#পর্ব_১৩
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan
বিকেলের ম্লান আলো করিডোর জুড়ে এক অদ্ভুত মায়াবী আঁধার তৈরি করেছে। আয়াত গত দশ মিনিট ধরে আরভানের বন্ধ দরজার সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। হাতে ধরা ফোনটা সিমকার্ডহীন এক টুকরো কাঁচ আর প্লাস্টিক ছাড়া আর কিছুই নয়। মেলবোর্নে আসার পর থেকে এক মুহূর্তের জন্যও সে দাদাজানের সাথে কথা বলতে পারেনি। যে মানুষটা একদিন আয়াতকে চোখের আড়াল করলে অস্থির হয়ে যেতেন, যার রাতের ওষুধ থেকে সকালের নাস্তা—সবটাই ছিল আয়াতের হাতের ছোঁয়ায়, আজ সেখানে তার কাজগুলো কে করে দিচ্ছে? দাদাজান কি তার অভাব বোধ করছেন?
ভাবনার অতলে ডুব দিতেই আয়াতের চোখ থেকে এক ফোঁটা উষ্ণ অশ্রু গড়িয়ে চিবুক ছুঁলো। মানুষটা তাকে বড্ড মায়ায় বেঁধেছিলেন, অথচ শেষমেশ সেই মানুষটাই তাকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে ঠেলে দিলেন। কোন ভরসায় তিনি তাকে এই পাষাণ হৃদয়ের মানুষের হাতে সঁপে দিলেন, যার হৃদয়ে মায়ার বদলে কেবল বিষ আর প্রতিহিংসার রাজত্ব!
ঠিক তখনই হড়বড় করে দরজাটা খুলে গেল। আরভান বের হয়ে এলো। আয়াতকে নিজের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেও আরভান মোটেও অবাক হলো না; যেন সে আয়াতের উপস্থিতি আর নিঃশ্বাসের অস্থির ছন্দ অনেক আগেই টের পেয়েছিল।
আরভান নিজের ট্রলি ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে এসে দরজাটা সজোরে টেনে লক করে দিল। আয়াত কিছুটা হতভম্ব হয়ে গেল। এই লোকটা কি তাকে চোর মনে করে? সে কি অনুমতি ছাড়া কারো রুমে ঢুকে পড়ার মতো অসভ্য? অপমানে আয়াতের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমলো, তবুও সে নিজেকে সামলে নিল। আরভান ওকে উপেক্ষা করে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল, কিন্তু কয়েক কদম হেঁটে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরল। তারপর ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,
”আয়াত, তুমি কি ভূতের ভয় পাও?”
সে এমন গম্ভীর মুখে প্রশ্নটা করল যেন কোনো আন্তর্জাতিক সংকটের সমাধান খুঁজছে। আয়াতের মেজাজ মুহূর্তেই চড়ে গেল। সে মুখ বাঁকিয়ে জবাব দিল,
“আপনার মতো আস্ত এক দানবের বাড়িতে যেখানে আমি চব্বিশ ঘণ্টা পার করছি, সেখানে ভূতের ভয় পাওয়াটা বিলাসিতা মাত্র! ভূতের চেয়েও ভয়ংকর জীব তো আমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। আপনি নিজেই তো সব ভূতের সর্দার!”
আরভান একটু সময় নিয়ে আয়াতের চোখের দিকে তাকালো। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল যা অত্যন্ত রহস্যময়। সে এক পা এগিয়ে এসে কণ্ঠস্বর একদম খাদে নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
”আমি কিন্তু সব ভূতের সর্দার নই আয়াত, আমি হলাম সেই তৃষ্ণার্ত প্রেতাত্মা যে মাঝরাতে অতৃপ্ত বাসনা নিয়ে শিকারের খোঁজে বের হয়। সাবধানে থেকো আয়াত। এ বাড়িতে ভূত না আসলেও মাঝে মাঝে এমন এক ছায়ার আনাগোনা হয়, যে তোমার ঘরের সব তালা আর নিয়ম অনায়াসেই ভেঙে ফেলতে পারে। নিজের দরজার চেয়েও বেশি সতর্ক থেকো নিজের মনের দরজা নিয়ে, ওটাই বেশি অরক্ষিত।”
আরভানের কথার গূঢ় অর্থ বুঝতে আয়াতের কয়েক মুহূর্ত সময় লাগলো। যখন বুঝতে পারলো, সে রাগে কথা হারিয়ে ফেলল। আরভান পুনরায় কণ্ঠস্বর গম্ভীর করে বলল,
“আমি কাল রাতের আগে ফিরতে পারব না। বাড়িতে তুমি একাই থাকবে। তাই ভয় পেলে আগেই বলে দাও, ডেইজিকে আসতে বলব সে তোমার সাথে থাকবে।”
আয়াত জেদ ধরে বলল, “প্রয়োজন হবে না। আমি একাই থাকতে পারব।”
“ভালো। তবে ডেইজি ছাড়া আর কেউ কলিং বেল দিলে দরজা খুলবে না। নিজের সেফটি নিয়ে কেয়ারলেস হবে না, কারণ আমি চাই না আমার অনুপস্থিতিতে আমার কোনো দামী প্রপার্টি ড্যামেজ হোক।”
আরভানের মুখে নিজেকে ‘প্রপার্টি’ হিসেবে শুনে আয়াতের পিত্তি জ্বলে গেল। এই লোকটা কি কোনোদিন তাকে একজন রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে সম্মান দিতে শিখবে না? পরক্ষণেই এক অজানা কৌতূহল সামলাতে না পেরে সে ধীর গলায় জিজ্ঞেস করল, ” আপনি কোথায় যাচ্ছেন?”
প্রশ্নটা করেই আয়াত নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল। কেন সে এই অধিকার খাটাতে গেল? আরভান যেন এই প্রশ্নটার জন্যই অপেক্ষা করছিল। সে এক পা দু-পা করে একদম আয়াতের কাছে এগিয়ে এল। আয়াত পিছু হটে দেয়ালের সাথে মিশে যেতেই আরভান তার দু-পাশে হাত রেখে ঝুঁকে এল। আয়াতের কানের কাছে মুখ নিয়ে উত্তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
”কী ব্যাপার বলতো আয়াত? হঠাৎ এমন ‘মিসেস মিসেস’ ফিল দিচ্ছ কেন? সত্যি বলছি আয়াত, আজ প্রথমবার মনে হলো আমি একজন বিবাহিত পুরুষ, যার ঘরের বউ তার স্বামীর গন্তব্য জানতে ব্যাকুল। তোমার এই অধিকারবোধটুকুও বেশ মাদকতাময়!”
আরভানের শরীরের তীব্র পুরুষালি ঘ্রাণ আর তপ্ত নিঃশ্বাস আয়াতের বুক ধুকপুকানি বাড়িয়ে দিয়েছে। সে দুই হাতে আরভানের বুক ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার বৃথা চেষ্টা করে কাঁপা গলায় বলল,
“আপনার আজেবাজে কথা রাখুন। আমি আপনাকে স্বামী বলে মানি না, তাই অধিকার খাটানোর প্রশ্নই আসে না। আমি জাস্ট সাধারণ সৌজন্যবোধ থেকে জিজ্ঞেস করেছি। ”
আরভান বাঁকা হেসে আয়াতের কপালে ছড়িয়ে থাকা এলোমেলো চুলগুলো খুব যত্নে কানের পিছনে গুঁজে দিয়ে বলল, “আমিও কি একবারও বলেছি আমি তোমাকে বউ হিসেবে মেনে নিয়েছি? এনিওয়ে, কিছু বলবে?”
