Home "ধারাবাহিক গল্প ঝরা শিউলির দিনে ঝরা শিউলির দিনে পর্ব-৪৬

ঝরা শিউলির দিনে পর্ব-৪৬

0
478

#ঝরা_শিউলির_দিনে
#পর্ব ৪৬
#তামান্না_ইসলাম_শিমলা

_______________________

কেটে গেছে তেরোটি দিন। সময় হিসেব করলে মাত্র তেরোটি দিন, অথচ অপরূপার কাছে মনে হচ্ছে বহু ঋতু পেরিয়ে গেছে এই অল্প ক’টা সময়ে। জীবন কখনও কখনও বড় অদ্ভুত প্রান্তে এসে দাঁড়া করায়। কোনো কোনো মানুষ বছরের পর বছর পাশাপাশি থেকেও হৃদয়ের ভেতর জায়গা করে নিতে পারে না, আবার কেউ কেউ মাত্র কয়েকটি দিনের ব্যবধানে সমস্ত ভাবনাজুড়ে বিস্তৃত হয়ে বসে। আজ আভিয়ান আর অপরূপার বিয়ের তেরোতম দিন। এই তেরো দিনে অপরূপা আর কিছু বুঝুক বা না-ই বুঝুক, একটা বিষয় খুব স্পষ্টভাবে বুঝেছে
আভিয়ানের কাছে পিহু কতটা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু দায়িত্ব নয়, শুধু মায়া নয় বরং এমন এক গভীর স্নেহ, যা রক্তের সম্পর্কের সীমারেখাকেও হার মানিয়ে দেয়। সবকিছু এত স্বাভাবিক, এত আন্তরিক যে মাঝে মাঝে অপরূপার নিজেরই বিশ্বাস হয় না। পিহুও পুরোপুরি মিশে গেছে। সে
গর্বভরে সবাইকে বলে আভিয়ান তার ইয়ান পাপা। আর সেই সম্বোধন শুনলেই আভিয়ানের মুখে যে হাসিটা ফুটে ওঠে, সেটার সঙ্গে পৃথিবীর কোনো কিছুর তুলনা চলে না।
তবে এই তেরো দিনে আরেকটি পরিবর্তন হয়েছে। অপরূপার নিজের ভেতরেও। সে এক অদ্ভুত রোগে আক্রান্ত হয়েছে। সেটা হলো অনুভূতির রোগ। এই অনুভূতির কোনো নাম সে জানে না। কেবল জানে, দিনশেষে ঘুমাতে যাওয়ার আগে সে আভিয়ানকে নিয়ে ভাবে। সকালে ঘুম ভাঙার পরও ভাবে। অফিসে বসে ফাইল দেখতে দেখতে ভাবে। হঠাৎ কোনো কথা মনে পড়লে অকারণে হাসে। আবার নিজের সেই হাসি নিজেই লুকিয়ে ফেলে। কেন? সেটার উত্তর তার কাছে নেই। শুধু এটুকু জানে কিছু একটা তাকে ধীরে ধীরে আভিয়ানের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। অথচ এর মাঝেও একটা বিষাক্ত কাঁটার মতো ব্যথা প্রতিদিন তার বুকের ভেতর বিদ্ধ হয়। তার পরিবার। তার মা, তার ভাই। তারা নেই। এই পৃথিবীর কোথাও নেই। পুলিশ এখনো তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে, কেসের ফাইলের পর ফাইল খুলছে। তদন্ত হচ্ছে।
জিজ্ঞাসাবাদ হচ্ছে। কিন্তু সৈকত কিংবা তার সহযোগী সেই দুই মানুষ তাদের কোনো খোঁজ নেই। একটুও না।
অপরূপা এমনিতেও আইনের উপর খুব বেশি ভরসা করে না। বিশেষ করে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার পর তো নয়ই। কখনো কখনো গভীর রাতে তার মনে হয় যদি একবার তাদের খুঁজে পেত, মাত্র একবার তাহলে আইনের হাতে নয়। নিজের হাতে বিচার করত সে। নিজের হাতে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে মায়ের নিথর মুখ। ভাইয়ের রক্তাক্ত শরীর। সেসব মনে আসলেই তার সমস্ত অস্তিত্ব প্রতিশোধের আগুনে জ্বলে ওঠে। অপরূপার আঙুলের ফাঁকে ঘুরতে থাকা কলমটা হঠাৎ ডেস্কে ঠক করে আঘাত করল। অপরূপা চমকে বাস্তবে ফিরল। একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে চোখ তুলে সামনে তাকাল। আভিয়ানের কেবিন খালি। দুই কেবিনের মাঝখানের কাঁচের পার্টিশনের পর্দাটা অনেক আগেই সরিয়ে দিয়েছে আভিয়ান নিজ উদ্যোগে। অফিসের সবাই তাদের বিয়ের কথা জানে। এমন সময় হুট করেই দরজায় নক পড়ল। অপরূপা সেদিকে তাকিয়ে দেখল অভ্র। অপরূপা হেসে ভেতরে আসতে বলতেই ভেতরে ঢুকল সে। হাতে একটা ফাইল। মুখে চিরচেনা হাসি।

“ম্যাডাম, আমার বেচারা ফাইলটার কোনো খোঁজ আছে?”

অপরূপা ভ্রু তুলল। জিজ্ঞেস করল,

“কোন ফাইল?”

