#_এক_ফালি_রোদ্দুর_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_পর্ব_১০_
” আমি ইসেচি।”
আড়াই বছরের নাদুসনুদুস ছোট্ট বাচ্চাটা কেবিনের দরজার ফাঁক দিয়ে আগে মাথাটা ঢুকিয়ে দিলো।তারপর গোলগাল মুখটা উঁকি দিল ভেতরে। বড় বড় চোখ দুটো কৌতূহলে চকচক করছে। দরজার হাতল পর্যন্ত ঠিকমতো পৌঁছাতে পারে না সে, তবুও নিজের মতো করেই দরজাটা ঠেলে খুলে ঢুকে পড়েছে।ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে কাজ করছিলো ফারহান। পরিচিত কচি কণ্ঠস্বর কানে যেতেই সে মুখ তুলে তাকায়। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট মানুষটাকে দেখে তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠে।
” ইফতি! কাম বেবি।”
অনুমতি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইফতি খুশিতে দৌড় দেয়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সে এসে দাঁড়ায় ফারহানের সামনে। ফারহান নিচু হয়ে তাকে কোলে তুলে নেয়। তারপর নিজের টেবিলের ওপর সাবধানে বসিয়ে দেয়। ইফতি পা দুটো ঝুলিয়ে বসে রইলো।
” আম্মু এসেছে?”
ফারহান জিজ্ঞেস করে। ইফতি মাথা নেড়ে বললো,
” এসেচে। আম্মু উই লুমে।”
ফারহান হেসে ফেলে।
” রুম না, কেবিন।”
ইফতি কয়েক সেকেন্ড ভেবে আবার বলে ওঠে,
” হুম হুম! কেবিন।”
শব্দটা ঠিকমতো বলতে পেরে নিজেই বেশ খুশি হয়ে গেল ইফতি। পরক্ষণেই তার মনোযোগ চলে যায় টেবিলের ওপর রাখা জিনিসপত্রের দিকে। ছোট্ট হাত বাড়িয়ে ল্যাপটপের কীবোর্ডে চাপতে লাগলো। কখনো কলম তুলে নিচ্ছে, কখনো ফাইলের কোণা ধরে টানছে। ফারহান কিছু বললো না। শুধু চুপচাপ তাকিয়ে রইলো। এই ছেলেটাকে দেখলে তার কাজের প্রতি মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়।
ইফতির গাল দুটো নরম আর ফুলে আছে। হাসলেই গালে ছোট ছোট টোল পড়ে। চোখ দুটো বড় আর উজ্জ্বল। ফারহান কখনো কখনো অবাক হয়ে ভাবে, প্রভার সঙ্গে ছেলেটার চেহারার খুব একটা মিল নেই। হয়তো রাজের মতোই হয়েছে। তবুও ইফতির মধ্যে আলাদা একটা মায়া আছে। যে মায়া থেকে চোখ সরিয়ে নেওয়া কঠিন। হঠাৎ করেই ফারহান ঝুঁকে এসে তার ফোলা গালে একটা চুমু দেয়। ইফতি চোখ বড় বড় করে তাকায়।
” হামি দিসো?”
ফারহান হেসে মাথা নেড়ে বললো,
” হুম!”
” আমিও ডিবো।”
ফারহান সঙ্গে সঙ্গে নিজের গাল এগিয়ে দেয়।
” দাও।”
ইফতি খুব মনোযোগ দিয়ে সামনে ঝুঁকে এলো। তারপর ছোট্ট ঠোঁট দিয়ে গালে চুমু দিতে যায়। কিন্তু, পরের মুহূর্তেই,
” উপপপপ!”
ইফতি দ্রুত মুখ সরিয়ে নেয়।
” বেতা লাগে।”
দাড়ির খোঁচা লেগে ইফতির মুখ কুঁচকে গেছে। এক সেকেন্ড স্তব্ধ থাকার পর ফারহান আর নিজেকে সামলাতে পারে না। হো হো করে হেসে উঠলো সে।ইফতি ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। তারপর নিজেও কারণ না বুঝেই খিলখিল করে হেসে উঠলো।দুজনের হাসির মাঝেই কেবিনের দরজাটা আবার খুলে যায়। ভেতরে ঢুকলো প্রভা, হাতে ফাইল। দৃশ্যটা দেখে সে কিছুক্ষণ দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে রইলো।টেবিলের ওপর বসে থাকা তার ছেলে, আর তার সামনে বসে প্রাণ খুলে হাসতে থাকা ফারহান। কী নিয়ে এতো হাসাহাসি হচ্ছে সে জানে না। তবে দৃশ্যটা দেখে তার নিজেরও অজান্তে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো।
…
রাত প্রায় দশটা ছুঁইছুঁই। চারপাশে নীরবতা নেমে এসেছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ বাইরে তাকিয়ে ছিলো রাজ। মাথার ভেতর নানা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। অবশেষে সে রুমে ফিরে এলো। রুমে ঢুকেই তার দৃষ্টি আটকে যায় অনন্যার ওপর। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে শেষবারের মতো গুছিয়ে নিচ্ছে সে। কালো রঙের একটি টিশার্টের ওপর ফিনফিনে কালো শার্ট, সঙ্গে কালো প্যান্ট। খোলা চুলগুলো কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে। ধবধবে ফর্সা গায়ের রঙে কালো পোশাকটা আরও বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো রাজ। তারপর ভ্রু কুঁচকে বললো,
” এতো রাতে কোথায় যাচ্ছো তুমি?”
