#হৃদয়_জানে_মনের_কথা
#পর্ব_১৬
#লেখনীতে_মারিয়া_আক্তার_মাতিন
-“এই স্রোত, তোর ফোনের কী হয়েছে রে? তোকে কয়দিন কল দিলাম, ফোন খালি বন্ধ দেখায়। সিম চেঞ্জ করেছিস নাকি?”
অর্কের কথায় স্রোত কেমন চুপ হয়ে গেল। চেয়েও বলতে পারলো না যে হ্যাঁ, তার এখন নতুন ফোনে নতুন সিম। কারণ, অন্বয় ভাইয়ের নিষেধ এই ফোনে যেন অর্কের নাম্বার না থাকে। সে কী বলবে এখন? সে অসহায় চোখে অন্বয়ের দিকে তাকালো। অন্বয়ের চা খাওয়া শেষ। সে চায়ের কাপটা রেখে বলল,
-“হ্যাঁ, স্রোত সিম চেঞ্জ করেছে।”
-“কিন্তু কেন?”
-“তার জবাব তোমাকে কেন দিতে হবে?”
-“না মানে, আগে তো ওর সাথে ফোনে কথা হতো, ওর খোঁজখবর নিতে পারতাম। এখন তো ওর সাথে যোগাযোগই করতে পারি না।”
-“এতো যোগাযোগ করার দরকার কী? স্রোতের খোঁজখবর রাখার বহু মানুষ আছে।”
-“দেখুন ভাই, আপনি কিন্তু স্রোতের সাথে আমার বন্ধুত্ব নষ্ট করতে চাচ্ছেন। এটা ঠিক না!”
অন্বয় কেমন ঠাণ্ডা চোখে চেয়ে হাসলো। বলল,
-“শুধুই বন্ধুত্ব?”
এরূপ প্রশ্নে অর্ক থতমত খেল। বেশ ঘাবড়ে গিয়ে বলল,
-“ম..মানে কী বলতে চাচ্ছেন?”
-“সেটা তুমি ভালো জানো, অর্ক।”
অর্ক মাথাটা একটু নিচে করে এদিক ওদিক তাকালো। এই ভাবওয়ালাটা আবার সব বুঝে গেল নাকি? না, না কীভাবে বুঝবে! যেখানে স্রোতই এখন পর্যন্ত ওর মনের খবর টের পায়নি, সেখানে উনি কীভাবে টের পাবে! তার এখন ঘাবড়ে গেলে চলবে না, স্বাভাবিক থাকতে হবে। সে মাথা তুলে স্রোতের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“তোর ফোন নাম্বারটা দে, স্রোত। মাঝে মাঝে ফোন করে একটু কথা বলা যাবে।”
স্রোতের সাহসেই কুলাচ্ছে না ওর নাম্বার দিতে। সে কী করবে বুঝতেও পারছে না। তখনি অন্বয় গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“আমার দৃষ্টিতে তুমি স্রোতের জন্য পরপুরুষ। কোনো পরপুরুষের ফোনে আমার বউয়ের নাম্বার থাকুক সেটা আমি চাই না।”
অর্ক কিছু বলতে যাবে তার আগেই অন্বয় বলল,
-“ব্যস! এ বিষয়ে আমি আর কোনো কথা কিংবা কোনো যুক্তিতর্ক শুনতে চাই না।”
তারপর স্রোতের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“আমাদের এখন যাওয়ার সময় হয়েছে।”
অতঃপর চায়ের বিল মিটিয়ে তারা বাড়ির পথ ধরলো। অর্ক এখনো বসে আছে একই জায়গায়। সে কটমট করে ভাবছে, ছোট থেকে স্রোতের সাথে তার বন্ধুত্বের সম্পর্ক। সেই বন্ধুত্ব কখন যে ভালোবাসায় রূপান্তর হয়েছে সে বুঝতেও পারেনি। স্রোত সবসময় তাকে বন্ধুর চোখে দেখলেও সে কখনো স্রোতকে বন্ধুর চোখে দেখেনি। নিজের বউ রূপে কল্পনা করেছে সে। কিন্তু বোকা স্রোত কখনো তার মনের অনুভূতি বুঝতে পারেনি। সে তো ঠিক করেই রেখেছিল, উপযুক্ত সময় এলে সে স্রোতকে তার মনের কথা জানাবে। কিন্তু হঠাৎ একদিন সব কেমন এলোমেলো হয়ে গেল। নারায়ণগঞ্জ খালার বাড়ি ঘুরতে যাওয়াটাই কাল হয়ে দাঁড়ালো ওর। এর মাঝেই হুট করে স্রোতের বিয়ে ঠিক হয়ে গেল, বিয়েও হয়ে গেল। স্রোত অবশ্য তাকে ফোন করে বলেছে তার বিয়েতে উপস্থিত থাকতে। তখন সে চেয়েও বলতে পারেনি তার মনের কথা। সাহস করে বলতে পারেনি, ‘তুই এ বিয়ে করিস না, আমি তোকে ভালোবাসি।’
সে ঝামেলার অযুহাত দিয়ে স্রোতের বিয়েতে ইচ্ছে করেই আসেনি। এসেও বা কী হতো! যেখানে বিয়ের সমস্ত আয়োজন হয়ে গেছে, সেখানে তার চাওয়ায় কি কিছু হতো? আরও আগে জানতে পারলে নাহয় সে কিছু একটা করতো! যেখানে সে ছোট থেকে স্রোতকে ভালোবেসে এসেছে, সেখানে কোত্থেকে ওর ফুফাতো ভাই এসে ওর স্রোতকে কেড়ে নিল? আবার তাকে কিনা এখন বলছে, সে স্রোতের জন্য পরপুরুষ! এটা সে কীভাবে সহ্য করবে? শুরুতে সে নিজের ভাগ্যকে মেনে নিয়েছিল, ধরেই নিয়েছিল স্রোত ওর কপালে নেই। কিন্তু এইযে এতোদিন কাটলো, একটা দিনের জন্যও সে স্রোতকে ভুলতে পারেনি বরং আরও বেশি করে মনে পড়ছিল। তাই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নিজের জিনিস যেভাবেই হোক, আদায় করেই ছাড়বে।
আচানক একটা মেয়েলী কণ্ঠে অর্ক ভাবনার জগত থেকে বেরিয়ে আসে।
-“খুব জ্বলছে তাই না, অর্ক সাহেব?”
