#_এক_ফালি_রোদ্দুর_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_পর্ব_৫_(প্রথমাংশ)
আজ অফিসে প্রথম দিন প্রভার বেশ ভালোই কেটেছে। সকালে অফিসে ঢোকার সময় বুকের ভেতরটা কাঁপছিল তার। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ, নতুন দায়িত্ব, সব মিলিয়ে ভীষণ চিন্তিতত লাগছিলো। তার উপর শরীরটাও পুরোপুরি ভালো নেই। মাথা হালকা ঝিমঝিম করছিলো সকাল থেকেই। কিন্তু, অফিসে ঢোকার পর থেকে এক মুহূর্তের জন্যও তাকে অস্বস্তিতে পড়তে দেয়নি ফারহান।
শুরুর দিকেই পুরো অফিস ঘুরে দেখিয়েছে ফারহান। কার সাথে কিভাবে কথা বলতে হবে, কোন ফাইল কোথায় থাকে, কোন কাজ কিভাবে করতে হবে, সব ধৈর্য ধরে বুঝিয়ে দিয়েছে। এমনকি কয়েকবার তো প্রভা একই প্রশ্ন করলেও বিরক্ত হয়নি একটুও। বরং শান্ত গলায় আবার বুঝিয়ে দিয়েছে। প্রথমে ব্যাপারটা একটু অবাকই করেছিল প্রভাকে। একটা কোম্পানির মালিক হয়েও মানুষটা এতো সহজভাবে কথা বলতে পারে, সেটা তার ধারণার বাইরে ছিলো। বন্ধু হিসাবে অসাধারণ ফারহান, আরও একবা প্রমান হলো।
তবে সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছে অন্য একটা ব্যাপারে। ১১ টার দিকে তার ডেস্কে গরম দুধ এসে পৌঁছায়। সাথে সেদ্ধ ডিম আর কিছু ফল। প্রভা প্রথমে ভেবেছিল হয়তো ভুল করে এসেছে। কিন্তু, অফিস বয় এসে স্পষ্ট বলেছে,
” স্যার পাঠাইছে, ম্যাম!”
প্রভা সাথে সাথে অস্বস্তিতে পড়ে যায়। আশেপাশে কয়েকজন সহকর্মীও তখন তাকিয়ে ছিলো তার দিকে। লজ্জায় মুখটাই গরম হয়ে উঠেছিল। সে তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে ফারহানের কেবিনে দাঁড়ায়।
” এইসব কেন পাঠিয়েছেন?”
ল্যাপটপে চোখ রেখেই শান্ত স্বরে বলেছিল ফারহান,
” খাওয়ার জন্য।”
” না মানে, আমার জন্য আলাদা করে এসব করার দরকার ছিল না।”
ফারহান এবার চোখ তুলে তাকিয়েছিলো তার দিকে।
” দরকার ছিল বলেই করেছি।”
” কিন্তু…”
” প্রভা! তুই এখন শুধু নিজের জন্য না।”
কথাটা শুনে প্রভা চুপ করে গিয়েছিলো। বুকের ভেতরটা কেমন যেন নরম হয়ে এসেছিলো হঠাৎ। অনেকদিন পর কেউ এভাবে তার খাওয়ার কথা ভেবেছে। এরপর বিকেলের দিকে আবারও স্ন্যাক্স এসেছে। লাঞ্চের সময় ঠিকঠাক খাবার পৌঁছে গেছে ডেস্কে। এমনকি অফিস শেষ হওয়ার আগে আবার ফলের জুসও পাঠিয়েছে ফারহান। প্রভা কয়েকবার নিষেধ করেছে। প্রতিবারই ফারহান একদম পাত্তা দেয়নি। অদ্ভুত মানুষ। অস্বস্তি লাগছিল, খুবই লাগছিল। কিন্তু, সেই অস্বস্তির মাঝেও একটা ভালো লাগা কাজ করছিলো তার ভেতরে। যত্ন পাওয়ার অনুভূতিটা মানুষকে এতোটা দুর্বল করে দেয়, আগে বুঝতে পারেনি সে।
অফিস ছুটির পরও নতুন ঝামেলা শুরু হয়েছিলো। ফারহান নিজেই তাকে বাসায় পৌঁছে দিতে চেয়েছে। প্রভা অনেকবার বলেছে,
” আমি চলে যেতে পারবো।”
” জানি পারবি। তারপরও আমি দিয়ে আসবো।”
” এতো কষ্ট করার কি আছে?”
” তোকে ড্রপ করা কষ্টের মধ্যে পড়ে?”
কথাটার পর আর কিছু বলতে পারেনি প্রভা।
পুরো রাস্তা জুড়ে ফারহান টুকটাক কথা বলেছে। বেশিরভাগই অফিসের বিষয়। মাঝে মাঝে ফাহিমের দুষ্টুমির গল্পও করেছে। আর প্রভা চুপচাপ শুনেছে। অনেকদিন পর তার মনটা একটু হালকা লাগছিলো। বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে এখন নিজের রুমের বিছানায় বসে আছে প্রভা। চুলগুলো এখনও হালকা ভেজা। জানালার বাইরে রাত নেমেছে পুরোপুরি। দূরের বিল্ডিংগুলোর আলো ঝাপসা হয়ে ভেসে আসছে। সারাদিনের ক্লান্তি থাকলেও আজ মনটা শান্ত। ঠিক তখনই ফোনটা বেজে ওঠে। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটা দেখে প্রভার ঠোঁটের কোণে ছোট্ট হাসি ফুটে উঠে।ফারহান! সে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠ,
” কি অবস্থা?”
প্রভা হালকা হেসে বললো,
” এইতো ভালো। আপনার?”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর ফারহানের গলা ভেসে এলো,
” শোন, আমি তোর বস শুধু অফিসে। বাকি সবসময় বন্ধু। আমি তোকে অফিসেও এইসব ফর্মালিটি করতে নিষেধ করেছি, তুই শুনিসনি। কিন্তু, বাকি এইসময় আমি কিন্তু সহ্য করবো না।”
কথাটা শুনে প্রভা ফিক করে হেসে ফেলে। অনেকদিন পর এভাবে স্বতঃস্ফূর্ত হাসি হাসলো সে। ফারহান সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে,
” এই তো! এইভাবে হাসবি। সারাক্ষণ এমন মন খারাপ করে থাকলে চলবে?”
প্রভা বিছানার হেডবোর্ডে মাথা ঠেকিয়ে আস্তে করে বললো,
” সবসময় ইচ্ছা করলেই তো হাসা যায় না।”
ওপাশে কিছুক্ষণ চুপ থাকে ফারহান। তারপর শান্ত স্বরে বলে,
” তা ঠিক। কিন্তু, চেষ্টা করতে দোষ কি?”
প্রভা এবার কিছু বলে না। শুধু নিঃশব্দে হাসে।
কথাগুলো খুব সাধারণ। অথচ কেন জানি বুকের ভেতর প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ছে তার। মনে হচ্ছে, দীর্ঘ অন্ধকারের পর কেউ হয়তো খুব আস্তে করে একফালি আলো ধরিয়ে দিচ্ছে তার চারদিকে। প্রভা আস্তে করে বললো,
” ঠিক আছে, আর রাগ করা লাগবে না।”
” হুম! এই তো ভালো মেয়ে।”
কথাটা শুনে প্রভা চোখ উল্টালো, যদিও ফারহান সেটা দেখতে পাচ্ছে না। তবুও ঠোঁটের কোণে হাসি লেগেই রইলো তার। ফারহান এবার একটু গম্ভীর স্বরে বললো,
” শরীরের কি অবস্থা এখন? আর বমি হয়েছে?”
প্রভা বিছানার ওপর পা তুলে গুটিসুটি মেরে বসে।
জানালার বাইরের বাতাস পর্দাটা হালকা দুলিয়ে দিচ্ছে। সে ধীরে উত্তর দিলো,
” না, বাসায় এসে আর হয়নি।”
” মাথা ঘুরছে?”
