Home "ধারাবাহিক গল্প ঝরা শিউলির দিনে ঝরা শিউলির দিনে পর্ব-৫০ এবং শেষ পর্ব

ঝরা শিউলির দিনে পর্ব-৫০ এবং শেষ পর্ব

0
973

#ঝরা_শিউলির_দিনে
#পর্ব ৫০
#তামান্না_ইসলাম_শিমলা

_______________________

দেখতে দেখতে সময়ের খাতা থেকে কেটে গিয়েছে অনেকগুলো দিন, অনেকগুলো মাস। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে পার হয়েছে বেশ কিছু বছরও। সময়ের অমোঘ নিয়মে জীবনের ক্যানভাসে পাল্টেছে কত কিছু! বদলেছে চারপাশের চেনা মানুষের রূপ, আর সেই সাথে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে আভিয়ান ও অপরূপার সম্পর্কের গভীরতা। তাদের বিবাহিত জীবনের চার-চারটি বছর পার হয়ে গেছে। সময়টা খুব বেশি না হলেও একেবারে কম নয়। এই চার বছরের দীর্ঘ পথচলায় এহসান পরিবারে যেমন এসেছে এক বিশাল শূন্যতা, তেমনই এসেছে এক নতুন প্রাণের জোয়ার। পরিবার থেকে চিরতরে বিয়োগ ঘটে গেছে শ্রদ্ধেয় ইরফান এহসানের। তবে যাওয়ার আগে তিনি পরিবারে রেখে গেছেন এক মস্ত বড় আশীবার্দ। আভিয়ান ও অপরূপার কোল আলো করে এসেছে তাদের ভালোবাসার নতুন সদস্য, আয়াজ এহসান। বয়স এখন তার মাত্র দু বছর। ছেলেটা বড় হওয়ার সাথে সাথে অবিকল তার বাবার রূপ ধারণ করছে। বিশেষ করে তার চোখ দুটো আভিয়ানের মতোই গভীর, মায়াবী ও সুন্দর। রঙটাও এক। বর্তমানে এহসান গ্রুপের পুরো সাম্রাজ্যের দায়িত্ব এখন অপরূপার কাঁধে। মৃত্যুর পূর্বে ইরফান এহসান নিজেই তার যোগ্যতার ওপর আস্থা রেখে এই দায়িত্ব সঁপে দিয়ে গিয়েছিলেন। তাই তো আজ ঘরে কিংবা বাইরে সবখানেই অপরূপা রাজ রমণী।

সময়টা এখন সন্ধ্যা। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময় হওয়ায় চারপাশের প্রকৃতিতে জাঁকিয়ে শীত পড়েছে। তবে তারা এখন আর চেনা শহরের চার দেওয়ালে বন্ধ নেই। গত তিন দিন হলো তারা সপরিবারে ঘুরতে এসেছে হাওয়াই-এ। হাওয়াইয়ের বিগ আইল্যান্ডের মাউনা কেয়া পর্বতমালার কোলে গড়ে ওঠা এই তুষারাবৃত সৌন্দর্য সত্যিই অপার্থিব। চারদিকে সাদা বরফের চাদর, পাইন গাছের পাতায় জমে থাকা তুষারের কণা আর দূরে পাহাড়ি উপত্যকার গায়ে টিমটিম করে জ্বলতে থাকা কাঠের লজের আলো। সব মিলিয়ে এক রূপকথার পরিবেশ। বর্তমানে রিসোর্টের বিশাল কাঁচের ব্যালকনিতে আয়াজকে কোলে নিয়ে বসে আছে অপরূপা। কনকনে ঠাণ্ডা বাতাসকে আড়াল করতে ব্যালকনির কাঁচের স্লাইডিং ডোরটা বন্ধ করা। ছোট্ট পিহু এখন আর আগের মতো একদম ছোটটি নেই। হাতে-পায়ে সে প্রায় অপরূপার সমান লম্বা হয়ে উঠেছে। একটু আগেই বাবা আর মেয়ে মিলে মা-ছেলেকে ঘরে রেখে হাওয়াইয়ের এই বরফে ঢাকা মেঠোপথে ঘুরতে বেরিয়েছে। ​অপরূপা কোলে থাকা ছোট্ট আয়াজকে আলতো করে চাপড়ে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা করছে। ঠিক এমন সময় কেবিনের মূল দরজাটা বেশ শব্দ করে খুলে গেল। ঘরে প্রবেশ করল নিদ্রা। অপরূপা ঠিক তখনই আয়াজকে বিছানায় শুইয়ে দেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়িয়েছে । নিদ্রার ঠিক পিছু পিছু প্রায় এক প্রকার দৌড়ে ঘরে প্রবেশ করল জাওভান। জাওভানের মুখাবয়ব জুড়েই এক অপরাধবোধের ছাপ। সে সমানে বলে চলেছে,

​”আরে নিদ্রা শোন, আই অ্যাম রিয়্যেলি সরি! প্লিজ, রাগ করিস না!”

​নিদ্রা অপরূপার সামনে গিয়ে নিজের জ্যাকেটটা সোফায় ছুঁড়ে মেরে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,

“অপরূপা! আপনি এই বালটাকে এখনই আমার চোখের সামনে থেকে দূর হতে বলুন! নয়তো আমি এখানেই একে খুন করে ফেলব!”

​অপরূপা বিছানায় আয়াজকে সাবধানে শুইয়ে দিয়ে কম্বলটা টেনে দিল। অতঃপর ওদের দিকে ঘুরে ভ্রু কুঁচকে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,

“কী হয়েছে? ঝগড়া কেন করছেন আপনারা?”