“যেটা দুদিন আগে দিয়েছিলাম।”

“ওটা তো আভিয়ান স্যারের কাছে।”

অভ্র সঙ্গে সঙ্গে নাটকীয়ভাবে বুক চাপড়াল।

“ইয়া আল্লাহ! তাহলে তো ফাইলটা শহীদ হয়ে গেছে। যাই হোক, আমার ফাইলটা উদ্ধার করে দিন।”

অপরূপা হাসল। পরপর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আভিয়ান আজকাল কাজের দিকে একদমই মনোযোগ দিচ্ছে না। ফাইলটা দিয়েছে দুদিন আগে। এখনো সেটা চেক করেনি। ছেলেটা কী যে করে। অপরূপা তাকাল অভ্রর দিকে। বলল,

“হ্যাঁ, ফিরুক। দেখি হয়েছে কি-না।”

অভ্র কিছু বলার উপক্রম করতেই কেবিনের ভারী দরজাটা হঠাৎ খুলে গেল। আর সেই শব্দে দুজনের ঠোঁটে লেগে থাকা হাসির রেখা নিমেষেই মিলিয়ে গেল। দরজার সামনে এক রোমাঞ্চকর অবয়বে দাঁড়িয়ে আছে আভিয়ান। মাথায় তার ব্ল্যাক হেলমেট, পরনে চারকোল রঙের নিখুঁত ফরমাল স্যুট, যা তার ব্যক্তিত্বকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এক হাতের আঙুলে খেলা করছে গাড়ির চাবিটা। তার চোখদুটোয় এক গম্ভীর, মেঘাচ্ছন্ন ভাব। সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সোজা গিয়ে আছড়ে পড়ল অভ্রর ওপর। মুহূর্তেই ঘরের হালকা পরিবেশটা ভারী হয়ে উঠল তার সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বরে,

“কাজ বাদ দিয়ে গল্প কীসের আপনাদের?”

অভ্র চট করে তাকাল সেদিকে। আভিয়ানের এই আকস্মিক আগমন আর মুখের গম্ভীর ভঙ্গি দেখে সে ঠোঁট কামড়ে নিজের হাসিটা চেপে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করল। মনের গহীনে সে অনেক আগেই এই দৃশ্যপট কল্পনা করে রেখেছিল। কারণ আভিয়ানের মনের গতিবিধি বা তার এই লুকোনো অধিকারবোধের মতলব অভ্রর চেনা। সে নিজের কৌতুকী ভাবটা কোনোমতে নিয়ন্ত্রণ করে মাথা সামান্য ঝুঁকিয়ে বলে উঠল,

“সরি স্যার।”

অভ্র আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ানোর প্রয়োজন বোধ করল না। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে সে দ্রুত কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। তবে যাওয়ার সময় অবশ্য আড়চোখে অপরূপার দিকে তাকিয়ে মনের সুখে মুচকি হাসতে ভুলল না। অভ্র চলে গেলেও আভিয়ান এখনো দরজার সামনে ওভাবেই একরাশ গাম্ভীর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। অপরূপা এতক্ষণে নিজের চোখের পলক তুলে তার দিকে তাকাল। আভিয়ান তো বাড়ি থেকে পিহুকে সঙ্গে নিয়েই বেরিয়েছিল, কিন্তু এই মুহূর্তে তো মেয়েটিকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না! কপালে হালকা চিন্তার ভাঁজ পড়ল রমণীর। সে উৎসুক কণ্ঠে শুধালো,

“পিহু কোথায়?”

ঠিক তখনই দরজার আড়াল থেকে ছোট্ট একটা মাথা উঁকি দিল। আর কেবিন কাঁপিয়ে মিষ্টি সুরে শব্দ করে উঠল,

“বু!”

অপরূপা অতর্কিতে বেশ ভালো রকম চমকে উঠল। পরক্ষণেই তার দৃষ্টিগোচর হলো পিহু। মাথায় তার একটা ছোট্ট হেলমেট ঝুলছে, আর পরনে ঢোলা ব্যাগি টি-শার্ট আর প্যান্ট। তাকে এই অদ্ভুত ফ্যাশনেবল বেশে দেখে অপরূপার চোখ দুটি বিস্ময়ে গোল গোল হয়ে গেল। সে তো মেয়েটিকে নিজের হাতে সুন্দর একটা ফ্রক পরিয়ে পাঠিয়েছিল, তবে এই অল্প সময়ে এমন ভোলবদল কী করে সম্ভব হলো? সে অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,

“তোমার ফ্রক কই?”

পিহু পরম গর্বে আর আহ্লাদে নিজের নতুন জামাটার দিকে তাকাল। যেন সে এক মস্ত বড় যুদ্ধ জয় করে এসেছে! তারপর আধো আধো বুলি আউড়ে বলল,

“আমি কুল।”

আভিয়ান ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। তার দুই হাত শপিং ব্যাগের বিশাল বহরে একদম ভর্তি। সে ব্যাগগুলো পরম যত্নে ডেস্কের ওপর রেখে, মস্তক থেকে হেলমেটটা খুলতে খুলতে কিছুটা অভিমানী সুরে বলল,

“পিহুর ফ্রকের হিসাব পরে হবে। তার আগে আপনি বলুন, ওই অভ্রর সাথে কত সময় ধরে এত নিবিড় বাক্যালাপে মত্ত ছিলেন? কাজের হিসাব তো অনেক হলো, এবার এই পাওনাটাও বুঝিয়ে দিতে হবে নাকি?”