আয়াত আমতা আমতা করে বলল, “আমার একটা সিমকার্ড লাগবে।”
“সিম দিয়ে কী করবে?”
আয়াত তেজি গলায় বলল, “আমি আপনার মতো নিষ্ঠুর না যে নিজের শেকড় আর পরিবার ভুলে যাব। আমি দাদাজানের সাথে কথা বলতে চাই।”
আরভানের চেহারায় আবার সেই চিরচেনা কাঠিন্য ফিরে এল। “যে লোকটা তোমাকে আমার মতো এক পাষাণ হৃদয়ের মানুষের কাছে জোর এখানে পাঠিয়েছে, তার সাথে কথা বলে কোনো লাভ নেই আয়াত।”
”তিনি জোর করেননি, আপনি আমাকে অজ্ঞান করে এখানে নিয়ে এসেছেন!”
আরভান দায়সারাভাবে হাসল।
“কথায় লজিক আছে তোমার। তবে আপাতত সিমকার্ডের কথা ভুলে যাও। নিচে ল্যান্ডলাইন আছে, ওখান থেকে যত ইচ্ছা যার সাথে ইচ্ছা কথা বলো। আমি এখন তোমাকে কোনো ব্যক্তিগত সিম দিচ্ছি না। আর হ্যাঁ, ওই ভার্সিটি… আপাতত তুমি পড়াশোনা কন্টিনিউ করতে পারো। তবে সাবধান, অ্যালানের ছায়া থেকেও দূরে থাকবে। কারণ আমি যদি জানতে পারি তুমি ওর সাথে কথা বলছো, তবে তোমার ওই ভার্সিটি যাওয়ার শখ আমি চিরদিনের মতো মিটিয়ে দেব।”
আয়াত রাগে ফেটে পড়ে বলল, “আপনি একটা একরোখা আর অসভ্য মানুষ! আপনার সমস্যা কী? আপনি কি অ্যালানকে ভয় পাচ্ছেন? নাকি মিস্টার অ্যালান আপনার ব্যাপারে এমন কিছু জানেন যা আপনি আমার কাছে লুকাতে চাইছেন?”
আরভান পাল্টা জবাব দেওয়ার আগেই তার ফোনে ফারহানের কল এল। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ফারহানের আতঙ্কিত কণ্ঠ শোনা গেল,”এভি, জেসিকা অফিসে এসে হাঙ্গামা করছে! ও বলছে তোর সাথে কথা না বলে যাবে না। কী করব?”
আরভান চোয়াল শক্ত করে বলল, “সিকিউরিটি দিয়ে বের করে দে।”
“আরে ও একটা মেয়েকে এভাবে…
“ন্যকামো করবি না ফারহান। তোর এই সস্তা আবেগের মূল্য দেওয়ার মতো সময় বা রুচি কোনোটাই আমার নেই। তুই জানিস আমি একটা ইম্পর্ট্যান্ট কাজে বের হচ্ছি। এসব থার্ড ক্লাস ইস্যু নিয়ে আমাকে বিরক্ত করবি না। দ্যাটস ইট!”
ফোনটা কেটে আরভান আয়াতের দিকে একবার তীক্ষ্ণ নজরে তাকালো। তার সেই চাউনিতে রাগ আর অস্থিরতার এক বিচিত্র সংমিশ্রণ ছিল। সে কোনো কথা না বলে গটগট করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল।
আয়াত নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। লোকটা একবারও স্পষ্টভাবে বলল না সে কোথায় যাচ্ছে। অথচ তাকে এই বিশাল ঘরের ভেতর একা ফেলে যাচ্ছে। তাকে ল্যান্ডলাইনের আশ্বাস দিয়ে নিজের মতো বেরিয়ে গেল।
আয়াত মনে মনে গজগজ করতে করতে নিজের রুমে চলে এল। লোকটা যেমন রহস্যময়, তার চারপাশের মানুষগুলোও তেমন অদ্ভুত। আয়াতের ভীষণ কান্না পাচ্ছিল; নিজেকে বড্ড অসহায় আর একা মনে হচ্ছে। তার মনের কোণে এক অদ্ভুত শূন্যতা আর অস্বস্তি দানা বাঁধল। এটা কি রাগ, নাকি না বলে চলে যাওয়ার অভিমান? সে নিজেই জানে না।
******
শহরের কোলাহল থেকে দূরে, নির্জন এক পরিত্যক্ত গুদামের ভেতর ভ্যাপসা গুমোট অন্ধকার। চারদিকের দেয়ালে লোনা ধরা নোনা গন্ধ আর স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ এক বিভীষিকাময় আবহ তৈরি করেছে। ওপর থেকে ঝুলতে থাকা টিমটিমে বাল্বের আলোয় ঘরের ধুলিকণাগুলো বিষাক্ত এক নাচন নাচছে। ঘরটির মাঝখানে একটি কাঠের চেয়ারে হাত-পা শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে এক যুবককে। তার সারা শরীর ভয়ে ঘামছে, কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া ঘাম আর চোখের নোনা জল মিশে একাকার হয়ে গেছে। যুবকের সামনে আয়েশি ভঙ্গিতে সোফায় বসে আছেন আরশাদ চৌধুরী। তার ঠোঁটের কোণে ঝুলে থাকা দামী চুরুটের ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে ওপরে উঠছে। আরশাদ চৌধুরীর শান্ত কিন্তু ক্রুর চাহনি যুবকের কলিজা কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
যুবকটি ফুঁপিয়ে উঠে অনুনয়ের সুরে বলল, “স্যার, প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন! আমি তো আপনার কোনো ক্ষতি করিনি। আমি সাধারণ একটা ছাত্র, দয়া করে আমাকে যেতে দিন!”
আরশাদ চৌধুরী চুরুট থেকে ছাই ঝাড়লেন। অত্যন্ত শীতল আর মোলায়েম গলায় বললেন,
“অবশ্যই তোমাকে ছেড়ে দেব। মিছেমিছি কেন তোমাকে আটকে রাখব বলো? আমি তো আর পেশাদার খুনি নই যে তোমাকে এখানে কবর দেব। শুধু ছোট্ট এই ইনজেকশনটা তোমার শরীরে প্রবেশ করাবে ওরা, ব্যস! তারপরই তুমি মুক্ত। নীল আকাশের নিচে ডানা মেলে ওড়ার জন্য একদম স্বাধীন।”
সামনে রাখা ট্রে-তে থাকা নীলচে তরল ভর্তি সিরিঞ্জটির দিকে তাকিয়ে যুবকটি আর্তনাদ করে উঠল,
“প্লিজ! আমাকে এই ড্রাগ দেবেন না স্যার! আমি মরে যাব। আমার মা-বাবা আছে… আমি আপনাদের পায়ে পড়ছি, দয়া করে আমার শরীরে এই বিষ প্রয়োগ করবেন না!”
আরশাদ চৌধুরী বাঁকা হাসলেন। চেয়ার থেকে উঠে ধীর পায়ে যুবকের কাছে এগিয়ে এলেন। তার চিবুক চেপে ধরে অত্যন্ত দরদমাখা কণ্ঠে বললেন,
“বোকা ছেলে! এত ভয় পাচ্ছ কেন? এই ড্রাগে কিছুই হবে না। আমার ছেলে আরভানকে দেখছো না? ওকেও তো আমি বছরের পর বছর এটা দিয়েছি। ও কি মরে গেছে? বরং দেখো, একজন তরুণ হিসেবে ও আজ কত সফল ব্যবসায়ী। এটা তোমাকে অন্য এক জগতের বাসিন্দা করবে, তোমার মেধা আর সাহসের এমন বিকাশ ঘটাবে যা তুমি কল্পনাও করতে পারো না। তুমি অজেয় হয়ে উঠবে।”
যুবকটি এবার ক্ষোভে আর যন্ত্রণায় ফেটে পড়ল, “আপনার ড্রাগ যদি এতই জাদুকরী হয়, তবে আপনার নিজের ছেলেকে কেন এখন আর দিচ্ছেন না? কেন আমাদের মতো অসহায় ছেলেদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন?”
