Home "ধারাবাহিক গল্প এক ফালি রোদ্দুর এক ফালি রোদ্দুর পর্ব-১৩

এক ফালি রোদ্দুর পর্ব-১৩

0
792

#_এক_ফালি_রোদ্দুর_
#_মারিয়া_রশিদ_
#_পর্ব_১৩_(বিয়ে স্পেশাল)

অবশেষে আজ ফারহান আর প্রভার বিয়ে হলো।কোনো জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন নয়, কোনো বিশাল অনুষ্ঠান নয়, একেবারে ঘরোয়া পরিবেশেই সম্পন্ন হয়েছে তাদের বিয়ের সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা। কাছের কিছু আত্মীয় স্বজন আর পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে নতুন জীবনের পথে পা রেখেছে তারা। প্রভার পরিবারও ভীষণ খুশি। দীর্ঘদিনের দুঃসময়, অনিশ্চয়তা আর নানা বাধা পেরিয়ে অবশেষে মেয়েটার জীবনে নতুন করে সুখের সম্ভাবনা এসেছে। সেই আনন্দটাই যেন সবার চোখেমুখে ফুটে উঠেছে।

প্রভাও আজ অদ্ভুত এক অনুভূতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। নতুন জীবনের শুরু, নতুন সম্পর্ক, নতুন পরিবার, সবকিছু মিলিয়ে তার মন ভরা দ্বিধা, সংকোচ আর একরাশ অচেনা স্বস্তিতে। অন্যদিকে, ফারিহা পারভিন এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিকভাবে সবকিছু মেনে নিতে পারেননি। তবে ছেলের মুখের শান্তি আর দৃঢ়তা দেখে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন। মনের ভেতরের সমস্ত দ্বন্দ্ব রাতারাতি মুছে ফেলা সম্ভব নয়। তবুও তিনি চেষ্টা করছেন। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে সবাই যখন বাড়িতে ফিরেছে, তখন বাড়িজুড়ে এক ধরনের ক্লান্ত অথচ আনন্দময় পরিবেশ বিরাজ করছে।

সন্ধ্যার পর থেকেই ইফতি রয়েছে ফাহিমের কাছে। ছোট্ট ছেলেটা যেন খুব অল্প সময়েই ফাহিমের সঙ্গে দারুণভাবে মিশে গেছে। কখনও তার কাঁধে উঠে বসছে, কখনও চুল টানছে, কখনও আবার অকারণেই হেসে গড়িয়ে পড়ছে। ফারহানের বাড়িতে আসার পর থেকেই দুজনের খুনসুটি যেন থামার নাম নেই।

” এই যে মিস্টার ইফতি! তুমি কি আমার মাথার সব চুল তুলে ফেলবে নাকি?”
ফাহিম মুখ গম্ভীর করে বলতেই ইফতি খিলখিল করে হেসে উঠলো।

” দুষ্টু!”
আবারও তার নাক চেপে ধরলো ফাহিম। ঠিক তখনই পেছন থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো।
” ফাহিম!”

ফাহিম ঘুরে তাকায়। সামনে দাঁড়িয়ে আছে ফারহান।সাদা পাঞ্জাবির ওপর হালকা রঙের কোটি এখনও খোলা হয়নি। সারাদিনের ক্লান্তি মুখে স্পষ্ট হলেও চোখেমুখে আজ এক ধরনের প্রশান্তি। ইফতি ফারহানকে দেখামাত্রই ফিচফিচ করে হেসে উঠলো।মুহূর্তের মধ্যেই দুই হাত সামনে বাড়িয়ে দিল সে। ফারহান এগিয়ে এলো। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি।
” ওকে আমার কাছে দে। অনেক রাত হয়ে যাচ্ছে। ওর ঘুমানো লাগবে।”

ফাহিম মুখ খুললো,
” আরে ভাইয়া! আরেকটু থাকুক না। আমরা তো এখন…”

