Home "ধারাবাহিক গল্প এক ফালি রোদ্দুর এক ফালি রোদ্দুর পর্ব-১১

এক ফালি রোদ্দুর পর্ব-১১

0
742

#_এক_ফালি_রোদ্দুর_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_পর্ব_১১_

” রাজকে কবে ছাড়বে তুমি?”

কাঠ কাঠ গলায় প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলো জিসান। তার চোখে মুখে স্পষ্ট বিরক্তি। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অস্থিরতা আর চাপা রাগ একসঙ্গে বেরিয়ে আসতে চাইছে। অনন্যা এলোমেলো হয়ে যাওয়া শার্টটা ঠিক করতে করতে একবার তাকায় জিসানের দিকে।তারপর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলে,
” খুব তাড়াতাড়ি।”

কথাটা যেন জিসানের রাগ আরও বাড়িয়ে দিলো। সে কয়েক পা এগিয়ে এসে অনন্যার গাল চেপে ধরে।
” দ্রুত। গত তিন বছরের বেশি সহ্য করছি এইসব। আর না।”

অনন্যা আস্তে করে তার হাত সরিয়ে দেয়।
” শান্ত হও। তীরে এসে তরী ডুবতে দেবো না আমি। অলরেডি কয়েক কোটি টাকা আমি অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে ফেলেছি। আরও কিছু টাকা ট্রান্সফার করলেই আমি তোমার কাছে পাকাপাকি ভাবে চলে আসবো। আর কয়েকটা দিন সহ্য করো, জান!”

জিসান কোনো উত্তর দেয় না। রাগী পায়ে হেঁটে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়ায় সে। মাঝরাত প্রায় পেরিয়ে গেছে। বাইরে অন্ধকারে শহরটা ডুবে আছে। আকাশে চাঁদ নেই, তারাও যেন লুকিয়ে পড়েছে কোথাও।জিসানের চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। অনন্যা ধীরে তার কাছে এগিয়ে গেলো। পেছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরলো। জিসানের উন্মুক্ত শরীরে শুধু একটা থ্রিকোয়ার্টার প্যান্ট পরা। অনন্যার কোমল হাত জিসানের উন্মুক্ত বুক জুড়ে বিচরন করতে থাকে। মাথাটা রাখল জিসানের পুরুষালী পিঠে। কয়েক মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বললো না। জিসানের শরীরের টানটান ভাবটা অনন্যার চোখ এড়ায় না। সে নরম স্বরে বলে ওঠে,
” শেষ পর্যায়ে এসে এতো রাগ করলে হবে না, জান! এই সম্পূর্ণ প্ল্যান কিন্তু তোমারই ছিলো। রাজের জীবনে প্রবেশ করা, তার বিশ্বাস অর্জন করা, তার সংসার ভাঙা, তার সবকিছু নিজের মুঠোর মধ্যে নিয়ে আসা, সবকিছুর পরিকল্পনা তোমার। এখন এসে এতো অধৈর্য হলে কী করে হবে?”

কথাগুলো শুনে জিসানের মুখ আরও কঠিন হয়ে উঠলো। সে ঘুরে দাঁড়ায়। এক ঝটকায় অনন্যার চুলের মুঠি আঁকড়ে ধরে তাকে নিজের দিকে টেনে আনে।আকস্মিক টানে অনন্যার মুখ বিকৃত হয়ে উঠলো ব্যথায়। তাও, সে কোনো প্রতিবাদ করলো না। শুধু স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো জিসানের চোখের দিকে। জিসানের চোখ দুটো রাগে জ্বলছে। চোয়াল শক্ত করে সে বলে,
” হ্যাঁ! আমি চাই ও ধ্বংস হয়ে যাক। আমি চাই সবকিছু হারিয়ে ফেলুক। শেষ হয়ে যাক রাজ রহমান! ওর জন্য আমার ব্যবসা একসময় মাটিতে মিশে গিয়েছিলো। আমি নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলাম। মানুষ আমাকে করুণা করতো। সেই অপমান আমি কোনোদিন ভুলিনি। আমি চাই রাজও সেই কষ্টটা অনুভব করুক। শুধু টাকা হারানো নয়, আমি চাই তার পুরো জীবনটা এলোমেলো হয়ে যাক। সব কিছু হারানোর যন্ত্রনা ও তিলে তিলে বুঝুক। শেষ হয়ে যাক রাজ! ওর জন্য আমাদের এতোটাই খারাপ অবস্থা হয়ে গিয়েছিলো ব্যাবসায়, যেইটা আমার আব্বু মেনে নিতে না পেরে হার্ট অ্যাটাক করে মারা যান। ওকে আমি শেষ হয়ে যেতে দেখতে চাই।”