অপরূপা নিজের ভেতরেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল। লোকটা যে অভ্রকে নিয়ে একটু বেশিই ঈর্ষাকাতর আর জেলাস, তা তার জানা। তবে অপরূপারও আজকাল আভিয়ানের এই শান্ত রূপটা ভেঙে তাকে একটু জ্বালাতে বেশ ভালোই লাগে। মনের ভেতর এক দুষ্টু বুদ্ধি চাড়া দিয়ে উঠল তার। ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় হাসি ঝুলিয়ে বলে উঠল,

“কেন বলুন তো?”

“যা জিজ্ঞেস করেছি, ঠিক তার উত্তর দিন।”

“অনেকক্ষণ ধরে কথা বলছিলাম। এই ধরুন ঘণ্টা খানেক তো হবেই। অভ্র ছেলেটা কিন্তু ভীষণ ভালো, বুঝলেন?”

নিজের ভেতরের উপচে পড়া হাসিটুকু কোনোমতে চেপে রেখে কথাগুলো বেশ গুছিয়ে বলল অপরূপা।আভিয়ানের মুখাবয়ব মুহূর্তেই শক্ত আর কঠোর হয়ে উঠল। তার চোখের চাউনি দেখেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সে মনে মনে বেশ রেগে গিয়েছে। তাকে রাগানোর এই সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া না করে অপরূপা দ্বিতীয় দফায় যোগ করল,

“ওনার মতো এমন সহজ-সরল আর মার্জিত মানুষ আমি আজকাল খুব কম দেখেছি। এত্ত ডিসেন্ট!”

ডিসেন্ট? ওই অভ্র নাকি মার্জিত? আর সে? সে কি ডিসেন্ট নয়? কই, তাকে নিয়ে তো এই রমণী কখনো এত প্রশংসার বাণী বর্ষণ করে না! তবে এই অভ্রর প্রতি কেন এত স্তুতিগান? এই পর্যায়ে আভিয়ানের ভেতরকার সেই পুরুষালী অধিকারবোধ আর গম্ভীর সত্তাটা পুরোপুরি জেগে উঠল। সে আর কোনো দূরত্ব না রেখে এক ক্ষিপ্র গতিতে এগিয়ে এসে সজোরে জড়িয়ে নিল অপরূপার কোমর। অপরূপা অবশ্য খুব একটা চমকে গেল না। বরং অবাধ্য এক সাহসে সরাসরি চোখে চোখ রাখল তার। আভিয়ান পুরোপুরি ঝুঁকে এলো অপরূপার মুখের ওপর। চোখে চোখ রেখে, প্রগাঢ় অধিকারবোধ নিয়ে ফিসফিসিয়ে আওড়াল,

“আপনার গল্পের সূচনা আমি না-ই হতে পারি, তবে সমাপ্তিটা শুধুমাত্র শুধুই আমি। এই আভিয়ান এহসান। আর আমাকে ব্যতিত আর কোনো পুরুষের কথা ভাবাও আপনার জন্য নিষিদ্ধ, মিসেস আভিয়ান।”

“অধিকার খাটাচ্ছেন?”

আভিয়ান হাসলো। কোমরে রাখা হাতের বাঁধন দৃঢ় হলো তার। কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল,

“অধিকার খাটালে এতদিনে লিটেল কিটেনের খেলার সঙ্গী আসার সুখবর চলে আসত। তাই নয় কি, মিসেস আভিয়ান?”

“অসভ্য!”

লজ্জায় আর আড়ষ্টতায় অপরূপার কান দিয়ে বুঝি গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে। সে এক ঝটকায় নিজেকে আভিয়ানের বলিষ্ঠ বাহুডোর থেকে ছাড়িয়ে নিল। আভিয়ানের ঠোঁটের কোণে তখন এক বিজয়ী, বক্র হাসির রেখা। অপরূপা চট করে চোখ সরিয়ে নিজের লাল হয়ে ওঠা মুখটা আড়াল করল। গম্ভীর মুখে তাকাল পিহুর দিকে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সে কথা ঘুরিয়ে শুধাল,

“এসব কী? এত এত ব্যাগ কীসের?”

নিচ থেকে পিহু পরম আনন্দে উত্তেজিত কণ্ঠে হাততালি দিয়ে বলল,

“পাপা আমাকে কিনে দিয়েছে, অনেক অনেক জুতো আর জামা!”

অপরূপা হতবাক হয়ে ডেস্কের ওপর রাখা ব্যাগগুলোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর চোখ ফিরিয়ে তাকাল আভিয়ানের পানে।

“এত জিনিস কেন অযথা কিনে এনেছেন?”

আভিয়ান এবার সুযোগ বুঝে আবারও তার দিকে সামান্য ঝুঁকে এলো। গম্ভীর কণ্ঠস্বরে কৌতুক মিশিয়ে শুধালো,

“কেন? আপনি কি জেলাস হচ্ছেন?”

অপরূপা চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলল। এখানে ঈর্ষার প্রশ্ন কোথা থেকে আসছে? আশ্চর্য লোক তো!

“আজব! আমি জেলাস কেন হতে যাব?”

