#_এক_ফালি_রোদ্দুর_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_পর্ব_৬_
সময়ের গতির জন্য প্রভার প্রেগন্যান্সির আজ আট মাস চলে। সময় পরিক্রমায় অনেক কিছু বদলিয়েছে। জীবনের যে অধ্যায়গুলো একসময় কেবল বেদনা, অনিশ্চয়তা আর একাকীত্বে ভরা ছিল, সেগুলোর রঙ ধীরে ধীরে পাল্টাতে শুরু করেছে। সবকিছু একদিনে বদলায়নি। পরিবর্তন এসেছে খুব ধীরে, নিঃশব্দে, ঠিক যেমন ভোর হওয়ার আগে অন্ধকার একটু একটু করে পাতলা হয়ে যায়।
এই কয়েক মাসে শুধু প্রভার সাথেই নয়, তার পুরো পরিবারের সাথেও ফারহানের সম্পর্ক সহজ ও স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। প্রভার অফিসে যাওয়া বন্ধ হয়ে বাসা থেকে কাজ শুরু করার ঠিক দুইদিন পরের ঘটনা। সেদিন দুপুরবেলা হঠাৎ করেই ফারহান তাদের বাসায় এসে হাজির হয়েছিলো। তার দুই হাত ভর্তি ছিল নানা জিনিসে। ফলমূল, মিষ্টি, মাদারস হরলিকস, গুড়ো দুধ, বিভিন্ন ধরনের বাদাম, খেজুর, পুষ্টিকর বিস্কুট, এমনকি ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজন হতে পারে এমন কিছু স্বাস্থ্যকর খাবারও।
একজন গর্ভবতী মায়ের যত্নের জন্য যা যা প্রয়োজন হতে পারে, তার প্রায় সবকিছুই সে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলো।
প্রথমদিকে বিষয়টা দেখে প্রভা যেমন অপ্রস্তুত হয়েছিল, তার পরিবারের মানুষরাও কিছুটা বিস্মিত হয়েছিল। তবে সেই বিস্ময় খুব বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। নিজেকে সে কখনো প্রভার অফিসের বস হিসেবে পরিচয় দেয়নি। বরং, অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলেছিল, সে প্রভার বহু বছরের পুরোনো বন্ধু। সেই কলেজ জীবনের বন্ধু, যাদের একসাথে চলাফেরা, হাসিঠাট্টা, গল্পগুজব অনেকেই দেখেছে। প্রভার বাবা, মা, বড় ভাই এবং পরিবারের অন্য সদস্যদেরও সেই সময়ের কিছু স্মৃতি ছিলো। তারা অস্পষ্টভাবে হলেও ফারহানকে মনে করতে পেরেছিলেন। ফলে তাকে আপন করে নিতে খুব বেশি সময় লাগেনি।
অবশ্য কয়েকবার প্রভা সত্যিটা বলতে চেয়েছিল। বলতে চেয়েছিল যে ফারহান শুধু তার পুরোনো বন্ধু নয়, তার কর্মস্থলের সর্বোচ্চ দায়িত্বে থাকা মানুষও। কিন্তু, প্রতিবারই ফারহান কোনো না কোনোভাবে তাকে থামিয়ে দিয়েছে। তার যুক্তি ছিলো খুব সহজ। মানুষ যখন কারও পদমর্যাদা জানতে পারে, তখন সম্পর্কের ভেতর অদৃশ্য একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়। অকারণ সম্মান, অপ্রয়োজনীয় আগ্রহ, বাড়তি গুরুত্ব, এসব তার ভালো লাগতো না। সে চাইতো না প্রভার পরিবার তাকে অন্য চোখে দেখুক। তাই সে নিজের পরিচয়টাকে খুব সাধারণ রেখেছিল। শুধু একজন বন্ধু। অনেক বছরের পুরোনো একজন বন্ধু। সেদিনের পর থেকেই সেই বাড়িতে তার যাতায়াত অনেক সহজ হয়ে যায়।
