Home "ধারাবাহিক গল্প লাল শাড়ি লাল শাড়ি পর্ব-১১

লাল শাড়ি পর্ব-১১

0
300

#লাল_শাড়ি
#১১
#ফারহানা_ইসলাম

…. মোড়ল জেঠা আর জেঠি চলে যাওয়ার পর বাড়িটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

আম্মা কিছুক্ষণ চুপচাপ বারান্দায় বসে রইলেন। তাঁর চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। তবুও মুখে এক ধরনের দৃঢ়তা।

ইভা আপু ধীরে ধীরে এসে আম্মার পাশে বসল।

___ আম্মা।

আম্মা মেয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

___ কী রে মা?

ইভা আপুর চোখে পানি চিকচিক করছে।

___ আমার জন্য এত কথা শুনতে হলো তোমারে।

আম্মা ইভার মাথায় হাত রেখে বললেন,,,

___ যদি মায়ের কপালে সন্তানের জন্য কষ্ট লেখা থাকে। এই কষ্ট নিয়ে কোনোদিন আফসোস করিস না।

ইভা আপু হঠাৎ আম্মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল।

___ আমি অনেক পড়াশোনা করব আম্মা। আমি এমন মানুষ হইব, যেন কেউ আর কোনোদিন বলতে না পারে—তোমার মেয়েরে ছোট বয়সে বিয়ে দাও।

আম্মার চোখও ভিজে উঠল।

___ এই কথাটাই আমি শুনতে চাইছিলাম।

আমি আর নিশা দরজার আড়াল থেকে সব দেখছিলাম। আমারও মনে হচ্ছিল, আম্মার স্বপ্ন কোনোদিন ভাঙতে দেওয়া যাবে না।

ঠিক তখনই উঠান থেকে হাজেরার মায়ের গলা শোনা গেল।

___ হুঁ! বেশি লেখাপড়া করাইয়া কী হইবো? শেষে তো অন্যের বাড়িই যাইতে হইবো!

আম্মা এবার আর কোনো উত্তর দিলেন না।

শুধু শান্তভাবে বললেন,

___ সব মেয়েই অন্যের বাড়ি যায়। কিন্তু মাথা উঁচু করে যায়, না মাথা নিচু করে যায়—সেটা শিক্ষা ঠিক করে দেয়।

হাজেরার মা মুখটা কালো করে চলে গেলেন।

এইদিকে আব্বা হাজেরার মাকে বললেন,,,

___ আপনাকে কত বার নিষেধ করেছি যেন, ওদের কোনো ব্যাপারে মাথা না ঘামাতে। কিন্তু আপনি কেনো এইরকম করতেছেন।

হাজেরার মা ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন,,,

___ আমি কি মিথ্যা কিছু কইছি? মাইয়াগো এত লেখাপড়া করাইয়া শেষ পর্যন্ত কী লাভ?

আব্বার কণ্ঠটা এবার আগের চেয়ে কঠিন শোনাল।

___ লাভ-লোকসানের হিসাব সবকিছুতে হয় না। আমার মেয়েরা পড়বে। এই বিষয়ে আর একটা কথাও আমি শুনতে চাই না।

কথাটা শুনে আমি, ইভা আপু আর আম্মা—তিনজনই অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছিল না। এই মানুষটাই কি আমাদের আব্বা? যিনি এতদিন আমাদের কোনো ব্যাপারে মুখ খুলতেন না, আজ তিনিই সবার সামনে আমাদের হয়ে কথা বলছেন!

হাজেরার মা রাগে গজগজ করতে করতে চলে গেলেন।

হাজেরা একবারও কোনো কথা বলল না। শুধু মাথা নিচু করে নিজের ঘরে ঢুকে গেল।

আব্বা কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে ধীরে আম্মার দিকে তাকালেন।

___ নাজিয়া, তোমার শরীর এখন কেমন?

আম্মা শান্ত গলায় বললেন,

___ আলহামদুলিল্লাহ। একটু ভালো আছি।

___ ডাক্তার যা যা বলছে, সব মেনে চলবা। নিজের শরীরের দিকেও একটু খেয়াল রাখো।

এতটুকু বলেই আব্বা চলে গেলেন।

আম্মা অনেকক্ষণ তাঁর যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইলেন। চোখে যেন হাজারটা প্রশ্ন।