আভিয়ান কোনো পরোয়া না করে হালকা করে কাঁধ ঝাঁকাল। জবাব দিল,

“কারণ নিজের মেয়েকে এত শপিং করিয়ে দিলাম, অথচ আপনার জন্য একটি সুতোও আনিনি। আমি ভালো করেই জানি, মেয়েরা একটু বেশিই জেলাস হয়। তাই বলে নিজের ছোট্ট মেয়ের ওপরেও ঈর্ষা? দ্যাটস নট গুড, মাই ডিয়ার প্রিটি ওয়াইফি।”

“পাগল নাকি আপনি?”

আভিয়ানের চওড়া বক্ষপটে আলতো এক ধাক্কা দিল অপরূপা। আভিয়ান সেই গম্ভীর মুখাবয়বেই চোখ টিপল। ধীর অথচ গভীর স্বরে আওড়াল,

“হ্যাঁ, শুধু মাত্র আপনার জন্য।”

অপরূপা অসহায়ের মতো দীর্ঘশ্বাস ফেলল। লোকটার সাথে কথায় জেতা অসম্ভব। সে গম্ভীর হয়ে বলল,

“দুদিন আগে যে কাজের ফাইলটা আপনাকে দিলাম, ওটা সই করে ফেরত দিচ্ছেন না কেন? দিন দিন কাজের প্রতি আপনার মনোযোগ যেভাবে হারাচ্ছে, তাতে তো দেখছি এহসান গ্রুপের লাটে উঠবে।”

আভিয়ান বুকের ওপর হাত দুটি ভাঁজ করে দেয়ালে হেলান দিল।

“আপনার মতো এক অপ্সরা যদি সর্বদা চোখের সামনে ঘুরে বেড়ায়, তবে কোনো নশ্বর পুরুষের পক্ষে কাজে মনোযোগ দেওয়া সম্ভব বলুন?”

“একদম রসিকতা করবেন না। কাজের বিষয়ে একটু সিরিয়াস হোন।”

আভিয়ান নিজের শার্টের কলারটা কিঞ্চিৎ ঠিক করতে করতে অহংকারের সুরে বলল,

“পার্ফেক্ট! আপনিই এহসান গ্রুপের জন্য একদম উপযুক্ত ফিউচার সিইও।”

অপরূপা ভ্রু কুঁচকে ফেলল।

“কী বললেন?”

“যা শুনলেন।”

“আমি কিন্তু অত্যন্ত সিরিয়াসলি বলছি।”

“আমিও সিরিয়াস।”

“আভিয়ান!”

“জি, মিসেস আভিয়ান?”

“আপনি দিন দিন অসম্ভব বিরক্তিকর হয়ে উঠছেন।”

“ধন্যবাদ। এই সুন্দর বাক্যটিকে আমি পরম প্রশংসা হিসেবেই গ্রহণ করলাম।”

পাশ থেকে পিহু তাদের এই খুনসুটি দেখে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। নিজের মাথা থেকে ভারী হেলমেটটা সরাতে সরাতে বলল,

“মাম্মা রাগ করেচে!””

অপরূপা পিহুর দিকে পরম স্নেহে তাকিয়ে বলে উঠল,

“রাগ করব না? দেখো তোমার পাপার কীর্তি!”

“পাপা বড্ড বদ!”

“এই!”

আভিয়ান নাটকীয় ভঙ্গিতে নিজের বুকের বাম পাশটা চেপে ধরল।

“নিজের মেয়েও এখন মায়ের দলে যোগ দিয়ে আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করে দিল!”

পিহু এবার আরও জোরে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। ঠিক তখনই আভিয়ানের পকেটে থাকা মুঠোফোনটি উচ্চশব্দে বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই তার মুখের সেই চঞ্চল ও কৌতুকী ভাবটা নিমেষেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল, সেখানে স্থান নিল এক পেশাদার গাম্ভীর্য। কলটা রিসিভ করে সংক্ষেপে গম্ভীর গলায় দু-একটা কথা বলেই সে ফোনটা নামিয়ে রাখল। তারপর অপরূপার দিকে তাকিয়ে বলল,

“ফাইলটা ডেস্কে রাখা আছে। আপনি যেহেতু নিজে চেক করেছেন, তার মানে সব ঠিকঠাকই আছে। আমার হয়ে ওটায় আপনিই সাইন করে দিন। আমি একটা জরুরি কাজে আসছি।”

“কিন্তু…”

আভিয়ান আর দাঁড়াল না, দরজার দিকে হাঁটা ধরল। যেতে যেতেই এক প্রকার আদেশ দেওয়ার ভঙ্গিতে উচ্চারণ করল,

“কোনো কিন্তু নয়।”

“আভিয়ান শুনুন…”

আভিয়ান থামল না, কিংবা তার পেছনের আকুল আহ্বান শুনলও না। আর কোনো কথা বলার বিন্দুমাত্র সুযোগ না দিয়েই সে দ্রুত কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।
সে চলে যেতেই পুরো কেবিনে কয়েক মুহূর্তের জন্য এক মায়াবী নীরবতা নেমে এলো। অপরূপা স্থির হয়ে সেই বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে নিজের মাথাটা নেড়ে একাই হেসে ফেলল। নিজের অজান্তেই তার ওষ্ঠের কোণে এক চিলতে অমলিন ও পবিত্র ভালোবাসার হাসি ছড়িয়ে পড়ল। সে টেবিল থেকে ফাইলটা নিজের হাতে তুলে নিতে নিতে আপন মনে বিড়বিড় করে বলল,

“লোকটা আসলেই একটা আস্ত পাগল!”