​জাওভান পাশে দাঁড়িয়ে এক হাত দিয়ে মাথা চুলকে অত্যন্ত বোকা বোকা এক চিলতে হাসি দিল। নিদ্রা আর নিজের ক্ষোভ ধরে রাখতে না পেরে এক হাত কোমরে রেখে বলতে শুরু করল,

“হবে না ঝগড়া? এই লোকটার কান্ড দেখুন! আমি কতদিন ধরে বলছি যে আমার এখন একটা বেবি চাই, আমাদের ফ্রেন্ড সার্কেলের সবার বাচ্চা হয়ে গেল। আর ও নাকি এখনো মেন্টালি প্রিপেয়ার্ড না! ওর নাকি ভয় করে! একটা জোয়ান মরদ বাচ্চার নাম শুনলে ওভাবে কাপড়ের ট্রলি নিয়ে পালায়? ভাবা যায়?”

​নিদ্রার মুখে এমন এক অদ্ভুত ও লজ্জাকর দাম্পত্য তর্কের কাহিনী শুনে অপরূপা নিজের ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করল। জাওভান এবার ফিসফিস করে বলল,

“আরে ভাই, এখানে লোকে হানিমুন করতে আসে, নাকি বাচ্চা নেওয়ার প্রেশার নিতে আসে? আমি জাস্ট বলেছি আর একটা বছর সময় দে।”

​অপরূপা ওদের এই হাস্যকর ঝগড়া দেখে আর থাকতে পারল না। দুজনকে থামিয়ে দিয়ে হেসে বলল,

“আচ্ছা বাবা, আপনারা এখন শান্ত হ তো। এই শীতের মধ্যে আর চিল্লামিল্লি করবেন না। রুমে যান, ফ্রেশ হয়ে ঠাণ্ডা মাথায় কথা বলুন।”

​ওদের দুজনকে এক প্রকার জোর করেই শান্ত করে পাশের রুমে পাঠিয়ে দিল অপরূপা। আসলে এই হাওয়াই ট্রিপে তাদের সাথে জাওভান আর নিদ্রাও এসেছে। যদিও তাদের জন্য এটাকে এক প্রকার লেট হানিমুনই বলা চলে। হাজারটা কাঠখড় পুড়িয়ে, বছর দেড়েক হলো নিদ্রা জাওভানকে বিয়ে করেছে। তবে বিয়ের পর এক ছাদের নিচে এলেও এদের মধ্যকার সম্পর্কটা এখনো সেই আগের মতোই রসাত্মক আর সাপে-নেউলে রয়ে গেছে।

​নিদ্রা আর জাওভান প্রস্থান করতেই আবারও দরজা খোলার শব্দ হলো। এবার ঘরে প্রবেশ করল পিহু। পরনে তার একটা ভারী কালো লেদার জ্যাকেট, মাথায় বড়সড় স্কি হেলমেট। ঘরে ঢুকেই সে রেগেমেগে হেলমেটটা এক ঝটকায় খুলে টেবিলের ওপর রাখল। নাক-মুখ কুঁচকে অপরূপার দিকে তাকিয়ে বেশ জোর গলায় ঘোষণা দিল,

“মাম্মা! আমি আজ থেকে আর কোনোদিন পাপার সাথে কোনো রাইডে যাব না! একদম না!”

​অপরূপা তার মেয়ের এই রাগান্বিত রূপ দেখে বেশ অবাক হলো। সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,

“কেন? কী হয়েছে?”

পিহু কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই দরজার ওপার থেকে আভিয়ান প্রবেশ করল। তার পরনেও একই রকমের জ্যাকেট। সে নিজের হেলমেটটা হাতে নিয়ে অপরাধীর মতো মুখ করে পিহুর পেছনে পেছনে এগিয়ে এলো। পিহুর সামনে গিয়ে দুই হাত দিয়ে নিজের কান দুটো ধরে অত্যন্ত নরম সুরে বলল,

​”স্যরি তো পাপা! আই অ্যাম রিয়ালি সরি। আর কখনো এমন হবে না। এত রাগ করছো কেন লিটেল কিটেন? এই দেখো, পাপা কান ধরছি।”

​পিহু মুখ ঘুরিয়ে নিল মুহূর্তেই। ওষ্ঠ উল্টে বলল,

“নো! তোমার এই ড্রামা আমি আর শুনছি না। তুমি বড্ড চিটার, পাপা।”

​অপরূপা এতক্ষণ ধরে বাবা-মেয়ের এই মান-অভিমানের নাটকের মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারল না। অবশেষে সে ধৈর্য হারিয়ে এক প্রকার চেঁচিয়ে উঠে বলল,

“আরে, তোমারা কেউ আমাকে বলবে যে আসল ঘটনাটা কী হয়েছে? এখানে দাঁড়িয়ে তোমরাই তর্ক করছ, ওদিকে জাওভান-নিদ্রা যুদ্ধ করে গেল! হয়েছেটা কী?”

​মায়ের গমগমে কণ্ঠস্বর শুনে পিহু আর আভিয়ান দুজনই তড়িৎ গতিতে একসাথে মুখ ঘুরিয়ে একদম সোজা হয়ে অপরূপার দিকে তাকাল। দুজনের মুখাবয়বেই তখন এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য। পিহু এবার অপরূপার কাছে গিয়ে নালিশ করার সুরে বলল,

​”মাম্মা, জানো পাপা কী করেছে? আমরা যখন স্নো-বাইক রাইড দিচ্ছিলাম, তখন পাপা স্পিড বাড়িয়ে একটা বরফের ঢিবির ওপর দিয়ে বাইক জাম্প করিয়েছে! আমি তো ভয়ে চোখ বন্ধ করে চিৎকার করছিলাম, আর পাপা স্টান্টবাজি শেষ করে নিচে নেমে আমাকে আইসক্রিম খাইয়ে মুখ বন্ধ করতে চাচ্ছিল! এই মাইনাস ডিগ্রি তাপমাত্রায় কেউ মেয়েকে আইসক্রিম খাওয়ায়? আমার গলা বসে গেলে কাল আমি ঘুরবো কীভাবে?”

