#হৃদয়_জানে_মনের_কথা
#পর্ব_১৭
#লেখনীতে_মারিয়া_আক্তার_মাতিন
-“আপনি অর্কের সাথে একটু বেশি বেশি করেন।”
স্রোতের এমন কথায় অন্বয়ের রাগের পরিমাণ বাড়লো। রাগটাকে নিয়ন্ত্রণ করে সে বলল,
-“ওহ, সিরিয়াসলি? আমি বেশি বেশি করছি?”
-“তা তো করছেন-ই। আপনিই বলুন, ওকে আমার নাম্বার দিলে কী এমন হতো? ওর সাথে তো জাস্ট আমার বন্ধুত্বের সম্পর্ক। বন্ধু হয়ে বন্ধুর খোঁজখবর রাখাটা কি স্বাভাবিক না?”
-“যা জানিস না, তা নিয়ে কথা বলিস না। রাগ হয় খুব।”
-“কী জানি না আমি?”
-“কিছু না।”
স্রোত জেদ ধরে বলল,
-“না, আপনাকে আজ বলতে হবে, কী জানি না আমি। সবসময় কিছু জিজ্ঞেস করলেই আপনি এড়িয়ে যান। কেন সব খুলে বললে কী সমস্যা? আমাকে কি সব বলা যায় না? যদি আমায় কিছু বলতেই না পারেন, তাহলে আপনি কীসের ভালোবাসাটা বাসেন আমায়?”
-“খবরদার, আমার ভালোবাসা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলবি না!”
-“কেন তুলব না? আপনি হয়তো আমাকে এখনো ভালোই বাসতে পারেননি যার জন্য আমায় কিছু খোলাসা করে বলেন না।”
অন্বয় স্রোতের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। তারপর ফোস করে শ্বাস ছেড়ে বলল,
-“অর্ক তোকে ভালোবাসে।”
কথাটা কর্ণপাত হতেই স্রোতের মাথায় যেন বাজ পড়লো। বিস্ময়, অবিশ্বাস, বিহ্বলতা নিয়ে তাকিয়ে থাকলো সে। অন্বয় স্রোতের চোখের ভাষা নিমিষেই বুঝে ফেলল। স্রোতের দিকে একটু এগিয়ে বলল,
-“আমি জানতাম, তুই বিশ্বাস করবি না। এজন্যই বলতে চাইনি।”
-“আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে। এমনটা হতে পারে না। ও আমায় ভালোবাসলে আমি টের পেতাম না?”
-“তোর মতো গর্দভ কীভাবে টের পাবে?”
-“আমি আপনার কথা বিশ্বাস করতে পারছি না।”
-“বিশ্বাস করা, না করা তোর ব্যাপার। তাই বলে সত্য তো আর বদলে যাবে না।”
-“এটা কীভাবে সম্ভব? অর্ক তো আমায় বলেওনি কখনো।”
-“সে বলার আগেই আমি তোকে আমার করে নিয়েছি।”
স্রোতের এবার মনে পড়লো, অর্ক সবসময় বলতো সে একজনকে ভালোবাসে, তাকে সে মনের কথা বলতে চায় কিন্তু বলতে পারে না। ওর বিয়ের পরও তো বলেছিল যে মেয়েটাকে ভালোবাসি বলার আগেই সে অন্যকারো হয়ে গেছে। তার মানে কি ওই মেয়েটা সে-ই ছিল? তার কেন জানি বিশ্বাস হচ্ছে না আবার অন্বয় ভাইকেও অবিশ্বাস করতে পারছে না। এক দোটানার মাঝে পড়ে গেল সে। তখনি অন্বয় ওর দু কাঁধে হাত রেখে বলল,
-“আমায় বিশ্বাস করিস না? আমি কখনো মিথ্যে বলি? অর্ক তোকে সত্যিই ভালোবাসে। আর ঠিক এখানটায় আমার সমস্যা। ও কেন আমার বউয়ের প্রতি নজর দিবে? তুই শুধু আমার। আমি ব্যতীত তুই কারো হতে পারবি না, আমি হতে দিব না।”
স্রোত কেমন মনমরা হয়ে বলল,
-“কিন্তু এতো বছরে আমি একমুহূর্তের জন্যও টের পেলাম না?”
-“ওইযে বললাম না, তুই তো গর্দভ! তাই টের পাসনি।”
-“আমাকে আপনি আর কতো গর্দভ বলবেন? আমি যখন গর্দভই তাহলে আমায় বিয়ে করলেন কেন? একটা বুদ্ধিমতি মেয়েকে বিয়ে করতেন!”