অনন্যা শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
” তাহলে এতো অধৈর্য হচ্ছ কেন?”

জিসান কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইলো।তারপর ধীরে ধীরে হাত ছেড়ে দেয়। এক পা পিছিয়ে গিয়ে জানালার দিকে মুখ ফেরায় সে।
” কারণ, একটা জিনিস আমি সহ্য করতে পারি না।”

” কী জিনিস?”

জিসানের কণ্ঠে এবার ঈর্ষা আর তিক্ততা মিশে যায়,
” আমার প্রেমিকা প্রতিদিন অন্য একজনের সঙ্গে জীবন কাটাচ্ছে, রোজ রাতে তার চাহিদা মেটাচ্ছে, এই সত্যিটা আমি মানতে পারি না।”

অনন্যা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। সে ধীর পায়ে জিসানের কাছে এগিয়ে এলো।
” আর কয়েকটা দিন, জান! শুধু কয়েকটা দিন।তারপর সবকিছু বদলে যাবে। রাজের জীবনও, আমাদের জীবনও।”

জিসান কোনো উত্তর দেয় না। জানালার কাচে নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে রইলো সে। গম্ভীর গলায় বললো,
” তাও সহ্য করতে পারি না আমি। কিছুতেই না।”

অনন্যা বুঝতে পারছে, জিসানের ভেতরের অস্থিরতা এখনো একটুও কমেনি। রাগ, ঈর্ষা আর প্রতিশোধের আগুন তাকে ভেতর থেকে গ্রাস করে ফেলছে। সেই আগুনকে শান্ত করতেই সে জিসানের কাছে এগিয়ে গেলো। একটা হালকা ধাক্কা দিয়ে তাকে বিছানার কিনারায় বসিয়ে দেয়। জিসানের কোমরের দুইপাশ দিয়ে পা দিয়ে জিসানের কোলে বসে অনন্যা।আঙুলের ডগা দিয়ে জিসানের বুকে অন্যমনস্কভাবে নকশা আঁকতে আঁকতে মৃদু স্বরে বললো,
” একটু সহ্য করো, প্লিজ! আর কটা দিন মাত্র। তারপর রাজ্যসহ রাজকুমারী তোমার। আর যার ওপর তোমার এত রাগ, সে থাকবে মাটিতে।”

কথাগুলো বলার সময় অনন্যার কণ্ঠে ছিল আশ্বাসের সুর। সে জিসানকে মনে করিয়ে দিতে চাইছে, এতোদিনের পরিকল্পনা প্রায় সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। কিন্তু, জিসানের মুখের কঠোরতা বিন্দুমাত্র কমে না। সে মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলো। চোখের দৃষ্টিতে স্পষ্ট বিরক্তি আর অস্থিরতা। অনন্যা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর আলতো করে তার চিবুক ছুঁয়ে মুখটা নিজের দিকে ফিরিয়ে আনল। জিসান অনিচ্ছাসত্ত্বেও তার দিকে তাকায়। দুই জনের চোখ কয়েক মুহূর্তের জন্য একে অপরের মধ্যে আটকে রইলো। অনন্যা জিসানের ঠোঁটে খুব গাঢ় করে ওষ্ঠ স্পর্শ একে দেয়।