প্রথমদিকে সপ্তাহে এক, দুদিন এলেও পরে সেটা ধীরে ধীরে নিয়মিত হয়ে ওঠে। কখনো ফল নিয়ে আসে, কখনো ডাক্তার দেখানোর পর প্রয়োজনীয় ওষুধ। কখনো আবার বাজার থেকে এমন সব জিনিস নিয়ে আসে, যেগুলোর কথা প্রভা নিজেও ভাবেনি। প্রভা প্রথম প্রথম আপত্তি করতো। তার মনে হতো, একজন মানুষের জন্য এভাবে বারবার কষ্ট করা ঠিক নয়। কিন্তু, ফারহান কখনো সেই আপত্তি শুনতো না। প্রতিবার একই রকম নির্লিপ্ত মুখে সবকিছু এগিয়ে দিতো। যেন এগুলো কোনো বিশেষ কাজ নয়। যেন এটাই স্বাভাবিক।
ধীরে ধীরে প্রভার পরিবারের মানুষও বিষয়টার সাথে অভ্যস্ত হয়ে যায়। প্রভার মা তো একসময় প্রায় নির্ভর করতেই শুরু করে তার ওপর। কোনো ওষুধ শেষ হয়ে গেলে ফোন করতেন। ডাক্তারের রিপোর্ট বুঝতে সমস্যা হলে ছবিটা পাঠিয়ে দিতেন। এমনকি হাসপাতালের অ্যাপয়েন্টমেন্টের সময়টাও অনেক ক্ষেত্রে ফারহানই ঠিক করে দেয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এসব দায়িত্ব কখন যে তার জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে, সে নিজেও হয়তো বুঝতে পারেনি।
তবে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন এসেছিল প্রভার বাবার মধ্যে। প্রথমদিকে তিনি কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখলেও সময়ের সাথে সাথে সেই দূরত্ব ভেঙে যায়। একজন দায়িত্ববান, ভদ্র এবং পরিণত মানুষ হিসেবে ফারহানকে তার ভালো লাগতে শুরু করে। প্রায়ই সন্ধ্যার দিকে দুজনকে একসাথে বারান্দায় বসে চা খেতে দেখা যায়। কখনো ব্যবসা নিয়ে আলোচনা, কখনো দেশের অর্থনীতি নিয়ে, আবার কখনো একেবারে সাধারণ পারিবারিক গল্প। ফারহান মন দিয়ে শুনে। অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার যে বিরল গুণটা মানুষের মধ্যে খুব কম দেখা যায়, সেটা তার মধ্যে ছিল। আর সেই কারণেই হয়তো মানুষ খুব সহজেই তার প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়তো।
প্রভার গর্ভাবস্থার আট মাস চলে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার শরীরেও এসেছে মাতৃত্বের স্পষ্ট ছাপ। গর্ভকালীন পানির কারণে শরীর কিছুটা ফুলে উঠেছে, মুখমণ্ডল গোল হয়েছে, কিন্তু সেই পরিবর্তন তাকে মলিন করেনি। বরং এক অন্যরকম সৌন্দর্যে ভরে তুলেছে। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ গায়ের রঙ যেন আগের চেয়েও দীপ্ত হয়ে উঠেছে। তার চোখে, মুখে, চলাফেরায় ছড়িয়ে পড়েছে কোমলতা। মাতৃত্বের সেই স্বাভাবিক আভা তাকে এমন এক সৌন্দর্য দিয়েছে, যা কোনো অলংকার বা প্রসাধনীর প্রয়োজন ছাড়াই মানুষকে মুগ্ধ করে রাখে।