কথা শেষ করার আগেই তার দৃষ্টি অন্যদিকে চলে যায়। ফারিহা পারভিন সেদিকেই এগিয়ে আসছেন। মায়ের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে ফাহিম আর কিছু বললো না। ফারহানও কিছু বললো না। শুধু হাত বাড়িয়ে দিলো। ইফতি এক মুহূর্তও দেরি করলো না।ছোট্ট শরীরটা সামনে ঝুঁকিয়ে ফারহানের কোলে চলে এলো। আর কোলে উঠেই আদুরে ভঙ্গিতে তার ঘাড়ের কাছে মুখ গুঁজে দেয়। ফারহানের বুকটা কেমন যেন নরম হয়ে এলো। এক হাতে ইফতির পিঠে আলতো চাপড় দিতে দিতে সে চোখ বন্ধ করলো কয়েক সেকেন্ডের জন্য। মনে হলো, পৃথিবীর সমস্ত শান্তি যেন এই ছোট্ট মানুষটার ভেতর লুকিয়ে আছে।

ফারহানের কোলে আরাম করে বসে আছে ইফতি। ছোট্ট দুটো হাত তার পাঞ্জাবির কলার আঁকড়ে ধরে আছে। মাঝে মাঝে মাথা তুলে চারপাশে তাকাচ্ছে, আবার মুহূর্তের মধ্যেই ফারহানের বুকে মুখ গুঁজে দিচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে হালকা গলায় বললেন ফারিহা পারভিন,
” আজ ইফতি আমাদের কাছেই থাকুক। ফাহিম আছে, আমি আছি। আমরা ওকে দেখে রাখবো।”

ফাহিমও সঙ্গে সঙ্গে সায় দিলো।
” হ্যাঁ, ভাইয়া! কোনো সমস্যা হবে না। ও তো আমার সাথেই দিব্যি খেলছিলো।”

ফারহান মায়ের দিকে তাকায়। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠলো। শান্ত কণ্ঠে সে বলে ওঠে,
” আম্মু! আমি প্রভাকে ভালোবাসলেও, আজ আমার আর প্রভার বিয়ের কারণ কিন্তু ইফতি। আমিও কোনো না কোনোভাবে ইফতিকে বুকে জড়িয়ে ঘুমানোর জন্য বড্ড লোভী। আর আজ আমি সেই সুযোগটা মিস করতে চাই না।”

কথাগুলো শুনে মুহূর্তের জন্য চুপ করে গেলেন ফারিহা পারভিন। ছেলের চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি বুঝতে পারলেন, কথাগুলো নিছক আবেগ নয়। গভীর আন্তরিকতা মিশে আছে সেখানে।
” কিন্তু ফারহান…”

কথা শেষ হওয়ার আগেই ফারহান নরম গলায় বলে উঠলো,
” প্লিজ, আম্মু! আমি ইফতিকে নিজের কাছেই আজ রাখতে চাই।”

ফারিহা পারভিন আর কিছু বললেন না। ফারহান তখন আদর করে ইফতির ফোলা ফোলা গালে একটা চুমু খায়। সঙ্গে সঙ্গে ইফতি ফিচফিচ করে হেসে উঠলো। তার সেই নিষ্পাপ হাসি দেখে ফারহানও হেসে ফেলে। ছোট্ট ছেলেটা চারপাশে তাকাতে তাকাতে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ফারিহা পারভিনের দিকে আঙুল তুলে বললো,
” উতি কে?”

সবাই একসঙ্গে তার দিকে তাকায়। ফারহান মুচকি হেসে বললো,
” তোমার দাদু।”