অনন্যা আয়নার ভেতর দিয়ে একবার তার দিকে তাকায়। কিন্তু কোনো উত্তর দেয় না। আবার নিজের দিকে মনোযোগ ফিরিয়ে ঠোঁটে লিপস্টিক লাগাতে শুরু করে। রাজ বলে,
” কিছু জিজ্ঞেস করছি তোমাকে। উত্তর দিচ্ছো না কেন?”
অনন্যা নির্বিকার গলায় বললো,
” বাইরে যাচ্ছি।”
” বাইরে যাচ্ছো মানে? এই রাত দশটার সময়? কোনো ভদ্র বাড়ির বউ এভাবে রাতে বাইরে যায়?”
রাজের কণ্ঠে বিস্ময়ের সঙ্গে রাগও মিশে আছে।কথাটা শুনে অনন্যা থেমে গেলো। কয়েক সেকেন্ড আয়নার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে রাজের দিকে ফিরে। তার চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট।
” তো কী করব? ঘোমটা দিয়ে ঘরে বসে থাকবো?”
রাজ কিছু বলার আগেই অনন্যা আবার বললো,
” শোনো, রাজয়! আমার আনন্দময় জীবনে অযথা ইন্টারফেয়ার করতে আসবে না। আমি এসব একদম পছন্দ করি না।”
রাজ স্তব্ধ হয়ে যায়। অনন্যা ব্যাগটা হাতে তুলে নেয়।তারপর দরজার দিকে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে আবার থামে। পেছন ফিরে রাজের দিকে তাকায়।
” ফিরতে ভোরও হয়ে যেতে পারে। ফ্রেন্ডদের সঙ্গে পার্টি আছে।”
কথাটা বলে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না অনন্যা।দরজা খুলে বেরিয়ে যায়। পুরো রুম নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। রাজ কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। মনে হচ্ছে, এইমাত্র ঝড়ের মতো কেউ এসে সবকিছু এলোমেলো করে দিয়ে চলে গেছে। সে বিছানার ধারে গিয়ে বসে পড়ে। দুই হাত দিয়ে নিজের চুল মুঠো করে ধরলো। মাথার ভেতর অসংখ্য প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগে। কোথায় ভুল হচ্ছে? কেন তাদের সম্পর্কটা দিন দিন এতো দূরে সরে যাচ্ছে? একসময় যে মানুষটার সঙ্গে ভবিষ্যতের হাজারো স্বপ্ন দেখেছিল, আজ তার সঙ্গে দুটো স্বাভাবিক কথাও বলা যায় না।
রাজ মাথা নিচু করে। বুকের ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে আছে। চোখ বন্ধ করতেই হঠাৎ করেই মনে পড়ে গেলো বছর কয়েক আগের একটা সন্ধ্যার কথা। তখন তার জীবনে অনন্যা আসেনি। প্রভা ছিলো তার পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের মানুষ। সংসারের ছোট ছোট মুহূর্তগুলোতেই তারা খুঁজে নিতো সুখ। সেদিন সন্ধ্যায় অফিসের কাজ শেষ করে রাজ হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত নিলো বাইরে ডিনার করবে। ঘড়ির কাঁটা তখন ছয়টা না সাতটা ছুঁয়েছে। সে ফোন বের করে প্রভার নম্বরে কল দেয়। দুইবার রিং হতেই কল রিসিভ হলো।
” বলো, বাসায় কখন আসবে?”
” আজ বাসায় আসছি না এখন। বাইরে ডিনার করবো। তুমি রেডি হয়ে নাও, তোমাকেও আসতে হবে।”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
” কিন্তু, বাসায় তো রান্না হয়েছে।”
” হোক রান্না। একদিন না হয় রান্না থাকলো। আজ আমরা বাইরে খাবো।”
” আচ্ছা! তাহলে কখন আসবে?”