অন্বয় মুচকি হেসে বলল,
-“আমার যে এই গর্দভটাকেই প্রয়োজন।”
___________________
অর্ক স্রোতের নাম্বার পেয়েছে। সেই থেকে সে মহাখুশি। আনন্দে তার তর সইছে না। মেহের তাকে দেখা করতে বলেছিল। তাই সে মেহেরের সাথে দেখা করতে এসেছে।
-“আগেই এতো খুশি হবেন না। আগে আমরা সাকসেসফুলি কাজটা করি, তারপর খুশি হয়েন।”
মেহেরের কথায় অর্ক বলল,
-“শুনুন, আমি স্রোতের নাম্বার পেয়ে গেছি। এখন কাজ হোক না হোক আমার তাতে কিছু যায় আসে না। আমি নিজেই এখন সব করতে পারব।”
-“আপনি তো বড্ড স্বার্থপর মানুষ। আমার বুদ্ধিতে স্রোতের নাম্বার পেলেন এখন বলছেন আপনি নিজেই সব করবেন? তার মানে এখন আর আমাকে প্রয়োজন নেই?”
অর্ক এবার সতর্ক চোখে চেয়ে বলল,
-“তার আগে আপনি বলুন, আপনি যা বলছেন তা সত্যি তো? আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, আপনি একটা ফ্র’ড মহিলা। কেবলমাত্র স্রোতের নাম্বার পাওয়ার জন্য আমায় ইউজ করছেন।”
রাগে মেহেরের গা জ্বলছে। লোকটা আসলেই একটা বলদ। কী থেকে কী বানিয়ে ফেলে তার কোনো ঠিক নেই। এজন্যই তো চোখের সামনে আরেক লোক এসে তার ভালোবাসাকে নিজের করে নিল অথচ সে কিছুই করতে পারেনি। মেহের জোরে শ্বাস নিয়ে বলল,
-“আপনি আমায় বিশ্বাস করতে পারছেন না তাই তো? ঠিক আছে। আপনাকে একটা জিনিস দেখাই।”
এই বলে মেহের তার ফোন থেকে সেই ছবি বের করে যেটা সে স্রোতকে দেখিয়েছিল। অর্ক ছবিটা দেখে এবার পুরোপুরি বিশ্বাস করে ফেলল যে না মেয়েটা সত্যিই বলছে। মেহের মনে মনে বলল,
-“সাধে কি আর বলদ বলি! নাহলে যেখানে অন্বয় স্যার মুহূর্তেই বুঝে ফেলেছিলেন এটা এডিট করা ছবি, সেখানে এই বলদ কিছু বুঝতেই পারল না!”
থাক গে, এতে করে তারই সুবিধা হয়েছে। সে এবার নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারবে। মেহের এবার তার আসল প্ল্যান নিয়ে আলোচনা করলো। সবটা শুনে অর্কের মুখে ফুটে উঠে মূল্যবান কিছু পাওয়ার হাসি। সে প্রশংসার সুরে বলল,
-“মানতেই হবে, আপনার মাথায় ভালো বুদ্ধি আছে।”
মেহের অহংকারের সাথে হাসে। বলে,
-“দেখতে হবে না, এই মেহেরটা আসলে কে!”
__________________
কয়েকদিন পর……..
বিকেলবেলা। স্রোত ল্যাপটপে মুভি দেখছে। ল্যাপটপটা গতকাল অন্বয় তাকে কিনে দিয়েছে। এমন সময় তার ফোন বেজে উঠে। ল্যাপটপের স্ক্রিনে তখন মুভির একটা ইন্টারেস্টিং পার্ট দেখাচ্ছিল। তাই এই মুহূর্তে ফোন বেজে উঠায় সে মহাবিরক্ত। তবুও সে ফোন হাতে নিল, দেখল একটা আননোন নাম্বার। সে আর রিসিভ করল না। কিছুক্ষণ পর ফের বাজতে লাগলো। স্রোতের বিরক্তি ভাব তুঙ্গে।
মহা জ্বালা তো! কে এতো ফোন করছে! সে কল রিসিভ করে কানে ধরতেই ভেসে আসলো অর্কের কণ্ঠস্বর,
-“কেমন আছিস, স্রোত?”
স্রোত আশ্চর্য হয়ে গেল। এটা তো অর্কের কণ্ঠস্বর। অর্ক তার নাম্বার কোথায় পেল! সে অর্কের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বলল,
-“অর্ক, তুই আমার নাম্বার কোথায় পেলি?”
-“পেয়েছি কোনো এক জায়গায়।”
-“না বল, কোথায় পেয়েছিস?”