গত কয়েক মাসে প্রভা নিজেকে অনেকটাই বদলে ফেলেছে। জীবনের তীব্র আঘাতগুলো তাকে ভেঙে দিয়েছিলো ঠিকই, কিন্তু সেই ভাঙাচোরা অংশগুলো জোড়া লাগানোর শক্তিও সে খুঁজে পেয়েছে নিজের ভেতরেই। এখন আর অতীতের প্রতিটি স্মৃতি তাকে আগের মতো কাঁদায় না। কষ্ট হয়, বুকের ভেতর শূন্যতাও অনুভব করে, কিন্তু সেই শূন্যতাকে গ্রাস করে নিয়েছে আরেকটি অনুভূতি, মা হওয়ার অনুভূতি। তার সমস্ত ভালোবাসা, সমস্ত স্বপ্ন আর সমস্ত অপেক্ষার কেন্দ্রবিন্দু এখন তার অনাগত সন্তান। দিনের বেশিরভাগ সময়ই সে নিজের সন্তানের কথা ভাবতে ভাবতে কাটিয়ে দেয়। ছোট্ট মানুষটা যখন পেটের ভেতর নড়েচড়ে ওঠে, হালকা লাথি দেয় কিংবা নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়, তখন প্রভার বুক ভরে যায় প্রশান্তিতে। মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত অস্থিরতা থেকে দূরে কোথাও একটুকরো নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে সে। পেটের ভেতরে ছোট্ট প্রাণটির নড়াচড়া এখন নিয়মিত অনুভব করে সে। প্রতিদিনই সে নিজের ফুলে ওঠা পেটের ওপর হাত রেখে সন্তানের সঙ্গে সময় কাটায়। ভবিষ্যতের অসংখ্য স্বপ্ন বুনে, হাজারো কথা মনে মনে বলে যায়। যদিও সেই কথাগুলোর কোনো উত্তর আসে না, তবুও তার মনে হয়, ছোট্ট প্রাণটা সবকিছুই শুনছে, সবকিছুই বুঝছে।
প্রথমদিকে যে ভয়, অনিশ্চয়তা আর দুশ্চিন্তা তাকে প্রতিদিন গ্রাস করতো, সেগুলো এখন অনেকটাই কমে এসেছে। সব কষ্ট মুছে যায়নি। সব ক্ষতও সেরে ওঠেনি। কিন্তু সেই ক্ষতগুলোর পাশে নতুন কিছু অনুভূতি জায়গা করে নিয়েছে। আশা। অপেক্ষা। আর মমতা। প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে সে নিজের পেটের উপর হাত রেখে শুয়ে থাকে। শিশুটির নড়াচড়া অনুভব করে। মাঝে মাঝে তার মনে হয়, পৃথিবীর সব ভাঙন, সব অপূর্ণতা, সব হারিয়ে ফেলা জিনিসের মাঝেও এই ছোট্ট প্রাণটা যেন তাকে নতুন করে বাঁচার কারণ দিয়েছে। জীবনকে আবার শুরু করার সাহস দিয়েছে।
আর ঠিক সেই সময়গুলোতেই অজান্তেই তার মনে পড়ে যায় আরেকজন মানুষের কথা। যে মানুষটা কোনো দাবি করেনি। কোনো অধিকার ফলায়নি।কোনো প্রশ্নও করেনি। শুধু নিঃশব্দে পাশে দাঁড়িয়ে থেকেছে। বৃষ্টি হোক কিংবা রোদ। অস্থিরতা হোক কিংবা নীরবতা। সবসময়। একসময় প্রভার মনে হতো, পৃথিবীতে তার আপন বলতে আর কেউ নেই। জীবনের সবচেয়ে প্রয়োজনের মুহূর্তে যাদের পাশে পাওয়ার কথা ছিল, তাদের অনেকেই দূরে সরে গেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে বুঝতে শিখেছে, সব সম্পর্ক রক্তের বন্ধনে তৈরি হয় না। কিছু মানুষ হঠাৎ করেই জীবনের অংশ হয়ে যায়, আর নিঃশব্দে এমন জায়গা দখল করে নেয়, যা অন্য কারও পক্ষে পূরণ করা সম্ভব নয়।