ইফতি গোল গোল চোখ করে তাকিয়ে রইলো
ফারিহা পারভিনের দিকে। যেন নতুন কোনো মানুষকে আবিষ্কার করেছে। ফারিহা পারভিনও অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন তার দিকে। বয়সের ভারে মুখে ভাঁজ পড়েছে, কিন্তু সেই মুহূর্তে চোখদুটো ভরে উঠলো এক কোমলতায়। তার দৃষ্টি বারবার গিয়ে আটকে যাচ্ছে ফারহান আর ইফতির ওপর। সত্যিই, দুজনকে পাশাপাশি দেখলে একটা মিল চোখে পড়ে।গায়ের রঙ প্রায় একই। ইফতি যেভাবে নির্ভয়ে ফারহানের বুকের সঙ্গে লেপ্টে আছে, তাতে দূর থেকে দেখলে যে কেউ বলবে, এরা বাপ ছেলে। ভাবনাটা মনে আসতেই ফারিহা পারভিনের বুকের ভেতরটা কেমন যেন নরম হয়ে এলো। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

হয়তো রক্তের সম্পর্ক সবসময় সবচেয়ে বড় পরিচয় নয়। কিছু কিছু সম্পর্ক তৈরি হয় ভালোবাসা দিয়ে, মায়া দিয়ে, নিঃস্বার্থ গ্রহণ করার ক্ষমতা দিয়ে। ইফতির মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ফারহান যখন নিচু স্বরে কিছু একটা বলছিলো, তখন দৃশ্যটা দেখে অকারণেই সবার মন ভরে উঠলো।আসলেই, বাচ্চাটা বড্ড আদুরে। আর তার থেকেও বেশি আদুরে হয়ে উঠেছে সেই মানুষটার কাছে, যে তাকে নিজের সন্তানের মতো করেই বুকে জায়গা দিচ্ছে। ছোট্ট আঙুলটা ফারিহা পারভিনের দিকে তুলে ইফতি মিষ্টি গলায় বলে উঠলো,
” ডাডু!”

শব্দটা খুব স্পষ্ট নয়। শিশুসুলভ জড়তা মিশে আছে উচ্চারণে। কিন্তু, তাতেই যেন মুহূর্তের মধ্যে কিছু একটা বদলে গেল। ফারিহা পারভিনের বুকের ভেতরটা খচ করে উঠলো। এই প্রথম কেউ তাকে এভাবে ডাকলো। একটা ছোট্ট শিশু। যে তার রক্তের সম্পর্কের নয়, অথচ অজান্তেই হৃদয়ের ভেতর জায়গা করে নিতে শুরু করেছে। তার দৃষ্টি গিয়ে থামে ইফতির নিষ্পাপ মুখে। তারপর ধীরে ধীরে সরে এলো ফারহানের দিকে। হঠাৎ করেই যেন অনেক কিছু বুঝতে পারলেন তিনি। কেন ফারহান এতোটা দৃঢ় ছিলো। কেন এতো বাধা, এতো আপত্তির পরও সে প্রভাকে বিয়ে করতে পিছপা হয়নি। কারণটা শুধু প্রভা নয়। কারণটা এই ছোট্ট মানুষটাও।

ইফতি যেন সত্যিই একটা জাদুর বাক্স। এমন এক জাদুর বাক্স, যেখানে একবার উঁকি দিলেই মানুষ হারিয়ে যায়। ভালোবেসে ফেলে। নিজের অজান্তেই তার প্রতি মায়া জন্মে যায়। ফারহান সেই জাদুর মধ্যে অনেক আগেই বন্দি হয়েছে। আর আজ মনে হচ্ছে, ফারিহা পারভিনও ধীরে ধীরে সেই জাদুর ভেতর আটকে যাচ্ছেন। ইফতি আবার ডাকলো,
” ডাডু!”

ফারিহা পারভিন চমকে উঠলেন। ইফতি এবার ভ্রু কুঁচকে বললো,
” ডাডু কতা বুলো না কেন?”