আরশাদ চৌধুরীর হাসিমাখা মুখটা মুহূর্তেই কালো মেঘের মতো থমথমে হয়ে গেল। তার চোখের মণি হিংস্র পশুর মতো তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে তিনি বললেন,
“দিতাম তো আমার ছেলেকেই। সবসময় দিতাম। কিন্তু কে যেন আমার সেই অনুগত ছেলের কানে আমার বিরুদ্ধে বিষ ঢেলে দিয়েছে! আমার প্রতিটি কথা যে ছেলে এক সময় চোখ বুজে মেনে নিত, হঠাৎ একদিন সে বিদ্রোহ শুরু করল। ও নিজেকে আমার হাতের মুঠোর বাইরে নিয়ে যাওয়ার স্পর্ধা দেখাচ্ছে। আমার তিল তিল করে তৈরি করা সাম্রাজ্যকে ও ভেঙে দিতে চাইছে! তাই তো আমাকে বিকল্প খুঁজতে হচ্ছে। আমাকে প্রমাণ করতে হবে যে ওকে ছাড়াও আমার এই ব্যবসার চাকা সচল থাকবে।”
একটু থেমে তিনি চুরুটটা অ্যাশট্রেতে পিষে ফেললেন। অবজ্ঞার সুরে বললেন,
“কিন্তু তোমার মতো অপদার্থের সাথে এত কথা বলছি কেন আমি? তুমি তো কেবল একটা গিনিপিগ!”
আরশাদ চৌধুরী হাতের ইশারায় তার লোকদের নির্দেশ দিলেন। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুই বিশালদেহী লোক সিরিঞ্জটা তুলে নিল। যুবকটি শেষবারের মতো একটি ভয়ংকর চিৎকার দিয়ে উঠল, “নাআআ!”
নির্দয়ভাবে তার শরীরে ইনজেকশনটা পুশ করা হলো। কয়েক সেকেন্ডের চরম ছটফটানি, তারপর শরীরটা ধনুকের মতো বেঁকে গিয়ে নিস্তেজ হয়ে এল। যুবকটি জ্ঞান হারিয়ে মাথা ঝুলিয়ে দিল। আরশাদ চৌধুরী বিরক্তির সাথে ভ্রু কুঁচকে রুমাল দিয়ে নিজের হাত মুছলেন। তারপর এক অদ্ভুত বিদ্রূপাত্মক হাসি দিয়ে বললেন,
“বড্ড দুর্বল এরা! আমার ছেলের মতো তেজস্বী একটাকেও পেলাম না। সব জঞ্জাল!”
একটু থামলেন তিনি। আরভানের সেই জেদি মুখটা তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। তিনি ভালো করেই জানেন আরভানের দুর্বলতা এখন কোথায় লুকিয়ে আছে। সেই দুর্বলতাকে ব্যবহার করেই তাকে আবার নিজের নিয়ন্ত্রণে আনা প্রয়োজন। কালই ছেলের সাথে আবারও দেখা করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি।
ম্লান আলোয় আরশাদ চৌধুরীর ক্রুর হাসি যেন আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল। তিনি দ্রুত পায়ে গুদাম ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।পিছনে পরে রইলো এক যুবকের প্রাণহীন প্রায় দেহ আর আরভানের জীবনের সেই অন্ধকার অধ্যায়ের এক ভয়ংকর পুনরাবৃত্তি মাত্র।
******
আরভানের উপস্থিতিতে মেজাজ যতটা খিটখিটে থাকতো, তার অনুপস্থিতিতে তার চেয়েও বেশি অস্থিরতা কাজ করছে আয়াতের মনে। পুরো বাড়িতে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা, যা তাকে ক্রমশ গ্রাস করছে। হয়তো গত কয়েকদিন ধরে লোকটার ছায়ার সাথে থাকতে থাকতে সে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে, আর এটাই এখন আয়াতের নিজের ওপর বিরক্তির বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের ওপর রাগ হচ্ছে—যে মানুষটা তাকে একটা বার ফোন করে খবর নেওয়ার প্রয়োজন মনে করল না, তাকে নিয়ে সে কেন এত ভাবছে?এই কয়েক ঘণ্টায় মেলবোর্নের আকাশটা যেন বড্ড বেশি ধূসর মনে হচ্ছে।
বিকেলে কলিং বেলের আওয়াজে একছুটে নিচে গিয়েছিল সে। কিন্তু দরজার ওপাশে ডেইজি ছাড়া আর কারো দেখা মিলল না। পুরো একটা দিন কেটে গেল, আরভানের কোনো পাত্তাই নেই। মনের ওপর জেঁকে বসা এই ভার কমানোর জন্য আয়াত অগত্য ড্রয়িংরুমের ল্যান্ডলাইন থেকে শেহজাদির বাংলাদেশি নাম্বারে কল দিল। বেশ কিছুক্ষণ রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে কেউ কলটা রিসিভ করল না।আয়াত নিরাশ হয়ে রিসিভার নামিয়ে রাখতেই কয়েক সেকেন্ডের মাথায় ল্যান্ডলাইনটা সজোরে বেজে উঠল।
আয়াত ওপারের মানুষটাকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে নিজেই হড়বড়িয়ে কথা বলে উঠল,
”জানি অনেক দিন পরে কথা হলে সবাই সবার খোঁজখবর নেয়, কিন্তু আমি তা করব না কারণ আমার সেই ধৈর্যটুকুও অবশিষ্ট নেই।শেহজাদি… আমি বোধহয় পাল্টে যাচ্ছি। নিজের ভেতরের পরিবর্তনগুলো আমি নিজেই নিতে পারছি না। যে মানুষটা আমার চরিত্র দিকে আঙুল তুলল, যে এই পবিত্র বিয়েটাকে পুতুল খেলা বলে অপমান করল—আমি কেন জানি সেই মানুষটার জন্যই অস্থির হয়ে উঠছি! বিশ্বাস কর, আমার মনে হচ্ছে তাকে এক পলক দেখা দরকার। পুরো একটা দিন পেরিয়ে গেল, অথচ সে একটা খবর পর্যন্ত দিল না। অথচ আমি নির্লজ্জের মতো তাকে নিয়ে ভাবছি, সামনে দেখার জন্য ছটফট করছি! আমার এই পরিবর্তনের কারণ কী বলতে পারিস? এই মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় কী?”
কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে আয়াত হাঁপাতে লাগল। ওপাশ থেকে কয়েক সেকেন্ড কোনো শব্দ এল না, ঘুটঘুটে নীরবতা। আয়াত ভাবল হয়তো নেটওয়ার্কের সমস্যা। কিন্তু পরক্ষণেই ওপাশ থেকে এক ভারী এবং চেনা পুরুষালি কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
”তাকে নিয়ে এত টেনশন করে নিজের শরীর খারাপ করতে হবে না। কাল সকালেই সে ফিরে আসবে। ”
কন্ঠটা কানে আসতেই আয়াতের শরীর মুহূর্তেই হিম হয়ে গেল।হৃৎপিণ্ড যেন স্পন্দন ভুলে গেল। হাতের রিসিভারটা যেন বরফের মতো শীতল মনে হতে লাগল। ওপাশে শেহজাদি নয়, আরভান! আয়াত পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, তার কণ্ঠনালী শুকিয়ে কাঠ। ওপাশ থেকে আরভান গম্ভীর গলায় আবার বলল, “ফারহান কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়িতে যাচ্ছে কিছু জরুরি পেপারস নিতে। তুমি নিজের রুমে গিয়ে দরজা লক করে থাকবে, একদম বের হবে না। গুড নাইট।”
আয়াতের উত্তরের অপেক্ষা না করেই ওপাশ থেকে খট করে কলটা কেটে গেল। আয়াত ল্যান্ডলাইনের রিসিভারটা কানে ধরে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। নিজের কানকে সে বিশ্বাস করতে পারছে না। যে কথাগুলো সে পৃথিবীর কাউকেই বলতে চায়নি, সেই স্বীকারোক্তি স্বয়ং আরভানের কানে পৌঁছে গেল! শেহজাদি ভেবে সে নিজের মনের সব দুর্বলতা তার সামনে উগরে দিল, সে সারাক্ষণ ঘৃণা করতে গিয়েও বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।
লজ্জায়, আর সংকোচে আয়াতের ইচ্ছে করল মাটির নিচে ঢুকে যেতে। সে দুই হাতে নিজের মুখ চেপে ধরে সোফায় বসে পড়ল। । তার সারা মুখ আর কান তপ্ত হয়ে উঠছে। আরভানের সেই শান্ত অথচ কর্তৃত্ববাদী কণ্ঠস্বর বারবার কানে বাজছে— ‘তাকে নিয়ে এত টেনশন করতে হবে না।’
আয়াত মনে মনে নিজেকে সহস্রবার ধিক্কার দিল। কাল যখন এই লোকটা ফিরে আসবে, সে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াবে কোন মুখে?
“ছিঃ আয়াত! তুই এতটাও বোকা কীভাবে হতে পারলি?” নিজের কপালে মৃদু করাঘাত করে সে বিড়বিড় করল। লজ্জার এই পাহাড় ডিঙিয়ে সে কীভাবে নিজেকে সামলাবে, তা ভেবেই তার দম বন্ধ হয়ে আসছে।
লোকটা নিশ্চয়ই মনে মনে বিজয়ীর হাসি হাসছে আর ভাবছে আয়াত তার প্রেমে পাগল হয়ে গেছে। যে লোকটা সামান্য সুযোগ পেলেই বিদ্রূপ করতে ছাড়ে না, সে এবার তাকে খোঁচা দেওয়ার মোক্ষম অস্ত্র পেয়ে গেছে। সে ফিরে এলে নিশ্চয়ই সেই রহস্যময় হাসি দিয়ে বলবে— ‘কী মিসেস আয়াত, আমার জন্য বুঝি বড্ড বেশি প্রাণ আনচান করছিল?
আয়াত মনে মনে এক অদ্ভুত আর অবাস্তব দোয়া করল,কাল সকালে সূর্য যেন কক্ষনো না ওঠে! পৃথিবীর ঘূর্ণন কি একটি রাতের জন্য থমকে যেতে পারে না? এই মুহূর্ত থেকে সে কঠিন সিদ্ধান্ত নিল, আরভান ফিরে এলেও সে আর কখনো তার সামনে যাবে না। নিজেকে ঘরের চার দেয়ালের ওপালে আজীবন বন্দি করে রাখবে, তবুও ওই বিদ্রূপকারী লোকটার মুখোমুখি হবে না।
ওদিকে, মাইলখানেক দূরে সমুদ্রের ধারের এক নির্জন ক্যাবিনে বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আরভান। হাতে ধরা ফোনের স্ক্রিনটা তখনো জ্বলজ্বল করছে। আয়াতের প্রতিটি শব্দ, তার কণ্ঠের সেই আর্তনাদ আর অসহায় স্বীকারোক্তি আরভানের হৃদয়ের কোনো এক সুপ্ত কোণে কম্পন সৃষ্টি করেছে। সে চোখ বন্ধ করে গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস নিল। আয়াতের সেই আধো-কাঁপা কণ্ঠের রেশ যেন এখনো তার কানে বাজছে।
আরভান নিজের বুকের বাঁ-পাশে হাত রাখল। যে হৃদপিণ্ডটাকে সে মৃত ভেবেছিল, আজ সেখানে এক অবাধ্য স্পন্দন। সে বুঝতে পারল, নিজের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ শিথিল হয়ে আসছে।
সে ভেবেছিল নিজেকে পাথরের মতো শক্ত করে রাখবে, এই মেয়েটার মায়া থেকে যোজন যোজন দূরে থাকবে। কিন্তু আয়াতের সেই অসহায় স্বীকারোক্তি তার হৃদয়ের সব দেয়াল নিমিষেই গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
তার ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত যন্ত্রণাময় প্রশান্তি ফুটে উঠল। সে বিড়বিড় করে বলল, “নিজেকে আর কত ঠকাবে আরভান? যে আগুনের শিখা নেভাতে চেয়েছিলে, তা তো এখন তোমার পুরো অস্তিত্ব জুড়ে দহন সৃষ্টি করছে। এই মায়াবী জাদুকরীকে দূরে সরিয়ে রাখা এখন আর তোমার সাধ্যের বাইরে।”
#তাসনিম_রিয়া_খান
#পর্ব_১৪
#আমার_হয়ে_থেকো🍁
#Tasnim_Riya_khan
নিচে তলার মেইন ডোর খোলার শব্দ কানে আসতেই আয়াতের তন্দ্রাভাবটা ছুটে গেল। ঘড়িতে তখন রাত প্রায় নয়টা। আরভান ফোনে বলেছিল ফারহান আসবে কিছু জরুরি ফাইল নিতে, আর আয়াতকে কড়া নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিল সে যেন নিজের রুম থেকে বের না হয়। কিন্তু আয়াত আরভানের এই অযৌক্তিক হুকুম মানতে মোটেও বাধ্য নয়। সে শুধু নিজের কাছের মানুষের হুকুম আর আবেগকে সম্মান করতে জানে, নতুবা সে প্রচণ্ড স্বাধীনচেতা; কারো অযাচিত নিয়ন্ত্রণ বা একতরফা শাসন তার সহজাত স্বভাবের পরিপন্থী।
তাছাড়া পেটের ভেতরকার কৌতুহল আর অস্থিরতা তাকে স্থির থাকতে দিচ্ছিল না।
আয়াত ধীরপায়ে নিচে নেমে এল। দেখল ফারহান আরভানের স্টাডি রুম থেকে কিছু ফাইল হাতে নিয়ে বেরিয়ে আসছে। আয়াতকে সামনে দেখে ফারহান একটু চমকালেও পরক্ষণেই তার সেই চিরচেনা অমায়িক হাসিটা দিল।
”কী খবর আয়াত? কোনো সমস্যা হচ্ছে না তো একলা বাড়িতে?”
আয়াত সৌজন্যমূলক হেসে বলল,
“না ভাইয়া, কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আপনার সব প্রয়োজনীয় জিনিস কি নেওয়া হয়েছে?”
ফারহান ফাইলগুলো বগলে চেপে ধরে বলল, “হ্যাঁ, সব জরুরি কাগজপত্র নিয়ে নিয়েছি। আচ্ছা আয়াত, আজ তাহলে আমি আসছি। একটা ইম্পর্ট্যান্ট কাজ আছে, বুঝতেই পারছ এভি নেই মানে অফিসের সব দায়িত্ব এখন আমার ঘাড়ে।”
ফারহান দরজার দিকে পা বাড়াতেই আয়াতের ভেতরের অস্থির প্রশ্নটা অবাধ্য হয়ে বেরিয়ে এল। সে একটু ইতস্তত করে বলে উঠল, “ভাইয়া, আপনার বন্ধু কোথায়? মানে সে কি তার প্রেমিকাকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে গেছে?”