” একটু ক্লান্ত লাগছে। তবে আগের থেকে ভালো।”
ফারহান যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে ওঠে,
” প্রভা! আমি একটা কথা ভাবছি।”
” কি কথা?”
” সামনের মাস থেকে তোর অফিসে আসার প্রয়োজন নেই।”
কথাটা শুনে প্রভা সোজা হয়ে বসে পড়ে। বুকের ভেতর ধক করে ওঠে।
” মানে?”
ওপাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে ফারহান বলে ওঠে,
” ই’ডি’য়ট! এই সময় এত উত্তেজিত হচ্ছিস কেন?”
প্রভা ঠোঁট কামড়ে ধরে আস্তে করে বিড়বিড় করলো,
” আমার চাকরি?”
” তোর চাকরি যাবে না। কিন্তু, তোর ফিজিকাল কন্ডিশনের কথা ভেবেই বলছি। তুই বাসা থেকে সব কাজ করবি। বেবি হওয়ার পর আবার অফিসে আসবি।”
প্রভা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। এই মানুষটা কেন এভাবে তার সবকিছু নিয়ে ভাবে? কেন এতোটা গুরুত্ব দেয় তাকে? সে আস্তে করে বললো,
” কিন্তু, এইটা তো ঠিক না।”
ফারহান এবার একটু কঠিন স্বরে বললো,
” আমি তো মাগনা টাকা দিচ্ছি না, তাই না? কাজ তো করছিসই। শুধু বাসায় বসে করবি। প্লিজ! এইটা নিয়ে একদম ঠ্যাটামি করবি না।”
প্রভা মাথা নিচু করে ফেলে, যদিও সে জানে ফারহান সেটা দেখতে পাচ্ছে না। তার চোখের কোণে হালকা জল জমে ওঠে। কেউ শেষ কবে তার সুবিধা অসুবিধার কথা এতো গুরুত্ব দিয়ে ভেবেছে, মনে করতে পারে না সে। প্রভা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তারপর খুব আস্তে বললো,
” ওকে!”
ওপাশে ফারহানের গলায় সঙ্গে সঙ্গে স্বস্তি নেমে এলো।
” এই তো। এবার শান্তিতে ঘুমাবি। আর ঠিকমতো খেয়ে মেডিসিন নিবি।”
প্রভা মৃদু হেসে চোখ বন্ধ করে। অদ্ভুত ব্যাপার!জীবনের ভয়গুলোও যেন একটু কম লাগতে শুরু করেছে তার।
…
সময় গড়িয়ে এক সপ্তাহ কেটে গেছে। আজ রাজ আর অনন্যার এনগেজমেন্ট। পুরো অনুষ্ঠানটা আয়োজন করা হয়েছে অনন্যার পছন্দমতো। শহরের অভিজাত একটি কনভেনশন হলে জমকালো সাজসজ্জা করা হয়েছে। চারপাশে সাদা আর রুপালি রঙের ডেকোরেশন, ঝাড়বাতির নরম আলো আর তাজা ফুলের সুবাসে ভরে আছে পুরো পরিবেশ। স্টেজটাও সাজানো হয়েছে একদম রূপকথার মতো। সাদা গোলাপ, অর্কিড আর ঝলমলে লাইটের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে স্বপ্নের এক আবহ।
অনন্যা আজ যেন সেই স্বপ্নেরই কোনো চরিত্র। তার পরনে সাদা রঙের ব্রাইডাল গাউন। গলার কাছে ঝলমল করছে দামি ডায়মন্ড সেট। চুলগুলো নিখুঁতভাবে স্টাইল করে খোপা করা হয়েছে। ধবধবে ফর্সা শরীরে শুভ্র সাজসজ্জা তাকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। দূর থেকে তাকালে মনে হচ্ছে সাদা পুষ্পের মতো ফুটে আছে সে। স্টেজের মাঝখানে রাজ আর অনন্যা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। অনন্যার চোখেমুখে স্পষ্ট উচ্ছ্বাস। আজকের দিনটা নিয়ে সে অনেকদিন ধরেই স্বপ্ন দেখেছে। সে রাজের দিকে তাকিয়ে বললো,
” আমি যে ডায়মন্ড রিংটা আনতে বলেছিলাম, সেটা এনেছো?”
” হ্যাঁ, ঐটাই এনেছি।”
কথাটা শুনেই অনন্যার মুখ আনন্দে ঝলমল করে উঠল।
” রিয়েলি?”
” হুম।”
অনন্যা শিশুর মতো খুশি হয়ে উঠলো। তার চোখেমুখে তৃপ্তির ছাপ স্পষ্ট। সবকিছু ঠিক তার ইচ্ছামতোই হচ্ছে। কিন্তু, এই আনন্দমুখর পরিবেশের মাঝেও একজন মানুষ সম্পূর্ণ নীরব হয়ে বসে আছেন। হলের এক কোণের সোফায় চুপচাপ বসে আছেন মারফুয়া বেগম। চারপাশে হাসি আনন্দ, কোলাহল, অতিথিদের ব্যস্ততা, কিছুই যেন তাকে স্পর্শ করতে পারছে না। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন স্টেজের দিকে। তার চোখ স্থির হয়ে আছে নিজের ছেলে রাজের দিকে। সাদা শার্ট আর কালো ব্লেজারে আজ রাজকে অসম্ভব সুদর্শন লাগছে। যে কোনো মায়ের মতোই ছেলেকে দেখে গর্ব হওয়ার কথা তার। কিন্তু, আশ্চর্যের বিষয়, আজ তার মন ভরে উঠছে না। বরং বুকের ভেতর শূন্যতা জমে আছে। কারণ, আজ বারবার প্রভার কথা মনে পড়ছে তার। মেয়েটা এখন কেমন আছে? আদৌ ভালো আছে তো? গত কয়েকদিনে কতোবার যে ফোন করেছে তিনি, তার হিসাব নেই। কিন্তু প্রতিবারই ফোন বন্ধ পেয়েছেন। হয়তো সিম বদলে ফেলেছে। প্রভাকে তিনি কখনো নিজের মেয়ের চেয়ে কম ভাবেননি। মেয়েটা কতো কষ্ট নিয়ে এই বাড়ি থেকে চলে গেছে, কতো চুপচাপ সহ্য করেছিলো, সবই তো দেখেছেন তিনি। তবুও শেষ পর্যন্ত তাকে ধরে রাখতে পারেননি। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো মারফুয়া বেগমের বুক থেকে।
ঠিক তখনই মারফুয়া বেগমের দৃষ্টি গিয়ে পড়ে অনন্যার দিকে। মুহূর্তেই তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। অনন্যাকে দেখলেই মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। তিনি নীরবে অনেক খোঁজখবর নিয়েছেন মেয়েটার সম্পর্কে। সমাজে তার চলাফেরা, বন্ধু-বান্ধব, জীবন, সবকিছু। আর যেসব তথ্য তার কানে এসেছে, সেগুলো একটুও ভালো লাগেনি তার। বরং, প্রতিটা তথ্য শুনে তার অস্বস্তি আরও বেড়েছে। সবকিছু মিলিয়ে অনন্যার প্রতি এক ধরনের বিরূপ ধারণা জন্মে গেছে তার মনে। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই মেয়েটাই খুব শিগগিরই তার ছেলের স্ত্রী হতে যাচ্ছে।ভাবতেই বুকের ভেতর রাগ আর অসহায়তা জমে ওঠে। কিন্তু তিনি জানেন, এখন আর কিছু বলার নেই।রাজ নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। অনুষ্ঠানের আলো, মানুষের হাসি আর ক্যামেরার ঝলকানির মাঝেও মারফুয়া বেগমের মনে হচ্ছে, কোথাও যেন একটা বড় ভুল হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেই ভুলটা থামানোর ক্ষমতা আর তার হাতে নেই।
ঠিক তখনই এগিয়ে এসে তার পাশে বসলেন রনক রহমান। কিছুক্ষণ স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। বহু বছরের সংসার জীবনে এই মুখের প্রতিটি অভিব্যক্তি তিনি চিনে ফেলেছেন। মারফুয়া বেগমের চোখের ভেতর জমে থাকা অস্থিরতা বুঝতে তার এক মুহূর্তও লাগলো না। নরম স্বরে তিনি বললেন,
” মন খারাপ করে বসে আছো কেন?”
