#পর্ব৪
#হৃদয়ের_ছোঁয়া
#অর্ষা_আওরাত
দিনের আলো নেমে গিয়ে ধরনীর বুকে রাত্রের আঁধার নেমে এসেছে। চারদিক কালো অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে আছে। আকাশে মস্ত বড়ো একটা থালার মতন চাঁদ ওঠেছে। আকাশ জুড়ে অসংখ্য তারা মেলা। চাঁদের অপরূপ কিরন ছড়িয়ে দিচ্ছে ধরনীর বুকে। কিন্তু তার মধ্যেও রাত্রের অন্ধকারের আভাস বেশ ভালো ভাবেই রয়ে গিয়েছে! জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে বাহিরে জোনাক পোকা উড়ে যাচ্ছে। অনেকক্ষণ যাবত রুমে জানলার পাশ ঘেসে বসে বাহিরে রাত্রের দৃশ্য অবলোকন করছে ছোঁয়া। হৃদয় এখনো আসে নি রুমে। তখন বিদায় শেষে হৃদয়ের বাড়িতে আসে ছোঁয়া। সমস্ত নিয়ম কানুন শেষ করে ছোঁয়াকে রুমে বসিয়ে রাখা হয়েছে। ছোঁয়া ফ্রেশ হয়ে রুমে বসে অপেক্ষা করছে কখন হৃদয় আসবে। হৃদয় আসতে আসতে ছোঁয়া ডুব দিলো তাদের অতীতে………….
ছোঁয়ার সাথে হৃদয়ের পরিচয় হয় আজ থেকে ঠিক নয় মাস আগে। বলা যায় এক বছর হয়েই গেছে। ছোঁয়ার বাবার সাথে কাজে এসছিলো হৃদয় ছোঁয়াদের বাড়িতে তখনি ছোঁয়ার সাথে প্রথম দেখা হয় হৃদয়ের। তারপর আসতে আসতে ভালো লাগা, ভালো লাগা শেষ অব্দি প্রণয়ের রুপ নেয়। হৃদয়ই প্রথম ছোঁয়াকে তার ভালোবাসার কথা বলে, যা বেশিদিনও হয়নি আজ থেক তিন মাস হবে। ছোঁয়াও হৃদয়ের সাথে কথা বলতো প্রতিদিন। কিন্তু যেদিন হৃদয় ছোঁয়াকে প্রেম নিবেদন করে সেদিন ছোঁয়া প্রতিউত্তরে ভালোবাসি বলেনি হৃদয়কে। চুপ করে ছিলো। মৌনতা সম্মতির লক্ষন ভেবে হৃদয় ধরে নেয় ছোঁয়াও তাকে ভালোবাসে। পরবর্তীতে ছোঁয়ার ব্যবহারে বোঝা যায় যে ছোঁয়া মুখ ফুটে না বললেও সে নিজেও হৃদয়কে ভালোবাসে। এভাবে হৃদয় ছোঁয়াকে ভালোবাসার কথা বলার তিন মাস পর ছোঁয়ার বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। ছোঁয়ার বাবা হৃদয়কে আগ থেকেই চিনতো যার কারনে তাদের বিয়তে কোনো অমত করেনি। সব শেষে তাদের দু’জনের বিয়ে হলো আজ।
—-ছোঁয়ার ভাবনার মাঝেই দরজা খোলার শব্দে অতীত থেকে বেরিয়ে আসলো। দরজার শব্দ শুনে মুখ তুলে দরজার পাশে তাকিয়ে দেখলো হৃদয় দরজা খুলে এগিয়ে আসছে রুমের দিকে। হৃদয়কে দেখে ছোঁয়ার হৃৎপিণ্ড কেমন দ্রুত গতিতে চলতে লাগলো! ভয় গ্রাস করে তুললো ছোঁয়ার ভেতরে! লজ্জায় নিমজ্জিত হয়ে আছে ছোঁয়া। মুখশ্রীকে ফুটে ওঠেছে লজ্জার রক্তিম আভা। এই প্রথম ছোঁয়ার হৃদয়কে দেখে লজ্জা, ভয় মিলিয়ে এক অজানা অনুভূতির সম্মুখীন হচ্ছে। হৃদয়ের দিকে তাকালো এক পলক। হৃদয় এগিয়ে এসে ছোঁয়ার পাশে এসে বসেছে। কেমন ঘোর লাগা দৃষ্টিতে ছোঁয়ার দিকে হৃদয় তার দৃষ্টি আবদ্ধ করে রেখেছে। হৃদয়ের এই ঘোর লাগানো দৃষ্টি ছোঁয়াকে আরো একবার লজ্জায় আবদ্ধ করলো! খাট থেক ওঠে দাঁড়ালো হৃদয়কে সালাম করার উদ্দেশ্য। যখনি হৃদয়ের পায়ে ছোঁয়ার হাত স্পর্শ করলো তখনি হৃদয় ছোঁয়াকে ওঠিয়ে নিজের সামনে সোজা দাড় করালো। কিঞ্চিৎ পরিমান ফাঁক রয়েছে তাদের দু’জনের মধ্যিখানে। হৃদয় ছোঁয়ার উদ্দেশ্য বললো,