ফারহানের বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠে। সে উদ্বিগ্ন চোখে মায়ের দিকে তাকায়। ইফতি এখনও খুব ছোট। কিন্তু ছোট্ট মনেও আঘাত লাগে। যদি তার মা এখন মুখ ফিরিয়ে নেন, যদি কোনো উত্তর না দেন, তাহলে হয়তো শিশুটা বুঝবে না ঠিক কী হয়েছে, তবু কষ্ট পাবে। ফারহান কিছু বলতে যাচ্ছিলো, কিন্তু তার আগেই ফারিহা পারভিন মৃদু হেসে উঠলেন। একটা শান্ত, কোমল হাসি। যে হাসির ভেতরে আর কোনো দ্বিধা নেই। তিনি ধীরে সামনে এগিয়ে এলেন। তারপর আলতো করে ইফতির কপালে একটা চুমু দিলেন।ইফতি আরও বেশি খুশি হয়ে যায়। খিলখিল করে হেসে উঠে সেও ঝুঁকে পড়ে। ছোট্ট দুই হাত দিয়ে ফারিহা পারভিনের গাল জড়িয়ে ধরে টুপ করে একটা চুমু এঁকে দেয় সেখানে। অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন ফারিহা পারভিন। চোখের কোণ ভিজে উঠলো কি না, তিনি নিজেও বুঝতে পারলেন না। কতো সহজে ভালোবাসা দেওয়া যায়। আর কতো সহজেই তা ফিরে পাওয়া যায়। তিনি ইফতির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে নরম স্বরে বললেন,
” যাও, ঘুমিয়ে পড়ো। আগামীকাল কথা হবে, ওকে?”

ইফতি সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়।
” টুমিও গুমিয়ে পলো, আমিও গুমাই।”

কথাটা বলেই সে দুই হাত বাড়িয়ে ফারহানের গলা জড়িয়ে ধরে। মুহূর্তের মধ্যেই নিজের মুখটা গুঁজে দিল তার কাঁধে। ফারহান মৃদু হেসে ছেলেটাকে আরও শক্ত করে বুকে টেনে নেয়। তারপর সবার দিকে একবার তাকিয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ায়। ইফতির ছোট্ট মাথাটা ফারহানের কাঁধে হেলে পড়ে আছে। আর ফারহান এমনভাবে তাকে আঁকড়ে ধরে আছে, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটাকে বুকে আগলে রেখেছে।

নিচে দাঁড়িয়ে রইলেন ফারিহা পারভিন। নিঃশব্দে।অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যাওয়া দুটো মানুষের দিকে। একজন তার ছেলে।আর অন্যজন, হয়তো এখনও রক্তের সম্পর্কে তার কিছু নয়। তাও কেন যেন মনে হচ্ছে, ছোট্ট ছেলেটা অল্প অল্প করে তাদের পরিবারেরই একজন হয়ে উঠছে। আর সেই অনুভূতিটা অদ্ভুত ভাবে তার ভালো লাগছে।

প্রভা ধীরে ধীরে চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখছে।
রুমটা খুব বেশি জাঁকজমকপূর্ণভাবে সাজানো হয়নি, তাও সাজসজ্জার ভেতর একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে। বিছানার চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হয়েছে তাজা ফুল। গোলাপ আর রজনীগন্ধার মিষ্টি ঘ্রাণ পুরো ঘরজুড়ে এক ধরনের শান্ত আবেশ তৈরি করেছে।

প্রভা আজ হালকা লালচে গোলাপি রঙের একটি শাড়ি পরে আছে। গলায় ছোট্ট একটি হার, কানে মানানসই দুল, হাতে কয়েকটি চুড়ি, সব মিলিয়ে সাজটা ছিল একেবারে সাধারণ, অথচ ভীষণ সুন্দর। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ মুখশ্রীতে আজ যেন অন্যরকম এক আভা ফুটে উঠেছে। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সে রাতের আকাশ দেখছে মনের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি কাজ করছে। নতুন জীবন, নতুন পরিচয়, নতুন সম্পর্ক। এতোদিনের পরিচিত পৃথিবীটা যেন আজ একটু বদলে গেছে। ঠিক তখনই দরজা খোলার শব্দে চমকে ঘুরে তাকায় সে। দৃষ্টি গিয়ে থামলো দরজার কাছে।