মারফুয়া বেগম মাথা ঘুরিয়ে স্বামীর দিকে তাকায়।চোখে মুখে ক্লান্তি আর অসহায়তার ছাপ স্পষ্ট। তার কণ্ঠ কেঁপে উঠলো,
” তুমি কি বুঝতে পারছো না, আমার ছেলের জীবন ধ্বং’সের দিকে যাচ্ছে? আমার একটা মাত্র সন্তান। তার জীবন কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে, বুঝতে কি পারছো না?”
রনক রহমান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি আবারও একবার স্টেজের দিকে তাকালেন। রাজ তখন অতিথিদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলছে। সে ভীষণ সুখী।চোখ ফিরিয়ে তিনি শান্ত গলায় বললেন,
” পারছি বুঝতে। কিন্তু, এখানে আমার কিছুই করার নেই। আমি তো তাকে বলিনি যে তুমি প্রভাকে ছেড়ে অনন্যাকে বিয়ে করো। তোমার ছেলে যথেষ্ট ম্যাচিউর। তাকে হাতে কলমে কিছু শেখানোর প্রয়োজন নেই।”
” কিন্তু, অনন্যা যে…”
কথাটা শেষ করার সুযোগ পেলেন না মারফুয়া বেগমের। রনক রহমান বলে ওঠে,
” অনন্যা কেমন, সেটা আমি জানি। যখন তুমি অনন্যার ব্যাপারে খোঁজ নিচ্ছিলে, তখন আমি তোমাকে সাহায্য করেছি। যা জানার, আমিও জেনেছি। কিন্তু, তোমার ছেলের জীবনের কোনো সিদ্ধান্ত আমি নিতে পারি না।”
মারফুয়া বেগম অসহায়ের মতো স্বামীর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
” তাই বলে…”
বাকিটুকু আর বলতে পারলেন না তিনি। গলার ভেতর যেন কিছু আটকে গেল। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা কষ্ট, হতাশা আর দুশ্চিন্তা একসঙ্গে এসে ভর করলো তার ওপর। এক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো চোখের কোণ বেয়ে। তারপর আরেক ফোঁটা। রনক রহমানের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠে। এই নারীকে তিনি অনেক রূপে দেখেছেন, রাগী, দৃঢ়, সাহসী, কঠোর। কিন্তু, সন্তানের জন্য ভেঙে পড়া একজন মায়ের কষ্ট সবসময়ই তাকে অসহায় করে দেয়। তিনি ধীরে হাত বাড়িয়ে মারফুয়া বেগমের চোখের জল মুছে দিলেন।
” কেঁদো না।”
” কিভাবে না কাঁদি বলো? আমি মা। আমার ভয় হয়। খুব ভয় হয়।”
রনক রহমান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর স্ত্রীর হাতের ওপর নিজের হাত রেখে বললেন,
” আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করেছি। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা রাজের। জীবন তাকে নিজের মতো করেই শিক্ষা দেবে।”
মারফুয়া বেগম নিঃশব্দে চোখ বন্ধ করলেন। সামনের স্টেজে তখন হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে রাজ আর অনন্যা। চারদিকে আনন্দের উচ্ছ্বাস। কিন্তু, সেই কোলাহলের মাঝেও একজন মায়ের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক আশঙ্কা বারবার ফিসফিস করে বলে চলেছে, কোথাও যেন একটা বড় ভুল হয়ে যাচ্ছে। আর সেই ভুলের মূল্য হয়তো একদিন খুব বড় করেই দিতে হবে সবাইকে।
…
রাত বেশ গভীর হয়ে এসেছে। পুরো বাড়িটা প্রায় নিস্তব্ধ। ড্রইংরুমের আলো নিভিয়ে সবাই যার যার রুমে চলে গেছে অনেক আগেই। শুধু দ্বিতীয় তলার কর্নারের রুমটায় এখনও আলো জ্বলছে। নিজের রুমে বসে আছে ফারহান। সামনে টেবিলজুড়ে ছড়িয়ে আছে বেশ কয়েকটা ফাইল। ল্যাপটপের স্ক্রিনে বিভিন্ন রিপোর্ট খোলা। অফিস থেকে ফিরেও কাজের চাপ যেন তার পিছু ছাড়ে না। মনোযোগ দিয়ে একটা ফাইলের পাতা উল্টাচ্ছে সে। ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়লো। ফারহান মুখ তুলে তাকায়। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ফারিন। বোনটাকে দেখে তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠলো।
” ওখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ভেতরে আয়।”
ফারিন ভেতরে ঢুকলো। তারপর গিয়ে ডিভানের ওপর বসে পড়লো। কিছুক্ষণ চুপচাপ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলো সে। ফারহান আবারও ফাইলের দিকে মন দেয়। ফারিন বিরক্ত মুখে বললো,
” বাসায় এসেও এইসব করা লাগে?”
ফারহান চোখ না তুলেই উত্তর দিলো,
” সব কাজ কি আর অফিসে শেষ করা সম্ভব?”
” তোমার তো মনে হয় সম্ভব না। অফিসে কাজ করো, বাসায় এসে কাজ করো, ছুটির দিনেও কাজ করো।”
ফারহানের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটলো।
” ব্যবসা করতে গেলে একটু কষ্ট তো করতেই হয়।”
ফারিন বিরক্তিতে চোখ উল্টালো। তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ বললো,
” ভাইয়া! তুমি কি আম্মুর দিকে তাকাও?”
কথাটা শুনে ফারহান এবার ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
” তাকাবো না কেন? কি সব আজেবাজে প্রশ্ন করছিস?”
” যদি তাকাও, তাহলে তো দেখতে পেতে আম্মুর একটা বউমার প্রয়োজন।”
ফারহান দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এই বিষয়টা নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে পরিবারের সবাই তাকে কম বিরক্ত করেনি। কেউ সুযোগ পেলেই বিয়ের প্রসঙ্গ তুলে বসে। সে আবারও ফাইলের দিকে চোখ নামিয়ে বললো,
” শুরু করিস না, ফারিন!”
” কেন শুরু করবো না?”
ফারিন এবার ডিভান থেকে উঠে এসে তার টেবিলের সামনে দাঁড়ায়।
” বিয়ে কেন করছো না, ভাইয়া? তোমার বয়স কি কমছে দিন দিন?”
ফারহান নির্লিপ্ত গলায় বললো,
” আমার বয়স নিয়ে তোর এতো চিন্তা করার দরকার নেই।”
” আমার চিন্তা না থাকলেও আম্মুর আছে।”
ফারহান কিছু বললো না। ফারিন থামলোও না।
” হয় তোমার নিজের পছন্দের কেউ থাকলে আমাদের বলো, আর না থাকলে আমরা মেয়ে পছন্দ করবো। অন্তত সেই অনুমতিটা দাও।”
কথাগুলো বলে সে ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। কিন্তু, ফারহান যেন কিছুই শুনেনি। শান্ত ভাবে ফাইলের পাতা উল্টে চলেছে। এই মানুষটার এমন ভাবলেশহীন আচরণে ফারিনের ভীষণ রাগ লাগে। সে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে বললো,
” আমি তোমার সাথে কথা বলছি।”
” আমিও তো শুনছি।”
” শুনছো না।”
” শুনছি।”
” তাহলে উত্তর দিচ্ছো না কেন?”