পরের মুহূর্তেই জিসানের সংযম যেন ভেঙে যায়। তার ভেতরে জমে থাকা আবেগ বিস্ফোরিত হয়ে যায়। সে অনন্যাকে শক্ত করে নিজের কাছে টেনে নেয়। তাকে এক প্রকার আছড়ে ফেলে বিছানায়। জিসান অনন্যার গলায় মুখ ডুবিয়ে দেয়। দাঁতের চাপ পড়ে সেখানে। অনন্যা ব্যাথা পেলেও সবটা সহ্য করে নেয়। জিসানের মাথা ঠান্ডা করা তার এক মাত্র লক্ষ্য। তাই জিসানের চুল আকড়ে ধরে নিজের দিকে মিশিয়ে নেয় অনন্যা।

অনন্যা মুহূর্তের জন্য ব্যথা অনুভব করলেও কোনো অভিযোগ করে না। বরং সে বুঝতে পারছে, জিসানের রাগের আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর অসহায়ত্ব।প্রতিশোধের নেশা তাকে যতোটা কঠিন করেছে, অপেক্ষা তাকে ততোটাই দুর্বল করে তুলেছে। অবশ্য, তারা দুই জনই অপেক্ষা করছে সেই দিনের জন্য, যেদিন তাদের বহুদিনের পরিকল্পনার শেষ অধ্যায় শুরু হবে। আর সেই অধ্যায়ের পরিণতি যে কতোটা ভয়াবহ হতে পারে, তা হয়তো তারা নিজেরাও এখনো কল্পনা করতে পারেনি।

ফজরের আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে চারদিক থেকে। ভোরের আবছা আলো জানালার পর্দা পেরিয়ে ঘরের ভেতরে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু, সেই শান্ত ভোরে হঠাৎ করেই কান্নার শব্দে ঘুম ভাঙে প্রভার। চোখ খুলতেই দেখে, পাশে শুয়ে থাকা ইফতি ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদছে। ছোট্ট মুখটা লাল হয়ে গেছে। প্রভা দ্রুত উঠে বসে ছেলেকে কোলে তুলে নেয়।
” কী হয়েছে, পাপা?”

ইফতি ফুঁপাতে ফুঁপাতে বললো,
” ফালহান আনতেলের কাচে যাবু।”

প্রভার বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠে। সে নরম গলায় বলে,
” ফারহান আংকেল চলে আসবে, পাপা! ঘুম থেকে উঠেই চলে আসবে।”

ইফতি সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে দেয়।
” না। আমি একুনি যাবু।”

বলেই আবার কান্না শুরু করে দিলো। প্রভা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। জ্বর আগের চেয়ে অনেকটাই কমেছে। তবুও ছোট্ট শরীরটায় এখনও হালকা গরম ভাব রয়ে গেছে। অসুস্থতার কারণে এমনিতেই বাচ্চাটা বেশি বিরক্ত হয়ে আছে। তার ওপর গতকাল সারাদিন ফারহানের কোলে কোলে কাটিয়েছে। আজ সকালে ঘুম ভাঙতেই তাই প্রথমে যার কথা মনে পড়েছে, সে ফারহান।ইফতিকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে বসে রইলো প্রভা। তার নিজের শরীরও ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছে। গত রাতটা প্রায় নির্ঘুম কেটেছে। একদিকে ইফতির জ্বর, অন্যদিকে ফারহানের বলা কথাগুলো বারবার কানের কাছে ফিরে আসছে। যেন কেউ মনের ভেতরে অবিরাম প্রতিধ্বনি তুলে যাচ্ছে। আর আজ সকালে সেই একই মানুষটার জন্য ইফতির এই কান্না। কী অদ্ভুত! একজন চাইছে ইফতির বাবা হতে। আর ইফতি চাইছে তার কাছেই যেতে। প্রভা চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্তের জন্য মাথাটা দেয়ালে ঠেকালো। তারপর নিচু স্বরে ডাকলো,
” পাপা!”