ফারহানকে মনে হলেই আজকাল প্রভার ভেতর কৃতজ্ঞতার অনুভূতি জন্মায়। কলেজ জীবনের সেই দিনগুলোর কথা এখনও তার স্পষ্ট মনে আছে। কতো হাসি, কত গল্প, কতো ছোট ছোট স্মৃতি জমে ছিল সেই সময়টায়। তারপর একদিন হঠাৎ করেই সবকিছু বদলে গেলো। পারিবারিক কারণে তাদের শহর ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিলো। ঘটনাগুলো এতো দ্রুত ঘটেছিল যে ফারহানকে কিছু জানানোর সুযোগও পায়নি সে। বিদায় বলার সুযোগ তো দূরের কথা, ঠিকমতো যোগাযোগের কোনো উপায়ও ছিল না।
তখনকার সময়ে পরিস্থিতিও আজকের মতো ছিল না। একটি মেয়ের একা কোথাও গিয়ে পুরোনো বন্ধুর খোঁজ নেওয়া খুব সহজ ব্যাপার ছিল না। পরিবার, সমাজ আর চারপাশের অসংখ্য সীমাবদ্ধতা তাকে আটকে রেখেছিল। ফলে ধীরে ধীরে যোগাযোগের শেষ সুতোও ছিঁড়ে যায়। কিন্তু, মানুষটাকে ভুলতে পারেনি প্রভা। অনেক রাতেই পুরোনো স্মৃতিগুলো মনে পড়ে তার চোখ ভিজে উঠতো। কারণ ফারহান শুধু একজন বন্ধু ছিল না, ছিল তার সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোর একজন। জীবনের এমন এক সময়ের সঙ্গী, যখন বন্ধুত্বগুলো ছিল নিঃস্বার্থ, সম্পর্কগুলো ছিল স্বচ্ছ।
তাই এতো বছর পর আবার যখন ফারহান তার জীবনে ফিরে এলো, তাও এমন এক সময়ে যখন চারপাশে সবকিছু অন্ধকার মনে হচ্ছিল, তখন প্রভার মাঝে মাঝে সত্যিই মনে হয়, মানুষটা যেন আল্লাহর পাঠানো এক বিশেষ উপহার। এমন একজন, যে কোনো দাবি ছাড়াই পাশে দাঁড়িয়েছে, কোনো প্রতিদানের আশা ছাড়াই দায়িত্ব নিয়েছে। জীবন যখন তাকে একের পর এক শূন্যতা উপহার দিয়েছে, তখন সেই শূন্যতার মাঝেই ফারহান হয়ে উঠেছে একটুকরো আশ্বাস।
অন্যদিকে রাজ আর অনন্যার সংসারও নিজেদের মতো করে এগিয়ে চলেছে। তাদের বিয়ের তিন মাস পেরিয়ে গেছে। এই অল্প সময়ের মধ্যেই তারা নিজেদের জীবনে আনন্দ আর ব্যস্ততার এক আলাদা ছন্দ খুঁজে পেয়েছে। অনন্যার দিনগুলো কাটছে হাসি, ঘোরাঘুরি আর নতুন নতুন কেনাকাটায়। বিয়ের পর থেকে কত কেনাকাটা করেছে, তার হিসাব হয়তো সে নিজেও জানে না। পোশাক, গয়না, প্রসাধনী, প্রতিটি জিনিসেই তার অদম্য উৎসাহ। রাজও যথাসম্ভব তার সব ইচ্ছা পূরণ করার করছে।
বিয়ের মাত্র তিন মাসের মধ্যেই দুবার বিদেশ ভ্রমণ হয়ে গেছে তাদের। নতুন জায়গা দেখা, ছবি তোলা, বিলাসী হোটেলে থাকা আর দুজনের একসঙ্গে সময় কাটানো, সব মিলিয়ে তাদের জীবনটা বাইরে থেকে দেখলে নিখুঁত বলেই মনে হয়। দুজনের পৃথিবী যেন রঙিন আলোয় ভরা এক আলাদা জগৎ, যেখানে আপাততো কোনো দুঃখ বা অস্থিরতার ছায়া নেই।
…
বিকেলের আলো তখন ড্রইংরুমের জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকছে। বাসার পরিবেশটাও বেশ শান্ত। ঠিক তখনই দরজার কলিং বেল বেজে উঠে। অরশি রান্নাঘর থেকে হাত মুছতে মুছতে এসে দরজা খুলে দেয়। দরজার ওপাশে একজন ডেলিভারি বয় দাঁড়িয়ে আছে। মেঝেতে একটি পার্সেল। অরশি ভ্রু কুঁচকে তাকায়।
” এইসব কী?”