–“এতো ঝড় ঝাপ্টার পড় তোমাকে নিজের করে পেয়েছি। পায়ে নয় সবসময়ই আমার বুকের মধ্যিখানে রয়েছো তুমি।”
হৃদয়ের কথায় ছোঁয়া অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো হৃদয়ের দিকে। মানুষটিকে আজ নিজের স্বামী রুপে পেয়েছে যে। ছোঁয়ার তাকানোর মাঝেই হৃদয় বলে ওঠলো,
–“আজকের রাত্রি কি তুমি আমাকে এভাবে দেখে দেখেই কাটিয়ে দিবে নাকি বলোতো? বিয়ের প্রথম রাত্রে মানুষ কতোকিছু ভেবে থাকে আর আমার বউ সে হয়তো ভাবছে আমাকে দেখে দেখেই রাত্রি পার করে দিবে? আমার মনের সুপ্ত বাসনা হয়তো সে পূরন করতে দিবে না?”
–“হৃদয়ের এহেনো লাগামহীন কথায় আরো লজ্জায় পড়ে গেলো ছোঁয়া! মনে মনে ভাবছে বিয়ে হতে না হতেই লোকটা এতো নির্লজ্জ হয়ে গেলো? ছোঁয়া বলে ওঠলো,
–“কি সব লাগামহীন কথা বার্তা বলছো? আমি কি তোমাকে বলেছি যে আমি তোমাকে দেখে দেখে রাত্রি পার করে দিবো? এসব লাগামহীন কথা একদম বলবে না আমার পছন্দ নয় এগুলো।”
ছোঁয়ার কথার মাঝেই হৃদয় পরম আবেশে ছোঁয়ার লটাটে তার ওষ্ঠদ্বয় স্পর্শ করলো। এই প্রথম হৃদয়ের স্পর্শ টের পেলো ছোঁয়া। শরীরের মধ্যে এক অদ্ভুত শিহরন বয়ে ওঠছে ছোঁয়ার! হৃদয় আবারো কেমন ঘোরলাগা দৃষ্টি নিয়ে ছোঁয়ার দিকে তাকিয়ে বললো,
–“ঝগড়া করো না আজকে অন্ততে। ঝগড়ার জন্যও অনেক সময় পাবে। এখন এই সময়টা শুধু তোমার আর আমার।”
হৃদয়ের বলা উক্তি শেষ করে ছোঁয়াকে ফুলে সজ্জিত খাটে বসিয়ে দিয়ে নিজেও ছোঁয়ার সামনে এসে বসে। কিঞ্চিৎ সামান্য পরিমান ফাঁক রয়েছে তাদের দু’জনের মধ্যে। হৃদয় ছোঁয়ার এতোটাই কাছে এসে যে নিশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছে ছোঁয়া। একটি লাল গোলাপ নিয়ে ছোঁয়ার মাথার খোাপায় গুজে দিলো। হৃদয় নিজের হাত দু’টো দ্বারা ছোঁয়ার মুখশ্রী ধরে রেখে নয়ন মেলে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। ছোঁয়ার গালে, কপালে হৃদয় তার ওষ্ঠদ্বয় দিয়ে গভীরভাবে পরশ একে দিলো! ছোঁয়ার লজ্জা,ভয়,সব মিলিয়ে এক গভীর ভালো লাগা কাজ করছে হৃদয়ের পরশে। হৃদয় ছোঁয়ার ওষ্ঠদ্বয়ের দিকে নেশা ময় দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে। ছোঁয়ার চোখ এড়ালো না ব্যাপারটি। এই মুহুর্তে তার হৃদয়ের দিকে তাকাতেও লজ্জা করছে! অদ্ভুদ শিহরন বয়ে যাচ্ছে ছোঁয়ার সর্বঅঙ্গে হৃদয়ের স্পর্শে। হৃদয় ছোঁয়ার হাত দু’টো নিজের হাতের মধ্যে আঁকড়ে ধরে বললো,
–“শুরু করা যাক আমাদের নতুন জীবনের সূচনা? যেই সূচনাতে শুধু তুমি আর আমি দু’জনে মিলে মিশে একাকার হয়ে যাবো। থাকবে কোনো বাঁধা।”
ছোঁয়া হৃদয়ের কথায় লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো! হৃদয় বুঝে গিয়েছে মৌনতা সম্মতির লক্ষন। হৃদয় ছোঁয়ার হাত ধরে পাড়ি জমালো তাদের নতুন জীবনের উদ্দেশ্য। শুরু করলো এক নতুন অধ্যায়!