-“তুই এতো রেগে যাচ্ছিস কেন? আমি ফোন করাতে কি তুই বিরক্ত হয়েছিস?”
-“আমি বিরক্ত হবো কেন? আমি তোকে যা জিজ্ঞেস করলাম, তার উত্তর দে।”
-“আচ্ছা, সেসব পরে বলব। এখন শোন না, আমি না একটা বিপদে পড়েছি। তুই কি আমায় হেল্প করতে পারবি?”
-“কী হয়েছে?”
-“আমি না এই বিষয়টা নিয়ে তোর সাথে সরাসরি কথা বলতে চাচ্ছিলাম। ফোনে কি আর এতোকিছু খোলাসা করে বলা যায়? তুই কি এখন আমার সাথে একটু দেখা করতে পারবি?”
-“দেখ, চাইলেই তো আর দেখা করা যায় না। আমার অন্বয় ভাইয়ের কাছ থেকে পারমিশন নিতে হবে। উনি যদি রাজি হয়, তাহলে দেখা করতে পারব।”
-“তোর স্বামী তো আমায় দুচোখে সহ্য করতে পারে না। আমার তো মনে হয়, উনি জীবনেও রাজি হবে না। আচ্ছা, উনাকে আর বলার দরকার কী? তুই এসে পড়। বেশিক্ষণ দেরি করব না, একটু আলাপ-আলোচনা করেই চলে যাব।”
স্রোতের মন সায় দিচ্ছে না। তার উপর সেদিন অন্বয় ভাই বলেছে, অর্ক তাকে ভালোবাসে। সে যদিও পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারেনি। আচ্ছা, এই বিষয়টা নিয়ে কি সে প্রশ্ন করবে? না, থাক। কিন্তু অন্বয় ভাইয়ের অনুমতি ছাড়া সে যেতে পারবে না। অর্ক যতোই তার বন্ধু হোক, স্বামীর অনুপস্থিতিতে সে যেতে পারে না। সে বলল,
-“দেখ অর্ক, অন্বয় ভাই আমার স্বামী। স্বামীর অনুমতি ছাড়া আমি কীভাবে তোর সাথে দেখা করব?”
-“তুই তাহলে আমায় সাহায্য করবি না? এখন নিজের বন্ধুকেও ভুলে গেলি?”
-“আচ্ছা, তোর কী এমন সমস্যা হয়েছে যে সরাসরি যেয়েই তোর সাথে কথা বলতে হবে?”
-“একটা বড়ো ধরণের বিপদে পড়েছি দেখেই তোকে ফোন করলাম৷ কারণ আমার জানামতে, বন্ধুই বন্ধুর বিপদে সাহায্য করে। আচ্ছা থাক, তোকে আসতে হবে না। বিপদে পড়লেই মানুষ চেনা যায়।”
-“দেখ তুই শুধু শুধু রাগ করছিস। আমার অবস্থা বুঝতেই চাচ্ছিস না! আচ্ছা, আমি অন্বয় ভাইয়ের সাথে ফোনে কথা বলে দেখি, উনি কী বলেন।”
-“তুই ভালো করেই জানিস, তোর স্বামী জীবনেও রাজি হবে না। আচ্ছা আমি বললাম তো তোকে সাহায্য করতে হবে না। শুধু শুধু এখন সাহায্য করার নাটক করিস না।”
-“কীহ! আমি নাটক করছি? তুই আমায় এটা বলতে পারলি, অর্ক?”
-“হ্যাঁ, পারলাম। কারণ, দুঃসময়ে বন্ধুও কোনো উপকারে আসে না। আমায় মানুষ চিনতে সাহায্য করলি, স্রোত। এজন্য তোকে ধন্যবাদ দিলাম।”
স্রোত পড়লো মহাবিপাকে। অর্ক তো এমনভাবে কথা বলছে যে সে সত্যিই বড় ধরণের কোনো বিপদে পড়েছে। হয়তো সত্যি হতেও পারে। কিন্তু সে অন্বয়ের অনুমতি ছাড়া যাবে কীভাবে? আবার বললেও তাকে যেতে দিবে না কখনোই। এটা সে ও ভালো করেই জানে। তাহলে সে কি যাবে? আচ্ছা, বন্ধু যেহেতু, এতো বছরের বন্ধুত্ব, দেখাটা নাহয় করেই আসুক। হয়তো তার দ্বারা কোনো উপকার হতে পারে। বন্ধুর বিপদে তো বন্ধুই পাশে দাঁড়াবে, তাই না? তাই সে মনস্থির করলো যে সে যাবে অর্কের সাথে দেখা করতে।
কোথায় দেখা করবে তা অর্কের কাছ থেকে জেনে সে নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে পৌঁছালো। সে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই অর্ক এসে হাজির হয় সেখানে। স্রোতকে দেখেই সে হেসে বলল,
-“তোকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।”
-“এখন বল, কী বলবি।”
-“এখানে বলব? এখানে তো অনেক মানুষ। আমি চাচ্ছিলাম নিরিবিলি কোনো জায়গায় গিয়ে আলোচনা করতে। তুই আমার সাথে চল।”
-“কোথায়?”