” ম্যাম! পার্সেল।”
” কিন্তু, আমি তো কোনো অর্ডার করিনি। কার নামে দেওয়া?”
” প্রভা ইরিন!”
” প্রভা?”
” জি, ম্যাম!”
” আচ্ছা, একটু দাঁড়ান।”
দরজা আধখোলা রেখেই অরশি ভেতরের দিকে চলে যায়। প্রভা তখন নিজের ঘরে বসে ছিল। বিছানার মাথার দিকে হেলান দিয়ে একটি উপন্যাস পড়ছে।গর্ভাবস্থার শেষ সময়গুলোতে বই তার সবচেয়ে কাছের সঙ্গী হয়ে উঠেছে। চারপাশের ব্যস্ততা থেকে দূরে, গল্পের ভেতর ডুবে থাকলে সময়টাও একটু দ্রুত কেটে যায়। অরশি দরজার কাছে এসে ডাকে,
” প্রভা!”
প্রভা বই থেকে চোখ তুলে তাকায়।
” জি, ভাবি!”
” তোমার একটা পার্সেল এসেছে। ফারহান কিছু পাঠিয়েছে নাকি?”
প্রভার চোখে বিস্ময় ফুটে উঠে।
” পার্সেল?”
” হ্যাঁ!”
” না তো। ফারহান তো সাধারণত পার্সেলে কিছু পাঠায় না। যা দেয়, নিজেই নিয়ে আসে।”
অরশি কাঁধ ঝাঁকায়।
” তাহলে কে পাঠিয়েছে জানি না। এসো, রিসিভ করো।”
প্রভা বইটা বন্ধ করে পাশে রেখে দেয়। তারপর ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নামে। আট মাসের গর্ভাবস্থায় শরীর অনেকটাই ভারী হয়ে গেছে। ফুলে ওঠা পেটটা নিয়ে এখন আগের মতো দ্রুত হাঁটা সম্ভব হয় না। প্রতিটি পদক্ষেপই নিতে হয় সাবধানে। এক হাত স্বাভাবিকভাবেই পেটের ওপর রেখে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো সে।
প্রভা ধীরে ধীরে ড্রইংরুমে এসে দাঁড়ায়। দরজার সামনে এসে সে দেখতে পেলো মেঝেতে রাখা একটি বেশ বড়সড় কার্টনের বক্স। বক্সটির আকার দেখে তার ভ্রু কুঁচকে যায়। ডেলিভারি বয়টি ভদ্রভাবে দাঁড়িয়ে ছিল পাশে। প্রভা এগিয়ে এসে বললো,
” আমি প্রভা ইরিন!”
ছেলেটি সঙ্গে সঙ্গে হাতে থাকা কাগজটা এগিয়ে দেয়।
” ম্যাম! আপনার পার্সেল। একটু এখানে সাইন করে দিন, আমি তাহলে যেতে পারি।”
প্রভা কাগজটার দিকে তাকালেও সঙ্গে সঙ্গে কলম ধরলো না।
” কে পাঠিয়েছে বলতে পারেন?”
” ওয়েট, ম্যাম!”
ডেলিভারি বয় পকেট থেকে মোবাইল বের করে কিছুক্ষণ স্ক্রিনে চোখ বুলালো। তারপর মাথা তুলে বললো,
” মারফুয়া বেগম পাঠিয়েছেন।”
নামটা শুনেই প্রভা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তার চোখে স্পষ্ট বিস্ময় ফুটে উঠে। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা অরশির দিকে তাকায় সে। অরশিও সমান অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। এক মুহূর্ত নীরব থাকার পর প্রভা কাগজে স্বাক্ষর করে দিলো। ডেলিভারি বয় বিদায় নিয়ে চলে যেতেই অরশি সামনে এগিয়ে এলো। বড় কার্টনের বক্সটার দিকে তাকিয়ে কৌতূহলী গলায় বলে ওঠে,
” তোমার শাশুড়ি এইসব পাঠিয়েছেন? এতো কিছু? কী আছে এতে?”