​আভিয়ান পাশ থেকে আমতা আমতা করে ডিফেন্স নেওয়ার চেষ্টা করল,

“আরে, ওটা তো জাস্ট সামান্য একটু থ্রিল ছিল প্রিটি ওয়াইফি। আর হাওয়াই এসে বরফের মাঝে আইসক্রিম খাওয়ার মজাই আলাদা! ও তো রাইডের সময় এনজয়ই করছিল, এখন এখানে এসে অনাহূত রাগ দেখাচ্ছে।”

​”এনজয় করছিলাম মানে?”

পিহু কোমর বেঁধে দাঁড়িয়ে গেল।

“তুমি আমায় না জানিয়ে অত ওপর থেকে বাইক জাম্প করালে কেন? যদি আমরা পড়ে যেতাম? মাম্মা, পাপাকে বলো সে যেন নিজের বয়সটা একটু মনে রাখে। দুই বাচ্চার বাবা হয়েও এখনো নিজেকে বাইক স্টান্টম্যান ভাবে!”

​আভিয়ান এবার চোখ বড় বড় করে পিহুকে থামানোর চেষ্টা করল,

“এই এই! বয়স মনে রাখব মানে? বয়স কত আমার? মাত্র তেত্রিশ। আর আমি কি আনাড়ি চালক? কত সেফলি ল্যান্ড করালাম!”

​অপরূপা কপালে হাত দিয়ে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই এক পুরুষ তার জীবনে, আর তার রক্ত বহন করা দুই সন্তান! সে অত্যন্ত অসহায় কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলল,

“বাপ আর ছেলে-মেয়ে এই তিনজনই একদম এক ধাঁচের হয়েছে! উফ, আমার এই সংসারে আর শান্তি নেই। একজন জাওভানের পেছনে লাঠি নিয়ে ঘুরছে, আর এখানে খোকাবাবু মেয়েকে নিয়ে স্টান্টবাজি করছে!”

​পিহু মায়ের এই অসহায় দশা দেখে এবার নিজের ঠোঁট টিপে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। সে টেবিল থেকে নিজের জিনিসপত্র তুলে নিতে নিতে বলল,

“মাম্মা, আমি আমার রুমে যাচ্ছি। তুমি এই স্টান্টম্যানকে ভালো করে সাইজ করো। নালিশ কিন্তু আমি দিয়ে দিয়েছি। টাটা!”

​পিহু এক ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের পাশের রুমে চলে গেল। পিহু চলে যেতেই আভিয়ান একগাল দুষ্টু হাসি নিয়ে অপরূপার দিকে পা বাড়াল। তার কোমরে হাত রাখতে যাবে, ঠিক তখনই অপরূপা একরাশ কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে দু-পা পিছিয়ে গেল। চোখ দুটো বড় বড় করে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

​”একদম না, এক কদমও এগোবেন না! দূরে থাকুন আমার থেকে।”

​আভিয়ান নিজের জ্যাকেটটা খুলে খাটের এক কোণে ছুঁড়ে মারল। শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে নিয়ে আবার এক পা এগিয়ে এলো।

​”দূরত্ব বাড়াতে বলছেন কেন, মিসেস আভিয়ান? বরফের দেশে এমনিতেই বড্ড ঠাণ্ডা, তার ওপর আপনিও যদি এমন শীতল আচরণ করেন, তবে এই অভাগা স্বামী বাঁচবে কী করে?”

​”ন্যাকামো করবেন না একদম!”

অপরূপা চোখ রাঙাল। যোগ করল,

“কী ভেবেছেন কী আপনি হ্যাঁ? পিহুকে নিয়ে ওমন বিপজ্জনক রাইডে যাওয়ার কী দরকার ছিল? মেয়েটার যদি কিছু হয়ে যেত?”

​”আরে কিচ্ছু হতো না।”

আভিয়ান অপরূপার দু হাত নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে নিল। এবার আর অপরূপা নিজেকে ছাড়াতে পারল না। আভিয়ান তার গভীর সবুজ চোখ দুটো নিয়ে অপরূপার মুখের ওপর সামান্য ঝুঁকে এলো।

“আমি থাকতে আমার লিটেল কিটেনের কিছু হতে পারে? আর তাছাড়া, মাউনা কেয়া পর্বতের এই সৌন্দর্য দেখলে কার না একটু উম্মাদ হতে ইচ্ছে করে বলুন? বিশেষ করে পাশে যখন আমার এই রূপসী অপ্সরা থাকে।”

​”কথা ঘোরাবেন না আভিয়ান।”

অপরূপা মুখটা ঘুরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, যদিও তার ঠোঁটের কোণে এতক্ষণে একটা মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠেছে।

“আপনি দিন দিন বড্ড বেশি বাচ্চা হয়ে যাচ্ছেন। আয়াজের বয়স দুই বছর, আর আপনার আচরণ দেখে মনে হয় আপনার বয়সও দুই!”