____

টিপটিপ বৃষ্টিতে মুখরিত হয়ে আছে পুরো পরিবেশ। আকাশজুড়ে ছড়িয়ে আছে ধূসর মেঘের স্তর। দূরের গাছপালাগুলো বৃষ্টির আবছা পর্দার আড়ালে ঝাপসা হয়ে গেছে। নির্জন মহাসড়কের একপাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে চারটি বাইক। বৃষ্টির ফোঁটা এসে পড়ছে তাদের গায়ে। জ্যাকেট ভিজে গেছে। চুল ভিজে গেছে।তবুও চারজনের কেউই নড়ছে না। নিজ নিজ বাইকের উপর বসে আছে আভিয়ান, ফুয়াদ, জাওভান আর নিদ্রা।
কেমন এক ভারী নীরবতা চারপাশকে গ্রাস করে রেখেছে।
মাঝে মাঝে শুধু বৃষ্টির শব্দ আর বজ্রের গুমগুম আওয়াজ। এই নীরবতার ভেতরেই হঠাৎ জাওভান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর মাথা ঘুরিয়ে তাকাল আভিয়ানের দিকে।

“তুই কিছু বল?”

আভিয়ান ধীরে ধীরে মুখ তুলল। দৃষ্টি গিয়ে থামল জাওভানের উপর। কিছু বলল না সে। কয়েক সেকেন্ড নীরবই রইল। শেষমেশ গভীর একটা শ্বাস টেনে নিয়ে শান্ত গলায় বলল,

“সবারই নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন আছে। আমাদের উচিত নয় সেসবে ঢোকা।”

জাওভানের ভ্রু কুঁচকে গেল।

“মানে?”

“মানে যা বললাম।”

“সবকিছুর একটা সীমা আছে আভি।”

লাফিয়ে উঠল জাওভান। ঠিক তখনই নিদ্রা বলে উঠল,

“আভিয়ান ঠিকই বলছে।”

জাওভান সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে ফিরল।

“না, ঠিক বলছে না।”

“বলছে।”

“কীভাবে?”

“কারও জীবনের সিদ্ধান্তে জোর করে ঢুকে পড়া ঠিক না।”

“আচ্ছা! এখন তুই আমাকে নীতিকথা শোনাবি?”

নিদ্রা বিরক্ত হলো জাওভাসের কথায়। বিরক্তি নিয়েই জবাব দিল,

“আমি নীতিকথা শোনাচ্ছি না। বাস্তবতা বলছি।”

“বাস্তবতা?”

হেসে উঠল জাওভান। তাচ্ছিল্য ময় সেই হাসি। নিদ্রা দাঁতে দাঁত চেপে উচ্চারণ করল,

“হ্যাঁ।”

“বাস্তবতা হচ্ছে আমরা বন্ধু।”

“বন্ধু মানে কারও ব্যক্তিগত সীমানা ভেঙে ফেলা না।”

দুজনের কণ্ঠেই বিরক্তি স্পষ্ট। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ঠিক তখনই ফুয়াদ ধমক দিয়ে উঠল দুজনকে।

“তর্ক থামা!”

তার কণ্ঠেও স্পষ্ট বিরক্তি। চুপ করে গেল দুজনেই। ফুয়াদ দুহাতে মুখ মুছে নিল। বৃষ্টির পানি আর জমে থাকা অস্থিরতা একসাথে ঝরে পড়ল তার মুখ থেকে।

“আমি এমনিতেই দ্বিধায় আছি কী করব। আর তোরা…”

কথাটা শেষ করতে পারল না ফুয়াদ। তার গলা ভারী হয়ে এল। চারপাশে আবার নীরবতা নেমে এল। সে সপ্নটা ছোট থেকে দেখে এসেছে সে সেটা আজ তার দোরগোড়ায়। ফ্রান্সের ল্যাসেলে জি হয়েছো তার। তবে এই মুহূর্তে পরিবার, বন্ধু কাউকেই আর ছেড়ে যেতে মন টানছে না তার। আভিয়ান এ পর্যায়ে বাইক থেকে নেমে এল। বৃষ্টির মাঝে দাঁড়িয়ে বন্ধুর দিকে তাকাল।

“যাবি।”

ফুয়াদ তাকাল।

“কী?”

“তুই ফ্রান্স যাবি। এটা তোর ড্রিম ছিল। বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছিস। তাহলে এখন দ্বিধা কিসের?”

ফুয়াদ মাথা নিচু করে নিল। ছেলেটার চোখ জোড়া ছলছল করছে অশ্রুজলে। ধরে আসা কণ্ঠে জবাব দিল,

“তোদের ফেলে যেতে ইচ্ছে করছে না।”

এইবার নিদ্রা মৃদু হেসে উঠল। চোখের কোণে জল জমেছে তারও। তবুও নরম রইল তার কণ্ঠস্বর,

“দূরে গেলে বন্ধুত্ব নষ্ট হয়, এটা কে বলেছে?”