ইফতি তখনও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। মায়ের ডাক শুনে ভেজা চোখে তাকায়।
” বুলো।”

প্রভার ঠোঁট কেঁপে উঠে। কিছু প্রশ্ন আছে, যার উত্তর একটা শিশুর কাছ থেকে পাওয়ার কথা নয়। তাও, আজ সে জানতে চাইছে। হয়তো নিজের জন্য। হয়তো নিজের মনের অস্থিরতা কমানোর জন্য। খুব ধীরে ধীরে সে বলে ওঠে,
” তুমি কি ফারহান আংকেলকে অনেক বেশি ভালোবাসো?”

ইফতি কান্নার মাঝেও চুপ করে রইলো। প্রভা আবার বললো,
” সব সময় একসাথে থাকতে চাও?”

ছোট্ট ছেলেটা তার গোলগাল দুই হাত দিয়ে চোখ মুখ ডলতে লাগে। কান্নার জন্য ধবধবে ফর্সা কোমল মুখটা টকটকে লাল হয়ে গেছে। প্রভা মৃদু স্বরে আবার প্রশ্ন করলো,
” সব সময় ফারহান আংকেলকে কাছে পেতে চাও?”

ইফতি এবার কোনো দ্বিধা না করেই মাথা নেড়ে বলে ওঠে,
” হুম!”

একটা শব্দ। মাত্র একটা শব্দ। কিন্তু, সেই শব্দটা এসে যেন সরাসরি প্রভার বুকের কোথাও আঘাত করে।ইফতি আবার বলে,
” ফালহান আনতেল আমাল।”

” তোমার?”

” হুহ! আমাল।”

শিশুসুলভ সরলতায় কথাটা বলেই ইফতি দুই হাত বাড়িয়ে দেয়।
” আমাকে ফালহান আনতেলের কাচে নিয়ে চলো।”

প্রভা কিছুক্ষণ ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।এই ছোট্ট মানুষটা এখনও পৃথিবীর জটিল সম্পর্ক বোঝে না। সে জানে না, বাবা কাকে বলে। জানে না, রক্তের সম্পর্ক কী। জানে না, সমাজ কীভাবে বিচার করে। সে শুধু বোঝে, কে তাকে আদর করে, কে তাকে বুকে জড়িয়ে রাখে, কে তার কান্না থামায়। তার ছোট্ট পৃথিবীতে ফারহানের জন্য আলাদা একটা জায়গা তৈরি হয়ে গেছে। প্রভার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠে। অজান্তেই তার মনে পড়ে গেল গত রাতের সেই গভীর, স্থির কণ্ঠস্বর,
“আমি ইফতির বাবা ডাক শুনতে চাই।”

প্রভা চোখ নামিয়ে ফেলে। কোলের মধ্যে বসে থাকা ইফতি আবারও ফুঁপিয়ে উঠেছে।
” আমাল ফালহান আনতেলের কাচে যাবু।”

বাইরে তখন ভোরের আলো আরও একটু উজ্জ্বল হচ্ছে। আর প্রভার মনে আরও গভীর কোনো প্রশ্নের জন্ম হচ্ছে। যদি কোনো একদিন সত্যিই ইফতি বাবা বলে ডাকে? তাহলে, কি সেই ডাকটা শুধু ফারহানের জন্যই হবে?

” আমি ছব ছময় ফালহান আনকেল কে কাছে পেতি চাই।”
ইফতির ছোট্ট কণ্ঠে কথাটা বের হতেই প্রভার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে ওঠে। সে ছেলেটার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দেয়। তারপর চোখ তুলে ঘড়ির দিকে তাকায়। ৬:৪৫! এই সময় সাধারণত পুরো পৃথিবীটাই একটু থেমে থাকে। কিন্তু আজ কেন জানি প্রভার ভেতরে অদ্ভুত অস্থিরতা নড়ে ওঠে। ঠিক তখনই, কলিং বেলের শব্দ।

প্রভা ভ্রু কুঁচকে ফেলে। এই ভোরে কে আসবে?ইফতির অসুস্থতার কথা তো কাউকে বলা হয়নি। সে এক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। আবার বেল বাজে। এইবার আর দেরি করে না। ইফতিকে কোলে করে ধরে সে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় প্রভা। গভীর শ্বাস নিয়ে দরজা খুলে দেয়। দরজা খুলতেই, সে স্থির হয়ে যায়।ফারহান!

দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে ফারহান। তার গায়ে হালকা অ্যাশ রঙের ট্রাউজার, সঙ্গে অলিভ গ্রিন নরমাল টিশার্ট। চুলগুলো এলোমেলো, চোখ দুটো লালচে, ক্লান্ত। এক মুহূর্তের জন্য পুরো পরিবেশ থমকে যায়। ইফতি তাকে দেখেই ঠোঁট উল্টে কান্না শুরু করে দেয়। ফারহান এক সেকেন্ডও দেরি করে না। দরজার ভেতর ঢুকে সরাসরি ইফতিকে নিজের কোলে তুলে নেয়। ছোট্ট শরীরটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার কপালে হাত রাখে। তারপর খুব মনোযোগ দিয়ে জ্বর চেক করে। হালকা আছে, মনে মনে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সে। তারপর ধীরে ধীরে ইফতির পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়। ইফতি নাক টেনে টেনে ফারহানের ঘাড়ে মুখ গুঁজে দেয়, যেন এতক্ষণ জমে থাকা সব কষ্ট এক মুহূর্তে শেষ হয়ে গেছে। প্রভা দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে থাকে। চোখে বিস্ময়, আর তার ভেতরে এক অস্থিরতা। সে আস্তে করে বলে ওঠে,
” তুই এতো সকালে?”

ফারহান ইফতিকে কোলে রেখেই ভেতরের দিকে পা বাড়ায়। সে উত্তর দেয়,
” সারা রাত ঘুম হয়নি ইফতির টেনশনে। ভোরের দিকে চোখ লেগে এসেছিল, কিন্তু বসে থাকতে পারছিলাম না। তাই চলে এলাম।”

এই কথাটা বলেই ফারহান সোজা ভেতরের রুমে চলে যায়। আর প্রভা, সে এখনো দরজার পাশে দাঁড়িয়ে।হেলান দিয়ে। চুপচাপ। বাইরের ভোরটা ধীরে ধীরে আরও আলোয় ভরে উঠছে। রুমের ভেতর থেকে ভেসে আসা হাসির শব্দে এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ায় প্রভা। দরজার হাতলটা ধীরে করে ছেড়ে সে ভেতরে ঢুকে পড়ে। ঘরের ভেতরের দৃশ্যটা উষ্ণতায় ভরা। বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসে আছে ফারহান, তার পেটের উপর বসে আছে ইফতি। দুই জনের হাসিতে পুরো ঘর জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ফারহান কখনো মুখ বাঁকিয়ে ভয়ংকর মুখ বানাচ্ছে, কখনো আবার চোখ বড় করে অবাক হওয়ার ভান করছে, আর প্রতিবারই ইফতির খিলখিল হাসি আরও বেড়ে যাচ্ছে।

প্রভা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে পড়ে। তার চোখ সরছে না ওদের উপর থেকে। এই দৃশ্যটা তার কাছে অচেনা না, তবুও আজ কেন যেন ভেতরটা অন্যরকম ভারী লাগছে। ইফতি হঠাৎ ফারহানের বুকের ওপর ঝুঁকে পড়ে। ছোট্ট দুই হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার গলা।
” তুমি চুলি গেসো কেন? আর যাবা না, আমি তুমাল কাচে থাকবো।”

ফারহান এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়। তারপর খুব আস্তে, খুব সাবধানে ইফতির মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।

” আর যাবো না, সোনা!”
ফারহান বলে ওঠে নিচু স্বরে। ইফতি আবার উঠে বসে তার পেটের উপর।
” আমি ছব ছময় তুমাল সাথে থাকবো, বুজসো?”