​”সে তো আপনার দোষেই, স্নো হোয়াইট।”

আভিয়ান অপরূপার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলল। একটু থেমে আবার যোগ করল,

“আপনি অফিসে যে কড়া শাসন চালান, ঘরে এসেও যদি সেই একই শাসন করেন তবে তো আমার একটু বাচ্চামো করে আপনার মনোযোগ কাড়তেই হবে। চারটে বছর কেটে গেল, অথচ আপনার এই রাগটুকু এখনো ঠিক আগের মতোই রয়ে গেল। একটুও কমলো না।”

অপরূপা এবার আভিয়ানের বুকের ওপর নিজের হাত দুটো রাখল। বলল,

​”কমবে কীভাবে? কমানোর মতো কোনো লক্ষণ রেখেছেন আপনি? জাওভান আর নিদ্রার কাণ্ডটা দেখলেন? এই বয়সে এসেও ওরা বাচ্চার নাম শুনলে ঝগড়া করে। আর আপনি? আপনি….”

অপরূপার কথা শেষ করতে দিল না আভিয়ান। কথা কেটে নিজেই আওড়াল,

“জাওভানের দোষ নেই। নিদ্রা যেভাবে ওর ওপর হুকুম চালায়, বেচারা এমনিতেই ভয়ে থাকে। তবে আমাদের বেলায় তো তেমন ভয় ছিল না, তাই না? আয়াজ তো দেখতে দেখতেই দুই বছরের হয়ে গেল।”

​অপরূপা বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা ছোট্ট আয়াজের দিকে একবার তাকাল। হুট করেই নরম হয়ে এলো তার কণ্ঠস্বর। আভিয়ানের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট শ্বাস ফেলল। বলল,

“আয়াজটা একদম আপনার মতো হয়েছে, আভিয়ান। আমি চাই শুধু চেহারা নয় বরং চারিত্রিক বৈশিষ্ট গুলোও বড় হয়ে আপনার মতোই হোক।”

​আভিয়ান অপরূপার কপালে নিজের ওষ্ঠাধর ছোঁয়ালো। দীর্ঘ এক চুম্বন এঁকে দিল ললাটে। ফিসফিস করে বলল,

“আর আমি চাই ও যেন বড় হয়ে ওর মায়ের মতোই শক্ত আর দায়িত্বশীল এক রমণীকে নিজের জীবনে খুঁজে পায়।”

​অপরূপা লজ্জা পেল খানিক। আভিয়ান অপরূপার লজ্জা মাখানো মুখের দিকে তাকাল। ওষ্ঠের কোণে ফুটে উঠল এক চিলতে বক্র হাসি। কোমরে রাখা হাতের বাঁধনটা আর একটু সুদৃঢ় করে সে নিজের মুখটা অপরূপার কানের লতির একদম কাছাকাছি নিয়ে এলো। তার উষ্ণ নিশ্বাস অপরূপার শীতল ত্বকে এক অবাধ্য কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে।

“তা মিসেস আভিয়ান, বাইরে তো মাইনাস ডিগ্রি তাপমাত্রা। কিন্তু এই ঘরের ভেতরটা কেন জানি বড্ড উত্তপ্ত মনে হচ্ছে না আপনার কাছে? বিশেষ করে আপনার এই লাল হয়ে ওঠা গাল দুটো দেখে আমার নিজেরই কেমন জানি…”

আভিয়ান একটু থেমে চোখ টিপল। কণ্ঠস্বর নামিয়ে আনলো আরো গভীরে,

“একটু বেশিই গরম গরম লাগছে, স্নো হোয়াইট!”

“আভিয়ান! অসভ্যতামি করবেন না একদম।”

অপরূপা চটজলদি নিজের দুই হাত দিয়ে আভিয়ানের চওড়া বক্ষপটে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করল। এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল,

“পিহু পাশের ঘরেই আছে। আর আয়াজও যেকোনো সময় জেগে যেতে পারে। ছাড়ুন আমায়!”

“ওরা কেউ এখন আসবে না।”

আভিয়ান অপরূপার বাধা দেওয়া হাত দুটোকে এক হাতে মুঠোবন্দি করে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। তার গভীর সবুজ চোখ দুটোতে গত রাতের মতোই এক চিলতে আদিম মদিরতা খেলা করছে। সে অত্যন্ত নিচু, ফিসফিসানি কণ্ঠে আওড়াল,

“চলুন না, একটু ‘এহুম এহুম’ করে ওই নরম বেডটা থেকে ঘুরে আসি? হাওয়াইয়ের এই বরফভেজা সন্ধ্যায় এর চেয়ে ভালো কোনো টাইমপাস আর হতেই পারে না, মাই ডিয়ার প্রিটি ওয়াইফি!”

অপরূপার কান দিয়ে সত্যি সত্যি গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে। সে চোখ দুটো বড় বড় করে কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল,

“আপনি বড্ড লাগাম ছাড়া। লজ্জা শরম নেই আপনার?”

“নিজের বিবাহিত স্ত্রীর সাথে রোমান্স করতে আবার কিসের লজ্জা, স্নো হোয়াইট?”