” আমি আসছি না। ড্রাইভারকে ঠিকানা বলে দিচ্ছি, সে তোমাকে নিয়ে আসবে।”
” তুমি আসবে না নিতে?”
” না। তুমি চলে এসো। ড্রাইভার তো থাকবেই।”
” না! আমি যাবো না।”
রাজ অবাক হয়ে যায়।
” কেন?”
” রাতে একা বের হওয়া মেয়ে মানুষের ভালো দেখায় না।”
” একা কোথায়? ড্রাইভার তো থাকবে।”
” তবুও। আমি তো বাড়ির বউ। তুমি এসে নিয়ে গেলে যাবো।”
প্রভার গলায় জেদ ছিলো, তবে সেই জেদের মধ্যেও ছিল মিষ্টি এক আবদার। রাজ হেসে ফেলে।
” আচ্ছা! তাহলে ব্যাপার এই?”
” কোন ব্যাপার?”
” আমি নিজে গিয়ে নিয়ে আসলে নিশ্চয়ই কিছুমিছু একটা পাবো?”
কথাটা বলেই রাজ হেসে উঠে। ওপাশে সঙ্গে সঙ্গে নীরবতা। তারপর খুব আস্তে প্রভার লাজুক কণ্ঠ ভেসে আসে,
” ধ্যাৎ! কী যে বলো।”
রাজ স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিল, মেয়েটা লজ্জায় লাল হয়ে গেছে।
” তাহলে আসছি? কিছুমিছু নিতে।”
” উফ! চুপ করো। এখন রাখি, রেডি হতে হবে।”
কথা শেষ করেই প্রভা দ্রুত কল কেটে দিয়েছিলো।সেদিন অনেকক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে হেসেছিল রাজ। প্রভার এই ছোট ছোট আবদারগুলো তার ভীষণ ভালো লাগতো। মেয়েটা কখনো নিজেকে আলাদা করে কিছু দাবি করেনি। শুধু চাইতো রাজ তার পাশে থাকুক। স্মৃতিটা মনে পড়তেই রাজের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠে। কিন্তু, সেই হাসি বেশিক্ষণ টিকলো না। ধীরে ধীরে হাসিটা মিলিয়ে যায়।
আজ হঠাৎ করে এতো বছর আগের সেই দিনের কথা মনে পড়লো কেন? হয়তো কারণ, প্রভা কখনো রাজ ছাড়া রাতে একা কোথাও যেতে চাইতো না। আর আজ? আজ তার অনন্যা নিজেই জানিয়ে গেলো, ভোরে ফিরতে পারে। দুই সময়ের ব্যবধানটা যেন হঠাৎ করেই খুব স্পষ্ট হয়ে উঠল রাজের কাছে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বুকের ভেতরটা কেমন অস্বস্তি করছে। রুমটাও যেন অসহনীয় গরম লাগছে। চোখ বন্ধ করে কয়েক মুহূর্ত স্থির বসে রইল রাজ। তারপর উঠে দাঁড়ায়। কোনো কিছু আর ভাবতে চাইছে না সে।
নিঃশব্দে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যায়। গোসল করতে ইচ্ছে করছে। হয়তো ঠান্ডা পানি শরীরের সঙ্গে সঙ্গে মনের ভেতরের অস্থিরতাটাও একটু ধুয়ে নিয়ে যাবে।
…
সকাল থেকেই ইফতির শরীরটা ভালো না। হালকা জ্বর নিয়ে ঘুম থেকে উঠলেও সময় যতো গড়িয়েছে, তার অস্থিরতা ততো বেড়েছে। ধবধবে ফর্সা শরীরটা জ্বরের তাপে লালচে হয়ে উঠেছে। ছোট্ট মুখটা ভার করে রেখেছে সে। ঠোঁট দুটো ফুলিয়ে চেরি ফলের মতো উল্টিয়ে রেখেছে। সামান্য কিছুতেই কান্না জুড়ে দিচ্ছে, আবার কিছুক্ষণ পর ক্লান্ত হয়ে প্রভার কাঁধে মাথা রেখে চুপ করে থাকছে।
সারাটা সকাল প্রভা তাকে নিয়ে ব্যস্ত। কখনো কপালে ভেজা কাপড় দিচ্ছে, কখনো ওষুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু, জ্বরের কারণে ইফতি আরও বেশি জেদি হয়ে উঠেছে। মায়ের কোল ছেড়ে কোথাও যেতে চাইছে না। তবুও তার কান্না থামছেই না। ফোন তুলে ফারহানকে খবর দিয়েছিল। খবর পাওয়ার পর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করেনি সে। অফিসের কাজ ফেলে তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে পড়েছে।