প্রভা হালকা মাথা নাড়ে।
” জানি না, ভাবি!”
গত কয়েক মাসে মারফুয়া বেগম প্রায় প্রতিদিনই অন্তত একবার, কখনো কখনো দুবার ফোন করেন। প্রভার শরীর কেমন আছে, সময়মতো খাওয়া হচ্ছে কি না, ডাক্তার কী বলেছে, সবকিছুই খোঁজ নেন। প্রথমদিকে বিষয়টা প্রভার কাছে অস্বস্তিকর লাগতো। এটাই রাজের প্রথম সন্তান। আর মারফুয়া বেগমের বংশের প্রথম নাতি কিংবা নাতনি। সন্তানটির প্রতি তার মায়া দিন দিন আরও বেড়ে উঠছে, ব্যাপারটা স্বাভাবিক। গত কয়েক মাসে একাধিকবার তিনি খাবার, ফলমূল, প্রয়োজনীয় নানা জিনিস পাঠাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিবারই প্রভা বিনয়ের সঙ্গে না করে দিয়েছে। নিজের আত্মসম্মানবোধের জন্য সে কিছু নিতে চায়নি। মারফুয়া বেগমও জোর করেননি। তবে আজ মনে হচ্ছে, তিনি আর প্রভার আপত্তির তোয়াক্কা করেননি। ঠিক তখনই নিজের কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন রহিমা ইয়াসমিন। ড্রইংরুমে এসে এতো বড়সড় কার্টন দেখে তিনি বিস্মিত হয়ে ভ্রু কুঁচকে বললেন,
” এইটা কী?”
অরশি বক্সটার দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বললো,
” প্রভার শাশুড়ি পাঠিয়েছে।”
কথাটা শুনে রহিমা ইয়াসমিন বিস্মিত চোখে প্রভার দিকে তাকালেন।
” প্রভার শাশুড়ি?”
প্রভা শুধু মৃদু মাথা নাড়লো। কিছুক্ষণ বক্সটার দিকে তাকিয়ে থেকে সে শান্ত গলায় বললো,
” ভাবি! বক্সটা খুলো।”
অরশি আর দেরি করলো না। রান্নাঘর থেকে একটা ছুরি এনে কার্টনের ওপর লাগানো মোটা টেপগুলো কাটতে শুরু করলো। কয়েক মুহূর্ত পর ঢাকনাটা খুলতেই সবাই একসঙ্গে ভেতরের দিকে তাকায়। আর তারপরই বিস্ময়ে তাদের চোখ বড় হয়ে গেলো। অরশি এক এক করে বের করতে থাকে। সবার ওপরে সাজানো ছিল কয়েকটা ছোট ছোট রঙিন পুতুল। নরম কাপড়ে তৈরি পুতুলগুলো এতোটাই সুন্দর ছিল যে দেখলেই আদর করতে ইচ্ছে করে। পুতুলগুলোর নিচে ছিল একটি ভাঁজ করা ছোট্ট বেবি বেড। তার পাশেই সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা একটি ছোট্ট মশারি। ছিল শিশুর মাথার জন্য ছোট্ট বালিশ, আর তার সঙ্গে তিনটি পাশ বালিশ। এক এক করে জিনিসগুলো বের করতে করতে অরশির বিস্ময় যেন আরও বাড়তে লাগে। এক পাশে সারি করে রাখা ছিল বেবি অয়েল, শ্যাম্পু, বেবি সোপ, লোশন, ক্রিম। অন্য পাশে ছোট ছোট জামা কাপড়। নরম তোয়ালে, হাতমোজা, পায়ের মোজা, শিশুর প্রয়োজন হতে পারে এমন প্রায় সবকিছুই ছিল সেখানে। মনে হচ্ছিল, একজন দাদী তার অনাগত নাতি বা নাতনির জন্য যতোটুকু ভালোবাসা জমিয়ে রাখতে পারেন, সবটুকুই যেন এই বক্সের ভেতরে গুছিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
রহিমা ইয়াসমিন ধীরে ধীরে একটা ছোট্ট জামা হাতে তুলে নিলেন। সাদা কাপড়ের ওপর নীল রঙের ছোট ছোট মেঘ আঁকা। তার চোখে অদ্ভুত কোমলতা নেমে এলো।
” আল্লাহ! কী সুন্দর!”