আভিয়ান অপরূপার নাকের ডগায় নিজের নাক ঘষে দিল। যোগ করল,

“আর তাছাড়া, আপনি দিন দিন যেভাবে অফিসের কড়া বস হয়ে উঠছেন, আমার তো ভয় হয়। কবে জানি আমাকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে আপনার কাছে আসতে হয়! তাই এই সুযোগটা হাতছাড়া করার কোনো প্রশ্নই আসে না।”

অপরূপা হাসলো। দৃঢ় স্বরে উচ্চারণ করল,

“একেবারেই না, আমি এহসান গ্রুপের সিইও, মনে রাখবেন। আমার পারমিশন ছাড়া আপনি এক কদমও নড়তে পারবেন না।”

আভিয়ান অপরূপার ওষ্ঠাধরের একদম কাছাকাছি নিজের ঠোঁট দুটো নিয়ে এলো, নিশ্বাসের উত্তাপ একাকার হয়ে যাচ্ছে দুজনের।

“আই নো, মাই কুইন। তাই তো সিইও-র কাছে এই অভাগা স্বামী একটু বিশেষ পারমিশন ভিক্ষা চাইছে। আজকের সন্ধ্যাটা শুধু আমাদের হোক, অপ্সরা।”

অপরূপা আর নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারল না। এত গুলো বছরের দাম্পত্যের গভীরতা তাদের একে অপরের প্রতি টানকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সে নিজের চোখ দুটো আলতো করে বুঁজে নিল, যা আভিয়ানের জন্য মৌন সবুজ সংকেত। আভিয়ান আর এক মুহূর্তও কালক্ষেপণ করল না। সে এক ঝটকায় অপরূপাকে নিজের পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। অপরূপা আকস্মিকতায় মৃদু চিৎকার করে আভিয়ানের গলা জড়িয়ে ধরল। আভিয়ান তাকে কোলে নিয়েই ধীর পায়ে বিছানার দিকে এগোতে লাগল। যেতে যেতে আওড়াল,

“পরিবারে নতুন সদস্য এলে মন্দ হয় না।”

______

হাওয়াইয়ের বিগ আইল্যান্ডের মাউনা কেয়া পর্বতের চূড়া ঘেঁষে এসে পড়েছে সোনালী রোদ। বরফে ঢাকা উপত্যকা এক রূপালী স্বর্গে পরিণত হয়েছ। কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস আর তুষারের শুভ্রতা মাখিয়ে শুরু হয়েছে এক নতুন দিনের। আজ তারা সবাই পাহাড়ি পথ ধরে ঘুরতে বেরিয়েছে। একটু সামনেই হেঁটে যাচ্ছে জাওভান আর নিদ্রা। নিদ্রার পরনে হালকা গোলাপি রঙের ফার জ্যাকেট, আর জাওভানের গায়ে চারকোল ওভারকোট। কাল রাতের হাস্যকর ঝগড়ার রেশটুকু এখন আর নেই, বরং এই কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে দুজনের মাঝে অদ্ভুত সুন্দর ভালোবাসার আবহাওয়া তৈরি হয়েছে। জাওভান নিদ্রার জ্যাকেটের পকেটে হাত গুঁজে নিজের আঙুলগুলো আরও একটু শক্ত করে চেপে ধরে বলল,

​”আচ্ছা নিদ্রা, সত্যি করে একটা কথা বল তো? বিয়ের এই দেড়টা বছরে তোর কি একবারও মনে হয়েছে যে জাওভান নামের এই আস্ত গোঁয়ার ছেলেটাকে বিয়ে করে তুই ভুল করেছিস?”

​নিদ্রা হাঁটার গতি সামান্য কমিয়ে জাওভানের দিকে আড়চোখে তাকাল। তার ফরসা গাল দুটো ঠাণ্ডায় এমনিতেই কিছুটা গোলাপী হয়ে আছে, জাওভানের প্রশ্নে সেই গোলাপী ভাবটা আর একটু গাঢ় হলো। সে মুখটা কিঞ্চিৎ বাঁকিয়ে বলল,

​”ভুল? ভুল শব্দটা বড্ড ছোট রে জাওভান। তোকে বিয়ে করাটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ব্ল্যান্ডার! তুই এখনো আগের মতোই অগোছালো আছিস। সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজের ভেজা তোয়ালেটা বিছানার ওপর কে রাখে? মাঝে মাঝে তো আমার মনে হয় তোকে ডিভোর্স দিয়ে অন্য কোথাও চলে যাই।”

​”এই! একদম ওসব অলক্ষুণে কথা মুখে আনবি না।”

জাওভান চট করে নিদ্রার সামনে এসে তার পথ আগলে দাঁড়াল। তার চোখে গভীর আকুলতা।

“ডিভোর্স দিয়ে যাবি কোথায় শুনি? এই জাওভান খানের খাঁচা থেকে পালানোর সাধ্য তোর নেই, বউ। আর তোয়ালে বিছানায় রাখাটা তো একটা আর্ট! তুই বুঝবি না। কিন্তু আসল কথাটা তো এড়িয়ে গেলি।”

​নিদ্রা ভ্রু কুঁচকে শুধাল,

“কোন আসল কথা?”

​জাওভান এবার একটু নিচু স্বরে, চারপাশটা দেখে নিয়ে বলল।

“এই যে বাচ্চার কথা বলছিস। আমি কি একবারও বলেছি যে আমি বাবা হতে চাই না? আমি শুধু ভাবছি, তুই আর আমি এখনো নিজেদের মাঝেই যেভাবে চোর-পুলিশ খেলি, সেখানে আর একটা ছোট জাওভান বা ছোট নিদ্রা এলে ঘরের কী অবস্থা হবে! আমি তোকে আর একটু নিজের করে আগলে রাখতে চাই, নিদ্রা। এই দেড়টা বছর তো দেখতে দেখতেই কেটে গেল। হসপিটালের কাজের চাপে তুইও তো ঠিকমতো দম ফেলার সময় পাস না। তাই ভাবলাম, এই হাওয়াইয়ের সুন্দর দিনগুলো শুধু আমাদের দুটো মানুষের হোক। এতে কি খুব ভুল বলেছি?”