ফারহান এবার চেয়ার ছেড়ে পেছনে হেলান দেয়। মুখে ক্লান্তির ছাপ।
” কারণ এই মুহুর্তে আমার বিয়ে করার কোনো ইচ্ছা নেই।”
” এই একই কথা গত কয়েক বছর ধরে শুনে আসছি।”
” তাহলে আর নতুন করে বলার কি আছে?”
ফারিন হতাশ হয়ে মাথা নাড়ায়। কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এলো রুমে। তারপর সে একটু নরম গলায় বলে ওঠে,
” তুমি কি সারাজীবন একা থাকতে চাও?”
ফারহান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো। জানালার বাইরে তাকালো একবার। রাতের অন্ধকারে দূরের আলো ঝাপসা হয়ে জ্বলছে। তারপর ধীরস্বরে বললো,
” ভবিষ্যতের কথা ভবিষ্যতেই দেখা যাবে।”
ফারিন এবার সত্যিই বিরক্ত হয়ে যায়।
” তোমার সাথে কোনো কথা বলা যায় না।”
” তাহলে বলিস না।”
” একটা কথা মনে রেখো, সবসময় কাজ মানুষকে সঙ্গ দেয় না। দিনের শেষে মানুষের একজন মানুষও লাগে।”
ফারহান কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইলো। তারপর দ্রুত ফাইলটা সামনে টেনে নিয়ে আবার কাজে মন দেওয়ার চেষ্টা করে। ফারিন কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। মনে হচ্ছে, আজ কোনো উত্তর না নিয়ে সে এই রুম থেকে বের হবে না। ভাইয়ের এই উদাসীনতা তার একদমই ভালো লাগছে না। মানুষের জীবনে কাজ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু কাজই তো সবকিছু নয়। সে আবারও গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,
” ভাইয়া! একটা কথা বলি?”
ফারহান ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখেই উত্তর দিলো,
” বল।”
” আম্মু একটা মেয়ের কথা বলছে।”
কথাটা শুনেও বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো না ফারহানের মধ্যে। সে ফাইলের একটা পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে শান্ত স্বরে বললো,
” কোনো মেয়ে দেখার প্রয়োজন নেই।”
ফারিন ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
” তাহলে কি তোমার কোনো পছন্দ আছে?”
প্রশ্নটা শুনে ফারহানের হাত থেমে যায়। ফাইলের ওপর রাখা কলমটা ধীরে টেবিলে নামিয়ে রাখলো সে। কয়েক মুহূর্ত নীরব হয়ে বসে রইলো। তারপর খুব ধীরে মুখ তুলে একবার তাকালো ফারিনের দিকে। ফারিনের চোখে কৌতূহল স্পষ্ট। কিন্তু, ফারহান কোনো উত্তর দেয় না। বরং দৃষ্টি সরিয়ে জানালার দিকে তাকায়। জানালার ওপারে গভীর রাতের আকাশ। সেই অন্ধকারের মাঝেই হঠাৎ করে ভেসে উঠলো একটি মুখ। প্রভা! মুহূর্তের জন্য বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠলো তার। গত কয়েক সপ্তাহে মেয়েটার জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। মাতৃত্বের কোমল আভা যেন তাকে আরও অন্যরকম করে তুলেছে। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের মুখটায় এখন এক ধরনের প্রশান্ত সৌন্দর্য ফুটে থাকে সবসময়।আজকাল মেয়েটাকে ভীষণ সুন্দর লাগে তার। খুব বেশি সাজসজ্জা নয়। খুব বেশি কথা নয়। তবুও কেন জানি চোখ সরাতে ইচ্ছে করে না। ঠিক তখনই ফারিনের কণ্ঠস্বর তার চিন্তার জাল ছিঁড়ে দিলো।
” ভাইয়া! কিছু বলছো না কেন?”
ফারহান বাস্তবে ফিরে এলো। চোখের পলকে মুখের সব অনুভূতি গুছিয়ে নিয়ে সে হালকা একটা হাসি দেয়।
” আচ্ছা, আমাকে একটু সময় দে। আমি বলবো তোদের।”
ফারিনের চোখ দুটো সঙ্গে সঙ্গে বড় হয়ে যায়।
” মানে সত্যিই কিছু আছে?”
ফারহান এবার শুধু রহস্যময় হাসলো।
” সময় হলে জানতে পারবি।”
ফারিন ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো,
” ওকে। কিন্তু বেশি সময় নিও না।”
” ঠিক আছে!”
” ফিহা কই?”
” ফাহিমের কাছে।”
” আচ্ছা!”
ফারিন আর কিছু বললো না। মুখে চাপা হাসি নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো সে। ফারহান কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইলো। তারপর সামনে ছড়িয়ে থাকা ফাইলগুলোর দিকে তাকায়। কাজ করার চেষ্টা করে।কিন্তু, মন বসলো না। বারবার একটা মুখই সামনে ভেসে উঠছে। প্রভা! দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফাইলগুলো একপাশে সরিয়ে রাখলো সে। এরপর চেয়ার ছেড়ে উঠে বারান্দার দিকে চলে যায়।
#_চলবে_ইনশাআল্লাহ_🌹
#_এক_ফালি_রোদ্দুর_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_পর্ব_৫_(বর্ধিতাংশ)
বাইরে ঝড়ো হাওয়া আরও তীব্র হয়ে উঠছে। জানালার কাঁচে হালকা কাঁপন ধরেছে, যেন প্রকৃতিও কোনো অস্থির স্মৃতির ভার বইতে পারছে না।আকাশের ভেতর জমে থাকা মেঘগুলো বারবার একে অপরের সাথে ধাক্কা খাচ্ছে, আর সেই সংঘর্ষের শব্দহীন গর্জনে রাতটা আরও ভারী হয়ে উঠছে।
ফারহান বারান্দার রেলিংয়ে হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকে। ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগছে, কিন্তু তার ভেতরের উত্তাপটাকে যেন স্পর্শ করতে পারছে না। চোখ বন্ধ করলেই বর্তমানটা কোথাও মিলিয়ে যায়, শুধু ভেসে ওঠে বহু পুরোনো সময়ের টুকরো টুকরো ছবি।
সেই দিনগুলো ছিল একেবারেই সাধারণ, অথচ কেন জানি আজ সেগুলোই সবচেয়ে বেশি মূল্যবান মনে হয়। কলেজের প্রথম দিকের সময়, যখন জীবন নিয়ে এতো হিসাব ছিলো না, সম্পর্কগুলো এতো জটিল হয়ে ওঠেনি, আর অনুভূতিগুলো লুকিয়ে রাখার মতো এতো প্রাচীরও তৈরি হয়নি। সেদিনের সেই প্রথম দেখা এখনো তার মনে জীবন্ত। ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ এক অপ্রত্যাশিত মুহূর্তে তৈরি হওয়া ছোট্ট সংঘর্ষ, তারপর সেই অপরিচিত মুখের অস্বাভাবিক শান্ত আচরণ।চারপাশে যখন সবাই অল্পতেই বিরক্ত হয়ে উঠতো, তখন সেই মেয়েটার চোখে ছিল এক ধরনের সহজ স্বাভাবিকতা, যেন ছোট ছোট ঘটনাগুলোকে বড় করে দেখার অভ্যাস তার নেই।
