাই হাতের লেখা মিলিয়ে দেখেছি! ওটা হিয়ার-ই লেখা চিঠি! নিজের চাচাতো ভাইকে ওভাবে কেউ চিঠি লিখে! ছিঃ”

আমার সম্পর্কে সবার এত খারাপ ধারণা দেখে আমার মরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে! হিমার একটা ভুল আজ আমাকে এইখানে এনে দাড় করিয়েছে! যারা আমাকে এত ভালবাসতো তারা আমাকে ভুল বুঝছে!

–“মা ওটা হিয়াই লিখেছিলো তবে অন্য একটা মেয়ের জন্য৷ ওই মেয়েটাই ওকে বলেছিলো চিঠিটা লিখে দিতে৷ তোমরা অভীক ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করোনি? অভীক ভাইয়াতো জানে সব ওই চিঠিটা কে দিয়েছিলো৷ ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করলেইতো সব সত্যিটা জানা যাবে!”

আবির ভাইয়ার কথা শুনে সবাই ওইদিকে তাকালো৷ বড় চাচি বলে উঠলেন,

–“আবির তুই এর মধ্যে নাক কেন গলাচ্ছিস? তুই কি করে জানিস চিঠির কথা? তোদেরকেতো বলিনি কিছু! আর আমার ছেলেকে এসব ঝামেলার মধ্যে টেনে আনবি না! ওকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, ও কাউকে পছন্দ করে কিনা! ও না বলেছে।”

–“কিন্তু চাচি, অভীক ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করা দরকার! সত্যিটা না জেনে আপনারা হিয়াকে কীভাবে দোষারোপ করতে পারেন! ”

বড় কাকা এইবার আবির ভাইয়াকে ধমক দিয়ে বললেন,

–“আমি আর এইসব নিয়ে কোনো কথা শুনতে চাইনা। আর আবির, বড়দের সাথে সম্মান দিয়ে কথা বলতে শিখো! বেয়াদবি কোথা থেকে শিখেছো! সবাই যে যার রুমে চলে যাও। কাল সকালে হিয়ার বিয়ে৷ এই নিয়ে আমি আর কোনো কথা শুনতে চাইনা। এই মেয়েকে যত ঘরে রাখা যাবে তত খারাপ! আরো ছেলে-মেয়ে আছে! তাদেরকেওতো বিয়ে দিতে হবে! যার এইবিয়ে পছন্দ হবে না সে কালকের জন্য বাড়ি থেকে চলে যেতে পারো!”

শেষের কথাগুলো কাকা আবির ভাইয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল। আমি বারবার হিমার দিকে তাকাচ্ছি৷ ভয়ে হিমার মুখ হলুদ হয়ে গেছে। ও ভয়ে আছে যে সবাই যখন জানতে পারবে যে চিঠিটা ওই দিয়েছিলো তখন কি হবে! আমার সাথে-সাথে ওর জীবনটাও শেষ হয়ে যাবে!

বড় কাকার কথাগুলো শুনে সবাই রুম থেকে বের হয়ে যাচ্ছিলো৷ তখন আবির ভাইয়া বলে উঠলো,

–“হিয়াকে যদি তোমরা বিয়ে দিতেই চাও তবে আমার সাথেই দাও!”

কথাটা বলার সাথে-সাথেই মেজো কাকা আবির ভাইয়ার গালে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন। আমরা সবাই অবাক হয়ে গেছি৷ চাচিও এগিয়ে গিয়ে বললেন,

–“কেন? এই মেয়েকে তুই কেন বিয়ে করবি? দেশে কি মেয়ের অভাব পড়েছে! আমার ছেলের জন্য এইরকম একটা মেয়েকে বেছে নেবো! ”

সবার কথাগুলো আমার অন্তর ঝাঝরা করে ফেলছিলো৷ কষ্টে আমার বুক ফেটে যাচ্ছিলো৷ আমার মা আমার পাশে দাঁড়িয়ে কান্না করছে। বাবা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে! আমার জন্য আমার বাবা-মায়ের কষ্টটা আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারছি না। ভালবাসা পাওয়া কি এতটাই কষ্টের? আমার নিজের ব্যবহারে নিজেরি ঘৃণা হচ্ছে! আমি সকালে ওইভাবে না গেলে হয়তো সবাই আমাকে আর আমার মা-বাবাকে এত অপমান করতো না৷ এরা নিজের মানুষ হয়েই এমন ব্যবহার কি করে করতে পারছে!