ফুয়াদ নিশ্চুপ। নিদ্রা আবার বলল,

“একটা দেশের দূরত্ব কি এত বছরের সম্পর্ককে হারিয়ে দিতে পারে?”

“কিন্তু…”

“কোনো কিন্তু না।”

ফুয়াদ এবার জাওভানের দিকে তাকাল। জাওভানও কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর নিচু গলায় বলল,

“আমি আসলে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।”

নিদ্রা কপাল কুঁচকে নিল। শুধালো,

“কীসের?”

“তোদের নিয়ে।”

তাদের সবার মাঝে জাওভান হলো সবচাইতে বেশি ইমোশনাল। ছোট্ট ছোট্ট বিষয়গুলোতেও সে আবেগী হয়ে পড়ে। নিদ্রা হেসে বলে উঠল,

“অভ্যাস কাটিয়ে উঠতে আমাদের। আমরা তো সবসময় একই জায়গায় আটকে থাকতে পারব না তাই না?

জাওভান গম্ভীর মুখে নিদ্রার দিকে তাকাল। গমগমে স্বরে বলে উঠল,

“তুই এসব বলছিস?”

নিদ্রা ভ্রু তুলল। শুধালো,

“কেন?”

“যেখানে তুই নিজেই একটা লুপে আটকে আছিস।”

নিদ্রার মুখের হাসি মুহূর্তে মিলিয়ে গেল।

“জাওভান। সীমা ছাড়াচ্ছিস তুই।”

“সত্য বলছি যে, তেঁতো তো লাগবেই।”

“চুপ কর জাওভান।”

জাওভান কিছু বলতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই আভিয়ানের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো।

“এনাফ।”

চারপাশ মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল। আভিয়ানের চোখদুটো কঠিন। অস্বাভাবিক রকম কঠিন।

“ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে আর একটা শব্দও না।”

জাওভান চুপ হয়ে গেল। আভিয়ান এবার ফুয়াদের দিকে ফিরল।

“তুই অবশ্যই যাবি। কারণ এটা তোর স্বপ্ন। আমাদের জন্য নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করার মতো বোকামি করলে প্রথমে আমি নিজেই তোকে মারব।”

ফুয়াদ হেসে ফেলল। চোখের জল আজ আর আড়াল করতে ইচ্ছে জাগল না তার। আওড়াল,

“এত সুন্দর করে মোটিভেশন দেওয়ার পর মারধরের হুমকি না দিলেও পারতি।”

“নিদ্রা হেসে উঠল। জাওভানও হেসে ফেলল এ পর্যায়ে।
পরিবেশটা ধীরে ধীরে হালকা হতে শুরু করল। ফুয়াদ হঠাৎ এগিয়ে এসে আভিয়ানকে জড়িয়ে ধরল শক্ত করে।
অনেক শক্ত করে।

“চারদিন পরই ফ্লাইট।”

তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

“আর এই চারদিন আমি তোদের সাথে কাটাব। বেস্ট মেমরি তৈরি করব।”

আভিয়ানও তাকে জড়িয়ে ধরল। মুখে ছোট্ট হাসি।
জাওভানের চোখ ভিজে উঠেছে ইতোমধ্যে। সে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিল। নাক টানল। কিন্তু ততক্ষণে ধরা পড়ে গেছে।
নিদ্রা হেসে বলল,

“তুই কাঁদছিস?”

“চুপ।”

“কাঁদছিস না?”

“না, বৃষ্টি পড়ছে।”

নিদ্রা হাসি থামিয়ে প্রশ্ন করল,

“তোর চোখের ভেতরেও?”

জাওভান এবার সত্যি সত্যি কেঁদে ফেলল। তার কাছে বন্ধুত্বের থেকে দামি আর কিছু নেই। তারা সকলেই দিনশেষে বেঁচে আছে কেবলই একে অপরের জন্য। না-হয় একাকিত্ব সেই কবেই কির পর্যন্ত পৌঁছে দিত। চারজনই একসাথে জড়িয়ে ধরল একে অপরকে এই বৃষ্টির ভেতর। জাওভান নাক টেনে বলল,

“আমার পার্টি চাই।”

এক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর ফুয়াদ আর নিদ্রা একসাথে হেসে উঠল। আভিয়ানও হাসল খানিক। ফুয়াদ চোখ মুছতে মুছতে বলল,

“অবশ্যই।”

“কবে?”

“পরশুই এরেঞ্জ করব।”

জাওভান আবারো নাক টানল। বলে উঠল,

“গ্র্যান্ড চাই।”

“বাজেট দিবি তুই?”

“বন্ধুত্বের কোনো বাজেট হয় না।”

ফুয়াদ হেসে বলল,

“বিলও তাহলে তুই দিবি।”

জাওভান চোখ মুখ কুঁচকে নিল। জবাব দিল,

“না, সেটা বন্ধুত্বের অপমান।”

আবারও হেসে উঠল নিদ্রা আর ফুয়াদ। নিদ্রা হেলমেট মাথায় দিতে দিতে বলল,

“তো আজ রাইড হয়ে যাক?”

ফুয়াদ সঙ্গে সঙ্গে বলল,

“রেস হলে কেমন হয়?”

জাওভান তৎক্ষনাৎ গম্ভীর মুখ করে বলে উঠল,

“রেস করে বাল হবে। জিতবে তো আভিই।”

নিদ্রা খোঁচা মেরে বলে উঠল,

“আগে থেকেই হার মানছিস?”