-“আরে চল না। তোকে তো আর অন্য কোথাও নিয়ে যাব না। তোর কিছু হলে তোর স্বামী আমায় মেরেই ফেলবে।”
অর্ক স্রোতকে নিয়ে নির্দিষ্ট সেই জায়গায় পৌঁছালো। স্রোত চারপাশে তাকিয়ে দেখলো, কেমন জঙ্গলাবৃত স্থান। মাঝে এক বিশাল আকৃতির ভাঙা দালান। দেখেই মনে হচ্ছে বহু বছরের পুরোনো জায়গা এটা। স্রোত অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
-“এ কোথায় নিয়ে এসেছিস আমায়?”
অর্ক পৈশা’চিক হাসি দিয়ে বলল,
-“ভিতরে চল। বলছি।”
স্রোতের বুকের ভিতরটা কেমন ধুকপুক করছে। তার একদমই মন সায় দিচ্ছে না ভিতরে যেতে। সে বলল,
-“আমি ভিতরে যাব না, অর্ক। তুই যা বলার এখানেই বল।”
-“তুই ভয় পাচ্ছিস কেন? ভিতরে গেলে দেখতে পারবি, জায়গাটা আসলে এতোটাও খারাপ না। ওখানে আলাপ-আলোচনা করার মতো পরিবেশ আছে।”
অর্ক একপ্রকার জোরজবরদস্তি করেই স্রোতকে নিয়ে গেল ভিতরে। পিছনেই ভিতরে দুজোড়া পায়ের প্রবেশ ঘটল। দালানের সিঁড়ি বেয়ে উঠে সামনে এগোতেই আচমকা অর্ক স্রোতকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে। হিসহিসিয়ে বলে,
-“এবার তোকে কে বাঁচাবে? তোর অন্বয় ভাই?”
স্রোত আঁতকে উঠে। অর্কের এমন আচরণ দেখে ভয়ে তার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে। সে কোনোরকম বলার চেষ্টা করে,
-“ক..কী করছিস তুই? ছাড় আমায়!”
-“উহু, আজ কোনো ছাড়াছাড়ি হবে না। তুই কেন আমায় ভালোবাসলি না, স্রোত? সেই ছোট থেকে আমরা একসাথে বড়ো হয়েছি, একসাথে খেলা করেছি, একসাথে পড়েছি তারপরও তুই আমার ভালোবাসা বুঝলি না কেন? বল! কেন আমায় রেখে তুই তোর ফুফাতো ভাইকে বিয়ে করেছিস?”
-“তার মানে তুই সত্যি আমায় ভালোবাসতি? অন্বয় ভাই তাহলে ঠিক বলেছিল!”
অর্কের ভ্রু কুঁচকে গেল। এই হারা’মিটা তাহলে সব জানে? আর সেজন্যই ওর সাথে এমন ব্যবহার করতো? খুব সহজেই দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে ফেলল সে৷ জানলে জানুক! আজকের পর থেকে সে স্রোতকে আর পাবে না। স্রোতকে নিয়ে সে আজ নিখোঁজ হবে। তার আগে মূল কাজটা সারতে হবে। স্রোত সর্বশক্তি দিয়ে অর্ককে সামনে থেকে সরানোর চেষ্টা করছে। নিজের উপর খুব রাগ হচ্ছে তার। কেন সে তার অন্বয় ভাইয়ের কথা শুনল না? কেন যে আসতে গেল এখানে! ভয়ে তার গলা শুকিয়ে গেছে। সে মনে মনে আল্লাহর নাম জপছে। অর্ক আরও শক্ত করে তাকে ধরে বলল,
-“আমি তোকে ভালোবাসি, স্রোত। তুই আমার হয়ে যা। তোকে ওই গম্ভীর লোকের সাথে সংসার করতে হবে না। বিশ্বাস কর, আমি তোকে অনেক সুখে রাখব।”
স্রোত চোখেমুখে ঘৃণার ছাপ ফুটিয়ে বলল,
-“তোর মতো বন্ধু যেন আল্লাহ আমার শত্রুকেও না দেয়। তুই ছাড় আমায়, অর্ক!”