ফারহান দাঁড়িয়ে আছে। আর তার কোলে বসে আছে ইফতি। ছোট্ট ছেলেটা ফারহানের গলার সঙ্গে লেপ্টে থেকে কী যেন ফিসফিস করে বলে যাচ্ছে। মুখভর্তি হাসি। প্রভাকে দেখামাত্রই ইফতির চোখ দুটো চকচক করে উঠলো।

” মাম্মাম!”
খুশিতে চিৎকার করে উঠলো ইফতি। তারপর খিলখিল করে হেসে দুই হাত সামনে বাড়িয়ে দেয়।প্রভার বুকটা মুহূর্তেই ভরে যায়। সে দ্রুত এগিয়ে এসে ইফতিকে নিজের কাছে টেনে নেয়। তারপর আদর করে তার নরম, গোলাপি গালে একটা চুমু খেলো।ইফতি আরও বেশি খুশি হয়ে যায়। দুই হাত নেড়ে নেড়ে উচ্ছ্বসিত গলায় বললো,
” মাম্মাম! আমলা পালহান আনকেলের বাসায় এসেতি।”

কথাটা শুনে প্রভার এক পলকের জন্য দৃষ্টি গিয়ে আটকে রইলো ফারহানের মুখে। ফারহানও তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। প্রভা মৃদু হাসে। তারপর ইফতির কপালে আলতো চুমু দিয়ে নরম স্বরে বললো,
” ইফতি! আমার পাপা! ফারহান তোমার আংকেল নয়।”

ইফতি বিস্মিত হয়ে তাকায়।
” না?”

” না।”

” তায়লে?”

প্রভা একবার ফারহানের দিকে তাকায়। তারপর আবার ইফতির দিকে তাকিয়ে ধীরে বলে,
” ফারহান তোমার বাবা হয়।”

কথাটা বলেই প্রভা চুপ হয়ে যায়। ঘরের ভেতর হঠাৎ যেন নিস্তব্ধতা নেমে এলো। ইফতি রসগোল্লার মতো গোল গোল চোখ করে তাকিয়ে রইলো ফারহানের দিকে। তার ছোট্ট মুখে স্পষ্ট বিস্ময়। কয়েক সেকেন্ড কিছু না বলে শুধু তাকিয়েই থাকলো সে। তারপর বললো,
” পালহান আনকেল বাবা?”

প্রভা মৃদু হেসে মাথা নাড়ে।
” হুম!”

ইফতি আবার তাকায় ফারহানের দিকে। ফারহানও তাকিয়ে আছে তার দিকে। ঠোঁটের কোণে খুবই মৃদু একটা হাসি। কিন্তু, বুকের ভেতরে তখন যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছে। অস্থিরতা কাজ করছে তার মধ্যে। হাজারবার নিজেকে বুঝিয়েছে, একটা ডাকেই তো সবকিছু বদলে যায় না। তবুও কেন যেন আজ সেই ছোট্ট ডাকটার জন্য মনটা ভীষণ ব্যাকুল হয়ে উঠেছে।একবার। শুধু একবার। ইফতির মুখে বাবা ডাকটা শুনতে পারলে হয়তো আজকের দিনটা সম্পূর্ণ হয়ে যাবে। গোল গোল চোখে ফারহানের দিকে তাকিয়ে থেকে ইফতি বললো,
” টুমি আমাল বাবা হও?”

ফারহান কোনো উত্তর দিলো না। শুধু তাকিয়ে রইলো।তার চোখদুটো স্থির হয়ে আছে ইফতির মুখে। এই ছোট্ট প্রশ্নটার উত্তর দেওয়ার ভাষা তার জানা নেই, কিংবা হয়তো এমন একটা মুহূর্তের জন্য সে প্রস্তুতই ছিল না। ইফতি এবার মুখ ঘুরিয়ে প্রভার দিকে তাকায়। তার চোখে সরল প্রশ্ন। প্রভা মৃদু হাসলো।তারপর খুব শান্ত, খুব কোমল স্বরে বলে ওঠে,
” হুম! তোমার বাবা! সাজ্জাদুল ফারহান!”