জাওভান নিদ্রার দিকে এক পলক তাকিয়ে মুখ ভেঙাল। জবাব দিল,

“আমি বাস্তববাদী মানুষ।”

” তুই একটা কাঁদুক্কা।”

কথাটা বলল ফুয়াদ। মুহূর্তেই চেঁচিয়ে উঠল জাওভান,

“ফুয়াদের বাচ্চা!”

“জি?”

“তোকে ফ্রান্স পাঠানোর আগেই নদীতে ফেলে দিব।”

বাইকে চেপে বসল সকলেই। চারটি বাইকের ইঞ্জিন একসাথে গর্জে উঠল। বৃষ্টির পর্দা চিরে তারা ছুটে গেল সামনের দিকে। রয়ে গেল বন্ধুত্বের উষ্ণতা, অগণিত স্মৃতির প্রতিশ্রুতি। কারণ কিছু সম্পর্ক দূরত্বে ক্ষয় হয় না। বরং সময় আর দূরত্ব পেরিয়েও আরও গভীর হয়ে ওঠে।

__________

রাত এগারোটা। এহসান মঞ্জিলের বিশাল প্রাসাদসদৃশ বাড়িটা অনেক আগেই নিস্তব্ধতায় ডুবে গেছে। আজ ফিরতে বেশ দেরি হয়ে গেছে আভিয়ান অপরূপার।
মূল দোষ অবশ্য আভিয়ানের। বাইক নিয়ে একবার এদিকে, একবার ওদিকে ঘুরিয়েছে সে। শহরের আলোকিত রাস্তা, নদীর ধারের পথ, নির্জন ফ্লাইওভার কোথায় কোথায় যে নিয়ে গেছে, তার হিসেব নেই।অপরূপাও খুব একটা আপত্তি করেনি। বরং অনেকদিন পর তার ভালোই লাগছিল রাতের শহরটাকে নতুন করে দেখতে। কোনো তাড়া ছাড়া, কোনো ভয় ছাড়া ছুটতে।স্নান সেরে ভেজা চুল পিঠে ছড়িয়ে নিচে নামতেই ডাইনিং স্পেসের দিকে চোখ গেল অপরূপার। তারপর অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। ডাইনিং টেবিলের সামনে পাশাপাশি বসে আছে আভিয়ান আর পিহু। দুজনেই ফ্রেশ হয়ে এসেছে। আভিয়ান কনুই টেবিলে রেখে কী যেন বলছে, যার উত্তরে পিহু গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ছে।
অপরূপা এগিয়ে গেল সেদিকে। টেবিলে রাখা খাবারগুলো সাজাতে লাগল সে। তিনজনের জন্য প্লেট বের করল। ভাত বাড়ল। ঠিক তখনই পিহু প্লেটের দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকাল।

“পিহু এগুলো দিয়ে ভাত কাবে না।”

অপরূপা ভ্রু তুলল।

“তাহলে?”

“পিহু ডিম ভাজি কাবে।”

“এখানে চিকেন আছে। এটা দিয়েই খাও।”

পিহু ঠোঁট ফুলিয়ে ফেলল।

“না।”

গম্ভীর স্বরে ধমকে উঠল অপরূপা,

“পিহু।”

“আমি ডিম ভাজি কাব মাম্মা।”

মুখটা মলিন করে বাক্যটা উচ্চারণ করল পিহু। অপরূপা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলে উঠল,

“তোমার জন্য এখন আমাকে আবার কিচেনে যেতে হবে।”

পিহু নির্বিকার। ঠিক তখনই আভিয়ান বলে উঠল,

“আপনি বসুন। আমি করে আনছি।”

অপরূপা চোখ পিটপিট করল।

“আপনি করবেন?”

“হুম।”

“রান্না পারেন?”

আভিয়ান ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। তারপর চোখ টিপে বলল,

“তা পারি একটু। বসুন।”

পিহু সঙ্গে সঙ্গে হাততালি দিল।

“ইয়ান পাপা কুকিং!”

আভিয়ান গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ল। পিহুর কপালে চুমু খেয়ে আওড়াল,

“মাস্টারশেফ।”

বলেই উঠে দাঁড়াল আভিয়ান। পিহুকে চেয়ারে বসিয়ে রেখে কিচেন কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেল। অপরূপা বসে থাকার চেষ্টা করল তবে পারল না। কৌতূহলবশত সেও ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। কিচেনের প্রবেশমুখে এসে দেয়ালে হেলান দিল সে। দেখতে লাগল কাজকর্ম । আভিয়ান অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে ডিম ভাঙছে। দেখে মনে হচ্ছে বহু বছরের অভিজ্ঞ রাঁধুনি। আভিয়ান ঠিকঠাক ভাবেই ডিমটা ভাজল। পরপর আভিয়ান বিজয়ীর ভঙ্গিতে প্যান নামাতে গেল। আর ঠিক তখনই হাত ছুঁয়ে গেল গরম ধাতব অংশে। মুহূর্তেই কুঁকড়ে গেল সে।

“উফ!”

অপরূপা প্রায় দৌড়ে গেল তার কাছে। বিচলিত স্বরে প্রশ্ন করল,

“কী হয়েছে?”