~~~~~~~~~~~~~
রাত্রি এখন মধ্যে প্রহরে নেমে এসেছে। চাঁদের আলো শেষে ঘুটঘুটে অন্ধকার গ্রাস করেছে সমগ্র ধরনীর বুকে! কিছুক্ষণ পরপরই কুকুর গুলো ডেকে ডেকে জানান দিচ্ছে তারাও ঘুমায় নি, জেগে রয়েছে সোহার মতন। বিয়ে উপলক্ষে ছোঁয়াদের পুরো বাড়ি সাজানো হয়েছে রঙিন আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়েছে পুরো বাড়িটিকে। ছাঁদেও এর ব্যতিক্রম নয়। বাড়ির ভেতরের পাশাপাশি ছাঁদ টিকেও সুন্দর করে সাজানো হয়েছে যার ফলে ধরনীর বুকে কালো ঘুটঘুটে অন্ধকার থাকলেও ছাঁদে কিছুটা উজ্জ্বল হয়ে আছে রঙিন আলোকসজ্জার কারনে। সেই আবছা আলোয় দাঁড়িয়ে রয়েছে সোহা। অনুতপ্ত হচ্ছে নিজের কর্মে। সোহা আর ছোঁয়া দু’জনে জমজ বোন ছিলো। ছোটোবেলা থেকে একসাথে বড়ো হয়েছে। স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি সব জায়গায়ই দু’জনে একসাথে থেকেছে। আজ সেই আপুর বিয়ে হয়ে গেছে অথচ সোহা একটি বারও তার নিজের বোনকে জড়িয়ে ধরে বিদায় দিতে পারলো না! ভুল বুঝে চলে গিয়েছে অনেক দূরে। দূরত্ব তৈরী হয়েছে দু’জনের মধ্যে! ডেই দুরত্ব সোহার নিজেরই কারনে সৃষ্টি হয়েছে। আজকের ঘটনা ভাবছে আর অশ্রু বর্ষন করছে সমানতালে! হঠাৎই কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ পেতেই সোহা ঘুরে তাকিয়ে দেখতে পেলো সামাদ দাঁড়িয়ে রয়েছে তার পিছনে! এই মুহূর্তে সামাদকে এখানে মোটেও আশা করেনি সোহা। যার দরুন বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে সামাদ এর দিকে! সামাদ বলে ওঠলো,
–“এতোকিছু করেও তো বিয়েটা আটকাতে পারলে না সোহা? কি হলো এতোকিছু করে? শেষ পর্যন্ত তো ছোঁয়ার সাথেই হৃদয়ের বিয়ে হয়ে গেলো। তাহলে এখন কি হবে তোমার?”
সামাদের কথায় ছোঁয়ার চোখে মুখে ভয় লক্ষ্য করা গেলো! বুক কেঁপে ওঠলো সামাদের বলা শেষোক্ত বাক্যটি শুনে। সত্যিই তো এতোকিছু করার পরেও ছোঁয়া আর হৃদয়ের বিয়েটা ঠিকই হলো। আটকাতে তো পারলো না সোহা। এখন সামাদ কি অস্বীকার করবে তাকে? কিন্তু মন যে বরং খুশি হয়েছে হৃদয়ের সাথে ছোঁয়ার বিয়ে হওয়াতে। কিন্তু একদিকে আবার নিজের জন্য কষ্ট হচ্ছে কি করবে এবার সামাদ সোহার সাথে? ভেবেই গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে! সামাদ যে কি করতে পারে এটা কেউ না বুঝলেও সোহার বোধগম্য হয়ে গিয়েছে। সোহাকে কিছু বলে ওঠবে এর আগেই সামাদ বলে ওঠলো,
–“এবার কি হবে তোমার সোহা?”
#চলবে?
বিঃদ্রঃ ভুল ত্রুটি থাকলে ধরিয়ে দিবেন।