​জাওভানের কণ্ঠের আচমকা গভীরতা নিদ্রাকে মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ করে দিল। তার ভেতরের সমস্ত কৃত্রিম রাগ এক পলকে গলে জল হয়ে গেল। সে জাওভানের ওভারকোটের কলারটা দুই হাত দিয়ে টেনে ধরে নিজের দিকে কিঞ্চিৎ আকর্ষিত করল। চোখে চোখ রেখে বলল,

​”তুই বড্ড বেশি কথা সাজিয়ে বলতে পারিস, জাওভান। আগে যখন আমার পেছনে ল্যাংটো ছেলের মতো ঘুরতিস, তখন তো মুখে এত খই ফুটত না! তখন তো আমার এক ধমকে তোর জান শুকিয়ে যেত।”

​জাওভান হেসে ফেলল। সে নিদ্রার কোমরে নিজের হাত রাখল।

“তখন তো তুই আমার বন্ধু ছিলি, আর এখন তুই আমার বিবাহিত স্ত্রী। অধিকারটা একটু বেশি, বুঝিস না? আচ্ছা বাবা, প্রমিস করছি, এই ট্রিপ থেকে ফিরেই আমরা ডাক্তার দেখাব। এবার খুশি?”

​নিদ্রা হাসলো। সে জাওভানের বুকে আলতো করে কপাল ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“হুম, খুশি। তবে তোয়ালে যদি আর কোনোদিন বিছানায় দেখেছি, তবে হাওয়াই-এর বরফ এনে তোর স্যুটের ভেতর ঢুকিয়ে দেব, মনে রাখিস!”

​জাওভান খিলখিলিয়ে হেসে উঠল।

“তোর এই ভয়ঙ্কর রূপ দেখেই তো আমি বাচ্চার নাম শুনলে ভয় পাই!”

​ওদের এই মধুর খুনসুটি দূর থেকে দেখে যাচ্ছে অপরূপা আর আভিয়ান। অপরূপার কোলে থাকা আয়াজ তখন তার ছোট্ট দুটো হাত দিয়ে মায়ের গলার মাফলারটা টেনে ধরার খেলায় মত্ত। তবে তা বেশি সময় স্থায়ী হলো না। পিহু দৌড়ে এসে আয়াজকে নিজের সাথে নিয়ে গেল। এই সুযোগে আভিয়ান অপরূপার কোমরে নিজের হাতটা আর একটু সুদৃঢ় করল। কোট ভেদ করে আভিয়ানের চেনা উষ্ণ ছোঁয়া অপরূপার শরীরে পৌঁছাতেই সে কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠল।

“কী ব্যাপার, ম্যাডাম? বরফের দেশে এসে শরীরটা কি একটু বেশিই কাঁপছে, নাকি ভেতরের উত্তাপটা বাইরে প্রকাশ পাচ্ছে?”

আভিয়ান ওষ্ঠের কোণে বিরাজ করছে এক চিলতে বক্র হাসি। অপরূপা আভিয়ানের দিকে তাকিয়ে এক চোখ সরু করে বলল,

“ঠাণ্ডা বাতাস চলছে আভিয়ান, তাই কাঁপছি। আর আপনার ওই ডাবল মিনিং কথাগুলো একটু বন্ধ করবেন? আর রাস্তাঘাটে একটু ভদ্র হয়ে হাঁটুন।”

“রাস্তাঘাটে ভদ্র?”

আভিয়ান অপরূপার আরও কাছে ঘেঁষে এলো, তাদের কাঁধ দুটো একে অপরের সাথে স্পর্শ লাগছে। আভিয়ান একটু থেকে দ্বিতীয় দফায় উচ্চারণ করল,

“বিবাহিত স্ত্রীর কোমরে হাত রেখে হাঁটাটা যদি অভদ্রতা হয়, তবে আমি আজীবন অভদ্রই থাকতে চাই, মাই ডিয়ার প্রিটি ওয়াইফি। আর তাছাড়া, কাল রাতের পর থেকে তো আমার ভদ্রতার ডেফিনিশনটাই পাল্টে গেছে।”

কাল রাতের কথা মনে পড়তেই অপরূপার ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তের মধ্যে আপেলের মতো লাল হয়ে উঠল। সে মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিল তৎক্ষনাৎ। বলল

“কাল রাতের কথা একদম মুখে আনবেন না। আপনি একটা আস্ত অসভ্য!”

“অসভ্য?”

আভিয়ান শব্দ করে হেসে উঠল, সেই হাসিতে ছড়াল গভীর পুরুষালী মাদকতা। কণ্ঠ নামিয়ে ফের বলল,

“কাল রাতে যখন ওই নরম বিছানায় মাইনাস ডিগ্রি তাপমাত্রার মাঝে আপনার ওই তপ্ত শরীরের ওম নিচ্ছিলাম তখন কিন্তু এই অসভ্যর কামড়গুলোই আপনার বড্ড আপন মনে হচ্ছিল, স্নো হোয়াইট। তখন তো কই, একবারও বলেননি যে আমি অসভ্য! উল্টো তো নিজের নখ দিয়ে আমার পিঠে…”

“আভিয়ান!”

অপরূপা লজ্জায় এক প্রকার চিৎকার করে আভিয়ানের মুখটা নিজের এক হাত দিয়ে চেপে ধরল। তার হৃৎপিণ্ড পাঁজরের ভেতর তুমুল গতিতে আছড়ে পড়ছে। সে চারপাশটা দেখে নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,

“বললাম না চুপ করতে? আশেপাশে লোক আছে। পিহুও যেকোনো সময় তাকিয়ে ফেলতে পারে। আপনার কি দিন দিন লজ্জাশরম সব ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাচ্ছে?”