কিছু পরেই কলিং বেলের শব্দ ভেসে আসে। কোলে ইফতিকে নিয়েই দরজার দিকে এগিয়ে যায় প্রভা। দরজা খুলতেই সামনে ফারহানকে দেখতে পায়। অফিসের পোশাকেই দাঁড়িয়ে আছে সে। মুখে স্পষ্ট উদ্বেগের ছাপ। ফারহানকে দেখামাত্র ইফতির চোখে পানি আরও বেড়ে যায়। ছোট্ট হাত দুটো তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে কান্না জুড়ে দেয়। ফারহান দ্রুত তাকে কোলে তুলে নেয়। বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরতেই অনুভব করে ছোট্ট শরীরটা অস্বাভাবিক গরম। কপালে হাত রেখে তার ভ্রু কুঁচকে যায়। জ্বরের তাপ এখনও পুরোপুরি নামেনি। এরপর থেকে পুরো সময়টাই যেন ইফতির চারপাশে ঘুরতে থাকে। কখনো তাকে কোলে নিয়ে হাঁটছে, কখনো পানি খাওয়াচ্ছে, কখনো গল্প শোনানোর ভঙ্গিতে নানা কিছু বলছে। আশ্চর্যের বিষয়, ফারহানের কোলে থাকলে ইফতি কিছুটা শান্ত থাকে। কিন্তু, তাকে নামিয়ে দিলেই আবার কান্না শুরু করে দেয়।
সময় ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। সারাদিন পেরিয়ে, সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমে আসে। ঘড়ির কাঁটা দশটার কাছাকাছি পৌঁছে যায়। জ্বর আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে ঠিকই, কিন্তু ইফতির একগুঁয়েমি একটুও কমেনি। সে আজ কিছুতেই ফারহানকে ছেড়ে থাকতে রাজি নয়। একবার কোলে উঠলে আর নামতে চায় না। চোখে ঘুম নেমে এলেও তার ছোট্ট হাত শক্ত করে ফারহানের শার্ট আঁকড়ে ধরে রাখে।
প্রভা কয়েকবার চেষ্টা করেছিল ইফতিকে নিজের কাছে নেওয়ার। কিন্তু, প্রতিবারই ইফতি কান্না জুড়ে দিয়েছে। বিষয়টা যতোটা মায়ার, ততোটাই অস্বস্তিকরও। কারণ, রাত বাড়ছে। আর ফারহানের অসুস্থ বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতেও পারছে সে। শুধু ধৈর্য ধরে তাকে নিয়ে ঘরের ভেতর হাঁটতে থাকে। নীরব রাতের মধ্যে বারবার একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হতে থাকে।
ফারহানের কাঁধে মাথা রেখে আধো ঘুমে ঢুলছে ইফতি। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ চমকে উঠে আবার নিশ্চিত হচ্ছে মানুষটা এখনও তার কাছেই আছে। তারপর আবার চোখ বুজে ফেলছে। এভাবেই একসময় রাত বারোটা পেরিয়ে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে হাঁটতে হাঁটতে ফারহানের নিজের শরীরও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তাও সে থামেনি। অবশেষে যখন নিশ্চিত হলো ইফতি গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে, তখন খুব সাবধানে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিলো। ছোট্ট বাচ্চাটা ঘুমের মধ্যেই একটু নড়ে উঠলো। ফারহান কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর আলতো করে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
ঘরটা ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে আসে। ফারহান সোজা হয়ে দাঁড়ায়। তারপর মুখ তুলে তাকায় প্রভার দিকে। প্রভা কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিলো। সারাদিনের ক্লান্তি তার চোখেমুখে স্পষ্ট। ফারহান প্রভার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললো,
” রাতে ইফতির জ্বর বাড়লে আমাকে কল করিস।”
প্রভা মাথা নেড়ে বললো,
” ঠিক আছে!”