কথাগুলো বলার সময় প্রভার কণ্ঠে কোনো দ্বিধা নেই।যেন সে শুধু একটা পরিচয় দিচ্ছে না, বরং একটা সম্পর্ককে তার প্রাপ্য নামটা দিচ্ছে। ইফতি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। ছোট্ট একটা হাত তুলে নিজের কানটা আলতো করে ডললো। তারপর আবার তাকায় ফারহানের দিকে। শিশুসুলভ মনটা নিজের মতো করে সবকিছু মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। কয়েক সেকেন্ড কেটে যায়। তারপর সে ঠোঁটটা একটু উল্টে বলে,
” বাবা!”

শব্দটা খুব ছোট। কিন্তু, সেই ছোট্ট শব্দের ভার যেন পুরো পৃথিবীর সমান। ফারহানের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠে। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, চারপাশের সব শব্দ হারিয়ে গেছে। রজনীগন্ধার ঘ্রাণ নেই। রাতের নীরবতা নেই। সময়ও নেই। আছে শুধু একটি শব্দ, বাবা। নিজের বাবাকে তো বহুকাল আগেই হারিয়েছে, অথচ আজ তাকে কেউ বাবা বলে ডাকছে। তার চোখ দুটো বন্ধ হয়ে এলো। কেন এতো কান্না পাচ্ছে তার? সে নিজেও জানে না। হয়তো এই ডাকে কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই। কোনো জৈবিক পরিচয় নেই। তাও, এই ছোট্ট মানুষটার জন্য কতোদিন ধরে বুকের ভেতর মায়া জমে আছে।কতোদিন ধরে তাকে এই অধিকারে আগলে রাখতে ইচ্ছে করেছে। কতোদিন ধরে মনে মনে ভেবেছে, যদি একদিন ইফতি তাকে নিজের মানুষ বলে মেনে নেয়।আজ সেই মুহূর্তটাই এসে গেছে। ইফতি দুই হাত বাড়িয়ে দেয়, ঝুঁকে এসে ফারহানের গলা জড়িয়ে ধরে। ছোট্ট মাথাটা এনে রাখলো তার কাঁধে। চোখ বন্ধ করে আদুরে গলায় বললো,
” আমাল বাবা!”

ফারহানের সমস্ত বাঁধ যেন সেই মুহূর্তে ভেঙে যায়। সে দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো ইফতিকে। এমনভাবে বুকের সঙ্গে চেপে ধরলো, যেন পৃথিবীর কোনো শক্তিই আর তাদের আলাদা করতে পারবে না। তার গলা শুকিয়ে এসেছে। শ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে। চোখের কোণ থেকে নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়লো এক ফোঁটা জল। একটা মাত্র অশ্রুবিন্দু। কিন্তু, সেই এক ফোঁটা জলের ভেতর জমে ছিল অগণিত অনুভূতি। অপেক্ষা। চভালোবাসা। প্রাপ্তি। আর এক অদ্ভুত পরিপূর্ণতা।

প্রভা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। তার দৃষ্টি গিয়ে থামে ফারহানের চোখের কোণ বেয়ে নেমে আসা সেই অশ্রুবিন্দুতে। মুহূর্তের জন্য তার বুকটাও কেঁপে উঠলো। আজ সে প্রথমবার বুঝতে পারলো, একজন মানুষ শুধু তাকে ভালোবাসেনি। ভালোবেসেছে তার সন্তানকেও। নিঃস্বার্থভাবে। নির্বিচারে। সম্পূর্ণ হৃদয় দিয়ে। প্রভার ঠোঁটের কোণে একটুকরো হাসি ফুটে উঠলো। চোখ দুটো ভিজে এলো অজান্তেই। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা আজ শুধু তার স্বামী নয়। ইফতির বাবা। আর হয়তো এই পরিচয়টাই ফারহানের জীবনের সবচেয়ে প্রিয় পরিচয়।

#_চলবে_ইনশাআল্লাহ_🌹