আভিয়ান অপরূপার হাতের তালুতেই নিজের ওষ্ঠাধর ছোঁয়ালো। অপরূপা তড়িৎ গতিতে হাতটা সরিয়ে নিল, যেন এক ভোল্ট বিদ্যুতের শট খেয়েছে। আভিয়ান তার গভীর সবুজ চোখ দুটো মেলল। আওড়াল,

“নিজের স্ত্রীর সামনে লজ্জা পেতে যাব কেন, হুম? নিজের স্ত্রীর এমন রূপ দেখলে কি কোনো পুরুষ নিজেকে সামলাতে পারে বলুন?”

অপরূপা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে আভিয়ানের বাহুডোরের মাঝেই নিজেকে আর একটু সঁপে দিল। আভিয়ানের উন্মাদনা তার নিজের ভেতরও এক অদ্ভুত অনাকাঙ্ক্ষিত ভালোলাগার জন্ম দিচ্ছে। সে ধীর স্বরে বলল,

“পারেন না বলেই তো দিন দিন কাজের প্রতি আপনার মনোযোগ কমছে। অফিসে যখন আমি কোনো ইম্পর্ট্যান্ট ফাইল নিয়ে ডিসকাস করি, আপনি তখন টেবিলের নিচ দিয়ে আমার শাড়ির কুঁচি ধরে টানেন। ওটা কি কোনো ডিসেন্ট পুরুষের কাজ, মিস্টার আভিয়ান এহসান?”

আভিয়ান অপরূপার কানের লতিতে মৃদু দাঁত বসাল। বলে উঠল,

“একদম পারফেক্ট কাজ। শুধু শাড়ির কুঁচি টানতে নয়, আমার তো তখন ইচ্ছে করে ফাইলপত্র সব লাটে তুলে ওই টেবিলের ওপরই…..”

আভিয়ানকে বাক্য সম্পূর্ণ করতে দিল না অপরূপা। লোকটা দিনদিন অতিরিক্ত কথা বলছে। তাকে লজ্জায় ফেলতে একটা সুযোগও হাতছাড়া করে না এই অসভ্য লোকটা।

“আভিয়ান, আপনি আসলেই একটা সাইকো! কীসব নোংরা কথা মুখে আসে আপনার? উফ!”

“নোংরা নয় অপ্সরা, ওটা ভালোবাসা, তীব্র আকর্ষণ। এত বছর ধরে যে পুরুষ এই মুখটার জন্য চাতক পাখির মতো তৃষ্ণার্ত ছিল, সে যখন এই রূপের পুরো সাম্রাজ্যের একমাত্র রাজা তখন একটু আধটু উগ্র হওয়া তো রাজধর্মের মাঝেই পড়ে।”

আভিয়ান অপরূপার চুলে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ালো, এক পরম তৃপ্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“আপনাকে না পেলে আমি অসম্পূর্ণই থেকে যেতাম।”

অপরূপা আভিয়ানের বুক থেকে মাথা তুলে সরাসরি তার সেই সম্মোহনী সবুজ চোখে তাকাল। চোখে তার অগাধ মুগ্ধতা, পবিত্র প্রেম। সে নিজের সুকোমল হাতটি আলতো করে স্থাপন করল আভিয়ানের গালের ওপর।

“আমিও তো আপনাকে ছাড়া অসম্পূর্ণ ছিলাম, আভিয়ান। আপনি আমাকে এত আগলে না রাখলে, এত অধিকার না খাটালে আমি হয়তো আজ এই রাজ রমণী হয়ে উঠতে পারতাম না। আপনিই আমার শক্তি, আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সুন্দর পূর্ণতা।”

আভিয়ান অপরূপার হাতের পাতায় একটা গভীর চুমু খেল। দুষ্টু হেসে বিড়বিড় করল,

“তাহলে ম্যাডাম, এই শক্তির পাওনাটা আজ রাতে একটু সুদে-আসলে চুকিয়ে দেওয়া যাক? আজ রাতে কিন্তু আয়াজকে জাওভানের রুমে পাঠিয়ে দেব। কোনো ডিস্টার্বেন্স থাকবে না।”

আভিয়ান আবার সেই চেনা বক্র হাসিটা ফিরিয়ে আনল নিজের ঠোঁটে। যোগ করল,

“শুধু আপনি, আমি আর এই বরফভেজা হাওয়াইয়ের রাত। একটু বেশিই সুন্দর হবে রাতটা, তাই না?”

রেগে গেল রমণী। লজ্জায় মুখটা দেখার মত হলো তার। আভিয়ানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল সে। বিরক্তির স্বরে আওড়াল,

“যান! আপনার সাথে কথাই বলা বৃথা। একটা অসভ্য লোক!”

আভিয়ান দৌড়ে এগিয়ে এলো। পায়ে পা মিলিয়ে বলল,

“আরে স্যরি স্যরি। আর বলব না।”

অপরূপা নিরুত্তর। দৃষ্টি তার চারদিকে। কী সুন্দর পরিবেশ। কিছুটা সময় নীরবেই হাটল তারা। তারপর আভিয়ান হুট করেই প্রশ্ন করে বসল,

“ক্লান্ত লাগছে, ম্যাডাম?”