অর্ক পিছন ফিরে কাউকে ইশারা দিল। সাথে সাথে দুটো ক্যামেরার ভিডিও অপশন অন হলো। মেহের ফিসফিস করে তার ভাই হাবিবকে বলল,
-“ভালো করে ভিডিয়ো করিস, ভাইয়া। যাতে স্পষ্ট সব দেখা যায়।”
হাবিবও ফিসফিস করে বলল,
-“তুই পরে ভালোভাবে এডিটটা করিস। কেমনভাবে এডিট করিস যে অন্বয় স্যার সব বুঝে যায়?”
-“আরে, ছবির নিচে অ্যাপের নাম লেখাটা আমার চোখেই পড়েনি। এবার কোনো সমস্যা হবে না। কারণ, ঘটনাটা তো সত্যি। শুধু কথাগুলো এডিট করে চেঞ্জ করতে হবে। এমনভাবে করতে হবে যেন সম্পূর্ণ দোষটা স্রোতের উপর পড়ে।”
-“পরে এই ভিডিয়ো কী করবি? ভাইরাল করবি?”
-“নাহ! ভাইরাল করে কী করব? এটা অন্বয় স্যারকে দেখাব। ততক্ষণে অর্ক স্রোতকে নিয়ে চলে যাবে। এদিকে অন্বয় স্যারও মনে করবে যে স্রোত উনাকে ঠকিয়েছে। ফলে ভুল বুঝে কষ্ট পাবে।”
-“তোর বুদ্ধি তো দারুণ!”
অর্ক একহাত স্রোতের কোমড়ে রাখতে গেলে স্রোত অর্কের অন্য হাতে জোরে কামড় বসায়। ব্যথায় অর্ক চোখদুটো খিঁচে বন্ধ করে ফেলে। ফলে স্রোতের হাত ছেড়ে দেয়। এ সুযোগে স্রোত দৌড়ে পালাতে গেলে অর্ক ফের ওর হাত চেপে ধরে নিজের কাছে নিয়ে আসে। বলে,
-“একা একাই পালিয়ে যাচ্ছিস? আমায় নিয়ে পালা! তোর পালাতে হবে না, আমিই তোকে নিয়ে পালিয়ে যাবো। এমন এক জায়গায় যাবো যেখানে কেউ আমাদের খোঁজে পাবে না।”
-“ছি, অর্ক, ছি! তোর এতোটা অধঃপতন হয়েছে? তুই আমার সাথে এসব কী করছিস? ছাড় বলছি, নয়তো তোকে গাঢ়ভাবে আঘাত করতে দুবার ভাবব না।”
-“যা, খুশি কর! তোকে আমি ছাড়ছি না।”
স্রোতের খুব কান্না পাচ্ছে। জীবন তাকে এ কোন পরিস্থিতিতে এনে দাঁড় করালো! সে মনে মনে বলছে,
-“হে আল্লাহ, রক্ষা করো আমায়!”
সে তরতর করে ঘামছে। মুখমণ্ডলে ভয়, আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। নিজের আপন বন্ধুর দ্বারা এমন পরিস্থিতির শিকার হবে সে কখনো ভাবতেও পারেনি। সে ছটফট করছে ছুটার জন্য কিন্তু পারছে না। অর্ক এবার স্রোতের খুব কাছে আসতে চাইলো, সে এক পা কেবল স্রোতের দিকে বাড়িয়েছে ওমনি পিছন থেকে কেউ তার ঘাড়ে ধরে ওদিক ফিরালো। ওদিক ফিরতেই অর্কের চোখদুটো বড় বড় হয়ে যায়। ভয়ে তার সর্বাঙ্গ কেমন নেতিয়ে আসে। কারণ তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে অন্বয়। রাগে অন্বয়ের কপালের রগ ফুটে উঠেছে। অন্বয়কে কেমন হিংস্র বাঘের মতো লাগছে যেন অর্ককে কাঁচা চিবিয়ে খাবে। চোখদুটো রক্তিম। কিছু বুঝে উঠার আগেই অন্বয় সজোরে এক ঘুষি বসালো অর্কের মুখে। অর্ক ছিটকে পড়ে গেল নিচে। ঠোঁট কেটে তার রক্ত ঝরছে। এদিকে লুকিয়ে থাকা মেহের ও হাবিবের গলা শুকিয়ে গেছে এমন দৃশ্য দেখে। তাদের মাথায় ঘুরছে একটা প্রশ্নই– অন্বয় স্যার এখানে আসলো কীভাবে?
চলবে……..