সেই প্রথম অনুভূতি ছিলো কৌতূহলের। তারপর সেই কৌতূহল ধীরে ধীরে বদলে গিয়েছিল অভ্যস্ততায়। প্রতিদিন দেখা হওয়া, অল্প অল্প করে কথা বাড়া, একসাথে ক্লাসের ফাঁকে বসে থাকা, আর সময়ের অজান্তেই একে অপরের উপস্থিতিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা। সম্পর্কটা শুরুতে বন্ধুত্বের মতোই ছিল, খুব সাধারণ, খুব নির্ভার। কিন্তু, সেই নির্ভারতার ভেতরেই কোথাও ফারহানের অনুভূতিগুলো আলাদা পথে হাঁটতে শুরু করেছিলো। প্রভাকে দেখা মানে তখন শুধু একজন বন্ধুকে দেখা ছিলো না, বরং এক ধরনের শান্তির জায়গায় ফিরে যাওয়া। মেয়েটার উপস্থিতি যেন চারপাশের সব কোলাহলকে কমিয়ে দিতো।
ফারহান তখন বুঝেছিল, এই পরিবর্তনটা সাধারণ কিছু নয়। কিন্তু বুঝলেও সে কখনো স্বীকার করতে চায়নি। নিজের ভেতরের অনুভূতিকে নাম দেওয়াও তার কাছে তখন বিপজ্জনক মনে হতো। কারণ নাম দিলে দায়িত্ব আসে, আর দায়িত্ব মানেই হারানোর ভয়। সবচেয়ে বড় ভয় ছিল সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার। প্রভা যদি কখনো দূরে সরে যায়, যদি সেই সহজ বন্ধুত্বের জায়গাটা নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে স্বাভাবিক অংশটাই হারিয়ে যাবে। সেই ভয়ই তাকে বারবার থামিয়ে দিয়েছে। তাই অনুভূতি যতোই গভীর হয়েছে, প্রকাশ ততোটাই চাপা পড়ে গেছে।
সময় এগিয়েছে, আর সেই না বলা অনুভূতিগুলো ভেতরে ভেতরে আরও ভারী হয়েছে। একসময় যা ছিলো শুধু একতরফা মুগ্ধতা, তা ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে নীরব ভালোবাসায়। এমন ভালোবাসা, যেটা নিজের কাছেও স্বীকার করা সহজ ছিলো না।
ইন্টার দ্বিতীয় বর্ষের সেই সময়টা ছিলো তাদের জীবনের সবচেয়ে টানটান অধ্যায়। সামনে এইচএসসি পরীক্ষা, চারপাশে বইয়ের চাপ, ভবিষ্যতের অজানা ভয়, সব মিলিয়ে দিনগুলো ভারী হয়ে উঠছিলো। তবুও সেই ভারের ভেতরেই কোথাও এক ধরনের সহজ আলো ছিল, যেটা ফারহানের কাছে ছিলো প্রভা।
সেই সময় হঠাৎ করেই ফারহানের নানা বাড়িতে কিছুদিনের জন্য যাওয়া হয়ে যায়। কয়েকটা দিন ছিলো নিঃশব্দ, ধীর, কিন্তু ভেতরে ভেতরে টান তাকে তাড়িত করছিলো, প্রভার সাথে দেখা না হওয়ার অস্বস্তি, অকারণ অস্থিরতা, আর অভ্যাস হয়ে যাওয়া উপস্থিতির অভাব। ফিরে আসার পর সেই অভাবটা প্রথমে খুব বেশি চোখে পড়েনি। মনে হয়েছিল হয়তো কয়েকটা দিনই তো, স্বাভাবিকভাবে আবার দেখা হয়ে যাবে। কিন্তু দিন গড়িয়ে গেলেও প্রভা আর ফিরে এলো না। প্রথমে সেটা কেবলই অনুপস্থিতি ছিলো, পরে তা ধীরে ধীরে রূপ নিল শূন্যতায়। দুই তিন দিন অপেক্ষার পর যখন আর কোনো খোঁজ পাওয়া গেলো না, তখন অস্থিরতা আর শুধু মনের ভেতর থাকলো না। সেটা বেরিয়ে এলো বাস্তবতার খোঁজে।
ফারহান নিজেই প্রভার ভাড়া বাসার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু, সেখানে গিয়ে যে খবরটা পেলো, তা তার ভেতরের জমে থাকা আশাটাকে এক ঝটকায় ভেঙে দিলো। কিছুদিন আগেই তারা সেই বাসা ছেড়ে চলে গেছে। কোথায় গেছে, কেন গেছে, এমন কোনো তথ্যই আর নেই। চারপাশের পরিচিত গলি, প্রতিবেশী মুখ, প্রতিটা দরজা, সবখানে খোঁজ নেওয়া হলো।কোথাও কোনো চিহ্ন নেই। প্রভা যেন হঠাৎ করেই বাস্তব জীবন থেকে মুছে গেছে, রেখে গেছে শুধু প্রশ্ন। স্কুলে গিয়ে যখন জানা গেলো সে টিসি নিয়ে অন্য কোথাও চলে গেছে, তখন সেই শূন্যতা আরও গভীর হয়ে উঠলো। কোনো ঠিকানা নেই, কোনো বিদায় নেই৷ শুধু নিঃশব্দভাবে হারিয়ে যাওয়া।
পরবর্তী দিনগুলোতে সময় কেবল এগিয়েছে, কিন্তু ফারহানের ভেতরে আটকে থাকা সেই মুহূর্তটা এগোয়নি। পাড়া, শহর, সম্ভাব্য জায়গা, সবখানেই খোঁজ চলেছে এক ধরনের অসম্পূর্ণ আশায় ভর করে। কিন্তু প্রতিবারই ফিরে এসেছে একই রকম শূন্য উত্তর। ধীরে ধীরে দিন সপ্তাহে, সপ্তাহ মাসে, মাস বছরে পরিণত হয়েছে। জীবন এগিয়েছে নিজের নিয়মে, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, তারপর মাস্টার্স পর্যন্ত। বাইরে থেকে সব স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরের একটা অংশ যেন সবসময় সেই পুরোনো জায়গাতেই দাঁড়িয়ে ছিলো।
ফারহান মাঝেমধ্যেই আবার খোঁজ শুরু করতো, কখনো হাল ছাড়তো না পুরোপুরি। যেন কোনো অদৃশ্য আশা তাকে বারবার টেনে রাখতো সেই অসমাপ্ত অধ্যায়ের দিকে। মাস্টার্স পরীক্ষার শেষ দিনটা ছিল অন্যরকম। একদিকে ক্লান্তি, অন্যদিকে একটা দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি। সেদিনই ভাগ্যের অদ্ভুত মোড়ে ফারহান কিছু খোঁজ পায়, ছোট, অস্পষ্ট, কিন্তু বহুদিন পর একটি দিকনির্দেশনার মতো। কিন্তু সেই খোঁজ আনন্দ নিয়ে আসেনি। বরং নিয়ে এসেছে এক ভার।
কারণ, যাকে এতোদিন ধরে খুঁজে বেড়ানো হয়েছে, যাকে ঘিরে এতো বছর ধরে একটা নীরব অপেক্ষা বেঁচে ছিলো, সে তখন আর আগের জায়গায় নেই।
প্রভা তখন অন্য কারও জীবনের অংশ হয়ে গেছে। সদ্য বিবাহিত একজন নারী, যার পরিচয় এখন অন্য নামের সাথে জড়িয়ে গেছে, রাজ রহমান, শহরের পরিচিত এক ব্যবসায়ী। সেই মুহূর্তে ফারহানের দীর্ঘ অনুসন্ধান থেমে যায় না, কিন্তু তার অর্থ বদলে যায়। খোঁজ পাওয়া আর পাওয়া না পাওয়ার মাঝের যে জায়গাটা, সেটাই হয়ে দাঁড়ায় সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা। কারণ কখনো কখনো, যা পাওয়া যায় না বলে কষ্ট থাকে, তা যখন সত্যিই পাওয়া যায়, তখন সেটাই সবচেয়ে বড় হারিয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি হয়ে দাঁড়ায়।