অর্ক চমকে তাকালো পাশে। দেখলো একজন অল্প বয়সী মেয়ে দাঁড়িয়ে। ভূষণে তার বেশ জাঁকজমক ভাব। সে বলল,
-“কে আপনি?”
-“আমায় আপনি পরেও চিনতে পারবেন। তার আগে বলুন খুব জ্বলছে?”
-“আমি কোনো অপরিচিত মেয়ের সাথে কথা বলতে ইচ্ছুক নই।”
-“বাহ! বেশ লয়্যাল মানুষ আপনি! ঠিক আছে, আমি আমার পরিচয় দিচ্ছি। আমি ফারিশতা মেহনাজ মেহের।”
-“কী জন্য এসেছেন?”
-“আপনাকে সাহায্য করতে।”
-“মানে?”
-“মানেটা খুব সহজ। আপনি স্রোতকে ভালোবাসেন আর আমি ভালোবাসি অন্বয়কে। আমরা দুজন চাইলেই এক হয়ে ওদের আলাদা করে দিতে পারি।”
এমন কথায় অর্ক দ্রুত গতিতে উঠে দাঁড়ালো। আশ্চর্য হয়ে বলল,
-“আপনি সত্যি বলছেন?”
-“জি। দূর থেকে আপনাদের দেখছিলাম৷ আপনার ভিতরটা যে জ্বলেপুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে, তা বুঝতে আমার বেশি বেগ পেতে হয়নি কিন্তু।”
-“আপনি আমায় কীভাবে সাহায্য করবেন?”
-“বলছি। তার আগে আপনাকে একটা কাজ করতে হবে। আপনার আমায় স্রোতের ফোন নাম্বার এনে দিতে হবে।”
অর্ক দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
-“চেয়েছিলামই তো! ওর ওই বদ’মাশ স্বামীটার জন্য চেয়েও পাইনি!”
-“ওর কাছ থেকেই কেন আনতে হবে? আপনি চাইলে অন্যভাবেও জোগাড় করতে পারেন।”
-“কীভাবে?”
-“স্রোতের মায়ের কাছ থেকে আনতে পারবেন। আপনি যেহেতু স্রোতের ছোটবেলার বন্ধু, সেহেতু ওর মায়ের সাথে আপনার ভালো সম্পর্ক থাকার কথা। আর স্রোত তো অবশ্যই এতদিনে ওর মায়ের সাথে ফোনে যোগাযোগ করেছে। ওর মায়ের কাছে অবশ্যই নাম্বার থাকবে। আপনি জাস্ট বন্ধু হিসেবে নাম্বারটা আনবেন। বুঝেছেন? একটু ব্রেইন খাটিয়ে চলতে শিখুন, অর্ক সাহেব৷ তাহলেই না নিজের জিনিস নিজের করে পাবেন!”
অর্ক ভেবে দেখলো, বুদ্ধি খারাপ না। মেয়েটার মাথায় ভালোই বুদ্ধি আছে। এ তো দেখা যায়, জল না চাইতেই বৃষ্টির মতো। এবার এই মেয়েটার সাথে এক হয়েই সে তার কার্যক্রম শুরু করবে। স্রোতকে পাওয়াটাই এখন তার কাছে মুখ্য বিষয়। কীভাবে পেল, কী উপায়ে পেল তা নিয়ে সে ভাবতে চায় না, ভাববেও না। মেহের অর্কের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
-“তাহলে আজকে থেকে আমরা এক হয়ে কাজ করব। কী বলেন?”
অর্কও মুচকি হেসে হাত মিলিয়ে বলল,
-“অবশ্যই।”
মেহের মনে মনে বলল,
-“মিস্টার তাসজিদ শাহরিয়ার অন্বয়, এবার দেখবেন কীভাবে আপনার থেকে স্রোতকে আলাদা করি। তারপর আপনি স্রোতের জন্য ছটফট করতে করতে মরবেন, আর আমি সেটা মন ভরে উপভোগ করব।”
চলবে……..