রাতে আমরা সবাই একসাথে খেতে বসলাম।

অনেকদিন পর প্রথমবারের মতো আব্বা নিজে থেকে বললেন,,,

___ ইরা, তোর পরীক্ষার আর কতদিন বাকি?

আমি অবাক হয়ে বললাম,,,,

___ আর এক মাস।

___ ভালো করে পড়বি। কোনো কিছুর জন্য পড়াশোনা নষ্ট করবি না।

আমি শুধু মাথা নাড়লাম।

ইভা আপুও চুপচাপ বসে ছিল।

খাওয়া শেষ হওয়ার পর আব্বা উঠে নিজের ঘরে চলে গেলেন।

মাজেদা খালা আস্তে করে বললেন,

___ মানুষটার ভেতরে কিছু একটা পরিবর্তন হইতেছে আপা।

আম্মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

___ আল্লাহ চাইলে পাথরের মনও একদিন নরম হয়।

পরদিন সকালে মুন্নী স্কুলে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে আমাদের বলল,

___ ইরা, ইভা আপু! শুনছিস?

আমি অবাক হয়ে বললাম,

___ কী হইছে?

মুন্নী চারদিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,

___ কাল সন্ধ্যায় বাজারে একটা ঘটনা ঘটছে। পুরো গ্রামে এখন ওইটাই আলোচনা।

আমার বুকটা ধক করে উঠল।

___ কী ঘটনা?

মুন্নী বলল,,,

___ ঘটনাটা তোদের আব্বাকে নিয়েই!!

মুন্নীর মুখে কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।

আমি তাড়াতাড়ি বললাম,

___ আব্বাকে নিয়ে কী হয়েছে?

মুন্নী চারদিকে একবার তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,

___ কাল সন্ধ্যায় বাজারে হাজেরার মামা আর কয়েকজন লোক তোমাদের আব্বাকে অনেক অপমান করছে।

ইভা আপু কপাল কুঁচকে বলল,,,

___ কেন?

___ তারা নাকি বলতেছিল, আগের সংসারের লোকজনের জন্য এত দরদ দেখাইলে নতুন সংসার কইরা লাভ কী?

আমি আর কিছু শুনতে পারছিলাম না।

মুন্নী আবার বলল,

___ কিন্তু জানিস, এবার কাকা একদম চুপ ছিল না।

আমরা দুজনেই অবাক হয়ে তাকালাম।

আমরা দুজনেই অবাক হয়ে তাকালাম।

___ উনি সবাইকে বলছেন, নাজিয়া আমার সন্তানদের মা। ওর সম্মান মানে আমার সম্মান। আমার মেয়েদের নিয়ে আর একটা কথাও কেউ বলবেন না।

কথাটা শুনে আমার বুকটা কেঁপে উঠল।

ইভা আপুও কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে রইল।

স্কুল ছুটি হওয়ার পর আমরা দ্রুত বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