ফারহান ধীর পায়ে রুমের দরজার দিকে এগিয়ে গেলো। কিন্তু, দরজার কাছে গিয়ে আবার থেমে যায়। পেছন ফিরে তাকাতেই তার চোখ গিয়ে আটকালো বিছানায় শুয়ে থাকা ইফতির ওপর। এই অবস্থায় বাচ্চাটাকে রেখে যেতে একদম ইচ্ছে করছে না তার। মনে হচ্ছে, আজ রাতটা এখানেই থেকে যায়। যদি মাঝরাতে জ্বর বেড়ে যায়? যদি হঠাৎ করে কান্না শুরু করে? কিন্তু, সঙ্গে সঙ্গেই বাস্তবতা তাকে থামিয়ে দিল। থাকার কোনো অধিকার নেই তার। ইফতির পাশে থাকার ইচ্ছে যতেই প্রবল হোক, এই বাড়িতে রাত কাটানোর অধিকার সে অর্জন করেনি। একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে ফারহান রুম থেকে বের হয়ে মাঝের রুমে এসে দাঁড়ায়। প্রভাও তার পেছন পেছন বেরিয়ে এলো।
ফারহানের বুকের ভেতর অস্বস্তি হচ্ছে। রাতে যদি সত্যিই জ্বর বেড়ে যায়? প্রভা একা কীভাবে সামলাবে? মেয়েটাকে যতোটা শক্ত মনে হয়, ভেতরে সে ততোটাই নরম। বিশেষ করে ইফতির ব্যাপারে। ইফতির সামান্য সর্দি কাশিতেও প্রভা অস্থির হয়ে পড়ে। হওয়াটাই স্বাভাবিক। অনেক অপেক্ষা আর অনেক ভালোবাসার পর পাওয়া সন্তান সে। ফারহান কিছুক্ষণ চুপচাপ প্রভার দিকে তাকিয়ে রইলো।মেয়েটার মুখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তার ছাপ। ফারহান ডাকলো,
” প্রভা!”
প্রভা মুখ তুলে তাকায়।
” হুম?”
ফারহান কয়েক সেকেন্ড নীরব রইলো। তারপর ধীরে ধীরে বললো,
” একটা কথা বলতে চাই।”
” বল।”
ফারহান সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলো না। চোখ দুটো কিছুক্ষণ স্থির রইলো প্রভার মুখে। তারপর খুব নিচু, কিন্তু স্পষ্ট কণ্ঠে বললো,
” আমি ইফতির বাবা ডাক শুনতে চাই।”
প্রভার বুকের ভেতর ধক করে উঠে। ফারহান থামলো না।
” আমি বাবা হতে চাই ইফতির!”
মুহূর্তের মধ্যে প্রভার শরীর কেঁপে উঠে। মনে হলো, কেউ যেন হঠাৎ করে তার বহুদিন ধরে বন্ধ করে রাখা দরজায় জোরে কড়া নাড়লো। চারপাশের সব শব্দ মিলিয়ে গেল। শুধু ফারহানের কণ্ঠস্বর কানে বাজতে লাগলো। ফারহান এক পা এগিয়ে এলো। তার চোখে কোনো দ্বিধা নেই। কোনো আবেগের মুহূর্তের দুর্বলতাও নেই। শুধু একরাশ সত্যতা। সে ধীরে ধীরে বললো,
” আমাকে বিয়ে করবি তুই?”
প্রভার নিঃশ্বাস যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়।চোখ দুটো আপনাআপনি বন্ধ হয়ে এলো। আবার বিয়ে? আবার একটা সম্পর্ক? আবার সংসার? এই শব্দগুলোই যেন তার ভেতরে ঝড় তুলে দিলো। সেই কারণেই হয়তো আজও নতুন করে কোনো সম্পর্কের কথা ভাবলেই তার বুকের ভেতর ভয় জমে ওঠে।ফারহান কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলো। কিন্তু, কোনো উত্তর এলো না। প্রভা চোখ বন্ধ করেই দাঁড়িয়ে রইলো।তখন ফারহান মৃদু স্বরে বললো,
” আমি তোর উত্তরের অপেক্ষা করবো।”
আর কিছু বললো না সে। উত্তর চাইলো না। চাপ দিলো না। শুধু কথাটা বলে দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করে। বেরিয়ে যায়। সবকিছু আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। অনেকক্ষণ পর প্রভা চোখ খুললো। ঘর ফাঁকা। ফারহান চলে গেছে। কিন্তু, তার বলা কথাগুলো যেন এখনও বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।
” আমি ইফতির বাবা ডাক শুনতে চাই।”
” আমাকে বিয়ে করবি তুই?”
প্রভার বুকের ভেতর অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়লো। সে স্থির দৃষ্টিতে বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রইলো।ফারহান চলে গেছে। কিন্তু, যাওয়ার আগে তার মনে এমন এক প্রশ্ন রেখে গেছে, যার উত্তর হয়তো প্রভা নিজেও জানে না।
#_চলবে_ইনশাআল্লাহ_🌹