আয়াতের এমন সোজাসাপ্টা প্রশ্নে ফারহান থমকে দাঁড়িয়ে হা করে তাকিয়ে রইল। পরক্ষণেই সে শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
“প্রেমিকা? তাও আবার এভির! ও তো একটা আস্ত নারীবিদ্বেষী। আশেপাশে কোনো নারীকে ও সহ্য করতে পারতো না। আমার তো মাঝে মাঝে ভয় হতো ব্যাটা আবার ‘গে’ নাকি! কখন না জানি সুযোগ বুঝে আমার ইজ্জত হরণ করে বসে!”
আয়াত ফারহানের বলার ভঙ্গিতে হেসে দিলেও মনে মনে গজগজ করল। যে লোকটা সুযোগ পেলেই তার গায়ের ওপর এসে পড়ে, কথায় কথায় নিঃশ্বাসের দূরত্বে চলে আসে—সে নাকি নারীবিদ্বেষী! নিজের চিন্তাগুলো মনেই চেপে রেখে সে ফারহানের দিকে তাকালো।
ফারহান আশ্বস্ত হওয়ার ভঙ্গিতে বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“তবে এখন আমি নিশ্চিন্তে আছি, কারণ তুমি নামক ওর একজন সুন্দরী বউ আছে। অন্তত আমার ইজ্জত এখন সেফ!”
আয়াতের হাসির রেখা মিলিয়ে গেল। জেসিকার সেই উদ্ধত চেহারাটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই সে গম্ভীর হয়ে বলল, “তাহলে জেসিকা কে? ওর সাথে আরভানের কী সম্পর্ক?”
ফারহান মুখ বাঁকিয়ে বলল, “জেসিকা? ও একটা আপদ। লাস্ট বিজনেস পার্টিতে বাবার সাথে এসেছিল। আরভানকে দেখলেই সে একদম হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে সোজা জড়িয়ে ধরেছিল। তারপর যা হওয়ার তাই হলো_”
আয়াতের হাসির রেশটুকু মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। জেসিকা আরভানকে জড়িয়ে ধরেছিল তথ্যটা তার মোটেও পছন্দ হলো না। বুকের ভেতরটা কেন যেন অজানা এক দহনে জ্বলে উঠল। সে দাঁতে দাঁত চেপে, নিজের ভেতরের অস্বস্তি আড়াল করার চেষ্টা করে তপ্ত গলায় বলল,
”তারপর কী হলো? আপনার বন্ধু কি খুব আহ্লাদ নিয়ে সেই আলিঙ্গন উপভোগ করলেন, নাকি পাল্টা জড়িয়ে ধরেছিলো?”
ফারহান আয়াতের গলার স্বরে থাকা ঈর্ষাটুকু ধরতে পেরে মনে মনে হাসল। সে ভাবল ‘বউ’ তো দেখি জ্যান্ত আগ্নেয়গিরি!’ ফারহান মুখ টিপে হেসে বলল,
”আরে না! তারপর আর কী! আমাদের জাঁদরেল আরভান চৌধুরী সবার সামনে তাকে একটা কষিয়ে থাপ্পড় লাগিয়ে দিয়েছিল।”
কথাটা শুনে আয়াতের হৃদয়ে একটু প্রশান্তি লাগলেও রহস্যটা কাটল না। আয়াত ভ্রু কুঁচকে বলল, “তাহলে তাকে নিয়ে বাংলাদেশে কেন গিয়েছিল সে? আর কেন বলেছিল জেসিকা তার ফিউন্সে?”
ফারহানের চোখ বড় বড় হয়ে গেল।
“কী বললে? ও বাংলাদেশে জেসিকাকে নিয়ে গিয়েছিল? আবার ফিউন্সে বলেছে! ও তো আমাকে এসব কিচ্ছু বলেনি। দাঁড়াও, ব্যাটা ফিরুক, জ্যান্ত চিবিয়ে খাব ওকে!”
আয়াত ধীর গলায় বলল, “আমার প্রশ্নের উত্তরটা কিন্তু আপনি দেননি ভাইয়া। জেসিকার সাথে আরভানের আসল সম্পর্কটা কী?”
ফারহান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু শান্ত হলো। আয়াতের দিকে তাকিয়ে বিষণ্ণ স্বরে বলল, ” আরশাদ চৌধুরী চান এভি জেসিকাকে বিয়ে করুক। কারণ জেসিকার বাবার সাথে তার বড় ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িয়ে আছে। উনি মনে করেন এভি ওনার হাতের পুতুল, তাই ওনাকে খুশি করতে এভি ওটাই করবে যা উনি চাইবেন। ”
একটু থেমে ফারহান আবার বলল, “আয়াত, আরভান বাইরে থেকে যেমন রুক্ষ দেখায় ও আসলে তেমন না। ওর জীবনটা এক বীভৎস যন্ত্রণার নাম। ওকে একটু ভালোবাসা দিও আয়াত। হয়তো তোমার স্পর্শেই ও পৃথিবীর মায়ায় পড়ে যাবে, বেঁচে থাকার নতুন কোনো কারণ খুঁজে পাবে। সময় বড় নিষ্ঠুর জিনিস আয়াত; চলে গেলে হাজার কাঁদলেও আর তাকে পাওয়া যায় না। হারাবার আগে আগলে রাখার চেষ্টা করো।”
কথাটা বলে ফারহান আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। কিন্তু আয়াতকে এক গভীর ধোঁয়াশার মাঝে রেখে চলে গেল। আরভানের জীবনে এমন কী বিভীষিকা আছে যা তাকে জানানো হচ্ছে না? কেন সবাই তাকে শুধু আগলে রাখার কথা বলছে? কোন যন্ত্রণায় সে নিজেকে সবার থেকে আড়াল করে রাখে?
আয়াত সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে আরভানের রুমের দরজার কাছে গেল। তার মনে হলো আরভানের রুমটা তন্নতন্ন করে খুঁজলে হয়তো কিছু পাওয়া যেতে পারে যা তার অতীত আর বর্তমানের সেতুবন্ধন। কিন্তু নব ঘুরাতেই বুঝল রুমটা লক করা। দরজায় পাস-লক সিস্টেম জ্বলজ্বল করছে। বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে গেল তার। অসহ্য! এই বেয়াদপ লোকটার রুমে এমন কী কুবেরের ধন আছে যার জন্য সবসময় পাসকোড দিয়ে রাখতে হয়? আয়াত দরজার দিকে একরাশ বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল। কিন্তু তার মনের ভেতরের অস্থিরতা কমলো না বরং এক অজানা আশঙ্কায় দানা বাঁধতে লাগল।
*****
সকালের নরম রোদ জানলার পর্দা ভেদ করে ঘরে ঢুকলেও আয়াতের মনের কোণে জমে থাকা মেঘগুলো কাটেনি। সারারাত দুচোখের পাতা এক করতে পারেনি সে। আরভানের জন্য এক অজানা উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় তার হৃদপিণ্ডটা বারবার কেঁপে উঠছিল। নিজের ওপর প্রচণ্ড বিরক্ত সে; যে মানুষটা তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার কোনো সুযোগ ছাড়ে না, তার জন্যই কেন সে আজ এতটা ব্যাকুল? কেন বারবার তার ফেরার সময়টা ঘড়ির কাঁটার সাথে মেলাচ্ছে?