অপরূপা দৃষ্টি স্থির রেখেই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জবাব দিল,

“একদম না, বরং আপনার সাথে হাঁটতে বড্ড ভালোই লাগছে।”

​”তাহলে ট্রিপটা আরও কয়েকদিন বাড়িয়ে দিই? আয়াজও তো বেশ এনজয় করছে। আর কাল রাতের স্পেশাল পর্বের পর তো আমার মনে হচ্ছে হাওয়াইতেই পাকাপাকি থেকে যাই।”

​”আভিয়ান! আবার!”

হো হো করে হেসে উঠল আভিয়ান। রাগ হলো রমণীর। সে মুহূর্তেই নিচ থেকে বরফ মুঠোতে তুলে নিয়ে ছুঁড়ে মারল আভিয়ানের দিকে। আভিয়ানও কম নয়। দৌড়াল সে। যেতে যেতে নিজেও বরফ ছুড়ল অপরূপার দিকে। দুজনেই হাসছে আনন্দে। এক টুকরো নরম বরফ এসে লাগল অপরূপার শালের ওপর, কিছু অবাধ্য কণা তার ফরসা গালে লেগে মুহূর্তেই জলের বিন্দু হয়ে গলে গেল। রমণী দমবার পাত্রী নয়। শাড়ির কুঁচিটা একহাতে কিঞ্চিৎ ওপরে তুলে সে-ও ছুটল তার অবাধ্য স্বামীর পেছনে। এই কনকনে তাপমাত্রার মাঝেও দুজনের অবয়বে এক তপ্ত, অনাবিল আনন্দের জোয়ার। চারপাশের শুভ্র বরফকে সাক্ষী রেখে দুজনেই হাসছে পরম আনন্দে, পরম তৃপ্তিতে। তাদের খিলখিলিয়ে ওঠা নিখাদ হাসির শব্দ আর তুষারভেজা খুনসুটি জানান দিচ্ছে জীবনের সমস্ত ভাঙা-গড়ার হিসেব চুকিয়ে তারা এখনো ঠিক আগের মতোই আছে। গভীর হয়েছে সম্পর্কের বাঁধন। অতঃপর শুভ্র বরফের রাজ্যে হারাল দুটো প্রাণ। দৌড়াল একে অপরের পিছু। চারপাশ মুখরিত হলো তাদের হাসির শব্দে। এক রূপকথার দৃশ্য আজ বাস্তব। চার জোড়া দৃষ্টি উৎসুক হয়ে চেয়ে রইল তাদের দিকে। দূর থেকে শোনা গেল একটি গানের সুর। মুহূর্তেই বুঝি বন্দি হলো মুহূর্তটা। সেই সুরটা আজ বাজল তাদের মন গহীনেও। অতঃপর ছুটতে ছুটতে আভিয়ান গেয়ে উঠল একই সাথে,

I’ll be your baby, on a Sunday
Oh, why don’t we get out of town?
Call me your baby, on the same wave
Oh, no, no, there’s no slowin’ down

গানের মাঝেই আভিয়ান হুট করে এক পাক ঘুরে একটা বরফের বড় বল বানিয়ে আলতো করে ছুঁড়ে মারল অপরূপার দিকে। অপরূপা ডানে সরে গিয়ে চমৎকার ভঙ্গিতে সেটা হাত দিয়ে আড়াল করল। তার হলদে শাড়ির আঁচলটা বাতাসে উড়ছে শ্বেতশুভ্র বরফের মাঝে এক টুকরো তপ্ত রোদের ন্যায়। সে নিজের ভেজা চুলগুলো এক ঝটকায় পেছনে ফেলে এবার উল্টো দৌড় লাগাল আভিয়ানের দিকে। এবার আভিয়ান পিছু হটল। অপরূপা নিছু হয়ে দু-হাতে একরাশ আলগা বরফ তুলে নিয়ে ছুড়ে দিল আভিয়ানের মুখের ওপর। বরফের গুঁড়োগুলো আভিয়ানের ঘন চোখের পাপড়ি, চুলে এসে আটকে যেতেই সে হো হো করে হেসে উঠল। সেই হাসির মাঝেই সে এক ক্ষিপ্র গতিতে এগিয়ে এসে অপরূপাকে এক হাতে জড়িয়ে মিশিয়ে নিল নিজের বুকের সাথে। দুজনের নিশ্বাস মিশে একাকার হয়ে গেল। আভিয়ান অপরূপার কোমরের বাঁধন শক্ত করে তার চোখে চোখ রেখে গভীর ও গম্ভীর স্বরে গাইল, আর তার সাথে সুর মেলালো অপরূপাও,

​”You and I, I
Ridin’ Harleys in Hawaii-i-i
I’m on the back, I’m holdin’ tight, I
Want you to take me for a ri-ide, ride
When I hula-hula, hula
So good, you’ll take me to the jeweler-jeweler, jeweler”

​আভিয়ান আরো খানিকটা টেনে আনলো অপরূপাকে। অপরূপার কপালটা ঠেকল আভিয়ানের চিবুকে। তারা দুজনেই ক্লান্ত, দুজনেরই বুক ওঠানামা করছে দ্রুত গতিতে। ওপর থেকে মাউনা কেয়ার আকাশটাও দুপুরের আলোয় অন্য এক রূপ নিয়েছে। আলো এসে পড়ছে দু’জনের চোখে মুখে। আভিয়ান অপরূপার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। অতঃপর দুজনেই আঁকড়ে ধরল একে অপরের অধর। দূর থেকে ভেসে এলো কটেজ কাউন্টারে বাজতে থাকা গানের শেষ দুটো লাইন,

​”There’s pink and purple in the sky-y-y
We’re ridin’ Harleys in Hawaii-i-i”

~সমাপ্ত~