মা আমাকে টেনে বের হয়ে আসলেন। বাবাও মাথা নিচু করে চলে আসলেন৷ বড় চাচা আবির ভাইয়াকে বলতে লাগলো,

–“বড় হয়েছো ঠিক-ই। কিন্তু কোথায় কি বলতে হয় তা শেখোনি! কোন সাহসে তুমি ওকে বিয়ে করতে চাও?”

আবির ভাইয়া চুপ করে আছে৷ আবির ভাইয়ার মা বলল,

–“ওই মেয়েকে কিছুতেই আমি আমার ছেলে বউ হিসেবে মেনে নিবো না! প্রথমে অভীক! তারপর ওই ছেলেটা! কি যেন নাম! শাহিল! ওদেরকে পটাতে পারেনি! আর এখন আমার ছেলের পিছে পড়েছে!”

আমি ওখানেই দাঁড়িয়ে পড়েছি আবির ভাইয়ার উত্তর শোনার জন্য৷ মা আমাকে টানছে চলে যাওয়ার জন্য৷ বাবা ঘরে চলে গেছে।

বড় কাকাও দরজার বাইরে চলে এসেছেন৷ তখন আবির ভাইয়া বলে উঠলো,

–“আমি হিয়াকে বিয়ে করে নিয়েছি!”

আবির ভাইয়ার মুখে এইরকম কথা শুনে সবাই পাথরের মতো নিশ্চুপ হয়ে গেলো। বড় কাকাও থেমে গেছে৷ মা আমার হাতটা ছেড়ে দিলো৷ কেউ যেন বুঝতে পারছে না যে, আবির ভাইয়া আসলে কি বলেছে! আবির ভাইয়ার মা কান্না শুরু করে দিলেন৷ তারপর বললেন,

–“আবির তুই কি বললি?”

আবির ভাইয়া এইবার জোরেশোরে বলে উঠলো,

–“আমি হিয়াকে বিয়ে করে নিয়েছি! শুনেছো এইবার! হিয়া এখন আমার স্ত্রী! দুনিয়ার আর কারো শক্তি নেই ওকে বিয়ে দেওয়ার! বিবাহিত একটা মেয়েকে আর কি বিয়ে দেবে!আর হিয়া বাড়ি থেকে আমার কাছেই গিয়েছিলো। শাহিলের কাছে নয়। হিয়া শুধু আমাকেই ভালবাসে! অভীক ভাইয়াকে নয়!”

পুরো বাড়ি জুড়ে যেন মুহুর্তেই নিরবতায় ছেয়ে গেলো! বড় কাকা হিমাকে দিয়ে বাবাকে ডেকে পাঠালেন৷ সবাই আবার ওখানে বসলো। বড় কাকা আমাকে বললেন,

–“আবির যা বলছে তা কি সত্যি?”

আমি একবার আবির ভাইয়ার দিকে আরেকবার সবার দিকে তাকালাম৷ তারপর আস্তে-আস্তে বললাম,

–“হ্যাঁ, আবির ভাইয়া ঠিক-ই বলেছে!”

বাবা এইবার আমাকে মারার জন্য উদ্যত হলে আবির ভাইয়া বাবাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,

–“কাকা আপনি ওর গায়ে হাত তুলবেন না৷ ও এখন আমার স্ত্রী!”

আবির ভাইয়ার সাহস দেখে শুধু আমি না রুমের বাকি সবাই অবাক হয়ে গেলো৷ বাবা রাগে ফেটে পড়ছেন। তারপর বললেন,

–“বেশ! রাখ তোর বউ তোর কাছে! আজ থেকে আমি ধরে নিলাম যে, আমার মেয়ে মরে গেছে।… তুই আর কখনো আমার চোখের সামনে আসবি না! আমার কোনো মেয়ে নেই! আমার একটা ছেলে আছে শুধু!”

বলেই রাগে ফুসতে-ফুসতে বাবা মায়ের হাত ধরে টানতে-টানতে নিয়ে গেলো ওখান থেকে। বাকি সবাই আমাকে আর আবির ভাইয়াকে দেখছে৷ আবির ভাইয়ার মা মনে হচ্ছে আমাকে এক্ষুনি চিবিয়ে খাবে! চাচির এমন রূপ আমি জীবনেও দেখিনি! কি হবে এখন? আমার নিজের বাবা আমাকে মেনে নিচ্ছেন না! আমার কলিজাটা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে! আবির ভাইয়ার পরিবার কি আমায় মেনে নেবে? নাকি আমার জীবনে আসতে চলেছে একটা কালো অধ্যায়! যার কোনো শেষ নেই! আমি এতবড় একটা ভুল কি করে করলাম? পুরো পরিবারটাকে ভেঙে গুড়িয়ে দিলাম? এখন আমি কি করবো? আমার এখন কি করা উচিৎ???

চলবে….