ফারহানের মুখে হালকা হাসি ফুটে ওঠে। সে নিচু হয়ে ইফতির ছোট্ট পায়ের পাতায় আলতো করে চুমু দেয়।
” ঠিক আছে, আমার সোনা বাবা!”

এই কথাটা শোনামাত্রই ইফতি আবার খিলখিল করে হেসে ওঠে। মুহূর্তেই আবার শুরু হয় তাদের খুনসুটি।কখনো ধরাধরি, কখনো ভান করা রাগ, কখনো আবার নিছক আদরের খেলা। হাসির শব্দে ঘরটা ভরে যায়, দেয়ালগুলোও যেন সেই হাসি শুষে নিচ্ছে। আর দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রভা নিঃশব্দ। তার বুকের ভেতরে কোনো ঝড় নেই, শুধু এক ধরনের স্থির, গভীর উপলব্ধি। সে বুঝতে পারে, ফারহান এখানে শুধু তার বন্ধু না। সে এখন ইফতির পৃথিবীর একটা অংশ হয়ে গেছে। এমন এক অংশ, যেটা সরিয়ে ফেললে শিশুটার পুরো পৃথিবীটাই কেঁপে উঠবে।

প্রভা ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে নেয়। তার ঠোঁট কাঁপে না, চোখ ভেজে না, তবু ভেতরে কোথাও একটা অদৃশ্য সিদ্ধান্ত জন্ম নেয়। সে খুব ভালো করেই বুঝে যায়, তার জীবনে ফারহানের জায়গা হয়তো জটিল, অনিশ্চিত, কিন্তু তার ছেলের জীবনে ফারহান এখন প্রয়োজনের চেয়েও বেশি কিছু।

ভোর ৭টা ৩০ মিনিট!!
ড্রইংরুমের বড় সোফাটায় হেলান দিয়ে বসে আছে রাজ। মাথাটা পেছনে ঠেকানো, চোখ দুটো বন্ধ। সকালের নামাজ শেষ করে নিজের রুম থেকে বেরিয়ে এলেন মারফুয়া বেগম। ড্রইংরুমে এসে ছেলেকে এমন অবস্থায় বসে থাকতে দেখে তিনি থমকে গেলেন।রাজকে তিনি বহুবার চিন্তিত দেখেছেন, রাগ করতে দেখেছেন, হাসতে দেখেছেন। কিন্তু, এভাবে ভোরবেলা নিঃশব্দে বসে থাকতে খুব কমই দেখেছেন। ধীরে এগিয়ে এসে তিনি রাজের পাশে বসেন।

পাশে কারও উপস্থিতি টের পেয়ে রাজ চোখ খুলে তাকায়। ছেলের চোখ দুটো দেখে মারফুয়া বেগমের বুক ধক করে ওঠে। চোখ লাল হয়ে আছে। ক্লান্ত।অবসন্ন। মনে হচ্ছে, সারারাত এক ফোঁটা ঘুমও হয়নি।তিনি নরম গলায় বললেন,
” কী হয়েছে বাবা তোর? এমন করে বসে আছিস কেন?”

রাজ একবার মায়ের দিকে তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে নেয়। তারপর হাত দিয়ে মুখটা ডলে নেয়।
” কিছু হয়নি, আম্মু!”

” কিছু তো হয়েছে। আমাকে বল।”

রাজ ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। কী বলবে সে? যে তার নিজের সংসারটাই ধীরে ধীরে হাতের মুঠো থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে? যে তার স্ত্রী গতকাল রাতে বেরিয়ে গেছে আর এখনও ফেরেনি?নাকি বলবে, এতো বছর পর আজও কিছু স্মৃতি তাকে তাড়া করে বেড়ায়? কিছু কথা মানুষ চাইলেও বলতে পারে না। রাজ ধীরে ধীরে বললো,
” কিছু হয়নি। আমি রুমে যাচ্ছি।”

রাজ উঠে দাঁড়ায়। দুই তিন পা এগিয়ে গেছে, এমন সময় পেছন থেকে মারফুয়া বেগমের কণ্ঠ ভেসে এলো।
” অনন্যা কোথায়?”