“কিছু না।”

“কিছু না বললেই হলো? দেখি হাত দেখান।”

রমণীর কণ্ঠে কঠোরতা। আভিয়ান বাধ্য ছেলের মতো হাত বাড়িয়ে দিল। অপরূপা দ্রুত কল ছেড়ে তার হাতের উপর ঠান্ডা পানি ফেলতে লাগল। মুখে তার বিরক্তিকর ভাব। চোখে উদ্বেগ।

“কে বলেছিল এত কিছু করতে? এসেছে পাকামো করে রান্না করতে।”

আভিয়ান নির্বিকার ভঙ্গিতে জবাব দিল,

“পিহু খেতে চেয়েছে তো করব না?”

“পিহু বলল আর আপনি করবেন?”

“ও আমার মেয়ে, আমার মেয়ে কিছু চাইবে তা আমি দেব না?”

থেমে গেল অপরূপা। চোখ তুলে তাকাল আভিয়ানের চোখে। কয়েক মুহূর্ত স্থির রইল দৃষ্টি। কত সহজেই না বলে বসল পিহু তার মেয়ে। প্রশান্তিতে হৃদয় দোলা দিল রমণীর। হাসি ফুটল অস্পষ্ট। সে মনোযোগ দিল আভিয়ানের হাতের দিকে।

“চুপ করে দাঁড়ান।”

আভিয়ান চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তবে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠেছে ইতোমধ্যে। অপরূপা সেটা দেখেই আরো রেগে গেল।

“একদম হাসবেন না।এটা হাসির বিষয়?”

“না।”

“তাহলে হাসছেন কেন?”

আভিয়ান তার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল,

“রাগলে আপনাকে অনেক বেশি উষ্ণ লাগে। ইংরেজিতে বললে অশ্লীল শোনাবে তাই বাংলাতে বললাম।”

অপরূপা থমকে গেল। কথার মানে বুঝতে সময় লাগেনি তার। সে বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল চটজলদি।অপরূপা চোখ বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। লোকটার সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই। সে ডিম ভাজির প্লেটটা তুলে নিল।
তারপর সরাসরি ডাইনিং টেবিলের দিকে চলে গেল। পিহু ততক্ষণে নিজেই চামচ হাতে বসে আছে। ডিম দেখেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার মুখ।

“ইয়েস!”

“ধীরে খাবে।”

“ওকে।”

বললেও পিহু সঙ্গে সঙ্গে খাওয়া শুরু করে দিল। কয়েক মুহূর্ত পর আভিয়ানও এসে বসল। অপরূপা তার প্লেটের দিকে তাকাল।

“আপনাকে কী দেব?”

আভিয়ান সঙ্গে সঙ্গে আহত মুখ করল।

“আমার হাত পুড়ে গিয়েছে দেখেননি? একা একা খেতে পারব?”

অপরূপা সন্দিহান চোখে তাকাল আভিয়ানের দিকে। প্রশ্ন ছুড়ল,

“পারবেন না?”

“না। একদমই না। খাইয়ে দিন আমাকে।”

অপরূপা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে চেয়ার টেনে বসল। ভাত মাখল সে।অতঃপর আভিয়ানের মুখের সামনে খাবার ধরল। গম্ভীর মুখে বলল,

“হা করুন।”

আভিয়ান সঙ্গে সঙ্গে মুখ খুলল বাধ্য ছেলের মতো। অপরূপা খাবার তুলে দিল তার মুখে। আভিয়ান খেল। পরপর মাথা নেড়ে বলল,

“মন্দ না।”

অপরূপা চোখ রাঙাল। আভিয়ান আবার চুপ করে গেল।
দূর থেকে দৃশ্যটা দেখছিল আরেকজোড়া চোখ। পানি নিতে নিচে নেমেছিল এরিনা। কিন্তু ডাইনিং স্পেসে এসে সে থেমে গেছে। নীরবে স্থির হয়ে। তার সামনে বসে আছে তিনটি মানুষ। একটা ছোট্ট পরিবার। একটা অসম্পূর্ণ ছবির ভেতর পূর্ণতার রঙ। আভিয়ানের মুখে যে হাসি, সেটি সে বহু বছর ধরে চেনে। কিন্তু এই হাসিটা ভিন্ন।
অনেক ভিন্ন। এরিনার ঠোঁটেও হাসি ফুটল। তবে সেই হাসির গভীরে লুকিয়ে রইল দীর্ঘদিনের এক নীরব বিষাদ।
চোখ নামিয়ে খুব আস্তে বিড়বিড় করে বলল,

“তোমাকে আমি এভাবেই হাসি খুশি দেখতে চেয়েছিলাম। তবে সেটা আমার সাথে, অন্য কারো সাথে নয়। অথচ ভাগ্য চাইল বিপরীত।”

এরিনা আর এক কদমও অগ্রসর হলো না। বুকের ভেতর জমে থাকা অতলান্ত বিষাদটুকু এক দীর্ঘশ্বাসের বাতাসে উড়িয়ে দিল সে। ঠিক যেভাবে নিঃশব্দে অলক্ষ্যে এসে দাঁড়িয়েছিল, সেভাবেই পা ফেলে ফেলে ফিরে গেল নিজের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। যাওয়ার আগে মনের গহীন কোণে কেবল একটি বাক্যই প্রতিধ্বনিত করে গেল,

“সুখী হও, আমার না হওয়া সুখ।”

______

#চলবে