অনেক বছর ধরে ফারহান নিজের ভেতর একটা ছন্দ তৈরি করে নিয়েছিলো, কাজ, দায়িত্ব, একাকিত্ব, সব মিলিয়ে একধরনের নিয়ন্ত্রিত জীবন। সেই নিয়ন্ত্রণই ছিলো তার ঢাল, তার অভ্যাস, তার বেঁচে থাকার নিয়ম। মাস্টার্স শেষ হওয়ার পর দিনগুলো যেন এক ধরনের শূন্যতায় ভেসে গিয়েছিলো। যেটুকু উদ্দেশ্য ছিল, সেটুকুও হারিয়ে যাচ্ছিল। বাবার রেখে যাওয়া ব্যবসা, যেটা এতোদিন তার মা সামলাচ্ছিলেন, সেটার ভার শেষ পর্যন্ত তার কাঁধেই এসে পড়ে। সে দায়িত্ব নিয়েছিলো। কারণ, তার কাছে জীবন মানে ছিল দায়িত্ব এড়ানো নয়, বরং চুপচাপ বহন করে যাওয়া। কিন্তু, জীবন কখনোই শুধু বহনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেটা ফারহান বুঝেছে অনেক পরে।
সেই দিনগুলোতে ফারহান প্রায়ই নিজেকে তাচ্ছিল্য করতো। যেন নিজের কাছেই নিজের কোনো ব্যাখ্যা নেই। সময়ের সাথে সাথে মানুষ বদলায়, কিন্তু কিছু কিছু অপেক্ষা বদলায় না, শুধু রূপ পাল্টায়।ফারহানের ভেতরেও তেমনই কিছু একটা ছিলো, যেটার নাম সে কখনো দিতে চায়নি। তারপর হঠাৎই সবকিছু বদলে যায়। যেন বহু বছরের বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে কেউ হঠাৎ করে আলো নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
প্রভার ফিরে আসা তার জীবনে কোনো সাধারণ ঘটনা ছিল না। সেটা ছিল এমন এক ধাক্কা, যেটা তার গুছিয়ে রাখা পৃথিবীর সব নিয়ম এক মুহূর্তে এলোমেলো করে দেয়। সময়ের হিসাব, সিদ্ধান্তের ভার, বাস্তবতার কঠোরতা, সবকিছুই হঠাৎ করে অন্য রকম হয়ে যায়। প্রভার উপস্থিতি তার ভেতরে কোনো অভিযোগ তৈরি করেনি। কোনো ক্ষোভ না, কোনো আক্ষেপ না। বরং একটা স্থিরতা এনে দিয়েছে, যেটা সে ব্যাখ্যা করতে পারে না।
সবচেয়ে অদ্ভুত এই সত্যটা, প্রভা এখন আর একা নয়, তার জীবন অন্য কারও সাথে জড়িয়ে গেছে, আর তবুও ফারহানের ভেতরে কোনো প্রতিযোগিতা নেই, কোনো অধিকারবোধের হাহাকার নেই। শুধু আছে একধরনের নীরব টান, যেটা সময়ের সাথে কমেনি, বরং আরও গভীর হয়েছে। কখনো কখনো তার মনে হয়, সে কি সত্যিই প্রভাকে নিজের কাছে টেনে আনতে চায়? নাকি সে শুধু সেই মানুষটাকে হারাতে চায় না, যার অস্তিত্ব একসময় তার জীবনের সবচেয়ে শান্ত জায়গা ছিল? উত্তর সে নিজেও জানে না। তবে একটা বিষয় খুব স্পষ্ট, প্রভার সামান্য কষ্টও তার ভেতরে অস্থিরতা তৈরি করে। সেই কষ্ট যেন তার নিজের গায়ে লাগে। সে সহ্য করতে পারে না, এমনকি মেনে নেওয়াও তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এই অনুভূতি ভালোবাসা কি না, সে সেটা নিয়েও আর মাথা ঘামায় না। কারণ নাম দিলেই জটিলতা আসে, আর জটিলতা মানেই আবার হারানোর ভয়।
বাইরে আকাশ বদলে গেছে। মেঘ জমে আসছিলো অনেকক্ষণ ধরেই, কিন্তু সেই জমাট বাঁধা আকাশ যেন হঠাৎ ভেঙে পড়ে। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামতে শুরু করে। বারান্দার ভেতরে থাকা বাতাস এক মুহূর্তে ভিজে যায় বৃষ্টির ছাটে। ফারহান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ঠান্ডা পানি তার মুখে এসে লাগে, গাল বেয়ে নেমে যায়, কিন্তু সে সরে যায় না। বরং চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকায়। অন্ধকারের বুক চিরে হঠাৎ করে কোথাও কোথাও আলো ঝিলমিল করে ওঠে। যেন রাতের গভীরতার মাঝেও কোনো অনুচ্চারিত সত্য লুকিয়ে আছে। সে হাত বাড়িয়ে দেয় বৃষ্টির দিকে। আঙুলের ডগায় ঠান্ডা জল জমে, তারপর ফসকে পড়ে যায়। সেই স্পর্শে কোনো আশ্বাস নেই, তবুও একটা অদ্ভুত অনুভূতি থাকে, যেন অতীত আর বর্তমান একসাথে ভিজে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে সে, নিজের ভেতরের শব্দহীন জগতে হারিয়ে। তারপর কোনো অদৃশ্য ভার নামিয়ে রেখে সে বারান্দা ছেড়ে ভেতরে চলে যায়।
…
বেশ কয়েকদিন ধরে টানা বৃষ্টিতে যেন চারপাশের পৃথিবী ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলো। আকাশের মুখ ভার ছিল, বাতাসে ছিল এক ধরনের স্যাঁতসেঁতে বিষণ্ণতা। কিন্তু, আজ সকাল থেকেই প্রকৃতির চেহারা বদলে গেছে। ঝকঝকে রোদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে, ভেজা পাতার গায়ে আলো ঝিলমিল করছে, আর দীর্ঘদিন পর আকাশটাকেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে দেখা যাচ্ছে।
আজ অফিসের ছুটির দিন। এমনিতেও আর বেশি দিন অফিসে যাওয়া হবে না প্রভার। ফারহানের বলা অনুযায়ী সামনের সপ্তাহ থেকেই তাকে বাসা থেকে কাজ করতে হবে। ফলে জীবনের ছন্দে আরেকটি পরিবর্তন আসতে চলেছে। বাড়িটাও আজ নির্জন। ভাই, ভাবি আর তাদের দুই সন্তান সকালে ভাবির বাবার বাড়িতে বেড়াতে গেছে। কয়েকদিন সেখানেই থাকবে তারা। বাবা মাও কিছু প্রয়োজনীয় কেনাকাটার জন্য বাইরে বেরিয়েছেন।
বাসার প্রতিটি ঘরে নিস্তব্ধতা ছড়িয়ে আছে। এই নিঃশব্দ সময় কাটানোর জন্য নিজের বুকশেলফ থেকে একটি উপন্যাস বের করে নিয়ে বসে প্রভা। জানালার পাশে রাখা চেয়ারে হেলান দিয়ে বইয়ের পাতায় চোখ রাখে সে। ঠিক তখনই হঠাৎ কলিং বেলের শব্দ ভেসে এলো। নীরব বাড়ির মধ্যে শব্দটা অস্বাভাবিকভাবে স্পষ্ট শোনায়। প্রভা বইয়ের পাতা থেকে চোখ তুলে ঘড়ির দিকে তাকায়। বাবা মা এতো দ্রুত ফিরে আসার কথা নয়। বের হওয়ার সময় তারা বলেছিলেন ফিরতে বেশ কিছুটা সময় লাগবে। তাহলে কে আসলো?