তীব্র কলিং বেলের আওয়াজে আয়াতের হালকা তন্দ্রাভাবটা পুরোপুরি কেটে গেল। ধড়ফড় করে বিছানা থেকে নেমে সে ঘড়ির দিকে তাকালো। সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত নিচে নেমে দরজার নব ধরতে গিয়েও সে থমকে দাঁড়াল। মনে পড়ে গেল গত রাতের সেই ল্যান্ডলাইনের কথা। সে তো ঠিক করেছিল আরভানের সামনে আসবে না! দরজা খুললেই লোকটা নিশ্চয়ই কাল রাতের সেই দুর্বল মুহূর্ত আর স্বীকারোক্তি নিয়ে আজেবাসে কথা শুনিয়ে বিদ্রূপ করবে। কিন্তু এতক্ষণ ধরে বেল বাজানোর কী মানে? লোকটা কি নিজের আঙুলের ছাপ বা পাসকোড দিয়ে ভেতরে ঢুকতে পারছে না?
অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর ক্রমাগত বেলের শব্দে বিরক্ত হয়ে আয়াত দরজাটা ঝট করে খুলে চিৎকার করে উঠল,
“অসভ্যের মতো এভাবে বেল কেন বাজাচ্ছেন? আপনার কি পাসকোড মনে নেই নাকি ইচ্ছা করেই আমাকে বিরক্ত —”
আয়াতের কথা মাঝপথে থেমে গেল। সামনে আরভান নয়, বরং একজন সুঠামদেহী মধ্যবয়স্ক পুরুষ দাঁড়িয়ে। দামী সুট-বুট পরা মানুষটাকে দেখে আয়াত যতটা অবাক হলো, তার চেয়ে যেন শতগুণ বেশি অবাক হয়েছেন সেই ভদ্রলোক। তার চোখেমুখে বিস্ময়ের এমন এক ছাপ, যা আয়াতকে মুহূর্তেই অপ্রস্তুত করে দিল।নিজের অসংলগ্ন আচরণের জন্য সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে ঢোক গিলল। লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়ে নিচু স্বরে বলল,
”মাপ করবেন, আমি আসলে অন্য কাউকে ভেবে ওভাবে কথা বলে ফেলেছি। কিন্তু… আপনি কে? কাকে খুঁজছেন?”
লোকটা কোনো কথা বলল না। একদম স্থির হয়ে নির্নিমেষ চোখে আয়াতের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার সেই দৃষ্টিতে এক বিচিত্র ঘোর, যা আয়াতকে মুহূর্তেই অস্বস্তিতে ফেলে দিল। আয়াত গলা খাঁকারি দিয়ে গলার আওয়াজ বাড়িয়ে আবারও জিজ্ঞেস করল, “কাকে চাই আপনার?”
লোকটা এবার স্বাভাবিক হয়ে শান্ত গলায় বলল, “আরভানকে। আমি আরভানের বাবা, আরশাদ চৌধুরী।”
আয়াত স্তব্ধ হয়ে গেল। এই সেই মানুষ, যার কথা ফারহান বলছিল! নিজের অসংলগ্ন ব্যবহারের জন্য সে ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড অনুতপ্ত হলো। তবে ছেলের ওপর রাগটা অজান্তেই বাবার ওপর ঝেড়ে ফেলেছে ভেবে সে মনে মনে লজ্জিত হয়ে একটু সরে দাঁড়িয়ে বলল,
“তিনি তো বাড়িতে নেই, আপনি ভেতরে আসুন। আমি ভীষণ দুঃখিত ওভাবে কথা বলার জন্য।আসলে আমি বুঝতে পারিনি…”
আরশাদ চৌধুরী ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে চারপাশে সূক্ষ্ম নজর বুলিয়ে বললেন, “কোথায় গেছে সে?”
আয়াত দরজা লাগিয়ে বলতে লাগল, “একটু কাজে বাইরে গেছেন, হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবেন।”
আরশাদ চৌধুরী সোফায় বসে মুচকি হেসে বললেন,
“তুমি আয়াত, তাই না? আমাকে তোমার অবশ্য মনে নেই, অনেক ছোট ছিলে তখন। তবে তুমি একদম তোমার মায়ের মতো হয়েছো, অবিকল সেই মুখ।”
আয়াত সৌজন্যমূলক হাসি দিলেও লোকটার চাউনি তাকে বড্ড অস্বস্তিতে ফেলছে। তার দৃষ্টির গভীরতায় এমন কিছু আছে যা সহজ বা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। আয়াত সেটা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য বলল, “আপনি চা খাবেন নাকি কফি?”
আরশাদ চৌধুরী হেসে বললেন, “তোমার হাতে এক কাপ চা খাওয়া যায়। তোমার মা চমৎকার চা বানাতেন, আশা করি সেই স্বাদ তোমার হাতেও পাওয়া যাবে।”
আয়াত মাথা নেড়ে রান্নাঘরে চলে এল। চাচা বানানোর সময়ও তার মনে হচ্ছিল লিভিং রুম থেকে কেউ তাকে ক্রমাগত অদৃশ্য এক দৃষ্টি দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে। চায়ের ট্রে নিয়ে সে যখন আরশাদ চৌধুরীর সামনে গিয়ে দাঁড়াল, দেখল লোকটা তখনো একইভাবে তার দিকে তাকিয়ে আছে, যেন চারপাশের আর কোনো কিছুর অস্তিত্ব তার কাছে নেই। এই দৃষ্টিটা লোলুপ না হলেও অতিরিক্ত নিবিড় আর অস্বাভাবিক, যা আয়াতকে ভেতরে ভেতরে আতঙ্কিত করে তুলল। সে বুঝতে পারল এই মানুষটার সান্নিধ্য তার জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পেরে সে নিজেকে সামলাতে পারল না; ইচ্ছা করেই হাতের ট্রে-টা একটু টালমাটাল করে চায়ের কাপটা আরশাদ চৌধুরীর গায়ের ওপর উল্টে দিল।
গরম চায়ের ছেঁকায় আরশাদ চৌধুরী আর্তনাদ করে উঠলেন। আয়াত সঙ্গে সঙ্গে একটু নাটুকে ভঙ্গিতে ব্যস্ত হয়ে বলল, “হায় আল্লাহ, আমি কী করে ফেললাম! প্লিজ মাফ করবেন, হাতটা স্লিপ করে গিয়েছিল। একটু দাঁড়ান আমি এখনই বরফ নিয়ে আসছি।”
আয়াত দ্রুত ফ্রিজ থেকে বরফ নিয়ে এসে আরশাদ চৌধুরীর দিকে বাড়িয়ে দিল। ঠিক তখনই পেছন থেকে এক গম্ভীর, বজ্রকঠিন শব্দ ভেসে এল,
“এখানে কী হচ্ছে?”