অরশিও মুগ্ধ হয়ে বললো,
” দেখেই বোঝা যাচ্ছে, কতো যত্ন করে সব কিনেছে।”
সবকিছু বের করার পর বক্সের একেবারে নিচে একটি ভাঁজ করা কাগজ দেখতে পায় অরশি। সে কাগজটা তুলে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। তারপর প্রভার দিকে এগিয়ে দিল।
” মনে হয় একটা চিঠি।”
প্রভা হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিল। ভাঁজ করা সাদা কাগজটার দিকে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলো সে। তার মুখের অভিব্যক্তি ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগলো। অরশি কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে বলে ওঠে,
” চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছো কেন? কাগজটা খুলো।”
প্রভা ধীরস্বরে বললো,
” এইসব কেন পাঠিয়েছেন উনি?”
অরশি তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে।
” তোমার শাশুড়ি তো তোমার যথেষ্ট খোঁজ নেন। আগেও কতোবার কতো কিছু পাঠাতে চেয়েছেন। তুমি নিজেই নিতে চাওনি। কিন্তু প্রথম নাতি নাতনির জন্য দাদী কিছু পাঠাবে না, সেটা কি হয়? আমার মনে হয় সেই কারণেই পাঠিয়েছেন।”
কথাগুলো শুনে প্রভা কিছু বললো না। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে রইলো হাতে ধরা ভাঁজ করা কাগজটার ওপর। চারপাশে উপস্থিত সবাই তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু সে যেন মুহূর্তের জন্য অন্য কোথাও হারিয়ে গেছে। ধীরে ধীরে সে চিরকুটটা খুলে পড়তে শুরু করলো।
< প্রিয় বউমা, ভাবছো, প্রতিদিন ফোনে কথা হয়, তাহলে আবার চিরকুট কেন লিখলাম, তাই না? আসলে, আমি এই বক্সটা নিয়ে ফোনে তোমার সঙ্গে কোনো আলাপ করতে চাই না, তাই এই চিরকুট লিখলাম। আমার সন্তান রাজ, আমার একমাত্র সন্তান। অনেক আদরে বড় করেছি। তাই তার প্রতিটা অন্যায় সুতোয় বাঁধা পুতুলের মতো মেনে নিয়েছি এবং নিচ্ছি। এতে আমিও সমান দোষী। এই দোষ আমি মাথা পেতে গ্রহণ করছি। কিন্তু, তার শাস্তি হিসেবে আমি আমার নাতি বা নাতনি কে দূরে সরিয়ে রাখতে পারবো না। তোমার প্রেগন্যান্সির সমস্ত খরচ আমি বহন করতে চেয়েছি, কিন্তু তুমি দাওনি। তোমার কথার কাছে হার মেনেছি আমি। কিন্তু আমার নাতি, হ্যাঁ, এই রহমান পরিবারের উত্তরাধিকার আসতে চলেছে, আর তার দাদা দাদীর পক্ষ থেকে কিছু যাবে না, এটা তো হতে পারে না। তাই, আমি নিজে মার্কেটে গিয়ে পছন্দ করে পছন্দ করে সবকিছু কিনেছি আমার নাতির জন্য। আশা করবো, আমার দেওয়া আমার নাতির জন্য কেনা এই উপহারগুলোকে অবহেলা করবে না তুমি। ইতি, তোমার সন্তানের দাদী >
চিঠিটা পড়া শেষ হওয়ার পরও কিছুক্ষণ কোনো কথা বললো না প্রভা। তার চোখ দুটো স্থির হয়ে রইলো কাগজটার ওপর। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি জমতে লাগে। মারফুয়া বেগমের প্রতি তার কোনো রাগ কখনোই ছিল না। তবুও আত্মসম্মানের কারণে তিনি পাঠানো কোনো সাহায্য গ্রহণ করতে চায়নি। কিন্তু এই চিঠির প্রতিটি শব্দে যে মমতা লুকিয়ে আছে, সেটাকে অস্বীকার করার শক্তি আজ তার মধ্যে খুঁজে পেলো না। প্রভা চিরকুটটা ভাঁজ করে আবার আগের মতো গুছিয়ে রাখে। তারপর শান্ত গলায় বললো,