বাড়িতে গিয়ে দেখি আব্বা উঠানে একা বসে আছেন।

মুখটা কেমন যেন ক্লান্ত।

আমি অনেকক্ষণ দূরে দাঁড়িয়ে রইলাম।

জীবনে প্রথমবার আব্বার কাছে গিয়ে বসতে ইচ্ছে করছিল।

কিন্তু সাহস হচ্ছিল না।

ঠিক তখনই আব্বা নিজেই ডাকলেন,

___ ইরা, এদিকে আয় মা।

তিনি আমার মাথায় হাত রেখে বললেন,

___ তুই কি আমার ওপর অনেক রাগ করছিস?

আমি মাথা নিচু করে রইলাম।

চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারলাম না।

___ রাগ না… খুব কষ্ট পাইছি।

আব্বার চোখও ভিজে উঠল।

___ জানি মা। তোদের অনেক কষ্ট দিছি।

আমি অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকালাম।

জীবনে এই প্রথম আব্বাকে নিজের ভুল স্বীকার করতে দেখলাম।

তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,,,

___ মানুষ কখনো কখনো এমন ভুল করে, যার শাস্তি সে সারাজীবন ভোগ করে। আমি এখন প্রতিদিন সেই শাস্তিই ভোগ করতেছি।

আমি কিছু বলতে পারলাম না।

দূর থেকে দেখলাম আম্মা বারান্দায় দাঁড়িয়ে সব দেখছেন।

তাঁর চোখেও পানি।

কিন্তু তিনি এগিয়ে এলেন না।

হয়তো কিছু দূরত্ব এত সহজে মুছে যায় না।

সেদিন রাতটা অন্যরকম ছিল।

বাড়িতে কোনো ঝগড়া হলো না।

হাজেরাও চুপচাপ নিজের ঘরে ছিল।

পরেরদিন সকালবেলা

…. আব্বা হাজেরাকে নিয়ে কোথাও বের হইলেন। নিশা আব্বাকে ডেকে বলল,,,

___ আব্বা তুমি কই যাও?

___ ডাক্তারের কাছে যাইতেছি। তোদের নতুন মায়ের শরীরটা ভালো নেই।

___ ওহ।

___ তোমার জন্যে আব্বা কী নিয়া আসবো বলো?

___ আমি মিষ্টি খাব। আমার জন্যে মিষ্টি নিয়া আসিও।

___ আচ্ছা নিয়া আসবো।

…. নিশার সাথে কথা বলে আব্বা ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। আম্মা আড়াল থেকে সব শুনছে। ওরা চলে যাওয়ার পর আম্মা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,,
ইরা, ইভা তোরা দুই বোন মুন্নী আর নিশাকে নিয়ে তোদের মামা বাড়ি থেকে ঘুরে আয়।

ইভা আপু বললেন,,

___ আম্মা আপনার শরীর ভালো নেই। আমরা কীভাবে যাই।

___ আমি আর মাজেদা থাকতে পারবো। তোরা দুইটা দিন থেকে আয়। এই কয়মাসে তোদের ওপর অনেক ধকল গেছে।

____ আম্মা আপনিও চলেন। ওইখানে গেলে আপনারও মন ভালো থাকবে।

___ না রে মা আমি অন্য সময় যাব।

আম্মার কথা শুনে আমরা আর জোর করলাম না।

ইভা আপু শুধু বলল,

___ ঠিক আছে আম্মা। তবে আপনার কোনো সমস্যা হলেই সঙ্গে সঙ্গে খবর পাঠাবেন।

আম্মা মুচকি হেসে মাথা নাড়লেন।

___ আমার কিছু হবে না ইনশাআল্লাহ। তোরা নিশ্চিন্তে যা।

মাজেদা খালা রান্নাঘর থেকে বের হয়ে বললেন,

___ যাও মা, দুইদিন একটু ঘুইরা আইসো। আমি আপার খেয়াল রাখুম।

আমরা তাড়াতাড়ি কাপড়চোপড় গুছিয়ে নিলাম। নিশা তো আনন্দে লাফাতে শুরু করল।

___ মামাবাড়ি যামু! মামাবাড়ি যামু!

মুন্নীও খবর পেয়ে আমাদের সঙ্গে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে গেল।

দুপুরের আগেই আমরা চারজন রওনা দিলাম।

অনেকদিন পর গ্রামের সেই চেনা মেঠোপথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বুকটা হালকা লাগছিল।

নদীর পাড়ে গিয়ে নৌকায় উঠলাম। নিশা খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল।

মামাবাড়ির উঠানে ঢুকতেই নানু ছুটে এসে আমাদের বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

___ আমার নাতনিগো মুখডা দেখি!

মামিরাও খুব খুশি হলেন।

কিন্তু সবার প্রথম প্রশ্ন ছিল—

___ নাজিয়া কই?

ইভা আপু আস্তে করে বলল,

___ আম্মা আসে নাই। শরীরটা ভালো না।

কথাটা শুনেই নানুর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

___ আবার শরীর খারাপ?

আমি সব খুলে বলতে পারলাম না।

শুধু বললাম,

___ ডাক্তার বিশ্রাম নিতে কইছে।

বিকেলে মামা বাজার থেকে নানা রকম ফল আর মিষ্টি নিয়ে এলেন।

নিশা তো খুশিতে আত্মহারা।

কিন্তু রাতের খাবারের সময় হঠাৎ দেখি বড় মামা খুব চিন্তিত মুখে বসে আছেন।

নানু জিজ্ঞেস করলেন,

___ কী হইছে?

মামা একটু ইতস্তত করে বললেন,

___ আজ বাজারে একটা কথা শুনলাম।

আমার বুকটা ধক করে উঠল।

___ কী কথা মামা?

মামা আমাদের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বললেন,

___ গ্রামের কিছু লোক নাকি আবার নাজিয়ারে নিয়ে বাজে কথা বলা শুরু করছে।

ইভা আপুর মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

___ কেন?

___ কারণ হাজেরা নাকি মা হতে চলেছে।

মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

আমার হাত থেকে গ্লাসটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

নিশা কিছুই বুঝতে না পেরে শুধু চারদিকে তাকিয়ে রইল।

মামা আবার বললেন,

___ আমি জানি না খবরটা কতটুকু সত্যি। কিন্তু এই খবর ছড়ানোর পর অনেকেই বলতেছে, এখন নাজিয়া আর ওর মেয়েদের দিন আরও কঠিন হবে।

আমি আর ইভা আপু একে অপরের দিকে তাকালাম।

চলবে