দরজা খুলতেই সময় যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে যায় প্রভা। সামনের পরিচিত মুখটি দেখে প্রভার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠলো। দীর্ঘদিনের চেনা সেই মুখ। বয়সের ছাপ কিছুটা স্পষ্ট হয়েছে, চোখের কোণে ক্লান্তির রেখাও আগের চেয়ে গভীর। তবুও সেই স্নেহমাখা দৃষ্টি একটুও বদলায়নি। দাঁড়িয়ে আছেন তার শাশুড়ি। এক মুহূর্তে অসংখ্য স্মৃতি ঝড়ের মতো এসে আঘাত করে প্রভার মনে। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর অনেকগুলো স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই মানুষটি। সেই বাড়ি, সেই দিনগুলো, সেই সম্পর্ক, যেগুলো এখন অতীত হয়ে গেছে।
মানুষ সাধারণত বলে, ভালো স্বামীর সঙ্গে খারাপ শাশুড়ির গল্প বেশি দেখা যায়। কিন্তু, প্রভার জীবনে যেন সবকিছু উল্টো ছিলো। যে মানুষটির সঙ্গে জীবন কাটানোর স্বপ্ন দেখেছিলো, সেই মানুষটিই একদিন তাকে সবচেয়ে বেশি আঘাত দিয়েছে। অথচ তার শাশুড়ি কখনো তাকে পর ভাবেননি। বিয়ের পর প্রথম দিন থেকেই তিনি তাকে মেয়ের মতো আগলে রেখেছিলেন। অসুস্থ হলে রাত জেগে পাশে বসে থেকেছেন, মন খারাপ হলে বুঝিয়ে শুনিয়ে সাহস দিয়েছেন, ভুল করলে বকেছেনও, কিন্তু সেই বকুনির ভেতরেও ছিল মায়ের মমতা। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর সবচেয়ে বেশি কষ্টের একটি কারণ ছিল এই মানুষটিকে হারিয়ে ফেলা। কারণ স্বামীকে হারানোর বেদনার বাইরে, একজন মায়ের মতো মানুষকেও হারানোর শূন্যতা তৈরি হয়েছিল তার জীবনে। আজ এতোদিন পর তাকে সামনে দেখে বুকের ভেতর জমে থাকা সব শক্তি যেন এক মুহূর্তে ভেঙে পড়লো। চোখের কোণে পানি জমে উঠল অপ্রতিরোধ্যভাবে। কতোদিন পর এই মুখটা দেখছে সে? হয়তো মাসের হিসাব আছে, কিন্তু সেই অপেক্ষার অনুভূতির কোনো হিসাব নেই।
সামনের মানুষটিও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর চোখদুটোও অস্বাভাবিকভাবে ভেজা লাগছে। দীর্ঘদিন ধরে বুকের মধ্যে জমে থাকা অগণিত অনুভূতি যেন নীরবে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। মারফুয়া বেগমও কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি টেনে বললেন,
” ভেতরে যেতে বলবি না?”
প্রভা যেন বাস্তবে ফিরে এলো। তড়িঘড়ি করে একপাশে সরে দাঁড়িয়ে বললো,
” আসুন, আম্মা!”
মারফুয়া বেগম ভেতরে প্রবেশ করলেন। ঘরে ঢুকেই চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। বাড়িটা শান্ত হয়ে আছে। কোথাও কোনো শব্দ নেই, শিশুদের কোলাহল নেই, মানুষের চলাফেরার আওয়াজ নেই। কিছুটা অবাক হয়ে তিনি বললেন,
” সবাই কোথায়?”
প্রভা দরজা বন্ধ করতে করতে উত্তর দিলো,
” বাড়িতে নেই। ভাইয়া, ভাবিরা বেড়াতে গেছে। বাবা মাও বেরিয়েছেন। আপনি, বসুন।”
ড্রইংরুমের সোফায় গিয়ে বসলেন মারফুয়া বেগম।প্রভা কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কী বলবে, কী করবে, বুঝে উঠতে পারছে না। অবশেষে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
” আমি একটু চা করে নিয়ে আসি।”
কিন্তু মারফুয়া বেগম সঙ্গে সঙ্গেই মাথা নেড়ে না করলেন।
” তার কোনো প্রয়োজন নেই। তুই আমার পাশে এসে বোস।”
কথাটা বলার ভঙ্গিতে এমন এক মায়া ছিল, যেটা শুনে প্রভার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তাঁর পাশে বসে পড়লো। বসার সঙ্গে সঙ্গেই মারফুয়া বেগম নিজের কাঁপা হাতটা তুলে প্রভার গালে রাখলেন। তিনি কিছুক্ষণ কোনো কথা বললেন না। শুধু ছলছল চোখে তাকিয়ে রইলেন প্রভার মুখের দিকে। অবশেষে ভারী গলায় বললেন,
” সিম বদলিয়ে ফেলেছিস? এই মা টার কথা একদম ভুলে গেছিস? অন্যায় আমার ছেলে করেছে, আমাকেও শাস্তি দিচ্ছিস?”
শব্দগুলো শুনেই প্রভার বুকের ভেতরে জমে থাকা দেয়ালটা ভেঙে পড়লো। তার চোখ বেয়ে নিঃশব্দে জল গড়িয়ে পড়তে লাগে। কাঁপা কণ্ঠে সে বলে ওঠে,
” আমি কি করতাম, আম্মা? আমাকে তো বাঁচতে হবে।”
মারফুয়া বেগম গভীর কষ্ট নিয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর নিজের আঁচল দিয়ে আলতো করে তার গাল বেয়ে নেমে আসা অশ্রুবিন্দুগুলো মুছে দিলেন। একটু সময় নিয়ে মারফুয়া বেগম ধীরে ধীরে বললেন,
” ওদের এনগেজমেন্ট হয়ে গেছে।”
প্রভা স্থির হয়ে বসে রইলো। মারফুয়া বেগম আবার বললেন,
” সামনের মাসেই হয়তো বিয়েটা হয়ে যাবে। কিছু কি করা যায় না, মা?”
কথাগুলো বলতে গিয়ে তাঁর গলা কেঁপে উঠলো। প্রভা কয়েক সেকেন্ড কোনো উত্তর দিল না। শুধু নিচের দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর মুখ তুলে শান্ত গলায় বললো,
” কি করবো আমি, আম্মা? কি করার আছে আমার?”
প্রভা একটু থেমে তিক্ত হাসে।
” আপনার ছেলে তো আমাকে ডিভোর্স দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে।”
কথাটা শুনে মারফুয়া বেগমের কপালে ভাজ পড়ে যায়। তিনি অবাক হয়ে তাকালেন।
” তোদের এখনো ডিভোর্স হয়নি?”
প্রভা মাথা নাড়ায়।
” না!”
” কিন্তু, রাজ তো আমাকে বলেছে ডিভোর্স কমপ্লিট।”
প্রভা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
” কাগজে সই এখনো হয়নি, আম্মা! এই মুহূর্তে ডিভোর্স কার্যকর হবে না। আইনগতভাবে সবকিছু সম্পূর্ণ হতে আরও আট নয় মাস অপেক্ষা করতে হবে।”
মারফুয়া বেগম নির্বাক হয়ে গেলেন। তিনি কিছু বললেন না। শুধু মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। প্রভা নিজের আঙুলগুলো মুঠো করে বসে আছে।অবশেষে খুব শান্ত স্বরে বললো,
” আমি মা হতে চলেছি।”
মারফুয়া বেগমের চোখ বন্ধ করে ফেললেন। এক মুহূর্তে তাঁর বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতির ঢেউ আছড়ে পড়ল। শান্তি। অশান্তি। স্বস্তি। ভয়। সবকিছু একসাথে এসে জড়িয়ে গেলো। তাঁর নাতি বা নাতনি পৃথিবীতে আসতে চলেছে, এই ভাবনাটা বুকের ভেতর অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে দিচ্ছে। আবার একইসঙ্গে মনে হচ্ছে, কতো কিছু ভেঙে যাচ্ছে, কতো কিছু হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এই অনুভূতির নাম কি? তিনি নিজেও জানেন না। কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে চোখ খুললেন তিনি। চোখদুটো অস্বাভাবিকভাবে ভেজা। নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
” রাজ সবটা জানে, তাই না?”