মুহূর্তেই রাজের পা থেমে যায়। তার কাঁধ দুটো শক্ত হয়ে উঠে। কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা। কিন্তু, সে পেছন ফিরে তাকায় না। শুধু স্থির গলায় বললো,
” জানি না।”

মারফুয়া বেগমের ভ্রু কুঁচকে যায়। মারফুয়া বেগম বিস্মিত চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি বললেন,
” জানি না মানে?”

রাজ এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলো।তারপর গভীর শ্বাস নিয়ে বললো,
” রাত থেকে বাড়ির বাইরে। কোথায় আছে বলতে পারি না।”

” বাড়ির বউ সারা রাত বাইরে?”

রাজ এবার মায়ের দিকে তাকায়। সেই চোখে কোনো রাগ নেই, অভিযোগ নেই, আছে শুধু একরাশ অবসাদ।
” হ্যাঁ! এর বেশি কিছু জানি না আমি। প্রশ্ন করো না, আম্মু। মাথা ধরে আছে। একটু ঘুমাতে চাই। অনেকগুলো রাত নির্ঘুম কাটিয়েছি। কিন্তু, আজ বড্ড ঘুম পাচ্ছে। আর ঘুমানোর এই সুযোগটা আমি মিস করতে চাই না।”

কথাগুলো বলেই আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না রাজ। দ্রুত পায়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলো। তার হাঁটার ভঙ্গিতে যেন এক ধরনের পালিয়ে যাওয়ার তাড়া। যেন সে আর কোনো প্রশ্নের মুখোমুখি হতে চায় না। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার পদশব্দ সিঁড়ি বেয়ে উপরে মিলিয়ে গেল।

ড্রইংরুমে নিস্তব্ধতা নেমে আসে। মারফুয়া বেগম সোফায় বসে রইলেন। তাঁর দৃষ্টি স্থির সিঁড়ির দিকে, যেদিক দিয়ে রাজ চলে গেছে। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, কিন্তু ভেতরে ভেতরে চিন্তার ঝড় বইছে। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাহলে, অনন্যা নিজের আসল রূপ দেখাতে শুরু করেছে। আর রাজ, তার ছেলে নিজের কর্মফল ভোগ করা শুরু করে দিয়েছে। কথাটা ভাবতেই বুকের ভেতর এক ভার জমে উঠলো।একজন মা হিসেবে ছেলের কষ্ট দেখে তাঁর খারাপ লাগছে। কিন্তু, একই সঙ্গে তিনি এটাও জানেন, জীবনের কিছু হিসাব একসময় মানুষকে দিতেই হয়।তবুও এবার ব্যাপারটা শুধু রাজের নয়। এর পেছনে আরও বড় কিছু আছে। আর সেই বিষয়টাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি অস্থির করে তুলছে।

মারফুয়া বেগমের মুখ কঠিন হয়ে উঠলো। তিনি যা জানেন, যদি তা সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে সামনে ভয়াবহ একটা স’র্বনা’শ অপেক্ষা করছে। না। তিনি সেটা হতে দেবেন না। কিছুতেই না। দুই হাতের আঙুল শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন তিনি। অনন্যা যে পরিকল্পনা নিয়ে এতোদূর এগিয়েছে, সেই পরিকল্পনা সফল হওয়ার আগেই থামাতে হবে। যে করেই হোক থামাতে হবে। কারণ, এখন আর বিষয়টা শুধু সন্দেহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তিনি স্পষ্ট অনুভব করতে পারছেন, ঝড় খুব কাছে চলে এসেছে। আর, সেই ঝড় আঘাত হানার আগেই তাঁকে কিছু একটা করতে হবে। যেকোনো মূল্যে।

#_চলবে_ইনশাআল্লাহ_🌹