আয়াত আর আরশাদ চৌধুরী দুজনেই দরজার দিকে তাকাল। সেখানে সাদা শার্টের হাতা গুটানো অবস্থায় আরভান দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখের দৃষ্টিতে যেন আগ্নেয়গিরির তপ্ত লাভা উপচে পড়ছে।
আরশাদ চৌধুরী বরফ হাতে নিয়ে দগ্ধ জায়গায় ঘষতে ঘষতে নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন, “তোমার অপেক্ষায়ই ছিলাম আরভান। এসো।”
আরভান তার বাবার কথার কোনো উত্তর দিল না। সে আয়াতের দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকালো, যেন ওই দৃষ্টি দিয়েই তাকে ভস্ম করে দেবে। আয়াত বুঝতে পারল না তার অপরাধ ঠিক কোথায়; সে তো কেবল সৌজন্যবোধ দেখিয়েছিল। আরভান দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “উপরে যাও আয়াত।”
আয়াত নড়ল না। অপরিচিত একজন মানুষের সামনে আরভানের এমন হুকুমজারি করার ধরন তার আত্মসম্মানে আঘাত করল।তাই সে অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু আরভান এবার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে আয়াতের হাতটা সজোরে খপ করে ধরল। হিড়হিড় করে টেনে সিঁড়ি বেয়ে উপরে নিয়ে গিয়ে তাকে নিজের রুমে প্রায় ধাক্কা দিয়ে ঢুকিয়ে দিল।
”তোমাকে বারবার বলার পরেও কোন সাহসে তুমি বাইরের মানুষের জন্য দরজা খুলেছ? আমি কি তোমাকে বারণ করিনি যে ডেইজি ছাড়া আর কাউকে এ বাড়িতে ঢুকতে দেবে না?”
আরভানের কণ্ঠস্বর যেন ফেটে পড়ল।আয়াত নিজেকে সামলে নিয়ে তীব্র গলায় পালটা জবাব দিল, “উনি আপনার বাবা হন আরভান! আমি কোনো পরপুরুষের জন্য দরজা খুলিনি…”
”আমার বাবা হোক কিংবা দাদা—যে-ই হোক না কেন! যখন আমি বারণ করেছি, তখন সেটা পালন করাই তোমার উচিত ছিল। এই অবাধ্যতার ফল কী হতে পারে সেটা আমি তোমাকে পরে বোঝাচ্ছি।”
কথাটি বলেই আরভান ঘরের দরজাটা ওপাশ থেকে সজোরে লাগিয়ে লক করে দিল, যেন আয়াত চাইলেও আর বের হতে না পারে। আয়াত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
****
নিচে নেমে আসতেই আরভান দেখল আরশাদ চৌধুরী সোফায় পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছেন। আরভানকে দেখে তিনি এক বিদ্রূপাত্মক হাসি দিয়ে বললেন, “আমার ছেলে কেন ডিভোর্স দিতে গিয়ে সেই মেয়েকে সাথে করে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসেছে, তা এবার আমার কাছে পরিষ্কার। তুমি আবারও ভুল করলে আরভান। বারবার বলার পরও বাঙালি মেয়ের মায়াবী রূপের জালে তুমি ঠিকই পা দিলে।”
আরভান কোনো ভূমিকা না করে চোয়াল শক্ত করে প্রশ্ন করল, এই বাড়িতে কেন এসেছেন আপনি?”
”এটা কেমন প্রশ্ন আরভান? বাবা প্রথমবার তোমার বাড়িতে এসেছে, কোথায় তাকে আপ্যায়ন করবে তা না করে… আচ্ছা বাদ দাও, কাজের কথা বলি। তোমাকে আমার বড্ড প্রয়োজন আরভান। তুমি তো জানো ব্যবসায়ের …”
আরভান ঠোঁট বাঁকিয়ে অবজ্ঞার হাসি হাসল। “আপনাকে দেখে আমার বড্ড মায়া হয় মিস্টার চৌধুরী। মনে হয় আমার সামনে কোনো জরাজীর্ণ ভিখারি দাঁড়িয়ে আছে, যে বারবার কোনো না কোনো স্বার্থের জন্য ভিক্ষা চাইতে আসে। আপনার আভিজাত্যের আড়ালে এই নিঃস্ব রূপটা বড্ড হাস্যকর।”
আরশাদ চৌধুরী ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন। ্ রুক্ষ গলায় বললেন “মুখ সামলে কথা বলো আরভান! ভুলে যেও না আমি তোমার বাবা হই।”
”আই ডোন্ট থিঙ্ক সো। বায়োলজিক্যাল রিলেশন থাকলেই কেউ বাবা হয়ে যায় না। আগেও বলেছি, এখনো বলছি—আমি আপনার কোনো নোংরা কাজ করতে রাজি নই। আপনি সসম্মানে আমার বাড়ি থেকে বের হন, নতুবা আমাকে অন্য কোনো ব্যবস্থা নিতে হবে।”
আরশাদ চৌধুরী সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কঠিন গলায় বললেন, “আমার বিরুদ্ধাচরণ করার পরিণাম কিন্তু ভয়ংকর হতে পারে আরভান।”
আরভান এক পা এগিয়ে এসে তার বাবার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “আমিও আপনার সেই ভয়ংকর রূপটা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় রইলাম। দেখি আপনার প্রতিহিংসা কতদূর পৌঁছায়।”
আরশাদ চৌধুরী ছেলের দিকে একবার অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে রাগে গজগজ করতে করতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন। আরভান কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে আয়াতের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নব ঘোরাতেই বুঝল আয়াত ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।
আরভান দরজায় মৃদু করাঘাত করে বলল, “আয়াত, দরজা খোলো। তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।”
ভেতর থেকে কোনো সাড়া এল না। এমনকি কোনো শব্দও শোনা গেল না। কয়েকবার জোরে দরজায় ধাক্কা দিয়ে আরভান অস্থির হয়ে বলল,
“আমি কিন্তু দরজা ভেঙে ফেলব আয়াত! কেন তুমি বুঝতে চাইছো না যে দাদাজান তোমাকে আমার কাছে পাঠিয়েছেন তোমার সুরক্ষার জন্য। এই কয়দিনে আমার জীবন দেখে কি বুঝতে পারোনি যে আমার চারপাশটা খুব একটা নিরাপদ নয়? আমার কেউ নেই আয়াত। পরিবার, বাবা, মা—এইসব রঙিন সম্পর্ক আমার জন্য নয়। এটা তোমাকে বুঝতে হবে।”
ওপাশ থেকে এবারও কোনো উত্তর এল না। ঠিক তখনই আরভানের ফোনে একটি জরুরি কল আসায় সে বিরক্ত হয়ে করিডোর দিয়ে চলে গেল।
এদিকে আয়াত বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল।গত রাতের অনিদ্রা, আজকের অপমান আর আরভানের এই দ্বিমুখী আচরণ।সব মিলিয়ে সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। একরাশ অভিমান আর অবহেলা তার বুকটাকে চিরে ফেলছে। সারারাত না ঘুমানোর ক্লান্তি আর মানসিক অবসাদে তার চোখ দুটো ক্রমশ বুজে এল। অভিমানে ভরা মনটা নিয়ে সে একসময় গভীর ঘুমের দেশে তলিয়ে গেল।
****
আরভান এই বাড়িটি এমন এক সূক্ষ্ম নকশায় তৈরি করেছে যে, তার নিজস্ব মাস্টার বেডরুম থেকে একটি গোপন করিডোর দিয়ে বাড়ির প্রায় সবকটি ঘরে অনায়াসেই যাতায়াত করা যায়। সেই সুবাদেই আয়াতের রুমে নিঃশব্দে প্রবেশ করল সে। রুমে তখন বিকেলের মরা আলো এক মায়াবী আচ্ছন্নতা তৈরি করেছে।
আরভান আয়াতের শিয়রে বসল। কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে সেই মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বড় আদরে কপালের ওপর লুটিয়ে থাকা অবাধ্য চুলগুলো সরিয়ে দিল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বলল,
“তুমি আমার এক অনবদ্য দুর্বলতা হয়ে উঠছো আয়াত। যে প্রাচীর আমি নিজের চারপাশে গড়ে তুলেছিলাম, তুমি প্রতিদিন নিঃশব্দে তার একেকটি ইট সরিয়ে দিচ্ছ। আমি নিজের অজান্তেই তোমার কাছে হেরে যাচ্ছি।”
আরভানের উষ্ণ আঙুলগুলো আয়াতের গাল স্পর্শ করল। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘুমের ঘোরেই আয়াত এক অদ্ভুত অস্থিরতা অনুভব করল। অবচেতন মনেই সে আরভানের হাতটা আঁকড়ে ধরে নিজেকে আরভানের প্রশস্ত বুকের মাঝে লুকিয়ে ফেলল। আরভান চমকে গেল, কয়েক মুহূর্ত সে নিস্পন্দ হয়ে তাকিয়ে রইল আয়াতের দিকে। তারপর ধীরলয়ে সে আয়াতের পাশে শুয়ে পড়ল। জীবনের প্রথমবার সে কোনো নারীকে এভাবে নিবিড়ভাবে অনুভব করছে। আয়াতের চুলের মিষ্টি ঘ্রাণ আর তার নিয়মিত নিঃশ্বাসের শব্দ আরভানের দীর্ঘদিনের একাকীত্বকে যেন এক নিমেষে ধুয়ে দিল। সে আয়াতকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল, যেন এই মায়াবী মুহূর্তটা সে কখনোই হারাতে চায় না।
হঠাৎ ঘুমের মাঝে আয়াতের দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো। মনে হলো কেউ তাকে শক্ত কোনো নাগপাশে বেঁধে ফেলেছে। আতঙ্কে চোখ না মেলেই সে চিৎকার দিয়ে উঠল। আয়াতের চিৎকারে আরভান নিজেও ঘাবড়ে গিয়ে বন্ধন ঢিল করল। কিন্তু আয়াত তখনো আধো-ঘুম আধো-জাগরণ অবস্থায়! সে নিজের সুরক্ষায় অবচেতন মনেই দুম করে এক ঘুষি চালিয়ে দিল সামনে থাকা মানুষটার দিকে। সেই ঘুষিটা গিয়ে সরাসরি লাগল আরভানের সুঠাম চোয়ালে।
”আহ্! স্টপ ইট আয়াত! এটা আমি!”