প্রভা মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।
” হুম!”
” আমি জানতাম, এই খবরটা কখনোই আপনাদের বলবে না।”
মারফুয়া বেগমের বুকটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠলো।তিনি কষ্ট নিয়ে বললেন,
” তুইও জানানোর প্রয়োজন মনে করিসনি?”
প্রভা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। মৃদু স্বরে সে বললো,
” কি হবে বলে?”
মারফুয়া বেগম ছলছল চোখে তাকিয়ে রইলেন প্রভার দিকে। মেয়েটার মুখটা আগের মতোই আছে, অথচ কত বদলে গেছে। যে মেয়েটা একসময় ছোট ছোট ব্যাপারেও তাঁর কাছে ছুটে আসতো, আজ সে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় খবরটাও একা বয়ে বেড়াচ্ছে। কেন যেন সেই মুহূর্তে তাঁর নিজের ওপরই ঘৃণা হতে লাগে। মায়ের পরিচয় দেওয়ার অধিকার থাকলেও, সন্তানের ভুলের দায় থেকে তিনি কি সত্যিই মুক্ত? নাকি ছেলের প্রতিটি অন্যায়ের কিছু অংশ তাঁর কাঁধেও এসে জমা হয়েছে? প্রভার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তাঁর চোখ বেয়ে নিঃশব্দে একটি অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ে। মারফুয়া বেগম ধীরে ধীরে কাঁপা গলায় প্রশ্ন করলেন,
” কয় মাস?”
প্রভা এক মুহূর্ত নিচের দিকে তাকিয়ে থেকে শান্ত স্বরে উত্তর দেয়,
” তিন মাস।”
কথাটা শোনার পর মারফুয়া বেগমের চোখ আবার ভিজে উঠলো। বুকের ভেতর জমে থাকা অগণিত অনুভূতি একসঙ্গে নাড়া দিয়ে উঠলো। তিনি আলতো করে প্রভার হাত নিজের হাতে নিয়ে বললেন,
” শোন, আমি তোর আর আমার নাতির দায়িত্ব নিবো। হয়ে যাক ডিভোর্স, কিন্তু আমার নাতি তো আর পর হয়ে যাবে না।”
প্রভার ঠোঁটের কোণে হালকা একটা হাসি ফুটে উঠলো।
” আমি চাই না এইটা, আম্মা!”
” কেন চাস না? এই সন্তান ওই বাড়ির একমাত্র উত্তরাধিকার। আমি চাই এই সন্তান তার প্রাপ্য পাক। আমাদের সব প্রোপার্টির আশি শতাংশ রাজের নামে করা। আর বাকি বিশ শতাংশ তোর শ্বশুর আর আমার নামে। এই অংশটা আমি তোদের সন্তানের নামে করে দিবো।”
প্রভা কিছুক্ষণ নীরব রইলো। তারপর খুব ধীর অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললো,
” আমি বিন্দুমাত্র সম্পত্তি আমার সন্তানকে ভোগ করতে দেবো না, আম্মা! যেখানে সে তার পিতাকেই পাচ্ছে না, সেখানে সেই সম্পত্তির কোনো প্রয়োজন নেই।”
” কিন্তু, প্রভা…”
তাঁর কথা শেষ হওয়ার আগেই প্রভা মাথা নেড়ে থামিয়ে দেয়।
” কোনো কিন্তু না, আম্মা! আমি আপনাকে এই ব্যাপারে অনুরোধ করছি, এমন দাবি করবেন না দয়া করে।”
মারফুয়া বেগম হতাশ চোখে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন, প্রভার এই সিদ্ধান্ত কোনো মুহূর্তের আবেগ নয়। দীর্ঘ কষ্ট, অপমান, ভাঙন আর একাকীত্বের ভেতর দিয়ে হেঁটে আসা একজন নারীর দৃঢ় অবস্থান এটা। তাঁর বুকের ভেতর হাহাকার জমতে লাগে। একদিকে নিজের নাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা, অন্যদিকে প্রভার আত্মসম্মানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অসহায়ত্ব। তিনি জানেন, এই মেয়েটাকে জোর করে কোনো সিদ্ধান্তে আনা সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে তিনি প্রভার মাথায় হাত রাখলেন। আঙুলগুলো কাঁপছে। মারফুয়া বেগম ভাঙা গলায় বলে,
” আমাকে মাফ করে দিস, মা! তোর জন্য আমি কিছু করতে পারলাম না। একমাত্র সন্তান বলে সবকিছু কেমন জানি মুখ বুজে মেনে নিচ্ছি। আমি চেয়েও প্রতিবাদ করতে পারছি না। আমি জানি, এটা অন্যায় করছি। কিন্তু ওর সামনে গেলে আমার আর কিছুই করার ক্ষমতা থাকে না। আমি মা। প্রভা! মা হয়ে যাই আমি তখন।”
মারফুয়া বেগম এক মুহূর্ত থেমে গেলেন। চোখ তুলে তাকালেন প্রভার দিকে।
” কিন্তু, আমি জানি, ও খুব বাজেভাবে ভুগবে। তোর শূন্যতা ও বুঝবে। কিন্তু, তখন কিছুই করার থাকবে না।”
প্রভা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর খুব শান্ত গলায় বললো,
” আমি তো আপনাকে চিনি, আম্মা! তাই আপনার প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই।”
মারফুয়া বেগম মাথা নামিয়ে নিলেন। ঠোঁট কেঁপে উঠছে, তবুও তিনি কিছু বলতে পারছিলেন না।কিছুক্ষণ পর তিনি আবার বললেন, এবার কণ্ঠে তিক্ততা মেশানো কষ্ট,
” এরকম একটা মেয়েকে ছেড়ে আমার ছেলেটা আরেকটা মেয়ের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলছে। আমি জানি, ঐ মেয়েটা ওকে ভালোবাসে না। ও শুধু আমার ছেলের অর্থসম্পত্তিকে ভালোবাসে। খুব বাজে মেয়ে। আরও অনেক বাজে কথা শুনেছি আমি। তোকে বলতেও আমার মুখ আটকে যাচ্ছে।”
এইবার প্রভা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না।
তার ভেতরের জমে থাকা কষ্ট, অপমান, চাপা রাখা ভাঙন, সব একসাথে ফেটে পড়লো। সে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে।
” আমি এই সম্পর্কে কিছু শুনতে চাই না, আম্মা! আমি শুধু আমার সন্তানকে নিয়ে ভালোভাবে বাঁচতে চাই।”
প্রভা মাথা তুলে তাকায়। চোখ লাল হয়ে গেছে।
” আপনার ছেলেকে আমি কোনোদিনও ক্ষমা করবো না। কোনোদিনও না। কেন এসেছেন আম্মা আপনি? কেন এসেছেন? আমাকে দুর্বল বানাবেন না। একটুও না। আমি শক্ত থাকতে চাই। আমার সন্তানের জন্য আমি শক্ত থাকতে চাই।”
শেষ কথাগুলো বলতে গিয়ে তার কণ্ঠ প্রায় হারিয়ে যায়। মারফুয়া বেগম এগিয়ে এসে প্রভাকে জড়িয়ে ধরে। প্রভার ভেতরের সব বাধ ভেঙে যায়। সে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না। মারফুয়া বেগমের বুকের ভেতর মুখ গুঁজে সে কেঁদে উঠলো।আর মারফুয়া বেগমও। তার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে চুপচাপ।
#_চলবে_ইনশাআল্লাহ_🌹