” সবকিছু সুন্দর করে গুছিয়ে রাখো, ভাবি! আমার সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর এইসবই প্রথম ব্যবহার করবে।”
…
জাপানের রাজধানী টোকিও শহর। আভিজাত্য আর আধুনিকতার মিশেলে গড়া শহরটা রাতের আলোয় আরও বেশি জীবন্ত মনে হয়। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, পুরো শহরটাই যেন ঝলমলে এক স্বপ্ন।
একটি পাঁচতারা হোটেলের বিশ তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে অনন্যা। ঠান্ডা হাওয়ায় তার চুলগুলো হালকা দুলছে। পরনে কালো টিশার্ট আর অফহোয়াইট থ্রিকোয়ার্টার প্যান্ট। শহরের আলো তার চোখে প্রতিফলিত হচ্ছে, কিন্তু সেই চোখে আজ কোথাও একটুখানি অস্থিরতা লুকানো। হঠাৎ পেছনে একজন এসে দাঁড়ায়। পরিচিত সেই স্পর্শে অনন্যা আর চমকে ওঠে না। কারণ, মানুষটা রাজ। রাজ, অনন্যার পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরে। তারপর অনন্যার কাঁধে মাথা হেলিয়ে খুব নরম গলায় বলে ওঠে,
” মন খারাপ?”
অনন্যা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। শহরের দূরের আলো গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে ঘুরে রাজের দিকে তাকায়।
” না! একটা কথা ভাবছিলাম।”
রাজ ভ্রু একটু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
” কী কথা?”
অনন্যা একটু থামে।
” বাচ্চাটা হয়ে গেলে তুমি প্রভাকে ডিভোর্স দেবে, ঠিক আছে। কিন্তু, ভবিষ্যতে যদি বাচ্চাটা তোমার সম্পত্তির দাবি করে বসে?”
রাজের মুখের হাসি মিলিয়ে যায়। তার চোখ গম্ভীর হয়ে ওঠে। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর খুব ঠান্ডা গলায় বলে,
” ও সেটা পারবে না। এসব নিয়ে চিন্তা করো না।”
অনন্যা তাকিয়ে থাকে। রাজ আবার বললো,
” বাচ্চাটা আমার সম্পত্তির ওপর দাবি করতে পারবে তখনই, যখন আমার নিজের কিছু থাকবে। কিন্তু, আমি সেই সুযোগ তাকে দেবো না। সে দাবি করার মতো বয়সে পৌঁছানোর আগেই আমি সব কিছু তোমার নামে করে দেবো।”
কথাটা শেষ হতেই অনন্যার মুখে যেন অন্ধকারটা হঠাৎ সরে গিয়ে আলো নেমে আসে। চোখজোড়া ঝিলমিল করে ওঠে খুশিতে।
” সত্যি, রাজ?”
” হ্যাঁ!”
এই একটি শব্দেই অনন্যার সমস্ত সংশয় যেন ভেঙে পড়ে। সে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে রাজকে জড়িয়ে ধরে। বারান্দার ঠান্ডা বাতাস, শহরের আলো, সবকিছু মিলিয়ে মুহূর্তটা যেন তাদের দুজনের নিজের একান্ত জগৎ হয়ে যায়। অনন্যা রাজের গালে আলতো করে চুমু দেয়। রাজও তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। তার হাত অনন্যার কোমরে এসে থামে, এক ধরনের দখলদার ভঙ্গিতে। কোনো কথা না বলে সে অনন্যাকে কোলে তুলে নেয়। অনন্যা হালকা হেসে ওঠে। রাজ তাকে নিয়ে রুমের ভেতরে চলে যায়।
#_চলবে_ইনশাআল্লাহ_🌹