আরভান যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠে চিৎকার করল।
আয়াত ধড়ফড় করে উঠে বসে বড় বড় চোখে তাকাল। দেখল সামনে আরভান গাল চেপে ধরে বসে আছে। আয়াত প্রথমে হতভম্ব হয়ে দরজার দিকে তাকাল। দরজা তো ভেতর থেকে যথারীতি বন্ধ!
”আ… আপনি? আপনি রুমে ঢুকলেন কী করে? দরজা তো ভেতর থেকে লক করা! আর আপনার সাহস হয় কী করে আমার অনুমতি ছাড়া আমাকে এভাবে…” আয়াত কথা শেষ করতে পারল না লজ্জায়।
আরভান এক হাত দিয়ে গাল চেপে ধরে ব্যথায় মুখ কুঁচকে বলল, “নির্দয় নারী! আস্ত একটা স্বামী নির্যাতনকারী, এক নম্বর জাহান্নামী বউ তুমি! বলতো, এইটুকু শরীরে এত শক্তি কোত্থেকে আসে? জানা ছিল না বারো বছর আগে আমি কোনো হৃদয়হীন প্রফেশনাল বক্সারকেই কবুল বলেছিলাম!”
আয়াত কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থেকে নিজের রাগ সামলে নিয়ে বলল,
“আপনি তো আর জান্নাত থেকে পালিয়ে আসা কোনো নিষ্পাপ ফেরেশতা নন! আপনি হলেন আস্ত এক পিশাচ! সেদিন না বুক ফুলিয়ে বললেন আমাকে স্ত্রী হিসেবে মানেন না? তবে এই অসভ্য অধিকারবোধ এখন কোত্থেকে এল?”
আরভান এক হাত দিয়ে গাল ঘষতে ঘষতে বাঁকা হাসল, “তখন মানিনি, এখন মানছি। স্বামীর মন তো, আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাসের মতো যেকোনো সময় বদলে যেতে পারে।এখন পরিস্থিতি মেঘলা থেকে রোদেলা হয়ে গেছে!”
আয়াত ভ্রু কুঁচকে বলল, “বুঝতে পেরেছি। কাল রাতের ল্যান্ডলাইনের কথাগুলো নিয়ে আপনি ঠাট্টা করার নতুন বাহানা খুঁজছেন, তাই না?”
আরভান এবার একটু বেশিই নাটক শুরু করল। সে আয়াতের খুব কাছে এগিয়ে এল।
“ঠাট্টা? আরে আমার তো হার্টবিট থেমে যাওয়ার জোগাড়! আমি তো ভাবলাম আমার বিরহে তুমি না জানি হিমালয়ে গিয়ে সন্ন্যাসী হয়ে যাও। ওই শোনো, এখন এই ড্রামা বন্ধ করো। তাড়াতাড়ি বরফ নিয়ে এসো, আমার গালটা কিন্তু অলরেডি ফুলে টমেটো হয়ে গেছে।
বিরক্ত চোখে আয়াত কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। এই লোকটা আসলেই বড্ড বিচিত্র! একে না যায় ঘৃণা করা, না যায় বেশিক্ষণ রাগ করে থাকা। আয়াত অগত্য উঠে গিয়ে আইস-ব্যাগ নিয়ে এল। আরভানের সামনে ধরে ইশারা করল নিজে লাগিয়ে নিতে। কিন্তু আরভান মুখ ঘুরিয়ে নিল। করুণ মুখ করে বলল,
“আঘাত যে দেয়, মলম লাগানোর দায়িত্বও তো তারই হওয়া উচিত। নাকি সেটাও আমাকেই করতে হবে? আমি তো এখন ইনজিউর্ড পারসন!”
আয়াত বিরক্ত হয়ে ধপ করে আরভানের পাশে বসে পড়ল এবং তার গালে বরফ ঘষতে শুরু করল। ঠিক তখনই আরভান হঠাৎ আয়াতের হাতটা আঁকড়ে ধরল। ঘরের পরিবেশ মুহূর্তেই পাল্টে গেল। এক অদ্ভুত ঘোরের মাঝে আরভান আয়াতের চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
”তুমি বড্ড মায়াবী আয়াত। আমার অন্ধকার পৃথিবীতে তোমার এই কাজল কালো চোখ দুটো বারবার আমাকে টেনে আনে। আমি চাইলেও আর ফিরে যেতে পারছি না। তোমার এই নিঃশ্বাসের কাছাকাছি থাকাটা আমার নেশা হয়ে যাচ্ছে।”
আয়াতের হৃৎপিণ্ড যেন আজ ড্রাম বাজাতে শুরু করেছে। আরভান আরও কাছে এগিয়ে এল। তার নাকের অগ্রভাগ আয়াতের গালে স্পর্শ করতেই এক তীব্র শিহরণ খেলে গেল আয়াতের শরীরে। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। আরভানকে দু-হাতে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে সে একছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। পেছনে ফেলে রেখে গেল এক দিশেহারা আরভানকে, যার ঠোঁটের কোণে তখন এক তৃপ্তির হাসি।
করিডোরে দাঁড়িয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল আয়াত। লোকটা কি তার সাথে নতুন কোনো অভিনয় করছে? সে আর যাই হোক, এই সুবিধাবাদী লোককে সহজে বিশ্বাস করবে না। কিন্তু নিজের ধুকপুক করতে থাকা মনটাকে শান্ত করার উপায়ও তো সে জানে না!
#তাসনিম_রিয়া_খান
চলবে….

